Friday, August 17, 2012

গৌরাঙ্গ বর্মণ, গীতা বর্মণ – প্রাচীণ শহরের শিল্পীত দম্পতি


পারম্পরিক শিল্পের অন্যতম পীঠস্থান এই বাঙলায় একটি শিল্পের জন্য নিবেদিত দম্পতির দেখা পাওয়া সাধারণ ঘটনা। কিন্তু একই দম্পতি দুটি আলাদা পারম্পরিক শিল্পে নিজেদের দক্ষতাকে চরমতম সীমায় তুলে নিয়ে গিয়েছেন, এবং সংগঠণও করছেন, এমন ঘটনা খুবই ব্যতিক্রমী। এরকমই এক আলাদা শিল্পী দম্পতি কোচবিহারের শহরের গৌরাঙ্গ বর্মণ, গীতা বর্মণ।
গৌরাঙ্গ বর্মণের জন্ম অসমের গোয়ালপাড়ার বরপেটা রোডে। ছোটবেলা থেকেই তিনি দোকানে দোকানে রেডিমেড কাপড় সরবরাহ করতেন। যিনি জন্মশিল্পী, তিনি জানেন না, এক শিল্পীত ভবিষ্যত অপেক্ষা করে রয়েছে তাঁর জন্য। তখন তিনি নওগাঁও গ্রামে দুই মুসলমান ভাইএর একজনের দোকানে ব্যবসা করেন। আরএক ভাই বাঁশের নানান ধরণের শিল্পীত দ্রব্য তৈরি করতেন। আমি বহুদিনই টাকা আনতে গিয়ে সেই শিল্প দোকানে বসে তাঁদের দেখাদেখি বাঁশ কাটা ছোলার কাজ শিখে গিয়েছি, বললেন গৌরাঙ্গ। যে দোকান থেকে অর্থ রোজগার করছি, সেই দোকানের থেকে বেশি আকর্ষণ করত পাশের শিল্পেভরা দোকানটি।
ইতোমধ্যে এক পারিবারিক গোলোযোগে সবই হারালেন। বিয়ে করেছেন কোচবিহারের মেয়ে গীতাকে। হাতে একটাও টাকা নেই। এক বাঁশ শিল্পীকে সঙ্গে নিয়ে বসতি স্থাপন করলেন কোচবিহারে, শ্বশুরবাড়ি শহরে, লঙ্কাবর, তোর্সার চরে। আটের দশকে আমি নিজে তাঁর কাজের কথা শুনে গৌরাঙ্গদার বাড়ি এসেছি। দেখেছি। কী অবস্থায় তিনি থাকতেন স্ত্রীকে নিয়ে। বাড়িতে হামাদিয়ে ঢুকতে হত। চেষ্টা করেছি তাঁর শিল্প যাতে বাজার পায়, জানালেন বঙ্গীয় পারম্পরিক কারু ও বস্ত্র শিল্পী সংঘের যুগ্মসম্পাদক মধুমঙ্গল মালাকার। আজ কোচবিহারের রাজেন তেপথির গৌরাঙ্গ-গীতার আধপাকা বাড়িতে ভিড় লেগে থাকে পরম্পরিক শিল্পী সংঘের কর্মীদের।
তখনও খুব কষ্টে দিন কাটে। তাঁর পাশে দাঁড়ালেন গীতা। পাটের নানান দ্রব্য তৈরি করতেন গীতার দিদা। গীতাও শিশুকাল থেকেই শিখে নিয়েছেন পাট শিল্পের অক্ষহৃদয়। গৌরাঙ্গ দক্ষিণাপণে দ্রব্য সরবরাহ করেন। সেখান থেকেই পাটজাত শিল্পের নমুনা সংগ্রহ করে নিয়ে এসে স্ত্রীর হাতে দেন। বাঁশের পাশাপাশি তৈরি হতে শুরু হল পাট দ্রব্যও।
তখনও আর্থিক সাফল্যের মুখ দেখতে পাননি। ৮৭তে কপাল ঠুকে কোচবিহারের রাসমেলায় অংশ নিলাম। বিক্রি হল সাত হাজার। নয়ের দশকের প্রথম দিকে আলাপ রাজ্য শিল্প দপ্তরের বড় কর্তার সঙ্গে। তিনিই তাঁকে প্রথম রেজিস্ট্রেশন করান। আর আমাদের পেছন ফিরে তাকাতে হয় নি। শুধুই শিল্পীত ইতিহাস। জেলা পুস্কারের পর রাজ্য পুরস্কার, এক শিল্পীর জীবনে যা পাওয়ার কথা সবই তাঁরা পেয়েছেন।
যখন তাঁর অবসরের বয়স, নতুন যাত্রা শুরু হল বর্মণ দম্পতির। স্থানীয়দের বাঁশ আর পাটের কাজ শেখানো শুরু করলেন। আজ কোচবিহারের তোর্সাপারের লঙ্কাবর আর কালজানির আমবাড়ি গ্রামে অন্ততঃ পাঁচশো পরিবার বাঁশ আর পাটের কাজ করে পরিবারের ভরণপোষণ করেন। নয়ের দশকে গীতা পঞ্চায়েতে উপপ্রধানও হন।
লঙ্কাবরের মেয়েদের নিয়ে আজ বর্মণ দম্পতি, শিল্পীদের নিজস্ব সংগঠণ বঙ্গীয় পারম্পরিক কারু ও বস্ত্র শিল্পী সংঘের শেকড় কোচবিহারে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। আজ সংঘের সব থেকে বড় সংগঠণ তৈরি হয়েছে কোচবিহারে। আগামী সেপ্টেম্বরে(বাংলায় ভাদ্র মাসে) সংঘের উত্তরবঙ্গ সম্মেলন আয়োজন করবেন ঘুঘুমারি, কালজানি আর লঙ্কাবরের পাটি, বাঁশ আর পাট শিল্পীরা।
তিনবার খুবই বড় স্ট্রোক হয়ে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা গৌরঙ্গ বর্মণকে আগলে রাখেন গীতা। উদ্বিগ্ন স্ত্রীকে নিয়ে গৌরাঙ্গ চরম সক্রিয়তায় মিটিং করে চলেন- কখনও সম্মেলন সফল করতে, কখনওবা সংগঠণকে মজবুত করতে। নিজেদের শিল্প দক্ষতা সম্বল করে, শিল্পী খুঁজে, নীরবে তাঁদের সংগঠিত করতে বর্মণ দম্পতি আজও ব্যতিক্রমী শিল্পীত উদাহরণ।

