Monday, March 28, 2011

ধূসর মৃত্যুর ছায়া – লোকনাট্যের সন্ধানে এক পরিক্রমা৩


কোম্পানি আমলের প্রথম থেকেই গ্রামীণ বাঙালি লুঠেরা কোম্পানি রাজের ওপর খড়্গহস্ত তিতুমীরের আন্দোলন দিয়ে যে বিদ্রোহী গ্রামীণ লৌকিক বাংলার জয় যাত্রা শুরু, সেই জয়যাত্রা শেষ হবে স্বাধীণতা আন্দোলনের পর নতুন করে পশ্চিমিভাবধারায় উদ্বুদ্ধ শাসক মধ্যবিত্তের হাতে পরাধীন হয়ে অথচ শহুরে বাঙালিরা ঠিক ততখানি উদারতার সঙ্গেই সঙ্গ দিচ্ছে কোম্পানির নানান উদ্যমকে তাই শহুরে বাংলা গদ্যের বিকাশে বিদেশিয়দের, অভিযাত্রিকদের, ধর্মপরিবর্তকদের ভূমিকা বেশ বেশি বলেও গ্রামীণ সংস্কৃতির বিকাশে এঁদের ভূমিকা স্বাভাবিকভাবেই খুব বেশি নেই বললেই চলে প্রথম থেকেই গ্রামীণ বাংলাকে বর্জন করেছিল ব্রিটিশ শাসক বাংলায় এক লাক পাঠশালা ভংস করে সর্বশিক্ষার ধারণাটাকেই শহুরে মধ্যবিত্তের সহায়তায় উপড়ে ফেলল ততকালীন রাজশক্তি ধর্মপ্রচার, ধর্মপরিবর্তন এবং এদেশের নানান প্রযুক্তি, শিক্ষা ব্যবস্থা, এবং নানান তথ্য পঞ্জীকরণ করতে গিয়ে(আদতে তা চুরিই) দেখলেন হাজার হাজার বছর ধরে লৌকিক বাঙালিরা এক সমৃদ্ধশালী বাংলা গড়েছে এই সমৃদ্ধ সমাজকে তাঁরা দেগে দিলেন অবোধ, অজ্ঞ আর পিছিয়ে পড়া হিসেবে ফলে মেকলের পদ্ধতিতে শিক্ষিত বাঙালির একটা বড় অংশ দুরছাই করলেন তাঁর নিজের সংস্কৃতির শেকড় থেকে দূরে সরে গিয়ে
তবুও বিদেশিয় শিক্ষাব্যবস্থা বিদেশিয় দর্শেণের বাইরে বেরিয়ে এসে এক ঝাঁক মানুষের প্রণোদনা জাগল শেকড়ে ফিরে যাওয়ার গ্রামীণ মানুষের মুখের কাহিনী, সঙ্গীত, নাটক, শিল্প পুনরুদ্ধারে তাঁদের অনেকেই জাবনপণ করলেন সেই প্রণোদনায় গড়ে উঠল বিদেশিপ্রভাবের বাইরে বেরিয়ে এসে নতুন করে দেশ আর তার মানুষ, তাদের সংস্কৃতিকে জানার আকুলতা অথচ এদের মধ্যেও বিভেদের রূপরেখা দেখা দিল ক্রমশঃ লোক সাহিত্য যখন নতুন করে তার পথ খুঁজে নিচ্ছে নিজস্ব গতিজাড্যে, তখন লৌকিক নাটককে আদৌ সাহিত্য বলা হবে কীনা, তা নিয়ে চুলচেরা বিরোধ দেখা দিচ্ছে দেশজ ভাবধারায় শিক্ষিত আর বিদেশিয় মেকলে পদ্ধতিতে কালো সীহেবদের মধ্যে দেশের মধ্যে নানান সাহিত্যিক কর্মকাণ্ডকে আলাদা করে দেখার দর্শণে উদ্বুদ্ধ শহুরে শিক্ষিতদের মধ্যে থানা গেড়েছে বেশ ভালভাবেই বিদেশিয় ভাবধারা অনুসরনকারীরা লোক সাহিত্যের মধ্যে ভাগ বয়ে নিয়ে এলেন উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে বিদেশিয় শিক্ষা পদ্ধতিতে শিক্ষিতরা সাহিত্য বলতে অনেকদিনই বুঝিয়েছেন, ছড়া, গীতিকা, গান, লোক-কথাকে লোকনাট্যও যে লোক সাহিত্যের এক শক্তিশালী মাধ্যম সেই তথ্যকে উদ্দেশ্যপূর্ণভাবেই উপেক্ষা করা হয়েছে দীর্ঘদিন বিপক্ষদের যুক্তি লোক নাটক অভিকর শিল্প বা পারফর্মিং আর্ট, তাই সে সাহিত্য পদবাচ্য নয় তখন দেশাভিমানিনী বিপক্ষ দল প্রশ্ন তুলল, লোক সঙ্গীত যদি সাহিত্যপদবাচ্য হতে পারে, তাহলে লোক নাটককে সাহিত্য অভিধা দানে কেন ইতস্তত করা! ভারতীয় নাট্য দর্শনে আমরা যে চুলচেরা বিভাগগুলি পাই তাতে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে শিল্পী সঙ্গীত, নৃত্য আর নাট্যে পারদর্শী, তাকেই পরিপূর্ণ শিল্পীর অভিধা দেওয়া হয়েছে এবং লোক নাট্যগুলিতে স্বাভাবিকভাবেই ভারতীয় দর্শণ বর্ণিত পরিপূর্ণ শিল্পীর পরিচয় দেখতে পাই
Post a Comment