Friday, February 4, 2011

সাম্রাজ্যের বন্ধুরাঃ উচ্চ-মধ্যবিত্তের ঔপনিবেশিক চক্রান্তের মুখোশ৪


পরে শহুরে এংলিসিস্টদের ইংরেজবাদী আন্দোলনের সরাসরি অভিঘাতে বেন্টিঙ্ক, ট্রেভলিয়ান বা মেকলেরমত সাম্রাজ্যবাদীদের হাত ধরে, দেশের গ্রামীণ চিরাচরিত শিক্ষাব্যবস্থা একেবারে ভেঙে ফেলে, যে ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা পদ্ধতি ভারতের শহরগুলোয় প্রবেশ করবে, ভারত স্বাধীণ হওয়ার পরও তার সুফল ভোগ করে দেশ শাসনের অধিকারী হবে ব্রিটিশপথানুগামী ছদ্ম-ঔপনিবেশিক বাঙালি তথা শহুরে ভারতীয়রা আজ জোর দিয়ে বলা দরকার, এংলিসিস্টদের আন্দেলন কিন্তু শুধু ইংরেজি মাধ্যমে পঠন-পাঠন ব্যবস্থা চালুকরার দাবিমাত্র ছিল না, বরং সে আন্দোলন ছিল আরও বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তন সৃষ্টিকারী - ব্রিটিশ শিক্ষা পদ্ধতিকে নতমস্তকে ভারতের মাটিতে শেকড় গজানোর, ভারতীয় সাম্রাজ্যে শেকড় বিছোনোর সরাসরি উচ্চ-মধ্যবিত্তিয় চক্রান্ত অনেক দশক পরের ভারতআত্মাসন্ধানী বহু লেখক-গবেষক-উত্সাহী সে সময়কার এংলিসিস্টদের আন্দেলনের বিরোধিতা করতে গিয়ে দেশজ সংস্কৃত বা আরবি-ফারসী মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থা চালু রাখার ওরিয়েন্টালিস্টদের আন্দোলনের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন দৃঢ়ভাবে বাস্তব হল, দুপক্ষই আদতে ধণিক-বণিক-মধ্যউচ্চশ্রেণীর শহুরে সীমিত শিক্ষাব্যবস্থার পক্ষে অন্ততঃ ব্রিটিশ  সরকারের সঙ্গে মিলেমিশে মাসিক প্রায় পাঁচহাজার টাকা রোজগার করেও সে ধন ব্যক্তিগত বা পরিবারের সদস্যদের ভোগকরতে না দেওয়ারমত নতুন পথ তৈরি করা বিদ্যাসাগরমশাই নিজেই সার্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থার বিরোধিতা করেছেন মেকলের শিক্ষা প্রস্তাবের সমর্থনে লৌকিক ভারতজুড়ে যে সার্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থার শেকড় প্রোথিত হয়েছিল সমাজের অন্তঃস্থলে, কয়েক হাজার বছরের গ্রামীণ ভারতের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়, এই দুই আন্দোলন আদতে সেই হাজার হাজার বছরের প্রচেষ্টায় গড়ে-বেড়ে ওঠা সার্বজনীন সমাজভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার চরম বিরোধিতার পথে হেঁটে ভারতকে বিশেষ করে ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থার আদর্শে ঢেলে সাজাতে যথাসাধ্য চেষ্টা করে গিয়েছে
