Friday, October 14, 2011

এক যে ছিলেন প্রিন্স১০ - জবাব চায় বাংলা


জবাব চায়
পলাশির পর সোজা বাঁকা দুই পথে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সিন্দুকে যে টাকা ঢুকল, সে অর্থ হিসেব করে দেখা গেল তা দিয়ে ভারতে ব্যবসার তিন বছরের ইনভেস্টমেন্টএর অর্থ উঠে এসেছে তখন থেকে কোম্পানি এ দেশে রূপো আনা বন্ধ করে দিল দেওয়ানির সনদ হাতে আসারপর এই ব্যবস্থা পাকাপাকি হয়ে উঠল সে সময় কোম্পানি চিনের সঙ্গে ব্যবসা শুরু করেছে চিন থেকে ইংলন্ডে চা রপ্তানি হত ইংলন্ডে চায়ের বাজার তখন চাঙ্গা বললে কম বলা হয় রূপো দিয়েই সে চা কিনতে হত এখন বাংলায় রূপো আনা বন্ধ হয়ে গিয়েছে, কোম্পানির তখন উদ্দেশ্য হল চিনেও রূপো পাঠানো বন্ধ করতে হবে তৈরি হল কোম্পানি ষড়যন্ত্র
বাংলার রাজস্ব হাতে পাওয়ার পর ইংলন্ড বাংলা আর চিনের মধ্যে সে এমন এক বাণিজ্য ত্রিভূজ গড়ে তুলতে শুরু করল, যাতে নিজেদের দেশ থেকে কোনো বিনিয়োগ না করেই চিন থেকে সে চা কিনতে পারে পলাশির চক্রান্তে সফল হয়ে বাংলা থেকে চিনে রূপো পাঠিয়ে সেখান থেকে দামি পণ্যগুলো সংগ্রহ করত ঠিক হল এমন এক কল করতে হবে, যাতে রূপে বাংলা থেকে আর চিনে না পাঠিয়ে ইংলন্ডে নিয়ে যাওয়া হবে অথচ চিনের সঙ্গে বাণিজ্যও ঠিকঠাক চলতে থাকবে ভারতের খাজনা তোলার টাকায় চিনে সুতির কাপড় আর আফিম যেতে শুরু করল ক্যন্টনে বাংলা থেকে পাঠানো আফিম বাণিজ্যকে আকাশ ছোঁয়ানোর পরিকল্পনা করা হল সেই বাণিজ্যের উদ্বৃত্ত অর্থের অদ্ভুত রসায়নে, বাংলা বিহারের চাষীর রক্ত ঝরানো আফিম চিনেদের রক্তে ঢুকে পড়ল বাংলা-চিনের আফিমের ব্যবসা শুরু হল ক্রমশঃ চিন থেকে আফিম ব্যবসার উদ্বৃত্তে বহুমূল্য চা কিনতে শুরু করল ব্রিটেন চিনেও রূপো আনা বন্ধ করে দিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্য এশিয়া লুঠ করে তার সম্পদ ব্রিটেনে নিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার দেশ থেকেও কিন্তু দামি ধাতু এশিয়ায় আসা বন্ধ হয়ে গেল এশিয়ায় ব্যবসা করতে আর রূপো আনার আর প্রয়োজন হল না এশিয়ার লুঠের সঙ্গে সঙ্গে হাজার হাজার বছর ধরে বিকশিত নানান শিল্প পরিকাঠামোও ভেঙে দিল ব্রিটেন ফলে এশিয়া-ইওরোপের বাণিজ্য নতুন পথ ধরে যাওয়া শুরু হল এতদিন প্রযুক্তি, শিল্প দ্রব্যের এশিয়ার বাজার ছিল ইওরোপ, পলাশির ৭০ বছরের মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতির ইতিহাসের চাকা দ্রুত ঘুরে গেল, এশিয়া অধমর্ণ হল আর ইওরোপ হল উত্তমর্ণ
