Lokfolk লোকফোক forum of folk লোক tribal আদিবাসী culture সংস্কৃতি of West Bengal পশ্চিমবঙ্গ, বাংলা. LOKFOLK is Bengal বাংলা India's ভারতের traditional পারম্পরিক knowledge system জ্ঞানভাণ্ডার, history ইতিহাস, Indigenous technology প্রযুক্তি. We have two mass bodies গনসংগঠন Bongiyo Paromporik Kaaru O ও Bastro Shilpi Sangho; Bongiyo Paromporik Aavikaar Shilpi Sangho. Journal পত্রিকা, PARAM, পরম. Picture - KaaliKaach কালিকাচ, Dinajpur দিনাজপুর, Madhumangal মধুমঙ্গল Malakar মালাকার
Thursday, August 30, 2012
ম্যাক্সমুলর লিপজিগ বিশ্বিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট উপাধি পান নি, সাধারণ পরীক্ষাই দেন নি
সম্প্রতি কলাবতী মুদ্রা বাঙলার দ্বিতীয় ইতিহাস রচনা কালে জানতে পারে লিপজিগ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যাক্স মুলর যে ডক্টরেট উপাধি পেয়েছেন বলে তাঁর স্ত্রী আর পুত্র জানায়, সেগুলি মিথ্যা. কিন্তু উইকিপিডিয়াসহ নানান ওয়েবসাইটে এই তথ্য আজও প্রকাশিত.
>
> friederike.rohland@uni-leipzig.de
>
> <http://www.uni-leipzig.de> www.uni-leipzig.de
>
> Von: biswendu nanda [mailto:biswendu@yahoo.com]
> Gesendet: Dienstag, 28. August 2012 12:05
> An: friederike.rohland@uni-leipzig.de
> Betreff: Query from Indian Researcher
> Sir,
> I am a research scholar fromIndia ,
West Bengal , Kolkata.
> I am doing my research onBengal ,
India .
> It was quoted from various source noted Indologist Max Muller obtained his p.hd degree fromleipzig
university.
>> Some expressed doubt about the claim. one of them said he had not seen any record on max muller in the said university.
>> can you clear the doubt.
>> if max muller was the pupil of the said university, can you provide us any document of that!
>> it will not only assist my research work but create a flutter in the indian media also.
> expecting your reply soon,
>
> yours
>
> biswendu nanda
>> research scholar of Kalaboti Mudra Folk Research Team, West Bengal, India
>> --- Ende der weitergeleiteten Nachricht / End of forwarded message ---
>> Universität Leipzig
>> Institut für Indologie und Zentralasienwissenschaften
>> Schillerstraße 6
>> 04109 Leipzig
>> Tel.: 0341-9737120
>> Fax: 0341-9737148
>----------------------------------------------------------------
This message was sent using IMP, the Internet Messaging Program.
>
> friederike.rohland@uni-leipzig.de
>
> <http://www.uni-leipzig.de> www.uni-leipzig.de
>
> Von: biswendu nanda [mailto:biswendu@yahoo.com]
> Gesendet: Dienstag, 28. August 2012 12:05
> An: friederike.rohland@uni-leipzig.de
> Betreff: Query from Indian Researcher
> Sir,
> I am a research scholar from
> I am doing my research on
> It was quoted from various source noted Indologist Max Muller obtained his p.hd degree from
>> Some expressed doubt about the claim. one of them said he had not seen any record on max muller in the said university.
>> can you clear the doubt.
>> if max muller was the pupil of the said university, can you provide us any document of that!
>> it will not only assist my research work but create a flutter in the indian media also.
> expecting your reply soon,
>
> yours
>
> biswendu nanda
>> research scholar of Kalaboti Mudra Folk Research Team, West Bengal, India
>> --- Ende der weitergeleiteten Nachricht / End of forwarded message ---
>> Universität Leipzig
>> Institut für Indologie und Zentralasienwissenschaften
>> Schillerstraße 6
>> 04109 Leipzig
>> Tel.: 0341-9737120
>> Fax: 0341-9737148
>----------------------------------------------------------------
This message was sent using IMP, the Internet Messaging Program.
লেবেলসমূহ:
leipzig university,
Max Muller,
ম্যাক্স মুলার,
লিপজিগ বিশ্ববিদ্যালয়
Friday, August 24, 2012
ব্রিটিশ পূর্ব সমাজে সাধারণ জীবন এবং চেঙ্গলপট্টু সমীক্ষা৩
ছাগল,
গরু আর ভেড়ার মোট সংখ্যা
গরু ৯৪৬৮৫
মহিষ ৫৪১৭
ছাগল ১৪৯৩১
ভেড়া ১৪৯৭০
বকনা(বুলক) ৫৯৫৫০
১৭৪৮
থেকে ১৭৭০ পর্যন্ত দক্ষিণ ভারত জুড়ে যুদ্ধ, লুঠ আর অবাধে হত্যাকান্ড চলেছে(ঠিক
যেন ১৭৫৭র পরের বাঙলা). বছর কুড়ি আগে হয়ত এই সংখ্যাটি অনেক বেশি ছিল.
১৫৪৪টি
এলাকায় মোট গৃহস্থের(হাউসহোল্ড) সংখ্যা
মোট
গৃহস্থ ৬২৫২৯
কৃষক
আর পশুপালক ৩৩৯৬৩
ভেলালা ৭৪১১
পলি ৯৬৯৩
পারিয়ার ১১০৫২
রেড্ডি ১৪১৭
কাম্মাওয়ার ১০০৫
কাউকিপার্স ২৫৭৩
শানার ৮১২
তাঁতি ৪০১১
!! ৮৫
কটন
রিফাইনার্স ৫৩৬
কার্পেন্টার্স ৩৯৪
কামার ৪৫
!! ২০৯
আর্টিফিসার্স(দক্ষ
শ্রমিক, দক্ষ সেনানীও হয়) ৬৩৭
সোনা
রূপোর গয়না তৈরির স্যাকরা ৩৮৯
কাঠুরে ৫৯৬
নুন
তৈরি করেন যারা ৩৯
জেলে ৫৯০
মুচি ৭৮
পাথর
কাটাই ৮৯
অন্যান্য(প্রায়) ৫০০
মোট
৪৩১২
ব্যবসায়ী,
শ্রফ
চেট্টি ২০৫১
অন্য
ব্যবসায়ী ১৮৩৯
শ্রফ ৪২২
আপতকালীন
সেবা ১৬৮৫
নাপিত ৬৬৪
ধোপা ৮৬২
বৈদ্য Medicalmen ১৫৯
পন্ডিত, উচ্চ পাঠদানেরত, অভিকর শিল্পী, সংস্কৃতি
ব্রাহ্মণ ৬৬৪৬
পান্ডারাম ১০৫৪
দেবদাসী ৬২২
ভাল্লুভন Valluvans ১৩৭
Wochuns ১৭৩
বাদ্যকর ২৭
কুটাডি(অভিকর শিল্পী, মঞ্চে অভিনয়কারী) ২৫
প্রশাসন,
পুলিস ২৬৮১
কলক্কাপিল্লাই(নথিরক্ষক,
হিসাবরক্ষক) ১৬৬০
Panisevans ৩১৪
Taliars ৭০৭
সেনা
Militia System ১৪৭৯
মুসলমান ৭৩৩
মুর ৬৭১
ফকির ৬২
অন্যান্য ৭৪৮
মান্যম
থেকে যা কর আদায়হত, তার বাইরেও মোট কৃষি জমি থেকে যে কর উঠত তারও এক অংশ বিভিন্ন
সংঘ(সংঘের নিজের সদস্য সংঘ অথবা ব্যক্তির মধ্যে), ব্যক্তিতে বন্টিত হত এমনকী যারা
কৃষির সঙ্গে যুক্ত নন যেমন ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী অথবা শিল্পও পেত হয়ত. মোট কৃষি
উত্পাদনের ২৫ শতাংশ প্রথম চাষ করা চাষী থেকে স্থানীয় মন্দির পর্যন্ত পেত.
চেঙ্গলপট্টুতে এই অংশ ছিল মোট জেলার কৃষি উত্পাদনের ২৭ শতাংশের আশেপাশে. নিচের
তালিকা তৈরি হয়েছে ১৪৫৮টি এলাকার কালামের হিসেবে. এক কালাম সমান ১২৫ কিলোরমত.
