Saturday, August 23, 2014

বাংলার গ্রামশিল্প, জেলাওয়ারি সমীক্ষা৩৬, Handicrafts of Bengal - District Wise Survey36

অবিভক্ত ২৪ পরগণা
জয়নগর
প্রায় পাঁচশো বছর আগে আদি গঙ্গা এই শহর দিয়ে বয়ে গিয়েছিল। চৈতন্যদেব নীলাচলে গমনকালে জয়নগরে থেমেছিলেন। গঙ্গা ক্রমে ক্রমে মজে মজে জয়নগরের সঙ্গে মজিলপুর শব্দটি উপসর্গ হিসেবে জুড়ে গিয়েছে। প্রাচীন জনপদ গড়িয়া হরিনাভি দক্ষিণ বারাসাত হয়ে যদি জয়নগরে যান তাহলে রাস্তার ডান পাশে দেখবেন ছোট ছোট খাত জলে ডোবা। আদতে এই রাস্তায় একসময় চলন ছিল গঙ্গার। বিশাল বিসাল সওদাগরী জাহাজ এই রাস্তায় যেত সমুদ্রে। জয়নগরে এই মজে ইয়াওয়া গঙ্গা বেঁচে আআছেন ঘোষের গঙ্গা, মিত্র গঙ্গা হয়ে – অর্থাৎ ঘোষেদের বা মিত্রদের এলাকা দিয়ে প্রবাহিত ছিলেন যে গঙ্গা। আর সেই সময়েই সেখানকার মন্দির আর সংগ্রহশালা দেখে নেওয়া যেতে পারে।
এই শহরে আদি বাংলার প্রাচীন শিক্ষাব্রতীদের বাস ছিল – যারা ব্রিটিশ পূর্ব সময়ে বাংলার এই অঞ্চলে জ্বালিয়ে রেখেছিলেন জ্ঞানের প্রদীপ শিখাপ্রখ্যাত পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এই শহরে বাসিন্দা। তাঁর পরিবারকে এখনও এলাকায় সিদ্ধান্ত পরিবার হিসেবে ডাকা হয়।
জয়নগর বললেই বাঙালির আর কিছু না মনে পড়ুক, এই শীতে অবশ্যই মনেপড়বে মোয়ার কথা। বাংলার প্রায় সব মিষ্টিই এলাকা ভিত্তিক। কিন্তু আর কোনও মিষ্টির সঙ্গে সেই এলাকার নাম বোধহয় জুড়ে নেই। আমরা যখন মিষ্টির কথা বলি সেই এলাকার কথা জুড়ে নিইমাত্র ইয়েমন মালদার কানসাট, বর্ধমানে সীতাভোগ মিহিদানা ইত্যাদি। কিন্তু মোয়া মানেই জয়নগরের মোয়া। শীতকালে সারা বাংলা তথা ভারতজুড়ে মোয়া ব্যবসার যে স্বতষ্ফুর্ত জনগণব্রান্ডিং হয় তা যে কোনও মার্কেটিং পেশাদারের স্বপ্ন। ছোট ব্যবসায়ীরা জানেন কোন সময়ে কী ব্যবসা হয়। তাঁদের মত বাজার বোঝা মানুষ খুবই কম আছে। রাস্তার পাশে যে যেখানে পারে একটা দোকান খুলে বসে যায়। সারা বছর হয়ত এটা ওটা সেটা বিক্কিরি করছে, কিন্তু শীতকাল এলেই লালা শালুতে দোকান মুড়ে, দোকানে বিশাল বিশাল অক্ষরে জয়নগরের আসল মোয়া শব্দবন্ধটি লিখে তিন টাকা পিস থেকে পনেরো টাকা পিস পর্যন্ত মোয়া বিক্রি করে মোয়া থাকে চিত্রিত মাটির হাঁড়িতে। একসময় বাংলাদেশে যা শখের হাঁড়ি নামে পরিচিত ছিল। রকমারি মোয়ার সঙ্গে খাজা আর মাটির নাগরীতে নলেন গুড় আর সরায় মোড়া পাটালিসে এক অপরূপ আয়োজন।
স্থানীয় মানুষেরা বলেন নৃত্যগোপাল সরকার আর পূর্ণচন্দ্র ঘোষ প্রথম জয়নগরের মোয়ার স্রষ্টাআদত জয়নগরের মোয়া বানাতে প্রয়োজন কণকচূড় ধানের খই। উতকৃষ্ট ঘি, নলেনগুড় আর নানান মশলা সঙ্গে চূড়ায় একটা কাজুবাদামের অর্ধেক কোয়া বা অর্ধেক কিসমিস।

জয়নগরের পুতুল শিল্প
ণেশজননী, নারায়ণী, কৃষ্ণ-বলরাম, দক্ষিণরায়, বনবিবিপর পর সাজানো অসংখ্য পোড়া মাটির পুতুল দেখতে প্রচলিত মাটির পুতুলের চেয়ে অনেকটাই আলাদা টানা টানা চোখ, গোলগাল গড়নের সাবেক বাংলার এই পুতুলের কদর গোটা পৃথিবী জুড়ে দক্ষিণ ২৪ পরগনার জয়নগর-মজিলপুরে তৈরি এই শিল্পসামগ্রী স্থান পেয়েছে ব্রিটিশ মিউজিয়াম থেকে স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউট কিংবা ভারতীয় সংগ্রহালয় থেকে দিল্লির জাতীয় সংগ্রহালয়ে শুধু সংগ্রহালয় নয়, লোকশিল্পের ইতিহাস, এমনকী, লোকশিল্পের বইয়েও স্থান পেয়েছে বাংলার প্রাচীন এই পুতুল শিল্প 
বর্তমানে শম্ভু দাস বাবা পাঁচুগোপাল দাসের ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। তিনিও ছিলেন নাম করা শিল্পী নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও শম্ভু আঁকড়ে ধরে রেখেছেন এই শিল্পকে কিন্তু কত দিন আর পারা যাবে তা নিয়ে সংশয়ে জয়নগর-মজিলপুর
জয়নগর মজিলপুরের পুতুল দুপ্রকার হাতে তৈরি এবং ছাঁচের প্রচলিত দেবদেবীর পাশাপাশি তৈরি হয় নানা লৌকিক দেবদেবীর মূর্তি হাতে তৈরি পুতুলের মধ্যে নারায়ণী, শীতলা, বনবিবি, দক্ষিণরায়, পঞ্চানন, মানিকপীর, আটেশ্বর, দক্ষিণেশ্বর উল্লেখযোগ্যআর ছাঁচের পুতুলের মধ্যে রয়েছে গণেশজননী, জগদ্ধাত্রী, রাধাকৃষ্ণ, কালিয়দমন, ষড়ভূজচৈতন্য, কলকাতার বাবু, গয়লা-বৌ, কৃষক ইত্যাদি ছাড়াও রথের সময় জগন্নাথ, ঝুলন-জন্মাষ্টমীর সময় রাধা-কৃষ্ণ, গোপাল, নববর্ষে লক্ষ্মী-গণেশের মূর্তির ভাল চাহিদা থাকে এমনও হয়  সময়ে সময়ে শম্ভু চাহিদামত সরবরাহ করতে পারেন না। 
Post a Comment