Tuesday, November 1, 2011

এডামের শিক্ষা প্রতিবেদন২

এডাম পাঁচটি জেলায় যে বিষয়গুলি নিয়ে বিশদে তথ্য গ্রহণ করেন, ১) বুনিয়াদি পাঠাশালা আর বটুদের জাত বিভাগ, ২) ঐ আর গুরুমশাইদের জাত বিভাগ, ৩) কী ধরনের পাঠদানব্যবস্থা ছিল, ৪) সংস্কৃত শিক্ষার অবস্থা কী ছিল, ৫) সংস্কৃত শিক্ষায় কী ধরনের বই ব্যবহৃত হত, ৬) পারসিক আর আরবি উচ্চ পাঠশালাগুলির বিশদ ৭) এই উচ্চ পাঠশালাগুলোতে কী ধরনের বই ব্যবহার হত ইত্যাদি। পাঠশালাগুলি নিয়ে এডাম কী বলছেন একটু শুনি। তাঁর মতে বাংলা আর বিহার মিলিয়ে, ১,৫০,৭৭৪টি গ্রামে বাংলা-বিহারে এক লাখেরও বেশি পাঠশালা রয়েছে। সবকটি গ্রামে নাথাকলেও অধিকাংশতেই পাঠশালা বিদ্যমান। কোনো কোনো গ্রামে ছটাও পাঠশালার খবর পাওয়া যাচ্ছে। পাঠশালাগুলির উপযোগিতা নিয়ে এডামের বক্তব্য, It is not, however, in the present state of these schools, that they can be regarded as valuable instruments for this purpose। The benefits resulting from them are but small, owing partly to the incompetency of the instructors, and partly to the early age at which through the poverty of the parents the children are removed।
পাঠদান শুরু হত পাঁচ বা ছবছরেই। এই বুনিয়াদি শিক্ষাদান চলত পাঁচ বছর ধরে। বটুদের দেয় অর্থের ওপরেই গুরুমশাইদের দিনগুজরান হত। নিজেদের রোজগার বাড়াবার জন্য গুরুমশাইরা প্রতিবেশি অঞ্চল থেকে সম্মানীয় বা অর্থবান পরিবারের বটু ভর্তি করত। পাঠদানপদ্ধতি নিয়েও এডাম বিশদে বলেছেন। স্বরবর্ণ শিক্ষা সমাপ্ত হলে ব্যাঞ্জনবর্ণ শিক্ষাদান হত। মাটিতে বালি লেপে তার ওপরে আঙুল অথবা লাঠি্দিয়ে এই বর্ণগুলি মকশ করা হত। এরপর মাটিতে সাদা লাঠি দিয়ে ফুটিয়ে তোলাহত বর্ণগুলোর চেহারা। এই কাজটি চলত আট থেকে দশদিন পর্যন্ত। এরপর লালা রঙএ খাগের কলম তালুতে(এডাম স্পষ্ট বলছেন আঙুলে নিয়ে নয়) ধরে সেটি তালপাতার ওপর কালোরঙএর ভুসো কালিতে চুবিয়ে, স্বরবর্ণের সঙ্গে ব্যাঞ্জন বর্ণের মিলন, যুক্তবর্ণ, স্বরভক্তি(সিলেবল), শব্দ শিখতে হত। এ ছাড়াও তারা শিখত নিউমারেশন, টাকা, ওজন(ওয়োটস ওন্ড মোজার্স) আর বিভিন্ন ব্যক্তি, জাতি, ও স্থানের নাম সঠিকবর্ণে সঠিকভাবে লিখতে পারা শেখানো হত। এই কাজগুলি চলত এক বছর ধরে। এরপর এডভানসড স্টাডি। বাতির কালোশিষ ধরে কলাপাতায় শেখানো হত সাধারণ যোগ বিয়োগ গুণ ভাগ। এরপর খুব সরল জমি, বাণিজ্য ও কৃষিকাজের জন্য পাটিগণিত শেখানো হত। গ্রামের পাঠশালাগুলিতে কৃষিবিযয়ক অঙ্ক বিশেষ করে করানো হত। আর শহরে নানান বাণিজ্যে দিকগুলি নিয়ে অঙ্ক শেখানো হত। তিনি বলছেন বটুদের নীতি শিক্ষা দেওয়ার জন্য কোনো বিদ্যালয়েই পাঠ্যপুস্তকের প্রচলন ছিলনা। তাঁর মতে এতে বটুদের নীতিশিক্ষা হত না।
