Sunday, March 27, 2011

উত্তরবঙ্গের মুখা বা মুখোশ

সমগ্র বাংলা জুড়ে যতটুকু মুখোশের প্রাচুর্য রয়েছে, তার সন্ধান করা দেশজ সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধ সমাজের মানুষদের একান্ত প্রয়োজন. মালদহ থেকে শুরু করে  দার্জিলিং পর্যন্ত প্রায় প্রত্যেক জেলায় রয়েছে মুখা বা মুখোশের বৈচিত্র্য আর সমারোহ.
মালদহ
মালদহের মুখোশ সাধারণভাবেই মুখা নামে পরিচিত. যদিও গম্ভীরা গান বা পালার সঙ্গে এই মুখোশ একদা দেখা যেত আজ আর এই মুখোশের সচরাচর দেখা মেলে না. স্থানীয় শিল্পীরা বলেন, এবং সরকারি নানান প্রদর্শনী সাক্ষী,  একসময়ে এই মুখোশ তৈরি হত কাঠ দিয়ে, কিন্তু বর্তমানে এই মুখোশ তৈরি হয় মাটি দিয়ে. এদের মধ্যে নরসিংহ, কালি, রাম, কার্তিক, প্রেত, হনুমান, বুড়ো-বুড়ি, শিব, ভুত প্রভৃতি আজও তৈরি হয়.
গম্ভীরা বিষয়ে প্রথম শহরের মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হরিদাস পালিত আদ্যের গম্ভীরা বইতে লিখেছেন, মুখার উর্ধদিকে ও পশ্চাদংশে একটি এবং দুই কর্ণের পশ্চাতে দুইটি ছিদ্র দৃষ্ট হয়. মুখার ঘর্ষণ থেকে মুখ রক্ষার জন্য চাদর বা বস্ত্রখন্ড  দিয়া কর্ণ বেষ্টন করিয়া পাগড়ী বাঁধা হয়. বছরের শেষে গম্ভীরার নাচ আর মুখোশ দেখতে পাওয়া যায়. তবে নানান  কারনে দারুন দেখতে এই মুখোশগুলো সারা বাংলা জুড়ে লৌকিক শিল্পের দোকানে সচরাচর দেখতে পাওয়া যায়না. গম্ভীরা বা গাজনের সময় এগুলি পাওয়া যায়, মেলায় ওঠে, কিন্ত দাম পায় না, কেননা, গম্ভীরা শিল্পীছাড়া কেউই সাধারণতঃ এগুলি কেনেননা.
জলপাইগুড়ি
এই জেলার রাজবংশী সমাজ সমগ্র উত্তরবঙ্গেরমতই মুখোশকে মুখা বলেন. জলপাইগুড়ের মুখা-খেল কিন্তু গম্ভীরারমত শুধুই ধর্মীয় উত্সব নির্ভর নয় বলে, প্রায় সারা বছরই এই নাচ আর মুখোশ দেখা যায়. যদিও রাম-রাবণ, শিব-দুর্গা আর উত্তরবঙ্গের জাতীয়দেবী মনসার মুখা পাওয়া যায়. পৌরানিক বা ধর্মীয় ভাবনার পাশাপাশি সাধারণ জীবনের নানান ভাবনাও উঠে আসে এই মুখা খেলার মধ্যে.  এগুলি কাঠ, লাউ, পোড়ামাটি, পুরু কাগজ অথবা পাতলা শেলা দিয়ে তৈরি. কাঠের বা লাউএর খোলের ওপর কাদা দিয়ে ন্যকড়া এঁটে তার ওপর চিত্রকর এঁকে দেন. একমাত্র সূত্রধর সমাজেরই কোনো বিশেষ ব্যক্তি এই কাজটি করতে পারেন.
দিনাজপুর
দিনাজপুরে রাজবংশীদের পলিয়া আর দেশি সমাজে গমীরা খেলায় মুখা ব্যবহার হয়. এ অঞ্চলে মোখা নামে এটি পরিচিত. এগুলি একমাত্র ছৈতন বা ছাতিম গাছ দিয়ে তৈরি. গম্ভীরারমত মাটির মুখার প্রচলন নেই. তবে এই গমীরা-খেলার সঙ্গে গম্ভীরার কোনো ভাবগত সাজুজ্য নেই.  বুড়াবুড়ি, চামাড় কালি, উড়ান কালীর(শিকনি ঢাল)মত নানান বার্তাই এই নাচে দেওয়া হয়. রাম বনবাস পালায় অশোক বনের চেড়ি, হনুমান, পাতালের দানব, বাঘ, গন্ডার, ভালুক প্রভৃতি মুখোশ ব্যবহার হয়. হনুমানের মোখা শ্রদ্ধাসহকারে রাখা হয়.

দার্জিলিংএর মুখোশ নিয়ে আগেই আলোচনা হয়েছে.
একটা স্পষ্ট কথা বলা প্রয়োজন, এই অঞ্চলের মুখো নিয়ে ভারতীয় জাদুঘরের সবিতা রঞ্জন সরকার একবার কাজ করেছেন. সেই সংস্থা দ্বারা প্রকাশিত মাস্ক অব বেঙ্গল বইটি প্রথম এই মুখোশ নিয়ে ছবি প্রকাশ করে.
Post a Comment