Wednesday, August 15, 2012

বাঙলায় উপেক্ষিত এক শিক্ষা সমীক্ষা৫


পাঠশালার শিক্ষাদান পদ্ধতি
এডাম তাঁর সমীক্ষায় পাঁচটি জেলায় নানান বিষয়ে তথ্য গ্রহণ করেন ১) বুনিয়াদি পাঠাশালা আর পড়ুয়েদের জাত বিভাগ, ২) আগেরগুলির সঙ্গে গুরুমশাইদের জাত বিভাগ, ৩) কী ধরনের পাঠদানব্যবস্থা ছিল, ৪) সংস্কৃত শিক্ষার অবস্থা কী ছিল, ৫) সংস্কৃত শিক্ষায় কী ধরনের বই ব্যবহৃত হত, ৬) পারসিক আর আরবি উচ্চ পাঠশালাগুলির বিশদ ৭) এই উচ্চ পাঠশালাগুলোতে কী ধরনের পড়ানোর মাধ্যম ব্যবহার হত ইত্যাদি
পাঠশালাগুলি নিয়ে এডাম কী বলছেন একটু শুনি বাংলা আর বিহার মিলিয়ে, ১,৫০,৭৭৪টি গ্রামে এক লাখেরও বেশি পাঠশালা রয়েছে সবকটি গ্রামে না থাকলেও অধিকাংশতেই পাঠশালা বিদ্যমান কোনো কোনো গ্রামে ছটাও পাঠশালার খবর পাওয়া যাচ্ছে পাঠশালাগুলির উপযোগিতা নিয়ে এডামের বক্তব্য, It is not, however, in the present state of these schools, that they can be regarded as valuable instruments for this purpose. The benefits resulting from them are but small, owing partly to the incompetency of the instructors, and partly to the early age at which through the poverty of the parents the children are removed.
পাঠদান শুরু হত পাঁচ বা ছ বছরে এই বুনিয়াদি শিক্ষাদান চলত পাঁচ বছর ধরে পড়ুয়েদের দেয় অর্থের ওপরেই গুরুমশাইদের দিনগুজরান হত নিজেদের রোজগার বাড়াবার জন্য গুরুমশাইরা প্রতিবেশী অঞ্চল থেকে সম্মানীয় বা অর্থবান পরিবারের পড়ুয়ে ভর্তি করত স্বরবর্ণ শিক্ষা সমাপ্ত হলে ব্যাঞ্জনবর্ণ শিক্ষাদান হত মাটিতে বালি লেপে তার ওপরে আঙুল অথবা লাঠি দিয়ে এই বর্ণগুলি মকশ করা হত এরপর মাটিতে সাদা লাঠি দিয়ে ফুটিয়ে তোলাহত বর্ণগুলোর চেহারা এই পাঠটি চলত আট থেকে দশদিন পর্যন্ত এরপর লাল রঙএ খাগের কলম তালুতে (স্পষ্ট বলছেন আঙুলে নয়) ধরে সেটি তালপাতার ওপর কালোরঙএর ভুসো কালিতে চুবিয়ে, স্বরবর্ণের সঙ্গে ব্যাঞ্জন বর্ণের মিলন, যুক্তবর্ণ, স্বরভক্তি (সিলেবল), শব্দ শিখতে হত নিউমারেশন, টাকা, ওজন(ওয়েটস এন্ড মেজার্স) আর বিভিন্ন ব্যক্তি, জাতি, ও স্থানের নাম সঠিকবর্ণে সঠিকভাবে লেখা শেখানো হত চলত এক বছর ধরে এরপর উচ্চতর পাঠদান বাতির কালোশিষ ধরে কলাপাতায় শেখানো হত সাধারণ যোগ বিয়োগ গুণ ভাগ এরপর সরল জমি, বাণিজ্য ও কৃষিকাজের জন্য পাটিগণিত গ্রামের পাঠশালাগুলিতে কৃষি অঙ্ক করানো হত শহরের বাণিজ্যের দিকগুলি নিয়ে অঙ্ক শেখানো হত তিনি বলছেন পড়ুয়েদের নীতি শিক্ষা দেওয়ার জন্য কোনো বিদ্যালয়েই পাঠ্যপুস্তকের প্রচলন ছিলনা তাঁর মতে এর ফলে পড়ুয়েদের নীতিশিক্ষা হত না
