Sunday, June 30, 2013

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের আফিম ব্যবসা, Opium Trade of Colonial British Government

১৭৫৭র পর বাঙলা লুঠের পরবর্তী কালে ইংরেজদের লোভী দৃষ্টি পড়ল আফিম ব্যবসায়। পলাশির পর ইংরেজ ব্যবসায়ীরা বাঙলার সমাজের নানান বিধিনিষেধ ফুতকারে উড়িয়ে দিয়ে সরকারিভাবে নিয়ন্ত্রণ কায়েম করল বাঙলার নানান ব্যবসার সঙ্গে আফিম ব্যবসাতেও। ইংরেজদের হাতে পড়ে বাঙলা-বিহারের চিরাচরিত আফিম চাষী শোষণ-শাসনের শিকার হয়ে উঠল। ব্যবসা এতই লাভজনক ছিল যে বাঙলা ধংসের অন্যতম নায়ক ওয়ারেন হেস্টিংস তার বন্ধুদেরই বাঙলা-বিহারের আফিম একচেটিয়া ব্যবসার অধিকার দিয়ে সম্মানিত করতেন। সরকারের নানান অঙ্গের সাহায্যে শোষণের বেড়াজালে ব্যবসায়ীদের লাভের অঙ্ক আকাশ ছুঁত। দেশিয় দালাল মার্ফত চাষীদের কাছথেকে আফিম প্রায় বিনামূল্যে সংগ্রহ করে তা সরাকারের কাছে বিক্রি করত।
ইংরেজ ব্যবসায়ীদের দেশিয় দালালেরা চাষীদের কাছথেকে বলপ্রয়োগে নামমাত্র মূল্যে আফিম কিনে সেই আফিম উচ্চমূল্যে সরকারের কাছে বিক্রি করছে দেখে চাষীরা আফিম চাষ করতে অস্বীকার করলে তাদের ওপর নিপীড়ন নামিয়ে আনা হত। দালাল, গুন্ডা আর পুলিশদের সহায়তায় ইংরেদরা চাষীদের অন্যচাষের বদলে জোর করে আফিম চাষ করতে বাধ্য করত। আফিম চাষের জন্য দালালেরা চাষীর খেতের ফসল পুড়িয়ে দিয়েছিল, এমনও উদাহরণ বিরল নয়। আর অনিচ্ছুক চাষীদের আটক আর প্রহার ছিল সাধারণ ঘটনা। জোর করে চাষ করিয়েও রেহাই নেই আফিম ওজন করার সময় ওজন চুরি করেও চাষীকে কম দেওয়া হত। 
চাষীরা একসময় একযোগে প্রায় সংগ্রাম করায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুধেলা গরু আফিম ব্যবসা মার খেতে শুরু করে। এই আফিমের একটি বড় অংশ বিক্রি হত বেআইনিভাবে চিন দেশে। সপ্তদশ শতকের মাঝখান থেকে বানিয়া ইংরেজরা বুঝতেপারে, বাঙলাকে লুঠ করে ছিবড়ে করে দেওয়ার পর চিনে আফিম ব্যবসা তাদের বড় লাভের রোজগার হতে পারে। ক্রমশঃ তারা চিনে আফিম ব্যবসা বাড়াবার দিকে নজর দিল। ইতোমধ্যে চিনের অবৈধ কারবারিরা দেশের মানুষকে আফিমের মৌতাতে মাতিয়ে রেখে অযুত মুনাফা লাভ করার দিকে শনৈঃ শনৈঃ এগোতে থাকে। চিন সমাজের প্রায় প্রত্যেকটিস্তরে আফিমের নেশা দাবানলেরমত বাড়তে বাড়তে অষ্টাদশ শতকের প্রথমপাদে, এই নেশা দেশের মানুষকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে। প্রত্যক ছজনের মধ্য একজন ছিলেন আফিম সেবী। কুইং সাম্রাজ্য আফিমের বিক্রি এবং দেশের মানুষের আফিম সেবন বন্ধ করে দেওয়ার ফরমান জারি করে।
ইতোমধ্যে বাঙলার তন্তুজাত দ্রব্য ইংলন্ডে রপ্তানিও ক্রমশঃ কমতে শুরু করেছে, কোম্পানির একচেটিয়া ব্যবসার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। ব্রিটেন শুধু বস্ত্রজাত বস্তু নয়, রামমোহনের সনির্বন্ধ অনুরোধে ইংলন্ড বাঙলায় নুন পর্যন্ত রপ্তানি করতে শুরু করে দিয়েছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য। সব থেকে বড় কথা নানান দ্রব্য কিনতে ইংলন্ডকে ইওরোপ থেকে বাঙলায় সোনা-রূপা আনতে হত। পলাশির চক্রান্তে, বাঙলার শাসন ক্ষমতায় আসার পর, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্যতম শক্তি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাঙলাকে এত পরিমান লুঠ করে উদ্বৃত্ত তৈরি করে যে, পলাশির বছর থেকে আর তাকে বাঙলার দ্রব্য কিনতে আর ইওরোপ থেকে দামি ধাতু আর আনতে হয় নি।
এখন লুঠ কর্ম শেষে, ভারতের শিল্প আর শিল্প পরিকাঠামো ধংস করে কোম্পানি নতুন লুঠের বাজারের দিকে নজর ফেরায়। শিল্পবিপ্লবের প্রাক্কালে, আরও আরও কাঁচামালের জন্য, ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রধাণ রোজগেরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চিনের দিকে নজর ফেরাতে থাকে। ততদিনে ইংলন্ডে চা, পোর্সেলিন আর চিনা রেশমদ্রব্যের বাজার জাঁকিয়ে বসতে শুরু করেছে। ইংলন্ডকে চিন থেকে এই বস্তুগুলি কিনতে প্রচুর সেনাদানা নিয়ে যেতে হচ্ছে। চিনের সঙ্গে ইংলন্ডের বাণিজ্য ঘাটতি চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে যায়। এরপর শুরু হয় ইংরেজদের চিন লুঠের নতুন পরিকল্পনা। যে সোনাদানা নিয়ে ইংরেজ কোম্পানি চিনের চা, পোর্সেলিন আর রেশম কিনত সেই সোনাদানা যাতে আর আগামী দিনে চিনে আনতে না হয়, তার সুচারু পরিকল্পনা তৈরি হয়ে যায় ব্রিটিশ সরকারের মদতে কোম্পানির সম্মেলন ঘরে, সাথী হলেন বাঙালি আর পার্সি উদ্যোগীরা।