Wednesday, August 15, 2012

একটাই আশা, আজও গ্রামীণেরা নিজের শেকড়ে দাঁড়িয়ে৩



কয়েকটি সোজা কথা
স্পষ্টভাবে চোখে আঙুল দিয়ে কয়েকটি কথা বলা দরকার। এই সমীক্ষাগুলো থেকে পরিস্কার যে, ভারত কৃষি প্রধাণ দেশ হলেও দেশের সমাজ কিন্তু শুধুই কৃষি নির্ভর ছিল না। কৃষিজীবির সংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার মাত্র ৩০ শতাংশের আশেপাশে। ব্রিটিশদের তৈরি করে দেওয়া ভারত সমাজ ধারণার এক্কেবারে ঠিক উল্টো পিঠ।
সনাতন ভারতীয় সমাজ প্রত্যেক স্রষ্টাকে, সে কৃষকই হোক অথবা কারিগর, দিত সামাজিক নিরাপত্তারভাব। বাঙলা তথা ভারতজুড়ে এই মাতৃস্নেহেভরা, মায়া-মমতাময় নিরাপত্তাভরা সমাজ ছিল বলেই শুধু কৃষিভিত্তি নয়, ৭০শতাংশ জনসমাজ অন্যান্য ধরণের কাজ করতেন, করতে পারতেন এবং সৃষ্টিশীলতায় বাঁচতেন। তবেই না এই দেশের কারিগরেরা দিল্লির লোহার মিনার বা মদনমোহন অথবা বাচ্চাওয়ালি কামানেরমত শয়ে শয়ে বছর খোলা আপাশের তলায় পড়ে থাকা মরচে ছাড়া লোহার পণ্যদ্রব্য বানিয়েছিলেন অথবা সহস্রাব্দর পর সহস্রাব্দ ধরে (পোড়া)মাটিরবাড়ি (মন্দির) আজও সারা বাঙলায় অজর অমর, অসমের রংঘর ৫০০ বছর ছাড়িয়েও সগৌরবে মাথাতুলে দাঁড়িয়ে(আর বর্তমান প্রযুক্তির সিমেন্টের বাড়ি সর্বাধিক ৪০ বছর পরেই ভেঙে পড়তে থাকে), ইওরোপে ড. জেনারের আবির্ভাবের আগেই বাঙলার ভিষগেরা বসন্তের টিকা দিতেন অবহেলে, হাড়জোড়া ভিষগ অথবা কাটা অঙ্গ জোড়ার শল্য চিকিত্সক প্রায় প্রত্যেক এলাকাতেই মিলত, নদিবিধৌত পলিসমৃদ্ধ বাঙলা নয় চেঙ্গলপট্টুতে আজ থেকে ২৫০ বছর আগে খণ্ডিত জমির বাত্সরিক উত্পাদকতাই ছিল একর প্রতি ৬-৭টন ধান, দামাস্কাস তরোয়ালের লোহার মূল পিণ্ডটি রপ্তানি হত ভারত থেকে, অসম্ভব মমতায়, অপরিমিত যত্নে আর পরিশ্রমে আর ভলবাসায় তৈরি হত ক্যালিকো আথবা মসলিনেরমত স্বর্গীয় কাপড় শুধু ঢাকার জঙ্গলবাড়ি নয়, সারা বাঙলার কুড়িটারমত স্থানে, লেখা হয়েছে মাহুতদের শিক্ষার জন্য হস্তিবিদ্যার্ণব পুঁথি(অসমের মাজুলির আউনিআটি সত্রে রয়েছে), অথবা কৃষিকর্ম শেখাতে লেখা হয় কৃষিপরাশর, বাঙলা তথা ভারতের ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন দেশে ব্যবসা করতে গিয়ে অন্য দেশ অথবা নতুন কোনও  মহাদেশ আবিষ্কারএর অস্বাভাবিক কৃতিত্ব দাবি করে বসেন নি, নতুন দেশ আবিষ্কার করে সেই দেশের মানুষমেরে ধনসম্পদ আর জ্ঞাণ চুরিতো দূরস্থান, ভারতীয়রা দেশের নানান স্থানে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে জ্ঞাণ আর প্রযুক্তি বিলিয়েছে সারা বিশ্বে, নিজের দেশের ক্ষতি করে বিদেশে সে সময়ের শ্রেষ্ঠতম জ্ঞাণতপস্বীকে পাঠিয়েছে জ্ঞাণবিতরণের জন্য, বাঙলা-বিহারের দেড় লাখ গ্রামে ১৮৩৮ সাল পর্যন্ত কর্মক্ষম ছিল এক লাখেরও বেশি বুনিয়াদি আর উচ্চ পাঠশালা, সমাজের রীতি নীতি মেনেই সেগুলো চলত জনগণের অর্থে, একই পাঠশালায় একইসঙ্গে পড়ত আর পাড়াতেন আজকের ইওরোপিয় সমাজতত্বের ভাষায়, নিম্নবর্ণতম থেকে উচ্চবর্ণের মানুষজন, ডোম আর ব্রাহ্মণ বটু ও শিক্ষক পড়ত আর পড়াতেন, জাতপাতের ব্যাপক ভেদাভেদের কল্পকাহিনী অনেক পরের শিক্ষিত মধ্যবিত্তের রচনা, এলাকাভিত্তিক পাঠসূচি ছিল সেসব পাঠশালাগুলোতে, পাঠদীন কী হবে তার জন্য ছিলনা কোনও কেন্দ্রিয় নির্দেশক, ইওরোপের অনেক আগেই সরস্বতী-হরপ্পা সভ্যতায় গড়ে উঠেছে ড্রাই ডক, শূণ্যের ব্যবহার ছিল ব্যপ্ততম, দশমিক বা বাইনারি পদ্ধতির প্রচলন অথবা পাইএরমান বা পৃথিবীর গোলার্ধের মান নির্ণয় হয়েছে ভারতেই, দক্ষিণ ভারতে কলণ বিদ্যার সূচনা হয় লিবনিত্জ বা নিউটনের বহু আগেই জয়স্থদেবেরমত মানুষের