Monday, August 29, 2016

শিক্ষা নিয়ে কিছু ভাবনা

অনেক কিছু তো বলা আছে তো বললাম - ভেবে দেখা গেল কিন্তু সত্যিই কি কিছু বলার পক্ষে উপযুক্ত ব্যক্তি/সংগঠন? মনে হয় না - মাস্টারের ঘরের জন্মেছি আর সঙ্গঠনের সঙ্গে চলতি পড়াশোনার নিয়ে যোগায়োগ কিছুই নেই - এইটুকু নিয়েই যদি বলার আধিকার জন্মায় তাহলে তো চিত্তির। একজন ভদ্রলোকসমাজসদস্য হিসেবে ঐতিহাসিকভাবে কিছু তো বলার থাকে - তাই ওগরাতে বাধ্য হয়েই চাবি টেপা।
নিজের মাটি, ভাষা, সমাজ, মানুষ, তার জ্ঞানচর্চা, তার ইতিহাস - লেখ্য মৌখিক, চলতি ভাষায় লুকিয়ে থাকা(যেমন টানপোড়েন প্রমান করে বাংলা এক সময় তাঁতের ধাত্রী ছিল ইত্যাদি) ইতিহাস নিয়ে গর্ব খুব জরুরি - কিন্তু সেটা যেন অন্য কারোর স্বাধীনিতা গর্ব হত্যা-আঘাত করে করা না হয়(যেমন বার বার আমরা খাপ পঞ্চায়েত তার কন্যাভ্রুণ হত্যা নিয়ে জাট এলাকাকে ঠোনা মারি - এ কথা একদা জয়া দি বলেছিলেন - এক গ্রামের অভদ্রলোকীয় মহিলাকে প্রশ্ন করায় তিনি বলেছিলেন মেয়েরাই তো সমাজে কাজ করে তাকে মারলে সমাজের চলবে কি করে(এ নিয়ে জয়াদির সঙ্গে অনেক আলোচনা হয়েছে - সে বিষয় এখন থাক))।
দীপঙ্করদা যা আলোচনা করেছেন তা নিয়ে আমার বলার যোগ্যতা নেই - তিনি অন্যতম যোগ্য মানুষ। আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে শুধু বলব শিক্ষা যে উভয়ত পরম্পরাগত এবং পাঠশালা ভিত্তিক। এই দুটো বিষয়ই বাংলায় বহুকাল ছিল - ব্রিটিশ শাসনের পর পরম্পরাগত শিক্ষার মূল্য অন্তত ভদ্রলোকিয় সমাজে হ্রাস পেয়েছে(যেমন পরম্পরার ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তানের খুব বেশি পড়াশোনার ধার ধারতেন না - কাজ করতে করতেই তাদের হাতে কলমে শিক্ষা হয়ে যেত - যেমন করে গ্রামবাংলায় পরম্পরার পরিবারগুলোর হয়।
য়ে পড়াশোনাটার ভার আমাদের ওপর আজও চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, তা হল চাকরি করার মানসিকতা তৈরি। এই বন্ধটার একটা দাবি দেখলাম ছেলেমেয়েদের চাকরির ব্যবস্থা - ব্যবসা করতে উৎসাহ নয় - কারণ এনলাইটমেন্ট শিখিয়েছে ব্যবসা মানেই ঠকানো - এবং সে সময় ইওরোপের রাষ্ট্রগুলো তাইই করত - ফলে ব্যবসা সামাজিক হয়ে ওঠেনি আমাদের সনাজের মত।
আমাদের চলতি পড়াশোনার মধ্যে ঐতিহাসিকভাবে শ্রমের গুরুত্ব প্রায় শূন্যের কোঠায়। দীপঙ্করদইয়েযেকানে পড়ান সেখানে কিন্তু পড়ানো হয় কর্পোরেট চাকুরে তৈরির জন্য, অথচ নাম বিজনেস স্কুল - কালে ভদ্রে একজন দুজন যারা ব্যবসায়ী পরিবার থেকে আসে তারা ব্যবসায় জুতে যায়, বাকি ৯৯% চাকরি করে।
