Friday, June 28, 2013

আলালের ঘরের বালখিল্যরা১

'দূর্জয় যবন নষ্ট, করিলেক মান ভ্রষ্ট,সব গেল ব্রিটিশের ফেম। / শুকাইল রাঙ্গা মুখ, ইংরেজ এর এত দু:,
ফাটে বুক হায় হায় হায়।' …' চিরকাল হয় যেন ব্রিটিশের জয়। ব্রিটিশের রাজলক্ষী স্থির যেন রয়।'
'
ভারতের প্রিয়পুত্র হিন্দু সমূদয় মুক্তমুখে বল সবে ব্রিটিশের জয়।' ...'ভয় নাই আর, কিছু ভয় নাই আর
শুভ সমাচার, বড় শুভ সমাচার পূনর্বার হইয়াছে দিল্লী অধিকার' জয় হোক বৃটিশের, ব্রিটিশের জয়।
রাজ অনুগত যারা, তাদের কি ভয়।” …এই ভারত কিসে রক্ষা হবে ,  ভেব না মা সে ভাবনা।
সেই তাঁতীয়া তোপীর মাথা কেটে , আমরা ধরে দেব নানা ..একেবারে মারা যায় যত চাঁপদেড়ে হাঁসফাঁস করে যত প্যাঁজ খোর নেড়ে।। বিশেষত: পাকা দাড়ি পেট মোটা ভূড়ে। রোদ্র গিয়া পেটে ঢোকে নেড়া মাথা ফূড়ে।। কাজি কোল্লা মিয়া মোল্লা দাঁড়িপাল্লা ধরি কাছাখোল্লা তোবাতাল্লা বলে আল্লা মরি। ...বাদশা-বেগম দোঁহে ভোগে কারাগার।। অকারণে করিয়া দোষে করে অত্যাচার। মরিল দুজন তাঁর প্রাণের কুমার।। একেবারে ঝাড়ে বংশে হল ছারখার।...নানা পাপে পটু নানা, নাহি শুনে না না। অধর্ম্মের অন্ধকারে হইয়াছে কানা।। ভাল-দোষে ভাল তুমি, ঘটালে প্রমাদ।আগেতে দেখেছ ঘুঘু, শেষ দেখ ফাঁদ।।...হ্যাদে কি শুনি বাণী, ঝাঁসির রানী,  ঠোঁটকাটা কাকী। মেয়ে হয়ে সেনা নিয়ে, সাজিয়াছে নাকি? নানা তার ঘরের ঢেঁকি। নানা তার ঘরের ঢেঁকি, মাগী খেঁকী, গোয়ালের দলে।  এতদিনে ধনে জনে, যাবে রসাতলে।। হয়ে শেষ নানার নানী, মরে রানী, দেখে বুক ফাটে। কোম্পানীর মুলুকে কি, বর্গিগিরি খাটে? বড় সব ধেড়ে ধেড়ে, ছাগলদেড়ে, নেড়ে পানে রুখে। চড়ে ঘাড়ে কসে দেও, হাড়ে হাড়ে ঠুকে।। পশ্চিমে মিয়া মোল্লা, কাচাখোল্লা, তোবাতাল্লা বলে। কোপে পড়ে, তোপে উড়ে, যাবে সব জ্বলে।। কেবলি মর্জি তেড়া, কাজে ভেড়া, নেড়া মাথা যত। নরাধম নীচ নাই, নেড়েদের মত।। ...হেল্লা করে কেল্লা লুঠে দিল্লীর ভিতরে।  জেল্লা মেরে বেড়াইত অহঙ্কার ভরে।। এখন সে কেল্লা কোথা হেল্লা কোথা আর? জেল্লা মেরে কেবা দেয় দাড়ির বাহার?  ছেড়ে পাল্লা বলে আল্লা পড়েছি বিপাকে। কাছাখোলা যত মোল্লা তোবা তাল্লা ডাকে। ধরিয়াছে রাজবেশ পরে টুপী জামা। কোথা সেই কালনিমে রাবণের মামা? (ঈশ্বর গুপ্ত, ‘দিল্লীর যুদ্ধ)