জ্ঞাণবিজ্ঞাণের সঙ্গে সঙ্গে পণ্য-পরিবহনে জাহাজ, মশলা, নীল, রেশম, লৌহপিন্ড, নুন, সোরা, তাঁত-রেশম বস্ত্র, হাতি, কাঠ, গালা অথবা পান-সুপুরিরমত বাঙলা-বিহারের আফিমও ছিল বিশ্বের সেরাতম রপ্তানি দ্রব্য। বিশ্ববাজারে তার দাম অত্যন্ত চড়া। সমগ্র উনবিংশ শতক ধরে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য চিনে বাঙলা-বিহারে উত্পন্ন দামি অবৈধ আফিম সরবরাহ করত – অবৈধ কেননা চিন সম্রাট এই ব্যবসা স্বীকার করতেন না, ব্রিটিশেরা বলপ্রয়োগে এই বাণিজ্য সাধণ করত। এই অবৈধ বাণিজ্যই ছিল তত্কালীন ব্রিটিশ শাসিত ভারত সরকারের সবথেকে দামি বৈদেশিক বাণিজ্য। ১৭৯৭তে ভারতের জনগণমনঅধিনায়ক হয়ে এলেন কর্নওয়ালিস। হেস্টিংসএর সময় থেকে চলে আসা বেসরকারি উদ্যোগে আফিম চাষ আর আফিম তৈরির নীতি থেকে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গিয়ে ঠিক হল, ভারতে আগামীদিন থেকে আফিম তৈরি করবে ভারত সরকার অর্থাত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি স্বয়ং। অর্থাত ব্রিটিশ ভারতে নুনের সঙ্গে রাষ্ট্রীয়করণ করে নেওয়া হল আফিম উত্পাদন এবং ব্যবসা। ভারতের বাঙলা, বিহার এবং পূর্ব-উত্তরপ্রদেশের নির্দিষ্ট কয়েকজন চাষীর সঙ্গে সরকারি লেখাপড়ায় বন্দোবস্ত করে বছরে নির্দিষ্ট পরিমান আফিম তৈরি হতে শুরু করল। গাঙ্গেয় সমভূমিতে চুক্তিবদ্ধ আফিম চাষীর থেকে সরকার নির্দিষ্ট দামে চাষ করা আফিম কেনার চুক্তি হল। চিনের সঙ্গে অবৈধ এই ব্যবসায়ে ঘোরতর লিপ্ত কেম্পানি ফতেয়া দিল সরকারি ফরমানের বাইরে যে চাষী আফিম চাষ করবে তার চাষ অবৈধ ধরে নেওয়া হবে এবং সেই চাষীকে সরকার সাজা দেবে।
চাষের সময় দাদন দেওয়া চাষীর কাছ থেকে শুকনো আফিম রস কোম্পানি কিনে নিয়ে, সরকার নিয়ন্ত্রিত কারখানায় এক কেজির এক একটি গোলা তৈরি করা হত। চল্লিশটা গোলা নিয়ে তৈরি হত একটি চেস্ট। প্রত্যেকটি চেস্ট এবার চলে যেত কলকাতায় আফিম বাজারে নিলামের জন্য। পূর্ব ভারতে আফিম তৈরির পরিকাঠামো ছাড়াও সরাসরি ব্রিটিশ শাসিত ভারতের বাইরে ব্রিটিশ অভয়হস্তের নিচে থাকা রাজন্য শাসিত উত্তর-পশ্চিম রাজ্যগুলো থেকে আফিম তৈরির পরিকাঠামো তৈরি হল, যাকে তত্কালীন কোম্পানি কাগজপত্রে মালওয়া অথবা মালব আফিম বলা হচ্ছে। বাজারের আফিমের সরবরাহ আর চাহিদার তুল্যমূল্য অঙ্ক কষে ব্যক্তিগত উদ্যমীরা চাষীদের দাদন দিয়ে চাষ করাতেন। এদের দুটিস্থানে বড় ধরণের কর দিতে হত, প্রথমটি যে রাজ্যে তৈরি হচ্ছে, আর দ্বিতীয়টি রাজ্যটি ছেড়ে বেরোবার পর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে প্রবেশ পথে আরও একবার। এই পাশ ফি ছিল ব্যবসায়ীটির বম্বের বন্দর থেকে আফিমটি চিনের উদ্দেশ্যে রওনা করানোর ছাড়পত্র। সেই আফিম চিনে বিক্রি করে চিন বাণিজ্যের উদ্বৃত্ত তৈরি করতে হবে। এই পরিকল্পনা অনুসারে ভারতের আফিম চাষীদের সঙ্গে সমঝোতা করে যথেষ্ট বেশি আফিম তৈরির পরিকল্পনা হল। ভারতীয় দালালদেরমত চিনেও এই আফিম ব্যবসার ইংরেজদের সহযোগী ছিল হং ব্যবসায়ীরা।
ভারতে আফিম স্বাধীণতা সংগ্রামের পরে সরাসরি সরকারি পরিকাঠামো সম্বল করে, জনগণের দেয় খাজনার অর্থে যে কোম্পানি সরকারের আফিম উত্পাদন পরিকাঠামো গড়ে উঠল বাঙলা-বিহার-উত্তরপ্রদেশ জুড়ে, সেই কাঠামোকে ভিত্তি করেই প্রাথমিকভাবে কিন্তু গড়ে উঠেছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের চিনে অবৈধ আফিম সরবরাহ করার অতি লাভের পারানি। বিহারের পাটনা অঞ্চলে সরকারি নজরদারিতে ব্রিটিশদের চিনের ব্যবসা বছরের পর বছর বাড়তে থাকে। চিন থেকে ইংলন্ডে চা রপ্তানি ১৭০০তে ৯২,০০০ পাউন্ড থেকে বেড়ে ১৭৫১তে ২৭ লক্ষ পাউন্ডে দাঁড়াল। ১৮০০তে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চিন থেকে ২কেটি ৩০ লক্ষ পাউন্ড চা কিনতে খরচ করতে হত ৩৬ লক্ষ পাউন্ড রূপো।
