Thursday, February 11, 2016

একটি সমাধি আর কিছু বিতর্ক

সম্প্রতি 'হরিশপুরে' সমাধি দেওয়াকে কেন্দ্রকরে সনাতন ধর্মের নাম করে একঘরে করার বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে। তার উত্তরে দীপঙ্করদা একটা প্রকাশনা উল্লেখ করেছেন - যেখানে তারস্বরে যুক্তিবাদ, বিজ্ঞানবাদের দোহাই দেওয়া হয়েছে - তার উত্তরে আমাদের কিছু বলার ছিল -

দীপঙ্করদার উল্লিখিত প্রকাশনায় প্রবন্ধটা পড়লাম।
মনে হয়, 'যুক্তি ও বিজ্ঞানবাদী মানসিকতা' দিয়ে এই পরম্পরাঘাতী প্রবণতা আটকানো যাবে না। ব্রাহ্মণ্যবাদেরও নিজস্ব যুক্তি আছে। পশ্চিমী যুক্তিবাদ দিয়ে এই ধরণের ঘটনা আটকানো যায় নি, আগামী দিনে যাবেও না। শিল্পবিপ্লবীয়, বেকনীয়, অক্ষয় দত্তীয় তথাকথিত যুক্তিবাদের রমরমা গ্রামীন জ্ঞানচর্চা, পরম্পরার ক্ষতি করেছে। আশাকরি এই প্রবন্ধে উল্লিখিত যুক্তিবাদ তার বাইরের বাংলার অসম্ভব বৈচিত্রময় পরম্পরাভিত্তিক।
শুনলাম এই ঘটনায় মতুয়ারা পরিবারটাকে সমর্থন করেছেন।যুক্তিবাদী মতুয়া মানে কি জানি না - পরম্পরাবাদী মতুয়া হলে ভাল হত - এই ঘটনায় মতুয়াদের সংগঠনের আরও সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন ছিল - খুব আলগা মন্তব্য করলাম, না জেনেই - মতুয়াদের জীবনধারণের, জীবনযাত্রার, দর্শনের ওপর শ্রদ্ধা আছে বলেই এই দাবি।
বাংলায় বৈষ্ণবদের নিজস্ব যুক্তিবাদ রয়েছে - তার সঙ্গে পশ্চিমী যুক্তিবাদের বিস্তর ফারাক - বাংলার বৈষ্ণব দর্শনের নিজস্ব যুক্তির পরম্পরার ধারাকেই অবলম্বন করতে হবে - মতুয়ারা সেই জোর তৈরি করেছেন নিজেদের জ্ঞানচর্চায়, সঙ্ঘবদ্ধতায় - তাকে কাজে লাগাতে হবে।
বাংলায় বৈষ্ণবদের বহু গোষ্ঠী রয়েছেন যারা মৃত্যুর পরে শবদেহ পোড়ান না। সমাধি দেন, কেউ কেউ বসিয়ে দেন আমি নিজে দেখেছি - আড়ংঘাটায় - যেমন করে বীরেণ শাসমলকে সমাধি দেওয়া হয়েছিল সেভাবে বাংলার বহু বৈষ্ণব মৃত্যুর পরে সমাধি প্রাপ্ত হন। কেউ কেউ নিজের ভিটেতে সমাধি নেন - তার ওপর হরি মন্দির তৈরি করান - মেদিনীপুর, হাওড়া, হুগলী, নদীয়া ইত্যাদির গ্রামে গ্রামে এই পরম্পরা জোরদার ছিল বহুকাল যাবত। বিশেষ করে জাত বৈষ্ণবেরা এই প্রবণতা মানতেন।
মুশকিল হল এই নানান পারম্পরিক কিন্তু জোরদার প্রথাগুলিকে(যেমন কণ্ঠী বদল করে বিয়ে - তথাকথিত শিক্ষিত বৈষ্ণবেরা খুব বেশি করেন না - না-ই বরাবর - তারা তথাকথিত শাস্ত্রীয় বিয়ে করেন - বা লেখাপড়া করে রাষ্ট্রকে সাক্ষী রেখে করেন - অথচ কণ্ঠী বদল সমাজে গোষ্ঠীতে মেয়েদের স্বাবলম্বন আরও জোরদার করে) কুসংস্কার বলে তথাকথিত ইংরেজি শিক্ষিত, শহুরে সমাজে প্রতিষ্ঠিত বৈষ্ণবেরা আজকাল এমন নিন্দা করছেন, এই প্রথা মানছেন না, তাতে তথাকথিত ব্রাহ্মণ্যবাদীরা উতসাহিত হচ্ছে - এই পরম্পরা নষ্ট হচ্ছে - বিশেষ করে যারা বড় পুঁজির চাকরি/ব্যবসা করেন, কিছুটা ধনী হয়েছেন, তাঁদের নিজেদের সমাজের এই পরম্পরা থেকে বেরিয়ে আসার প্রাণান্তকর উতসাহ লক্ষ্য করা যায় - এ বিষয়ে জাত বৈষ্ণব অজিত দাসের জাত বৈষ্ণব কথা পড়ে দেখতে পারেন। এতে আমাদের পরম্পরার ক্ষতি হচ্ছে, ইতিহাসবোধও নষ্ট হচ্ছে।
আমরা আমাদের বাংলার নিজেদের ইতিহাস জানিনা, প্রথা জানি না - জানলেও মানতে চাই না। দেশিয় ইতিহাসচর্চা, জ্ঞানচর্চা দিয়ে পরম্পরা নষ্ট করার ক্ষতিকর প্রবণতাকে আটকাতে হবে।
দীপঙ্করদা যে লেখাটি তুলেছেন, সেখানে লেখক বিজ্ঞানবাদ আর যুক্তিবাদ যত প্রবলভাবে বললেন, তত জোর দিয়ে কোথাও বৈষ্ণব সমাজের এই পরম্পরার কথা বললেন না।
কয়েকশ বছরের এই পরম্পরা।
এটা আমার বাংলার পরম্পরা।
এটা আমার পরিচয়।
এটা জোর দিয়ে বলতে হবে
Post a Comment