তাই ঐতিহাসিকভাবেই বাংলার পাঠ্যক্রমে শ্রমবিমুখতা জন্মায়, দেশ সম্বন্ধে মেকলিয় উন্নাসিকতা জন্মায়। তা ছাড়া আমরা ধরেই নিই যে ইওরোপের পাঠ্যক্রমই অনুসরণযোগ্য। আমেরিকার অঙ্ক পড়ানো নিয়ে বিশদে লিখেছেন চন্দ্রকান্ত রাজু তার ব্লগে, নেটে রয়েছে দেখে নিতে পারেন - তিনি একটা উদাহরণ দিয়েছেন এনসিইআরটির অঙ্ক বই নিয়ে যেটি সমপাদনা করেছেন এক জ্যোতির্বিজ্ঞানী - তিনি জয়ন্ত বিষ্ণু নার্লিকর আর্যভটকে আর্যভট্ট মানে উচ্চবর্ণ দাগিয়ে দিয়েছেন - নবম দশম শ্রেণীর অঙ্ক বইতে আলেকজান্দ্রিয়ার অঙ্কবিদদের ছবি সব ককেসাসিয় চেহারার - কিন্তু তারা তো আফ্রিকার মিশরের - তাহলে তাদের চেহারায় আফ্রিকার মানুষের ছাপ থাকবে - রাজু প্রশ্ন করতে শিক্ষক বললেন তার এ বিষয়ে জ্ঞান নেই - তিনি বলতে পারবেন না (http://ckraju.net/hps-aiu/Escaping-Western-superstitions.pdf) - ছোটবেলা থেকেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই মেকলিয় জাতিবাদী ধারণা - ইওরোপ জ্ঞানে সর্বোচ্চ - তার আশেপাশে কেউ নেই - এ প্রশ্ন শিক্ষার্থীদের মাথায় প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হয়(সেই জন্য মধ্যবিত্তকে প্রভাবিত করতে কলকাতা লন্ডন করতে হয় আর দার্জিলিং সুইজারল্যান্ড বানাতে হয়)।
তো পড়াশোনার গোড়ায় গলদ। আজও সরল রৈখিক কার্টিসিয়ান অঙ্কের জ্যামিতির রমরমা, রাজু বলছেন জ্যামিতি বাক্স অকাজের যন্ত্র, ভারতীয় সুতো মাপন অনেক বেশি কাজের(দেখুন http://ckraju.net/papers/MathEducation2RopeTrick.pdf) এখন আপনি প্রশ্ন করতে পারবেন না এদেশের সূত্রধরেদের ব্যভার করা সুতো মাপনের বিদ্যার কথা তুললেই গেল গেল রব উঠবে - শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়বে বলা হবে - এবং এত দিন মোটামুটি বলে দেওয়া হয়েছে সেগুলি বৈজ্ঞানিক নয়। তাহলে?
তাহলে শুধু একটা শাঁখ, একটা বাঁশের কাজ, একটা পাথরের কাজ দেখিয়ে কি হবে - আপনি বলছেন অডিও ভিসুয়াল 'আধুনিক শিক্ষা' তাহলে হস্তশিল্প কি বর্তমানের শিক্ষা নয়! এই লেখার মধ্যেই কিন্তু আপনিই পার্থক্য টেনে দিচ্ছেন আধুনিক আর পরম্পরায় - ফলে শিক্ষার্থীরা শিখবে তারা আধুনিক পদ্ধতিতে শিখছে পরম্পরা যা নিরবে বলে দেওয়া হল আদতে কার্যকর নয়।
আমার ধারণা দীপঙ্করদা কাঠামো নিয়ে বলেছেন, আমি পাঠ্যক্রম নিয়ে একটা ইঙ্গিত দিলাম। এরকম হাজারো কথা বলা যায় - কিছুটা পরমের নানান সংখ্যায় আলোচনা করেছি। আদতে পুরো ব্যাপারটা খোল নলচে বদলাতে হবে। বাংলার নাবিকেরা চাষিরা, তাঁতিরা কলন বিদ্যা জানত - তা নিউটন বা লিবনিতজ থেকে আসেনি সে তথ্য তাদের কে দেবে? হাজার হাজার বছর ধরে শুদ্রদের জ্ঞানচর্চায় কলণবিদ্যা ভারতে বিকশিত হয়েছে - এটা কোন পাঠ্যক্রমে শেখানো হয়? সব অঙ্ক বইতে পড়ানো হয় নিউটন আর লিবনিতজ কলনবিদ্যার জনক। তার আগে যা ছিল তা প্রোটোক্যালকুলাস।