বাঙলার রূপো আনা বন্ধ হয়েছে এবং চিনেও যেনতেনপ্রকারেণ চা ব্যবসা বন্ধ না করে রূপো নিয়ে যাওয়া বন্ধ করতে চাইল ব্রিটিশ সরকারের বকলমে কোম্পানি। ১৭৯৩তে ব্রিটেন চিনে জর্জ ম্যাকার্টনিকে দূত হিসেবে পাঠাল। ম্যাকার্টনি পশ্চিমি প্রযুক্তির তৈরি সর্বশ্রষ্ঠ জিনিষপত্র দিয়ে সম্রাটকে প্রভাবিত করতে চাইলেন এবং ইংলন্ড-চিনের ব্যবসাকে নতুন ভাবে দেখতে আর্জি জানালেন। তখনও শিল্প, শিল্পিয় প্রযুক্তি আর শিল্প সৌকর্যে শিশু রাষ্ট্র ব্রিটেন তার সেই উপহারে সম্রাটকে প্রভাবিত করতে পারল না এবং ম্যাকার্টনির সমস্ত দাবি খারিজ হয়ে গেল। এর পরেও আরও একবার ব্রিটেন চেষ্টা করেছিল আফিম ব্যবসা নিয়ে সমঝোতা করার কিন্তু চিনের সম্রাট সেই দৌত্য খারিজ করে দেন।
ইতোমধ্যে ভারতীয় কয়েক হাজার বছরের ভারতের পরীক্ষিত সমুদ্রপোত প্রযুক্তি এবং ভারতীয় হাল্কা কাঠ দিয়ে লন্ডনে তৈরি হল ক্লিপার জাহাজ। সহজে বাতাস কেটে বেরোবার জন্য সরু ডেক, বড় হাল এবং বহু মাস্তুল ওয়ালা ক্লিপারগুলি সহজে তাড়াতাড়ি এবং অনেকবেশি বহন করে নিয়ে যেতে পারত বহু পণ্য দ্রব্য, এবং আফিমও। নতুন করে জমে উঠল ইংরেজদের চিনে আফিম পাঠানোর অবৈধ ব্যবসা। এবার একটি ওপিয়াম ক্লিপার জাহাজ, বছরে দুটি বাণিজ্য(যদি একে বাণিজ্য আখ্যা দেওয়া যায়) যাত্রা করতে পারত, ফলে আরও বেশি লাভ, আরও বেশি অবৈধ বাণিজ্য।
দিনে দিনে শশীকলাপ্রায় বেড়েছে চিনে ইংরেজ শাসনের অবৈধ আফিম সাম্রাজ্য, চিন সম্রাটের নাকের ডগা গিয়েই। কর্নওয়ালিশ ভারতে আসার আগে আগেই ১৭৯০ সালে চিনে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অবৈধ আফিম রপ্তানি ছিল চার হাজার চেস্ট। ১৮২০তে কর্নওয়ালিশের সরকারি নীতির ফলে এই পরিমান বেড়ে দাঁড়াল প্রায় দুগুণের কাছাকাছি। ত্রিশের দশকে সেই রপ্তানি আরও বাড়তে শুরু করল এবং ১৮৩৪এ কোম্পানির ভারত বাণিজ্যের একচ্ছত্র আধিপত্য শেষ হয়ে যাওয়ার পর, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আরও বেশি করে আফিম অবৈধ আফিম ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে শুরু করল। তবুও চিনে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্যক্তিগত উদ্যোগে আফিম ব্যবসা শেষ হল না। চিন সম্রাটও এই বাণিজ্য রুখতে কড়া পদক্ষেপ নিতে শুরু করায় প্রথম আফিম যুদ্ধ বাধাল ইংরেজ সাম্রাজ্যশক্তি। প্রথম আফিম যুদ্ধের আগে প্রায় ইংরেজ রাজশক্তি বছরে ভারত থেকে প্রায় ৪০,০০০ চেস্ট রপ্তানি করত। ব্রিটিশদের হিসেবে সেসময় চিনে কম করে এক কোটি আফিম সেবী রয়েছে যার মধ্যে ২০ লক্ষ আফিম মৌতাতে পুরোপুরি আসক্ত।

এ প্রসঙ্গে আর একটি উত্তেজকর তথ্য দেওয়া যাক, ১৮০০ থেকে ১৮৩৯ সালের মধ্যে আমেরিকার ব্যবসায়ীরা চিনে সরবরাহ করেছিল দশ হাজার চেস্ট আফিম। এবার ভারত থেকে অবৈধ আফিম রপ্তানির লেখাজোখা ১৭৭৩এ ১০০০ চেস্ট, ১৭৯০তে ৪০০০ চেস্ট, ১৮২০র দশকের আগে ১০,০০০ চেস্ট, ১৮২৮এ ১৮,০০০ চেস্ট, ১৮৩৯এ ৪০,০০০ চেস্ট, ১৮৬৫তে ৭৬,০০০ চেস্ট, ১৮৮৪তে ৮১,০০০ চেস্ট। ১৮৮১তে এই রপ্তানি সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছয়(সূত্র চাইনিজ রাউন্ডএবাউট, জনাথন স্পেন্স)। তবে প্রথম আফিম যুদ্ধ করেও ব্রিটিশরা চিনে আফিম ব্যবসাকে চিনে বৈধতা দিতে পারেনি। তাদের অপেক্ষা করতে হয়েছিল ১৮৫৬-১৮৬০এর ব্রিটেন-ফ্রান্সএর যৌথ দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধে বেজিং দখল করা পর্যন্ত। ১৮৮০ পর্যন্ত ব্রিটিশ ভারতের সবথেকে দামি রপ্তানি ছিল আফিম। সে সময় চিনে, প্রায় দেড় কোটি আফিমখোরদের চাহিদা মেটাতে রপ্তানির পরিমান ছিল চুয়ান্ন হাজার মেট্রিক টন। প্রথমে অবৈধ পরে গায়ের জোরে যুদ্ধ করে বৈধতা দেওয়া আফিম ব্যবসায় প্রত্যক বছর নয় কোটি তিরানব্বই লক্ষ রূপো টাকা আসত ভারত সরকারের সিন্দুকে, বৈদেশিক মোট রপ্তানির ১৬শতাংশ।

Saturday, June 29, 2013

দ্বারকানাথ, জবাব চায় বাংলা - WHY DWARAKANATH?

