Friday, February 4, 2011

সাম্রাজ্যের বন্ধুরাঃ উচ্চ-মধ্যবিত্তের ঔপনিবেশিক চক্রান্তের মুখোশ৯


এই লেখাটির মূল উদ্দেশ্য দুশো বছরের ব্রিটিশ সরকার, ব্রিটিশ বুদ্ধিজীবি আর তার ভারতীয় অনুগামীরা বাংলা তথা ভারতের সমাজের দর্শণ, প্রযুক্তির ন্যুনতা অন্বেষণে, সনাতন সমাজ ভাঙার প্রচেষ্টায় যে নিরবিছিন্ন প্রচার চালিয়েছেন তার ভিত্তিমূলকেই প্রশ্ন তোলা ব্রিটিশ আর পশ্চিমি সভ্যতার নির্দেশিত পথে ইওরোপিয়ভাবনায় শহুরে ভারত গড়ার কারিগরেরা এতদিন প্রণম্য ছিলেন, তাঁদের অবদানের কথা বহু আলোচনা হয়েছে, কিন্তু ঔপনিবেশিক শাসন গড়ে তুলতে, বিদ্রোহী ভারতের বিরুদ্ধে পরেক্ষে যুদ্ধ ঘোষণা করতে তাঁদের অবদান কী তা না জানলে বিদ্রোহী বাংলার প্রতি যে সুবিচার অপেক্ষা করে রয়েছে তাকে সম্মান জানানো যাবে না
বিদ্রোহী বাংলা অথবা বাংলার প্রযুক্তি-দর্শণ নিয়ে অসত্য তথ্যের পাহাড় সরানোর কাজে আজ ব্রতী হওয়া দরকার সর্বাগ্রে আদিবাসী সমাজকে বাগে না আনতে পেরে, বেশকিছু আদিবাসী সমাজকে জন্ম অপরাধীর ছাপ মেরে দেওয়ারমত ব্রিটিশ সরকারি কাজের চক্রান্তমূলক সমর্থন এসেছে বর্ণ বাঙালিদের সমাজ থেকেই বাংলার লৌকিক আদিবাসী গ্রামীণ সমাজের বিদ্রোহ দমন করতে ব্রিটিশ সভ্যতা যে হোলি খেলেছে, তার প্রচারও খুব একটা হয়নি, যে রক্তের ছিটের দাগ আজও লেগে রয়েছে ইংরেজি জানা বর্ণহিন্দুর গায়ে, সে দাগ সহজে ভারতীয় সভ্যতা মুছতে দেবেনা এই কলমচির গায়েও সেই দাগ লেগে রয়েছে যে গনগনির মাঠে হাজার হাজার বিদ্রাহীকে ফাঁসি দেওয়া হয়, সেই গনগনিরমাঠ আজ অবহেলায় পড়ে রয়েছে বিদ্রোহীদের রক্তচিহ্নবুকে ধরে সারা বিশ্বে তার কৃতকর্মের জন্য অতীতের নানান সম্রাজ্য বিভিন্ন সমাজের কাছে ক্ষমা চাইলেও, বাংলার একের পর এক মন্বন্তর ঘটিয়েও, সামাজিক ভারতের গ্রামীণের অর্বুদ-পদ্ম পরিমাণ অর্থ লুঠ করে, জ্ঞান চুরি করে, সমাজকে ছিন্নভিন্ন করে, ব্রিটিশ হৃদয় নিষ্কলঙ্ক থাকে, শহুরে, দেশ ছাড়া বুদ্ধিবিভাষাময় বাঙালিরাও ব্রিটিশ অর্থে চিনির পলেস্তেরা ফেলা গবেষণা কর্ম করে নোবেল পান ভারতে বা বাংলায় তাদের কৃতকর্মের জন্য রাণীকে ক্ষমা চাইতে বলার সাহস এ কজন আন্তর্জাতিক নোবেলীয় ব্যক্তিত্বের হয় না
বাংলার বৌদ্ধিক জগতে একটি নির্জলা মিথ্যে প্রচারিত রয়েছে যে, বাংলা তথা ভারত নিরুপদ্রবে ব্রিটিশ শাসন মেনে নিয়েছিল লৌকিক ভারত নয়, এই শাসন মেনে নিয়েছিল প্রথমে শহুরে বাংলা, পরে শহুরে ভারত বাংলার রেনেসাঁর নাম করে গত দেড়শ বছর যে বৌদ্ধিক পিটুলি গোলা বিশ্ব তথা বাংলাকে মানতে বাধ্য করেছে ব্রিটিশ অনুগামী বুদ্ধিবিভাষা, যে প্রচারে সমগ্র বাংলা আজও বুঁদ, সেই অতিকথার হাওয়া-বেলুন চুপসে দেওয়ার কাজ করা আজ সর্বস্তরের ভারতসমাজপ্রেমী মানুষের অবশ্য কর্তব্য যখন হাজার হাজার সরল লৌকিক বা আদিবাসী