মণীষায়, এলাহাবাদেরমত গরমতম এলাকায় তৈরি হত বরফ, পটুয়াদের বা মস্করীদের চিত্রকর্ম সারা দক্ষিণ এশিয়ার নানান বৌদ্ধমঠের চিত্রকলায় ছড়িয়ে রয়েছে আজও, গুজরাটের যে বন্দরথেকে এত পরিমান বাঙলার সুপুরি রপ্তানি হত সেই বন্দরের নামই হয়ে যায় সোপারা, যে তাঁতে ইওরোপিয় তাঁতিরা মোটাচটও বুনতে পারতেন না, সেই তাঁতেই তৈরিহত ভালবাসাময় ক্যালিকো অথবা অদৃশ্যসম মসলিন, ভারতে সেদিনও প্লাসটিক সার্জারি চালু ছিল। এক নিশ্বাসে যে সব বলাগেল তার বাইরেও হাজারো নিত্যনতুন গবেষণা করতেন সাধারণ গ্রামীণেরা, নিজেদেরই জোরে।
পশ্চিমের ব্যবসায়ীরা সেদেশের তৈরি কোনও দ্রব্য এ দেশে সহজে বিক্রি করতে পারত না। এদেশের ইওরোপিয় দ্রব্য ব্যবহারেরমত স্থূলতাই তৈরিই হয়নি তখনও, শহর অথবা গ্রামীণ সমাজে, ফোরেন গুডস্ ছিল সর্বতোভাবে পরিত্যজ্য। আঠেরশ শতাব্দ পর্যন্ত ভারত থেকে শিল্প-স্বাস্থ্য-অন্যান্য প্রযুক্তি ভারত তথা বাঙলা থেকে রপ্তানি হত, আর অসম্ভব সামাজিক নিরাপত্তার পরিবেশে বানানো এই পণ্যদ্রব্যগুলি কিনতে বিদেশ থেকে সোনা-রূপা বয়ে আনত ইওরোপিয়রা, যার অপভ্রংশ রূপি বা রূপিয়া(রূপো) আমরা আমাদের মুদ্রা ব্যবস্থায় আজও বহন করে চলেছি। মন্দিরভিত্তিক মান্যম সংস্কৃতির বৃহত্তর সামাজিক ব্যবহার থেকেই প্রমাণিত হয়, লৌকিক অথবা সামাজিক ধর্মপালনব্যবস্থা আর রাষ্ট্রিয় ধর্মীয় বিষয়আশয়, দুটো কিন্তু সম্পূর্ণ আলাদা বিষম বস্তু। ইওরোপ থেকে আধুনিকতা অথবা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ধার করে এনে ভারত রাষ্ট্র নিজেদের পায়ে কুড়ুল মেরেছে কীনা আজ নতুন করে ভাবা দরকার।

নব এক সভ্যতার স্রষ্টা
গ্রামীণেরা এমন সভ্যতা তৈরি করেছে, যে সভ্যতা বৈরাগ্য প্রধাণ। মহিলারা শ্মশানে-মশানে ঘোরা, গায়ে ছাই মাখা, গাঁজা খাওয়া, মহিষের পিঠে চড়া, নটরাজ শিবেরমত বর চায়। সন্তান শুধুই দুধেভাতে থাকলেই সে সুখী(মনেরাখিনা সেই প্রবাদপ্রতীম স্তবকে কবি কিন্তু সন্তান কথাটি উল্লেখ করছেন, ছেলে বলছেন না – তবুও ভারতীয় সমাজ পশ্চাদমুখীনতার ছাপ্পা পেয়ে যায়)। মহিলারা সমাজ তৈরি করেন। তাদেরই চাহিদাই এইটুকুতেই সীমাবদ্ধ থাকে। তাদের হাতে তৈরি প্রজন্মও অমানবিক চাহিদার বাইরে বেরিয়ে এসে প্রকৃতির সঙ্গে নিজেদের গড়ে পিটে নিতে চান।
চাহিদাহীনতাই ভারতীয় সভ্যতার হাজার হাজার বছর ধরে বেঁচে থাকার হয়ত মূলমন্ত্র। শ্রীশঙ্করাচার্য, শ্রীমন্ত শঙ্করদেব, শ্রীচৈতন্যের বৈরাগ্যের পথ ধরেই তৈরি হয় ভারতীয় সভ্যতার ভিত্তিভূমি। আজকের সাম্রাজ্যপ্রতীম রামকৃষ্ণ মঠ তৈরির উদ্যমে বিবেকানন্দজীর বিরাগ ছিল স্পষ্ট। এই বিষয় নিয়ে খুব বেশি আলোচনার সুযোগ নেই তবুও বলাযাক সংঘের সংগঠণের পরিকাঠামো বাড়ানো নিয়ে তাঁর সঙ্গে অনুগামীদের সঙ্গে স্পষ্ট মতবিরোধ হয়েছে।
ইওরোপের বিশ্বধংসী দর্শন সনাতন ভারত সচেতনভাবেই বর্জন করেছে। হয়ত এই সোজা কথাটা ভারতের অসাধারণে সাধারণ মানুষ, আর সমাজ স্পষ্টভাবে জানতেন। যে সমাজ তারা গড়েছিলেন হাজার হাজার বছরের পরিশ্রমে, জ্ঞাণে, সেই ভারত সমাজ ধংস করতে ইওরোপিয় নীতি প্রয়োগ করতে দেখে, ব্রিটিশদের পথের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিয়েছিল পলাশি চক্রান্তের পর থেকে ১৭৬৩ থেকে ফকির-শৈব-শাক্ত-বৈষ্ণব সন্ন্যাসী স্বাধীণতা সংগ্রামীদের আহ্বানে। ব্রিটিশ-পূর্ব বাঙলা নিজের সমাজ, নিজের ব্যবসা, নিজের উত্পাজন, নিজের প্রযুক্তি –নিজের চলার পথ নিজেরমত করেই খুঁজে নিয়েছিল কয়েক হাজার বছরের সভ্যতার বিকাশের পথ বেয়ে নানান পরীক্ষা-নীরিক্ষায়। আদ্যোপান্ত ইওরোপকেন্দ্রিক বাম শহুরেরা সামাজিক নিয়ন্ত্রণকে বলেছেন কুসংস্কার। ব্যবসায়ী, শিল্পী আর শ্রমিকদের, এই সামাজিক বাধাবন্ধের, সামাজিক নিরাপত্তারমধ্যে কাজকরাকে বলেছেন সামন্ততান্ত্রিক মূঢ়তা, অজ্ঞতা।