তিনি বলছেন হিন্দু আইন অনুযায়ী বটুদের পাঠগ্রহনের প্রবেশের বয়স ছিল পাঁচ বছর। পাঁচবছরে না হলে, সাত বা নয়, বিজোড় বছরেও পাঠ শুরু হত। বছরের এক নির্দিষ্ট মাস, মাসের এর নির্দিষ্ট সপ্তাহ আর সপ্তাহের এক নির্দিষ্ট দিনেই একটি ছাত্রের পাঠদানপ্রক্রিয়া শুরু হত। এই দিনেই পরিবারের পুরোহিত, দেবী সরস্বতীর পুজো দিয়েই ছাত্রের হাত ধরে বর্ণের ওপর মকশ করিয়ে সেগুলি উচ্চারণ করতে বলতেন। তবে প্রত্যেক হিন্দুই যে এ ধরণের পুজো-অর্চনা পালন করত তা বলা যায় না, যাদের বিশেষরূপে পাঠদানের সামর্থ রয়েছে, একমাত্র তারাই এ ধরনের পুজার্চনা করতেন এবং পরেরদিন থেকেই সন্তানকে বিদ্যালয়ে পাঠাতেন। তবে রাজসাহিতে এ ধরনের কোনো নির্দিষ্ট বয়স দেখিনি। ছাত্রের পাঠ গ্রহণ ক্ষমতা অথবা পরিবারের আর্থিক সামর্থের ওপরেই নির্ভর করত পাঠশালায় প্রবেশের বয়স। তবে কোন বয়সে শুরু করছে, তার ওপরেই নির্ভর করত কবে সে উচ্চ পাঠশালা থেকে কবে ছাড়া পাবে। তিনি নাটোরএর ১৭৬টি পাঠশালার উল্লেখ করছেন, যেখানে পাঠশালায় প্রবেশর বয়স পাঁচ থেকে শুরু করে দশ বছর পর্যন্ত ছিল। কোনো শিক্ষক থেকে শিক্ষকে পাঠদানের সময়সীমা বদলাত – পাঁচ থেকে দশ বছর।
শিক্ষকেরা তরুণ থেকে প্রবীণ পর্যন্ত হতেন। তারা সরল, সধারণ, অজ্ঞ(ইগনোরেন্ট) এবং গরীব তাই অন্য কোনো পেশায় প্রবেশের সুযেগ থাকে না। কিন্তু যে অঞ্চলে তাঁরা পাঠদান করেন সেই অঞ্চলে তাঁদের সম্মান ছিল অপরিমিত। তারা অনেকেই জানতেন না কী গুরুত্বপূর্ণ কাজ তাঁরা করছেন। যে কাজ করছেন, তার পেছেনে তাদের খুব একটা ভাবনা চিন্তাও ছিল না। বটুদের ওপরেও তাদের প্রভাবও বেশি হত না। এছাড়াও শিক্ষকদের সম্বন্ধে তিনি খুব একটা উচ্চধারণা পোষণ করতেন না তা তাঁর প্রতিবেদন থেকেই স্পষ্ট। শিক্ষকদের সাম্মানিক আসত শুধুমাত্র বিভিন্ন সূত্রে। দুজন শিক্ষক তাঁদের সমগ্র আর অন্যরা সাম্মানিকটুকুর একাংশ পেতেন গ্রামের কোনো সহৃদয় দানশীল ব্যক্তির দান থেকে। এক চতুর্থাংশের সাম্মানিক আসত বটুদের দেয় অর্থের থেকে। অন্যান্যদের সাম্মানিক আসত কিছুটা অর্থ আর কিছুটা পণ্যদ্রব্যের বিনিময়ে। সাধারণ ভাবে তিনটিস্তরে পড়াবার মাধ্যমের বিস্তৃতি ছিল, প্রথমটি