Saturday, October 29, 2016

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা অসত্যের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে টাটা কোম্পানির ভিত - প্রমথ নাথ মিত্রের খনি আবিষ্কারের কথা স্বীকার করে নি টাটা কোম্পানি

এই ব্লগেই বহু আগে জানিয়েছি টাটা কোম্পানি কি করে অনৈতিকভাবে চিনে আফিম চালান করে বিপুল অর্থ লাভ করেছিল।
আজ দেখাব টাটা আয়্রন এন্ড স্টিল কোম্পানি শুরুর জন্য দায়ী গুরুমহিষাণী খনির লৌহ আকরিক। তাঁদের এই তথ্য দেওয়ার পথিকৃত বাঙালি প্রমথ নাথ বোস। টাটারা শুধু তার প্রাপ্যই মেরে দেয় নি, বহুকাল পর্যন্ত তার অবদানটাও স্বীকার করে নি।
প্রমথবাবুর পুত্র পরিচালক মধু বসু আত্মজীবনী আমার জীবনএ এই বিষয়টা বিশদে লিখে গিয়েছেন। আড়াই পাতা ব্যাপী এই লেখাটা একটু বড়ই হবে - ইতিহাসের পাতা যাতে নিষ্কলঙ্ক থাকে, তার জন্য মুধু বসুর সেই ইতিহাস চর্চা এখানে উল্লিখত হল -প্রত্যেক বাঙ্গালীর এই সত্য জানা প্রয়োজন -