পলাশির পর সোজা বাঁকা দুই পথে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সিন্দুকে যে টাকা ঢুকল, হিসেব করে দেখা গেল তা দিয়ে ভারতে ব্যবসার তিন বছরের ইনভেস্টমেন্টএর অর্থ উঠে এসেছে। তখন থেকে কোম্পানি এ দেশে রূপো আনা বন্ধ করে দিল। দেওয়ানির সনদ অধিকারের পর এই ব্যবস্থা পাকাপাকি হয়ে উঠল। তখন কোম্পানি চিনের সঙ্গে সবে ব্যবসা শুরু করেছে। চিন থেকে ইংলন্ডে চা আমদানি করত। ইংলন্ডে চায়ের বাজার তখন চাঙ্গা বললে কম বলা হয়। ফলে রূপো দিয়েই কোম্পানিকে সেই চা কিনতে হত। এখন বাঙলায় রূপো আনা বন্ধ হয়ে গিয়েছে, কোম্পানির তখন উদ্দেশ্য হল চিনেও রূপো পাঠানো বন্ধ করতে হবে। তৈরি হল কোম্পানি ষড়যন্ত্র।
বাঙলার রাজস্ব হাতে পাওয়ার পর ইংলন্ড বাঙলা আর চিনের মধ্যে সে এমন এক বাণিজ্য ত্রিভূজ গড়ে তুলতে শুরু করল, যাতে বিনিয়োগ না করেই লন্ডনে, চিন থেকে চা আমদানি বজায় থাকে। ক্যান্টনে বাঙলা থেকে পাঠানো আফিম(পরে মালওয়া আফিমও যোগ হবে) বাণিজ্য(আদতে চোরাচালান)কে তুঙ্গে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা হল। বাঙলা থেকে প্রায় বিনামূল্য লুঠকরা সুতির কাপড় আর আফিম চিনে রপ্তানি হল। চোরাবাণিজ্যের রসায়নে, বাঙলা-বিহারের চাষীর ঘর থেকে লুঠ করা সরকারি আফিমের মাদক এককোটিরও বেশি চিনের রক্তে ঢুকে পড়ল। বাঙলা-চিনের আফিমের ব্যবসা শুরু হল। ক্রমশঃ চিন থেকে আফিম ব্যবসার উদ্বৃত্তে অর্থাত চিনের অর্থেই বহুমূল্য চা-রেশম-পোর্সেলিন ব্রিটেন নিয়ে যেতে শুরু করল কোম্পানি। এশিয়া লুঠসম্পদ ব্রিটেনে নিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটেন থেকে দামি ধাতু এশিয়ায় আসা বন্ধ হয়ে গেল। এশিয়ায় ব্যবসা করতে আর রূপো আনারও আর প্রয়োজন হল না, বিনিয়োগ করারও প্রয়োজন হল না। এশিয়ার অর্থেই এশিয়ার দ্রব্য কিনে দেশগুলোর সম্পদ চক্রবৃদ্ধিহাতে বাড়তে শুরু করল ইওরোপ। এশিয়ার সম্পদ লুঠের সঙ্গে সঙ্গে হাজার হাজার বছরের বিকশিত শিল্প পরিকাঠামো ভেঙে দিয়ে পাইকারি বাজারও দখলকরল ব্রিটেন। এশিয়া-ইওরোপের বাণিজ্য সম্পর্ক হেঁটমুন্ডঊর্ধপদ হল। অন্ততঃ দুহাজার বছর ধরে এশিয়ার প্রযুক্তি, শিল্প দ্রব্যের বাজার ছিল ইওরোপ। পলাশির ৩০ বছরের মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতির ইতিহাস পাল্টে গেল। এশিয়া অধমর্ণ হল আর ইওরোপ হল উত্তমর্ণ।
সনাতন বাঙলায় বৈদ্যদের রোগ সারানোয় আফিমের ভূমিকা অবসংবাদী ছিল। বিভিন্ন ব্যথায়, বার্ধক্যজনিত রোগে আফিমের প্রয়োগ ছিল সর্বজনবিদিত। ভারতের নানান প্রান্তে কৃষকেরা আফিমের চাষ করত সামাজিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থেকে। ব্যবসায়ীরা কৃষকদের থেকে পরিশুদ্ধ আফিম বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করতেন। কিন্তু ইংরেজরাই প্রথম ব্যাপকভাবে আফিমকে ব্যবহার করতে শুরু করলেন মাদক হিসেবে, শুধুই লাভের উদ্দেশ্যে। তারজন্য গোটা একটা দেশকে মাদকাসক্ত করতেও সভ্যতার বিবেকে বাধেনি। এই পুস্তকে ইংরেজদের আর বাঙালি-পার্সি ইংরেজ বন্ধুদের আফিম ব্যবসায় নিয়ে বহু কিছু আলোচনা হয়েছে। এই অমানবিক ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন দ্বারকানাথেরমত বাঙলার নানান স্বনামধন্য জগতখ্যাত ব্যক্তিত্ব, আজকের মুম্বইএর গোড়া পত্তন করেছিলেন এমন কিছু মানুষ যারা আজ ভারতের ব্যবসা জগতে নিজস্ব আলোয় ভাস্বর। তাঁদের শুরু কেমন হয়েছে তা আমাদের যেমন জানতে হবে, তেমনি যাঁরা বাঙলার একদা জনজাগৃতি এনেছেন বলে আজও খ্যাত, তারাও শুধু বাঙলার চাষীদের পীড়ন করেই ধনী হয়েই খান্ত থাকেন নি, তাদের একটা বড় অংশ ব্রিটিশদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে চিনে আফিম রপ্তানি করেছেন স্ব-ইচ্ছায়, দুদুটো যুদ্ধ বাধিয়েছেন, চিনের জনগণকে আফিম খাইয়ে ইওরোপকে ধনী করার চক্রান্তে, আর সেই বাণিজ্য থেকে উদ্বৃত্তের খুদকুঁড়ো নিজেদের সিন্দুকে ভরার স্বার্থে।