ভারতের অন্ততঃ খেদের প্রয়োজন নেই। বাণিজ্যিকভাবে উত্পাদন করে, প্রকৃতির ওপর ভয়াবহ চাপ সৃষ্টি করে অপরিমেয় লাভের মুক্তমনা ধংসলীলার যজ্ঞভূমির বিকাশ ঘটিয়েছে ব্রিটিশ বণিকেরা। এর প্রভাব আজ টের পাচ্ছে স্বপ্নের মহাদেশ ইওরোপ আমেরিকা। আজ সামাজিক চাপে ইওরোপে বড় উতপাদনের কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার মুখে। ঠিক আড়াইশ বছর আগে কড়া সামাজিক রীতিনীতির বাধাবন্ধ মেনে ভারতীয় তথা বাঙলার সমাজ বড় বাণিজ্যিক উতপাদনের বিরুদ্ধে আড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু ব্রিটিশ বণিকেরা ইওরোপের সমাজ-রাষ্ট্রকে চাপ দিয়ে এই প্রকৃতি বিরোধী উত্পাদন প্রক্রিয়া আর অবাধ বাণিজ্য চালু করেছিল। এই দুএর যোগফল শিল্পবিপ্লব।
আরও একটা ছোট কথা বলা যাক। ইওরোপিয় ব্যবসায়ীদের বহু আগে থেকেই বাঙলার ব্যবসায়ীরা বিশ্বের নানান প্রান্তে ব্যবসা করতেন। সাধের গন্তব্য আবিষ্কার করতে গিয়ে তাঁরা অন্যকোনও মহাদেশ আবিষ্কার করে তার নাম ভারত রাখার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি। সেই সমুদ্র বিদ্যার জ্ঞাণ তাদের ছিল। ভারতীয় বণিকেরা মহাদেশ আবিষ্কার করে লুঠপাট করে, খুন করে, রিক্ত করে আসে নি। অথবা সেই দেশের মানুষকে দাস বানানোরমত কাজ করেনি। তাই হয়ত তাদের কখোনোই মনে হয়নি, বিশ্বজয়ী পণ্যগুলির বাজার আরও আরও বাড়ানো, মনে হয়নি বিশ্বে নতুন নতুন চাহিদা তৈরি করা প্রয়োজন। অথচ (অ)প্রয়োজনে ইওরোপ একাই এশিয়া, আমেরিকা আর আফ্রিকাকে উপনিবেশ বানিয়ে রেখেছিল শতাব্দর পর শতাব্দ।
ভারতীয় সমাজ বণিকদের বিশ্ব বাণিজ্যে সেই অসম্ভব লাভ করার ছাড়পত্রও কোনও দিন দেয় নি। বণিকদের কাজ বণিকবৃত্তি করা, এই দায়টি সমাজ তাদের নির্দিষ্ট করে দিয়েছিল। সেই কর্মের বাইরে পা রেখে, তুলাযন্ত্র সরিয়ে রেখে, তরোয়াল নিয়ে দেশ-মহাদেশ শাসন করার, লুঠ করার অথবা খুনের অধিকার তাদের সমাজ দেয় নি। এ কথা স্পষ্টভাবে আজ বলে দেওয়া যাক। উত্পাদকের কাজ ছিল কর্মশালায় নির্দিষ্ট কাজ করা। তারা সেই কাজকে বিকাশ করার দিকে বেশি নজর দিয়েছে। সমাজ তাকে প্রার্থিত সামাজিক নিরাপত্তা দিয়েছে, রক্ষা করেছে সমস্ত দুর্বিপাকের হাত থেকে।

পারম্পরিক বাঙলা
ভারতের উত্তর আর দক্ষিণ এই দুই প্রান্তের সামাজিক গড়নের বৈশিষ্ট্যের কথা কয়েক স্তবক আগেও আলোচনা করা গেছে। বাঙলাতেও কিন্তু দেখা যাবে একই দর্শণের প্রতিধ্বনি। সারা ভারতের সমাজ গঠণের মধ্যে একই দার্শণিক সাজুজ্য বজায় ছিল। প্রত্যেক সামাজের রীতিনীতিতে বেশ কিছু পার্থক্য থাকলেও, ভারতের সনাতন, সমবায়ী সমাজগুলোর গঠণ-প্রশাসন-অর্থনীতির দর্শনের মধ্যে কিন্তু মূলগত পার্থক্য ছিল না প্রায়।
কৃষক কারিগরদের নিয়ে পত্তন হত একটি গ্রাম সমষ্টি, সেখানেই চাষের জমি, চারণভূমি, নানান শিল্পের কারখানা। ইওরোপের অনুকরণে এগুলোকে হস্তশিল্প বলার প্রচলণ হয়েছে- ভালই। ব্রিটিশ শিল্পবিপ্লব প্রণোদিত, নানান অপচয়মুখী মস্তবড় দৈত্যসম এককেন্দ্রিক উত্পাদন ব্যবস্থা অখবা প্রশাসনিক দর্শনের দিক থেকে ভারতের গ্রামীণেরা বরাবরই মুখ ঘুরিয়ে থেকেছিলেন। তাঁরা আজ আর পারছেন না। শিল্প বিপ্লবের ধ্বজা অনুসরণকরে ইওরোপিয় অর্থনীতির বিকাশের ধারা ভারতে ইংরেজ শাসনের পথ ধরে প্রোথিত করা হয়েছে। সেই অর্থনীতির উপজাত গ্রামীণদের গফুর মিঞার পথ ধরতে হয়। আকালের চরমতম গ্রাসে পড়ে গফুর মিঞা কিন্তু মহেশকে কেটে খেয়ে উদরপূর্তি করেন না। গরু তাঁর পরিবারের একজন, শুধুমাত্র রোজগারের জন্য পোষা প্রাকৃতিক সম্পদটুকু নয়, যাকে ব্যবহার করা যায় যেকোনও সময়েই। অসময়ে সে তার পরিবারপের একজনকে ব্যবহার করে নিজেকে বাঁচাতে চাননি। যে লেখক বাঙালি আর মুসলমানদের মধ্যে ফুটবল ম্যাচ আয়োজনের কথা বলেন, তিনিও কিন্তু গফুরকে দিয়ে মহেশকে নির্বিচারে হত্যা করে খাওয়ার দৃশ্য লিখে উঠতে পারেন নি। ইওরোপিয় মানদন্ডে গফুর তুচ্ছ, এক দরিদ্র প্রান্তিক ধর্মীয় সংখ্যালঘু জন। অথচ ভারতীয় সনাতন সভ্যতার ন্যুনতম এক সদস্য, গফুর মিঞা মানবিকতার প্রশ্নে এক সমুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বলাযাবে না, এটিই এই সভ্যতার সাধারণতম ঘটনা, ভারতীয় গ্রামীণ সভ্যতার এটিই দর্শণ।
