Friday, February 4, 2011

সাম্রাজ্যের বন্ধুরাঃ উচ্চ-মধ্যবিত্তের ঔপনিবেশিক চক্রান্তের মুখোশ২


অথচ জ্ঞাণী গ্রামীণ ভারত বরাবরই জানত, যে যায় লঙ্কায়, সে হয় রাবণ শাসকের চরিত্র সর্বকালে সর্বদেশে মোটামুটি একই গ্রামে বাঁধা তবে এও জানত, সমাজ স্থিতধী হলে শাসকদের নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় ভারতীয় সমাজ, দেশের শাসককে বহু বছরের প্রচেষ্টায় এক নির্দিষ্ট সামাজিক রীতি নীতিতে বেঁধে রাখার কাজে বেশ সফলকামও হয়েছিল শাসক আর শাসিতের মধ্যে একটি অদৃশ্য অথচ অলঙ্ঘনীয় রেখা টানা ছিল ভারতীয় সমাজে - এমনকী বিদেশি শাসক হলেও তার কোনো ছাড় নেই শাসকের অধিকার ছিলনা সহজে গ্রাম সমাজে স্থায়ীভাবে আঘাত হানার যুদ্ধ হত, কিন্তু রাজায় রাজায় তার প্রভাব কিছুটা সমাজে পড়লেও, সে প্রভাব ছিল ন্যুনতম, সমাজের সহ্যকরে নেওয়ার ক্ষমতা ছিল সনাতন সমাজ হাজার হাজার বছরের বহমান সভ্যতার জ্ঞানে ভারত, তথা বাংলাতেও শাসক-বণিকদের যে একটি ন্যুনতম সাধারণ সামাজিক বাঁধনে বেঁধে রাখতে সমর্থ হয়, সেই লাবণ্যময় বন্ধনের ডোরের কাঠিন্যে বেঁচেছে ভারত নামক যৌথ সমবায়ী সমাজটি যথনই কোনো উদ্দণ্ড শাসক সেই সামাজিক বাঁধনের বর্ম ভেঙে ফেলার চেষ্টা করেছে, তখন সেই সমাজে নেমে এসেছে বিনাশের কালো মেঘ আর সনাতন ভারত সে মন্বন্তর সময়ে নিজেদের গড়েপিটে নিয়ে নতুন প্রণোদনায় সাজিয়ে তুলছে নতুন উদ্যমে কোনো রাজবংশ, এমনকী কোনো সামাজিক সভ্যতা ধংস হয়ে গেলেও গ্রামীণ সমাজ সেই ধংসের বীজ থেকে শিক্ষা নিয়ে, পুরোনো সভ্যতার যা কিছু শুভ, যা কিছু অনুকরণযোগ্য, যা কিছু ছন্দোবদ্ধ জীবনের মালমশলা সে সমাজ তৈরি করছিল, তা নিজের করে নিয়ে, সম্পদ গুণোত্তর প্রগতিতে বৃদ্ধিপেতে থাকত - সমাজ আবার নতুন করে পথ চলতে শুরু করত পুরোনো ছন্দে –– পুকুরে ঢিল পড়ার কয়েক পল পরেই যেমন আবার পুকুরের জল নিজের শান্ত সমাহিত ছন্দে ফিরে আসে, যাকে অনড়-অজর-অচলায়তন অভিধায় ভূষিত করেছেন পশ্চিমি সাম্যবাদে দীক্ষিত শহুরে ইংরেজি জানা উচ্চবর্ণের জ্ঞানীগুণীজন
সেই গ্রামীণ ভারত তার চিরাচরিত প্রজ্ঞা প্রয়োগ করেই বুঝেছিল ব্রিটিশ শাসন সুখেরও সময় নয়, শান্তিরও সময় নয় - ব্রিটিশ শাসক পলাশি চক্রান্তের পর তার রাজদণ্ড নিয়ে প্রাণপনে শুষতে শুরু করেছে বাংলার সমাজকে কয়েক বছর পর ভারতের দেওয়ানির অধিকার পেয়ে সে সারা ভারতের একটা বড় অংশের সমাজকে লুঠে নিয়ে ছিবড়ে করা শুরু করেছে এ ঘটনা ভারতীয় গ্রামীণরা নিজের চোখে দেখেছে তার আগেই গ্রামীণরা বুঝেছিল, ভারত সমাজের কলজেয় হাঁটু গেড়ে বসে ফেড়ে রক্তারক্তি করে, এ মহাদেশোপম সনাতন সমাজে ছড়িয়ে থাকা হাজার হাজার বছরের সঞ্চিত ধণ-সম্পত্তিকে গ্রাস করে দেশে বয়ে নিয়ে যাবে তাই নয়, সভ্যতার সঞ্চিত নানান জ্ঞাণ, প্রযুক্তি, বিদ্যাভাণ্ডারও সে চুরি করে নিয়ে যাবে নিজেদের দেশে, নিজেদের ফুটো-ফাটা সভ্যতার প্রযুক্তিকে জোড়া তালি দিয়ে বিশ্বকে শোষণ করার কাজে লাগাবে ভারতের পারম্পরিক সামাজিক জ্ঞাণ পলাশির অভিজ্ঞতার মাধ্যমে ভারত সমাজের সব থেকে বড় অংশিদার, গ্রামীণ বাংলা সুবা হাতে অস্ত্রতুলে নিয়েছিল, শহুরে ভারতের বিপরীত পথে হেঁটে একের পর এক বিদ্রোহে ফেটে পড়ছিলেন বাংলার সাধারণ গ্রামীণ তখনও কিন্তু ছিয়াত্তরের মন্বন্তর বাংলায় হানা দেয় নি বাংলার অর্ধেক মানুষ ব্রিটিশ আর বাঙালি উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্তের চক্রান্তে শুধুই না খেতে পেয়ে মারা যান নি, একের পর এক শিল্পকর্মশাল, কারখানা ব্রিটিশ সরকারের জোর জবরদস্তিতে বন্ধহয়ে যায়নি
