Tuesday, August 14, 2012

ইওরোপিয়দের সবথেকে বড় চরিত্রগুণ হল তারা আদতে খুনি


(Dharampal. India Before British Rule and the Basis for India's Resurgence. 1998. Gandhi Seva Sangh, Sevagram: Wardha, Maharashtra, SECTION VII থেকে)
১২০-১৫০ বছর ধরে ব্রিটিশরা অত্যাচার, সেনা নামিয়ে জোর করে খাটানো, দাসত্বসহ নানান উপায়ে যে অর্থ ভারত থেকে লুঠ করে নিয়ে গিয়েছে তার ৬০ থেকে ৮০ শতাংশই খাজনাসূত্রে ১৮০০ এবং ১৮৫৭-৫৮তেই ব্রিটিশরাই অনুভব করছিল বন্দুকের বোয়োনেটের খোঁচায় ভারতের কর আদায় হত কোনও কোনও এলাকায় করের হার সামগ্রিক কৃষি উত্পাদনকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল যে কর তারা আদায় করে তার অধিকাংশই ব্যয় হত এক শতাব্দ জুড়ে সেন্ট হেলেনা থেকে হংকং পর্যন্ত সাম্রাজ্য বিস্তার এবং রক্ষার কাজে একই সঙ্গে কলকাতা, বম্বে, মাদ্রাজ এবং দিল্লিরমত শহর তৈরি, অজস্র সেনা ছাউনি তৈরি হয় ব্রিটিশ উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের অস্থায়ীভাবে থাকার জন্য ১৮০০র অনেক আগেই তৈরি হয় প্রচুর বাংলো তৈরি হয় প্রচুর পার্ক, ক্লাব, এবং স্থায়ী বাসস্থান ব্রিটিশ ভারত এবং রাজন্যশাসিত ভারতেও ১৮৫৮তে জন স্টুয়ার্ট মিলেএর অনুসরনে বলতে পারি, আফ্রিকার পশ্চিমতটের দ্বীপ সেন্ট হেলেনা থেকে চিনা সমুদ্রের দ্বীপ হংকংএর দখল এবং তার প্রশাসন চালানোর জন্য ব্রিটেন থেকে এক পেনিও বরাদ্দ হয় নি সমস্ত সম্পদ সংগ্রহ হয়েছিল প্রথমে বাংলা পরে সমগ্র বারত থেকে
ঊনবিংশ শতকে ভারতের ব্রিটিশ ভাইসরয়ের কাছে এক ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদকে পাঠানো হয়েছিল জানতে যে ব্রিটিশ শাসন পূর্ব সময়ে খরা অথবা মন্বন্তরের সময় শাসকেরা কী করতেন তিনি অর্থনীতিবিদকে খানিকটা তাচ্ছিল্যভরে জানান সে যুগে উত্পাদন না হলে রাজারা কর আদায় করতেন না কিন্তু আজ আমরা একই নীতি অনুসরণ করতে পারি না আমাদের খরচ ধরা রয়েছে, সেগুলো যে কোনও উপায়েই তুলতে হবে তাই উত্পাদন হোক আর না হোক আমাদের কর আদায় করতেই হবে তবে আমরা আমাদের কর আদায়ের মাত্রাকে যথাকিঞ্চিত কমাতে পারিমাত্র
ব্রিটিশ পূর্ব সময়ে ভারতেবর্ষে কর আদায়ের এককেন্দ্রিক ব্যবস্থা ছিল না বিশেষ করে উপকূল এলাকায় কোনও কর ছিল না রাষ্ট্রের রোজগারহত ব্যবসা বাণিজ্য থেকেই বাকি অংশ, যথাসম্ভব ভারতের তিন-চতুর্থাংশ কৃষি জমির একের পঞ্চমাংশ থেকে অর্ধাংশ ব্যয়িত হত সৈন্য, আরক্ষা বাহিনী, এবং প্রশাসনিক কাজে গ্রামের সেচ ব্যবস্থা, খাল কাটা, নালা কাটারমত পরিকাঠামোয় ব্যয়িত হত ৪ শতাংশ কৃষি উত্পাদন অধিকাংশ কর বরাদ্দহত এই এলাকার সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় এবং শিক্ষাকেন্দ্রের বিকাশের জন্য  বহুদূরের অনেক কেন্দ্রই এই বরাদ্দ থেকে বঞ্চিত হত না