পড়া হয় নি, কিন্তু পরমেশ আচার্য এই শিক্ষা ব্যবস্থাকে খুব গালাগালি দিয়েছেন - এই সূত্রটা পেয়েছি - অনেকের মতই তার ধারণা ছিল এটি সামন্ততন্ত্রের পৃষ্ঠপোষক - কিন্তু এডামের শিক্ষা সমীক্ষা নিয়ে আমরা দেখিয়েছি, এটি শুদ্রদের পড়াশোনার যায়গা ছিল হাতে কলমে কাজ শেখা ছাড়াওও - গত সহস্র বছর ধরে বাংলা উদ্বৃত্ত অর্থনীতির অর্থনীতির অংশ ছিল তার কিছুটা শ্রেয় যায় ১৫৬০০০ বাংলা-বিহারের গ্রামের এক লক্ষ পাঠশালার তার পাঠ্যক্রমের, তার গুরুমশাইএর, তার ব্যবস্থার, তার সমাজের - শুধু ব্রিটিশপূর্ব গ্রাম সমাজ সামন্ততন্ত্রএ ডুবে থাকা বলে দাগিয়ে দিলেই হয় না - সেই গ্রাম সমাজে চালিকা শক্তি ছিলেন শুদ্ররা - তারা সমাজের কেন্দ্রে না থেকেও তৈরি করেছিলেন একটা শুদ্র উতপাদন বিতরণ ব্যবস্থা - কিকরে? সেটাই শেখার আজও এই কেন্দ্রিভবনের সময়ে।
তো বটুদের কি শেখানো হবে, কিভাবে শেখানো হবে তা ভাবা দরকার খুব। মূলের স্বাদ নিতে এডামের শিক্ষা প্রতিবেদনের তিন খণ্ড নেটেই পাওয়া যায় - পড়ে নিতে পারেন - এটি একমাত্র শিক্ষা সমীক্ষা - যাতে দেশিয় ভাষায়- বাংলায় নয় শুধু - পড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছিল - যা কোনকালেই মানা হয় নি - তথাকথিত স্বাধীন ভারতেও নয় - সেই সমীক্ষা আমার কাছে রয়েছে - মেল নম্বরটা পাঠালে পাঠাতে পারি।
যাইহোক আমরা মনে করি এই যে পাঠ্যক্রম প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত ভারতে চলছে তার একটাই লক্ষ কর্পোরেট বন্ধু ইওরোপিয় এবং আমেরিকিয় জীবনযাত্রা অনুসারী আনুগত শ্রমিক গড়ে তোলা। এটাকে পাল্টাতে গেলে বিদ্যালয়ী শিক্ষায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন দরকার - তা কোন সরকারের করার কলজেতে নেই - হ্যাঁ আমি আমাদের রাজ্যের পাঠ্যক্রমের পরিবর্তন বিষয়ে লক্ষ্য রেখেই কথাটা বললাম।
যে মানুষদের সঙ্গে আমি জুড়ে রয়েছি - শিখছি - শিখছি শুধু শিখেই চলেছি - তারা হাজার হাজার বছর ধরে অকেন্দ্রিভূত একটা দর্শন গড়ে তুলেছিলেন - পাঠ্যক্রমেও সেই দর্শন বজায় ছিল - কলকাতার হাতিবাগানের পড়ুয়া যা পড়ত, তার কাছের ২৪ পরগণা বা নদীয়ার বটু তা পড়ত না। শিক্ষা ছিল স্থানীয় প্রয়োজন কেন্দ্রিক। এখন শিক্ষা বিশ্বজনীন অর্থে ইওরোপিয় স্বার্থবাহী - তাই কেউ সামনাসামনি, কেউ ঘোমটা পরে ইওরোপ আমেরিকার দেখাদেখি বিদ্যালয়ে কর্পোরেট পাঠ্যক্রম তৈরি করছেন - আদতে বিদ্যুত উতপাদনের মত সব কিছুই কেন্দ্রিয়ভাবে যাতে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
আমরা চাইলেই এখন ইচ্ছে মত বিকেন্দ্রিয় পাঠ্যক্রম তৈরি করা যাবে না - দেশের মানুষ, দেশের প্রযুক্তির, দেশের উতপাদন ব্যবস্থার কথা বললেই - সঙ্ঘী দেগে দেওয়া হচ্ছে - অথচ সঙ্ঘীরা মূলত ইওরোপিয় ঘরাণার এক জাতি, এক ধর্ম এক ভাষার অনুগামী - আমরা তার ঠিক উল্টো পথের - এত ভাববে কে আর কেন?
