Wednesday, October 16, 2013

কালীঘাটের পট৫, Kalighat Drawings5

অঞ্জন সেন
প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছিল বুকপকেট নামক একটি অন্তর্জাল পত্রিকায়। লিঙ্কটি হলhttp://bookpocket.net/archives/lekha/kalighat-pot
অনবদ্য পরম্পরাগত পৌরাণিক চিত্র অনেকগুলি দেখা গেছে। একটি গোষ্ঠলীলা পটের বিবরণ দিচ্ছেন অজিত ঘোষ, ‘প্রায় একশত বৎসর পূর্বে আঁকা এই ছবিখানি আকারে বড়ো, রূপকল্পনায় ও বর্ণসুষমায় চমৎকারজনক। রবিকরোজ্জ্বল আকাশের তলে নীল যমুনার ধারা আর উন্মুক্ত ছত্রাকারে দণ্ডায়মান পুষ্পিত তিনটি কদম বৃক্ষ নীল ও সাদার নিপুণ প্রয়োগে বিকশিত পুষ্পস্তবক ও ঘনশ্যাম প্রচুর পল্লব যেভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে তা বিশেষভাবে মনোহারী এই পটভূমিতে গোধন ও রাখাল সখাগণে পরিবৃত কৃষ্ণ-বলরামের গোষ্ঠলীলার সজীব সুন্দর একখানি আলেখ্য। বিলাতি জলরঙে ছাপা ছবি বা এনগ্রেভিং শিল্পী দেখে থাকবেন, তারই স্মৃতি থেকে সন্দেহ নেই, ছায়া সুষমারও প্রয়োগ করেছেন এওন বুঝে-সুঝে আর এত নিপুণভাবে যে, এই চিত্র রূপকল্পনার এই উর্ধ্বস্তরে উন্নীত হয়েছে। চিরাগত রেখাছন্দ আর রূপসন্নিবেশের দক্ষতা তো আছেই।’ (বিশ্বভারতী পত্রিকা) ছবিটি ইংল্যান্ডে আছে। এই বর্ণনায় বোঝা যায় সাদাকালোর সাবলীল রেখাছন্দের মধ্যে এসে গেছে অনুচিত্রের সূক্ষ্মতা। অবশ্যই এটি পরবর্তীকালের।
ভারতীয় চিত্রকলায় রেখার প্রাধান্য ও সাবলীলতার কথা আমরা আগে আলোচনা করেছি। অজন্তা থেকে সমস্ত ভারতীয় চিত্রকলার ঐতিহ্যে এটি চলে আসছে। কালীঘাটের পটুয়ারাও পরম্পরাগত পুরুষানুক্রমিক শিল্প শিক্ষা থেকে এ গুণ আয়ত্ত করেছেন।
কালীঘাট পট চিত্রের গৌরব ১৮৮১ থেকেই যে অস্তমিত তা ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় লিখেছেন। ছবির বাজারে চলে এসেছে লিথো, বিদেশে ছাপা ওলিওগ্রাফ যা দামে আরও সস্তা। লোকে ক্রমে সেগুলিই সংগ্রহ করতে শুরু করল, তবুও কালীঘাটের পট তার অস্তঙ্গত মহিমানিয়ে চলছিল, ১৯৩০ নাগাদ তা প্রায় বিলুপ্ত হল। যদিও ১৯৩০-এর পরও কিছু পট আঁকা হয়েছে। তার শিল্পগুণ থাকলেও নেই সমাদর ও বাজার। শ্রীশচন্দ্র চিত্রকর এরকম সময়ের এক গুণী শিল্পী।
উনিশ শতকে ঔপনিবেশিক চিন্তায় আচ্ছন্ন বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা যে শিল্পের মূল্য বোঝেননি, বিংশ শতকের গোড়া থেকে তার মূল্য কিছু কিছু শিল্পরসিক বুঝতে পেরেছিলেন। অবনীন্দ্রনাথ, গুরুসদয় দত্ত, নন্দলাল বসু, অজিত ঘোষ প্রমুখ। কালীঘাটের পট অবলম্বন করে সে সময়ে সুনয়নী দেবী ও যামিনী রায় ছবি এঁকেছেন। এসময়ের বিখ্যাত চিত্রকর যোগেন চৌধুরীর মধ্যেও কালীঘাটের পটের কিছু বৈশিষ্ট্য ক্ষীণভাবে দেখা যায়।

তথ্যের জন্য জয়তীন্দ্র জৈন, ব্রতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, অজিত ঘোষ ও পরিমল রায়ের কাছে ঋণী। চিত্রগুলি ভিক্টোরিয়া ও অ্যালবার্ট মিউজিয়ম, হারুইচ সংগ্রহ ও চিত্রকূট আর্ট গ্যালারি থেকে সংগৃহীত।
Post a Comment