Thursday, March 24, 2016

ভারতের ধ্বংস হওয়া শিক্ষা ব্যবস্থা ইসলামি জ্ঞানচর্চা১


বৌদ্ধধর্ম অস্তাচলে গেল। কিন্তু পূর্বভারতের শুদ্র সভ্যতার অবসান হল না।
কেন্দ্রিভূত রাজপৃষ্ঠপষকতাযুক্ত বৌদ্ধ শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস হলেও যে বিকেন্দ্রিত জ্ঞানচর্চার বিস্তৃত পরিকাঠামো গড়ে উঠেছি দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় তা কিন্তু পূর্বিভারতে থেকে গেল - তার প্রমান তারপরেও ব্রিটিশ লুঠেরা রাজত্বের আগে পর্যন্ত ৬০০ বছর ধরে বৃহত্তর বাংলার বাণিজ্য এবং জ্ঞানচর্চা সকলের ঈর্ষার কারণ ছিল। সেই তৃণমূলস্তরের শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে জুড়ল কোরাণের আয়াত আর হদিস। পশ্চিম এশিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থার অনুসরণে আমাদের আলোচ্য ভারতে এবং পূর্বভারতে নবতম জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্র যুক্ত হল(এর একটা অংশ পরমএর ব্রিটিশপূর্ব শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রকাশ করেছিলাম আমরা)। আজ বলতে বুক ফেটেযাচ্ছে, লুঠেরা, খুনে পশ্চিমের জঙ্গীপনায় ধ্বংস হওয়া বাগদাদের নিজামিয়া বিদ্যালয়ে পড়াতেন প্রখ্যাত দার্শনিক আল-গজলি। এই বিস্তৃত জ্ঞানচর্চার শিক্ষাব্যবস্থায় পড়ানো হত ব্যাকরণ, অলঙ্কারশাস্ত্র, তর্কশাস্ত্র/যুক্তিবিদ্যা, অদ্বৈতবাদ, দর্শনশাস্ত্র, অঙ্ক, ধর্মতত্ত্ব এবং আইন। এখানে দর্শন দুটি গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানচর্চার সঙ্গে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ছিল - ক। পদার্থবিদ্যা এবং অধিবিদ্যা আর এই জ্ঞানচর্চার ভিত্তি ছিল অঙ্ক, জ্যোতর্বিদ্যা, বীজগণিত, জ্যামিতি এবং পাটিগণিত। এই বিদ্যাচর্চা সাধারণত মাধ্যমিক এবং কিছুটা উচ্চতর জ্ঞানচর্চায় পাঠ্য ছিল। আর বুনিয়াদি স্তরে সারা এশিয়ায় পড়ানো হত পড়া, লেখা এবং যোগ-বিয়োগ-গুণ-ভাগের মত অঙ্কের ভিত্তিপ্রস্তর।
ভারতে এই ব্যবস্থা অনুকৃত হল মাদ্রাসা, মক্তবগুলিতে। সব থেকে বড় ব্যাপার হল শিক্ষাচর্চায় বিজ্ঞানবোধ। কোথাও কোথাও দর্শনের থেকে গুরুত্ব পেল প্রযুক্তিচর্চা। বিদ্যালয় বা উচ্চশিক্ষাক্ষেত্রগুলি তাত্ত্বিক পড়াশোনা করাত, প্রযুক্তি শিক্ষার ব্যবস্থা হল কারখানাগুলিতে।
ইসলামি আমলে তিনিটি মূল ধরণের পড়াশোনার কাঠামো ছিল ১। ব্যক্তিগতভাবে বহু গৃহস্থ বুনিয়াদি শিক্ষা দান করতেন; ২। মসজিদ এবং অন্যান্য ধার্মিক স্থানে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা দান ক্রা হত; ৩। মক্তব আর মাদ্রাসা ছিল উচ্চতর শিক্ষা ক্ষেত্র।
বাড়িতে বাচ্চারা শিখত অক্ষরজ্ঞান, উচ্চারণ, দ্রুতপঠন, তাখি(স্লেট বা লেখার বস্তু) -তে লেখার অভ্যেস আর কিছু ছবি আর সাধারণ আঁক কষা। তবে মাধ্যমিকস্তরের শিক্ষা ব্যবস্থা কেন্দ্রিভূত ছিল মসজিদ, খনকা আর দরগায়। কুতুবুদ্দিন আইবক সারা দেশজুড়ে হাজারো মাদ্রাসা, মসজিদ তৈরি করেছিলেন। তার বিদ্যাচর্চার ব্যবস্থাপনার তত্ত্ব পরের সম্রাটেরা অনুসরণ করেছেন। শাহ নিজামুদ্দিন আউলিয়া এবং মইনুদ্দিন চিস্তি(১২৬৫খ্রি) খনকাগুলি বিকাশ ঘটিয়েছিলেন। দরগাগুলি বিভিন্ন সুফির সমাধিস্থান। এবং অধিকাংশ দরগাই বিদ্যাকেন্দ্র রূপে গড়ে উঠেছিল - কেননা হাজারে হাজারে শ্রদ্ধালু মানুষ এই কেন্দ্রগুলিতে আসতেন, পথ নির্দেশ চাইতেন। মসজিদের সঙ্গে জুড়ে থাকত মক্তিব আর মাদ্রাসা। অতীত সময়ের মতই উচ্চশিক্ষার পৃষ্ঠপোষক ছিল রাষ্ট্র ব্যবস্থা - কখোনো লাখেরাজের বা পীরোত্তরের মত করহীন জমি দান করে বা কখনো আর্থিক সাহায্যে। অযোধ্যার গোপামাউ আর খইরাবাদ এবং আগ্রার জৌনপুরে আফগানিস্তান, বোখারা থেকেও পাঠ নিতে আসত। প্রখ্যাত শিক্ষকেরা পড়াতেন ব্যাকরণ, অলঙ্কারশাস্ত্র, তর্কশাস্ত্র/যুক্তিবিদ্যা, অদ্বৈতবাদ, দর্শনশাস্ত্র, অঙ্ক, ধর্মতত্ত্ব এবং আইন এবং বিজ্ঞান।
Post a Comment