Saturday, June 29, 2013

সাম্রাজ্যবন্ধু- দ্বারকানাথ ঠাকুর এবং রামমোহন রায় - কালেক্টরদের উত্তরসূরী রামমোহন, Rammohon is the ancestor to the Collectors of the British Raj

কলিকাতায় তাঁহার(নবকৃষ্ণ লেখক) ন্যায় আরও চারজন ব্যক্তি কোম্পানির প্রিয়পাত্র ছিলেন তাহাদের নাম কৃষ্ণকান্তবাবু, কাশিনাথ, গঙ্গাগোবিন্দ ও দেবী সিং এই পঞ্চপান্ডবই সেকালের বাংলার পান্ডববর্জিত দেশের সকল কলঙ্ক মোচন করিয়াছিলেন ইঁহারা পলাশি যুদ্ধের দু এক বত্সরের পরেও কলিকাতায় জ্ঞাতনামা ব্যক্তি ছিলেন না শেষে সৌভাগ্যবলে  ও ইংরাজ কোম্পানীর উচ্চ কর্মচারীদের অনুগ্রহে তাঁহারা সকলেই বাংলার প্রধান জমিদার ও উচ্চ পদবীশীল ব্যক্তি এবং কলিকাতায় সম্পত্তি ঐশ্বর্য লাভ করেন কাশিনাথ বড়বাজারে, কৃষ্ণকান্তবাবু শ্যামবাজারে, নবকৃষ্ণ শোভাবাজারে, গঙ্গাগোবিন্দ পাইকপাড়া ও দেবী সিং ক্লাইভ ষ্ট্রীটের নিকটপ্রভৃতি স্থানের উন্নতি করেন ইঁহাদিগকে তখনকার বাংলার প্রাচীন জমিদারেরা ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর পোষ্যপুত্র বলিতেন ও তাঁহাদের নিকট অনুগ্রহ ভিক্ষা পর্যন্ত করিতে হইয়াছিল ...ইহাদের সকলেরই অভ্যুদয় ঐশ্বর্য কলিকাতার উচ্চ কর্মচারীগণের অন্যায় আচরণে অথবা পৃষ্ঠপোষকতায় হইয়াছিল ...স্পষ্টকথা বলিতে হইল, উক্ত পঞ্চপান্ডবের বংশাবলীক্রমে পলাশি যুদ্ধের পরিণাম উপভোগ করিতেছেন ...কলিকাতা ক্রমে ক্রমে কোম্পানীর উচ্চ কর্মচারীদের পৃষ্ঠপোষক বা প্রিয়পাত্তগণের আবাস ও লীলাস্থল হইয়াছিল(রায়বাহাদুর প্রমথনাথ মল্লিক, কলিকাতার কথা, প্রথম খন্ড, ১৬৮ পাতা)
...অর্থ ও পদপ্রাপ্তির লোভে, স্ব স্ব পদোন্নতি ও বিলাস বিভব ভোগ করিবার নিমিত্ত কোম্পানির দাসত্ব করা  প্রায় সকলের ধ্যান ও ধারনা হইয়াছিল তখন যেন সকলে উহা করিতে পারিলেই আপনাকে ধন্য জ্ঞাণ করিত (ঐ, ১৯৮ পাতা)
বাঙলার রায়তদের ওপর অসীম নিপীড়ন নামিয়ে আনতে কোম্পানি রাজত্বে হেস্টিংসের সময়ে সুপারভাইজার পদটির নাম পাল্টে, কালেক্টর পদ তৈরি হল বাঙলার রাজস্ব আদায়, শিল্প, কৃষির আর ব্যবসা পরিকাঠামো ধংস করতে কালেক্টারেরা অসামান্য ভূমিকা পালন করেছে কালেক্টরেরা শুধু যে ইংরেজ হত এমন নয় অনেক সময় বাঙালিও হত বাঙলাই ছিল ব্রিটিশের প্রথম লুঠভূমি বাঙালিরাই দেশটাকে চিনত মোটামুটি উচ্চাকাঙ্খী চলনসই ইংরেজিটাও শিখেনিয়েছে কোম্পানি রাজের স্বার্থবাহী যে কোনও অনৈতিক কার্যে পারদর্শিতা দেখাতে উত্সুক ইংরেজ পদ, মস্তিষ্ক এবং সম্পদ সংগ্রহের প্রচেষ্টার কাজে তৈলমর্দনে দক্ষ তাই শহুরে বাঙালিরা লুঠ ভিত্তিক নিচু পদের চাকরিগুলোতে আগ্রাধিকার পেত পলাশির পরপরই বাঙলা লুঠের অশ্লীলতম প্রতিযোগিতাপর্বে, মির জাফরকে হটিয়ে মির কাশেম ক্ষমতায় বসল ইংরেজদের প্রধান সহায়ক, দেওয়ান রেজা খাঁর হস্তওবুদ(আমিনী আর খাজনাবৃদ্ধি)এর ফলে ক্রমশঃ চক্রবৃদ্ধিহারে জমিদারির খাজনা বাড়তে থাকে প্রাণ বসু, আমিল দুলাল রায়, ইজারাদার দেবী সিংহিদের অত্যাচারের মাত্রা আকাশ ছোঁয় আমিলদারিতে রাউজেরমত সুপারভাইজারা কী ভাবে কত পরিমান অর্থ নিংড়ে নিতেন জমিদার অথবা রায়তদের ওপর অসীম অত্যাচার নামিয়ে এনে, সে অসহ্য কাহিনী, নাটোরের রানী ভবানীর জমিদারির ওপর নামিয়ে আনা অত্যাচারের ইতিহাস এবং এই জমিদারি পতনের কারন খুঁজলে পাওয়া যাবে