...এটা ঐতিহাসিক সত্য যে জামশেদপুরের টাটা কোম্পানীর বিরাট লৌহ কারখানার জন্য খনিজ লৌহ যেখান থেকে আসে, সেই গুরুমহিষাণীর আবিষ্কারক হচ্ছেন আমার বাবা। একটা গুজব প্রচলিত আছে যে, এই আবিষ্কারের জন্য তিনি নাকি একটা মোটা টাকা পেয়েছিলেন। এমন কি অনেকের মনে এমন ধারণাও আছে যে আমরা এখনও পর্যন্ত নাকি টাটা কোম্পানীর কাছ থেকে বেশ মোটা রকম একটা মাসোহারা পেয়ে থাকি। এই ধারণাটা আবশ্য সাধারণ লোকের মনে আসা আস্বাভাবিক নয়। আজ যে কোম্পানি কোটি কোটি টাকার ব্যবসা করছে, লক্ষ লক্ষ লোকের অন্ন বস্ত্রের সংস্থান করছে, সেই বিরাট মহীরুহের বীজটি যিনি বপন করেছিলেন, তাঁর প্রতি কোম্পানীর একটা কর্তব্য থাকাই স্বাভাবিক। কিন্তু আসল কথাটা হচ্ছে এই।
আমি আগেই বলেছি, ১৯০৩-০৪ সালে ময়ূরভঞ্জ রাজ্যের গুরুমহিষাণীতে লৌহ আকর আবিষ্কার করেছিলেন আমার বাবা। সেই সময়ে বোম্বায়ের বিখ্যাত ব্যবসায়ী জামশেদজী নাসেরওয়ানজী টাটা বিরাটভাবে বিলাতী আদর্শে একটা লৌহ কারখানা স্থাপন করার পরিকল্পনা করেছিলেন। এ পরিকল্পনায় তাঁকে উপদেশ ও পরামর্শ দিচ্ছিলেন সি পি পেরীন ও সি এম ওয়েল্ড। এঁরা মধ্যপ্রদেশের ঢুল্লি ও রাজহরায় প্রচুর লৌহ আকরের সন্ধান পেলেন। কিন্তু এই স্থান দুটি বহু পূর্বে ১৮৮৭ সালে বাবা আবিষ্কার করে জিওলজিক্যাল সার্ভের রেকর্ডে প্রকাশ করে রেখেছিলেন(ভাইড রেকর্ডস দ্য জিওলজিক্যাল সার্ভে, ভল ২০, পার্ট১) বর্তমানে ভিলাই লৌহ ও ইস্পাত কারখানায় এই রাজহরা ও ঢুল্লি থেকেই আকরিক লৌহ চালান আসে।
যখন জামশেদজী টাটা জানতে পারলেন যে বাবা এই জায়গা দুটিতে লৌহ আকরের আবিষ্কারক, তখন তিনি বাবাকে চিঠি লিখে এই স্থানে লৌহ কারখানা স্থাপন করার ব্যপারে তাঁর মতামত চাইলেন। তার উত্তরে বাবা জামশেদজী টাটাকে ২০।২।১৯০৪ তারিখের চিঠিতে জানালেন যে ময়ূরভঞ্জ স্টেটের গুরুমহিষাণীতে প্রচুর লৌহ আকরের সমাবেশ রয়েছে। ঢুল্লি রাজহরা থেকে গুরুমহিষাণীতে কাজ করার সুবিধে এই জন্য বেশী যে বাংলাদেশের কয়লাগুলি এর খুব নিকটেই। এই চিঠি পাওয়ার পর শ্রীটাটা খুবই আকৃষ্ট হলেন এই প্রস্তাবে এবং বাবার সঙ্গে পত্রালাপ শুরু করলেন। ময়ূরভঞ্জের মহারাজা রামচন্দ্র ভঞ্জদেওয়ের পক্ষে বাবা এবং শ্রীটাটার পক্ষে শ্রীদোরাবজী টাটা, সি পি পেরীণ, সি এম ওয়েল্ড ও মি শাকলাতওয়ালা আলোচনা চালান, কিন্তু কোনরকম বন্দোবস্ত পাকাপাকি হওয়ার আগেই শ্রীজামশেদজী টাটা মারা যান ১৯০৪ সালে। এর পর তাঁর ছেলেরা বাবার সঙ্গে আলোচনা চালান। মহারাজা রামচন্দ্র ভঞ্জদেও বাবাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি টাটা কোম্পানীর কাছ থেকে যে রয়ালটি পাবেন, তার থেকে বাবাকে কিছু অংশ দেবেন। মহারাজের প্রতিশ্রুতির কথাটা লেখাপড়া করে রাখার জন্য বাবার বহু আইনজ্ঞ বন্ধু ও হিতৈষীরা অনুরোধ করেন। কিন্তু বাবা বললেন, মহারাজা যখন বলেছেন, তখন তাঁর কথায় আবিশ্বাস করব কী করে? লেখা পড়ার দরকার নেই। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত মহারাজা এক শিকার দুর্ঘটনায় মারা যান। পরে মহারাজার উত্তরাধিকারীরা এ বিষয়ে কোন উচ্চবাচ্য করেন নি। বাবা যাতে তাঁর প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত না হন, তার জন্য তাঁর দু’একজন আইনজ্ঞ বন্ধু বাবাকে এই সম্পর্কে আদালতে এফিডেভিট ক’রে রাখার পরামর্শ দেন। কিন্তু বাবা কোর্টে যেতে বরাবরই গররাজী, তাই তিনি তাঁদের কথায় কর্ণপাত করেন নি।
ব্যাপারটা ওখানেই চাপা পড়ে গেল। এর অনেক দিন পরে ১৯০৭ সালে টাটা আয়রণ এন্ড স্টীল কোম্পানী এক প্রস্পেক্টাস বের করে। মজার কথা এই যে, তার কোনখানেই বাবার নামের উল্লেখ পর্যন্ত ছিল না। তার ওপর তার ভিতরে বহু ভুল তথ্য পরিবেশিত হয়েছিল। যে গুরুমহিষাণী লৌহসম্পদের ফলে টাটা কোম্পানী আজ ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্প-প্রতিষ্ঠান, সেই লৌহ সম্পদের আসল আবিষ্কারকের নাম না থাকায় বাবা অতিশয় ক্ষুব্ধ হন, এবং স্বর্গত জে এন টাটার সেক্রেটারী মিঃ বি জে পাদসাকে প্রস্পেক্টাসের ভুলগুলি সংশোধন করে একটি চিঠি লেখেন,
সেই চিঠির সব শেষে তিনি লেখেন, I hope, in justice to me and in the interest of the truth you will be revise your prospectus in the light of these facts.
সেই চিঠির উত্তরে মি পাদশা ১৯০৭ সালের ৩রা জুলাই যে চিঠি লেখেন সেটাকে ব্যবসায়িক কূটনীতির চূড়ান্ত নিদর্শন বলা যেতে পারে। মি পাদশা লিখলেন,
In the commercial document one is not always able to reserve place for giving due credit to everyone but it is perfectly fair that the document should not be so worded as to imply that credit elsewhere than where it is due.
এর পরেও আমার সেজোমেসো(ক্ষীরোদ বিহারী দত্ত) বাবাকে অনেক করে বললেনঃ একটা কিছু করার দরকার। একটা এফিডেভিট করে চুপ করে বসে থাকা – বাকী সবকাজ আমরা করে দেব – তোমার এক পয়সাও খরচ হবে না। তোমার ন্যায্য প্রাপ্য এভাবে ছেড়ে দেওয়া ঠিক হচ্ছে না।
বাবার সেই এক কথা – কোর্টে তিনি কখোনোই যাবেন না। ব্যাস, বাবার নাম ও অর্থ দুইই চাপা পড়ে গেল কূটনৈতিক চালের ধাক্কায়।
কিন্তু সত্য একদিন না একদিন সাধারণ্যে প্রকাশ হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন পরে টাটা কোম্পানীর জেনারেল ম্যানেজার মিঃ কিনানকে ১৯৩১ সালের ২৯ আগস্ট তারিখের এক চিঠিতে মার্কিন লৌহ বিশেষজ্ঞ মঃ সি পি পেরীন জানান-
‘আপনি হয়ত জানেন না যে ময়ূরভঞ্জ রাজ্যের ভূতত্ত্ববিদ ছিলেন মিঃ পি এন বোস। গুরুমহিষাণীর অস্তিত্ব সম্বন্ধে তিনিই আমাদের প্রথম মনোযোগ আকর্ষণ করেন এবং পৃথিবীর সেই প্রান্তে তাঁর নির্দেশ অনুযায়ীই আমি যাই। তাঁর আবিষ্কারের জন্য আজ ময়ূরভঞ্জ রাজ্যের লৌহ-আকরের এই বিরাট প্রতিষ্ঠান। এই ঘটনাগুলি না ঘটলে আজকের এই বিরাট টাটা প্রতিষ্ঠানের জন্ম হতো কিনা সন্দেহ।’
এর পরেও বাবার আবদানের কথা টাটা কোম্পানী স্বীকার করে নি। বাবার মৃত্যুর তিন বছর পর যখন জামশেদপুরে তাঁর এক মর্মর মূর্তি স্থাপন করা হয়, তখন উদ্বোধনের সময় টাটা কোম্পানীর পক্ষ থেকে বাবার আবিষ্কারের কথা স্বীকার করা হয়। এই স্বীকৃতির বেশী আর কিছুই পাওয়া যায় নি টাটা কোম্পানীর কাছ থেকে।
Post a Comment