অস্বস্তিকর এই কথাগুলি আজ একমাত্র বাঙালিদের কম্বু কণ্ঠেই বলতে হবে, নিজেরদের আত্মশুদ্ধি আর বিগত আড়াইশ বছরের গ্রামীণ বাঙলা ধংস প্রকল্পে সামিল হওয়ার তাড়নার জবাবদিহিতে। ব্রিটিশদের অত্যাচারে বাঙলার খুন হয়ে যাওয়া কোটি কোটি বাঙলার হতভাগ্য খেটে খাওয়া জনগণ আজ জবাব চায়, সেই সময়ের শহুরে ধনী বাঙলা-বাঙালি উত্তরাধিকারীদের কাছে, যারা ব্রিটিশের অত্যাচারের পাশে দাঁড়িয়ে, বাঙলার রক্তে সরাসরি হাত রাঙিয়ে আফিম, নুন আর আফিম ব্যবসা এবং নীল চাষ করে ধণ উপার্জণ করেছেন। হাজার হাজার বছর ধরে গড়ে তোলা বাঙলার শিল্প-কারখানা আর সামাজিক ব্যবসা পরিকাঠামোকে ধংস করেছেন, সমাজ সংস্কারের নামে। সোসাল রিফর্ম ছিল সে যুগের অত্যন্ত আদরনীয় শব্দবন্ধগুলির মধ্যে অন্যতম। কোম্পানির শাসনকালে, বানিয়া ব্রিটিশদের এবং ব্রিটিশপদপ্রান্তে প্রণত শহুরে বাঙালিদের অমিত ধণার্জণ এবং বিত্তবাসনা, ইংরেজদের বাঙলার শিল্প ধংসকরণ প্রকল্পে স্ব-ইচ্ছায় অংশগ্রহণ, এই ধংসযজ্ঞকে আরও ত্বরান্বিত করে।
এই ধংসযজ্ঞের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে গ্রামীণ বাঙলা বুক চিতিয়ে লড়াই দিয়েছে আগ্রাসী ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে। শহুরে বাঙলার সংখ্যাগরিষ্ঠ ব্রিটিশ প্রসাদপুষ্ট জনসাধারণ একবারও স্বাধীণতা সংগ্রামীদের পাশে এসে দাঁড়াবার কথা ভাবেননি। ধংস হয়ে যাওয়া এইসব শিল্প-ব্যবসা-সামাজিক রীতিনীতিগুলি ভিত্তি করে বেঁচে থাকা লাখো লাখো স্বাধীণতা সংগ্রামী শ্রমিক-শিল্পী, তাদের পরিবার এবং এই কাজের ওপর নির্ভর করে পরোক্ষে জীবিকা নির্বাহ করা হাজারও মানুষ খুন হলেন, জীবিকা থেকে উচ্ছেদ হলেন, শিল্পী থেকে পথের ভিখারি হলেন, আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে আমনাগরিকে রূপান্তরিত হলেন। ভারতের শিল্প পরিকাঠামো ধংস করে, ইংলন্ডে শিল্প পরিকাঠামো গড়তে, এই শিল্পীদের জীবনে, নতুন নতুন ধরনের অমিত-পাশবিক অত্যাচার নামিয়ে এনে গ্রামীণ স্বাধীণতা সংগ্রামীদের জীবিকা থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে সরাসরি, যে কাজে সর্বান্তকরণে সমর্থন দিয়েছেন বাঙলার শহুরে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত সাম্রাজ্যের বন্ধুরা। ব্রিটিশদের অমানুষিক অত্যাচারে, কখোনো শহুরে বাঙালির ঔদাসিন্যে, কখোনোবা তাদের প্রত্যক্ষ মদতে, কোটি কোটি সাধারণ মরে হেজে যাওয়া গ্রামীণ বাঙালি, যারা জানল না কি দোষে তাদের খুন হতে হল অথবা ছেলেমেয়েবউনিয়ে রাস্তায় দাঁড়াতে হল, অথবা খেতমজুরি করে খেতে হল। আজ তারা জবাব চায় বাঙলার নবজাগরণের গুরুঠাকুরদের উত্তরাধিকার যাঁরা বহন করছেন সেই উজ্জ্বল ইংরেজি শিক্ষিত মানুষদের থেকে। 
উত্তমর্ণ অর্থনীতির উদ্বৃত্ত শিল্পোন্নত দেশ থেকে অধমর্ণ বাঙলাকে, ইওরোপের সংস্কৃতি-অর্থনীতির ওপর সরাসরি নির্ভরশীল দেশে পরিণত করার জন্য বাঙলার চিরাচরিত শিল্পী-কারিগরেরা শহুরে বাঙালিদের কাছে জবাব চায়।
জবাব চায় ভারতীয় সমবায়ী সমাজের হাজার হাজার কৃষক-শিল্পী-মজুর, যারা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে স্বাধীণতা সংগ্রামের ঝান্ডা তুলে, ব্রিটিশ তোপেরমুখে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করেছেন, রাইফেলের বেয়নেটের আঘাত খেয়েও লুঠ হয়ে যাওয়া সমাজমাতৃকার সম্মান রক্ষায় ব্যক্তিগত লাভলোকসানের সমঝোতার হিসেবের কড়ির কথা বিন্দুমাত্র চিন্তা করেননি, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সেনা-পুলিশের অত্যাচারে খুন হয়েছেন, অথচ মাথা বিকিয়ে দেননি বিদেশি লুঠেরা সাম্রাজ্যের শক্তির পায়ে। তারা সাম্রাজ্যের বন্ধুদের কাছ থেকে জানতে চায়, কী তাদের দোষ, কার দোষে তিল তিল করে গড়ে তোলা দেশটির হাঁড়ির হাল হল। 