সমাজ ঔপনিবেশিক ব্রটিশদের প্রতি ঘৃণায় হাতে অস্ত্রের তুলে নিযেছে, অবলীলায় প্রাণ দিচ্ছেন হাজার হাজার গ্রামীণ নর-নারী, তখন শহুরে ভারতীয় বুদ্ধিবিভাষার প্রধাণ পুরুষ রামমোহন আর তার অনুগামী দ্বারকানাথ আর তাঁদের শিষ্যগোষ্ঠী শিল্পবিপ্লবীয় দর্শনের পথে অতুলনীয় ধণে ধনী হতে গিয়ে প্রথমে লুঠেরা ব্রিটিশদের বেনিয়ানি করে, চাকরি করে, পর্বত প্রমাণ অর্থ অর্জন করেন
পরে সেই উত্পাতের অর্থে জমিদারি কিনে ভারতীয় রায়তদের শুধুই জোর করে আফিম বা নীল চাষ করতে বাধ্য করেন নি, আফিম আর নীল বিদ্রাহীদের সরাসরি বিরোধিতা করেছেন, বিদ্রোহীদের পরোক্ষে ঠেলে দিয়েছেন বাংলা জুড়ে তাণ্ডবলীলা চালানো ব্রিটিশ সেনার সামনে, লবন বিদ্রোহীদের বিরোধিতা করে, সরকারের লবন নীতির সমর্থন করে বুক ফুলিয়ে লবন ব্যবসা করেছেন, ভারতে ব্রিটিশদের জমি কেনার জন্য, দিল্লিশ্বরের জন্য কোম্পানির বরাদ্দ অর্থ বাড়াতে মহারাণীর কাছে লণ্ডনে দালালি করেছেন, চিনের সঙ্গে অনৈতিক আফিম ব্যবসায়ে সরাসরি জড়িত থেকেছেন, ভাইবেরাদারদের নিয়ে ব্যাঙ্ক খুলে আর কার টেগোর নামক কোম্পানি তৈরি করে নীল আর আফিম ব্যবসায় টাকা নিয়োগ করছেন, নীল চাষীদের রক্তে বোনা নীল রংএর ব্রিটিশ বণিক সাম্রাজ্যের সঙ্গে ব্যবসায়ে বাংলায় বড়তম অংশিদার ছিলেন, মহামান্য কেম্পানি বাহাদুরের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সরাসরি ভারতীয় সভ্যতার নামে ঘৃণা ছড়িয়ে অজস্র আস্থা অর্জন করেছেন, গ্রামীণ বাংলার সমাজিক বনিয়াদ ধ্বংস করে তার চরিত্র পাল্টে দেওয়ার কাজে সরাসরি যুদ্ধ করা ব্রিটিশ সেনারা যখন বিদ্রাহীদের রক্তে হোলি খেলছে, মেকলে, ট্রভলিয়নেরমত জাতিবিদ্বেষী ব্রিটিশ সরকারি আমলারা যখন কলকাতায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হাজার হাজার বছরের ভারতীয় সভ্যতার মুখে কালি ছেটাচ্ছেন, তখন ইংরেজি শিক্ষিত ভারতসমাজবিদ্বেষী বর্ণকুলীন নবজাগরণের বাঙালি কর্ণধার আর অগ্রদূতেরা রামমোহনের সাক্ষাত শিষ্য দ্বারকানাথ বেলগাছিয়ার বাগানবাড়িতে অশ্লীল নাচের আসর বসিয়ে মেকলেকে অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন মদের ফোয়ারা ছুটিয়ে, অজস্র অর্থ ব্যয় আর নষ্ট করেছেন অপচয়ের চরমে উঠে এ দেশে দ্বারকানাথ আর তার অস্বস্তির অপৌত্তলিকগুরু রামমোহনের যত জীবনী প্রকাশ হয়েছে, তাতে প্রায় প্রত্যেক লেখক উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে তাঁর বেনিয়ানি করে ঘুষ গ্রহণ, নুন আর আফিম বোর্ডে দেওয়ানি করে বামহস্তক্রিয়ায় বাস্তবে পাওয়া মাইনে থেকে অত্যন্ত বেশি আয় করা, ভারতে অত্যাচারী ব্রিটিশ নীলকরদের পক্ষ নেওয়া, নুন ব্যবসায় তার বিরুদ্ধে মালঙ্গীদের আন্দোলন নিয়ে সাধারণেই নীরব থেকেছেন