একদা সনাতন বাংলার সামাজিক পরিমণ্ডলে এবং বৈদ্যদের রোগ সারানোয় আফিমের ভূমিকা অবসংবাদী ছিল ভারতের নানান প্রান্তে কৃষকেরা এই চাষ করত সামাজিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থেকে ব্যবসায়ীরা কৃষকদের থেকে আফিম কিনে বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করতেন এই পুস্তকে ইংরেজদের আর বাঙালি-পার্সি ইংরেজ বন্ধুদের আফিম ব্যবসায় নিয়ে অনেক কথা আগেই বলা হয়েছে, কেননা এই অমানবিক ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন রামমোহন, দ্বারকানাথেরমত বাংলার নানান স্বনামধন্য জগতখ্যাত ব্যক্তিত্ব, আজকের মুম্বইএর গোড়া পত্তন করেছিলেন এমন কিছু মানুষ যারা আজ ভারতের ব্যবসা জগতে নিজস্ব আলোয় ভাস্বর তাঁদের শুরু কেমন হয়েছে তা আমাদের যেমন জানতে হবে, তেমনি যাঁরা বাংলার একদা জনজাগৃতি এনেছেন বলে আজও খ্যাত, তারাও শুধু বাংলার চাষীদের পীড়ন করেই ধনী হয়েই খান্ত থাকেন নি, তাদের একটা বড় অংশ ব্রিটিশদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে চিনে আফিম রপ্তানি করেছেন স্ব-ইচ্ছায়, দুদুটো যুদ্ধ বাধিয়েছেন, চিনের জনগণকে আফিম খাইয়ে ইওরোপকে ধনী করার চক্রান্তে, আর সেই বাণিজ্য থেকে নিজেদের সিন্দুক ভরার স্বার্থে
অস্বস্তিকর এই কথাগুলি আজ একমাত্র বাঙালিদের কম্বু কণ্ঠেই বলতে হবে, নিজেরদের আত্মশুদ্ধি আর বিগত আড়াইশ বছর ধরে ব্রিটিশ প্রণোদনায় গ্রামীণ বাংলা ধংস করার প্রকল্পে সামিল হওয়ার বিবেকের তাড়নার জবাবদিহিতে ব্রিটিশদের অত্যাচারে বাংলার খুন হয়ে যাওয়া কোটি কোটি বাঙলার হতভাগ্য খেটে খাওয়া জনগণে আজ জবাব চায়, সেই সময়ের শহুরে ধনী বাংলা-বাঙালি উত্তরাধিকারীদের কাছে, যারা ব্রিটিশের অত্যাচারের পাশে দাঁড়িয়ে, বাঙলার রক্তে সরাসরি হাত রাঙিয়ে আফিম, নুন আর আফিম ব্যবসা এবং নীল চাষ করে ধণ উপার্জণ করেছেন হাজার হাজার বছর ধরে গড়ে তোলা, বাঙলার শিল্প, কারখানা আর সামাজিক পরিকাঠামোকে ধংস করেছেন, সমাজ নবীকরণের নামে রিফর্ম ছিল সে যুগের অত্যন্ত আদরনীয় শব্দবন্ধগুলির মধ্যে অন্যতম কোম্পানির শাসনকালে, বানিয়া ব্রিটিশদের এবং ব্রিটিশপদপ্রান্তে প্রণত শহুরে বাঙালিদের অমিত ধণার্জণ এবং বিত্তবাসনা, ইংরেজদের বাংলার শিল্প ধংসকরণ প্রকল্পে স্ব-ইচ্ছায় অংশগ্রহণ, এই ধংসযজ্ঞকে আরও দ্রুত ত্বরান্বিত করে, অবশ্যম্ভাবী করে তোলে এই ধংস যজ্ঞের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে গ্রামীণ বাংলা বুক চিতিয়ে লড়াই দিয়েছে আগ্রাসী ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে শহুরে বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ ব্রিটিশ প্রসাদপুষ্ট জনসাধারণ একবারও স্বাধীণতা সংগ্রামীদের পাশে এসে দাঁড়াবার কথা ভাবেননি ধংস হয়ে যাওয়া এইসব শিল্প-ব্যবসা-সামাজিক রীতিনীতিগুলি ভিত্তি করে বেঁচে থাকা লাখো লাখো স্বাধীণতা সংগ্রামী শ্রমিক-শিল্পী, তাদের পরিবার এবং এই কাজের ওপর নির্ভর করে পরোক্ষে জীবিকা নির্বাহ করা হাজারও মানুষ খুন হলেন, জীবিকা থেকে উচ্ছেদ হলেন, শিল্পী থেকে পথের ভিখারি হলেন, আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে আমনাগরিকে রূপান্তরিত হলেন ভারতের শিল্প পরিকাঠামো ধংস করে, ইংলন্ডে