মোটামুটি মনেহয়, সুদূর অতীত থেকেই সরকার এবং প্রশাসন, নিরপেক্ষভাবেই একতৃতীয়াংশ কৃষিজমি বিভিন্ন সংগঠণ(ইন্সটিটিউশন) এবং ব্যক্তিকে চিরকালের জন্য দিয়ে রাখত আরও একতৃতীয়াংশ কৃষিজমির মোট উত্পাদন বরাদ্দ থাকত বিভিন্ন পরিকাঠামোর বিকাশের জন্য ৫০ থেকে ১০০টি সংঘ অথবা ব্যক্তির মধ্যে ১৭৭০এ বাঙলার শুধুমাত্র একটি জেলায় এ ধরনের ৬০,০০০ জমি বরাদ্দ ছিল, এমন দাবি করা হয়েছে এমনকী ১২০০ থেকে ১৭৫০ এর বাঙলায় ইসলামিক শাসনের সময়ও হিন্দু ও মুসলমান ধর্মের সংঘ ও ব্যক্তির মধ্যে এধরণের দান প্রাপ্তির তুলনা ১০এর ১ অর্থাত একজন মুসলমানের তুলনায় এধরনের জমি বা উত্পাদন ভোগ করত ১০ জন অমুসলমান ১৭৭০এর বাংলা এবং ১৮০০র দক্ষিণ ভারতের হিসেবরক্ষা থেকে দেখা যাচ্ছে, ব্রিটিশ শাসনের সময়ের তুলনায় একতৃতীয়াংশ থেকে এক চতুর্থাংশ কর আদায় হত এটি অথবা অন্যান্য সূত্র থেকেও জানা যাচ্ছে, ১৮০০ পর্যন্ত অব্রিটিশ এলাকায় মোট কষি জমির ১০ থেকে ১৫ শতাংশ উত্পাদন কর হিসেবে বরাদ্দ হত
ব্রিটিশ শাসিত এলাকায জমির কর নির্ধারিত হল ৫০ শতাংশের আশেপাশে কৃষকের কৃষি উতপাদনের গড় দাম নির্ধারণ করে, সেই পরিমানকে অর্থে পরিণত করে কর আদায় করত এর সঙ্গে জুড়ে দিত নানান অতিরিক্ত শুল্ক যা পূর্বে ব্যবহৃত হত বিভিন্ন গ্রাম বিকাশের কাজে এর পরিমান মোট ৬০ শতাংশের কাছাকাছি ১৭৮০ পর্যন্ত এই প্রবণতা বাংলা বিহারে ব্রিটিশ প্রশাসনের গবেষণাগারে চর্চিত হয়, পরীক্ষা হয়
১৮৬০সালের পর পর্যন্ত কৃষকেরা তাদের মোট কৃষি উত্পাদনের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কর দিতে বাধ্য হয়েছে কোনও এলাকায় কৃষি কর জমির মোট উত্পাদনকেও ছাড়িয়ে যায়, জমির মোট ফসল কররূপে দিয়েও কর শোধ হত না ১৮৪০এর আশেপাশে মাদ্রাজ প্রদেশের সবথেকে উর্বর জমির এক তৃতীয়াংশে কৃষক চাষ করা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়, ব্রিটিশ নথিতে যাকে বলা হয়েছে বিপুল রাজস্ব ঘাটতি
ঐতিহাসিকভাবে ব্রিটিশদের কাছে উচ্চ করহার কোনও নতুন ঘটনা নয় ১৭৫০এ ব্রিটেনসহ বিভিন্ন ইওরোপিয় দেশে কৃষি উতপাদনের কর হার ছিল ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ ১৮০০তে ব্রিটিশ খেতমজুর অথবা কৃষি শ্রমিকেরা অথবা অস্থায়ী কৃষকেরা যারা আদতে জমিতে হাত লাগিয়ে কৃষি উত্পাদন করত, তারা পেত মোট উত্পন্নের ১৮ শতাংশমাত্র ভারতের কৃষকদের দুর্দশা ব্রিটিশদের গাসওয়া ছিল তারা নিজেদের দেশেই শতাব্দের পর শতাব্দ জুড়ে কৃষকদের একই হাল করে ছেড়েছে ভারতে এমন বহু তলুকের সৃষ্টি হল যেখনে জনসংখ্যা অর্ধেকেরও কম সংখ্যায় নেমে এল যেমন অন্ধ্র প্রদেশের পালনাদ তালুক, অথবা ১৭৭০এর বাংলা-বিহার লুঠ-অত্যাচার শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের শিরদাঁড়া ভেঙেফেলার কাজ করে ইওরোপেও ১৯২০ পর্যন্ত সাধারণের সঙ্গে একই অত্যাচার করা হয়েছে
