Saturday, June 29, 2013

সাম্রাজ্যবন্ধু- দ্বারকানাথ ঠাকুর এবং রামমোহন রায় - সেসব ঢেকে রাখা অন্ধকার - রামমোহন, Those Unknown Days of Rammohon

রামমোহন রায় যখন ভারতবর্ষে জন্মগ্রহণ করেন তখন এখানে চতুর্দিকে কালরাত্রির অন্ধকার বিরাজ করছিল বঙ্গ সমাজ প্রেতভূমি ছিল, শ্মশানস্থলে প্রাচণকালের জীবন্ত হিন্দুধর্মের প্রেতমাত্র রাজত্ব করিতেছিল রামমোহন রায় সমাজকে এই সহস্র নাগপাশ বন্ধন হইতে মুক্ত করিতে নির্ভয়ে আগ্রসর হইলেন.... তিনি তখনকার অন্ধকার হিন্দু সমাজে আলোক জ্বালাইয়া দিলেন বর্তমান বঙ্গসমাজের ভিত্তি স্থাপন করিয়াছেন রামমোহন রায় আমরা সমস্ত বঙ্গবাসী তাঁহার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী তাঁহার নির্মিত ভবনে বাস করিতেছি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রচনাবলী, ৪র্থ খন্ড, ৫১৩ পৃ

রবীন্দ্রনাথ খারাপ কিছু বলেন নি। শুধু সমস্ত বঙ্গবাসীর, সমস্তের যায়গায় শহুরে শব্দটি বসালেই ঠিক হত। ইংরেজ শাসনে বাঙলায় ফকির-সন্ন্যাসী স্বাধীণতা সংগ্রাম, মেদিনীপুরের ঘড়ুই, খয়রা আর মাঝি স্বাধীণতা সংগ্রাম, চোয়াড় স্বাধীণতা সংগ্রাম, ত্রিপুরার সমশের গাজীর স্বাধীণতা সংগ্রাম, সন্দ্বীপের স্বাধীণতা সংগ্রাম, তন্তুবায়দের স্বাধীণতা সংগ্রাম, মালঙ্গীদের স্বাধীণতা সংগ্রাম, রেশমচাষীদের স্বাধীণতা সংগ্রাম, আফিম চাষীদের স্বাধীণতা সংগ্রাম, বাখরগঞ্জের সুবান্দিয়া স্বাধীণতা সংগ্রাম, পাহাড়িয়া স্বাধীণতা সংগ্রামের পর সংগ্রামে বাঙলা থরথরকরে কাঁপছে গ্রাম বাঙলার সমাজ এক হয়ে ব্রিটিশ লুঠে আর অত্যাচারের বিরুদ্ধে রাস্তাকেই একমাত্র রাস্তারূপে বেছে নিয়েছে সেই উত্তেজনাময় পরিস্থিতিতে, ১৮০৬ সালে রামমোহন রায় জন ডিগবির অধীনে, রামপুরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কালেক্টর(কোম্পানি আমলে কালেক্টরের যে কী দায় ছিল তা আমরা কয়েক স্তবক পূর্বে দেখেছি)রূপে চাকরি নিলেন সশ্রদ্ধ জীবনীকার বলছেন, তিনি দেওয়ান পদে উন্নীত হলেন The principal native officer in the collection of revenueআচার্য প্রফুল্লচন্দ্র তাঁর দেওয়ান চাকুরিরত পূর্বপুরুষের ধণাগম সম্বন্ধে বলছেন, এক শতাব্দী পূর্বে আমার প্রপিতামহ মাণিকলাল রায় কৃষ্ণনগরের কালেক্টরেটের (রামমোহন রায়ের দেওয়ানি থেকে অবসর নেওয়ার কিছু পরে)এবং পরে যশোহরের কালেক্টরেটের দেওয়ান ছিলেন আচার্য দেওয়ান শব্দের ব্যপ্তি নিরূপণ করেছেন,  মিঃ ডিগববী রাজা রামমোহন রায়ের কেন উপনিষত্ ও বেদান্তসারের