Friday, February 4, 2011

সাম্রাজ্যের বন্ধুরাঃ উচ্চ-মধ্যবিত্তের ঔপনিবেশিক চক্রান্তের মুখোশ৩


১৮৩৮এ পাদরি উইলিয়ম এডামের শিক্ষা সমীক্ষা নিয়ে, পরে স্বাধীনভারতে নানান স্তরে বেশ কৌতুহল উদ্রেক হবে এবং ভারত সমাজের অন্তরাত্মা উদ্ধারক শ্রীধরমপালজী সেই তথ্য ব্যবহার করবেন তার দ্য বিউটিফুল ট্রি বইখানিতে অপূর্ব দক্ষতায় এডাম প্রাথমিকভাবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কার্যকারিতায় বেশ আস্থাভাজন ছিলেন ১৮১৮ সালে ভারতে ধর্মপ্রচার করতে আসা ব্যাপটিসিট মিশনারি এডাম পরে ধর্মপ্রচারের থেকে যে কাজটি বেশি করেছেন সেটি হল সাংবাদিকতা এডাম, তার কাজের তাত্বিক রসদ সংগ্রহ করতেন সাম্রাজ্যবাদী উইলিয়ম উইলবারফোর্স, মেকলে আর বড়লাট উইলিয়ম বেন্টিঙ্কের দর্শণ থেকে যদিও এটি সরকারিভাবে তত্কালীন সরকারের সমীক্ষা না হলেও গভর্ণর জেনারেলের বেন্টিঙ্কের আদেশবলে এবং কোম্পানির আর্থিক সহায়তায়, কোম্পানির ফরমায়েসে তিনি ১৮৩৬ থেকে ১৮৩৮ সাল পর্যন্ত সমীক্ষা করেন, যে সমীক্ষার পরে পেষাকি নাম হবে Reports on the State of Education in Bengal 1836 and 1838 ১ জুলাই ১৮৩৬ প্রথম(বাংলার বিভিন্ন জেলায় প্রথাগত শিক্ষা পদ্ধতির হাল হকিকত আর তথ্যাবলী বর্ণনা), ২৩ ডিসেম্বর ১৮৩৬ দ্বিতীয়(রাজসাহী জেলীর নাটোর থানার সেসময়কার শিক্ষা ব্যবস্থার লেখাজোখা), ২৮ এপ্রিল ১৮৩৮ তৃতীয় ও শেষ(মুর্শিদাবাদের একাংশ, গোটা বীরভূম, বর্ধমান, দক্ষিণ বিহার ও ত্রিহুতের শিক্ষা ব্যবস্থার সমীক্ষার সঙ্গে যোগ হয়েছে এডামের বিশ্লেষণ, সুপারিশ, সমীক্ষার ইতিটানন), এই তিন দফায় জমা পড়া সমীক্ষায় যে সনাতন বাংলা-বিহার সমাজের শিক্ষাদানব্যবস্থার তথ্য সংগ্রহের কাজ করেছেন পাদরিমশাই, মনেরাখতে হবে, সেই সমাজকে ব্রিটিশেরা কিন্তু ততদিনে শোষণ করে ছিবড়ে করে ফেলেছে, সমাজ বাঁধনের গ্রন্থিগুলো আলগা করে পটাপট ছিঁড়ে ফেলছে সরাসরি অস্ত্র নিয়োগ করে, বাংলা সুবা থেকে বছরে কোটি কোটি ডলারের অর্থ, কাঁচামাল চালান হয়ে চলেছে ব্রিটিশ মুলুকে বাঙালি মধ্যবিত্তের বৌদ্ধিক সহায়তায়, আরও গভীরভাবে বলাভাল ব্রিটিশ-বাঙালির যৌথ চক্রান্তে, যার ছিটেফোঁটালভ্যাংশগুড়ের ভাগ পেয়েছে চক্রান্তের সম্রাজ্যের সরাসরি বন্ধু বাঙালি মধ্যউচ্চবিত্ত দল আর গোষ্ঠীপতিরা ভারতীয় সমাজ, বিশেষ করে বাংলা সুবার প্রত্যেকটি অঞ্চলের তুচ্ছাতিতুচ্ছ প্রকৃতিক সম্পদ, জ্ঞাণ, সামাজিক উত্পাদনের শেষবিন্দু পর্যন্ত লুণ্ঠন করে, সমাজের সঙ্গে একের পর এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, সাধারণ মানুষের সঙ্গে রক্ত হোলি খেলে, সনাতন সমাজের শিল্প আর শিক্ষা পরিকাঠামো ভেঙে, নিজেদের দেশেও হাজার হাজার খেটে খাওয়া মানুষের শবদেহের ওপর গড়ে উঠছিল মানুষমারা ব্যক্তিকেন্দ্রিক মুনাফাভোগী শিল্পবিপ্লবের ভিত্তিপ্রস্তর যে সভ্যতা তার গড়ে ওঠার দুশো বছরের মধ্যেই ত্রাহি ত্রাহি রবে ভেঙে পড়তে শুরু করবে চুরচুর হয়ে