মোট
কৃষি উত্পাদন ১৪৭৯৬৪৬
মোট
বরাদ্দ ৩৯৪৯৫০
সংঘ
আর Occupations ২৬৪৮২৪
স্থানীয় কোভিল- মন্দির, স্রাইন ১৩৮৮২
পান্ডারাম, দেবদাসী, জ্যোতির্বিদ ১৮৫০৩
চাষী, ভৃত্য ৮৭৫০৩
এদের মধ্যে অধিকাংশ পারিয়ার
সেচের বরাদ্দ ১৯৮০৬
ছুতোর আর কামার ১৯৪৭০
কুমোর ২৭৪৯
নাপিত ৬১৬৯
ধোপা ৬০৫৮
সবজি মাপক Corn measurers ১১৫৬১
শ্রফ(বিনিয়োগকারী) ৯৩৩২
কনক্কাপিলহিস ৩১৬২৪
পানিসেবন ৩১১০
টোট্টি ১৩৭১
Chief Inhabitants ৩১১৯৭
অন্যান্য ২৪৮৮
For outside
Institutions and Persons ১৩০১২৬
মঠম বা প্রধান কোভিব(উচ্চশিক্ষার জন্য)
স্কলার্স ২৫৩২১
প্রশাসন ৫৩৫৭২
পালায়াক্করন বা মিলিশিয়া ৪৫৯৩৬
ফকির, মসজিদ, দরগা ২৫১৮
অন্যান্য ২৭৭৯
নানান পাদটীকার মধ্যে ২২ নম্বরটিতে ধরমপালজী লিখছেন
The information in this section, and the information on
agricultural yields given above, is based on material written in English
pertaining to a survey of around 2,200 localities in the District of
Chengalpattu during the period 1767-1774. This material is held in the Tamil
Nadu State Archives in Madras .
Many more details relating to a number of these localities are still available
on palm leaf manuscripts now kept at the Tamil University
at Tanjore in Tamil Nadu. A detailed analysis of this data is presently being
carried on under the auspices of the PPST Foundation and the Centre for Policy
Studies, Madras . সূত্রঃ http://ppstbulletins.blogspot.in/2011/10/europe-and-non-european-world-since.html
লেবেলসমূহ:
Chengalpattu,
Dharampal,
Madras,
Pre-British,
Survey,
চেঙ্গলপট্টু,
ধরমপাল,
মাদ্রাজ,
সমীক্ষা
ব্রিটিশ পূর্ব সমাজে সাধারণ জীবন এবং চেঙ্গলপট্টু সমীক্ষা ২
চেঙ্গলপট্টু
জেলা সমীক্ষা
১৭৬৭ থেকে ১৭৮৪
পর্যন্ত চেঙ্গলপট্টুতে সমীক্ষা করে ব্রিটিশ কোম্পানি. সমীক্ষায় অনেক গন্ডগোল
রয়েছে, যেমন ১০০ কিমি সমুদ্র উপকূলে মাত্র ৩৯জন লবন কারিগর দেখানো হয়েছে. এমনও হতে
পারে এটি শুধু সুপারভাইজারদের সংখ্যা.
১৯১০টি এলাকা,
কানিতে জমির পরিমান, এক কানি সমান ০.৫ হেক্টরের একটু বেশি
মোট জমি ৭৭৯১৩২
পাহাড় আর নদীর জমি ৩৬০৯৯
পতিত ৮৪৯৭৩
সল্ট প্যান ৪১৯০
সেচের উত্স- হ্রদ, পুকুর ১,০০,৮০৬
কাঠ ১৩০৭৯০
টোক(গ্রুভস বা প্ল্যান্টেশন) ১৪০৫৫
বসবাসের জমি ২৪০৮৮
সেচের জমি কিন্ত অকর্ষিত(Uncultivated
irrigated land) ৫৮৬৬৭
অকর্ষিত, অসেচ(Uncultivated
unirrigated land) ৫০৬৬২
সেচ, কর্ষিত(Cultivated
irrigated) ১৮২১৭২
চাষের
জমি কিন্তু অসেচ ৮৮০৬৯
মোট
চাষযোগ্য জমির এক বড় অংশের নাম ছিল মান্যম(বাঙলায় চকেরান অথবা বাজি বা বাজে(কোনটা
ঠিক উচ্চারণ)!(Bazee) জমিন সম্বন্ধে ইন্ডিয়া অর ফ্যাক্টস সাবমিটেড টু
ইলাস্ট্রেট দ্যা ক্যারেক্টার এন্ড কনডিশন অব দ্য নেটিভ ইনহ্যাবিট্যান্টস,
দ্বিতীয় খন্ডে রিচার্ড রিকার্ডস এস্কোয়ার বলছেন সানড্রি অর মিসলেনিয়াস ল্যান্ড,
দ্য টার্ম এজ পার্টিকুলারলি এপ্লায়েড টু সাজ ল্যান্ডস এজ আর এক্সেম্পট ফ্রম
পেমেন্ট অব পাবলিক রেভিনিউ, অর ভেরি লাইটলি রেন্টেড, নট অনলি সাচ এজ আর হেল্ড বাই
ব্রাহ্মিনস অব এপয়েন্টেড টু দ্য সাপোর্ট অব প্লেসেস অব ওয়ারশিপ এন্ড বাট অলসো টু
দ্য ল্যান্ডস হেল্ড বাই দ্য অফিসার্স অব গভর্মেন্ট, সাচ এজ জমিনদারস, কানুনগোজ,
পাটওয়ারিজ. চকেরান জমি বিষয়ে তিনি লিখছেন, ল্যান্ডস এলটেড ফর দ্য মেনটেনেন্স অব
পাবলিক সার্ভেন্টস অব অল ডমিনেশনস, ফ্রম জমিনদার ডাউন টু দোজ অব ভিলেজ
এসটাবলিশমেন্টস). এই মান্যম জমির করে ব্যক্তি এবং সংগঠণের প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক,
সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানসব হত. ১৭৭০ সালে চেঙ্গলপট্টুতে ৪৪০৫৭ সেচযুক্ত জমি
আর ২২৬৮৪ অসেচ জমি ছিল. শুধু দক্ষিণেই নয়, উত্তরভারতেও ১০-১২ শতাব্দে কৃষি জমির
অর্ধেক মান্যমের জন্য বরাদ্দ ছিল. একজেলাতেই অন্ততঃ কয়েক হাজার সংঘ আর ব্যক্তি এই
মান্যম জমির অধিকারী ছিলেন. ১৭০০এ বাঙলার শুধু একটি জেলায় ৭০,০০০ মান্যম বরাদ্দ ছিল
ব্যক্তি অথবা সংঘের জন্য.
লেবেলসমূহ:
Chengalpattu,
Dharampal,
Madras,
Pre-British,
Survey,
চেঙ্গলপট্টু,
ধরমপাল,
মাদ্রাজ,
সমীক্ষা
ব্রিটিশ পূর্ব সমাজে সাধারণ জীবন এবং চেঙ্গলপট্টু সমীক্ষা১
দক্ষিণ ভারতের বেশ কিছু মন্দির তৈরি হয়েছিল ষষ্ঠ শতকে.
মাদ্রাজের কাছে দশম শকতের উত্তিরামেয়ুর (Uttiramerur) মন্দির লিপির পাঠোদ্ধারে সেই এলাকার সামাজিক জীবনের একটা ছবি উঠে আসে.
সাধারণভাবে
ভারতবর্ষ ৪০০টি ছোট ভৌগোলিক এলাকায় বিভক্ত ছিল যার মধ্যে ১৫-২০টি প্রধাণ ভাষা
এলাকা. এই ৪০০টির প্রত্যেকটি জেলায় কাপড় বোনা হত. মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিতে ১৮১০র
পর্যন্ত Moturpha
আর Veesabuddy কর আদায়ের ব্রিটিশ তথ্য বলছে প্রত্যেক জেলায় ১০,০০০ থেকে
২০,০০০ হাতে চালানো তাঁত ছিল. সারা ভারতে ১০,০০০ ধাতু গলানো চুল্লিতে লোহা আর
মর্চেছাড়া ধাতু(ক্রুসিবল স্টিল)র জিনিস তৈরি হত. সারা বছরে ৪০ সপ্তাহ ধরে ২০ টন
উচ্চমানের লোহা তৈরি করতে পারত. এছাড়াও অন্যান্য ধাতু শিল্পী ছিল. খনিতে কাজ করার
মানুষ ছিল. পাথর তক্ষণ শিল্পী, ছবি আঁকার শিল্পী, বাড়ি তৈরির কারিগর ছিল. চিনি, নুন
আর জনসংখ্যার অনুপাতে তেল তৈরির কারিগরের সংখ্যা ছিল ১শতাংশ. যাকে আমরা হস্তশিল্প
বলছি এবং ততসহ কারখানায় নিযুক্ত ছিলেন ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ মানুষ. এছাড়াও সুতো
কাটারও অনিয়মিত প্রচুর কারিগর ছিল. আট ঘন্টা তাঁত চালাতে প্রয়োজন অন্ততঃ ২৫ ঘন্টার
সুতো কাটার কাজ করা. মোট গৃহস্থদের তুলনায় ৫ শতাংশ যদি তাঁতি হয়, তাহলে ভারতের
প্রত্যেকটি বাড়িতে সারা বছরই সুতো কাটাতে হত. মূল স্বাস্থ্যবিধান গ্রামেই হত.
