Saturday, August 20, 2016

উপনিবেশবাদ বিরোধী চর্চা

বাংলার উতপাদন-বিতরণ ব্যবস্থা ধ্বংস
দীপঙ্করদাদার প্রকাশনার উত্তরে কিছু কথা
Dipankar Shibu দাদা https://www.facebook.com/dipankar.dey.583/posts/1223217114375915 সূত্রে বাংলার উপনিবেশিকতা নিয়ে ধারাবাহিক লিখছেন।
দার্শনিকভাবে তাঁর মতের সঙ্গে সামগ্রিকভাবে একমত। তথ্য আর ভাবনায় কিছু বলার আছে। হয়ত ফেবুর জন্য ছোট করতে গিয়ে ভাব প্রকাশে ঝামেলা হয়েছে বলে মনে হয়েছে।
কয়েকজন পাঠকের মন্তব্য অত্যন্ত আপত্তিকর, বাংলা বিষয়ে অনৈতিহাসিক। তাঁরা আমার শ্রদ্ধেয়। তাঁদের মতেরও বিরোধিতা সাধ্যমত করেছি।
১) নীল বা পাট বাংলার খুব পুরোনো চাষ।১৭৮০র আগে বাংলায় নীলকরের মত ভয়ঙ্কর অত্যাচারী শব্দটার অস্তিত্ব ছিল না আর নীল চাষ লুঠেরা ব্যবসায় পরিণত হয় নি। নীল চাষের বাংলা(বৃহত বাংলা> দীনেশ্চন্দ্র সেন) বিশ্বে বিখ্যাত ছিল কয়েক হাজার বছর ধরে যেজন্য থেকে ভারতের নাম হয় ইন্ডিগো>ইন্ডিয়া। নীল ব্যবসা ব্রিটিশদের আগে অত্যাচারী আর, কেন্দ্রিভূত ব্যবসাও ছিল না।
পাট হত উত্তরবাংলায়, পরে এসেছে দক্ষিণে - কিন্তু এটাও পুরোনো উতপাদন ব্যবস্থার অংশ।
২) তো বিদ্যুতচালিত মাকু তৈরি করার পর দেখা গেল বাংলার ছট আঁশের তুলোয় যন্ত্র ভাল চলে না, দ্বৈত শাসন ব্যবস্থায় নুন, তামাক চাষ, সুপুরি ব্যবসা, আফিম, বাঁশ, চট, সোরা, ধাতু, ইত্যাদি ব্যবসা দখল নিয়ে ছিয়াত্তরের আগেই বস্ত্রশিল্প ধ্বংস করেছে তারা। 'তুলো চাষ মার খেলো' অনৈতিহাসিক বাক্য, বলা দরকার ছিল সেই চাষ ব্যবস্থাকে পরিকল্পনা করে ধ্বংস করা হল - বাংলার ছোট আঁশের ফুটি এবং নানান রঙ্গীন সাদা বাহারী তুলো ধ্বংস করে বাংলায় চাষ হতে শুরু করল বিদ্যুতচালিত যন্ত্রের জন্য বড় আঁশের আমেরিকার আর মিশরীয় তুলো - আজও যার প্রচার বিজ্ঞাপনে দেখা যায় - মার খেল বাংলার মহিলাদের রোজগার - যাদের নাম চরকা কাটনি - কারণ ভাল কাপড়ের জয় সবার আগে প্রয়োজন ভাল সুতোর - সেটা চরকা কাটনিদের দান - এবারে তুলো উতপাদন ধ্বংস করে মহিলাদের রোজগার খেয়ে নেওয়া হল - তাঁতিদের নির্ভর করানো হল মিলের সুতোর ওপর যে সুতোয় আজও ভাল কাপড় তৈরি হয় না।
