Saturday, February 16, 2013

বাকল, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী

প্রাচীন বাংলার গৌরব থেকে আরও একটি লেখা, বাকল. এই প্রবন্ধে শাস্ত্রীমশাই মসলিনের কথা বিশদে উল্লেখ করেছেন. এই দুটি বিষয় প্রাচীন বাঙলার অন্যতম গৌরপেয়েছেব. সেই বিষয়গুলি এই প্রবন্ধে প্রকাশ  পেয়েছে. বিশ্বেন্দু



প্রথম অবস্থায় লোকে পাতা পরিত কটকের জঙ্গলমহলে এখনও দু-এক যায়গায় লোকে পাতা পরিয়া থাকে তাহার পর লোকে বাকল পরিত গাছের ছাল পিটিয়া পিটিয়া কাপড়ের মত নরম করিয়া লইত, তাহাই জড়াইয়া লজ্জা নিবারণ করিত এবং কাঁধের উপর একখানি ফেলিয়া উত্তরীয় করিত সাঁচী পাহাড়ের উপর এক প্রকাণ্ডস্তুপ আছে, উহার চারিদেকে পাথরের রেলিং আছে, রেলিংএর চারিদিকে বড় বড় ফটক আছে দুই থামের উপর এক একটি ফটক এই থামের গায়ে অনেক চিত্র আছে এই চিত্রের মধ্যে বাকল-পরা অনেক মুনি-ঋষি আছেন তাঁহাদের কাপড় পরার ধরন দেখিয়া আমরা বুঝিতে পারি, কেমন করিয়া সেখানে লোকে বাকল পরিয়া থাকিত তাহার পর লোকে আর বাকল পরিত না, বাকল হইতে সুতা বাহির করিয়া কাপড় বুনিয়া লইত শণ, পাট, ধঞ্চে এমন কি আতসী গাছের ছাল হইতেও সুতা বাহির করিত  এখন এই সকল সুতায় দড়ি ও থলে হয় সেকালে উহা হইতে খুব ভাল কাপড় তৈয়ার হইত এবং অনেক কাপড় খুব ভাল হইত বাকল হইতে যে কাপড় হইত তাহার নাম ক্ষৌম, উত্কৃষ্ট ক্ষৌমের নাম দুকূল ক্ষৌম পবিত্র বলিয়া লোকে বড় আদর করিয়া পরিত
কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের মতে বাংলাতেই এই বাকলের কাপড় বুনা হইত বঙ্গে দুকূল হইত, উহা শ্বেত ও স্নগ্ধ, দেখিলেই চক্ষু জুড়াইয়া যাইত পৌণ্ড্রেও দুকূল হইত, উহা শ্যামবর্ণ ও মণিরমত উজ্জ্বল সুবর্ণকুড্যে যে দুকূল হইত তাহার বর্ণ সূর্যেরমত এবং মণির মত উজ্জ্বল এই অংশের শেষে কৌটিল্য বলিতেছেন, ইহাতে কাশীর ও পৌণ্ড্র দেশের ক্ষৌমের কথা ব্যাখ্যা করা হইল ইহাতে বুঝাযায়, বাংলাতেই বাকলের কাপড় সকলের চেয়ে ভাল হইত এবং দুকূল একমাত্র বাংলাতেই হইত
...এখানে আমরা কাপাসের কথা বলিলাম না কারণ চাণক্যের মতে কাপাসের কাপড় যে শুধু বাংলাতেই ভাল হইত, এমন নয়, মথুরার কাপড়, অপরান্তর কাপড়, কলিঙ্গের কাপড়, কাশীর কাপড়, বত্সদেশের কাপড়, ও মহিষদেশের কাপড়ও বেশ হইত মথুরা পাণ্ড্যদেশ, মহিষদেশ নর্মদার দক্ষিণ, অপরান্ত বোম্বাই অঞ্চলে কিন্তু চাণক্যের অনেক পরে কাপাসের কাপড়ও বাংলার একটা প্রধান গৌরবের জিনিস হইয়াছিল ঢাকাই মসলিন ঘাসের উপর পড়িয়া রাখিলে ও রাত্রিতে তাহার উপর শিশির পড়িলে, কাপড় দেখাই যাইত না একটা আংটির ভিতর দিয়া এক থান মসলিন অনায়াসেই টানিয়া বাহির করিয়া লওয়া যাইত তাঁতীরা অতি প্রত্যুষে উঠিয়া একটি বাখারির কাটি লইয়া কাপাসের খেতে ঢুকিত ফট করিয়া যেমন একটি কাপাসের মুখ খুলিয়া যাইত, অমনি বাখারিতে জড়াইয়া তাহার মুখের তুলাটি সংগ্রহ করিত সেই তুলা হইতে অতি সূক্ষ্ম সূতা পাকাইত, তাহাতে মসলিন তৈয়ার হইত আকবর যখন বাংলা দখল করিয়া সুবাদার নিযুক্ত করেন, তখন সুবাদারের সহিত তাঁহার  বন্দোবস্ত হয় যে, তিনি বাংলার রাজস্ব-স্বরূপ বত্সরে মাত্র পাঁচ লক্ষ টাকা লইবেন, কিন্তু দিল্লীর রাজবাড়িতে যত মালদহের রেশমী কাপড় ও ঢাকার মসলিন দরকার হইবে, সমস্ত সুবাদারকে জোগাইতে হইবে
Post a Comment