Sunday, January 22, 2012

ভারতীয় সমুদ্রপোত প্রযুক্তি১


ভারতে সমুদ্রপোত তৈরির প্রাচীনতম সময়কে ধরতে গেলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে ন্যুনতম তৃতীয় সহস্রাব্দে, সরস্বতী-হরপ্পা সভ্যতার সময়ে জাহাজ তৈরি এবং সারাইএর জন্য সমুদ্র বন্দর লোথালে ড্রাই ডক তৈরি করার প্রযুক্তি আবিষ্কার করতে পেরেছিল সে সময়ের প্রযুক্তিবিদেরা ১৯৫৫তে এই আবিষ্কার ভারতীয় সমুদ্র বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এক বড় আবিষ্কার লোথালে ২১৪ মিটার লম্বা এবং ৩৬ মিটার চওড়া একটি বিশাল চৌকো ট্রাপিজিয়ামের আকারে একটি মস্ত পুকুর আবিষ্কৃত হয়েছে, একেই যে ড্রাই ডক বলছেন বিশেষজ্ঞরা এই পুকুরের চারটি দেওয়ালই পোড়া ইঁটের দেওয়ালের চাদরে ঢাকা, এবং চারস্তর পুরু এবং ৩ মিটার গভীর(বিশেষজ্ঞদের ধারণা এই গভীরতা সে সময় আরও বেশি ছিল) এটি স্ট্রটিগ্রাফিক্যালি সবরমতী নদীর তীরের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল দক্ষিণপ্রান্তটি তুলনামূলকভাবে অগভীর এবং চওড়াটি বেশ কমেরদিকে এটি ডকের ইনলেট চ্যানেল, বলছেন বিশেষজ্ঞরা এছাড়াও এটিতে একটি স্পিল চ্যানেল রয়েছে যাতে একটি স্লুইস দরজাও লাগানো এস আর রাও বলছেন এই পুকুরটি দুটি স্তরে কাজ করত প্রথমস্তরে ১৮-২০ মিটার লম্বা আর ৪-৬ মিটার চওড়া দুটি মোটামুটি বড় জাহাজ একই সঙ্গে সহজে ডকে ঢুকতে আর বেরোতে পারত দ্বিতীয়স্তরে ইনলেট চ্যানেলটি ছোট করে তুলনামূলকভাবে চ্যাপটা তলাওয়ালা একটিমাত্র বড় জাহাজ ঢুকতে পারত
পোড়ামাটির তৈরি একটি পোতের ক্ষুদ্র সংস্করণ আর একটি সিল পাওয়া গিয়েছে যা দেখে কী ধরণের জহাজ সমুদ্রে যেত তা আন্দাজ করতে পারছেন বিশেষজ্ঞরা লোথাল বন্দরের আবস্থান আহমেদাবাদের ৫০ কিমি দক্ষিণ-পশ্চিমে বর্তমান সরগওয়ালা গ্রামের কাছে আর বর্তমানের সবরমতী আর ভোগাভা নদীর মধ্যবর্তীতলে এবং ক্যাম্বেতটের গাল্ফের থেকে ১২ কিমি দূরে এবং বিশেষদজ্ঞদের ধারণা সে হাজার পাঁচেক বছর আগে লোথাল অনেক বেশি সমুদ্রের কাছে ছিল সবরমতী নদীর সিল্টেশনের হার তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি সরস্বতী-হরপ্পা সভ্যতায় লোথাল বড় বাজার এবং বড় বন্দরের দায়িত্ব পালন করত, বংপুর অথবা কাথেরমত নানান স্থানীয় জনপদের অঞ্চলের উত্পন্ন দ্রব্য বিশ্বের বাজারে পাঠানোর বড় দায় পালন করত অন্যদিকে বিদেশি দ্রব্যেরপ সঙ্গে বার্টারও করতে সাহায্য করত ভারতের পশ্চিম তট থেকে উত্পন্ন দ্রব্যসমূহ ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের একদিকে মেসোপটেমিয়া অন্যদিকে বাহারিনের