মনে রাখতে হবে পাদরি এডামের রিপোর্ট শুধু বাংলার শিক্ষাব্যবস্থার কথা বলে তাই নয়, এর পাশাপাশি ভারতের অন্যদুই প্রান্ত মাদ্রাজ আর পাঞ্জাবের দুটো রিপোর্ট যথাক্রমে Survey of Indigenous Education in the Madras Presidency in 1822-26 এবং G.W. Leitner-এর  History of Education in the Punjab since Annexation and in 1882-এও সার্বজনীন সামাজিক শিক্ষার পরিবেশের বর্ণনা পাই তত্কালীন উচ্চবেতনে নিযুক্ত কোম্পানির সরকারি উচ্চ পদের আমলাদের, ভারত ভাঙার প্রকল্পে উঠে আসা তথ্য নির্ভর, ভারতীয় সমাজ বিশ্লেষক, ব্রিটিশ কোম্পানি আর রাজ শাসনের কঠোরতম সমালোচক, ঋষি মার্কসের ভারতের সমাজের কাঠামো ভাঙা আর গড়ার প্রায়-নির্দেশিত পথে অসি হাতে ব্রিটিশরা ভারতীয় সমাজের ভিত্তিভূমি ভাঙার কাজ করেছে, চিরাচরিত জ্ঞাণ ভাণ্ডারে চৌর্যবৃত্তি করে তাকে নিজের করে নেওয়ার কাজে নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তি, লুণ্ঠিত সম্পদ নিয়োজিত রেখেছে দুর্ভাগ্য ভাঙন-কর্মটির ঐতিহাসিক দায় পূরণ করেছেন সে সময়ের ভারতীয়রা মসিঅস্ত্রমাত্রটি হাতে নিয়ে, নিজের সমাজকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলে - শুধু এইটুকু বলে দায় এড়িয়ে যাবার চেষ্টা যদি এই স্বাধীণ ভারতেও চলতে থাকে, তাকে ব্রিটিশ-ভারতীয় মধ্যবিত্তের যৌথ চক্রান্ত ছাড়া আর কী ভাষায়ইবা অভিহিত করা সমীচীন হতে পারে কে জানে বলাযাক, শুধুই ভারতীয়রা বললে শিল্পবিপ্লবের ধাত্রীভূমি ব্রিটিশিয় পদ্ধতিতে সত্যের অপলাপ হবে, অন্যান্য ভারতীয় সমাজকে হেয় করা হবে বলাভাল, প্রথম সত্তর বছরে সম্রাজ্যের এ সমাজভাঙার চক্রান্তের কাজে সর্বান্তকরণে ব্রিটিশ সহযোগী হয়েছিলেন বর্ণকুলীন শহুরে বাঙালি ব্যবসায়ী-চাকুরিজাবি সমাজ চক্রান্তের ভাগিদারির সুফলও পেয়েছেন শহুরে সমাজ হাতে গরমে সমাজভাঙার কাজ করে কেউবা হয়েছেন কেউকেটা, কেউবা পেয়েছেন ব্যবসার অংশিদারিত্ব, কেউবা পেয়েছেন সমাজ পরিবর্তনের অগ্রদূতের সম্মান, আবার কেউবা চিরযুবার মুকুট(ইয়ং বেঙ্গল)
পাদরি এডামের সমীক্ষা ধার করে যে তথ্য কয়েক ছত্র আগে বলাগিয়েছে, সে তথ্যকথা আবারও নতুন করে তুলে আনা যাক এংলিসিস্টদের আন্দেলনের একটি পরোক্ষ বক্তব্য ছিল সনাতন ভারতীয় জ্ঞান, গুরু আর ধর্মমুখী শুধু নয়, ভারতের পঠশালার অন্যতম সুবিধেভোগী ছিলেন ভারতের উচ্চবংশীয়রা গ্রামীণ তথা শহুরে বাংলার পাঠশালাগুলোতে নিম্নবর্ণের ছাত্রদের প্রবেশাধিকার ছিলনা এংলিসিস্টরা সে সময় খোঁজ করে দেখেন নি, ইংলন্ডের অক্সফোর্ড বা গ্রামার স্কুলগুলোতে প্রবেশাধিকার পেতেন দেশের অর্থবান আর সমাজবর্ণকুলীন পরিবারের সন্তানেরা কিন্তু এডামের রিপোর্টে ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা বর্ণনায় ঠিক এরই উল্টো তথ্যকথা বলা হয়েছে স্পষ্ট করে দুর্ভাগ্যের বিষয়, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উপকারিতায় আস্থারাখা এডামের রিপোর্টের সঠিক বিশ্লেষণ শহরের সামাজিক পরিসরে খুব একটা হয়নি প্রাথমিকভাবে ধরমপালজী আর দুএকজন ব্যতিক্রমী বিশ্লেষক-গবেষক-উত্সাহী ছাড়া, ভারত তথা বাংলার সনাতন সমাজের প্রতি অশ্রদ্ধায়, দায়সারা কাজেলিপ্ত নানান বর্ণকুলীন গবেষক তাদের গবেষণার কাজে নমঃনমঃকরে সমীক্ষার কথা তুলেইমাত্র কাজের অভিমুখ অন্যপানে ঘুরিয়ে দিতে চেয়েছেন পূর্ববাংলার বার্মাপ্রান্তথেকে বিহার পর্যন্ত, আবার জোর দিয়ে উল্লেখ করি, সমাজ পেষিত প্রায় প্রত্যেকটি পাঠশালায় যে সব ছাত্র পড়াগ্রহণ করত তাদের একটা বড় অংশ আজকের লব্জে নিম্নবর্ণের
