Tuesday, November 1, 2011

এডামের শিক্ষা প্রতিবেদন৩

তিনি গুরুমশাইদের পাওয়া মাইনের সঙ্গে গ্রামের প্রায় একই স্তরের কাজ করা মানুষের রোজগারের বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন। স্থানীয় জমিদারদের নানান কাজে যারা নিযুক্ত হতেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন পাটওয়ারি, আমিন, শুমারনাভি আর খামারনভিস। পাটওয়ারির কাজ ছিল বাড়ি বাড়ি গিয়ে জমিদারদের খাজনা উশুল করা, মাইনে পেতেন দুটাকা আট আনা সঙ্গে রায়তদের কাছথেকে শষ্য উঠলে বেশ কিছু জিনিষপত্তরও যার প্রায় মূল্য আট আনা, সবে মিলিয়ে তিন টাকা। আমিনদের কাজ ছিল জমিদারদের পক্ষে গ্রমের জমিজমার পরিমান মেপে বিবাদের সমাপ্তি ঘটাতেন। তিনি পেতেন মাসে সাড়ে তিন টাকা থেকে চার টাকা। শুমারনভিস পাটওয়ারিদের আদায়ের হিসেব রাখতেন, পেতেন পাঁচ টাকা প্রতি মাসে। আর অনেক জমিদার জমির ফসল থেকেই যখন খাজনা আদায় করার জন্য খামারনভিস রাখতেন তারা অনেক কম অর্থ পেতেন। জমিদারিতে যেসব আমলা কাজকরতেন তাদের অনেকেরই উপরি আয়ের সুযোগ থাকত, যে সুযোগটি এই গুরুমশাইদের ছিলনা।
গ্রামে পাঠশালার জন্য আলাদা করে গৃহ স্থাপিত হত না। যে স্থানে বটুরা পাঠ নিত সেই স্থানটি নানান কাজে নানাম সময়ে ব্যবহৃত হত। কেউ কেউ চন্ডিমন্ডপেই পাঠদিতেন, পাঠগ্রহণ ছাড়াও সেখানে সারা বছর নানান ধরনের পুজো, পার্বন ও অনুষ্ঠান হত। কোথাও কোথাও গ্রামের আড্ডার জন্য নির্দিষ্ট বৈঠকখানায়ও এই পাঠশালা আয়োজিত হত। কোনো কোনো পৃষ্ঠপোষক আবার নিজের বাস্থানের এক অংশ ছেড়ে দিতেন পাঠশালের জন্য। ৩০-৪০বটর জন্য যে সব পাঠশাল, সেগুলো বছরের শুকনো সময়ে খোলা যায়গায় আর বর্যার সময় তিন চারটি অস্থায়ী পাতায় ছাওয়া কুঁড়ে ঘরে হয়। বেশি বর্যা এলে বটুদের পাততাড়ি্ গুটেতে হত। ছাপার হরফে পুস্তকের কথা গ্রামাঞ্চলে কেউ জানতইনা বলা চলে। তবে কিছু কিছু ছাপাই পঞ্জিকা(এলম্যনাক) অবস্থাপন্ন পরিবারের গৃহস্থরা কলকাতা থেকে কিনে নিয়ে যেতেন। একজনও গুরুমশাই ছাপার বই দেখেননি। এডাম এদের স্কুল বুক সোসাইটির প্রকাশনায় পুস্তক দেখান। গুরুমশাইরা এগুলো খুবেশি গুরুত্ব দেননি। সোসাইটি বইগুলি বিক্রির জন্য বাউলিয়ায় একজন দালাল ঠিক করেছে বলেও তিনি জানান। প্রত্যেক গুরুমশাই তাঁর স্মৃতি থেকে আবৃত্তি করে পাঠদান করতেন। পাঠশাল শেষ হত স্বরস্বতী বন্দনা দিয়ে। একজন নেতা পোড়ো এই বন্দনা আবৃত্তি করত, বটুদের প্রত্যেককে ভুঁইএ মাথা ঠেকিয়ে বন্দনার একটার পর একটা স্তবক আবৃত্তি করতে হত যাতে এই বন্দনাটি তাদের স্মরণে থাকে। এছাড়াও ছড়ায় ছড়ায় শুভঙ্করী(এডামের ভাষায় ককার অব বেঙ্গল)ও শেখানো হত।
বাঙলা মাধ্যমে শিক্ষাদানের চারটি স্তর ছিল। প্রথম পর্বে মাটিতে বাঁশের বাঁখারি বা লাঠি দিয়ে আঁক কেটে অক্ষর শেখানো হত। জেলায় সাধারণতঃ অর্থ সাশ্রয়ের জন্য বালির বেদি ব্যবহার করা হত। এই পর্ব দশ দিনের বেশি চলত না। দ্বিতীয় পর্বে তালপাতার ওপর লেখা আর অক্ষরের উচ্চারণ শেখানো হত। এসময় অক্ষরগুলোর মাপ শেখানো হত না। এই পর্ব চলত দুবছর থেকে চার বছর পর্যন্ত। এ সময় যুক্তাক্ষর, স্বরভক্তি(syllables formed by the junction of vowels with consonants), সাধাহর স্থান নাম, ব্যক্তির নামও শেখানো হত। অন্য গ্রামগুলিতে জাতি, নদী, পর্বত এত্যাদের নামও শেখানো হত। কড়ি আর শতকিয়াও শেখানো হত। কাথা(জমির মাপ) তালিকা, সের তালিকা(ওজনের মাপ)ও শেখানো হত। তৃতীয় স্তরও দুই থেকে তিন সপ্তাহ। এ সময় প্ল্যানটোন পাতা(কলাগাছের পাতা!) দিয়ে