চট্টগ্রাম, হুগলি, বালেশ্বর বন্দর, বীরভূম, দিনাজপুর, কৃষ্ণনগর রাজ্য, রংপুর, সিলেট, পূর্নিয়া, ঢাকা, পাটনা- দেশের বাণিজ্য কেন্দ্রগুলোরমধ্যে প্রধাণতম এই বাণিজ্য কেন্দ্র আর পুরোনোপ্রথায় চলা জমিদারিগুলির নাভিশ্বাস উঠল সুপারভাইজারদের লুঠ আর অত্যাচারের কল্যাণে কোম্পানিপূর্ব বাঙলার শ্রীবৃদ্ধিতে পুরোনো এই জমিদার, জমিদারীর অবদান অনেকে ভুলেছেন(যদিও বহু জমিদার অত্যাচারী ছিলেন, মুকুন্দরাম উবাচ) ইংরেজ আর দাদনিবণিকদের লুঠকার্যে ঘোমটা পরাতে গবেষকেরা উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে এই জমিদারদের তুলনা টেনেছেন কর্নওয়ালিস প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে কেনা লুঠেরা লাঠিয়ালপোষা নব্যজমিদারদের জমিদারিগুলোর সঙ্গে বাঙলা লুঠ আর ধংসের প্রথম কারিগর, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অসীম চাহিদামত এই সুপারভাইজাররা রাজস্ব আদায় করতে পারলেন না গভর্নর-জেনারেল হেস্টিংস, সুপারভাইজার পদের বদলে প্রত্যেক জেলায় বেছেবেছে সুপারভাইজারদের থেকেও কঠোর, নৃশংস, অত্যাচারী, দুর্দম কালেক্টর নিয়োগ করেন কালেক্টরদের, জমিদারদের থেকে সঠিক পরিমান খাজনা আদায়ের ওপর নজরদারির দায় দেওয়া হল এই লুঠ কর্মে খান্ত না হয়ে রায়তদের ওপর আরও আরও বেশি কর চাপানো এবং আদায়ের জন্য নতুন একটি কমিশনও গঠণ হল কমিশন, কোনও আনুসন্ধান না করেই ইচ্ছেমত বাঙলার জমিরওপর কর ধার্য করে এই করের ওপর নির্ভর করে জমিদারদের সঙ্গে শুরু হল কোম্পানির দরকষাকষির পাঁচশালা বন্দোবস্ত কর এতই বেশি ছিল যে, বাঙলা সুবায় স্বাধীণতাকামীদের বিদ্রোহের কবলে পড়ে ইংরেজ সেনাবাহিনী দিয়ে কর আদায় করতে হয়েছে
১৭৫৭য় বাঙলা সুবার পরোক্ষ দায়িত্ব নিয়ে, ১৩ বছরের মধ্যেই ফিলিপ ফ্রান্সিসের তাত্বিকতায়, বাঙলায় কর্নওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু করার আগেই ছিয়াত্তরের মন্বন্তরেরমত বাঙলার প্রথম পাঁজর ভাঙা কান্ড ঘটেগিয়েছে পাঁচশালা বন্দোবস্তের অকালমৃত্যু হলেও বাঙলার সমাজে, সরকারি কাজে কালেক্টরদের রমরমা কিন্তু ছেদ পড়ল না(কালেক্টরদের সামাজিক-আর্থিক রমরমা স্বাধীণতার পরও ভারতের শাসন ব্যবস্থায় কমেনি) কুখ্যাত গঙ্গাগোবিন্দ সিংহ(ভারত বিদ্বেষী এডমন্ড বার্কএর ভাষায়, the basest, the wickedest, the corruptest, the most audacious and artocious), রেজা খাঁ, দেবী সিংহ, হরেরাম, প্রাণ বসু, দুলাল রায়দেরমত অত্যাচারীদের হাত দিয়ে কোম্পানির চাহিদামত রাজস্ব রোজগার হচ্ছিল না ফলে জেলায় জেলায় রেভিনিউ বোর্ড তৈরি হল মাথায় রইল একটি কোন্দ্রিয় রেভিনিউ বোর্ড উদ্দেশ্য আরও আরও বেশি খাজনা নির্ধারণ, আহরণ ফলে কোম্পানির আরও বেশি অর্থ রোজগার আরও বেশি লুঠের পরিকাঠামো তৈরি, যার সরাসরি ফল আরও আরও বেশি অত্যাচার

রায়তেরা কর দিতে অপারগ হলে তাদের জমি কেড়ে বিক্রি করা হবে ঘোষণা হল হাজার হাজার বছরের ভারতীয় সভ্যতাভূমিতে এই প্রথম বাঙলা সুবায় জমির বাজার তৈরি হল বছরে নির্দিষ্ট দিনে সরকারের কোষাগারে নির্দিষ্ট পরিমান অর্থ জমা দেওয়ার শর্তে, কালেক্টরদের অধীনে জমিদারেরা কৃষকদের কাছ থেকে বৈধ বা অবৈধ যে কোনও রকম অর্থ আদায় করতে পারত যে কোনওরকম অত্যাচার ছিল কোম্পানি সরকারের আইনে বৈধ আগামীদিনে এই পদের সমতুল পদে বসে সসম্মানে পদেন্নতি(রায়তদের মেরে খাজনা আদায়) অর্জণ করবেন, আলালদের প্রথম প্রখ্যাত বঙ্গাধিপতি রাজা রামমোহন রায়
Post a Comment