অথচ ঈশ্বর গুপ্তই লিখছেন,
কিরূপেতে বিজাতীয় রাজা রাহু আসি। সুখরূপ শশধরে আহারিল গ্রাসি।। মাতৃভাষা বাংলার প্রতি অবহেলা সহ্য হয় না তাঁর হায় হায় পরিতাপে পরিপূর্ণ দেশ। দেশের ভাষার প্রতি সকলের দ্বেষ।। অগাধ দুঃখের জলে সদা ভাসে ভাষা। কোনমতে নাহি তার জীবনের আশা ।। নিশাযোগে নলিনী যেরূপ হয় ক্ষীণা। বঙ্গভাষা সেইরূপ দিন দিন দীনা।। অপমান অনাদর প্রতি ঘরে ঘরে।  কোনমতে কেহ নাহি সমাদর করে।। ('ভাষা')

অথবা, ...মিছা মণি মুক্তা হেম, স্বদেশের প্রিয় প্রেম, তার চেয়ে রত্ন নাই আর। সুধাকরে কত সুধা, দূর করে তৃষ্ণাক্ষুধা, স্বদেশের শুভ সমাচার।। ভ্রাতৃভাব ভাবি মনে, দেখ দেশবাসীগণে, প্রেমপূর্ণ নয়ন মেলিয়া। কত রূপ স্নেহ করি, দেশের কুকুর ধরি, বিদেশের ঠাকুর ফেলিয়া।।