ইংরাজী অনুবাদের ভূমিকায় লিখিয়াছেন, - তিনি(রামমোহন)  পরে যে জেলায় রাজস্ব সংগ্রহের দেওয়ান বা প্রধান দেশীয় কর্মচারী নিযুক্ত হইয়াছিলেন, সেই জেলায় আমি পাঁচ বত্সর(১৮১০-১৪) ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর সিভিল কালেক্টরেট ছিলাম(কোলেট কৃত রাজা রামমোহন রায়ের জীবনী ও পত্রাবলী এছাড়াও তিনি শিবনাথ শাস্ত্রীর ব্রাহ্ম সমাজের ইতিহাস থেকে বলছেন, সেকালে সেটলমেন্টের কাজে বিশ্বস্ত দেশীয় সেরেস্তাদারদিগকেই সাধারণতঃ কালেক্টারেরা প্রধান এজেন্ট নিযুক্ত করিতেন এবং কলেক্টারেরা এই সব সেরেস্তাদারদের পরামর্শ ও সিদ্ধান্ত দ্বারা বিপুল পরিমানে চালিত হতেন) এই পদে তিনি যে প্রভূত ধন সঞ্চয় করিয়াছিলেন, তাহাতে সন্দেহ নাই আমার বাল্যকালে তাঁহার সঞ্চিত ধনের অদ্ভুত গল্প শুনিতাম তিনি মাঝে মাঝে মাটির হাঁড়ি ভরিয়া কোম্পানীর সিক্কা টাকা বাড়ীতে পাঠাইতেন  আমার পিতামহ আনন্দলাল রায় যশোরের সেরেস্তাদার ছিলেন এবং প্রচুর ধন উপার্জন করিয়া পৈতৃক সম্পত্তি বৃদ্ধি করেন ...আমার প্রপিতামহ বিপুল ঐশ্বর্য সঞ্চয় করিয়াছিলেন ১৮০০ খৃষ্টাব্দে তিনি যে ভূসম্পত্তি ক্রয় করেন, তাহা তাঁহার ঐশ্বর্যের কিয়দংশ মাত্র
কিন্তু এর আগে রামমোহন কী করছিলেন! এটাও প্রায় ধোঁয়াশায়ভরা এক প্রশ্ন শুধু ঐতিহাসিকদের লেখাতেই নয়, জীবনীকারেদের লেখাতেও রাজা রামমোহন রায়ঃ জীবনচরিতের নতুন খসড়ায় গিরিজাশঙ্কর রায়চৌধুরী রামমোহনের জীবনের নানান অন্ধকারাচ্ছন্ন বিষয় আলোকপাত করার চেষ্টা করেছেন গিরিজাশঙ্কর বলছেন রামমোহনের লন্ডনের সেক্রেটারি আর্নট রামমোহনের ১৮৩৩এর ২৭ সেপ্টেম্বর মৃত্যুর পর ৫ অক্টোবর রামমোহনের একটি আত্মজীবনী প্রকাশ করেন কার্পেন্টার রামমোহনের মুখ থেকে শুনে আর একটি জীবনী প্রকাশ করেন আর মিস কোলেটও আরও একটি জীবনী প্রকাশ করেন এছাড়াও নগেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় আর ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ও রামমোহনের জীবনী লেখেন এই সব জীবনীগুলির পরস্পরবিরোধী তথ্য প্রচুর কাটাছেঁড়া করে গিরিজাশঙ্কর দেখাচ্ছেন রামমোহনের জীবনের নানান মেঘেঢাকা কর্মকান্ড যা তাঁর জীবনাকারেরা বলেন নি, অথবা লুকিয়ে গিয়েছেন
