Thursday, July 9, 2015

Nilambori Saree, নীলাম্বরী শাড়ি

মায়ের পেটে থাকা অবস্থা থেকে শুনে আসছি করতে হবে, দিতে হবে - কিন্তু কে করবে, কেই বা দেবে? আমরা কলাবতী মুদ্রা, বঙ্গীয় পারম্পরিক কারু ও বস্ত্র শিল্পী সংঘ - একটি চাঁদা দিয়ে চালানো ছোট গ্রাম উদ্যমীদের সংগঠন নিজেদের সদস্যদের উদ্যমে এই হাতে কাটা সুতো, ঠকঠকি তাঁত আর প্রাকৃতিক রঙে চোবানো শাড়ি তৈরির সামাজিক উদ্যম বাস্তবায়িত করেছি বিগত কয়েক মাস ধরে অক্লান্ত প্রচেষ্টায় - তাঁতিপাড়া ফুলিয়ায়।
এই কাজ শুধু অতীতকে নতুন করে ফিরে পাওয়ার অতীত বিলাসী উদ্যম নয়। এটি আদতে নিজের দেশের মানুষের সমাজের যে দক্ষতা - বাংলার তাঁতিরা নিজের উদ্ভাবনী শক্তির যে অক্লান্ত নজির পেশ করেছিল সারা বিশ্বে, যাকে বড় পুঁজি ধ্বংস করেছিল নিজের স্বার্থে, তাকে ফিরিয়ে এনে বড় পুঁজির বিরুদ্ধে আন্দোলনকে জোরদার করা।
আজ বাংলার তাঁতি পাড়ার সব থেকে বড় সমস্যা কিন্তু তাঁতিদের দক্ষতা ফিরিয়ে দেওয়া নয় - এটা ভারত সরকারের এনএসডিসির ট্রেনিং প্রোগ্রাম নয় - যে প্রোগ্রাম মানুষকে কর্পোরেটের চাকুরে করে তোলে - সেই দক্ষতাটা তাঁদের আজও রয়েছে। প্রয়জন নষ্ট ধংস করে দেওয়া পরিকাঠামো গড়ে তোলা।
ফুলিয়াতে কেন আজ পশ্চিমবঙ্গের কোনো তাঁতি পাড়ায় এই নিজস্ব পরিকাঠামো অমিল - নির্ভর করতে হয় মিলের রঙ সুতোর উতপাদনের ওপর - দিনের পর দিন পরিকাঠামো নেই বলে দক্ষ প্রযুক্তিবিদদের কদর কমছে - তারা নেই হয়ে যাচ্ছেন - মারা যাচ্ছেন - তাঁদের সঙ্গে দক্ষতারও কবর হচ্ছে।
আজ নীল গাছের চাষ হয় শুধু দক্ষিণ ভারতে। প্রাকৃতিক নীলের বিপুল দাম। দুটি কোম্পানি তৈরি করে। কিলো ৩৫০০ টাকা। একটা নীলাম্বরী শাড়ি রঙ করতে প্রয়োজন হয় অন্তত ২৫০ গ্রাম প্রাকৃতিক নীল। ফলে এখানেই দিন পাঁচেকের শ্রমের মূল্য ছাড়াই একটা শাড়ির দাম জুড়ে গেল ১০০০টাকার কাছাকাছি।
খুব ঘুরে ঘুরে চরকা কাটুনিদের খুঁজে খুঁজে বার করেছি সাঙ্গঠনিক ভাবে - মধ্যবিত্ত সমাজ তাঁদের কাজের সম্মান দেননা - বোঝেন না বিষয়টা। সেই সুতো তৈরির পরিকাঠামো নেই হয়ে গিয়েছে প্রায়। কিন্তু দক্ষতা রয়েছে - সেই দক্ষতা আজও বড় পুঁজির পশ্চিমি যন্ত্র আর্জন করতে পারে নি। যে সুতো মিল তেরি করতে পারে না, সে সুতো আজও চরকা কাটুনিরা করে দিতে পারেন অবহেলে - সে যে কি পরিমান দক্ষতা তা না দেখলে বোঝানো যাবে না।
রঙ করাও একটা দক্ষতা। সেটা আজ দুতিনজনের আছে।
আজ এই দক্ষতাগুলোকে ছড়িয়ে দিতে হবে গোটা তাঁতি পাড়ায়, সারা পশ্চিমবঙ্গে।
নানান বিরোধ সত্ত্বেও বিশ্ববঙ্গ নিয়ে বাংলা সরকারের এই উদ্যোগ আমরা সর্বান্তকরণে সমর্থন করি।
কয়েক দিন আগে ফুলিয়ায় তাঁতিদের সঙ্গে বৈঠকে ঠিক করি যে আমরা নিজেরা নীল চাষ করব। শুধু নীল চাষ করলেই হয় না, গাছ থেকে নীল রঙ বের করা খুব শ্রম সাধ্য এবং দক্ষতা সাধ্য কাজ। সেই সিদ্ধান্ত অনুসারে আমরা ধান্য গবেষণা কেন্দ্রর শ্রী অনুপম পালের সঙ্গে কথা বলি। উনি আশ্বাস দিয়েছেন যে এই চাষ করতে তিনি তাঁতিদের সাহায্য করবেন।
এই সমস্ত কাজ করতে গিয়ে দেখছি, এটা আমাদের মত চাঁদা দিয়ে সংগঠন চালানো সংগঠনের ক্ষমতার আতীত হয়ে যাচ্ছে।চাই আপনাদের সক্রিয় সমর্থন। তবেই বাংলার তাঁতিপাড়াগুলোর নিজস্ব পরিকাঠামো বাড়বে। নিজেদের উতপাদনের ওপর নিজেদের সমাজের নিয়ন্ত্রণ কায়েম হবে। নতুনতরভাবে বড় পুঁজির বিরুদ্ধে লড়াই করার একটা হাতিয়ার ফিরে পাওয়া যাবে।
এ সব বিষয়ে আপনাদের সাহায্য চাই। নষ্ট ধ্বংস করে দেওয়া পরিকাঠামো তৈরি করাই আজকের প্রাথমিক কাজ - এ কাজ সমগ্র সমাজের অংশগ্রহণ ছাড়া সম্ভব নয়। শুধু অর্থ সাহায্য নয় নানাবিধ ভাবনাও তৈরি করতে হবে। আমাদের বিশ্বাস বাড়িয়েছে প্রথম দফায় তৈরি করা শাড়িগুলি বিপুল দাম সত্ত্বেও বিক্রি করতে পেরে। পরের দফায় উতপাদনের দাম কমেছে। দেখা যাক।
Post a Comment