পশ্চাদপট
১৮০০র প্রথমপাদে গ্রামবাঙলার বহু বিত্তহীন কিন্তু কৌলিণ্যপূর্ণ মধ্যবিত্তরমত কলকাতায় ভাগ্যান্বেষণে এসেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের পিতা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় নানান ঝড়ঝঞ্ঝা পেরিয়ে ১৮২০তেই দুটাকা রোজগার করতেই গ্রামের বাড়িতে অর্থ পাঠাবার উদ্যোগ নিয়েছিলেন ১৮২২ ঠাকুরদাসমশাইএর মাসরোজগার পরিমানের আড়াইগুণ মাসমাইনে দিয়ে হিন্দু কালেজে ইংরেজি শিখেছেন তখনকার ভাগ্যবন্তদের সন্তানেরা দুটাকা রোজগার মানে কত তার একটা হিসেব পাওয়া যাবে সে সময়ের বাজার দরে ১৮২২এ বালাম চালের মন ছিল ১টাকা ২৫ পয়সা(কলিকাতার কথা, রায়বাহাদুর প্রমথনাথ মল্লিক) এঁদের অনেকের পিতৃপুরুষ প্রথমে পলাশির অনুঘটক, পরে কোম্পানির সহায়তায় বাঙলা-বিহারের নানান প্রান্তে কড়া হাতে নব্যজমিদারি চালিয়ে বিপুল সম্পত্তির মালিক হয়েছেন। চণ্ডীচরণ সেন, নন্দকুমার ও শতবত্সর পূর্বের বঙ্গ সমাজ বইতে বলছেন, পলাশির পূর্বে ইংরাজ বণিকগণ...আলিবর্দি খাঁর ভয়ে সর্বদা সঙ্কুচিত থাকিতেন তখন কেবল একমাত্র প্রবঞ্চনার দ্বারই উন্মুক্ত ছিল সুতরাং সমধিক অর্থ লাভাশায় এই সকল ইংরাজ কোন প্রকার প্রবঞ্চনামূলক কার্য করিতে কুণ্ঠিত হইতেন না বাঙ্গালীদিগের মধ্যে যাহারা অত্যন্ত ধুর্ত, এবং প্রবঞ্চনা, প্রতারণার কার্যে বিশেষ পারদর্শী বলিয়া পরিচিত ছিল, তাহারাই কেবল ইংরাজ বণিকদিগের প্রিয়পাত্র হইত তাহারা বণিকদিগের বিবিধ অবৈধ আচরণ এবং নিষ্ঠুর ব্যবহারের সাহায্য করিয়া অনায়াসে ধন-সম্পত্তি লাভ করিত এই সকল ধর্মাধর্ম জ্ঞানশূন্য নরপিশাচসদৃশ প্রবঞ্চক বাঙ্গালি, ইংরাজবণিকদিগকে তত্সাময়িক কুকার্যের সাহায্য করিয়া বিপুল অর্থ সঞ্চয় করিতে সমর্থ হইল সুতরাং তাহাদের পৌত্র-প্রপৌত্রগণ মধ্যে অনেকেই বর্তমান সময়ে বঙ্গের অভিজাত শ্রেণীভুক্ত হইয়াছেন এরা সাম্রাজ্যের অধীনে গোমস্তাগিরি, ইজারাদারি, বেনিয়ানি, দালালিসহ নানান বামহস্ত নিয়মে উপরি পাওনার চাকরি এবং ব্যবসায় লিপ্ত থেকেছেন ছোট উতপাদক আর ছোট বিক্রেতাদের লুঠতে চালু করেছেন দস্তুরি আর বন্দোবস্ত বাঙলার রায়তদের শ্রমের মূল্য ডাকাতি আর লুঠের সম্পদে সুতিকাগার হয়ে উঠছে কলকাতা কলকাতা সমাজের ভাবী উজ্জ্বল নক্ষত্ররা সাম্রাজ্যসেবাযোগ্য হয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন ...১৮১৪ খ্রীষ্টাব্দে রামমোহন রায় কালেক্টরের সেরেস্তাদারী পদ হইতে অবসর লইয়া কলিকাতায় আসিয়া বাস করিলেন তদানীন্তন কালে এই পদই দেশীয়দিগের পক্ষে সর্বোচ্চ পদ ছিল লর্ড কর্নওয়ালিসের শাসনকালে ইহা স্থীরকৃত হয়(ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বারকানাথ ঠাকুরের জীবনী) তখনও পর্যন্ত ভারতীয়রা সাম্রাজ্যসেবনে সরকারি উচ্চপদে আরোহনের যোগ্য হয়ে ওঠেন নি
তবে, বাঙলায় ইংরেজরা ব্যাবসা করার প্রথম সময় থেকেই বাঙালি দাদনি ব্যাবসায়ি এবং জমিদারদের বড় একটা অংশ কিন্তু তাদের সঙ্গে ছিলেন। ১৭৫৭র ছলে-বলে-কৌশলে ক্ষমতা দখলের পর থেকেই তাঁরা নব্য ইংরেজ সাম্রাজ্যের অন্যতম ছোট অংশিদার হয়ে বসেন। কেমন? একটা ছোট উদাহরণ পেশ করা যাক। কলিকাতা সেকালের একালের পুস্তক হরিসাধন মুখোপাধ্যায় বলছেন, কলিকাতা আক্রমণের সময় এনেক বাঙ্গালীর ঘরবাড়ী নষ্ট হইয়া গিয়াছিল ... নবাবসৈন্য কলিকাতা লুঠ করায়, অনেকের বহুমূল্য জিনিষ পত্রাদিও নষ্ট হয়  নবাব মীরজাফর সেরাজ কর্ত্তৃক কলিকাতা লুণ্ঠনের ক্ষতিপূরণ স্বরূপ, ইংরেজ কোম্পানীর প্রজাবর্গের জন্য ও কোম্পানীর যে সমস্ত ইংরেজ কর্ম্মচারী এই আক্রমণে গতসর্বস্ব হইয়াছিলেন, তাঁহাদের ক্ষতিপূরণ জন্য এক কোটী সত্তর লক্ষ টাকা কোম্পানীকে দেয়াছিলেন এদেশীয়দের মধ্যে অনেকে কলিকাতা আক্রমণের সময় প্রাণভয়ে পলায়ন করিয়াছিল- কলিকাতা রক্ষার জন্য ইংরাজের কোনও সহায়তা করে নাই এই জন্য প্রথম সংকল্প স্থির হয়, যে এদেশীয় লোকেরা কোনওরূপ ক্ষতিপূরণ পাইবে না ...কলিকাতার বাঙ্গালী অধিবাসীদের মধ্যে গোবিন্দরাম মিত্র, শোভারাম বসাক প্রমুখ কয়েকজন বাঙ্গালী সেই সময় কলিকাতা ত্যাগ করে নাই ইহাঁদের প্রার্থনামতে, কোম্পানী-বাহাদুর পরে বাঙ্গালী নবাব কর্তৃক কলিকাতা আক্রমণের সময় সহর ত্যাগ করে নাই বা কোম্পানীর কোনওরূপ বিরুদ্ধাচরণ করে নাই, তাহারা ক্ষতিপূরণ স্বরূপ, নবাব মীরজাফর প্রদত্ত টাকার অংশ পাইবে দেশীয়দের মধ্যে  এই টাকা বিতরণের ভার গোবিন্দরাম মিত্র ও শোভারাম বসাকের হাতে পড়ে কিন্তু দুঃখের বিষয় তাঁহারা এই খেসারত পূরণের টাকার খুব বেশী অংশই নিজেরা গ্রহণ করেন ...এই টাকা বিতরণের জন্য এদেশীয় তেরজন কমিশনার নিযুক্ত হন আমরা তাঁহাদের নামের তালিকা, ক্ষতিপূরণের দাবীর টাকার একটী তালিকা, এস্থলে উদ্ধৃত করিয়া দিলাম এই তালিকা হইতে পলাশী-আমলে কলিকাতার জনকয়েক অবস্থাপন্ন অধিবাসীর কথা জানিতে পারা যায় (খুচরো বাদদিয়ে)