শহুরে বাঙালিরা চিনকে আফিম মাদকে মত্ত করার ইংরেজ প্রকল্পে সামিল হয়েছিলেন কেন সেই স্পর্ধিত প্রশ্ন তারা করতে চাইছে আজ। 
শহুরে বাঙালিদের পূর্বজরা, নিজেদের এবং পরিবারে সম্পদ বাড়াবার জন্য, সমাজে আরও একটু প্রতিপত্তি বৃদ্ধির জন্য, ব্রিটিশদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়েছেন, সেই কর্মকে প্রত্যেক বাঙালির প্রশ্ন করা প্রয়োজন। 
আজও বাঙলার খ্যাতিমানেরা ব্রিটিশ প্রণোদিত বাঙলা ধংস প্রকল্পের সফল কৃতকর্মের জন্য বাঙলা তথা ভারতে পুজ্য, প্রণম্য এবং আদরনীয়, অথচ বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গিয়েছেন বাঙলার বিদ্রোহী আদিবাসী আর লৌকিক সমাজ। স্বাধীণতা সংগ্রামী বাঙলা আজ জবাব চায়। সব হারানোর হিসেব নিকেষ করতে চায়।

নীলকর, কোম্পানির সম্বর্ধনা, বেশ্যাখানার মালিক, আফিম ব্যবসায়ী দ্বারকানাথ - Dwarakanath as Indigo Planter, Brothel Owner, Opium Trader

নীলকর দ্বারকানাথ
সে যুগের যুগধর্ম মেনেই নীলকর দ্বারকানাথ বেলগাছিয়ার প্রাসাদটিকে ব্যবসাগুলোর সঙ্গে ইংরেজ সাম্রাজ্যের জনসংযোগ কর্মকান্ডের অন্যতম ভিত্তিরূপে গড়ে তুলেছিলেন। জমিদারিতে তিনি নীলের এবং রেশম চাষ ও উতপাদন করাতেন, মদ তৈরি ও ফেরি করতেন। কার টোগোর কোম্পানি শুরু করার বহু আগে দ্বারকানাথ পাবনার শিলাইদহে ১৮২১ সালে প্রথম নীলের কুঠি স্থাপন করেন। বিরাহিমপুর কুঠি থেকে প্রথমে, সরকারের দাবিমত অর্থ না দিতে পারলেও কড়া জমিদার দ্বারকানাথ, ইওরোপিয়দের জমিদারি পরিচালনে রেখে পরেরদিকে ভাল লাভ ঘরে তোলেন। প্রমোদ সেনগুপ্ত নীলস্বাধীণতা সংগ্রামতে স্পষ্টস্বরে বলছেন কৃষকের নিকট নীলের চাষ যত বেশী ক্ষতিকর হত, নীলকরের পক্ষে তা ততটাই লাভজনক হত। ঠাকুর পরিবারের কোনও  ব্যক্তির সম্বন্ধেই কোনও পারিপার্শ্বিক প্রমাণদ্বারা প্রমাণিত কোনও কিছুই বলা নিষেধ এবং এঁদের জীবনীকারেরা নানান গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উল্লেখ করা থেকে যত্নসহকারে পিছিয়ে গিয়েছেন। এরসঙ্গে মনেরাখা দরকার বাঙালির  ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ দ্বারকানাথ সম্বন্ধে উদাসীন ছিলেন।
দ্বারকানাথ নীলকর ছিলেন। কড়া হাতেই জমিদারি চালাতেন এ তথ্য দ্বারকানাথের জীবনীকার ব্লেয়ার বি ক্লিং জানিয়েছেন। রাবীন্দ্রিক বাঙালি না চাইলেও এ তথ্য লুকিয়ে রাখা যাবে না। আজ আমাদের খুঁজে বেরকরতেই হবে, যে সব অঞ্চলে রবিঠাকুরের ঠাকুর্দা কড়া হাতে জমিদারি চালাতেন, সেখানের রায়তদের অবস্থা কী ছিল। যদিও সে তথ্য খুঁজে বেরকরা এই পুস্তকের উদ্দেশ্য নয়, তবুও বাঙলায় অত্যাচরিত রায়তদের কথা বলতে আমাদের এ তথ্য উদ্ধার করা ভীষণ জরুরি। কয়েকস্তবক আগেই আমরা দেখেছি জমিদার গোলকনাথ রায় অথবা প্যারীসুন্দরী কিন্তু নীলকর সাহেবের বিরুদ্ধে প্রজাদের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁধে কাঁধ রেখে লড়াই করেছেন। বাঙলায় একটা বড় অংশের জমিদার নীলকর ছিলেন না। তাঁদের অনেকেই কিন্তু স্বাভিমানবশে প্রজাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। দ্বারকানাথের তেমন কিছু কী খুঁজে পাওয়া যাবে! পেলে বাঙালি যে একটু শান্তি খুঁজে পায়। যতই হোক দ্বারকানাথ, রবীন্দ্রনাথের ঠাকুর্দা।