কুড়ির দশকেই নীলকরদের অত্যাচারে বাংলার চাষীরা হাতে অস্ত্র তুলে নেয় মনেরাখতে হবে বাংলার চাষীর একটা বড় অংশ ইসলামধর্মী তিতুমীর ছিলেন তাঁদের অন্যতম নেতা ততকালীন ভারতে নীলকরেরা কোম্পানি সরকারের কাছ থেকে কোনো আইনি রক্ষাকবচ পেত না ব্রিটিশ নাগরিকেরা ভারতভূমিতে জমিও কিনতে পারত না নীলকরেরা আইনি সুরক্ষা দাবি করলেন এটি উপনিবেশ গড়ার(কলোনাইজেশন) আন্দোলন নামে পরিচিত এই তত্বে রামমোহন দিয়েছেন সামাজিক-রাজনৈতিক ভিত্তিভূমি আর দ্বারকানাথ দিয়েছেন অর্থনৈতিক বনিয়াদ দ্বারকানাথের লেখায় বারবার উল্লিখিত হয়েছে নীল চাষে তিনি আর তার আত্মীয়দের অর্থনৈতিক উন্নতির সুগভীর বর্ণনা ১৮৩৩ সালের ভারতে ব্রিটিশ ইন্ডিয়া কোম্পানির একচেটিয়া ব্যবসার সনদ নতুনভাবে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে গৃহীত হওয়ার আগে থেকেই ভারতে জমি কেনার অধিকার পাওয়ার জন্য ব্রিটিশ নীলকর আর আফিম চাষীরা কোম্পানিকে যথাসম্ভব চাপ দিচ্ছিল রামমোহন আর দ্বারকানাথ সেই গোষ্ঠীরই পক্ষেই আন্দোলন করছিলেন তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ ব্রিটিশ আফিম আর নীল চাষীদের সঙ্গে জড়িত শিয়ালদায় সব থেকে বড় নীলের গুদাম ছিল দ্বারকানাথের ১৯২৩এর বড়লাট আমহার্ষ্ট-এর ষষ্ঠ আইনে বলা হল, সুদ-আসল তুলতে নীলকরেরা মামলা করতে পারবে ১৮২৮এ সংবাদ কৌমুদি ভারতে নীলকরেরা জোর করে ধানের জমি দখল করে নীল চাষ করানোর সংবাদ প্রকাশ করে ঐ বছরেই ২৬ ফেব্রুয়ারি দ্বারকানাথ ঠাকুর পত্রিকাটিতে একটি চিঠি প্রকাশ করে সংবাদের বিরুদ্ধমত প্রকাশকরে ভারতে ব্রিটিশ প্রজাদের, আদতে আফিম চাষী আর নীলকরদের জমি কেনার সপক্ষে সওয়াল করেন দ্বারকানাথের দাবি, এতে নীলকর জমিদারদের যেমন উপকার হবে তেমন গরীব চাষীদেরও একটু বেশি রোজগার হবে।। Rammohun believed that, the presence of British settlers would force the government to broaden political participation & to introduce British political institution in India, creating in the process a true British-Indian Empire… Rammohun suggested that immigration to be limited to Europeans of the high & better educated class -  খোলাখুলি বলছেন elite-পন্থী দ্বারকানাথের ব্রিটিশ জীবনীকার ব্লেয়ার বি ক্লিং তার Partner in Empire: Dwarakanath Tagore & the age of enterprise in Eastern India বইতে ব্লেয়ার যত সহজে রামমোহন বা দ্বারকানাথের পক্ষনিয়ে পরোক্ষে ব্রিটিশ সভ্যতার জয়গান আর ভারত ধংসের বীনা বাজাতে পারেন পারেন, শহুরে ভারতীয়রা পরবর্তীকালে ঠিক তত সহজ দক্ষতা নিয়েই ব্লেয়ারদের সুরে সুর মিলিয়ে সেই ধংসতত্ব সমর্থন করবেন! দ্বারকানাথের এই দাবির প্রতিধ্বনি তার দেড়শ বছর পর কন্ট্রাক্ট ফার্মিংএর প্রবক্তারা নতুন করে তুলবেন
Post a Comment