তটে পৌঁছে দেওয়ার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেরমত সেবাকর্ম করত লোথাল যে সব দ্রব্য বিদেশের বাজারে কদর ছিল সেগুলি হল রুটি, শাঁখের কাজ, ব্রোঞ্জের কাজ এবম হাতির দাঁতের সূক্ষ্মকর্ম বিভিন্ন ধরণের গাড়ি, চ্যাপটা নৌকো করে এই দ্রব্যগুলি বন্দর শহরে বয়ে নিয়েআসত ব্যবসায়ীরা আজকের দিনেও চ্যাপটা নৌকোয় করে মনুষ্য এবং বিভিন্ন হালকা ধরণের উত্পন্ন দ্রব্য বাহিত হয় সরস্বতী-হরপ্পার অধিবাসীরাও সেদিনও একই ধরণের নৌকো ব্যবহার করত স্থানীয় বড় জলাশয় এবং নদী পরিবহনে সমুদ্রে ব্যবহৃত হত পালতোলা আর হালচালানো নৌকো
হরপ্পার অধিবাসীরা শুধু যে অসম্ভব কার্যকরী এবং উচ্চপ্রযুক্তি ব্যবহার করে উচ্চমানের বন্দর তৈরি করেছিল তাই নয়, সেই বন্দরে রপ্তানির নানান দ্রব্যের ব্যবস্থাপনার পরিকাঠামোও গড়ে তুলেছিল লোথাল ঘিরে গড়ে উঠেছিল একের বেশি ছোট বন্দরসমূহ ভাগতারভ, সুতকাজেন্দর, সুতকাখা তবে এদের মধ্য সব থেকে বড়টি ছিল ধোলাভিরায় মনেরাখতে হবে সব কটি বন্দর অবস্থিত ছিল আজকের গুজরাটের ভৌগোলিক এলাকায়
মহেঞ্জাদারোয় একই ধরণের উচ্চ প্রো(prow) ওয়ালা জাহাজের খোদাই পাওয়া গিয়েছে একটি সিলে স্টার্নটি রিড দিয়ে তৈরি হত মধ্যভাগে থাকত একটি চৌকো কেবিন যে পাঁচটি পোতের ক্ষুদ্র সংস্করণ পাওয়া গিয়েছে তাদের একটিমাত্র গোটা রয়েছে এবং সেটির পালটি তোলা
সিন্ধু(আজকের পাকিস্তানে)র রাজা পুষ্যদেব ৭৫৬ খ্রি. আরব নৌপোতগুলিকে পশ্চাদপসরণ করতে বাধ্য করেছিলেন এই ঘটনা থেকে এই অঞ্চলের নৌশক্তির একটা আঁচ পাওয়া যায় একাদশ শতকের যুক্তিকল্পতরু পোত তৈরির বর্ণনা দিচ্ছে এবং নানান পোতের বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেছে মনুষ্য পরিবহন, পণ্য পরিবহন, মাঠধরা অথবা খেরি করাবার বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত জলযানকে বিভিন্ন নাম দেওয়া হচ্ছে সামান্য, মধ্যমা অথবা বিশেষ ঋগ্বেদে কিন্তু ভারতে প্রাপ্ত সবথেকে পুরোনো জলযানের উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে
অন্যান্য কর্মেরমতই জলযান তৈরির কাজটি পারিবারিক এবং বংশ পরম্পরাগতভাবে বয়ে যেত এই কাজটি বিশেষ একটি সম্প্রদায়ের মানুষের একচেটিয়া ছিল মাপ হিসেবে আঙুল, হাত অথবা পাএর মাপ ব্যবহার করত বহিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ধরণের জলযান তৈরি হত নানান জলযানের মাপ, প্রযুক্তি এবং কাঁচামালের অনেক সাদৃশ্য ছিল সাধারণতঃ পোত তৈরিতে টিক কাঠ ব্যবহার হলেও আদতে বিভিন্ন জলযানের জন্য বিভিন্ন ধরণের কাঠই ব্যবহার করা হত
Post a Comment