Sunday, June 30, 2013

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের আফিম ব্যবসা - বেম্বাইএর আফিম বোম্বেটে, Opium Trade of Colonial British Government - The Parsi Opium Traders of Bombay

পার্সিদের আফিম ব্যবসা এবং এই ব্যবসার লাভের গুড়ে যে বম্বে শহর গড়ে উঠেছে, এই বিষয়ে একটি বই সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে(ওপিয়াম সিটি - অমর ফারুকি) আজকের বোম্বাই বা মুম্বই নামে যে শহরটিকে ভারতের আর্থিক সম্পদের রাজধানী, সেটি গড়ে উঠেছিল মালব(মালওয়া) অঞ্চলের উত্পাদিত আফিম, মুম্বই হয়ে চিনে পাঠাবার উদ্বৃত্তের গুড়ে ১৮২০ নাগাদ কলকাতার বাঙালি ভদ্রলোকেদের আফিম ব্যবসার পথ ধরে, ভারতের পশ্চিমাঞ্চলের পার্সি, গুজরাটি বানিয়া, কোঙ্কনি মুসনমানেদের এক বিশাল গোষ্ঠী মালব আফিম ব্যবসার পরতে পরতে জুড়ে ছিলেন ১৮৩০, এই দশকটিতে ৪২টি বিদেশি কোম্পানি চিনে আফিম সরবরাহের ব্যবসাটি চালাত, তার মধ্যে ২০টির সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ছিল পার্সিদের হাতে তত্কালীন ভারতের সমুদ্র পরিবহন আর আফিম ব্যবসা ছিল একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠমাত্র 
আজকে যে বম্বের ইতিহাস-ভূগোল আমরা দেখি, তার সুচনা হয়েছিল ব্রিটিশদের অনুগত পার্সিদের আফিম ব্যাবসার লাভের এক অংশ বিনিয়োগের সূত্র ধরে। শহুরে ইংরেজি শিক্ষিত বাঙ্গালীদের মত পার্সিরাও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের খুব অনুগত ছিল, Industrialisation in India, 1850-1947: Three Variations in the Emergence of Indigenous Industrialists প্রবন্ধে Gijsbert Oonk বলছেন, the Parsees had a proven loyalty towards the British. They partly financed the military defense of the Bombay fort; they were loyal to the British during the Mutiny (1857), financing the British military apparatus.(http://repub.eur.nl/res/pub/1820/Industrialization%2520in%2520India%2520voor%2520Dare.pdf). ব্রিটিশরা পার্সিদের কোন দৃষ্টিতে দেখত, সে বিষয় বলতে গিয়ে তিনি তৎকালীন বম্বের গভর্নরের উদ্ধৃতি তুলে দিচ্ছেন, Throughout the Rebellion [1857] in the East, the Parsees have maintained an unshaken loyalty to the British whom they are proud to call their fellow sub-jects, and while preserving their own independence of religion and customs, their chief desire is that British rule in India should be consolidated upon a basis of strict justice and mutual interest(G. Aungier, Gouvernor of Bombay in a letter in 1673, printed in S. Playne, Bombay, The United Provinces, Punjab, Kashmir, Sindh, Rajputana and Central India. Their History, People, Commerce and Industrial Resources. Bombay 1917-1920, pp26-7). এই অদম্য নিবেদনের   বিনিময়ে ১৮০০ শতকের শুরুর আগে থেকেই উপনিবেশ সরকারের হাত ধরে মালব আফিমের ব্যবসা, বম্বে বন্দর দিয়ে শুরু করে পার্সিরা।