এই কেন্দ্রিভূত দর্শনের শিক্ষা ব্যবস্থায় দেশের কথা আলঙ্কারিকভাবে বলা যায়, তাতে কাজের কাজ কিস্যু হয় বলে আমার মনে হয় না - যে দেশটার গ্রামগুলির গোড়াটায় কেন্দ্রই নেই, তাকে আমরা বিদ্যালয়ে বাংলার বোর্ড, বা দিল্লির বোর্ডের সঙ্গে জুতে দিলে বাংলার কর্পোরেট স্বাভিমান বা দিল্লির ইওরোপিয় জাতিবাদী স্বাভিমানকে এগিয়ে নিয়ে যাব। কিন্তু গ্রাম বাংলার বিকাশ হবে না। আদতে বাংলার স্বাভিমান বলতে আমরা বুঝি রাজবংশী, সাঁওতালি, মুণ্ডারি, লিপিহীন শবরদের স্বাভিমান এবং তাদের সমাজ আর কৃতি তা কখোনোই শুধু বাংলার বোর্ডের কেন্দ্রিয় শিক্ষা ক্রমে থাকা সম্ভব নয়- প্রত্যেকের জন্য নিজস্ব পাঠ্যক্রম চাই। প্রত্যেককে ইওরোপিয় ধাঁচে তৈরি করে গড়ে তোলায় ইওরোপের লাভ হবে - তাতে গ্রাম বাংলার কি? কর্পোরেট দাস তেরি করা এই পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন আনা প্রায় আসম্ভব।
তাহলে?
তাহলে যা হবার তাই হচ্ছে - একদিকে মধ্যবিত্তের দুর্ভাবনা বাড়িয়ে দেশে কোটি কোটি নিরক্ষর, মধ্যবিত্ত পশ্চিমে, ইন্ডিয়ার ভদ্রলোকেদের কাছে মুখ দেখাতে পারে না - এত নিরক্ষর নিয়ে ভারত কি করে বিশ্বসভায় ঠাঁই পাবে ভেবেই আকুল। অন্যদিকে আমরা দেখছি - শিক্ষায় যত কর্পোরেটিকরণ বাড়ছে, যত কেন্দ্রিভবন বাড়ছে, তত গ্রামীন মানুষ, সেই পরিকাঠামো থেকে নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছেন।
এটা আগামী দিনে ঘটবে যতক্ষণনা কর্পোরেটবাদ না হারবে। এটা আমার ভাবনা।
ভারত যতদিন তার নিজস্ব প্রযুক্তি, তার পড়াশোনা, তার দর্শনে অটল ছিল ততদিন সে উদ্বৃত্তের সংসার করেছে - তার জগত খোলা ছিল - বাণিজ্য খোলা ছিল - শিক্ষাও খোলা ছিল - আদান প্রদান ছিল - কিন্তু নিজের জোর তার যতদিন তৈরি হবে না, যত দিন তার সমাজ জাতিরাষ্ট্রের দ্বারা নিপীড়িত হবে, বঞ্চিত হবে, ততদিন এই 'পিছিয়ে পড়ার' হাত থেকে মধ্যবিত্তকে বাঁচার উপায় নেই - গ্রাম বাংলা বাঁচবে - কিন্তু মধ্যবিত্তের?

Post a Comment