কমিশনারদের নাম
তাঁহাদের নষ্ট সম্পত্তির জন্য দাবীর পরিমান
কোম্পানী বাহাদুরের মঞ্জুরী টাকা
১) গোবিন্দরাম বসাক
৪১২৬৮০
৩৭৬৮০
২) শোভাবাম বসাক
৪৪১২৭৮
৬৬২৭৮
৩) আলিজান ভাই
৩৪৪৫৭
১৭৪৫৭
৪) রতু সরকার বা রতন সরকার
১৮০৩২২
৪০৩২২
৫) শুকদেব মল্লিক
৫০৯৪২
১০৯৪২
৬) নয়নচাঁদ মল্লিক
৪৩৯২২
৫৯২২
৭) দয়ারাম বসু
৫১৫৩
১১৫৩
৮) নীলমণি মিত্র
২৮১১৩
১০১১৩
৯) হরেকৃষ্ণ ঠাকুর
১৩৭৮৮
৩৭৮৮
১০) দুর্গারাম দত্ত
৬৪৭
১০০
১১) রামসন্তোষ
৬৪১০
৯১০
১২) মহম্মদ সাদেক
২৭১৬
১৩) আইনুদ্দিন

এই তালিকা থেকে দেখা যাচ্ছে তিনজন মুসলমান বাঙালিই সঠিক অর্থ পাননি হরিসাধনএর যুক্তি, লোভে পড়িয়া আশার অতিরিক্ত দাবী করিয়া বসিয়াছিল লেখক লিখলেন ...এই তালিকা হইতে প্রমাণ হয় কোম্পানি বাহাদুর সকলেরই দাবী যথেষ্ট কমাইয়া দিয়াছিলেন এই তালিকা হইতে দেখা যাইতেছে, শোভারাম বসাক সর্বাপেক্ষা বেশী টাকা পান, আর গোবিন্দরাম মিত্র তাঁহার নিম্নে এই তেরজন বাঙালী কমিশনারের অনুগৃহীত, কলিকাতার অন্যান্য বাঙালী অধিবাসিগণ, ক্ষতিপূরণ স্বরূপ কত টাকা পাইয়াছিলেন, পাঠকবর্গের কৌতুহল নিবৃত্তির জন্য, আমরা তাহার আর একটী তালিকা ...সংগ্রহ করিয়া দিলাম

কোম্পানী বাহাদুরের সেরেস্তার বানান
নাম
ক্ষতিপূরণের দাবী
যাহা মঞ্জুর হয়
দেশীয় কমিশনারগণের সহিত ক্ষতিপূরণ-প্রার্থীদের সম্বন্ধ

চৈতন দাস
১৭০২
৩০২
রতু সরকারের আশ্রিত ব্যক্তি

দুর্লভ লক্ষ্মী
কানতনরী
চরণ বসাক
৮২৩৩
১২৩৩
শোভারাম বসাকের আশ্রিত ব্যক্তি

কুড়রাম বিশ্বাস
৫৯৮৩
১৯৮৩
গোবিন্দরাম বসাকের অধীনস্থ কুলী সর্দ্দার

গণেশ বোস
১৫১৭
৩১৭
কমিটির জনৈক কেরাণী

রামদেব মিত্র
৭৩১৩
১৩১৩
গোবিন্দরামের সম্পর্কীয় ব্যক্তি(কিন্তু ১৭৪৭এ ইহার মৃত্যু হয়)

রতন
ললিতা
মতিবেওয়া
৩১৫২০
২৪১৯
৩৫৭৭
৬৫২
৮১৯
৫৭৭
গোবিন্দরাম মিত্রের আশ্রিত গণিকাগণ