১৭৯১ থেকে রামমোহন রায়ের বাবা রামকান্ত রায় ভুরসুট পারগণা বছরে ১,০১,৩৮৯ টাকায় জমিদারি ইজারা নিলেন বছরে নেট মুনাফা ১০,০০০ হয় কী না সন্দেহ ১৭৯৭র ১ ডিসেম্বর তিনি বাবার ভুরসুট পরগণার জমিদারির অংশ আর দেবসেবার ভার গ্রহণ করেন ১৭৯৭তে রামসে সাহেবকে গোমস্তা গোলক সরকারের হাত দিয়ে এটর্নীর আপিসে ৭৫০০ টাকা পাঠালেন রামসে দলিল লিখে সেই টাকার কর্জ গ্রহন করেন এই ধার দিয়ে রামমোহনের সুদচক্র চালানোর ব্যবসা শুরু হল ১৭৯৬তে কলকাতার পৈতৃক বাড়ি নিলেন এবং ১৭৯৭তে তিনি কলকাতা এলেন দুই স্ত্রীকে না নিয়েই সে সময় কলকাতায় পত্নী নিয়ে বাস করা নিন্দনীয় ছিল রামমোহনের বহু উপপত্নীর গল্পের জন্মের শুরু
গিরিজাশঙ্কর বলছেন পরে আরও অনেককে দিবেন এবং এই শ্বেতাঙ্গ সিভিলিয়ানদের টাকা কর্জ্জ দেওয়া হইতেই তাঁহার জীবনের গতি এবং সেই সঙ্গে মান, প্রতিপত্তি ও বৈষয়িক উচ্চাকাঙ্খা উত্তরোত্তর বর্ধিত হইয়া সাফল্য মন্ডিত হইবে এখন যে টাকা অবলম্বন করে রামমোহনের প্রভাব-প্রতিপত্তির যাত্রা শুরু সেই ৭৫০০টাকা (এর ২২ বছর পর, ১৮২০তে মাসে ২ টাকা রোজগার করে ঠাকুরদাস নিজেকে স্বচ্ছল ভাবছেন) রামমোহন পেলেন কোথায় এই প্রশ্ন তুলছেন গবেষক পিতার জমিদারি দেখিতে গিয়া  অসদুপায়ে সংগ্রহ করা ভিন্ন আর ত কেন পথ দেখা যায় না(নজরটান আর বক্তব্য দুইই গিরিজাশঙ্করের) ...যে যুবক মাত্র ২৩ বছর বয়সে এক দাগে ৭৫০০ টাকা এক জন সিভিলিয়ানকে হঠাতই কর্জ দিতে পারেন তাঁহার তহবিলে ৭৫০০ টাকা হইতে আরও অনেক বেশী টাকা আছে বলিয়া ধরিয়া লইতে হইবে
এই টাকার প্রশ্নে, নানান প্রশ্ন কেটে ছিঁড়ে নানান সূত্র উদ্ধৃত করে গিরিজা বলছেন, ভুরসুট পরগণা রামকান্তর লোকসানি মহাল ১৭৯৬ থেকে ১৭৯৯ রামমোহনের বাবা রাজস্বই দিয়ে উঠতে পারছেন না এই চার বছরের মুনাফাতো দূরস্থান, কোনও টাকাই টাকা রামকন্তর হাতে নেই রায়তদের কাছ থেকে খাজনা আদায় হচ্ছেনা রামমোহন অন্য চাকরিও করেন না তাহলে ১৭৯৭এই আগস্টে রামমোহন ৭৫০০ টাকা পেলেন কোথায়! রামমোহনের পিতা বর্ধমানের মহারানী বিষণকুমারীর থেকে এই পরিমান অর্থ কর্জ নেন গিরিজাশঙ্করের অনুমান সেই টাকা জমিদারির ধার না শুধে রামমোহন রামসেকে সেই তারিখেই ধার দিলেন অর্থাত রামমোহন পিতার কর্জের অর্থ নিজের সম্পদ বৃদ্ধিতে কাজে লাগালেন এবং রামমোহন পিতাকে সেই টাকা ফেরত দেন নি
গিরিজা বলছেন, জীবন-নাট্যের অভিনয়ে, ভারত সাম্রাজ্যের নুতন রাজধানী কলিকাতার রঙ্গমঞ্চে রামমোহনকে আমরা পরে বহুবার দেখিতে পাই কিন্তু ১৭৯৭ খৃঃ আমরা ঐ রঙ্গমঞ্চে যুবক রামমোহনের প্রথম প্রবেশ দেখিলাম  - টাকার তোড়া হস্তে কুসীদজীবীর ভূমিকায় বাংলার শতাব্দী শেষ হইতে তখনও তিন বত্সর বাকি তারপর ১৭৯৮খৃঃএও রামমোহন পিতার জমীদারীই দেখিতেছেন ইজারা লওয়া জমিদারিতে, বিশেষতঃ, তখনকার দিনে, প্রজাপীড়ন