মাটি, তালপাতা, শেষ মাধ্যম ছিল কাগজ। প্রত্যেক স্তরে পাঠাদানের শুরু থেকে আরও একটু বেশি মাইনে ধার্য হত। কোথাও কোথাও প্রথম আর দ্বিতীয়স্তর একটিস্তর হিসেবেই দেখা হত। কোথাও কোথাও দ্বিতীয় আর তৃতীয়স্তরে একই মাইনে দাবি করা হত। কোথাও আবার প্রত্যক স্তরের জন্য একই অর্থের মাইনে ছিল। তবে সাধারণঃ প্রত্যেকস্তরের জন্য আলাদা আলাদা পরিমান অর্থই দাবি করা হত। আবার বটুদের পরিবারের স্বচ্ছলতার ওপর নির্ভর করত মাইনে। অর্থবানদের তুলনায় গরীব বটুদের কখোনো অর্ধেক, কোথাও একচতুর্থাংশ, কোথাও আবার একতৃতীয়াংশ অর্থ মাইনে হিসেবে নেওয়া হত।
গুরুদের মাইনে মাসে চার আনা থেকে শুরু করে পাঁচ টাকা পর্যন্ত হত। যারা কম অর্থ পেতেন তাদের কাপড় দেওয়া হত, আর চাষীদের কাছ থেকে চাষের জিনিষও পেতেন। এছাড়াও কেউ হয়ত শুধুই প্রতিদিনকার খাদ্য পেতেন, কেউবা এর সঙ্গে পরিধেয় ধোয়া, অথবা তাঁর সমস্ত খরচপাতিও পেতেন। যিনি খাদ্যপেতেন তাঁর হয় নিজের বাসস্থান থাকত অথবা গ্রামের অবস্থাপন্ন ব্যক্তির ভদ্রাসনে থাকতেন। সামগ্রিকভাবে শুধু আর্থিক অথবা কিছুটা আর্থিক আর কিছুটা অন্যান্যভাবে যাঁরা রোজগার করতেন, তাঁদের প্রত্যেক মাসের রোজগার ছিল তিনটাকা আটআনা থেকে সাত টাকা আট আনা পর্যন্ত, গড়ে পাঁচটাকার বেশি সকলেই রোজগার করতেন। তিনি উদাহরণস্বরূপ ধারাইলের বিদ্যালয়ের কথা উল্লেখ করেছেন। এই গ্রামে চৌধুরিদের চারটি পরিবার বাস করত। এরাই গ্রামের সম্ভ্রান্ত। কিন্তু এদের আর্থিক অবস্থা এত ভাল ছিলনা, যে অন্যান্যদের সাহায্য ব্যাতীত তাঁরা গুরুমশাই নিয়োগ করতে পারেন। এংরা বাড়ির এক অংশে গুরুমশাইএর থাকার ব্যবস্থা করেন, যেখানে বটুরা পড়াশোনাও করত। এই স্থানটি পুজোর জন্যও ব্যবহার হত আবার অতিথি নিবাসও ছিল। দুটি পরিবার চারআনাকরে, তৃতীয় পরিবার আটআনা আর চতুর্থজন বারো আনা এই কাজে দিতেন। এর বাইরে তাঁরা আর কোনো কিছুই দিতেন না। এই অর্থে পাঁচটি বটু বাঙলা ভাষায় শিক্ষা পেত। কিন্ত এই অর্থে গুরুমশাইএর চলা মুশকিল ছিল, তাই তিনি অন্য পরিবার থেকে বটুর ব্যবস্থা করতেন – এক বটু দিত একআনা, একজন তিন আনা, পাঁচজন চার আনা করে গুরুমশাইকে মাসে সাম্মানিক দিত। এর বাইরে নানান শষ্য, মাঠ, চাল আর কখোনো কখোনো কেউ রুমাল(গামছা!), ফতুয়ারমত(আপার গার্মেন্ট) নানান পরিধেয়ও দিত। কাগবাড়িয়ার দুটি পরিবারের পাঁচটি বটু ধারাইল পাঠশালায় পাঠ নিত। এই দুই গ্রামের মধ্যে প্রায় এক মাইলের পার্থক্য।
Post a Comment