সাধারণ এ দর্শণে আপাদমস্তক জারিত ছিল বলেই, ভারত সভ্যতা নিজের পায়ে হাজার হাজার বছর ধরে বেঁচে এসেছে, অন্য সভ্যতাকে বাঁচিয়ে এসেছে। পুরুষানুক্রমে গফুরেরমত কৃষকেরা জমির ফসল ফলান, শিল্পী কর্মশালা চালান, ব্যবসা করেন, ব্যবসায়ীরা উভয়েই রাজস্ব দেন- এতেই শেষ হয়ে যায় রাজশক্তির সঙ্গে গ্রামীণের সম্পর্ক। তাঁরা পঞ্চায়েতি ব্যবস্থাকে ভিত্তি করে নিজেদেরমতই সমাজের সমৃদ্ধি বজায় রাখেন। কারিগরেরা-প্রযুক্তিবিদেরা গ্রামের প্রয়োজন মেটান, গ্রামের হাটেই তাদের বিক্রিবাটা হয়। তবু আজও তাঁরা সারা ভারতের প্রাণের সঙ্গে প্রাণ মেশাতে ছুটে যান মেলায় মেলায়, তীর্থে তীর্থে, জনপদে জনপদে। স্বাধীণতার পরেও ইওরোপিয় লুঠেরারাজের তৈরি করা অর্থনীতিতে যথাসম্ভব আলাদা থেকে গ্রামীণেরা আজও ভারত সভ্যতাকে বয়ে নিয়ে চলেন অতি মমতায় আর সারল্যে।
এই ভাঙা সময়ে একটাই আশাই জেগে থাকে, আজও গ্রামীণেরা নিজের শেকড়ে, ঐতিহ্যে, পরম্পরায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন।

একটাই আশা, আজও গ্রামীণেরা নিজের শেকড়ে দাঁড়িয়ে২


বিধিনিষেধ মানেই কুসংস্কার নয়
প্রকৃতির নানান আদরের বস্তুকে সঙ্গে নিয়ে প্রায় ঘরের মানুষেরমত বেড়ে উঠত ভারতীয় সমাজের প্রত্যেকটি স্তর আর মানুষ। জল, জঙ্গল, খণিজ দ্রব্যেরমত প্রকৃতির দেওয়া নানান অমূল্য অভাবনীয়কে নির্বিচারে প্রাকৃতিক সম্পদ ছাপ্পা দিয়ে, নাগরিক সমাজে কৃত্রিমতম চাহিদা তৈরি করে, প্রকৃতিকে ধংস করার শিল্পবিপ্লবজাত ইওরোপমুখী আধুনিক অপচয়ী সমাজ-দর্শণের বিরোধী ছিল ভারতের সমবায়ী গ্রামীণ সভ্যতা।
হাজার হাজার বছরের বিশ্বের নানান প্রান্তের লুঠেরাদের নানান ধরণের অত্যাচার সহ্যকরে, নিজেকে ধংস করার প্রলোভন সামলে, দৈনন্দিনের জীবনকে সাদাসিধে রেখে, প্রকৃতিকে যথাসম্ভব কম ব্যবহার করার কয়েকটি সহজ সাধারণ নীতি তৈরি করতে পেরেছিল এই সমাজ। ইওরোপিয় লুঠবাদী লেজা ফেয়ার নীতির বদলে সমাজে ছিল সাধারণ কিছু বিধি নিষেধ, যার প্রায়োগিক নীতিতে কিছু লৌকিক আর ধর্মীয় প্রথার বিকাশ ঘটেছে। এই প্রথায় জনগণকে কয়েকটি সামাজিক নীতি পালন করতে হয়, আর নিয়মিত সময় ধরে বেশ অনেকটা পারিবারিক আচার আচরণ অবশ্য মান্যকরাও প্রয়োজন হয়ে পড়ে।
প্রত্যেকটি ভারতীয় গ্রামসমাজ নিজেদের তৈরি আলাদা আলাদা শাসন-প্রশাসন নীতি মেনে চললেও, আদতে একটি সাধারণ বিকেন্দ্রিকতার দর্শণ বাস্তবে পালন করতে সমস্ত বিবাদ ভুলে গ্রামগোষ্ঠী ছিল এক্কাট্টা। গ্রাম সমাজ স্পষ্ট মনে করত, সমাজের নানান ধরণের কাজকর্মে, রাষ্ট্রের প্রশাসনিক শক্তির হস্তক্ষেপ অবাঞ্ছনীয় এবং বিষবত্ পরিত্যজ্য। প্রাথমিকভাবে ভারতীয় সমাজ রাষ্ট্র বিরোধী না হলেও রাষ্ট্র উদাসীন। ভারত জোড়া সমবায়ী সমাজে সমাজে নিত্য নিয়মিত আদান প্রদান বিদ্যমান ছিল সেদিনও।
খাজনা দেওয়া ছাড়া, রাষ্ট্রের এককেন্দ্রিক নানান আইন, নীতি আর কাজকর্মের সঙ্গে, অর্থনীতির ওঠাপড়ার সঙ্গে, রাষ্ট্রব্যবস্থার ভাঙাগড়ার সঙ্গে, নাগরিক সভ্যতার সৃষ্টি-ধংসের সঙ্গে, ভারতবর্ষের উত্তরপ্রান্ত থেকে দক্ষিণপ্রান্ত, পূর্বতমজনপদ থেকে পশ্চিমতমজনপদের গ্রামগুলির রোজকার জীবনের খুব বড় সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি।