দুর্গারাম, বিন্দু, গঙ্গা
৩০৯১
৫১৯
গোবিন্দরাম মিত্রের আশ্রিত ব্যক্তি

দুর্গারাম শর্ম্মা
নীলমণি চন্দ্র
হরিরাম ঘোষ
৫৩২
৭১০
৩৯০
১৩২
১৬০
৯০

রামচরণ সরকার
৬৪৬
৯৬
কমিটির কেরাণী

লক্ষ্ণীকান্ত ঘোষ
৩১৮
গোবিন্দরামের অনুগৃহীত

নয়ানদাস ধোপা
১৬৬৭
৪৬৭
রতু সরকারের অনুগৃহীত

গঙ্গাদত্ত পাত্র
২৫১৩
৫১৩
শোভারাম বসাকের আশ্রিত

বৃব্দাবণ ও ফুলচাঁদ
১২৩৯৫০
২৮৯৫
রতু সরকারের আশ্রিত

গোপীচরণ বসাক
৪০৫৬
১০৫৬
শোভারাম বসাকের আশ্রিত

রামকিশোর চক্রবর্তী
১৪২১
৪২১
গোবিন্দরাম মিত্রের আশ্রিত

রাধাকান্ত রায়
৮৭৬
১৭৬
নীলমণি মিত্রের লোক

রামশঙ্কর সরকার
১১৪০
২৪০
রামসন্তোষের আশ্রিত

ব্রজকিশোর শিরোমণি
২১৯৮
৬৯৮
নীলমণি মিত্রের ব্যক্তি
গোবিন্দরাম মিত্র কুমারটুলীর অধিবাসী নবাব(সিরাজ - লেখক) যখন কলিকাতা আক্রমণ করেন, কথন তিনি কলিকাতার আবাসবাটী ত্যাগ করেন নাই নিজের সিপাহিদ্বারা আত্মরক্ষার চেষ্টা করিয়াছিলেন শোভারাম বসাক সম্ভবতঃ কলুটোলা অঞ্চলে থাকিতেন আজো তাঁহার নামে একটি রাস্তা ঐ অঞ্চলে আছে রতু সরকার, নীলমণি মিত্র, শোভারাম বসাক, ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর সহিত ব্যবসা-সম্বন্ধে লিপ্ত ছিলেন রতু সরকার শোভারামের প্রতিবেশী ...যে সকল ব্যক্তি নবাব কর্তৃক সম্পত্তিনাশের ক্ষতিপূরণ দাবী করিয়াছিলেন তাঁহাদের অধিকাংশই উক্ত মিত্রজা সরকার ও বসাক মহাশয়দের অনুগৃহীত ...প্রথম তালিকায় গোবিন্দরাম প্রমুখ ব্যক্তিগণ তাঁহাদের নিজের জন্য বার লক্ষ, কুড়ি হাজার চারিশত উনত্রিশ টাকা দাবী করেন দ্বিতীয় তালিকাতেও দাবির পরিমান তেয়াত্তর হাজার চারিশত তিপান্ন টাকা কোম্পানী-বাহাদুর গোবিন্দরামের দাবিটা কিছুটা অসঙ্গত বলিয়া মনে করেন কারন কোম্পানীর সিপাহীরাই গোবিন্দরামের ধনসম্পত্তি রক্ষা করিয়াছিল
...মীরজাফরের শহিত ইংরাদজেরসন্ধির সত্বানুসারে, সিরাজ কর্ত্তৃক কলিকাতা আক্তমণের সময়, ইংরাজ ও দেশীয়গণের যে সম্পত্তি লুঠ হইয়াছিল বা অগ্নিদাহে যাহা কিছু ক্ষতি হইয়াছিল, তাহার সম্পূরর্ণার্থে নবাব এক ক্রোর টাকা ক্ষতিপূরণ স্বরূপ প্রদান করেন কটন সাহেবের মতে কলিকাতার ইংরাজ-অধিবাসীরা পঞ্চশলক্ষ, হিন্দু ও মুসলমানেরা কুড়িলক্ষ ও আর্ম্মিনিয়ানগণ সাতলক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ স্বরূপ পান ...নবাব কর্তৃক কলিকাতা লুণ্ঠনের এক বত্সরের পরে অর্থাৎ ১৮৫৭ খৃঃ অব্দের ৬ জুলাই তারিখে এক দফায় ৭৬ লক্ষ টাকা মুরশীদাবাদ হইতে কলিকাতায় আসে এই টাকা ৭০০টী কাঠের সিন্ধুকে আবদ্ধ ছিল ও একশতখানি নৌকা মুর্শিদাবাদ হইতে কলিকাতায় টাকা আসিয়াছিল ইহার দুই সপ্তাহ পরে কোম্পানীর ক্ষতিপূরণের জন্য আরও চল্লিশ লক্ষ টাকা কলিকাতায় পৌঁছয়   