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বদান্যতায় ছড়ানো অসত্য বাচনের কুশলতায়, বিদেশি বুদ্ধিজীবি, এমনকী পশ্চিমি জ্ঞাণে, ঔপনিবেশিক পদ্ধতিতে জ্ঞাণ-প্রযুক্তি চর্চারত ভারতীয় জ্ঞানীগুণীদ্বারা বহুল প্রচারিত তথ্যমিথের বিপরীতে গিয়ে আজ জানতে পারছি, ভারতের চিরাচরিত জ্ঞাণসম্পদের অন্যতম প্রধান অধিকারী ছিলেন ব্রিটিশ আর ব্রিটিশ সরকারের সরসরি অনুগ্রহপুষ্ট তত্কালীন শহুরে শিক্ষিত সমাজ বর্ণিত তথাকথিত ছোটলোক অথবা আজকের আমেরিকিয় সমাজতাত্বিকতার লব্জে ব্যবহৃত তথাকথিত পিছিয়ে পড়া, গরীব, অন্ত্যজ দেগে দেওয়া সমাজ হাজার হাজার বছরের সভ্যতার কল্যাণে গড়ে ওঠা শিল্পকাঠামো, ধাতুবিদ্যা, নানান মন্দির-মসজিদ, বিশাল হর্ম্য, বাণিজ্যে যাওয়া বিশাল বিশাল নৌপোতেরমত হাজারো প্রযুক্তির বিকাশের প্রতিভূ আর ধারক ছিলেন এই বিশাল ভারতীয় সমাজের অগুন্তি গ্রামীণ জ্ঞাণী মানুষ
ব্রিটিশ শাসক প্রতিনিধি, পাদরি উইলিয়ম এডামের শিক্ষা প্রতিবেদনের ছত্রে ছত্রে শহুরে সমাজের না জানা অনেক তথ্য উঠে এসেছে, যদিও আজও এই তথ্য বাংলা বাজারে খুব একটা সুলভ নয় অদম্য সমগ্র ভারতীয় সমাজের কথা ছেড়ে দিলেও, প্রায় ৭০ বছরের ব্রিটিশ সরকারের লুণ্ঠনি-আগ্রাসণে ছিবড়ে হয়ে যাওয়া বাংলা-বিহারের যৌথ সমাজ এক লক্ষেরও বেশি পাঠশালার দায় ভরণ পোষণ করত পাঠশালাগুলিতে পাঠের আদত ভাগিদার ছিল কিন্তু চিরাচরিত বাংলা-বিহার সমাজের সংখ্যাগুরু খেটেখাওয়া গ্রামীণেরাই সে বিদ্যাস্থলে বিদ্যার্জণে পরগাছা কিছু উচ্চবিত্ত ছাত্র-ছাত্রী ঠাঁই পেলেও আদত জ্ঞাণ অর্জণের হকদার ছিলেন, ভারতীয় সভ্যতা যে মানুষেরা গড়েছেন, সেই সংখ্যাগুরু তথাকথিত নিম্নবর্ণই
ব্রিটিশদের কল্যাণে আজকাল বুদ্ধিবিভাষাময় জাগতিক শহুরে সমাজ গড়ে উঠেছে, যারা আদতে তত্কালীন ব্রিটিশ পোষিত, শহুরে বুদ্ধিবিভাষার উত্তরসূরীর থেকে কম কিছু ক্ষতি করেন নি আজকের শহুরে বর্ণকুলীণউচ্চমধ্যবিত্তর পূর্বসূরীরা প্রচার করতেন ভারতীয় পাঠমালা মানেই ভগবানের আরাধণা, আর পাঠে উচ্চবর্ণের আধিকার কিন্তু পাদরি এডামের বাংলা-বিহারের শিক্ষাব্যবস্থা সমীক্ষা এর উল্টো তথ্য বাখান করে সেই লাখো পাঠশালার কল্যাণে ব্রিটিশ লুঠ-ভিত্তিক শাসনের সত্তর বছর পর্যন্তও ভারতের শিক্ষা আর অর্থনীতি ছিল উত্তমর্ণ, ভারতীয় সমাজে সাধারণতঃ বিদেশি দ্রব্যের, বিদেশি শিক্ষার খুব বেশি চাহিদা ছিলনা ব্রিটিশ শাসক-বনিকের অমানবিক অত্যাচার সয়ে তখনও পর্যন্ত সেই উত্পাদনের দায়ভাগ সামলাতেন সাধারণে অসাধারণ ভারতীয় গ্রামীণেরাই তখনও লৌকিক ভারতের জনগণ ছিলেন স্বদেশি উত্পাদনের পাশে- আর শহুরে ইংরেজি শিক্ষিত শিক্ষতরা সানন্দে ইংরেজদের আর ব্রিটিশ সরকারের গ্রামীণমারা নীতির পাশে ছিলেন তাই নয়, সেই নীতি কঠেরভাবে রূপায়ণ করতেও সরাসরি সাহায্য করেছেন
Post a Comment