ব্যতিরেকে- খাজনা আদায় করা একরূপ অসম্ভব কিন্তু এত করিয়া রাজস্বের পরিমান টাকা রামমোহন আদায় করিয়া উঠিতে পারিতেছেন না অথচ এই সময় হইতেই রামমোহনের নিজের নগদ টাকার তহবিল ফাঁপিয়া উঠিতেছে রামমোহনের তখন অন্য আর উপার্জন নাই, - এক পৈতৃক জমীদীরীতে প্রজার কাছে খাজনা আদায় করা ভিন্ন  আদতে রামমেহন ততদিনে কোম্পানির নানান আমলার যোগ্য দেওয়ান হয়ে ওঠার জন্য প্রজাপীড়ন এবং নিজের সম্পত্তি বৃদ্ধিতে হাত পাকাচ্ছেন
রামমোহন ১৭৯৯তে ১২ জুলাই বর্ধমানে একদিনেই গোবিন্দপুর ও রামেশ্বরপুর, দুটি তালুক কিনছেন কিন্তু সেই কেনার ৪৩৫০ টাকা পেলেন কোথায়! কিন্তু এই দুই তালুকের কিস্তিতে রাজস্ব ১৭৮৯.১৮ টাকা(পৃ ৩৪) সরকারকে দেবেন, তমসুক করলেন এই তালুক একবার রাজীবলোচন রায়কে ৪০০১ টাকায় মিথ্যা বিক্রি পরে সেই জমিদারিই তান্ত্রিকগুরু হরিহরানন্দনাথ স্বামীর সাক্ষ্যে নাবালক ভাগনে গুরুদাস মুখোপাধ্যায়কে একরারনামা করলেন এই হাতবদলে রাজীবলোচন লিখলেন, আপনার(গুরুদাসের) বেনামীতে খরিদ করিলাম এই দুই লাটের মালিক ও দান বিক্রীর অধিকারী আপনি, আমার সহিত কি আমার ওয়ারিশনের সহিত কিছুই এলাকা নাই গিরিজার দাবি এই একরারনামাটা রামমোহন নিজেরকাছে রেখেদেন এই দুই তালুক আবার বহুবছর পর রামমোহন নিজের নামে কেনেন(=করে নেন?)
১৮০০ সালের জুলাই পিতার ভুরসুট পরগণার জমিদারির রাজস্ব বাকী ধারের টাকা রামমোহন রামসেকে কর্জ দিয়েছেন। বিনাআদায়ে রামকান্ত হুগলিতে কারারুদ্ধ হলেন ঠিক সেই সময় রামমোহন বাঙলা ছেড়ে কাশীবাসী হলেন কাশীতে রামমোহনের দেনাদার রামসে কালেক্টর পদে আসীন উদ্দেশ্য সরল আসল আর সুদ উদ্ধার আর বাঙালির সব থেকে বড় প্যাশন, চাকরির উমদোরি ১৭৯৯এও রামমোহন পিতার জমিদারি দেখছেন তিনি জানেন সেই বছরেও ভুরসুট পরগণার রাজস্ব বাকি বাকি আগের তিন বছরও রামমোহন প্রজার কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করছেন অথচ তালুকটি পরের বছরেই মেয়াদ ফুরোবে সেই তালুকের রাজস্বের টাকা সরকারের ঘরে জমা না পড়ার অর্থ রামমোহন ভাল করেই জানেন রামমোহন কাশী যাত্রার পরিকল্পনা ছকছেন বাবাকে জেলে ফেলে বাবার বাকি আদায় না করে নিজের টাকা আদায়ে কাশী রওনা হলেন
১৮০১এ ডিগবির সঙ্গে কলকাতায় ২৭বছর বয়সী রামমোহনের পরিচয় হচ্ছে তিনি কোম্পানির কাগজ কম দরে কিনে বেশিদরে বিক্রি করে লাভ করছেন ১৮০২তে আর এক সিভিলিয়ান উডফোর্ডকে ৫০০০ টাকা ধার দিচ্ছেন নিজের ছিল ২০০০টাকা জোড়াসাঁকোর জয়কৃষ্ণ সিংহের থেকে কর্মচারী পাঠিয়ে ৩০০০টাকা আনাচ্ছেন গিরিজাশঙ্কর বলছেন টাকার বাজারে যথেষ্ট পসার(credit) না থাকিলে, চাহিবামাত্র ৩০০০ টাকা জয়কৃষ্ণ তাঁহাকে দিতেন না ২৯ বছর বয়সী রামমোহনের এই দুই সিবিলিয়নকে টাকা ধার দেওয়ার উদ্দেশ্য পরিস্কার ইংরেজ সমাজের সঙ্গে আরও বেশি করে মেলামেশার সুযোগ