ভারতীয় সভ্যতার প্রতি চরমতমবিদ্বেষভাবাপন্ন টম পেইন, বেকন, লক, বার্ক, রুশোরমত মনীষীদের রচনার সঙ্গে পরিচয় করানো হচ্ছে ভাবীনবজাগরণের অগ্রদূতেদের আমেরিকীয়, ইওরোপিয় গুরুস্থানীয়দের পথ আর তত্ব অনুসরণ করে গ্রামীণ ভারতকে ঘৃণা করতে শিখছেন কলকাতা ইওরোপের মুক্তি, যুক্তি আর স্বাধীণতার আদর্শ শুধুই মুক্ত, রাজত্ব চালানো ইওরোপিয় আর দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক উচ্চমধ্যবিত্ত বাঙালিরই ভোগ্য ততদিনে ইওরোপ ধ্রুপদী, আর সব ফোক ইওরোপ অর্থে আধুনিক উপনিবেশের ফোক সমাজের বাতিলবস্তু গ্রামীণ উত্পাদক, বিতরক, ব্যবসায়ী জনগণ তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণীর বধ-লুঠ-মৃগয়ার জন্তু প্রচারের ঘনঘটায় ইওরোপিয় তত্ব, জ্ঞাণচর্চা একমাত্র ইতিহাস আর সবই পাদটীকা ইওরোপের আধুনিকতম জ্ঞাণচর্চার ইতিহাস ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বজুড়ে বিশ্বজ্ঞাণভান্ডারের একমাত্র উদ্গাতা, ত্রাতা হিসেবে ইওরোপের পরিচয় ঘটছে পৃথিবীতে
ইওরোপিয়রা সেরিসুরাপানে মাতাল কলকাতার অগ্রদূতেরা বিদেশি স্বাধীণতা-মুক্তির পুস্তক পাঠে, কলকাতায় রিফর্মের ছায়াকামান দেগে ইংরেজদের বাতিল, বর্জ্যতত্বের মদেরভাঁড় শুঁকছিলেন, আর এজ অব রিজনিং পড়ে মাতলামির ভানে স্বাধীণতা সংগ্রামী গ্রামীণ বাঙলার বিরুদ্ধে মহড়া নিচ্ছিলেন সংগ্রামী বাঙলা থেকে পেছন ফিরে থাকাই যদি এজ অব রিজনিং হয়, কর্নওয়ালিসের অভয়হস্ত সম্বলকরে কলকাতার নব্য লুঠেরা জমিদারেরা বহু আগে এজ অব রিজনিংএর অভ্যুদয় ঘটিয়েছে ইংরেজদের সঙ্গে বাঙলার নানান প্রান্তের স্বাধীণতা সংগ্রাম দমন করার জন্য সাম্রাজ্যের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছেন ছাপা বই আর পেটোয়া পত্রিকা ব্যবহার করেছেন তাঁদের লুঠের অন্ধকার দিকগুলো লুকিয়ে রেখে তৈরি করছেন কর্তব্য পালনের লম্বাচওড়া ফিরিস্তি গ্রামীণ স্বাধীণতা সংগ্রামীদের খুনে, ডাকাত, লুঠেরা আখ্যায় ভূষিত করেছেন নিজেদের ক্রমশঃ সাম্রাজ্যের সেবায় যাগ্য করে তুলতে যে কোনও বাধা টপকাতে প্রস্তুত   

বিনয় ঘোষ বলছেন মেঘাচ্ছন্ন মধ্যযুগ থেকে আধুনিকযুগের উত্তোরণের আকাশে প্রথম আলোকরেখা হিন্দু কালেজের পাঁচ টাকা মাইনের ছাত্ররা বলছেন তাদের কর্মকান্ডে মানুষের মনে নতুন প্রশ্ন নতুন মূল্যবোধএর বিকাশ হচ্ছে কোন মানুষের, কোন মনুষ্যত্বের, কোন মূল্যবোধের বিকাশ তিনিই জানেন! রামমোহন, দ্বারকানাথেরমত নবজাগরণের মুক্তবুদ্ধির নবযুগের গুরুঠাকুরেরা সেরিমদ্য হাতে নবজাগরিত যুবকদের রিফর্ম রিফর্ম খেলার আইনকানুন ঠিক করছেন সাম্রাজ্যের শর্তে তারা সরকারের নানান উচ্চপদে থেকে চাকরি করেছেন বামহস্ত নিয়ম প্রয়োগ করে জমিদারি উপার্জণ করেছেন কেউ ঘামঝরিয়ে গ্রাম বাঙলার স্বাধীণতা সংগ্রাম দমন করেছেন কেউবা গ্রামবাঙলার স্বাধীণতা সংগ্রামের পিঠ ফিরিয়ে চাকরিযোগ্য হয়েছেন পাঁচটাকা ব্যয়ে
Post a Comment