১৮০০ সাল পর্যন্ত সাধারণ প্লাসটিক সার্জারি জলভাত ছিল. টিকা দেওয়াও খুব সাধারণ
রেওয়াজ ছিল. এলাহাবাদেরমত গরমতম স্থানেও বরফ তৈরি করার চলতি প্রযুক্তি সাধারণের
মধ্যে ছিল. দক্ষিণ আর পূর্ব ভারত থেকে সিড ড্রিল ব্রিটেনে পাঠানো হয় গবেষণার জন্য.
মাদ্রাজের এগমোরে এন্ড্রু বেলের নথি করা বেল পদ্ধতি বিশ্ব শিক্ষাব্যবস্থায় প্রভূত
প্রভাব ফেলেছে. ১৮০০ পর্যন্ত ব্রিটেনে শিশুদের পড়ানোর সার্বজনীক ব্যবস্থা ছিল না.
অনেকেই কৃষি, পশুপালনের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও কৃষির অনুষঙ্গ প্রচুর শিল্পের সঙ্গে
জড়িয়ে ছিলেন বহু মানুষ. সে সময়ের সেচ, বীজ বোনা, হাল দেওয়া, ঝাড়াই মাড়াই,
বীজের সংরক্ষণ আর সংকর করা ইত্যাদি নানান বিষয়ে প্রচুর আলেচনা নথিকরণ হয়েছে. ১৮০৩
সালে এলাহাবাদ বারানসী এলাকার কৃষি উত্পাদনে সঙ্গে ব্রিটেনের তুলনা করা হয়. ভারতের
উত্পাদন দেখা যায় অন্ততঃ দুই থেকে আড়াই গুণ বেশি. বেলারি আর কুডাপ্পার জেলার ১৮০৬টি
এলাকার বিশদ বিবরণে পাই, সমগ্র জনগণকে তিনভাগে ভাগ করা হয়, উচ্চ(২৫৯৫৬৮ জন) মধ্য(৩৭২৮৮৭)
ও নিম্ন শ্রেণীর(২১৮৬৮৪). অর্থ মূল্যে সারা বছরের consumption expenditure অনুপাত
ছিল ৬৯, ৩৭, ৩০. ঘি আর তেলের অনুপাত ছিল ৩, ১, ১ আর পালসেস ছিল ৪, ৪, ৩.
লেবেলসমূহ:
Chengalpattu,
Dharampal,
Madras,
Pre-British,
Survey,
চেঙ্গলপট্টু,
ধরমপাল,
মাদ্রাজ,
সমীক্ষা
Monday, August 20, 2012
বিদেশিদের ভাবনায় ভারতীয় দেবদেবী আর ধর্ম
১৭৫৭র ঠিক পর পরই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দেশিয় ঐতিহ্যকে ভারতের মাটি থেকে
ধুয়ে ফেলতে উদ্যেগী হয়ে উঠল। ইসলামি আমলে যে উদ্যম নিতে ভয় পেত সামন্ততন্ত্রর প্রতিভূ মোঘল সম্রাট,
রাজসভার বুদ্ধিজীবিরা, সেই কাজগুলি চোখের পলক না ফেলে সুচারু রূপে অবলীলায় সমাধা
করেছে গণতন্ত্রের ধুয়াধরা ইংরেজ প্রশাসক, ভারতীয় বুদ্ধিজীবি আর বিদেশি
ধর্মপ্রচারকেরা।
কোম্পানির আমলারা, পোষা বুদ্ধিজীবিরা এদেশের নানান ধরণের ধর্মাচারণকে হিন্দুত্ব ঘোষণা করে। দেশের নানান ধর্মাচরণকে একদেহী হিন্দুধর্মরূপে দেগে দিল তারা। বলল ভারতীয় হিন্দুধর্ম অনৈতিক এবং জরাজীর্ণ। আজও শিক্ষিত ভারতীয়দের বিশ্বাস, ইংরেজ বুদ্ধিজীবি, আমলা, প্রশাসকেরা ভারতীয় ধর্মের সতীদাহ অথবা বাল্য বিবাহেরমত নানান তথাকথিত জরাজীর্ণ কুআচারে মনেপ্রাণে ব্যথিত হয়ে ভারতীয় ধর্মের সংস্কারকর্ম গ্রহণ করে। সেই বিশ্বাসেই রামমোহন রায় ধর্মকে জঞ্জালমুক্ত করতে এগিয়ে এলেন। ইওরোপের অনুসরণে ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের জন্ম হল ভারতে।
দ্বিতীয়তঃ ভারতীয়দের আচরণীয় সংস্কার, সংস্কৃতিকে ব্রিটিশরা মিথ্যা ধর্মরূপে দেগে দিয়ে ভারতীয় ধর্মগুলিকেকে জরাজীর্ণ, মিথ্যারূপে প্রমাণ করা। তাহলে ব্রিটিশদের গুরুঠাকুর ঠাওরানো শহুরে ব্যবসা-চাকুরিকেন্দ্রিক মধ্যবিত্তরা নিজেরাই নিজেদের সমাজ ভাঙতে উদ্যোগী হয়ে উঠবে। এর জন্য বিদেশি ব্রিটিশদের সরাসরি ভারত সমাজভাঙার উদ্যমের প্রয়োজন হবে না। ক্ষুব্ধ ভারতীয়রাও ব্রিটিশদের সরাসরি দোষী ঠাওরাতে পারবে না। এই সমাজ ভাঙার পোষাকি নাম হল সংস্কার আন্দোলন অথবা নবজাগরণ।
বলাহল, কিছু মানুষের উন্মার্গগামীতায় এমন ঘটছে। আর হিন্দু ধর্মর মূলেই গলদ রয়েছে। ভারতীয়দের সত্য ধর্ম, খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করাই শ্রেয়। কিন্তু অন্যান্য মহাদেশেরমত খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করতে ভারতীয়রা হামলে পড়ল না। তাই শহুরে ভারতীয়দের বিশ্বাস করালে হল হিন্দুধর্মটাই মিথ্যা ধর্ম। অসুবিধে হল, ভারতীদের মানসিকতায় মিথ্যা ধর্ম নামক কোনও শব্দবন্ধের ধারণা নেই। তাতে কী! ব্রিটিশ পিরেরা বলেছেন। বিশদ না জেনেই নবজাগরণের অগ্রদূতেরা দাসত্ব প্রকল্প সামিল হলেন।
দীর্ঘ দুই শতাব্দ পেরিয়ে এসে আজ এই বিষয়টিকে নিয়ে বিশদ আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। যে তাত্বিকতায় ব্রিটিশেরা ধর্ম সংস্কারে উদ্যমী হয়েছিলেন, সেই ধারণাটির মূলে যাওয়া আজ অন্ততঃ প্রয়োজন। ভারতের রিফর্মিস্ট অথবা ধর্ম-সংস্কার আন্দোলন আলোচনায় ব্রিটিশদের ধর্ম বিষয়ক চিন্তাভাবনা না বুঝে নিলে, ভারতীয় ধর্ম সংস্কারের তাত্বিক দিকটি পরিষ্কার হবে না। প্রথম থেকেই কিন্তু রিফর্মিস্ট আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণ ছিল ইংরেজদের হাতে।
ধর্মের অন্যতম উদ্দেশ্য ভগবান পুজন। সেমেটিক ধর্মের অনুসরণকারীরা মনেকরে ভাগবানের সত্যিকারের আরাধনার পথজুড়ে আড় হয়ে রয়েছে শয়তান যার বাইবেলিয় নাম সাটান অথবা ডেভিল। শয়তান মানুষকে প্ররোচিত করেচলেছে আরাধনা থেকে সরে আসাতে। খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বীদের হাতেপড়ে এই মানুষেরা শুধুই খ্রিষ্ট ধর্ম অথবা সেমেটিক ধর্মের অনুগামী থাকলেন না। ধরে নেওয়া হল, বিশ্বের সকল মানুষকেই নানান নামে শয়তান(শয়তানের অনুসরণকারীরা লেজিয়ঁ (legion) নামে পরিচিত) পথভ্রষ্ট করে অজ্ঞাণী, অবোধদের নানান ভগবান পুজন করাচ্ছে। আদতে একমেবদ্বিতীয়ম ভাগবান ছাড়া সব পুজ্য ভগবানই আদতে শয়তানের রূপ। কিন্তু গড ছাড়া সবই মিথ্যা ভগবান।