হিন্দু সামাজিক নীতি অনুযায়ী পড়ুয়েদের পাঠশালায় প্রবেশের বয়স ছিল পাঁচ বছর পাঁচবছরে না হলে, সাত বা নয়, বিজোড় বছরে পাঠ শুরু হত বছরের এক নির্দিষ্ট মাস, মাসের এর নির্দিষ্ট সপ্তাহ আর সপ্তাহের এক নির্দিষ্ট দিনে ছাত্রদের পাঠদানপ্রক্রিয়া শুরু হত এই দিনে পরিবারের পুরোহিত, দেবী সরস্বতীর পুজো দিয়েই ছাত্রের হাত ধরে বর্ণের ওপর মকশ করিয়ে সেগুলি উচ্চারণ করতে বলতেন তবে প্রত্যেক হিন্দুই যে এ ধরণের পুজো-অর্চনা পালন করত তা বলা যায় না, বলছেন এডাম যাদের বিশেষরূপে পাঠদানের সামর্থ রয়েছে, একমাত্র তারাই এ ধরনের পুজার্চনা করে, পরেরদিন থেকেই সন্তানকে বিদ্যালয়ে পাঠাতেন তবে রাজসাহীতে ভর্তির নির্দিষ্ট বয়স দেখেননি এডাম ছাত্রের পাঠ গ্রহণ ক্ষমতা অথবা পরিবারের আর্থিক সামর্থের ওপরেই নির্ভর করত পাঠশালায় প্রবেশের বয়স তবে কোন বয়সে পাঠগ্রহন শুরু করছে, তার ওপরেই নির্ভর করত ছাড়া পাওয়ার সময় তিনি নাটোরএর ১৭৬টি পাঠশালার উল্লেখ করছেন সেখানে পাঠশালায় প্রবেশর বয়স পাঁচ থেকে শুরু করে দশ বছর পর্যন্ত ছিল শিক্ষকে শিক্ষকে পাঠদানের সময়সীমা বদলাত পাঁচ থেকে দশ বছর
শিক্ষকেরা তরুণ থেকে প্রবীণ পর্যন্ত হতেন যে অঞ্চলে তাঁরা পাঠদান করেন সেই অঞ্চলে তাঁদের সম্মান ছিল অপরিমিত এডামের মতে তাঁরা সরল, সধারণ, অজ্ঞ (ইগনোরেন্ট) এবং গরীব তাই অন্য কোনো পেশায় প্রবেশের সুযোগ থাকত না শিক্ষকেরা অনেকেই জানতেন না কী গুরুত্বপূর্ণ কাজ তাঁরা করছেন যে কাজ করছেন, তার পেছেনে তাদের খুব একটা ভাবনা-চিন্তাও ছিল না পড়ুয়েদের ওপরে প্রভাবও বেশি হত না গুরুমশাইদের সম্বন্ধে তিনি খুব একটা উচ্চধারণা পোষণ করতেন না, তা তাঁর প্রতিবেদন থেকেই স্পষ্ট
গুরুমশাইদের সাম্মানিক আসত বিভিন্ন সূত্রে দুজন গুরুমশাই তাঁদের সমগ্র আর অন্যরা সাম্মানিকটুকুর একাংশ পেতেন গ্রামের কোনো সহৃদয় দানশীল ব্যক্তির থেকে এক চতুর্থাংশের সাম্মানিক আসত পড়ুয়েদের দেয় অর্থ থেকে অন্যান্যদের সাম্মানিক আসত কিছুটা অর্থ আর কিছুটা পণ্যদ্রব্যের বিনিময়ে
সাধারণ ভাবে তিনটিস্তরে পড়াবার মাধ্যমের বিস্তৃতি ছিল, প্রথমটি মাটি, তালপাতা, শেষ মাধ্যম ছিল কাগজ প্রত্যেক স্তরে পাঠাদানের শুরু থেকে আরও একটু বেশি মাইনে ধার্য হত কোথাও কোথাও প্রথম আর দ্বিতীয়স্তর একটিস্তর হিসেবেই দেখা হত কোথাও কোথাও দ্বিতীয় আর তৃতীয়স্তরে একই মাইনে দাবি করা হত কোথাও আবার প্রত্যক স্তরের জন্য একই অর্থের মাইনে ছিল তবে সাধারণঃ প্রত্যেকস্তরের জন্য আলাদা আলাদা পরিমান অর্থই দাবি করা হত আবার পড়ুয়েদের পরিবারের স্বচ্ছলতার ওপর নির্ভর করত মাইনে অর্থবানদের তুলনায় গরীব পড়ুয়েদের কখোনো অর্ধেক, কোথাও একচতুর্থাংশ, কোথাও আবার একতৃতীয়াংশ অর্থ মাইনে হিসেবে নেওয়া হত
