Wednesday, July 20, 2011

অহিফেন ঠাকুর১

পলাশি আর আফিমঃ অধমর্ণ এশিয়া উত্তমর্ণ ইওরোপ
কয়েক হাজার বছর ধরে, ইওরোপ পণ্য কিনতে দামি ধাতু নিয়ে আসত এশিয়ায় পলাশির চক্রান্তে বাংলার রাজস্ব ব্যবস্থা দখল করে আর ঘুষের টাকায় প্রচুর উদ্বৃত্ত তৈরি করল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে পণ্যদ্রব্য কিনতে(যাকে কোম্পানি কাগজপত্রে ইনভেস্টমেন্ট বলা হয়েছে) দেশ (না ইওরোপ বলব) থেকে রূপো আনা বন্ধকরে দিল সে ইওরোপে, চিনের চা বিলাস দ্রব্য চিন থেকে ইংলন্ডে চা রপ্তানি ১৭০০তে ৯২,০০০ পাউন্ড থেকে বেড়ে ১৭৫১তে ২৭ লক্ষ পাউন্ডে দাঁড়াল ১৮০০তে চিন থেকে ২কেটি ৩০ লক্ষ পাউন্ড চা কিনতে খরচ করতে হত ৩৬ লক্ষ পাউন্ড রূপো ফলে বাংলা আর চিনের মধ্যে এমন এক বাণিজ্য ত্রিভূজ গড়ে তোলার পরিকল্পনা করল কোম্পানি, যাতে ইওরোপের দামি ধাতু বিনিয়োগ না করে, বাংলা থেকে রূপো, খাজনার টাকায় সুতির কাপড়, আর বাংলা-বিহার-মালবের আফিম পাঠিয়ে, সে ইওরোপের জন্য দামি চা কিনতে পারে চিন-ভারত বাণিজ্যের একটা উদ্বৃত্ত-রসায়ন তৈরি করা হল যতে বাংলা-বিহার আর রাজন্য শাসিত মালব অঞ্চলের চাষীর রক্ত ঝরানো আফিম চাষের ব্যবসায় লাভ করত পার্সি ব্যবসায়ী আর ইংরেজ সরকার, সে দ্রব্য পরিবহন করে ছিটেফোঁটা লাভ্যাংশ পেত বাঙালিরা আফিম ব্যবসার উদ্বৃত্তে বহুমূল্য চিনের চা কিনতে শুরু করল ব্রিটেন বাংলার সঙ্গে সঙ্গে চিনেও ইওরোপের রূপো আনা বন্ধ হয়ে গেল ভারত লুঠ করে হাজার হাজার বছর ধরে বিকশিত নানান শিল্প পরিকাঠামোও ভেঙে দিল ব্রিটেন পলাশির ৭০ বছরের মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতির ইতিহাসের চাকা দ্রুত ঘুরে গেল এশিয়া হল অধমর্ণ আর ইওরোপ হল উত্তমর্ণ

বাংলা-বিহারের আফিম
সেসময়ের বাংলা-বিহারের আফিম বিশ্বের বাজার সবথেকে দামি আফিম আফিম বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সরকারিভাবে, দাদন নেওয়া নির্দিষ্ট চাষীর থেকে শুকনো আফিম রস কিনে, উত্তরপ্রদেশের বারানসীর কাছে গাজিপুরের সরকারী ওপিয়াম ফ্যাক্টরিতে আফিম তৈরি হতে যেত আজও এই কারখানা গভর্নমেন্ট ওপিয়াম এন্ড এলকালয়েড ওয়ার্কস নামে ভারত সরকারকে বছরে ১৫ কোটি টাকা লাভ দেয় মূলতঃ চিনে পাঠানোর জন্য, সে সময় এক কেজি করে এক একটি আফিমের গোলা তৈরি হত এককেজির চল্লিশটা আফিমের গোলা নিয়ে তৈরি হত একটি চেস্ট প্রত্যেকটি চেস্ট চলে যেত কলকাতায় আফিম বাজারে নিলামের জন্য তারপর উঠত দ্রুত ক্লিপার জাহাজে নানান হাত ঘুরে দ্রুত পৌঁছে যেত চিনে