ব্রিটিশদের হাতে হঠাত প্রখ্যাত মনুস্মৃতি একমাত্র কয়েকটি সমাজেই কার্যকর ছিল।

তিনটি গ্রাম সমীক্ষা
বিশাল বিশাল মন্বন্তর ঘটিয়ে, জ্ঞাণ চুরি আর অপরিমিত সম্পদ লুঠকরে ছিবড়ে করে দেওয়ার পরও ১৯০০ সনের আদমসুমারিতে ব্রিটিশ শাসন বস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আমলা রোজ সাহেব(বাঙলার নবজাগৃতি, বিনয় ঘোষ) বিষ্মিতভাবে বলছেন, পাঞ্জাব প্রদেশের গ্রামগুলির অসম্ভব আত্মনির্ভরতার কথা। প্রত্যেক গ্রাম সমবায়ে জনগণের প্রয়োজনীয় জিনিষপত্র তৈরি হত, নানান শ্রেণীর বৃত্তিজীবি কারিগরদের কারিগরিতে। তিনি বিভিন্ন বর্ণের করিগরদের ব্যক্তিগত উদ্যমের স্বাতন্ত্র্য দেখেননি। অথচ ভারতের গ্রামসমাজের স্বয়ংসম্পূর্ণতার ছবি স্পষ্ট দেখছেন।
এই আদমসুমারিটির প্রায় ৫৫টি বছর(১৮৪৫) আগে আর এক কোম্পানিকর্তা গুডউইনও বলছেন দক্ষিণ ভারতের এক স্বতন্ত্র গ্রাম সমাজের কথা। বলছেন গ্রামের মধ্যে নানান ধরণের জীবিকার পারস্পরিক নির্ভরতার কথা। দিচ্ছেন নানান শিল্পী, প্রশাসক আখবা প্রযুক্তিবিদের বর্ণনা। গুডউইন বলছেন, গ্রামে পাতিল আর কুলাকার্ণিদের রাজস্ব আদায় আর নির্ধারণে দায়িত্ব ছিলেন। গ্রামের মধ্যে তাদের প্রভাব সর্বাধিক (পশ্চিমি দৃষ্টিতেতো বটেই)। ছুতোরেরা গ্রামের নানান কাজের কাঠের হাতিয়ার গড়তেন, গাড়ি তৈরি করতেন, মেরামত করতেন, তাই সমাজে তাদের সম্মান ছিল অনেক ওপরে। এঁরা ছিলেন কারিগরদের প্রধান। এরপর লোহারদের স্থান। লোহার যন্ত্রপাতি তৈরি আর তা মেরামতও করতেন। অন্যান্য কারিগরেরা নানান ধরণের কাজ করতেন। মজুরি ছাড়াও তারা সমাজে অন্যান্য সুযোগ সুবিধে পেতেন। তারা জমি পেতেন চাষ করার জন্য। নিজেরা না করতে পারলে(সাধারণতঃ করতেন না), চাষ করতেন চাযীরা। চাষের পর নিজেদের অংশ তুলে রেখে জমির উত্পাদনের পাওনা তারা বেঁটে দিতেন কারিগরদের মধ্যে। আর একমাত্র জমিরস্বত্ব রাখতে পারতেন না সেচের কাজে সাহায্য করা প্রযুক্তিবিদেরা। সারাবছর তাদের দেখভাল করত সমাজ কেননা তারা না হলে যে চাষকর্মটাই আটকে যেতে পারে(এই দুটি উদাহরণের সূত্র বিনয ঘোষ- বাঙলার নবজাগরণ)।
ছএর দশকে তাঞ্জাভুর তামিল বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর পলিসি স্টাডিজএর তৈরি করেন ধরমপালজী। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু আশ্চর্যজনক তথ্যসম্বলিত পুঁথি খুঁজে পান। ভারত গবেষণায় যে পুঁথিগুলিক দান অভূতপূর্ব। এগুলি আজ চেঙ্গলপেট্টু পুঁথি নামে খ্যাত। স্টাডিজএর পরের দিকের অধিকর্তা ড. জে কে বাজাজের মুখেই চেঙ্গলপেট্টু পুঁথির কথা শুনি, “Startling features of Tamil society in the 18th century emerge from these palmleaf accounts. Between 1762 and 1766 there were villages which produced up to 12 tons of paddy a hectare. This level of productivity can be obtained only in the best of the Green Revolution areas of the country, with the most advanced, expensive and often environmentally ruinous technologies. The annual availability of all food averaged five tons per household; the national average in India today is three-quarters ton. Whatever the ways of pre-British Indian society, they were definitely neither ineffective nor inefficient.”