উডফোর্ডকে টাকা ধার দিয়েই কয়েক মাস পরে তার অধীনে ফরিদপুরে চাকরি নিয়ে গেলেন তাঁর এই প্রথম সাম্রাজ্যের অধীনে চাকরি গিরিজা বলছেন, একটি বিষয় লক্ষ্য করিবার আছে তিনি যখন যে সিভিলিয়ানের অধীনে চাকুরী করিতেন, সেই সিভিলিয়ান বদলী হইবার সঙ্গে সঙ্গেই তিনিও কর্ম্মত্যাগ করিয়া চলিয়া আসিতেন গিরিজা কেন যে এই কথা বলেলন! ফরিদপুরের পর মুর্শিদাবাদে ছিলেন তিনি চাকরি করতেন কীনা পরিস্কার নয় ১৮০৬ থেকে তিনমাস ডিগবির অধীনে রামগড়ে চাকরি করছেন ১৮০৮এ যশোরে ৫ মাস ৯দিন ডিগবির অধীনে চাকরি ১৮০৯এ তিনি ভাগলপুরে ডিগবির অধীনে ৬মাস চাকরি করেন সেই বছরেই তিনি রঙ্গপুর বা রংপুরে ডিগবির অধীনে ৫ বছর চাকরি করেন যেহেতু বহুদিন তিনি ডিগবির অধীনে চাকরি করেছেন তাঁর পরিচয় ছিল ডিগবির দেওয়ান হিসেবে
রামমোহনের উমদোরির আরও এক বড় উদাহরণ ডিগবির সুপারিশ। রংপুরে তাঁকে স্থায়ী চাকরি দেওয়ার জন্য সুপারিশ করেছিলেন ডিগবি, বারংবার তিনি বোর্ডকে এমন কড়া কিছু লিখছেন, অথবা বোর্ডের কোনও সদস্যকে এমন কিছু অসম্মানজনক বলছেন যা বোর্ডের না পসন্দ হয় তাহার উত্তরে কলকাতার বোর্ড অব রেভিন্যু চটিয়া গিয়া লিখিলেন, ভবিষ্যতে ডিগবি যদি বোর্ডের প্রতি এরূপ অসম্মানসূচক ব্যবহার করেন, তাহা হইলে উহার সমুচিত উত্তর দিতে বাধ্য হইবেন রামমোহন সম্পর্কে বিতরাগের কথা জানিয়ে বোর্ড অব রেভিন্যুর ক্রিম্প লেখেন, রামগড়ে সেরেস্তাদার থাকাকালীন তাঁহার কার্য্যকলাপসম্বন্ধে অপ্রশংসাসূচক কথা (unfavourable mention of his conduct)আমার কানে এসেছে গিরিজা বলছেন, এই অপ্রশংসা তাঁর টাকাপয়সা সম্বন্ধেও হইতে পারে অথবা তাঁহার চরিত্রের অত্যধিক তেজস্বিতার জন্যও হইতে পারে আবার এই দুই কারন একত্র হইয়াও হইতে পারে
...এই দীর্ঘকাল চাকুরী করিয়া যে প্রচুর অর্থ উপার্জন করিয়াছিলেন, তাহা নিশ্চিত প্রবাদ যে, তিনি মোট ১১ লক্ষ টাকা লইয়া রঙ্গপুর হইতে ১৮১৪ জুন মাসে কলিকাতা আসিয়া বাস করিতে আরম্ভ করিলেন প্রবাদ সত্যও হইতে পারে আবার মিথ্যাও হইতে পারে তবে অনেক টাকা লইয়া তিনি ফিরিয়াছিলেন, ইহা আমরা দেখিতে পাই
রঙ্গপুর হইতে যে উপায়েই হউক তহবিলদার ভাবানী ঘোষ প্রতিনিয়তই পাঠাইতেন কলিকাতায় কলিকাতার তহবিলদার গোপীমোহন চট্টোপাধ্যায় উহা জমা করিয়া লইতেন