এই ঘৃণ্যকাজে মানুষদেরই একাংশ শয়তানের সাহায্যকারীরূপে অবতীর্ণ– এই সাহায্যকারীরা যাজক সম্প্রদায়। যাজক অথবা পুরোহিতেরা নানান ধরণের আচার আচরণ, জাদুটোনা প্রয়োগ করে ধর্মানুগামীদের পথ ভোলায়। ভগবানের মৌলিক বাণীগুলিকে জনগণের সামনে আবৃত করে রাখে। ফলে অবোধ সাধারণ মানুষ, শয়তান এবং তার অনুগামীদেরই ভগবান ভেবে পুজো করে। এরাই মিথ্যা দেবতা। গড অথবা আল্লা অথবা জোহেবাই সত্য ভগবান। মিথ্যা ভাগবানের পুজন যে ধর্ম প্রচার করে তাই মিথ্যা ধর্ম।
মিথ্যা ধর্ম ভোলাভালা সাধারণ মানুষকে শয়তানের অনুগামী করে। মানুষকে নরকের পথে নিয়ে যায়। এই সমস্ত ধর্মকর্ম জাগতিকভাবে অনৈতিক। ভারতে ব্রিটিশরা বাল্যবিবাহ অথবা সতীদাহেরমত নানান প্রথা দেখেছিল। এতে হিন্দুধর্মের অনৈতিকতাও সরাসরি প্রমাণিত হল। ব্রিটিশরা বলল এই সব আচার আচরণের প্রচার প্রসার মৌলিক, আদি ধর্মের বিরুদ্ধে মতলবী পুরোহিতদের চক্রান্ত। পুরোহিতদের সঙ্গে ব্রাহ্মণদের এককরে দেওয়া হল।
সেমেটিক ধর্মের পালনকারীদের মনেই প্রশ্ন উঠল ভাগবানের নাম করে এই ভন্ড ভারতীয় পুরোহিতেরা কীভাবে ক্ষমতা অর্জন করেছে এবং সেই ক্ষমতা দখলে রেখেছে! ধাঁধার সহজ উত্তর পাওয়াগেল না। উত্তর তো পেতেই হবে। নইলে ভারতে ধর্ম-সংস্কার তত্ব টেঁকেনা। বলতেহল পুরোহিতদের ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে ভারতীয়দের অন্ধভাবে জাতপাত মানার মধ্যে। তাই পশ্চিমিদের কাছে জাতপাত প্রধাণতম খলনায়ক হয়ে উঠল। অসাধু পুরোহিতেরা অজ্ঞাত উপায়ে ভারতের সমাজে জাতপাতের এক জটিল রূপরেখা তৈরি করে। তারা আরও অব্যক্ত পদ্ধতিতে এই জটিলতায় অধিকাংশ অবোধ, অজ্ঞাণ, মূঢ় জনগণেশকে সামিল করেছে। জোর করে অনৈতিক চক্রান্তমূলক জাতপাতভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা চাপিয়ে দিয়েছে। কী করে এই চাপিয়ে দেওযার ঘটনা ব্রাহ্মণেরা ঘটাতে পারল, সে তথ্য সর্বশক্তিমান ব্রিটিশ প্রমাণ করে দেখাতে পারে নি। ছদ্মব্রিটিশ অনুগামী বহু বুদ্ধিজীবি তা প্রমাণ করে দেখাতে পারে নি। মনগড়া স্বতঃসিদ্ধ তত্ব বাজারে চলছে। এদের মধ্যে বামমনোভাবাপন্ন ঐতিহাসিকদের ভূমিকা অগ্রগণ্য।
পরবর্তীকালে এই খলনায়ক ব্রাহ্মণ যাজকদের বিরুদ্ধে বৌদ্ধধর্মকে দাঁড় করানো হল। গৌতমবুদ্ধ নিজে ব্রাহ্মণদের বিরুদ্ধে লড়ে নিজের ধর্ম প্রতিষ্ঠা করেছেন। এ রসাল তথ্যও সুপরিবেশিত হল। শুধু ভারতে নয়, বিশ্বজুড়েও। বুদ্ধ নাকী অধঃপতিত ব্রাহ্মণ্যধর্মের বিরুদ্ধে লড়েছেন, সেহেতু প্রটেস্টান্টদের চোখে বুদ্ধ হিন্দুধর্মের তুলনায় অনেক বেশি গ্রহনীয় হলেন। পশ্চিমি অনেক চিন্তবিদমানুষ বৌদ্ধধর্মে প্রভূত আস্থারাখেন। সব কটাকে ছেড়ে বেঁড়ে ব্যাটাকে ধরার প্রকল্পে ভারতীয় সমাজ-সংস্কৃতির সব ধরণের বিচ্যুতির সন্ধান চলল হিন্দুধর্মের অন্দরে। বলাহল, সমস্ত বিচ্যুতি হিন্দুধর্মেরই অঙ্গ বিশেষ।
এই আধুনিক প্রচারে বিন্দুমাত্রও নাড়ানো গেলনা ভারতীয় গ্রামীণদের। তাঁরা নিজেদের সমাজ সংস্কৃতি যতটুকু বাঁচাতে পেরেছে ব্রিটিশ অথবা অনুগামীদের লুঠ, অত্যাচার আর দাসত্ব প্রকল্পের হাত থেকে, তাই নিয়েই সুখী থাকল। নানান প্ররোচনা সত্বেও।
চক্রান্তকারী ব্রাহ্মণদের সঙ্গে, হিন্দুধর্মের বিরুদ্ধে শশব্যস্তে কলম ধরলেন প্রগতিশীল রামমোহন রায়। তাকে সামনে রেখে অনেকেই পথে নামল এমনকী মূর্তিপূজকেরাও। ১৮১৫র রামমোহনের মিথ্যধর্মবিষয়ক কলমবাজি ২০ বছর পর ব্যাবিংটন মেকলের মিনিট। ১৮৩৫এর উদ্ধত, অশ্লীলতম মিনিটের বিরুদ্ধে আজও রা কাড়তে শেনা যায়না আধুনিক ভারতবাসীর। সনাতন পরিবারের বিদ্যাসাগরও মাথা নোয়ালেন চাকরি-ব্যবসার সুরক্ষায়। আঠারেশ শতকের প্রথমদিকে এহেন ব্রিটিশ প্রচারে কলকাতার শহুরেমহল সাড়া দিল। শহরের প্রখ্যাতদের অনেকেই তথাকথিত হিঁদুয়ানি ছেড়ে খ্রিস্টধর্মে আস্থাপ্রকাশ করলেন। খ্রিস্ট ধর্মেও দীক্ষা নিলেন। ধর্মান্তরিত হওয়ার উত্তেজনা স্তিমিত হয়ে আসতে শুরু করল কয়েক বছরের মধ্যে। রামমোহনেরমত একদল ভারতীয় ধর্ম ত্যাগ করল না। ব্রিটিশের ধর্ম সমালোচনার উত্তরে অনৈতিক হিন্দুধর্মকে শুদ্ধ করতে ধর্ম-সংস্কারে বুক পেতে দিলেন। পুরোনো পরিশুদ্ধতম বেদ উপনিষদের ধর্মে ফিরে যেতে চাইলেন। বেদ উপনিষদে ধর্মের অবিসংবাদী প্রাচীণরূপ আবিষ্কৃার করলেন। নতুন ধর্মের উদ্ভব ঘটল।
আফ্রিকা অথবা আমেরিকারমত, গ্রামীণ ভারত ভারত খ্রিস্টধর্ম বরণ করে নি। তাই প্রোটেস্টান্ট খ্রিস্টধর্মেরমতকরে হিন্দুধর্মের সংস্কার শুরু হল। ইংরেজি শিক্ষিত ভারতীয়রা সংস্কার নিবেদন পেশ করল। উদ্দেশ্য অধঃপতিত হিন্দুধর্ম রিফর্ম করে খ্রিস্টধর্মেরমত সম্মানিত ধর্মে পরিণত করা! প্রোটেস্টান্ট খ্রিস্ট ধর্মের আদলে ব্রাহ্ম সমাজ, প্রার্থনা সমাজ, আর্য সমাজেরমত ধর্মপ্রচেষ্টা গড়ে উঠল। ভারতীয় ধর্মের তথাকথিত কুসংস্কারীয় আচার আচরণ দেখে মাননীয়রা মুর্চ্ছা না যান সে ব্যবস্থা করলেন অগ্রণী ভারতীয়রা। আদত উদ্দেশ্য ব্রিটিশ সমাজে কল্কে অর্জন।
