Wednesday, August 15, 2012

বাঙলায় উপেক্ষিত এক শিক্ষা সমীক্ষা১


উত্তমর্ণ -উদ্বৃত্ত বাঙলা
ধরমপালজীর সাথীরা, আলমোড়ার লোক বিজ্ঞান কেন্দ্র বা দক্ষিণ ভারতের নানান শিকড়ে যাওয়ার আন্দোলন, বিভিন্ন গান্ধিজীর আদর্শ অনুসরণ করা সংস্থা আজও গ্রামভারতের সনাতন সমাজ, দর্শণ, ঐতিহ্য, প্রযুক্তি নথিকরণ করে চলেছেন দায়বদ্ধভাবে বাঙলায় গ্রাম বিষয়ে আলোচনার মুখপাত করেছিলেন রাজেন্দ্রলাল মিত্র, অক্ষয় কুমার দত্ত, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, দীনেশচন্দ্র সেন অথবা নির্মল চন্দ্র বসুরমত মানুষেরা সেই কাজের দায়ভাগ বয়ে নিয়ে চলেছেন সুধীর কুমার করণ, রঘুনাথ গোস্বামী, শক্তিনাথ ঝা, জয়া মিত্র, বিনয় ঘোষ, হরিদাস পালিত, হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়, বসন্তরঞ্জন রায়, তারাপদ সাঁতরারমত সমাজভক্তরা বাঙলার গ্লানি আর ন্যুনতার বহু মিথ-মিথ্যাকে প্রশ্ন করার কাজ খুব একটা এগোয় নি সারা জীবন সরকারের বহু প্রকল্পে সামিল থাকা মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদেরমত মানুষ শেষ বয়সে ব্রিটিশ সমান ইওরোপ সমান প্রগতিশীল এই সমীকরণ ভাঙতে চাইছিলেন(হরপ্রসাদ শাস্ত্রী রচনাবলী, ভূমিকা, প্রথম খন্ড) তিনি পারেন নি কিন্তু চাইছিলেন সে টুকুও পারেননি তাঁর বহুরঙিন অনুগামী আজও প্রচার ভারতীয় পাঠশালার পাঠ্যবস্তু মানেই ভগবানের আরাধণা এবং সেই ধর্মীয় পাঠের একচ্ছত্র অধিকার ছিল ধনবান উচ্চবর্ণের
পাদরি উইলিয়ম এডামের বাঙলা-বিহারের শিক্ষাব্যবস্থার সমীক্ষা সেই মিথ ভেঙে দিয়েছে আজও সেই সমীক্ষা বহু আলোচিত নয় এডাম তাঁর শিক্ষা প্রতিবেদনে বীরভূম জেলায় হিন্দু, মুসলমানএর সঙ্গে খ্রিষ্টিয় গুরুমশাইএর নাম পাচ্ছেন ৪০০ গুরুমশাই ছিলেন হিন্দুসহ ২৪টি জাতি তাদের মধ্যে কয়েকটির নাম চন্ডাল, ধোবি, তাঁতি, কৈবর্ত, গোয়ালা পড়ুয়েদের মধ্যে পাচ্ছেন মুসলমান, খ্রিস্টান, সাঁওতাল, ধাঙড়, ডোম, চন্ডাল, তেলি, ব্যধ, যুগি, তাঁতি, হাড়ি, কুর্মি, মালি এমনকী ব্রাহ্মণ, কায়স্থও বাঙলা-বিহারের দেড় লক্ষ গ্রাম এক লক্ষেরও বেশি পাঠশালার দায় ভরণ পোষণ করত পাঠশালায় উচ্চবিত্ত উচ্চবর্ণের ছাত্র-ছাত্রী ঠাঁই ছিল জ্ঞাণ অর্জণের হকদার ছিলেন, ভারতীয় সভ্যতা যে মানুষেরা গড়েছেন, সংখ্যাগুরু গ্রামীণ, আজকের ভাষায় নিম্নবর্ণ
এখানেই শেষ নয় তখনও বেন্টিঙ্ক-মেকলে-বিদ্যাসাগর ত্রিভূজ বাঙলায় শহরভিত্তিক বিদ্যালয় পরিচালনার সুপারিশ করে নি তাঁর সমীক্ষায় এডাম, বাঙলা-বিহারের গ্রামে এক লক্ষ পাঠশালার সন্ধান পাচ্ছেন সমীক্ষাটি করা হচ্ছে এমন এক সময়ে যখন বাঙালি উচ্চমধ্যবিত্তের সহায়তায় ব্রিটিশ সরকার ছিয়াত্তরের মন্বন্তর ঘটিয়ে তিনকোটি বাঙালি-বিহারি গ্রামীণ খুন করেছে দেশজ শিক্ষা-জ্ঞাণচর্চা আর শিল্পপরিকাঠামো ধংস করেছে অর্বুদ পরিমান সম্পদ লুঠ করে লন্ডনে নিয়ে গিয়েছে সেই অভিচারের পরও বাঙলা-বিহারে অসাধারণ গ্রামীণ লাখো পাঠশালা সযত্নে লালন-পালন করতেন ১৮০০ পর্যন্ত এই শিক্ষা ব্যবস্থার জেরে বাঙলার অর্থনীতি ছিল উদ্বৃত্ত প্রযুক্তিতে স্বাবলম্বী গ্রাম সমাজে বিদেশি পণ্যের, শিক্ষার চাহিদা ছিলনা তখনও(এবং আজও অনেকটা) গ্রামীণ জনগণ ছিলেন স্বদেশি উত্পাদনের পাশে
বাঙলা কতটা সম্পদশালী ছিল সে তথ্যটাও বিচার করা যাক রিচার্ড স্টিভেনসন, বেঙ্গল টাইগার এন্ড ব্রিটিশ লায়ন, এন একাউন্ট অব দ্য বেঙ্গল ফেমিন ১৯৪৩ বইতে এক অত্যাশ্চর্য তথ্যসূত্র উপস্থিত করছেন যে তথ্যে সে সময়ের সরকারি রোজগারের গুপ্তদ্বার খুলে যায় ১৮৭০-৭১এর অবিভক্ত ২৪ পরগণা জেলার প্রশাসনিক আয় ব্যায়ের এক আপাত নির্দোষ হিসেব দিচ্ছেন তিনি স্টিভেনসনের হিসেবে সে বছর ২৪ পরগণা থেকে ব্রিটিশ সরকারের আয় ৩,২১,৪৮৩ পাউন্ড মোট ব্যয় ৮৩,৫৭৩ পাউন্ড অর্থাত আয়-ব্যয়ের উদ্বৃত্ত খরচের প্রায় চারগুণ
আয়(পাউন্ডে)
খাজনা                 ১,৬৩,৭৩৬
অন্যান্য                 ৩,৬০২
আবগারি                ১৫,৪৪০
কর আদায়(এসেস ট্যাক্সেস)   ১০,৪০৮
স্টাম্প                  ৫৭,১৪১
ইন্টারেস্ট অন ল চার্জেস      ২,৪৪৮
টোল, ফেরি থেকে আদায়     ৪১,৮৯০
জেলের উতপাদন          ১৪,০৯৮
বিদ্যালয় বেতন           ১১,৭১০
মোট                  ৩,২১,৪৮৩