রামমোহনের সতীদাহপ্রথা সম্বন্ধে যে প্রবাদটি চলে আসছে তার সত্যতার কাঠামো নিয়েও গিরিজা প্রশ্ন তুলছেন ১৮১২(মার্চ-এপ্রিল) জগমোহনের(রামমোহনের দাদা - লেখক) মৃত্যু হয় এই মৃত্যুসংবাদ পত্রে রঙ্গপুর থাকাকালীন রামমোহন জানিতে পারেন সুতরাং জগমোহনের স্ত্রীর সহমরণ দেখিয়া ঐ প্রথা নিরাবণকল্পে রামমোহনের যে প্রথম সংকল্প শুনা যায়, তাহা একেবারে মিথ্যা জগমোহনের তিন স্ত্রী কোন স্ত্রী সহমরণে গেলেন! যদি একজন গিয়া থাকেন তবে আর দুইজন কি যান নাই! আমাদের ধারণা জগমোহনের কোনও স্ত্রীই সহমরণে যান নাই ... সহমরণে যাওয়া রায় পরিবারের প্রথা ছিল না অন্য কোনও ঘটনা হইতে রামমোহন সতাদাহ নিবারণে সংকল্প করিয়া থাকিবেন, ইহাই মনে হওয়া সঙ্গত রাজনারায়ণ বসু ও তাহার পিতা নন্দকিশোর বসুর দোহাই দিয়া যে এই মিথ্যা গল্পটির সৃষ্টি হইয়াছে, তাহা বড় দুঃখের
আমরা রায়বাহাদুর প্রমথনাথ মল্লিক, কলিকাতার কথা পুস্তকের বয়ানটুকুই তুলেদিতে পারিমাত্র, রামমোহনের সঙ্গে ভবানী(চরণ - লেখক) বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম খবরের কাগজ ছাপাইত এই সহমরণ লইয়া উভয়ের মতভেদ হওয়ায় পৃথক কাগজে উহার জবাব দিতে লাগিলেন লাট আমহার্ষ্টএর পত্নী সহমরণ যাহাতে উঠিয়া যায় সেজন্য পতিকে দিয়া এক আইন জারি করাইলেন, যে নিঃসন্তান সহমৃতার ধনসম্পত্তি কোম্পানি বাজেয়াপ্ত করিবেন সহমরণ করিতে হইলে ম্যাজিস্ট্রেটের সম্মুখে উপস্থিত হইয়া আপনার অভিমত জানাইতে হইবে আর যাহারা এই সহমরণের প্রশ্রয় দিবে বা যাহাদের বংশে হইবে, তাহারা কোম্পানির চাকরী পাইবে না রামমোহন কোম্পানির কর্মচারী ছিল, আরও এই সহমরণ প্রথার বিরুদ্ধে দাঁড়াইয়া তিনি কোম্পানির গভর্ণর ও পাদরিদের বড়ই প্রিয় হইয়া পড়িলেন
দেওয়ানি পদে উন্নীত হওয়ার খুবই একটি সাধারণ শর্ত, কোম্পানির চাহিদামত খাজনা আদায় এবং তার অংশ লুঠ করে পরিবারে ধনসামগম করন(কয়েক পৃষ্ঠাপূর্বে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের পূর্বপুরুষ সম্পর্কীয় উদ্ধৃতি দ্রষ্টব্য) আদায় বৃদ্ধি না হলে সংশ্লিষ্ট চাকুরের চাকরি যাওয়ার কথা। যা আমরা দেখেছি প্রাণ বসু, গঙ্গাগোবিন্দ সিঙ্গিদের সময়ে খুব সাধারণ তথ্য, রায়তদের বাবা বাছা করে কোম্পানির ধার্য করা লোভি অথবা লুঠেরা কোম্পানির চাহিদামত খাজনা আদায়ের দক্ষতা অর্জন করা যায় না তিনি সাহেবদের অধীনে উচ্চপদে কাজ করছেন এমন এক টালমাটাল সময়ে যখন গ্রামবাঙলা ইংরেজদের বিরুদ্ধে