Thursday, February 11, 2016

প্রত্নতত্ত্বভূমির কাব্যতীর্থযাত্রী - জয়দেবের কেন্দুবিল্ব২



গীতগোবিন্দে তাঁর যে আত্মপরিচয় রয়েছে তাতে নিজের সম্বন্ধে শুধু বলেছেন, শ্রীভোজদেবপ্রভবস্য বামাদেবীসুতশ্রী জয়দেবকস্য। পরাশরাদিপ্রিয়বন্ধুকণ্ঠে শ্রীগীতগোবিন্দ কবিত্বমস্তু।। অর্থাৎ পিতা ভোজদেব, মাতা বামাদেবী। প্রিয়বন্ধু পরাশর তাঁর দোহার আর গায়েন। এবারে বোঝা গেল কেন গ্রাম বাংলার মানুষ আজও তাঁর অনুগামী? সেই আটশ বছরের দোহার আর গায়েনের পরম্পরা আজও গ্রাম বাংলার সংস্কৃতিতে বিদ্যমান।
জয়দেবের কাব্য অনুকরণ যুগে যুগে ঘটেছে – বাংলায় তো বটেই। তাঁর জীবন নিয়েও সৃষ্টি হয়েছে নানান উপাখ্যান। বনমালী দাসের জয়দেবচরিত্র, কৃষ্ণদাসের ভক্তমাল, জগন্নাথ দাসের ভক্তরচিতামৃত বা সেদিনের কবি অধর চক্রবর্তী লীলা ও নিত্যভাবে শ্রীজয়দেব পদ্মাবতীর উপাখ্যান নামে পুরাণ জাতীয় কাব্য রচনায় উঠে এসেছে অন্যান্য উপাখ্যানের সঙ্গে ‘দেহি পদপল্লবমুদারম’এর কাহিনী - কবি ‘স্মরগরল খণ্ডনং, মম শিরসি মণ্ডনং’ পর্যন্ত লিখে ভাবতে ভাবতে গঙ্গা স্নানে গিয়েছেন। ইত্যবসরে স্বয়ং ভগবান কবির রূপ ধরে পদ্মাবতীর অতিথি হয়ে গীতগোবিন্দের পুঁথি খুলে লিখে দিয়ে যান ‘দেহি পদপল্লবমুদারম’। অসাধারণ এই উপাখ্যানের গুণমূল্য। শুধু ভক্তিভাবের নয়, তাঁর সঙ্গে জুড়ে যায় এক কবিবরের নন্দন চেষ্টার অসামান্য অন্ত্যমিলন। এই কাহিনীর থেকে বড় রোমাঞ্চকর আর বোধহয় কিছুই নেই। এই স্মৃতিটুকুই যদি ঐতিহাসিক নাও হয়, তাহলে বাংলার গীতিকাব্যের প্রথম ও প্রধান স্রষ্টার স্মৃতি-বিজড়িত স্থানটি যে সেদিন থেকেই কাব্য, সঙ্গীতপ্রেমী গ্রামীন বাঙালীদের তীর্থস্থান হয়ে উঠেছে, ব্যাপকতম জনসমাবেশে, তা বুঝতে কোষ্ঠি বিচার করতে হয় না।
কেঁদুলিতে রয়েছে রাধাবিনোদের মন্দির। কথিত এটি কবির বাসস্থানের ভিটের ওপরে তৈরি। ১৯২৩-২৪ সালের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের বাতসরিক সমীক্ষায় বলা হচ্ছে, it is an example of the nava-ratna or the nine towered type of temple, in which, one central tower is surrounded by two sets of corner towers at two different levels. The façade of the temple is richly decorated with brick tiles representing the various incarnations of Vishnu and scenes from the Ramayana, including the war between the monkeys and demons. বাংলার প্রাচীনতম মন্দিরগুলির মধ্যে রাধাবিনোদের মন্দিরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব যথেষ্ট। মন্দিরের পিছনে একটি পিতলের রথ রয়েছে, তাঁর এচিংএর কাজ দৃষ্টিনন্দন বাংলার কর্মকারদের একটি উল্লেখযোগ্য সৃষ্টিকর্ম।

মেলাকৃতি
মেলা হয় পৌষ-সংক্রান্তিতে কেঁদুলিতে বা যেমন মাঘে দধিয়াবৈরাগীতলায়। এই সময় নতুন ধান ওঠে চাষী আর গৃহস্থের ঘরে। মেলাগুলির অর্থনৈতিক বনিয়াদ তৈরি হয়েই যায়। হাজার হাজার বলা ভাল লাখে লাখে কাব্যতীর্থযাত্রী গ্রামীন অন্নসত্রগুলিতে খেয়ে যান। পৌষের শেষদিনে এই মেলার শুরু। সেদিন হলো "অধিবাস'পরেরদিন অর্থাৎ মাঘের প্রথম শুরুতে মকর স্নান করে সাধু, সন্ন্যাসী, বৈষ্ণব ভক্ত ও অন্যান্যেরা মেলা দর্শন করেন, ঘুরে ঘুরে। এদিন হল "নাম'মানে অস্থায়ী আশ্রমের প্যান্ডেল গুলোতে রাধা গোবিন্দের নামগান হয় সারা দিন রাত। আর বাউল ফকিরেরাও নিজেদের আনন্দমেলায় ডুবিয়ে রাখেন নেচে গেয়ে। শেষ দিন "ভোগ'সাধু, সন্ন্যাসী, ভক্তদের মাটির মালসায় ভোগ খাইয়ে "সেবা' করা হয় নানা অস্থায়ী আখড়াগুলোতে।
জয়দেব বা কেঁদুলিযে নামেই ডাকি না কেন, এই গ্রামের আসল বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করার মতো। এই গ্রামে শাক্ত ও বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের মধ্যে গড়ে উঠেছে নিবিড় আত্মীয়তার সম্পর্ক। আর মেলার নাম যদিও জয়দেব মেলা, কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটা বাউলদেরই মেলা। এখানে এই মেলা উপলক্ষে যত বাউল সমাগম হয় তত আর কোথাও হয় না। মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী থেকে সিলভ্যাঁ লেভি, কে না এসেছেন বাউলদের, বলা ভাল বাংলার ইতিহাসের শেকড়ের টানে। বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাস যে লুকিয়ে আছে এই মেলার প্রকাশভঙ্গীতে। সেই শেকড়ের জাল ছাড়িয়ে খুঁজে নিতে হয় ইতিহাসের ভিত্তিপ্রস্তর। সেই ইতিহাসকে আজও ধারণ, লালনপালন করেছেন আজস্র গ্রামীণেরা তাঁদের নিজস্বতার প্রণাম দিয়ে বংশপরম্পরায়। আউল বাউলদের সঙ্গে জয়দেব-কেঁদুলিতে খুঁজে নিতে হয় সেই প্রত্নতত্ত্বের ভূমি। বাংলার বাউলেরাই জয়দেবের গীতিগঙ্গার অন্যতম প্রবাহ। অন্যান্য সাংস্কৃতিক কর্মীদের সঙ্গে বাউলরা ধরে রয়েছেন তাঁর উত্তরাধিকার। গীতগোবিন্দ আজও কেঁদুলির বালকেরা গান গেয়ে বেড়ায় – আর মনে মনে গেয়ে বেড়ান অজস্র গ্রামবাংগালী – যাদের জন্য আজও টিকে রয়েছে কেন্দুবিল্বের মেলা জয়দেব উপসর্গে – নিজের জোরে।
Post a Comment