প্রত্যেকটি সম্মানিত ধর্মরমতই হিন্দুধর্মের নতুনতম ধর্মগুলির নানান স্মৃতিশাস্ত্র গড়ে উঠল। পশ্চিমি শাস্ত্র অনুসারে কিছু পালনীয় আচার, আচরণ, সেবাধর্ম লিখে ফেলা হল। প্রটেস্টান্ট ধর্মের অনুসরণে প্রতিবেশীর প্রতি কতটা গড় শ্রদ্ধাপ্রকাশ করা যায় তারও কিছুকিছু নির্দেশাবলী তৈরি হল। প্রটেস্টান্ট ধর্মের আদলে হিন্দুধর্মকে সংস্কার করতে গিয়ে প্রাথমিকভাবে বর্বর জাতিপ্রথারমত নানান কর্মকান্ডও নাশ করার ব্যবস্থা হল। রামমোহন বললেন ভারতের আপামর সাধারণ মূঢ়, অজ্ঞ। আমজনগণ উচ্চমার্গের উপনিষদীয় ধর্মভাবনায় নিজেদের মেলাতে পারে না। কেননা যুগ যুগ ধরে তারা নানান কুসংস্কারের অতলে তলিয়ে রয়েছে।
ইংরেজি শিক্ষিতদের এই ধর্ম-সংস্কার, গ্রামীণ ভারতীয়দের তুচ্ছতাচ্ছিল্যের অর্থ আদতে ভারতীয় চিরাচরিত সংস্কৃতিকে মেনে না নেওয়ার। তাকে অধঃপাতিত, জরাজীর্ণ প্রমাণ করে তার সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যাওয়া। শহরকেন্দ্রিক ধর্মপালনের যুগের শুরু। এতথ্য যেন আমরা আজ মনে রাখি। এই সংক্রান্ত বিশদ আলোচনা তখন হয় নি। আজও হয় না।
আশ্চর্যের বিষয় হল, বিদেশিদের ছত্রছায়ায় থেকে, ভারতীয় গ্রামীণ, সংস্কৃতির প্রতি সরাসরি অশ্রদ্ধার প্রকাশের এই শহুরে প্রচেষ্টাকে পারম্পরিক ভারতবর্ষ সহজভাবে মনে নিয়েছে। এটাই সনাতন ভারতের মহত্ব। সেটাই নমনীয় ভারতের চিরাচরিত পালনীয় সংস্কৃতি। আর্য সমাজীদেরমত নতুন ধর্মাবলম্বীরা ততটাই ভারতীয় সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে উঠল, যতটাই ভারতের শৈব অথবা শাক্ত অথবা বৈষ্ণবমতাবলম্বীরা চিরাচরিতভাবে ছিলেন। সহস্র সহস্র বছর ধরে ভারতীয় সংস্কৃতিকে যে সব ধারা পুষ্ট করেছে, নবতম ধর্মমতাবলম্বী আর্য সমাজীরা সেই পথেরই অন্যতম অঙ্গ হয়ে উঠল। কোনও প্রশ্ন উঠলনা।
সামগ্রিকভাবে ব্রিটিশদের দেখানো পথে মহানতম ভারতীয়রা হাঁটতে স্বস্তিবোধ করেছে। ব্রিটিশেরা বলল সাধারণ গ্রামীণ ভারতীয় শাস্ত্র সম্বন্ধে প্রায় অজ্ঞ। তার উত্তরে সংস্কারপন্থীরা নানান শাস্ত্র পঠনে ফিরে গেলেন। ব্রিটিশেরা কুসংস্কারমূলক আচার আচরণের সমালোচনা শুরু করে। ভারতীয় সংস্কারপন্থীরা সে সবগুলি হয় সংস্কার অথবা প্রতিস্থাপিত করার উদ্যোগ নেয়। ব্রিটিশেরা মনে করল ভারতীয় ধর্ম অনৈতিক। সংস্কারপন্থীরা শাস্ত্র থেকে নিজেদের জন্য কয়েকটি অবশ্য মাননীয় নির্দেশাবলী খুঁটে তুলে ধরল ব্রিটিশষদের সামনে। দেখাল খ্রিস্টধর্মেরমতই হিন্দুধর্মও নৈতিকতা বিশিষ্ট হতে পারে। আদতে ব্রিটিশ নিজেরমত করে মন গড়া cতৈরি করেছে। প্রখ্যাত ভারতীয়রা সেই এজেন্দাকে ভগবান প্রেরিত ভেবে বাঁদর নেচেছেন। সেই কাণ্ড আজও ঘটে চলেছে। তারা আজও তাদের এজেন্দাতেই নেচে চলেছেন।
ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে। ধর্ম-সংস্কারবাদীরা ধর্ম সমালোচনার উত্তরে নিজেদের মানিয়ে নিতে চাইলেন। প্রটেস্টান্ট ব্রিটিশদেরমত করে একটি হিন্দুধর্ম তৈরি করার চেষ্টা করলেন। তারা ব্রিটিশ সংস্কৃতিকে বোঝার চেষ্টা করা করেনি, ভারতকেও বোঝেননি। প্রয়োজনছিল ব্রিটিশদের সমালোচনার উত্তর দেওয়ার জন্য নিজেদের তৈরি করা, দেশ, সমাজকে বোঝা। তারা কোনটাই করলেন না। মহাজনেরা ভাবলেন ব্রিটিশরা যে ভারত ধর্ম-সমালোচনা করছে সেটি যথপোযুক্ত। সেদিনের ইওরোপ, আজকের আমেরিকা ভারতের ধর্ম, সমাজ, সংস্কৃতি সম্বন্ধে যতটুকু বলে এসেছে, তাকেই ইংরেজি শিক্ষিত ভারতীয়রা বেদবাক্যরূপে গণ্য করেছে, সেই অনুযায়ী সমাজ আর দেশ বদলানোর চেষ্টা করেছেন। আজও ইংরেজি পড়া ভারতবাসী বিশ্বাস করে ভারতে জাতিপ্রথা অনৈতিক। সহস্রবছর ধরে ব্রাহ্মণেরা তথাকথিত দলিতদের দলিত করে রেখেছে। বৌদ্ধধর্ম আদতে আচার আচরণসর্বস্ব ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। আজও ভারতের বিদ্বতজনেরা পশ্চিমি এধরণেরতত্বে বিশ্বাস করেন।
ভারতের সরকারি সংরক্ষণ নীতি, দলিতদের বৌদ্ধধর্মে অথবা খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তর আদতে সেই তত্বেরপ্রতি মধ্যবিত্তের আস্থা প্রমাণ করে।
কোম্পানির আমলারা, পোষা বুদ্ধিজীবিরা এদেশের নানান ধরণের ধর্মাচারণকে হিন্দুত্ব ঘোষণা করে। দেশের নানান ধর্মাচরণকে একদেহী হিন্দুধর্মরূপে দেগে দিল তারা। বলল ভারতীয় হিন্দুধর্ম অনৈতিক এবং জরাজীর্ণ। আজও শিক্ষিত ভারতীয়দের বিশ্বাস, ইংরেজ বুদ্ধিজীবি, আমলা, প্রশাসকেরা ভারতীয় ধর্মের সতীদাহ অথবা বাল্য বিবাহেরমত নানান তথাকথিত জরাজীর্ণ কুআচারে মনেপ্রাণে ব্যথিত হয়ে ভারতীয় ধর্মের সংস্কারকর্ম গ্রহণ করে। সেই বিশ্বাসেই রামমোহন রায় ধর্মকে জঞ্জালমুক্ত করতে এগিয়ে এলেন। ইওরোপের অনুসরণে ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের জন্ম হল ভারতে।
ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের যুক্তি খুবই সরল। প্রথমতঃ ধর্মসংস্কারের নামে ভারতের সমাজ-সংস্কৃতি-ধর্মের ওপর আঘাত নামিয়ে এনে
নানান ধর্ম নির্মূলণের তাত্বিকভূমি তৈরি করা। সেমেটিক
এককেন্দ্রিক ধর্মাচরণের সামাজিক পরিবেশে ইওরোপ বেড়ে উঠেছে। সেই সূত্রে ব্রিটিশরা বলল ভারতীয়রা যে ধর্মাচরণ করে তা আদতে মিথ্যা ধর্ম। এটি একটি প্রাচীণ সুললিত ধর্মের জরাজীর্ণ ইল্লুতে রূপ। উঠে এলেন
রামমোহন রায়। ব্রিটিশ ধর্মসংস্কারের পরিপূর্ণভাব বিকাশ ঘটল রামমোহন রায়েদেরমত ভারতীয়দের
নানান আচরণে।
দ্বিতীয়তঃ ভারতীয়দের আচরণীয় সংস্কার, সংস্কৃতিকে ব্রিটিশরা মিথ্যা ধর্মরূপে দেগে দিয়ে ভারতীয় ধর্মগুলিকেকে জরাজীর্ণ, মিথ্যারূপে প্রমাণ করা। তাহলে ব্রিটিশদের গুরুঠাকুর ঠাওরানো শহুরে ব্যবসা-চাকুরিকেন্দ্রিক মধ্যবিত্তরা নিজেরাই নিজেদের সমাজ ভাঙতে উদ্যোগী হয়ে উঠবে। এর জন্য বিদেশি ব্রিটিশদের সরাসরি ভারত সমাজভাঙার উদ্যমের প্রয়োজন হবে না। ক্ষুব্ধ ভারতীয়রাও ব্রিটিশদের সরাসরি দোষী ঠাওরাতে পারবে না। এই সমাজ ভাঙার পোষাকি নাম হল সংস্কার আন্দোলন অথবা নবজাগরণ।
বলাহল, কিছু মানুষের উন্মার্গগামীতায় এমন ঘটছে। আর হিন্দু ধর্মর মূলেই গলদ রয়েছে। ভারতীয়দের সত্য ধর্ম, খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করাই শ্রেয়। কিন্তু অন্যান্য মহাদেশেরমত খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করতে ভারতীয়রা হামলে পড়ল না। তাই শহুরে ভারতীয়দের বিশ্বাস করালে হল হিন্দুধর্মটাই মিথ্যা ধর্ম। অসুবিধে হল, ভারতীদের মানসিকতায় মিথ্যা ধর্ম নামক কোনও শব্দবন্ধের ধারণা নেই। তাতে কী! ব্রিটিশ পিরেরা বলেছেন। বিশদ না জেনেই নবজাগরণের অগ্রদূতেরা দাসত্ব প্রকল্প সামিল হলেন।
দীর্ঘ দুই শতাব্দ পেরিয়ে এসে আজ এই বিষয়টিকে নিয়ে বিশদ আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। যে তাত্বিকতায় ব্রিটিশেরা ধর্ম সংস্কারে উদ্যমী হয়েছিলেন, সেই ধারণাটির মূলে যাওয়া আজ অন্ততঃ প্রয়োজন। ভারতের রিফর্মিস্ট অথবা ধর্ম-সংস্কার আন্দোলন আলোচনায় ব্রিটিশদের ধর্ম বিষয়ক চিন্তাভাবনা না বুঝে নিলে, ভারতীয় ধর্ম সংস্কারের তাত্বিক দিকটি পরিষ্কার হবে না। প্রথম থেকেই কিন্তু রিফর্মিস্ট আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণ ছিল ইংরেজদের হাতে।
মিথ্যা ধর্ম – খায় না খুন
করে
সেমেটিক ধর্মে(জুডাবাদ, খ্রীষ্টধর্ম এবং ইসলাম)র অনুসারীরা মনে করেন বিশ্বে
শুধুই একক ভগবানই পুজ্য।
ধর্মগুলির শাস্ত্রবাক্য অনুসারে ভগবানই বিশ্বসৃষ্টিকর্তা(বাইবেল কথিত ওল্ড
টেস্টামেন্টের জেনেসিস পর্বটি)।
ধর্মের অন্যতম উদ্দেশ্য ভগবান পুজন। সেমেটিক ধর্মের অনুসরণকারীরা মনেকরে ভাগবানের সত্যিকারের আরাধনার পথজুড়ে আড় হয়ে রয়েছে শয়তান যার বাইবেলিয় নাম সাটান অথবা ডেভিল। শয়তান মানুষকে প্ররোচিত করেচলেছে আরাধনা থেকে সরে আসাতে। খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বীদের হাতেপড়ে এই মানুষেরা শুধুই খ্রিষ্ট ধর্ম অথবা সেমেটিক ধর্মের অনুগামী থাকলেন না। ধরে নেওয়া হল, বিশ্বের সকল মানুষকেই নানান নামে শয়তান(শয়তানের অনুসরণকারীরা লেজিয়ঁ (legion) নামে পরিচিত) পথভ্রষ্ট করে অজ্ঞাণী, অবোধদের নানান ভগবান পুজন করাচ্ছে। আদতে একমেবদ্বিতীয়ম ভাগবান ছাড়া সব পুজ্য ভগবানই আদতে শয়তানের রূপ। কিন্তু গড ছাড়া সবই মিথ্যা ভগবান।
এই ঘৃণ্যকাজে মানুষদেরই একাংশ শয়তানের সাহায্যকারীরূপে অবতীর্ণ– এই সাহায্যকারীরা যাজক সম্প্রদায়। যাজক অথবা পুরোহিতেরা নানান ধরণের আচার আচরণ, জাদুটোনা প্রয়োগ করে ধর্মানুগামীদের পথ ভোলায়। ভগবানের মৌলিক বাণীগুলিকে জনগণের সামনে আবৃত করে রাখে। ফলে অবোধ সাধারণ মানুষ, শয়তান এবং তার অনুগামীদেরই ভগবান ভেবে পুজো করে। এরাই মিথ্যা দেবতা। গড অথবা আল্লা অথবা জোহেবাই সত্য ভগবান। মিথ্যা ভাগবানের পুজন যে ধর্ম প্রচার করে তাই মিথ্যা ধর্ম।
মিথ্যাধর্মের পালক জাতপাত
তো ব্রিটিশ খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীরা ভারতে শাসন করতে এল। ব্রিটিশ ধর্ম
প্রচারকদের কাছে খ্রিস্ট ধর্ম ছাড়া যেকোনও ধর্মই মিথ্যাধর্ম। ভারতের
তেত্রিশ কোটি দেবী-দেবতা মিথ্যা দেবদেবী। এরা সকলেই শয়তান অথবা শয়তানের প্রতিভূ। প্রোটেস্টান্ট
ধর্মাবলম্বীরা বলল শয়তানের ঘোমটা উন্মোচনের মাধ্যমেই শয়তানের প্রতিভূ ব্রাহ্মণ
অথবা পুরোহিতদের আদত রূপ প্রকাশ পায়।
মিথ্যা ধর্ম ভোলাভালা সাধারণ মানুষকে শয়তানের অনুগামী করে। মানুষকে নরকের পথে নিয়ে যায়। এই সমস্ত ধর্মকর্ম জাগতিকভাবে অনৈতিক। ভারতে ব্রিটিশরা বাল্যবিবাহ অথবা সতীদাহেরমত নানান প্রথা দেখেছিল। এতে হিন্দুধর্মের অনৈতিকতাও সরাসরি প্রমাণিত হল। ব্রিটিশরা বলল এই সব আচার আচরণের প্রচার প্রসার মৌলিক, আদি ধর্মের বিরুদ্ধে মতলবী পুরোহিতদের চক্রান্ত। পুরোহিতদের সঙ্গে ব্রাহ্মণদের এককরে দেওয়া হল।