ধরমপালজী চেঙ্গলপট্টু(আজকের চেন্নাই) এলাকা সমীক্ষার কথা গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছেন। এটি মন্দিরভিত্তিক সমবায়ী সংস্কৃতির এক ভারতীয় রূপ। এলাকার মন্দিরগুলি যে জমি ভোগ করত, তার নাম মান্যম। সেই জমির উদ্বৃত্ত দিয়ে নিজের ব্যয় ছাড়াও নানান ধরণের প্রযুক্তিবিদ-বিদ্যাজীবির জীবিকা এমনকী অন্য ধর্মের পরিকাঠামোর ব্যয় নির্বাহ করতে হত মন্দিরের রোজগার থেকে। অথচ এই প্রযুক্তিবিদেরা কেউ কিন্তু মন্দিরের কর্মচারী ছিলেন না, অথচ নির্দিষ্ট সামাজিক কাজে সারা জীবনের জন্য দায়বদ্ধ থাকতেন। মন্দিরের এই কাজের কোনও আইনি বাঁধাবাঁধি ছিলনা।  কিন্তু প্রত্যেকেই নিজের নিজের দক্ষতা অনুযায়ী ঠিক করে নিয়েছিলেন নিজেদের কাজ সমাজ, মানুষ আর প্রকৃতির প্রতি অসম্ভব মমত্ববোধে। আজ কেন দুর্দশা, কেন আমরা সেই সমাজের ধারে পাশে পৌঁছতে পারছিনা, সেই সহজ প্রশ্নের উত্তরে ধরমপালজী বলছেন, “Since we have lost practically all contact with our tradition, and all comprehension of our chitta and kala, there are no standards and norms on the basis of which to answer questions that arise in ordinary social living. Ordinary Indians perhaps still retain an innate understanding of right action and right thought, but our elite society seems to have lost all touch with any stable norms of behavior and thinking. The present attempt at imitating the world and following every passing fad can hardly lead us anywhere. We shall have no options until we evolve a conceptual framework of our own, based on chitta and kala, to discriminate between right and wrong, what is useful for us and what is futile.” (http://www.cpsindia.org/annam_hindu.html)
ধরমপালজীর কথা আজ প্রায় দৈববাণীরমত মনে হয়।

একটাই আশা, আজও গ্রামীণেরা নিজের শেকড়ে দাঁড়িয়ে


অসাধারণে সাধারণ গ্রামব্যবস্থা
ভারতের গ্রাম সংগঠণের মূল বৈশিষ্ট্য ভূমির স্বত্বহীনতা। জয়া মিত্রের লেখায় পাই, সেদিনও রাজস্থানে আদমসুমারিতে যাওয়া কর্মীরা জমির মালিকের নাম প্রশ্নকরলে গ্রামীণের উত্তর দিয়েছিলেন, সমুদায়, অর্থাত সবার। ইওরোপে রাজা সমান রাষ্ট্র সর্বশক্তিমান।
ভারতবর্ষে রাজা নিজে ভূমিসত্ব ভোগ করতেন না। রাজা ছিলেন রাষ্ট্র পালনের পরিচালনের অছিমাত্র। রাজা শুধু জমিদারদের রাজস্ব সংগ্রহের অধিকার দিতেন। নাম জমিদার। জমির মালিক তিনি নন। রাজার কাজ ছিল, রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থাকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালন করা। যেন অছি।
জৈমিনি পূর্ব মিমাংসায় বলছেন, রাজা ভূমি হস্তান্তর করতে পারেন না। রাজা ভূমির মালিক নয়। যারা খেটে জমি চাষ করে, তারাই জমি চাষের মালিক। সায়নাচার্যও বলছেন, রাজার কর্তব্য অপরাধীকে দণ্ডদান। নিরাপরাধকে আশ্রয়প্রদান। মালিক রাজা নন। জৈমিনিরমতই তিনিও চাষীদেরই জমির অছি হিসেবে বলছেন। রাজা পাল্টেছে। রাজ্য পাল্টেছে। কিন্তু সমাজিক এই ব্যবস্থায় জমির মালিকানা নিয়ে বিতর্ক বাধেনি।
৭ নভেম্বর, ১৮৩০এ চার্লস মেটকাফ মিনিট অন দ্য সেটলমেন্ট ইন ওয়েস্টার্ন প্রভিন্স-এ বলছেন, Hindoo, Patan, Mogul, Mahratta, Sikh, English, are all masters in turn; but the village community remains same…. The sons will take place of their fathers’ the same sight for the village, the same position for the houses, the same land will be reoccupied by the decedents of those who were driven out when the village was depopulated… The union of the village comities, each one forming a separate little state in itself, has ….contributed more than any other cause to the preservation of the people of India through all the revolutions and changes which they have suffered, and is in a high degree conducive to the happiness, and to the enjoyment of a great portion of freedom & independence. 