যে সাতটি নীলের কুঠি সে এলাকায় ছিল, তার মধ্যে পাঁচটিই পাবনা-নদিয়া-বিরহিমপুর-সাহাজাদপুর জমিদারির মধ্যে পড়ত- শিলাইদহ, রায়নগর, মীরপুর, ডোব্রাকোল, এবং সমিধপুর(comidpore), অন্যদুটি মুর্শিদাবাদের বড় জঙ্গিপুর আর ছোট জঙ্গিপুরের জমিদারিতে, যেখানে তিনি রেশমও উতপাদন করতেন। প্রফেশনাল জমিদার দ্বারকানাথ, রায়তি ব্যবস্থায় নীলচাষ করলেও তার পিঠে নীলকর ছাপ বসেনি। প্রত্যক বছর ১৬০০মন নীল উতপাদন করতেন দ্বারকানাথের নীলকুঠি। কলকাতায় এই বিশাল পরিমান নীল বিক্রি করতেন প্রত্যেক বছর দুই লক্ষ টাকায়। তিনি তাঁর সময়ে অন্ততঃ বাঙলায় সব থেকে বড় নীল চাষী হিসেবে পরিগণিত হতেন। এছাড়াও তিনি ওয়েস্ট ইন্ডিজ পদ্ধতিতে পরিশুদ্ধ চিনি তৈরি করতে ব্যর্থ হলেও, চিনি তৈরির অন্যপিঠ, রায়নগরে একটি রাম উতপাদন কারখানা তৈরি করেন। মীরপুরের রাম লন্ডন প্রুফ ছাপ পেলে লন্ডনে রওনা হতে পারত রপ্তানি শুল্ক না দিয়েও। আর এই ছাড় না পেলে সেটি দেশি মদ রূপে প্রতি গ্যালন আট আনায় কলকাতার ট্যাভার্নগুলোতে বিক্রি হত। দ্বারকানাথ প্রত্যেক বছর ৫০০০গ্যালন রাম উতপাদন করতেন আর সেটি কলকাতার বাজারে বারো আনা থেকে একটাকায় বিক্রি হত।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সম্বর্ধনা
১৮৪৩এ ইংলন্ড থেকে নানান দেশের মহিলাদের নিয়ে নানান মুখরোচক স্কান্ডাল ধারণ করে ভারতে ফিরে এলেন প্রিন্স দ্বারকানাথ অবতাররূপে। ১০মে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাঁকে সোনার মেডেল দিয়ে সম্বর্ধনা জানানোর উদ্যোগ নেয়। ডেপুটি গভর্নর উইলিয়ম উইলবারফোর্স বার্ড তাঁকে এই সম্মানটি দিয়ে বললেন, exhorted my Native Friends who are looking for high situation to profit by (Dwarakanath’s) example to disply in the first instance the same zeal, ability, energy, and perseverance… and then they may rest assured that they will not fail in obtaining such advancement and such rewards as may be justly due to their merits and services.  উত্তরে দ্বারকানাথ বললেন, the prize less a compliment to myself, than…a pledge conveyed through me to the Natives of India, that their happiness and elevation are objects dear to their rulers(Calcutta Star, 11th May).  এই অনুষ্ঠানে বার্ড বললেন দ্বারকানাথ তাঁর অতীতের কাজ কর্মের জন্য এই পুস্কারটি অর্জন করলেন, আর দ্বারকানাথ জানালেন ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে মিলে ভারতের জনগণের উন্নতির জন্য তিনি তাঁর উদ্যম বিনিয়োগ করবেন।

বৌবাজারে ৪৩টি ঘরের বেশ্যাখানার মালিক দ্বারকানাথ
Attachment of Stigma in Sex Workers’ Milieu (Family & Community): A Hindrance of Psychosocial Development of Their Children গবেষক  Harasankar Adhikari বলছেন, The 1806 Census Report of Calcutta noted that a brothel in holding number 235 & 236 in Bowbazar Street was being operated by a member of Prince Dwarakanath Tagore’s family. It had 43 rooms for the sex workers who came from different parts of Bengal and belonged to the depressed classes. The females worked as servants during their twilight years along with other activities to support themselves (Mukherjee 1977, 71)। নবজাগরণের কী মহিমা।

অহিফেন ঠাকুর