খরচ
কালেক্টর                ৩,১৪১
কনটিনজেন্সিজ            ২,০৮৩
গভর্মেন্ট এস্টেটস           ২,৯৯৭
আবগারি                ৭৩৪
এসেসড ট্যক্সেস            ১,৪৫৩
স্টাম্পস                 ১,৫২৪
কোর্ট                  ১০,৭৮৬
কমিনার                ৫,৪২২
টোল আদায়              ৫,৩০০
জেল লকআপ             ১৩,১৩২
শিক্ষা                  ১৮,৩৪৩
পুলিশ                  ১৭,৪৭৯
মোট ব্যয়               ৮৩,৫৭৩
৪০০ শতাংশের কাছাকাছি উদ্বৃত্ত আয় এমন এক জেলা থেকে, যে জেলায় ব্রিটিশ লব্জে শিল্পে যথেষ্ট পশ্চাদপদ(যদিও সে সময় ব্রিটিশ-মধ্যবিত্ত বাঙালি চক্রান্তে শিল্পক্ষেত্রে, সমগ্র ভারতেরই ২৪ পরগণা জেলার অবস্থা) এই জেলায় এমন কোনও বড় শিল্পও নেই যেখান থেকে কর বসিয়ে রাষ্টায়ত্ব ভারত থেকে বিপুল অর্থ রোজগার হতে পারে শিল্প আর ব্যবসা নেই এমন এক জেলা কর আদায় থেকে ব্রিটিশ রাষ্ট্রের চতুর্গুণ রোজগার হতে পারে, তাহলে তার আগের এক শতাব্দ ধরে সরা ভারত থেকে কত অর্থ সে দেশে নিয়ে গিয়েছে সে অঙ্ক আজও কষা হয় নি যে আয় ব্যয়ের বছরটির হিসেব স্টিভেনসন দিচ্ছেন তার আগের ১২৫ বছর ধরে বাঙলা ক্লাইভ, হেস্টিংস অথবা কর্নওয়ালিসেরদের লুঠেরা সময় পেরিয়েছে একে একে শিল্প পরিকাঠোমো ধংস দেখেছে শিরদাঁড়া ভেঙে দেওয়া তিন কোটি মানুষের মৃত্যু উপত্যকা ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের চিরকালীন ক্ষতি শরীরে ফুটে রয়েছে দগদগে ঘাএর মত বিশ্ব মানচিত্রে বাঙলা রিক্ত নিঃস্ব এক প্রদেশ
Post a Comment