Sunday, September 1, 2013

সুতালুটির জন্ম এবং কলকাতায় ‘বসুক বা বসাকদের ইতিকথা৪, Basaks of Bengal are the Founder of Sutaluti or Sutanuti, the Old Calcutta4

ভাগিরথীর একদিকে সুতালূটীর সূতার ব্যবসা ও অপরদিকে বেতোড়ের হাট। এই দুইটী হাটের বাণিজ্যের জন্যই, ভবিষ্যৎ কলিকাতার প্রাণ-প্রতিষ্ঠায় বিশেষ সহায়তা হইয়াছিল। ধরিতে গেলে, শেঠ-বসাকদিগের আগমনে বন জঙ্গলপূর্ণ গোবিন্দপুর – একখানি ক্ষুদ্র গ্রামে পরিণত হয়।
বৈষ্ণবশ্রেষ্ঠ বল্লভাচার্জই রাধাকৃষ্ণের জুগল মুর্ত্তির উপাসনা চারতে প্রচার করেন এরূপ একটী জনপ্রবাদ আছে। বলিতে পারি না, শ্রীরাধাকৃষ্ণের যুগল-মুর্ত্তির বহুল প্রচার ইহার পুর্ব্বে হইয়াছিল কি না? বসাকেরা গোবিন্দউরে আসিবার পর, রাধাকৃষ্ণের যুগল-মুর্ত্তির প্রতিষ্ঠা করেন। সম্ভতঃ ইহা ষোড়শ শতাব্দীর প্রথমার্দ্ধ কাল। শেঠ-বসাকদিগের গোবিন্দজী ঠাকুর, রাধাকৃষ্ণেরই যুগল মূর্ত্তি(এই মূর্ত্তি স্থাপনার প্রধান উদ্যোগী মুকুন্দরাম বসাক। মুকুন্দরামের উপাধি ‘শেঠ’ ও তিনি মৌদ্গল্য-গোত্রীয়। ১৭৫৭ খৃঃঅব্দে অর্থাৎ পলাশী যুদ্ধের আমলে, কোম্পানীবাহাদুর গোবিন্দপুর হইতে লোকের বসবাস উঠাইয়া দিলে, তদ্বংশজাত বৈষ্ণবচরণ তথা হইতে গোবিন্দজীকে উঠাইয়া আনিয়া, বড়বাজারে নিজ বসতবাটঈর উত্তরে স্থাপিত করেন। তদবধি গোবন্দজী এখনও তথায় বর্ত্তমান আছেন। টাঁকশালের দক্ষিণ পুর্ব্বে, বড়বাজারের জাইবার পুর্ব্বধারে, তাঁহার মন্দির আজও অবস্থিত। ...মুকুন্দরামের বংশধর বৈষ্ণবচরণ শেঠ, পরম বৈষ্ণব ছিলেন। তিনি ব্যবসা-বাণিজ্য দ্বারা প্রচুর ধন সঞ্চয় করেন। তাঁহার মত ধর্ম্মভীরু লোক সেকালে বড় কম ছিল। তেলিঙ্গানা প্রদেশের – রাম্রাজার পূজার জন্য গঙ্গাজল তিনি কলিকাতা হইতে শিলমোহর করিয়া পাঠাইতেন। বৈষ্ণবচরণের ধর্ম্মভীরুতার সম্বন্ধে একটী গল্প শুনিয়াছি। পাঠক বোধহয় শুনিয়াছেন – এদেশে একটি প্রবাদ বাক্য আছে ‘লাগে টাকা দেবে গৌরীসেন।’ এই গৌরীসেন ব্যবসার সুত্রে বৈষ্ণবচরণের অংশীদার ছিলেন। বৈষ্ণবচরণ এক সমজয়ে কতকগুলি দস্তা খরিদ করেন। কিন্তু পরিক্ষসয় জানা যায় – এই দস্তারমধ্যে রূপার অংশ কিছু বেশী। বৈশণবচরণ ভাবিলেন গৌরিসেনের নামে  - দস্তা কেনায় তাহা ‘রাঙ্গের বদলে রূপায়’ দাঁড়াইয়াছে। ধররম্মভীরু, কর্ত্তব্যপরায়ণ বৈষ্ণবচরণ, ইহার বিক্রয়লব্ধ সমস্ত টাকাই গৌরীসেনকে প্রদান করেন। এই ব্যাপারে গৌরীসেন মহা ধনী হইয়া উঠেন। গৌরীসেন তাঁহার