সেমেটিক ধর্মের পালনকারীদের মনেই প্রশ্ন উঠল ভাগবানের নাম করে এই ভন্ড ভারতীয় পুরোহিতেরা কীভাবে ক্ষমতা অর্জন করেছে এবং সেই ক্ষমতা দখলে রেখেছে! ধাঁধার সহজ উত্তর পাওয়াগেল না। উত্তর তো পেতেই হবে। নইলে ভারতে ধর্ম-সংস্কার তত্ব টেঁকেনা। বলতেহল পুরোহিতদের ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে ভারতীয়দের অন্ধভাবে জাতপাত মানার মধ্যে। তাই পশ্চিমিদের কাছে জাতপাত প্রধাণতম খলনায়ক হয়ে উঠল। অসাধু পুরোহিতেরা অজ্ঞাত উপায়ে ভারতের সমাজে জাতপাতের এক জটিল রূপরেখা তৈরি করে। তারা আরও অব্যক্ত পদ্ধতিতে এই জটিলতায় অধিকাংশ অবোধ, অজ্ঞাণ, মূঢ় জনগণেশকে সামিল করেছে। জোর করে অনৈতিক চক্রান্তমূলক জাতপাতভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা চাপিয়ে দিয়েছে। কী করে এই চাপিয়ে দেওযার ঘটনা ব্রাহ্মণেরা ঘটাতে পারল, সে তথ্য সর্বশক্তিমান ব্রিটিশ প্রমাণ করে দেখাতে পারে নি। ছদ্মব্রিটিশ অনুগামী বহু বুদ্ধিজীবি তা প্রমাণ করে দেখাতে পারে নি। মনগড়া স্বতঃসিদ্ধ তত্ব বাজারে চলছে। এদের মধ্যে বামমনোভাবাপন্ন ঐতিহাসিকদের ভূমিকা অগ্রগণ্য।
নির্দিষ্ট কোনও জ্ঞাণচর্চা অথবা গবেষণার ভিত্তিতে
ব্রিটিশেরা অথবা তাঁদের অনুগামীরা এই উপসংহারে উপনীত হয়েছিল একথা বলা যায়না। তারা
ধর্মবিশ্বাসের ভিত্তিতেই এই তত্বে আজও আস্থারেখেছে। পরবর্তীকালে
ভারতীয় সমাজে তাঁরা অনেক কিছু অনাচাররূপে পশ্চিম আবিষ্কার করেছে। শহুরে
ভারতীয়রা সেগুলিকে সামাজিক অথবা ধর্মীয় অনাচাররূপেও মান্যতা দিয়েছে। এ সবই তথাকথিত
ধর্মচক্রচক্রান্ততত্বে খাপেখাপ খেয়ে গিয়েছে। ব্রিটিশদ্বারা উপনিষদ, বুদ্ধ এবং জৈনধর্ম আবিষ্কৃত হওয়ার পর এই
অনাচারমূলক ধর্মচক্রের উপসংহারটি আরও গতিময়তা অর্জন করে। ব্রিটিশরাজ
পোষিত বুদ্ধিজীবিরা ভারতীয় ধর্মের অধঃপাতে যাওয়ার তিনটি ক্রমপর্যায় আবিষ্কার করেন। প্রথমে বৈদিকধর্ম পরে
ব্রাহ্মণ্যধর্ম এবং সর্বশেষে হিন্দুধর্ম। বৈদিকধর্মই একক ভগবান কথিত আসল ধর্ম। এই ধর্মেই
রয়েছে ভাগবানের মূল বাণীসমূহ। ব্রাহ্মণ্যধর্ম আদতে বৈদিকধর্মের অধঃপাতিতরূপ। বৈদিকধর্ম
শয়তানের প্রতিভূ ব্রাহ্মণদের চক্রান্তে ব্রাহ্মণ্যধর্মে পরিণত হয়েছে। ব্রাহ্মণ্য
ধর্ম আরও অধঃপতিত হয়ে হিন্দুধর্মে কালপরিণত হয়েছে।
পরবর্তীকালে এই খলনায়ক ব্রাহ্মণ যাজকদের বিরুদ্ধে বৌদ্ধধর্মকে দাঁড় করানো হল। গৌতমবুদ্ধ নিজে ব্রাহ্মণদের বিরুদ্ধে লড়ে নিজের ধর্ম প্রতিষ্ঠা করেছেন। এ রসাল তথ্যও সুপরিবেশিত হল। শুধু ভারতে নয়, বিশ্বজুড়েও। বুদ্ধ নাকী অধঃপতিত ব্রাহ্মণ্যধর্মের বিরুদ্ধে লড়েছেন, সেহেতু প্রটেস্টান্টদের চোখে বুদ্ধ হিন্দুধর্মের তুলনায় অনেক বেশি গ্রহনীয় হলেন। পশ্চিমি অনেক চিন্তবিদমানুষ বৌদ্ধধর্মে প্রভূত আস্থারাখেন। সব কটাকে ছেড়ে বেঁড়ে ব্যাটাকে ধরার প্রকল্পে ভারতীয় সমাজ-সংস্কৃতির সব ধরণের বিচ্যুতির সন্ধান চলল হিন্দুধর্মের অন্দরে। বলাহল, সমস্ত বিচ্যুতি হিন্দুধর্মেরই অঙ্গ বিশেষ।
হিন্দুধর্ম যে আদতে মিথ্যা জরাজীর্ণ পতিত ধর্ম এই
ব্রিটিশীয় প্রচার মোটামুটি ভারতের বুদ্ধিজীবি মহলে সসম্মানে গৃহীত হল। ব্রিটিশ
অনুগামীদের প্রচারের ঘনঘটার দশচক্রে ভারতীয় ভগবানসমূহ শয়তানে পরিণত হলেন।
এই আধুনিক প্রচারে বিন্দুমাত্রও নাড়ানো গেলনা ভারতীয় গ্রামীণদের। তাঁরা নিজেদের সমাজ সংস্কৃতি যতটুকু বাঁচাতে পেরেছে ব্রিটিশ অথবা অনুগামীদের লুঠ, অত্যাচার আর দাসত্ব প্রকল্পের হাত থেকে, তাই নিয়েই সুখী থাকল। নানান প্ররোচনা সত্বেও।
চক্রান্তকারী ব্রাহ্মণদের সঙ্গে, হিন্দুধর্মের বিরুদ্ধে শশব্যস্তে কলম ধরলেন প্রগতিশীল রামমোহন রায়। তাকে সামনে রেখে অনেকেই পথে নামল এমনকী মূর্তিপূজকেরাও। ১৮১৫র রামমোহনের মিথ্যধর্মবিষয়ক কলমবাজি ২০ বছর পর ব্যাবিংটন মেকলের মিনিট। ১৮৩৫এর উদ্ধত, অশ্লীলতম মিনিটের বিরুদ্ধে আজও রা কাড়তে শেনা যায়না আধুনিক ভারতবাসীর। সনাতন পরিবারের বিদ্যাসাগরও মাথা নোয়ালেন চাকরি-ব্যবসার সুরক্ষায়। আঠারেশ শতকের প্রথমদিকে এহেন ব্রিটিশ প্রচারে কলকাতার শহুরেমহল সাড়া দিল। শহরের প্রখ্যাতদের অনেকেই তথাকথিত হিঁদুয়ানি ছেড়ে খ্রিস্টধর্মে আস্থাপ্রকাশ করলেন। খ্রিস্ট ধর্মেও দীক্ষা নিলেন। ধর্মান্তরিত হওয়ার উত্তেজনা স্তিমিত হয়ে আসতে শুরু করল কয়েক বছরের মধ্যে। রামমোহনেরমত একদল ভারতীয় ধর্ম ত্যাগ করল না। ব্রিটিশের ধর্ম সমালোচনার উত্তরে অনৈতিক হিন্দুধর্মকে শুদ্ধ করতে ধর্ম-সংস্কারে বুক পেতে দিলেন। পুরোনো পরিশুদ্ধতম বেদ উপনিষদের ধর্মে ফিরে যেতে চাইলেন। বেদ উপনিষদে ধর্মের অবিসংবাদী প্রাচীণরূপ আবিষ্কৃার করলেন। নতুন ধর্মের উদ্ভব ঘটল।
নতুন ধর্মের উদ্ভব
দাসত্ব প্রকল্পের পথে চলতে চলতে নির্গুণ, নিরাকার ব্রহ্ম হঠাতই শহুরে সমাজে
কল্কে পেয়েগেল।
ব্রিটিশ প্রণোদিত ভারতীয় ধর্ম সংস্কারের ষোলকলাপূর্ণ হল। ইওরোপিয়দের
ধুয়াধরে বলাহল বর্তমানে ভারতীয় জনগণ যে ধরণের পুজা অর্চনা আচার আচরণ মান্য করে,
উপনিষদ অথবা বেদে তার বর্ণনা নেই। চক্রান্তকারী ব্রাহ্মণদের হাতে তৈরি মন্দির এবং গৃহে স্থাপিত দেবতার পুজো