সব থেকে বড় জাল ছড়ানো ছিল জামসেদজী জিজিবয়ের(১৭৮৩-১৮৫৯) তিনি ছিলেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সব থেকে বড় এজেন্সি হাউস, জার্ডিন ম্যাথিসনের অন্যতম অংশিদার ব্রিটিনের সর্বোচ্চ নাইট(১৮৪২), ব্যারণ (১৮৫৭) উপাধি পাওয়া প্রথম ভারতীয় আফিম পরিবহনের জন্য তাঁর অনেকগুলি জাহাজও ছিল, আর তিনি ছিলেন ব্যাঙ্ক অব বোম্বের ছজন নির্দেশকের মধ্যে অন্যতম
দশকের পর দশক জুড়ে অবৈধ আফিম ব্যবসার লাভ থেকেই আজকের দক্ষিণ বম্বের বিশাল বিশাল প্রাসাদোপম হর্ম্যগুলি গড়ে ওঠে আজকের ধণতান্ত্রিক ভারতের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র বম্বে শহরটির ভ্রুণ তৈরি হচ্ছিল ১৭৯০ থেকে ১৮৪০এর মধ্যে অবৈধ আফিম ব্যবসার অপরিমিত লাভের পাহাড়ের ওপর বসে মনে রাখতে হবে ১৮২০ থেকে ১৮৪০ সালের মধ্যে, বম্বেতে অবৈধ আফিম ব্যবসা থেকে যে রূপো আসত তার পরিমান দ্বারকানাথেরমত কলকাতার ইংরেজ-বাঙালি ব্যবসায়ীদের লাভ্যাংশের থেকে অনেক অনেক বেশি কলকাতা থেকে যে সরকারি আফিম চিনে অবৈধভাবে সরাসরি রপ্তানি হত, তার লাভের হকদার ছিল সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ কোম্পানি সরকার, ছিটেফোঁটা লাভের গুড়ের অংশিদার হতেন সেই ব্যবসা সাজনোগোজানের প্রক্তিয়াতে জুড়ে থাকা দালালেরা এদের একাংশমাত্র ছিলেন বাঙালি, পার্সিরাও ছিলেন প্রথমের দিকে
কিন্তু বম্বের বিষয়টা ঠিক উল্টো সরাকারকে নির্দিষ্ট একটা অংশ কর দিয়ে এই লাভের গুড়ের পুরো অংশটাই যেত এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত পার্সি অংশিদারদের সিন্দুকে বেচারা চিনেদের আফিমের মৌতাতে রেখে পার্সিদের সেই লাভের অর্থে গড়ে উঠেছে মালাবার হিল, কাম্বালা হিল, ব্রিচ ক্যান্ডি, আঙ্ক্লেশ্বরেরমত জনপদসমূহ পরে সেই অঞ্চলের বিলাসবহুল পার্সি বাংলোগুলো লিজে দেওয়া হয়েছে ইওরোপিয়দের ১৮৩০-১৮৪০এর মধ্যে এই পার্সিরাই গড়ে তুলেছিলেন বম্বের শহরতলী অঞ্চলগুলো যেমন কার্সেটজী মানকজীর অধিকারে ছিল অনিকের, ঢাকজী দাদাজীর ভারাসাভি(আজকের ভারসোভা), ফারমজী কাওয়াসজীর পোয়াই লেন, জামসেদজী বোমানজীর ভিলে পার্লে, জুহু, কারসেটজী কাওয়াসজীর জর্জগাঁও, রতনজী এদুলজীর ঘাটকোপর, কৃষণরাও রঘুনাথের বোরবিদে এবং লক্ষ্ণণ হরিচাঁজদীর চিনচোলি
সে যুগের আফিম চোরাচালানে সরাসরি যুক্ত ছিলেন বোম্বের প্রায় প্রত্যেক প্রখ্যাত পার্সি পরিবার আফিম ব্যবসার এক প্রবাদপুরুষ, এক সময়ে কলকাতায় ব্যবসায়ী, জামশেদজী জিজিবয়(১৭৮৩-১৮৫৯) নিজে, জামশেদজী টাটাদের থেকে অনেক বেশিভাবে ডেভিড সাসুনের বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন জিজিবয় শিশুকাল থেকেই অনাথ কৈশোরের আগেই চিনের পথে পাড়ি দেন নানান ঝড়ঝঞ্ঝা সয়ে তিনি এক ডেনিস ব্যবসায়ীর নজরে পড়েন এবং ১৮৩৬এই অমিতপরিমান সম্পদের উত্তরাধিকারী হন অমিত অর্থের অধিকারী তাই, তাঁর জাবনীকারদের দাবি, তিনি কোম্ব্রিজে পাঠগ্রহণ করেছেন কিন্তু এর সত্যতা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে(আমরা মনেকরিনা, কেম্ব্রিজে পাঠগ্রহণ মানেই উচ্চস্তরীয় কোন সম্মানিত ব্যক্তি। আমাদের উৎসাহ তাঁর আফিম ব্যবসায়)  তিনি প্রথম নাইট উপাধি পাওয়া ভারতীয় জামশেদজী জিজিবয় গুড সাকসেসএরমত অনেকগুলি জাহাজের মালিক ছিলেন এই ব্যবসায় এত লাভ করেন যে বম্বে এবং পার্সি সমাজের উন্নতির জন্য ২,৩০,০০০ পাউন্ড(সে যুগে ২৩ লক্ষ টাকা) দান করেন সে সময় দু লাখ তিরিশ হাজার পাউন্ড বেশ ভাল পরিমাণ অর্থ
জামসেদজীর সঙ্গে মোতিচাঁদ আমিরচাঁদ, হরমুসজী দোরাবজীকে বম্বের আফিম ব্যবসার তিন বড় মাথা হিসেবে ধরা হয় দাদাভাই রুস্তমজীর রুস্তমজী এন্ড কোম্পানি ১৮২০ থেকেই চিনে আফিম ব্যবসা করত তিনি নিজে চিনে যান ১৮২৭এ মারিওয়ানজী মানকজী এবং জোহাঙ্গী ফ্রেমজী ১৮২১ থেকেই চিনে আফিমের ব্যবসায় লেগে পড়েন মানকজীর পুত্র করসেটজী মানকজী পরে বম্বের বিচারক হন করসেটজী বম্বের গভর্ণর এন্ড্রু রামসের রাইটার হিসেবে জীবন শুরু করে বাঙলা আর আরবের সঙ্গে ব্যবসার সূত্রে বিশাল অর্ণব পোতের মালিক হন দাদাভাই রুস্তমজী, জোহাঙ্গী ফ্রেমজীর আত্মীয় ফ্রেমজীর বাবা রুস্তমজা কাওয়াসজী বানাজীর অনেকগুলি আফিম পরিবহনের জাহাজ ছিল এরমধ্যে বিখ্যাততম হল দাদাভোই, বাঙলার দেশি নৌকো
২৫০ টনের আফিম ক্লিপার মেরি গর্ডন মাজগাঁও ডকে তৈরি করান ফুরডনজী লিমজী, ১৭জুলাই, ১৮৩৯এ চিনের দিকে রওনা হয় খিদিরপুর ডকে এর কিছুদিন আগে তৈরি হয় রুস্তমজী কাওয়াসজী ১২ জুলাই ১৮৩৯এ চিনে রওনা হয় প্রথম আফিম যুদ্ধে স্যর রবার্ট সেপিংস এই জাহাজটি ভাড়া করেন সিল্ফ জাহাজটি অনেকে বলেন বানাজী পরিবারের সম্পত্তি তবে এই জাহাজটি জার্ডিন-ম্যাথিসন কোম্পানি তাদের চিনে আফিম ব্যবসায় ভাড়া খাটাত অনেকে বলেন এটি নাকি জার্ডিন-ম্যাথিসনরই সম্পত্তি
Post a Comment