হাজার হাজার বছর ধরে ভারত সমাজ যে জ্ঞাণ বিতরণ করে এসেছে সারা বিশ্বে, সেই জ্ঞাণকে ব্যবহার করে ব্যক্তিগত অসীম পরিমান লাভ আর মুনাফার পাহাড় তৈরি করার অধিকার শহুরে সমাজের হাতে অর্পণ করেননি সমাজের ধারক বাহকেরা ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে, পাল আমলে সমাজ পোষিত নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজারা পরিদর্শনে এলে ছাত্রছাত্রীরা রাষ্ট্রের অছি, রাজাকে সম্মান-অভ্যর্থনা জানাতেন, কিন্তু ওই পর্যন্তই পাঠে বিঘ্ন ঘটিয়ে, পাঠ ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে প্রণাম জানানোর রীতি ছিল না এমনই প্রায়-সার্বভৌম অধিকার ছিল সমাজের সনাতন সমাজ তার অর্জিত জ্ঞাণ-প্রযুক্তি শিক্ষার অধিকার বিদেশিকেও দিয়েছিল ভারতে নালন্দারমত বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি ছাত্ররা পড়াশোনা করে জ্ঞান আহরণ করে দেশি মাটিতে ফিরে গিয়েছে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা বিদেশে ব্যবসা করতে গিয়ে জ্ঞাণ বিতরণ করছেন এমন তথ্যও সুলভ পাঁচশো বছর আগেও জেসুইট পাদরিরা অংক বিদ্যা, পর্তুগিজরা চিকিত্সা বিদ্যাসহ ভারতের নানান জ্ঞাণ-প্রযুক্তি নথিবদ্ধ করে নিয়ে গিয়েছেন নিজেদের দেশে তখন ভারতীয় সমাজ তখন প্রায় সব কিছুতেই উত্তমর্ণ মেধাস্বত্বের নাম করে জ্ঞাণ নিয়ে ব্যবসার পথে হাঁটতে ঘৃণা করেছে জ্ঞাণ তাপস ভারতীয় সমাজ জ্ঞাণকে কুক্ষিগত করার পথে কদাচ হাঁটেনি সারা বিশ্বে শুধুই জ্ঞাণ বিলিয়েছে সে পাদরি এডামএর সমীক্ষায় সেই প্রমাণটি আবারও নতুন করে সামনে এল যতই বিলোবে জ্ঞাণ, তত যাবে বেড়ে এই সরল অথচ সাধারণ সামাজিক দর্শণে বলীয়ান ছিল বাংলার আর ভারতের নানান সমাজ জ্ঞাণ, দর্শণ আর প্রযুক্তির স্বভাবিক লেনদেন ছিল ভারতীয় আন্তঃসমাজেও নানান তীর্থস্থান, মেলা, উত্সবসহ বিভিন্ন কারণে যখন গ্রামীণ ভারতীয়রা একত্রে জড়ো হতেন, তখন তাঁরা আদান প্রদান করতেন পারস্পরিক অর্জিত জ্ঞান-বিদ্যা-প্রযুক্তি-ভাবনার এই চর্চা ব্রিটিশরা আসার আগে পর্যন্ত ভারতীয় সমাজে সজীব ছিল, কেননা রাষ্ট্রের ক্ষমতা ছিলনা এধরণের সামাজিক উদ্যমে হস্তক্ষেপ করা, অথবা সমাজের অনুমতির বাইরে গিয়ে নীতি প্রণয়ন করার যে সমাজ সারা বিশ্বকে একদা জ্ঞাণ-প্রযুক্তি অবলীলায় দান করেছে, সেই সমাজকে অমানবিক অশ্রদ্ধায়, পাশ্চাত্য সভ্যতার অনুকরণে পিছিয়ে পড়া, সামন্ততান্ত্রিকতায় আচ্ছন্ন বলে দাগিয়ে দেওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত আজ আজও একটু নতুনকরে ভেবে দেখি
Post a Comment