Wednesday, July 20, 2011

অহিফেন ঠাকুর২


মালওয়া আফিম
পূর্ব ভারতে আফিম তৈরির পরিকাঠামো ছাড়াও আরও রাজস্ব বাড়াতে ব্রিটিশ শাসিত ভারতের বাইরে ব্রিটিশ আশ্রিত রাজন্যদের মালব অঞ্চল থেকে আফিম তৈরির পরিকাঠামো তৈরি হল যাকে তত্কালীন কোম্পানি কাগজপত্রে মালওয়া আফিম বলা হচ্ছে বাজারের আফিমের সরবরাহ আর চাহিদার তুল্যমূল্য অঙ্ক কষে ব্যক্তিগত উদ্যমীরা চাষীদের দাদন দিয়ে চাষ করাতেন মালওয়া আফিম ব্যবসায়ীদের দুধরণের কর দিতে হত, প্রথমটি রাজ্যে, আর দ্বিতীয়টি রাজ্যটি ছেড়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে প্রবেশ পথে, যা বম্বের বন্দর থেকে চিনের উদ্দেশ্যে রওনা করানোর ছাড়পত্র ভারতীয় দালালদের সঙ্গে চিনে আফিম ব্যবসার ইংরেজদের অন্যতম সহযোগী ছিল হং ব্যবসায়ীরা হংদের প্রত্যক্ষ্য সাহায্যে, ভারত থেকে চিনে অবৈধ আফিম রপ্তানির পরিমান বেড়েছে গুণোত্তর প্রগতিতে- ১৭৭৩এ ১০০০ চেস্ট, ১৭৯০তে ৪০০০ চেস্ট, ১৮২০র দশকের আগে ১০,০০০ চেস্ট, ১৮২৮এ ১৮,০০০ চেস্ট, ১৮৩৯এ ৪০,০০০ চেস্ট, ১৮৬৫তে ৭৬,০০০ চেস্ট, ১৮৮৪তে ৮১,০০০ চেস্ট ১৮৮১তে এই রপ্তানি সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছয় ১৮০০ থেকে ১৮৩৯ সালের মধ্যে আমেরিকার ব্যবসায়ীরা চিনে সরবরাহ করে দশ হাজার চেস্ট আফিম (সূত্র চাইনিজ রাউন্ডএবাউট, জনাথন স্পেন্স)
চিনের সঙ্গে পুরো আফিম ব্যবসাটাই ছিল অবৈধ চিন সম্রাট এই ব্যবসা অনুমোদন করতেন না বৈধতা পেতে দুটি যুদ্ধ করতে হয়েছিল প্রথমটিতেও সুবিধে হয় নি, পরে ১৮৫৬-১৮৬০এর ব্রিটেন-ফ্রান্সএর যৌথ দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধে বেজিং দখল করা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল ১৮৮০ পর্যন্ত ব্রিটিশ ভারতের সবথেকে দামি রপ্তানি ছিল আফিম দেড় কোটি চিনা আফিমখোরের চাহিদা মেটাতে রপ্তানির পরিমান ছিল চুয়ান্ন হাজার মেট্রিক টন আফিম ব্যবসায় প্রত্যক বছর নয় কোটি তিরানব্বই লক্ষ পাউন্ডের রূপো টাকা আসত ভারত সরকারের সিন্দুকে বৈদেশিক মোট রপ্তানির ১৬শতাংশ