৩) আমার আরও ধারণা কৃষি ব্যবস্থা এজ চাষের জন্য ধ্বংস হয় নি - এই চাষ বহুকাল ধরেই ছিল। হাজার হাজার বছর ধরে গড়ে তোলা সেচ আর জলাধার ব্যবস্থা ধ্বংস করে রপ্তানির জন্য বড় বড় রাস্তা তৈরি করা, তার পরে রেল রাস্তা তৈরি করা তার বড় কারণ। বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়া, মাটি, খাদ্য শৃঙ্খল ইত্যাদি বিবেচনা করে নিজস্বভাবে গড়ে ওঠা সমাজ নির্ভর সেচ ব্যবস্থা ধ্বংস হল - ফলে ধ্বংস হল বাংলার কৃষি ব্যবস্থা। রেল ব্যবস্থা তৈরি হল বড় বড় বাঁধের মত রাস্তা তৈরি করে, নদীর ওপর সেতু বানিয়ে - ফলে সেচের নালাগুলো দ্গ্বংস হয়ে গেল। ১৭৫৭ থেকে প্রায় মার্ক্সের একশ বছর পরের প্রণোদনা সত্যি করে(এ পরিকাঠামো ধ্বংস না করলে নতুন ইওরোপিয় ধাঁচের ভারত গড়ে উঠবে না) শহুরেদের পূর্বপুরুষেরা ব্রিটিশ লুঠের ছোট তরফ হতে ব্রিটিশ পদপ্রান্তে নিজেদের বিলিয়ে দিয়েছেন আর বিপরীতে গ্রামীনেরা ১৭৬৩ থেকেই ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়ছে। ফলে ব্যপক গ্রামীন বিশিল্পিয়ায়ন, ব্যাপক সম্পদ লুঠ, দক্ষ কারিগর খুন, আর উতপাদন ব্যবস্থা ধ্বংস বিষয়ে মাথা ঘামাতে পারল না ভারতীয় সমাজ।
৪) যে সঙ্ঘীরা বলেন বাঙ্গালির শিরদাঁড়া বেঁকানো ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে ব্রিটিশ বাবাদের কিস্যু করার ছিল না তারা নিজেদের পূর্বপুরুষের ব্রিটিশ লুঠের ভাগিদার হওয়ার কৃতজ্ঞতায় ব্রিটিশিয় 'গণহত্যার' সত্যে উপনীত হতে চান না। বিয়াল্লিশ নিয়ে যত কাজ হয়েছে ছিয়াত্তর নিয়ে তত কাজ হয় নি সত্য কিন্তু হাতে গোণা নাছোড়বান্দা বাঙালি যেমন কামিনী রায়ের পিতা চণ্ডীচরণ সেন অসাধারণ উপন্যাস নন্দকুমার লিখে জেলে পর্যন্ত গিয়েছিলেন যেখানে তিনি ফোর্ট উইলিয়মের নথিপত্র ঘেঁটে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন ব্রিটিশ লুঠ ধ্বংস আর অত্যাচারের কাহিনী উপন্যাসের আদলে লিখে। আজও পর্যন্ত ঔপনিবেশিক সাহিত্য ব্যবস্থার উপজাত এক জনও সাহিত্যিক ছিয়াত্তর নিয়ে লেখেন নি - আনন্দমঠের বঙ্কিম বাদ দিয়ে, সেখানেও তিনি চাকুরিদাতাদের সম্মানে, তাদের হত্যালীলা যতটা পারা যায় উজ্জ্বল এবং কালিমামুক্ত করে দেখাবার চেষ্টা করেছেন।
৫) এ নিয়ে কোন তর্কই উঠতে পারে না যে বামপন্থীরা বরাবরই ব্রিটিশ প্রণোদিত বাংলার পরম্পরার পরিকাঠামো ধ্বংসের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। কার্ল মার্ক্স জোর গলায় চেয়েছিলেন অশিক্ষিত, অজ্ঞানী, সভ্যতার ষোড়ৈশ্বর্যবোধহীন, নিরক্ষর গ্রামীন শুদ্রদের হাতে গড়ে তোলা এই ভারতের গ্রামীন সভ্যতার ধ্বংস। এ কাণ্ডটা না ঘটালে ইওরোপের জ্ঞানচর্চা, প্রযুক্তি আর জীবনধারণ পণ্যের বাজার তৈরি হয় না। ভারতীয় হিসেবে আমরা জানি গুরু বাক্য অমান্য করা পাপের থেকেও ভয়ঙ্কর।
Post a Comment