পাদরি এডামএর সমীক্ষা থেকেই অনেকগুলো অবাক করা তথ্য বেরিয়ে আসে তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি হল, বেশ কয়েকটা লুঠেরা মন্বন্তর, বিদ্রোহ আর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী সরকারি সহায়তায় মধ্যবিত্তের সরাসরি উদ্যোগে দেশজ শিল্পধংসকরণপ্রকল্প পেরিয়ে আসা সেই ছিবড়ে সমাজ এক লক্ষেরও বেশি পাঠশালার ব্যয়ভার বহন করার ক্ষমতা ধরত সে আন্তরিক উদ্যম তখনও সে ভেঙে যাওয়া বাংলা সমাজের ছিল শোষিত, লাঞ্ছিত বাংলার বৃহত্তর গ্রামীণ সমাজ তখনও সেই পাঠশালাগুলি, বিদ্যাকেন্দ্রগুলি বুকে ধরে, সযত্নে বাঁচিয়ে রাখার দায় নিয়েছিল অসীম মমতায় এই পাঠশালাগুলোতে পড়ানো হত সমাজকে বাঁচিয়ে রাখার নৈতিক-দার্শনিক সূত্রাবলী ছাড়াও নানান পর্যায়ের বিভক্ত কারিগরী-প্রযুক্তির জ্ঞাণ বাংলার অনেক গ্রামে তখন একটিরও বেশি, কোনো কোনো কসবায়(সমৃদ্ধশালী বড়গ্রাম) ছটিও পাঠশালার অস্তিত্ব উল্লেখ করেছেন পাদরিমশাই তার তিনদফা সমীক্ষায় লৌকিক বাংলার এই শিক্ষাসাজ, সমাজের সবাইকে নিয়ে বেঁচে থাকার দর্শণ, সমাজের সবার জন্য শিক্ষাসত্রে পাঠদানের আয়োজন, আজও আশ্চর্যজনক শুধু নয়, বাস্তবে এক মহতি উদ্দেশ্যওবটে অথচ ব্রিটিশ অনুগামী শহুরে-বাংলা আর কোম্পানি সরকার এই সনাতনে সার্বজনীন জ্ঞাণদান কাঠামো ভেঙে যে ব্রিটিশ শিক্ষা পদ্ধতি ভারতে রোপণ করতে চাইছিল, সেই সময়কার ব্রিটেনের শিক্ষাব্যবস্থায় তখনও সার্বজনীন শিক্ষার ধারণাটাই আসেনি, শিক্ষা ছিল মুষ্টিমেয়র ক্রয় যোগ্যবস্তু, এমনকী পঞ্চদশশতক থেকে বাইবেলও পড়ার অধিকার ছিলনা জনগণেশের বলা হয়ে ছিল, ‘that the English Bible should not be read in churches. The right of private reading was granted to nobles, gentry and merchants that were householders. It was expressly denied to artificers’ prentices, to journeymen and serving men “of the degree of yeomen or under”, to husbandmen and labourers’ so as ‘to allay certain symptoms of disorder occasioned by a free use of the Scriptures.’(ধরমপালজীর দ্য বিউটিফুল ট্রি বইটি থেকে গৃহীত) অন্যদিকে এই গুরুভার তথ্য লুকোতে ব্রিটিশ আর তার লুঠেরা সাম্রাজ্যে সহচর-অনুচর হয়ে খুদকুঁড়ো অর্জন করে ধনলাভ- খ্যাতিলাভ করা বাঙালিরা ধুয়ো তুলেছিল ভারতে নাকি নিম্নবর্ণের শাস্ত্রপাঠ নিষেধ আর তার সঙ্গে চিলচিত্কারে উঠছিল সনাতন সমাজের নানান ধরনের রিফর্মের দাবি! চালুনির আবার ছুঁচের বিচার!
Post a Comment