Monday, January 21, 2013

Traditional Houses of Bengal4, বাঙলার বাড়ি৪


যিনি নিজ চক্ষে এই ঘরখানি না দেখিবেন, তিনি এই শোভার একটা ধারনা করিতে পারিবেন না প্রতি অবকাশ স্থল, প্রত্যেক রুয়া, ছাটন, ফুরশি এমন সামঞ্জস্য-সহকারে নিয়মিত এবং প্রত্যেক জিনিষের ব্যবধান এরূপ সুনিয়ন্ত্রিত যে মনে হয় যে কারিগর প্রতি সূক্ষ্ম কার্য্যের জন্য গজকাঠি হাতে করিয়া কাজ করিয়াছেন কিন্তু আমাদের দেশের এই শিল্প শিক্ষা বংশানুক্রমে এরূপ বিশুদ্ধভাবে হইয়া আসিয়াছে, যে কোন গজকাঠি বা মানদণ্ডের সাহায্য ব্যতিরেকে সমস্ত জিনিষ কারিগরের স্বতঃসিদ্ধজ্ঞাণে সম্পাদিত হইয়াছে চালটা পূর্ব্বে দুই হস্ত পরিমিত পুরু ছিল, এখন উহা অত পুরু নাই এই পুরু চালের মধ্য মধ্যে সুদর্শন আবের চিত্রিত ছবির কারিগরী সর্ব্বত্র অপরূপ বিবরণ ৪ খানি চালা, চালা হইতে মুখপাত পর্য্যন্ত এক একটি ধয়ো ৪০ হাত ঘরের দৈর্ঘ্য ৩৫ ফিট এক একটি আঠনও ৩৫ ফিটন ঘরখানি প্রস্থে ৩০ ফিট, খাডাই ২৪ ফিট এক একটি  চালে ৯০টি ধয়ো, ৫৪টি আঠন ১৮৫টি ফুরশি, ৪৫০টি ছাটন, ১৭০টি সনা, ১৪টি পট, ৭টি পুখপাত, ৫টি পাড়, ৪০টি ডাফ, ১০টি খুঁটি, বারান্দায় ৮টি খুঁটি(ভিতরে) ও ২০টি তীর উপরিভাগে একটি ঢালা
ছাওয়ার জান মিঞা এখন জীবিত নাই তিনি অতি বৃদ্ধ বয়সে মারা গিয়াছেন তাঁহার পুত্রেরই বয়স প্রায় ৫০ এই ঘরখানি প্রায় ৮০ বত্সরের উর্দ্ধকাল হইল নির্ম্মিত হইয়াছে পূর্ব্বেই উল্লিখিত হইয়াছে, সেই সময় ইহাতে ব্যয় পড়িয়াছিল ১২,০০০(বার হাজার) টাকা তখন বাঁশ, বেত প্রভৃতি উপকরণের মূল্য এবং শিল্পীদের দক্ষিণা অতি অল্প ছিল সেই সময়কার একখানি খড়ো ঘরে যে বার হাজার টাকা ব্যয় হইতে পারে তাহা অসম্ভব মনে হইবে, কিন্তু ঘরখানি ভিতর দাঁড়াইলে মনে হইবে যে এখন যদি উহা কেহ নির্ম্মাণ করিতে চাহেন তবে উহা অপেক্ষা অনেকগুণ খরচ করিয়াও কারিগরের অভাবে তিনি সফলকাম হইবেন না কথিত আছে কোন বড় লোকের মেয়েকে ছাওয়ার জান বিবাহ করেন, তিনি পিত্রালয়ে বড় পাকা বাড়ীতে বাস করিয়া স্বামীগৃহের খড়ো ঘরের কথা শুনিয়া একটি ক্রুর ইঙ্গিত করিয়াছিলেন মিঞা মনে বড় দাগা পাইয়া তাঁহার জন্য এমন একখানি খড়ো ঘর তৈরী করাইলেন, যাহা একন বহু দূর হিতে লোকে দেখিতে আসে, অথচ ছাওয়ার জানের শ্বশুরের প্রাসাদোপম গৃহের শেষ ইষ্টকখানাও এখন বিলুপ্ত হইয়াছে, খড়ো ঘরের মহিমায় লোকে এখনও মুগ্ধ হয় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দেবারাধনা বা রমনীর প্রেমের প্রেরণা পাইয়া চিরকাল বিকাশ পাইয়াছে
