Wednesday, September 4, 2013

সোনার বাঙ্গলা – নিখিলনাথ রায়৫, Sonar Bangla - Nikhilnath Ray5

বাদশাহ সাহজাহানের রাজত্বকালে সুপ্রসিদ্ধ ফরাসী পরিব্রাজক বারণিয়ে ও টাভার্‌নিয়ে ভারতবর্ষে আগমন করিয়াছিলেন। তাঁহারা আরঙ্গজেবের রাজত্বকালেও অবস্থিতি করিয়াছিলেন। উভয়েই বঙ্গদেশে আগমন করিয়া তাঁহার বিশেষরূপ বিবরণ প্রদান করিয়াছেন। বারণিয়ে বঙ্গভূমিকে প্রকৃত সোনার বাঙ্গলা বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। তিনি বলেন যে, মিশর চিরদিন হইতে জগতের মধ্যে সৌন্দর্য্যশালী ও শস্যপূর্ণ বলিয়া বর্ণিত আসিতেছে। কিন্তু বঙ্গদেশই সেই প্রশংসা পাইবার যোগ্য। এই দেশে অপর্য্যাপ্ত পরিমাণে ধান্য উৎপন্ন হয়, এবং তাহার নিকটস্থ ও দূরস্থ দেশ সমুহে তাহা নীত হয়। গঙ্গার দ্বারা পাটনা পর্য্যন্ত এবং সমুদ্রের দ্বারা মছলীপত্তন ও করমন্ডল উপকূলের অনেক স্থানে ইহার রপ্তানি হয়। তদ্ভিন্ন সিংহল, মালদ্বীপ ও অন্যান্য রাজ্যেও নীত হইয়া থাকে। বাঙ্গালায় অনেক পরিমাণে চিনি প্রস্তুত হইয়া থাকে, তাহা গোলকুণ্ডা, কর্ণাট, এনং মোচা, বসরা হইতে আরব মেসপটেমিয়া ও বন্দর আব্বাস হইতে পারস্য দেশে নীত হয়। এখানে নানা প্রকার মিষ্টান্ন প্রস্তুত হইয়া থাকে। পর্টুগিজগণই তাহা বিশেষরূপে প্রস্তুত করিয়া তাঁহার ব্যবসায় করিয়া থাকে। এতদ্ভিন্ন জামীর, শতমূল বা অনন্তমূল, আম, আনারস, হরীতকী, লেবু ও আতার মোরব্বা প্রস্তুত করে। বাঙ্গলায় গমও উৎপন্ন হইয়া থাকে, এবং ইউরোপীয় জাহাজের অধিবাসীগণ তদ্দারা আপনাদের খাদ্যদ্রব্য প্রস্তুত করিয়া থাকে। তণ্ডুল, তিন চারি প্রকার উদ্ভিজ্জ, ঘৃত প্রভৃতি নিত্য খাদ্যদ্রব্য অতি সুলভ মুল্যে বিক্রীত হইয়া থাকে। এক টাকায় বিংশতি বা ততোধিক কুক্কুট পাওয়া যায়। রাজহাঁস, পাতিহাঁসও সুলভমূল্যে বিক্রীত হয়। ছাগ, মেষ ও শূকরমাংসে জীবনধারণ করে, লবনাক্ত শূকরমাংসও  ইংরেজ ও ওলান্দাজ জাহাজের আরোহীগণ ব্যবহার করিয়া থাকে। এক কথায় বাঙ্গলা জীবনধারণের উপযুক্ত উপযোগী দ্রব্য সমুহে পরিপূর্ণ।  এইজন্য পর্টুগীজ, ফিরিঙ্গী ও অন্যান্য খৃষ্টানগণ ওলান্দাজগণকর্ত্তৃক তাহাদের উপনিবেশ হইতে বিতাড়িত হইয়া এই শস্যপূর্ণ রাজ্যে বাস করিয়াছে, বাঙ্গলায় বহুমূল্য নানানবিধ পণ্যদ্রব্য বৈদেশিক বণিককে আকরষণ করিয়া থাকে। চিনি ব্যতীত এতদ্দেশে এত অধিকপরিমাণে তুলা ও রেশম উৎপন্ন হয় যে, ইহাকে ভারতবর্ষ, তাহার নিকটবর্ত্তী দেশ সমূহ, এমন কি ইউরোপের তুলা ও রেশম ভাণ্ডার বলা যাইতে পারে। ইহার শ্বেত ও রঞ্জিত, স্থূল ও সুক্ষ্ম নানাবিধ কার্পাসবস্ত্র দর্শনে চমৎকৃত হইতে হয়। ওলান্দাজগণ নানানস্থানে, বিশেষত জাপান ও ইউরোপে, ইহাদের রপ্তানী করে। ইংরেজ, পর্টুগীজ এবং দেশীয় ব্যবসায়িগনও বহুল পরিমাণে এই সমস্ত বস্ত্রের ব্যবসায় করিয়া থাকে। রেশম ও রেশমীবস্ত্র সম্বন্ধেও ঐরূপ বলা যাইতে পারে। সুদূর লাহোর ও কাবুল পর্য্যন্ত সমগ্র মোগলসাম্রাজ্যের ও অন্যান্য রাজ্যের জন্য কত পরিমাণে কার্পাসবস্ত্র নীত হইত, তাহা বিবেচনারও অতীত। রেশম তাদৃশ চিক্কণ না হইলেও মূল্য অতি সুলভ। তাহদিগকে বাছিয়া বুনিতে পারিলে তদ্দ্বারা সুন্দর বস্ত্রসমূহ প্রস্তুত হইতে পারে। ওলান্দাজেরা কাশীমবাজারে ইহার জন্য সাত আট শত দেশীয় লোক নিযুক্ত করিয়া থাকে। ইংরেজ ও অন্যান্য বণিকগণও সেইরূপ অধিকসংখ্যক লোক নিযুক্ত করে। বাঙ্গলায় যথেষ্ট পরিমাণে সোরাও উতপন্ন হয়। এই সমস্ত দ্রব্য ব্যতীত বাঙ্গলায় বহুল পরিমাণে লাক্ষা, অহিফেন, মোম, মৃগনাভি, লঙ্কামরিচ প্রভৃতি জন্মে। তদ্ভিন্ন ইহা হইতে অনেক পরিমাণে ঘৃত সমুদ্র পথে নানা দেশে নীত হয়, বার্ণিয়ে সোনার বাঙ্গলার সৌন্দর্য্যের কথাও বিশেষরূপে বর্ণনা করিয়াছেন। রাজমহল হইতে সমুদ্র পর্য্যন্ত গঙ্গার উভয়তীরে বিস্তৃত বহুসংখ্যক খাল ও অগণ্য-অধিবাসী-পরিপুর্ণ গ্রাম ও নগর এবং ধান্য, ইক্ষু, সর্ষপ, তিল, তুঁত প্রভৃতি নানাবিধ শস্য ও উদ্ভিজ্জে শোভিত প্রান্তর সমূহ ইহাকে সৌন্দর্যময় করিয়া রাখিয়াছিল তদ্ভিন্ন সহস্রখালবেষ্টিত, অরন্যশোভিত ও আনারসাদি-নানাবিধ-ফল্পাদিপূর্ণ দ্বীপপুঞ্জও ইহার সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি করিত। 
Post a Comment