কুড়ি বছর বয়সে ঠাকুরবাড়ির প্রখ্যাততম পুরুষ রবীন্দ্রনাথ ১২৮৮র জৈষ্ঠ সংখ্যার ভারতীতে, জার্মান প্রবন্ধের ইংরেজি অনুবাদ অবলম্বন করে বাঙলায় একটি প্রবন্ধ লেখেন- ভারতবর্ষীয় রাজস্বের অধিকাংশ এই অহিফেন বাণিজ্য হইতে উত্পন্ন হয়। কিন্তু অহিফেনের ন্যায় ক্ষতিবৃদ্ধিশীল বাণিজ্যের উপর ভারতবর্ষের রাজস্ব অথ অধিক পরিমানে নির্ভর করাকে সকলেই ভয়ের কারণ বলিয়া মনে করিতেছেন। ১৮৭১-৭২ খ্রিস্টাব্দে এই বাণিজ্য হইতে সাড়ে সাতকোটি পাউন্ডের অধিক রাজস্ব আদায় হইয়াছিল। কিন্তু কয়েক বতসরের মধ্যে তাহা ৫ কোটি ৩ লক্ষ পাউন্ডে নামিয়া আসে। এরূপ রাজস্বের উপর নির্ভর করা অত্যন্ত আশঙ্কার কারণ। ভারতবর্ষীয় অহিফেন নিকৃষ্ট হইয়া আসিতেছে, সুতরাং তার দাম কমিবার কথা। তাহা ভিন্ন চীনে ক্রমশঃই অহিফেন চাষ বাড়িতেছে।চীনে স্থানে স্থানে অহিফেন-সেবন-নিবারক সভা বসিয়াছে। ...এইরূপে চীনে অহিফেনের চাষ এত বাড়িতে পারে, ও অহিফেন সেবন কমিতে পারে যে, সহসা ভারতবর্ষীয় রাজস্বের হানি হইবার সম্ভাবনা। ... সমস্ত ভারতবর্ষে দেড় কোটি একর উর্বরতম জমি অহিফেনের জন্য নিযুক্ত আছে। পূর্বে সে সকল জমিতে শস্য ও ইক্ষু চাষ হইত। এক বাঙলা দেশে আধ কোটি একরেরও অধিক জমি অহিফেন চাষের জন্য নিযুক্ত। ১৮৭৭-৭৮এর দুর্ভিক্ষে বাঙলার প্রায় এক কোটি লোক মরে। আধ কোটি উর্বর ভূমিতে এক কোটি লোকের খাদ্য জোগাইতে পারে। ১৮৭১ খৃস্টাব্দে জাক্তার উইলসন পার্লিয়ামেন্টে জানাইয়াছেন, মালোয়াতে অহিফেনের চাষে অন্যান্য চাষের এত ক্ষতি হইয়াছিল যে, নিকটবর্তী রাজপুতানা দেশে ১২ লক্ষ লোক না খাইয়া মরে। রাজপুতানায় ১২ লক্ষ লোক মরিল তাহাতে তেমন ক্ষতি বিবেচনা করি না সে তো ক্ষণস্থায়ী ক্ষতি। এই অহিফেনে রাজপুতানার চিরস্থায়ী সর্বনাশের সূত্রপাত হইয়াছে। সমস্ত রাজপুতানা আজ অহিফেন খাইয়া আত্মহত্যা করিতে বসিয়াছে। অত বড় বীর জাতি আজ অকর্মণ্য, অলস, নির্জীব, নিরুদ্যম হইয়া ঝিমাইতেছে। আধুনিক রাজপুতানা নিদ্রার রাজ্য ও প্রাচীণ রাসজপুতানা স্বপ্নের রাজ্য হইয়া দাঁড়াইয়াছে। অতবড় জাতি অসার হইয়া যাইতেছে। কী দুঃখ! আসামে যেরূপে অহিফেন প্রবেশ করিয়াছে, তাহাতে আসামের অতিশয় হানি হইতেছে। বাণিজ্য-তত্বাবধায়ক ব্রুস সাহেব বলেন, অহিফেন সেবনরূপ ভীষণ মড়ক আসামের সুন্দর রাজ্য জনশূন্য ও বন্য জন্তুর বাসভূমি করিয়া তুলিয়াছে এবং আসামীদের মতো অমন ভালো একটি জাতিকে ভারতবর্ষের মধ্যে সর্বাপেক্ষা অধম, দাসবত্ এবং নীতিভ্রষ্ট করিয়া তুলিয়াছে। অহিফেন বাণিজ্য আমাদের ভারতবর্ষের তো এই সকল উপকার করিয়াছে।  কথিত যৌবনে বাপঠাকুর্দার ওপর রাগ করে প্রথমে দেবেন্দ্রনাথ আর পরে রবীন্দ্রানাথ দুজনেই দ্বারকানাথের বহু কাজগপত্র পুড়িয়ে দিয়েছেন। ফলে দ্বারকানাথকে নতুন করে উপস্থিত করার অন্য উপায়ও আজ আর নেই। রবীন্দ্রনাথ দ্বারকানাথের গুরু রামমোহনের স্মৃতি তর্পণ করলেও জ্ঞাণতঃ দ্বারকানাথের উপাসনা করেন নি। এমনই ছিল তাঁর ঠাকুর্দার প্রতি রবীন্দ্রবিতৃষ্ণা।
তিনি হয়ত জানতেন দ্বারকানাথ ছটি ক্লিপারের একটি বড় অংশিদারি অর্জন করেছিলেন। এরমধ্যে প্রধাণতমটি ছিল ৩৬৩টনের ওটারউইচ। খিদিরপুর ডকে পরিকল্পনা করে বানানো। এটির অর্ধেক অংশিদারি ছিল তাঁর আর অর্ধেক ছিল দুই ইংরেজ উইলিয়ম স্টর্ম আর এন্ড্রু হেন্ডারসনের। এটি কলকাতায় তৈরি তৃতীয় ক্লিপার। এর আগে যে দুটি তৈরি হয়েছে হাওড়া ডকে সে দুটি হল বম্বের আফিমব্যবসায়ীগুরু রুস্তমজী কাওয়াসজীর জন্য ১৮২৯এর রেড রোভার আর ১৮৩১এর সিল্ফ। সেই শতকের ত্রিশের দশকে চিনে অবৈধ আফিম চালানের পরিমান প্রায় তিনগুন হয়ে যায় এই ক্লিপারের দ্রুত পরিবহনক্ষমতায়। এবং উত্তর-পূর্ব বাতাস বয়ে ক্লিপারগুলি শীতেই যখন চিনে পৌঁছত সেখানে আফিমের দাম থাকত চড়া। এবং ক্লিপারের অনেকবেশি বোঝা নেওয়ার ক্ষমতার জন্যও আফিম ব্যবসায়ীদের কাছে ক্লিপার প্রধাণ পরিবহন হয়ে ওঠে। দ্বারকানাথের আরও দুটি আফিম ক্লিপার ছিল ৩৭১ টনের ১৮৩৭ সালে খিদিরপুরে তৈরি এরিয়েল এবং ১১২ টনের মাভিজ। এরিয়েল চিনে আফিম ব্যবসা করতে গিয়ে কমিশনার লিনএর হাতে ধরা পড়ে। একইসঙ্গে মনেরাখতে হবে দ্বারকানাথের ব্যবসাগুলির মধ্যে আফিম ব্যবসার পরিমান বেশ কম ছিল।