স্বাধীণতার লড়াই লড়ছে সোজা প্রশ্ন সোজাভাবে বলাই ভাল বাঙলার রায়ত আর জমিদারদের ওপর কত অত্যাচার নামিয়ে এনে, কত উপরি খাজনা আদায়ের দায়িত্ব পালন করে, স্বাধীণতার পুজারী রামমোহন রায় ব্রিটিশ শাসনের লুঠেরা সময়ে দেওয়ান পদে উন্নতির সুযোগ পেয়েছেন! এই পদে মাত্র কয়েক দশক আগেই ছিলেন রামমোহন রায়ের পূর্বসূরী অত্যাচারী গঙ্গাগেবিন্দ সিংহ, রেজা খাঁ, আর সমঝোতাবাজ নন্দকুমার সে ইতিহাসের অঙ্ক রামমোহনমুগ্ধ ভারত কষে উঠতে পারেনি বোধহয় করতে চায়নি অথবা করতে দেওয়া হয় নি ইংরেজ আর ইংরেজধন্যদের লুঠের বলি রায়তদের কাছে এ সব কটিরই একই অর্থ ইংরেজদের লুঠের বাজারে ঘোমটা পরানো গিরিজাশঙ্কর অথবা রমেশচন্দ্র মজুমদার যাঁরাই রামমোহনের কাজে প্রশ্ন তুলেছেন তাদেরকেই হিন্দু জাতীয়তাবাদী বলা হয়েছে
দেওয়ানি পদ পাওয়ার পিঠেপিঠি, তিনি যে অসাধারণ দক্ষতাটি অর্জন করলেন, সেটি হল, শাসন ক্ষমতায় থাকা ইংরেজদের আস্থা অর্জন যে ক্ষমতা তিনি চারিয়ে দেবেন তাঁর ইয়ংবেঙ্গল অনুগামীদের মধ্যে পৌত্তলিক শিষ্য দ্বারকানাথ ঠাকুরে এই দক্ষতার বিকাশ চরমতমভাবে ঘটবে এই দক্ষতাকে আরও গভীরভাবে শানদিতে, ফার্সি জানা রামমোহন ১৮০০ থেকে ইংরেজিটিও সযত্নে শিখতে শুরু করে দিয়েছেন কোম্পানি খ্রিস্ট যাজকদের অবাধে ভারতে কাজের অনুমতি দেয় নি কোম্পানির সেই দর্শণ সামনে রেখে ক্রমশঃ শাসক ইংরেজদের আরও কাছাকাছি হতে তিনি পাদ্রিদের বিরুদ্ধে আর একেশ্বরবাদের সপক্ষে যুক্তি সাজিয়ে নিজেকে কোম্পানির গ্রহণযোগ্য করা শুরু করলেন

ইংরেজদের প্রতি ঘৃণায় ১৭৬৩ থেকেই ফকির-সন্ন্যাসী স্বাধীণতা সংগ্রামে লড়াই শুরু হয়েছে পূর্ব ভারতে দিনের পর দিন সেই লড়াই আরও ঘণীভূত হচ্ছে বাঙলার অসাধারণে সাধারণ মানুষেরা নিজেদের ছুঁড়ে দিচ্ছেন কোম্পানির বন্দুকের গুলির সামনে, কামানের গোলার মুখে অবলীলায় প্রাণ দিচ্ছেন লুঠেরা রাজত্বের প্রতিবাদে ইংরেজদের তৈরিকরা নিরাপত্তার ঘেরাটোপে নিরাপদ চাকরিতে বসে, রামমোহন অথবা দ্বারকানাথেরমত শহুরে কোম্পানিলুঠেরপ্রাসাদধন্য মানুষেরা ইংরেজ রাজত্বের ভিত্তিপ্রস্তর আরও দৃঢ়করার কাজে উদ্যমী এই যোগ্য হয়ে ওঠার পথের ইতিহাসটি আদতে অসীম অন্ধকারে ঢাকা খুব একটা আলোচিতও হয়নি মহান এই মানুষদের অন্ধকারে সযত্নে ঢেকে রাখা এই পর্বগুলি হয়ত আগামাদিনে কোনও নিবেদিতপ্রাণ গবেষক বাঙলার মুক্তিদাতারূপে সর্বজনমান্যদের এই দিকটিকে উন্মোচিত করবেন, গ্রামীণ বাঙলার স্বাধীণতা সংগ্রামীদের প্রতি মমত্ববোধে ততদিন এই আক্ষেপ থাকবেই
Post a Comment