পার্লামেন্টের আফিম কমিশন আর বাঙালি রাজনীতিকরা
আফিমবাদীদের আতঙ্ক জাগিয়ে পার্লামেন্টারি কমিটির সমীক্ষায় ব্রিটিশ পার্লামেন্ট জানিয়ে দিল আফিম বেচতে সরকার আর বলপ্রয়োগের দ্বারস্থ হবে না আফিম ব্যবসায় যাঁদের প্রত্যক্ষ্য বা পরোক্ষ স্বার্থ জড়িয়ে রয়েছে তারা কী ছেড়ে কথা বলবেন আফিম থেকে তখন কোটি কোটি ডলার লুঠ করা ভারত সরকার, সেসময়ের আবসৃত উচ্চপদস্থ এক রাজকর্মচারী জেমস লায়ালকে ব্রিটেনে নিযুক্ত করল তাদের স্বার্থ দেখার জন্য ভারতেও লড়াই করার জন্য সরকার মাদ্রাজের দ্য হিন্দু সংবাদপত্রকে নিয়েগ করল ১৮৯৫তে দ্য হিন্দুতে লেখাহল, “Opium may be a great evil, but national bankruptcy is a greater evil” তত্কালীন কংগ্রেস সদস্যদের সসোমিরা আবস্থা তারা যেকোনো আফিম ব্যবসা বিরেধী আন্দোলনের পক্ষে নন, এ কথা সরাসরি জানাতেও যেমন পারছেন না, তেমনি আবার জনগণের ইচ্ছেও অমান্য করতে পারছেন না এ বড় আজব কুদরতি
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল এই কমিশনে সদস্যতা মোট নয় সদস্যের মধ্যে ভারতীয় সদস্য থাকার কথা দুজনের ভারত সচিবকে এই দুজন সদস্য মনোনীত করতে বলা হল তত্কালীন বাংলার লেফটেনেন্ট গভর্ণর ম্যাকডোনেল জানালেন, ভারতীয় নেতারা আফিম ব্যবসা বিরোধিতা পছন্দ করেন না, তবে তাঁরা পার্লামেন্টের রাডিক্যাল সদস্যদের ভারতবন্ধু বলে মান্য করেন তিনি লিখলেন, There is no Bengali whom I would recommend to your Excellency for nomination to the Opium Commission. There are several who are of the standing requisite, and whose views on the question are reasonable, such as Sir Jotendro Mohun Tagore and Sir Romesh Chunder Mitter. But they will not themselves, or run the risk of putting themselves, into opposition to the anti-opiumists, who are at the same time, like Mr. Caine, M. P. Congress men. They condemn the anti-opium agitation, but will not oppose it at the risk of alienating their English supporters in “Congress” matters.  (সূত্র ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের জে এফ রিচার্ডস Opium and the British Indian Empire: The Royal Commission of 1895  journals.cambridge.org/article_S0026749X02002044)
সে সময়ের আগে প্রায় এক শতক ধরে সত্যি সত্যিই কলকাতা এবং মুম্বাইএর শহরেরে কোনো না কোনো উদ্যমী পরিবার হয় আফিম, নয় নীল অথবা নুনের ব্যবসা অথবা রপ্তানির কাজে সরাসরি জড়িয়ে ছিলেন সমাজে তাঁদের মতামত এতই গুরুত্বপেত যে, সে সময় ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতাতে কোনো বাঙালিই সেই লবির বিরুদ্ধাচরণ করতে রাজি হননি এটাই বাস্তব যে, ভারতীয় সমাজ-রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা যতীন্দ্র মোহন ঠাকুর অথবা রমেশ মিত্ররমত গুরুত্বপূর্ণ সদস্যও আফিমপন্থীদের প্রতীকী বিরুদ্ধাচরণও করতে পারেন নি তাঁদের কাছে প্রস্তাব গেলে তাঁরা সরাসরি না করে দিয়েছেন রামমোহন, দ্বারকানাথের আগেও কলকাতার নামী পরিবারগুলি জমিদারি, গোমস্তাগিরি, দেওয়ানি, বেনিয়ানি আর মুতসুদ্দিগিরি করে, যে সনাতন ভারত মারার ব্যবসার মুখপাত করে গিয়েছেন, সেই ট্রাডিশন বজার রেখে ভারতের জমিদারদের একতা, ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশনের সদস্যরা নীলকরদের কৃতকর্মের সমালোচনা করলেও, আফিমবিরোধী কমিশনের সদস্য হতে পারেন নি তাঁরা সরাসরি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন
এর সঙ্গে শুধু কয়েকটি শুকনো তথ্যের জন্য বলা যাক, দুর্জয় বাঙালিদের মুখলুকোনো প্রত্যাখ্যানে ভারতের ভাইসরয় তখন দ্বারভাঙার মহারাজা লক্ষ্মীশ্বর সিংএর দ্বারস্থ হলেন তবে দ্বারভাঙার মহারাজের কোনো প্রজাই আফিম উত্পাদনে যুক্ত ছিলেন না লক্ষ্মীশ্বর নিজে জমিদারদের সংঘ ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশনএর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং বিদেশে যথেষ্ট পরিচিত মুখ তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অন্যতম পৃষ্ঠপোষকও বটে রয়েল কমিশনে সদস্য হওয়ার সময় তিনি ভাইসরয়ের পরামর্শদাতা দল, সুপ্রিম লেজিসলেটিভ কাউন্সিলেরও সদস্য ছিলেন ম্যকডোনেল তাঁর পক্ষ থেকে মহারাজার নাম গুরুত্বসহকারে সুপারিশ করলেন, The only man of sufficient standing and strength of character whom I know to be willing to take a nomination to the Opium Commission is the Maharajah of Durbhungah. His views are in favour of the maintenance of the opium revenue; and I think he would assert these views on the Commission, though I am not prepared to say that the anti-opiumists and pro-Congress people, such as Mr. Caine, may not influence him. But I should be disposed to run that risk, and I should be very glad to see Durbhungah get some mark of your Excellency’s confidence…. [H]e is a man of wide influence here, and I think he can be, if he likes, of great help to us. He and I are personally good friends and I find him very reasonable,… সুপারিশপত্র থেকে পরিস্কার তত্কালীন রাজনীতিতে মহারাজার গুরুত্ব কতখানি তবে রয়েল কমিশন ভারতে ভ্রমণকালে মহারাজার বুকের অসুখ বেড়ে যাওয়ায় তিনি তার সঙ্গে ঘুরতে পারেন নি, না কংগ্রেসিদের নানান চাপে চাননি তা বলা মুশকিল দ্বিতীয় মনোনীত সদস্য ছিলেন গুজরাটের জুনাগড় রাজত্বের প্রাক্তণ প্রধাণমন্ত্রী হরিদাস বিহারিদাস ব্রিটিশ সরকার তাঁকে এই কমিশনে নিয়েছিল মালব আফিম এলাকার উত্পাদক-ব্যবসায়ীদের খুশি করতে তবে হরিদাসের রাজত্বও কিন্তু আফিম উত্পাদনে যুক্ত ছিল না
Post a Comment