অর্জ্জিত বিপুল সম্পত্তি দান-খয়রাতে ব্যয় করিতেন। কন্যাদায়, মাতৃদায়, পিতৃদায়, দেনার দায়ে কায়েদী অধমর্ণ কিম্বা যাহারা ন্যায় পথে থাকিয়া সৎকার্য্যের জন্য ফৌজদারীতে জড়িত ও জরিমানার আসামী, তাঁহাদের জন্যই অকাতরে অর্থব্যয় করিতেন। ইহা হইতেই “লাগে টাকা দেবে গৌরীসেন’ এই প্রবাদ-বাক্যের উতপত্তি। এক্ষণে এই বৈষ্ণবচরণ শেঠ সম্বন্ধে দুই একটী কিম্বদন্তী বলিব। বৈষ্ণবচরণ এক সময়ে বর্দ্ধমানের কোন মহাজনের নিকট দশাজার টাকার চিনি কিনিবার সংকল্প করেন। এই লোকটীর নাম গোবর্ধন রক্ষিত – জাতাংশে তাম্বুলী। সমস্ত মাল যখন বড়বাজারের কদমতলার ঘাটে পৌঁছিল, সেই সময়ে বৈষ্ণবচরণের কর্ম্মচারীরা মাল নামাইতে যান। তাঁহারা গোবর্দ্ধনের নিকট কিছু উপরি পাওনার লাভে হতাশ হইয়া, মনিব বৈষ্ণবচরণকে মিথ্যা করিয়া জানান, যে মাল তত সুবিধার নয় – ইহা কিনিলে লোকসান হইবে। বৈষ্ণবচরণ রক্ষিত মহাশয়কে অন্যলোক দ্বারা সেই কথা জানাইয়া বলেন – ‘আপনার মাল শুনিতেছি তত ভাল নয়, এ জন্য দাম কমাইতে হইবে।’ সেকালের লোক ধর্ম্মকে বড় ভয় করিতেন। কাজেই রক্ষিত মহাশয়, যখন এই মিথ্যাপবাদ শুনিলেন – তখন তিনি ব্যবসায়ে বদনামের ভয়ে তাঁহার চাকরদের আদেশ করিলে, - ‘চিনির নৌকা গঙ্গায় ডুবাইয়া দে। বদনাম কিনিয়া চিনি বেচিতে চাহিনা।’ তাঁহার চাকরেরা এই হুকুম পাইয়া যখন তাহা কতকটা কারয্যে পরিণত করিয়াছে, তখন এসমস্ত কথা ধার্ম্মিক প্রবর বৈষ্ণবচরণের কাঙে পৌঁছিল। তিনি তখনই আসিয়া মহাজন রক্ষিত মহাশয়কে বলিলেন – ‘আমার কর্ম্মচারীদের মুখে মিথ্যা সংবাদ শুনিয়া আমি আপনাকে সন্দেহ করিয়াছি। গঙ্গায় যে মাল ফেলিয়া দিয়াছেন, ??? আপনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করিব না। এখন যে মাল মজুদ আছে, তাঁহার দাম পুর্ব্ব স্বত্ব মতই দিব। কিন্তু ধর্ম্মজ্ঞানে গোবর্দ্ধণও বৈষ্ণবচরণ অকেক্ষা কোন বিষয়ে ন্যুন ছিলেন না। তিনি – কোনমতেই পূরা দামে মাল বেচিতে চাহিলেন না। যে মাল নষ্ট হইয়াছিল – তাহা বাদে তন বৈষ্ণবচরণের নিকট মালের দাম চুকাইয়া লইলেন। হায় বাঙ্গালা! হায় বঙ্গবাসী!’ তোমরা দেড়শত বৎসর পুর্ব্বে সেরূপ মহত্বে ভূষিত ছিলে, আর কি সে দিন ফিরিয়া আসিবে!)। ক্রমশঃ গোষ্ঠী-বৃদ্ধি ও অবস্থার উন্নতির সহিত, এই শেঠ ও বসাকবংশীয়দের অনেকের গৃহে শ্যামরায়, মদনমোহন ইত্যাদি বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা হয়।
Post a Comment