১৭৯৫ থেকে ১৮০৯ পর্যন্ত যুদ্ধ করে মালাবার এবং গুজরাট অধিকার করেন আলেকজান্দার ওয়াকার তিনি লেখেন, "it has been computed that Nadir Shah carried out of India 30 million Sterling, but the spoils of the East India Company [That is in reality that taken by Britain] have probably exceeded that sum a hundred fold.... The drain which we have made from India have been less violent than the exaction's of other conquerors, but they have perhaps in their operation proved more destructive and deadly to the people. They have emptied gradually, but the pitcher has gone constantly to the well. There has been no relaxation. The demand has been regular and unremitting." ওয়াকার নিজ জবানীতে এই লেখা লিখেছেন ১৮২০তে এর পরও ব্রিটিশ ভারতে আরও ১৩০ বছর প্রায় রাজত্ব করে
এর সঙ্গে আরও কিছু তথ্য যদি আমরা এক সঙ্গে যোগ করি তাহলে বোধহয় বাড়াবাড়ি হবে না ১৭৫০ পর্যন্ত আজকে যে অঞ্চলকে তৃতীয় দুনিয়া আখ্যা দেওয়া হয়, সেই ভারত চিন যৌথভাবে বিশ্বের শিল্প উত্পাদনের ৭৩ শতাংশ সরবরাহ করত ১৮৩০এও ছিল ৬০শতাংশ যারা ভারতের জনসংখ্যা বিষয়ে মাথা ঘামান তাদের জন্য বলা যাক, ১৯০০র আদমসুমারিতে পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের সংখ্যা অনেক কাছাকাছি ছিল একশ দশ বছর পর আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে রয়েছি! ১৯০১এর আদমসুমারিতে প্রতি ১০০০ পুরুষের তুলনায় মহিলাদের সংখ্যা ছিল ৯৮০ ১৯৯১এর জনগণনায় মহিলাদের সংখ্যা ৯২০তে এসে ঠেকেছে এই ঘটনা ঘটেছে এমন সময়, যে সময়কে বলা হয় ভারতীয় মহিলাদের জাগরণের যুগ
আরও অনেক প্রশ্ন উত্থাপন করা যায় কিন্তু উত্তর দেবে কে! ১৮৮১-১৯১১এর তথ্য অনুযায়ী ৫জনের একজন মহিলা (৩ মাস থেকে ৮০ বছর পর্যন্ত ধরে) বিধবা এই পুরুষদের কী ঘটল! আদতে ১৭৪৮ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত সাধারণ ধারণায় কয়েক লাখ স্বাধীণতা সংগ্রামী শহীদ হন নি, অথবা কয়েক কোটি মানুষ মন্বন্তরে খুন হন নি আদতে ভারতজুড়ে ব্রিটিশ শাসন নীতিতে মারা গিয়েছেন ২৫ থেকে ৫০ কোটি বেচারা ভারতীয় বিশ্বের যে অঞ্চলেই ইওরোপিয় দখলদারেরা গিয়েছে, সেই অঞ্চলেই এ ধরণের মৃত্যু উপত্যকা সৃষ্টি করেছে তারা যে শুধু এইওরোপিয় দেশগুলোতে এই কান্ড ঘটিয়েছে এমন নয়, এই ঘটনা ঘটেছে বহু শতাব্দ জুড়ে আয়ারল্যান্ডে মনেরাখা দরকার ইওরোপিয়দের সবথেকে বড় চরিত্রগুণ হল তারা আদতে খুনি ভারতের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটে নি  
Post a Comment