আদতে অনৈতিকতম মূর্তি পুজের নামান্তর। প্রোটেস্টান্ট খ্রিস্টধর্মের আদলে তথাকথিত হিন্দুধর্মকে ঢেলে সাজার পরিকল্পনা,
শহুরে ইংরেজি শিক্ষিত সমাজের এক অংশে অনেকবেশিকরে গৃহীত হল।
আফ্রিকা অথবা আমেরিকারমত, গ্রামীণ ভারত ভারত খ্রিস্টধর্ম বরণ করে নি। তাই প্রোটেস্টান্ট খ্রিস্টধর্মেরমতকরে হিন্দুধর্মের সংস্কার শুরু হল। ইংরেজি শিক্ষিত ভারতীয়রা সংস্কার নিবেদন পেশ করল। উদ্দেশ্য অধঃপতিত হিন্দুধর্ম রিফর্ম করে খ্রিস্টধর্মেরমত সম্মানিত ধর্মে পরিণত করা! প্রোটেস্টান্ট খ্রিস্ট ধর্মের আদলে ব্রাহ্ম সমাজ, প্রার্থনা সমাজ, আর্য সমাজেরমত ধর্মপ্রচেষ্টা গড়ে উঠল। ভারতীয় ধর্মের তথাকথিত কুসংস্কারীয় আচার আচরণ দেখে মাননীয়রা মুর্চ্ছা না যান সে ব্যবস্থা করলেন অগ্রণী ভারতীয়রা। আদত উদ্দেশ্য ব্রিটিশ সমাজে কল্কে অর্জন।
প্রত্যেকটি সম্মানিত ধর্মরমতই হিন্দুধর্মের নতুনতম ধর্মগুলির নানান স্মৃতিশাস্ত্র গড়ে উঠল। পশ্চিমি শাস্ত্র অনুসারে কিছু পালনীয় আচার, আচরণ, সেবাধর্ম লিখে ফেলা হল। প্রটেস্টান্ট ধর্মের অনুসরণে প্রতিবেশীর প্রতি কতটা গড় শ্রদ্ধাপ্রকাশ করা যায় তারও কিছুকিছু নির্দেশাবলী তৈরি হল। প্রটেস্টান্ট ধর্মের আদলে হিন্দুধর্মকে সংস্কার করতে গিয়ে প্রাথমিকভাবে বর্বর জাতিপ্রথারমত নানান কর্মকান্ডও নাশ করার ব্যবস্থা হল। রামমোহন বললেন ভারতের আপামর সাধারণ মূঢ়, অজ্ঞ। আমজনগণ উচ্চমার্গের উপনিষদীয় ধর্মভাবনায় নিজেদের মেলাতে পারে না। কেননা যুগ যুগ ধরে তারা নানান কুসংস্কারের অতলে তলিয়ে রয়েছে।
ইংরেজি শিক্ষিতদের এই ধর্ম-সংস্কার, গ্রামীণ ভারতীয়দের তুচ্ছতাচ্ছিল্যের অর্থ আদতে ভারতীয় চিরাচরিত সংস্কৃতিকে মেনে না নেওয়ার। তাকে অধঃপাতিত, জরাজীর্ণ প্রমাণ করে তার সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যাওয়া। শহরকেন্দ্রিক ধর্মপালনের যুগের শুরু। এতথ্য যেন আমরা আজ মনে রাখি। এই সংক্রান্ত বিশদ আলোচনা তখন হয় নি। আজও হয় না।
আশ্চর্যের বিষয় হল, বিদেশিদের ছত্রছায়ায় থেকে, ভারতীয় গ্রামীণ, সংস্কৃতির প্রতি সরাসরি অশ্রদ্ধার প্রকাশের এই শহুরে প্রচেষ্টাকে পারম্পরিক ভারতবর্ষ সহজভাবে মনে নিয়েছে। এটাই সনাতন ভারতের মহত্ব। সেটাই নমনীয় ভারতের চিরাচরিত পালনীয় সংস্কৃতি। আর্য সমাজীদেরমত নতুন ধর্মাবলম্বীরা ততটাই ভারতীয় সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে উঠল, যতটাই ভারতের শৈব অথবা শাক্ত অথবা বৈষ্ণবমতাবলম্বীরা চিরাচরিতভাবে ছিলেন। সহস্র সহস্র বছর ধরে ভারতীয় সংস্কৃতিকে যে সব ধারা পুষ্ট করেছে, নবতম ধর্মমতাবলম্বী আর্য সমাজীরা সেই পথেরই অন্যতম অঙ্গ হয়ে উঠল। কোনও প্রশ্ন উঠলনা।
সামগ্রিকভাবে ব্রিটিশদের দেখানো পথে মহানতম ভারতীয়রা হাঁটতে স্বস্তিবোধ করেছে। ব্রিটিশেরা বলল সাধারণ গ্রামীণ ভারতীয় শাস্ত্র সম্বন্ধে প্রায় অজ্ঞ। তার উত্তরে সংস্কারপন্থীরা নানান শাস্ত্র পঠনে ফিরে গেলেন। ব্রিটিশেরা কুসংস্কারমূলক আচার আচরণের সমালোচনা শুরু করে। ভারতীয় সংস্কারপন্থীরা সে সবগুলি হয় সংস্কার অথবা প্রতিস্থাপিত করার উদ্যোগ নেয়। ব্রিটিশেরা মনে করল ভারতীয় ধর্ম অনৈতিক। সংস্কারপন্থীরা শাস্ত্র থেকে নিজেদের জন্য কয়েকটি অবশ্য মাননীয় নির্দেশাবলী খুঁটে তুলে ধরল ব্রিটিশষদের সামনে। দেখাল খ্রিস্টধর্মেরমতই হিন্দুধর্মও নৈতিকতা বিশিষ্ট হতে পারে। আদতে ব্রিটিশ নিজেরমত করে মন গড়া cতৈরি করেছে। প্রখ্যাত ভারতীয়রা সেই এজেন্দাকে ভগবান প্রেরিত ভেবে বাঁদর নেচেছেন। সেই কাণ্ড আজও ঘটে চলেছে। তারা আজও তাদের এজেন্দাতেই নেচে চলেছেন।
ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে। ধর্ম-সংস্কারবাদীরা ধর্ম সমালোচনার উত্তরে নিজেদের মানিয়ে নিতে চাইলেন। প্রটেস্টান্ট ব্রিটিশদেরমত করে একটি হিন্দুধর্ম তৈরি করার চেষ্টা করলেন। তারা ব্রিটিশ সংস্কৃতিকে বোঝার চেষ্টা করা করেনি, ভারতকেও বোঝেননি। প্রয়োজনছিল ব্রিটিশদের সমালোচনার উত্তর দেওয়ার জন্য নিজেদের তৈরি করা, দেশ, সমাজকে বোঝা। তারা কোনটাই করলেন না। মহাজনেরা ভাবলেন ব্রিটিশরা যে ভারত ধর্ম-সমালোচনা করছে সেটি যথপোযুক্ত। সেদিনের ইওরোপ, আজকের আমেরিকা ভারতের ধর্ম, সমাজ, সংস্কৃতি সম্বন্ধে যতটুকু বলে এসেছে, তাকেই ইংরেজি শিক্ষিত ভারতীয়রা বেদবাক্যরূপে গণ্য করেছে, সেই অনুযায়ী সমাজ আর দেশ বদলানোর চেষ্টা করেছেন। আজও ইংরেজি পড়া ভারতবাসী বিশ্বাস করে ভারতে জাতিপ্রথা অনৈতিক। সহস্রবছর ধরে ব্রাহ্মণেরা তথাকথিত দলিতদের দলিত করে রেখেছে। বৌদ্ধধর্ম আদতে আচার আচরণসর্বস্ব ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। আজও ভারতের বিদ্বতজনেরা পশ্চিমি এধরণেরতত্বে বিশ্বাস করেন।
ভারতের সরকারি সংরক্ষণ নীতি, দলিতদের বৌদ্ধধর্মে অথবা খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তর আদতে সেই তত্বেরপ্রতি মধ্যবিত্তের আস্থা প্রমাণ করে।
Subscribe to:
Posts (Atom)