এ তথ্য অনেকেই হয়ত জানেন। অনেকে মানেনই না। সাধারণতঃ সনাতন বৃহত্তর ভারতের নানান সমাজের প্রশাসনে দেশের কেন্দ্রিয় অথবা প্রাদেশিক সরকারের বড় ভূমিকা থাকত না। প্রত্যেকটি গ্রামগোষ্ঠী উত্পাদনের সঙ্গে প্রশাসনকর্মেও ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ। গ্রামগোষ্ঠীগুলি হাজার হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠা প্রাকৃতিক নিয়ম যথাসাধ্য মান্য করত। যত কম সম্ভব দ্রব্য ব্যবহার করত। সেগুলো বারংবার ব্যবহার করে নিজেদের সাধারণতম জীবন জীবিকা অসাধারণ সাধারণত্বে নির্বাহ করত।

সমবায়ীভাবে বাঁচার নাম হল দারিদ্র্য
এই জীবনধারণের দর্শণ নাগরিক, ইওরোপিয় লুঠেরা অপচয়ী দর্শণের বোধগম্যতার বাইরে। জীবনধারণের প্রক্রিয়াকে হয় পশ্চিম বুঝতেই পারেনি, না হয়, সঠিক ভাবে বিশ্লষণ করতে পেরে বুঝেছিল, গ্রামীণ ভারতের সহজিয়া দার্শনিক নীতিতে, ইওরোপিয় লুঠেরা আর প্রকৃতি ধংসকারী, বিশ্বব্যাপী লোভাতুর রাজত্ব গড়ে উঠতে পারেনা। বিশ্বপ্রকৃতিকে যথাসাধ্য অবিকৃতরূপে সুরক্ষিত রেখে, অতিরিক্ত চাহিদাবিহীন ভারতীয় যৌথ সমবায়ী সমাজের বেঁচে থাকার দর্শণটির নাম পশ্চিম দিল, দারিদ্র্য।
এর বিপরীতে আমেরিকা-ইওরোপের মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্তদের প্রকৃতি ধংসাশ্রয়ী জীবনধারণের পদ্ধতিক নাম কোয়ালিটি অব লাইফ। সারা বিশ্বকে এই প্রকৃতি ধংসকারী জীবনধারণ নকল করতে অর্বুদ ডলার-পাউন্ড-ইয়েন দান আর জড়ানো-প্যাঁচানো ঋণ দিয়ে চলেছে অবলীলায়। বিশ্বের নানান প্রান্তজুড়ে শপাঁচেক বছর আগেথেকে অমিত পরিমান অর্থ-সম্পদ-জ্ঞাণ লুঠ করে চলছিল ইওরোপিয়রা। সেই লুঠের সম্পদের আসলের সুদেই রমরমিয়ে আজও চলছে তথাকথিত তৃতীয় বিশ্ব উন্নয়ন ব্যবসা চক্র।
বিশ্বে দারিদ্র্যতত্ব সব থেকে বড় রপ্তানির বস্তু। ডান বাম, সব ইওরোপিয়রই মূলগত জীবনবেদ, চাহিদার সংস্কৃতি। যেসব মানুষের আমেরিকীয়-ইওরোপিয় তত্ব অথবা দ্রব্য অথবা সেবা, কোনও কিছুরই চাহিদা নেই, হয় সে গরীব, নয় সে মুর্খ, না হয় লৌকিক কিংবা আদিবাসী, না হয় অজ্ঞ কুসংকরাচ্ছন্ন, নিদেনপক্ষে তৃতীয় বিশ্বের অধিবাসী আর সামন্ততন্ত্রে গলা পর্যন্ত ডুবে থাকা গেঁয়ো। ক্ষমাঘেন্নার পাত্তর।
হাজার হাজার বছরের ভারতীয় সমবায়ী সমাজগুলির নীতি ছিল, অপচয়মুখী উত্পাদন, বন্টন, জীবনধারণ দর্শণের বাইরে যথাসাধ্যভাবে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চলার পথ তৈরি করা। নানান টানাপোড়েনে তৈরি সমবায়ী সংস্কৃতির পথ বেয়ে সমাজের স্বচ্ছলেরাই বাঁচত না। সমাজের প্রত্যেকেরই অংশগ্রহণ ছিল সেই জীবনযাত্রায়। প্রত্যকেরই কিছু না কিছু দেওয়ার ছিল সেই সমাজকে গড়ে তুলতে, তার সম্পদ তৈরি করতে, জ্ঞাণভান্ডার অর্জন আর তৈরি করতে।