অহিফেন ঠাকুর
ভারত সরকারের সঙ্গে সেই ব্যবসার অন্যতম অংশিদার ছিলেন দ্বারকানাথ ঠাকুর সে যুগে কলকাতায় তাঁর নাম ছিল অহিফেন ঠাকুর শুধু দ্বারকানাথই নয় ঠাকুর বাড়ির পূর্বজরাও আফিম ব্যাসায় জড়িত ছিলেন গোপীমোহন ঠাকুরের মৃত্যুর পর পুত্র চন্দ্রমোহন ঠাকুর আলেকজান্ডার এন্ড কোম্পানির সঙ্গে আফিম ব্যবসায় অধিকার নিয়ে আইনি লড়াই লড়তে গিয়ে সর্বস্বান্ত হন
দ্বারকানাথ, বোর্ড অব কাস্টমস সল্ট এন্ড ওপিয়ামে সেরেস্তাদারির চাকরি করতেন সে সময় তার বিরুদ্ধে ২৪ পরগণার লবন প্রস্তুতকারক মালঙ্গীরা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ আনে, যা দ্বারকানাথের ব্যবস্থা নামে পরিচিত আফিম ব্যবসায় তাঁর প্রধাণ অংশিদার হন ডোনাল্ড ম্যাকলিয়ড গর্ডন দ্বারকানাথ বাংলার ছটি আফিম ক্লিপারের একটির বড় অংশিদারি অর্জন করেছিলেন এরমধ্যে প্রধাণতমটি ছিল ৩৬৩টনের ওটারউইচ খিদিরপুর ডকে বানানো এটির অর্ধেক অংশিদারি ছিল তাঁর আর অর্ধেক ছিল দুই ইংরেজ উইলিয়ম স্টর্ম আর এন্ড্রু হেন্ডারসনের ওটারউইচ কলকাতায় তৈরি তৃতীয় ক্লিপার আগে দুটি তৈরি হয়েছে হাওড়া ডকে, একটি পার্সি ব্যবসায়ী রুস্তমজী কাওয়াসজী (বম্বের আফিম ব্যবসায়ী)র জন্য ১৮২৯এর রেড রোভার আর অন্যটি ১৮৩১এর সিল্ফ
সেই শতকের ত্রিশের দশক থেকে চিনে অবৈধ আফিম চালানের পরিমান প্রায় তিনগুন হয়ে যায় এই ক্লিপারের দ্রুত পরিবহনক্ষমতায় উত্তর-পূর্ব বাতাস বয়ে শীতেই চিনে পৌঁছত যখন সেখানে আফিমের দাম থাকত চড়া এবং এই ক্লিপারের অনেকবেশি বোঝা নেওয়ার ক্ষমতার জন্যও দ্বারকানাথেরমত আফিম ব্যবসায়ীদের কাছে ক্লিপার প্রধাণ পরিবহন হয়ে ওঠে দ্বাকানাথের আরও দুটি আফিম ক্লিপারে অংশদারি ছিল ৩৭১ টনের ১৮৩৭তে খিদিরপুরে তৈরি এরিয়েল এবং ১১২ টনের মাভিজ এরিয়েল চিনে আফিম ব্যবসা করতে গিয়ে চিন সম্রাটের কমিশনার লিনএর হাতে ধরা পড়ে
যৌবনে বাপ-ঠাকুর্দার প্রতি ক্ষোভে দেবেন্দ্রনাথ আর রবীন্দ্রানাথ দুজনেই দ্বারকানাথের বহু ব্যক্তিগত ও ব্যবসার কাজগপত্র পুড়িয়ে দেন দ্বারকানাথের আফিম, নীল, জমিদারি অথবা লবন ব্যবসাকে নতুন করে উপস্থিত করার অন্য উপায় আজ নেই প্যারীচরণ মিত্রের ভাই কৃস্ট চরণ মিত্রের মেমোয়ার্স অব দ্বারকানাথএরমত স্মৃতি তর্পণ আর ব্লেয়ার বি ক্লিংএর পার্টনার ইন এম্পায়ার- দ্বারকানাথ টেগোর, এন্ড দ্য এজ অব এন্টারপ্রাইজ ইন ইন্টার্ন ইন্ডিয়া-রমত কয়েকটি পুস্তক সম্বলমাত্র দ্বারকানাথের অপৌত্তলিক গুরু রামমোহনের স্মৃতি তর্পণ করলেও রবীন্দ্রনাথ দ্বারকানাথের উপাসনা করেন নি ঠাকুর্দার প্রতি রবীন্দ্রবিতৃষ্ণা শেষ দিন পর্যন্ত ছিল
Post a Comment