চালের খুব পুরু ও শক্ত গাঁথুনির দরুন ঘরের নিচের দিকটায় বহু বত্সেরও একফোঁটা জলও প্রবেশ করিতে পারিত না, এই জন্য চালের নিম্নভাগ নানানরূপে সজ্জিত করা হইত অনেকসময় ময়ূরের পাখা এবং সময়ে সময়ে মাছরাঙ্গা পাখীর পালক দিয়া তাহা সাজানো হইত(মাছুয়া পক্ষের পাখা দিয়া সাজুয়া বানায় মলুয়া, পূর্ব্ববঙ্গ গীতিকা, ২য় ভাগ, ১ম খণ্ড, ৬২ পৃঃ) উত্কৃষ্ট ঘরগুলি যে সকল বাঁশ ও বেত দিয়া নির্ম্মাণ করা হইত তাহা সাধারণ বাঁশ ও বেত অপেক্ষা অনেক ভাল, কারন তাহা গৃহস্থেরা আলাদা রকমের চারা তৈয়ারী করিয়া যত্নের সহিত উত্পাদন করিত সময়ে সময়ে একটি সুদ্ধি বেত ২৩শত হাত লম্বা হইত এখনও পূর্ব্ববঙ্গের কোন না কোন পল্লীতে সেরূপ বেত জন্মান হয় খাঁটী বাঙ্গালী ঘরের সকল কাজই বাঁশ, বেত ও ছন দিয়া সম্পাদিক হইত, ূতা দিয়া কাঁথা বা শালে নানারূপ ফুল, লতা ও জীবজন্তু প্রস্তুত করা হয়, শুধু শুদ্ধিবেত দিয়া সেইরূপ কারুকার্য্য হইত, সেই বেত চাঁচিয়া সরু সুতারমত সূক্ষ্ম করা হইত বাঁশের দ্বারা নানানরূপ জীবজন্তুর মুখ ও অবয়ব নির্ম্মিত হইত সুতরাং খাঁটী বাঙ্গালী গৃহস্থ খুব কমই কাঠ প্রভৃতি অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার করিতেন যত অল্প ব্যয়ে সম্ভব, পুরাণ শাড়ীর সুতা বাহির করিয়া যেরূপ কাশ্মীরা শালেরমত কাঁথা তৈরী হইত, এই সামান্য সামান্য উপকরণে তদ্রুপ বাঙ্গালার পল্লীর সুদর্শন অপূর্ব্ব কারু খচিত ঘর তৈয়ারী হইত এককালে বঙ্গ দেশে এইরূপ ঘর অনেকেই প্রস্তুত করিতেন এদেশে পাকাবাড়ী নির্ম্মাণ নিরাপদ ছিল না, অথচ যে সকল শিল্পী অজন্তা-গুহা ও মগধের রাজপ্রাসাদ কারুকার্য্য-খচিত করিয়াছিলেন, তাঁহাদের বংশধরেরা সেই পৈতৃক শিল্প-বিদ্যার যাদুকাঠি ছাড়িয়া দিতে প্রস্তুত হন নাই রাজার ঐশ্বর্য্য ও মর্ম্মর এবং কৃষ্ণপ্রস্তরের আসবাব তাঁহারা কোথায় পাইবেন সুতরাং বেত ও বাঁশের সামান্য উপকরণ লইয়া তাঁহারা অসামান্য কৃতিত্বের পরিচয় দিতে লাগিলেন এদেশ দেবী ভারতীর নিজস্থান, তাই প্রকাণ্ড বিহারগুলির শ্মশানে খড়ো ঘরের টোল বসিয়াগেল, - ভারতীয় আসন টলিল না যে সকল শিল্পী তাঁহাদের অত্যাশ্চর্য শিল্প-মহিমায় জগত বিষ্মিত করিয়াছিলেন, তাঁহাদের বংশধরেরা অমূল্য উপকরণের অভাবে, ছেঁড়া কাপড়, ছুঁচ, সুতা, পিঠালী, বাঁশ, বেত, ও খড় লইয়া বসিয়া গেলেন এই স্থান শিল্পের জন্মস্থান, যতবার সেই শিল্প নষ্ট করিবে ততবার তাহা ভিন্নরূপ লইয়া মাথা গজাইবে
Post a Comment