শব্দ দিয়ে সরল বাক্য শেখানো হত। শব্দের কথ্য আর লেখন পার্থক্যও মুখে শেখানো হত(abbreviated in speech by the omission of a vowel or a consonant, or by the running of two syllables into one)। এই শেখাকে লিখতেও শেখানো হত। correct orthography of words of Sanscrit origin which abound in the language of the people। এই সময়ে বটুদের শেখানো হত সরল অঙ্ক, যোগ-বিয়োগ। কিন্ত গুণ আর ভাগ আলাদা আলাদা করে শেখানো হত না। গুনের নামতা ২০ অবদি মুখস্ত করতে হত। রোজ পাঠশালা শুরু হওয়ার পরই এই নামতা পড়ানো হত।
সাধারণ অঙ্ক শেখার পর কৃষি আর সাধারণ বাণিজ্যের অঙ্কও শেখানো হত। কৃষিতে বা বাণিজ্যে জমা-খরচের খাতা কীভাবে রাখতে হয়, তাও শেখানো হত। দৈনিক মজুরির হার থেকে মাসিক অথবা বার্ষিক মজুরির হার বার করতে হত। কাঠা আর বিঘার মধ্যেকার সম্পর্কও অঙ্ক কষে বার করতে হত। দৈর্ঘ, প্রস্থ দেওয়া থাকলে একটি জমির সাধারণ ক্ষেত্রফল কী হবে তাও জানতে হত। একটি নির্দিষ্ট পরিমান জমি থেকে কত খাজনা দেয় হয় তাও জানতে হত বটুদের। খাতা রাখার সাধারণ হিসেবও শিখতে হত বটুদের। সের মনএর মধ্যেকার আর তোলা আর ছটাক সম্পর্কও কষতে হত। প্রত্যক টাকায় আনা আর কড়ির সংখ্যাও শেখানো হত। এক টাকার সুদও কষতে হত। একটাকার কমের মুদ্রামানের বিনিময় মূল্য – বাটাও শেখানোর ব্যবস্থা ছিল। চতুর্থ বা শেষস্তরে দুই বা তিন বছরের মধ্যে শেষ হত। এই পর্বে থাকত ব্যবসার পদ্ধতি, ব্যবসার চিঠি, গ্রান্ট, লিজ, একসেপটেন্স, হাত চিটা ইত্যাদি শেখানো হত। এক বছরের মধ্যে যে বটু নিজে নিজেই এ সমস্ত লিখতে পারত তাকেই কৃতকার্য রূপে ধরে নেওয়া হত। এছাড়াও রামায়ন মনসা মঙ্গলের নানান ছত্রও আবৃত্তি করতে হত।
সমীক্ষা অনুসারে বাংলায় তিন ধরণের উচ্চশিক্ষার উচ্চ পাঠশালা ছিল। কোথাও ব্যকরণ, অলঙ্কার, আর কোথাও কোথাও পৌরাণিক কাব্যও পড়ানো হত। দ্বিতীয়গুলিতে স্মৃতি আর কিছুটা পৌরাণিক কাব্য পড়ানো হত। তৃতীয় উচ্চ পাঠশালাগুলি লজিককে কেন্দ্র করে গড়ে উঠত। এই তিনধরণের বিদ্যালয়ে নির্দিষ্ট কিছু পাঠ্য পড়ানো হত। গুরুমশাই কিন্তু এই সব পাঠদান কেন্দ্রে দীর্ঘ বক্তৃতা দিতেন না। পাঠশালাগুলিতে ছাত্ররা নানান প্রশ্ন করত আর গুরুমশাই তার উত্তর দিতেন। প্রত্যেক শ্রেণীকক্ষে নির্দষ্ট মানের ছাত্রদের তাদের পাঠগ্রহণের ক্ষমতা অনুযায়ী আলাদা আলাদা করে বসানো হত। সামনে পুঁথি খুলে সবথেকে ভাল পড়তে পারা ছাত্রটি সশব্দে পাঠগুলি উচ্চারণ করত, শিক্ষক তার উত্তর দিতেন। এই ভাবে পড়াশোনা এগোত। সাধারণ ব্যকরণ শিখতে দুই থেকে ছয় বছর পর্যন্ত সময় লাগত, কিন্তু পাণিনী শিখতে নিদেন পক্ষে লাগত দশ বছর কখোনো আবার বারো বছরও। ব্যকরণ শেখার পর কাব্য, মীমাংসা আর দর্শণও পাঠ নিতে পারত। যে সব ছাত্র ন্যায় অথবা মিমাংসা পড়ত তাদের সময় লাগত ছবছর পর্যন্ত। এমনকী তাকে অন্য বিদ্যালয়েও যেতে হত। ওয়ার্ড বলছেন একলাখ ব্রাহ্মণের মধ্যে এক হাজারমাত্র সংস্কৃত ব্যকরণ শিখতেন, এদের মধ্যে চারশ থেকে পাঁচশ কাব্য পড়তেন, পঞ্চাশ জন হয়ত অলঙ্কার শাস্ত্রে পন্ডিত ছিলেন। এই হাজারের মধ্যে শচারেক স্মৃতির পাঠোদ্ধার করতে পারতেন। এদের মধ্যে মাত্র জনা দশেক তন্ত্র সম্বন্ধে বিশারদ ছিলেন। ন্যায় বিশারদ ছিলেন শতিনেক, পাঁচ থেকে ছজন শুধু মিমাংসা, বেদান্ত, পতঞ্জলি, বৈশেষিক অথবা বেদ পড়াতে পারতেন। দশজন জ্যোতির্বিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন। পঞ্চাশ জনের কাছাকাছি শ্রীভাগবত বা পুরাণ মুখস্ত করতেন।
Post a Comment