শিল্প পরিকাঠামো গড়তে, এই শিল্পীদের জীবনে, নতুন নতুন ধরনের অমিত-পাশবিক অত্যাচার নামিয়ে এনে গ্রামীণ স্বাধীণতা সংগ্রামীদের জীবিকা থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে সরাসরি, যে কাজে সর্বান্তকরণে সমর্থন দিয়েছেন বাংলার শহুরে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত সাম্রাজ্যের বন্ধুরা ব্রিটিশদের অমানুষিক অত্যাচারে, কখোনো শহুরে বাঙালির ঔদাসিন্যে, কখোনোবা তাদের প্রত্যক্ষ মদতে, কোটি কোটি সাধারণ মরে হেজে যাওয়া গ্রামীণ বাঙালি, যারা জানল না কি দোষে তাদের খুন হতে হল অথবা ছেলেমেয়েবউনিয়ে রাস্তায় দাঁড়াতে হল, অথবা খেতমজুরি করে খেতে হল আজ তারা জবাব চায় বাঙলার নবজাগরণের গুরুঠাকুরদের উত্তরাধিকার যাঁরা বহন করছেন সেই উজ্জ্বল ইংরেজি শিক্ষিত উচ্চবর্ণের মানুষদের থেকে উত্তমর্ণ অর্থনীতির উদ্বৃত্ত শিল্পোন্নত দেশ থেকে অধমর্ণ বাংলাকে, ইওরোপের সংস্কৃতি-অর্থনীতির ওপর সরাসরি নির্ভরশীল দেশে পরিণত করার জন্য বাংলার চিরাচরিত প্রতিবাদী শিল্পী-কারিগরেরা শহুরে ধনী বাঙালিদের কাছে জবাব চায় জবাব চায় ভারতীয় সমবায়ী সমাজের হাজার হাজার কৃষক-শিল্পী-মজুর, যারা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে স্বাধীণতা সংগ্রামের ঝান্ডা তুলে তোপেরমুখে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করেছেন, রাইফেলের বেয়নেটের আঘাত খেয়েও লুঠ হয়ে যাওয়া সমাজমাতৃকার সম্মান রক্ষায় ব্যক্তিগাত লাভলোকসানের সমঝোতার হিসেবের কড়ির কথা বিন্দুমাত্র চিন্তা করেননি, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সেনা-পুলিশের অত্যাচারে খুন হয়েছেন, অথচ মাথা বিকিয়ে দেননি বিদেশি লুঠেরা সাম্রাজ্যের শক্তির পায়ে তাঁরা তত্কালীন ইংরেজ সাম্রাজ্যের বন্ধুদের কাছ থেকে জানতে চায়, কী তাদের দোষ, কার দোষে তিল তিল করে গড়ে তোলা দেশটির এই হাঁড়ির হাল শহুরে বাঙালিরা চিনেরমত প্রতিবেশী দেশকে আফিম খাওয়ানোর ইংরেজ প্রকল্পে সামিল হয়েছিলেন কেন সেই স্পর্ধিত প্রশ্ন তারা করতে চাইছে আজ শহুরে বাঙালিদের পূর্বজরা, নিজেদের এবং নিজেদের পরিবারকে ধনী করার জন্য, সমাজে আরও একটু প্রতিপত্তি লাভের জন্য, নিজের দেশ, নিজের হতভাগ্য মানুষ, নিজের প্রতিবেশী দেশের প্রতি যে অন্যায়-অবিচার সংগঠিত করে গিয়েছেন, ব্রিটিশদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, সেই কর্মকে প্রত্যেক বাঙালির আজ প্রশ্ন করা প্রয়োজন আজও বাংলার খ্যাতিমানেরা ব্রিটিশ প্রণোদিত বাংলা ধংস প্রকল্পের সফল কৃতকর্মের জন্য বাংলা তথা ভারতে পুজ্য, প্রণম্য এবং আদরনীয়, অথচ বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গিয়েছেন বাংলার বিদ্রোহী আদিবাসী আর লৌকিক সমাজ ভাল রে ভাল! স্বাধীণতা সংগ্রামী বাংলা আজ জবাব চায় সব হারানোর হিসেব নিকেষ করতে চায়
Post a Comment