গুরুদের মাইনে মাসে চার আনা থেকে শুরু করে পাঁচ টাকা পর্যন্ত হত(১৮২০র দিকে ঈশ্বরচন্দ্রের পিতা ঠাকুরদাস কলকাতায় মাসে দুটাকা রোজগার করেই স্বচ্ছল বোধ করলেন) যারা কম অর্থ পেতেন তাদের কাপড় দেওয়া হত চাষীদের কাছ থেকে চাষের জিনিষও পেতেন কেউ হয়ত শুধুই প্রতিদিনকার খাদ্য পেতেন, কেউবা এর সঙ্গে পরিধেয় ধোয়া, অথবা তাঁর সমস্ত খরচপাতিও পেতেন যিনি খাদ্যপেতেন তাঁর হয় নিজের বাসস্থান থাকত অথবা গ্রামের অবস্থাপন্ন ব্যক্তির ভদ্রাসনে থাকতেন সামগ্রিকভাবে শুধু আর্থিক অথবা কিছুটা আর্থিক আর কিছুটা অন্যান্যভাবে যাঁরা রোজগার করতেন, তাঁদের প্রত্যেক মাসের রোজগার ছিল তিনটাকা আটআনা থেকে সাত টাকা আট আনা পর্যন্ত, গড়ে পাঁচটাকার বেশি সকলেই রোজগার করতেন
ধারাইলের এক বিদ্যালয়ের কথা উল্লেখ করেছেন এই গ্রামে চৌধুরিদের চারটি পরিবার বাস করত এরাই গ্রামের সম্ভ্রান্ত কিন্তু এদের আর্থিক অবস্থা এত ভাল ছিলনা, যে অন্যান্যদের সাহায্য ছাড়াই গুরুমশাই নিয়োগ করতে পারেন এরা বাড়ির এক অংশে গুরুমশাইএর থাকার ব্যবস্থা করেন, যেখানে পড়ুয়েরা পড়াশোনাও করত এই স্থানটি পুজোর জন্যও ব্যবহার হত আবার অতিথি নিবাসও ছিল দুটি পরিবার চারআনাকরে, তৃতীয় পরিবার আটআনা আর চতুর্থজন বারো আনা গুরুমশাইকে দিতেন এর বাইরে তাঁরা আর কোনো কিছুই দিতেন না এই অর্থে পাঁচটি পড়ুয়ে বাঙলা ভাষায় শিক্ষা পেত কিন্ত এই অর্থে গুরুমশাইএর চলা মুশকিল ছিল, তাই তিনি অন্য পরিবার থেকে পড়ুয়ের ব্যবস্থা করতেন এক পড়ুয়ে দিত একআনা, একজন তিন আনা, পাঁচজন চার আনা করে গুরুমশাইকে মাসে সাম্মানিক দিত এর বাইরে নানান শষ্য, মাঠ, চাল আর কখোনো কখোনো কেউ রুমাল(গামছা!), ফতুয়ারমত(আপার গার্মেন্ট) নানান পরিধেয়ও দিত কাগবাড়িয়ার দুটি পরিবারের পাঁচটি পড়ুয়ে ধারাইল পাঠশালায় পাঠ নিত এই দুই গ্রামের মধ্যে প্রায় এক মাইলের পার্থক্য
তিনি গুরুমশাইদের পাওয়া মাইনের সঙ্গে গ্রামের প্রায় একই স্তরের কাজ করা মানুষের রোজগারের বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন স্থানীয় জমিদারদের নানান কাজে যারা নিযুক্ত হতেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন পাটওয়ারি, আমিন, শুমারনাভি আর খামারনভিস পাটওয়ারির কাজ ছিল বাড়ি বাড়ি গিয়ে জমিদারদের খাজনা উশুল করা মাইনে পেতেন দুটাকা আট আনা সঙ্গে রায়তদের কাছথেকে শষ্য উঠলে বেশ কিছু জিনিষপত্তরও যার প্রায় মূল্য আট আনা সবে মিলিয়ে তিন টাকা আমিনদের কাজ ছিল জমিদারদের পক্ষে গ্রমের জমিজমার পরিমান মেপে বিবাদের সমাপ্তি ঘটাতেন তিনি পেতেন মাসে সাড়ে তিন টাকা থেকে চার টাকা শুমারনভিস পাটওয়ারিদের আদায়ের হিসেব রাখতেন, পেতেন পাঁচ টাকা প্রতি মাসে আর অনেক জমিদার জমির ফসল থেকেই যখন খাজনা আদায় করার জন্য খামারনভিস রাখতেন তারা অনেক কম অর্থ পেতেন জমিদারিতে যেসব আমলা কাজকরতেন তাদের অনেকেরই উপরি আয়ের সুযোগ থাকত, যে সুযোগটি এই গুরুমশাইদের ছিলনা
Post a Comment