Sunday, January 28, 2018

মুঘল দরবারের মুন্সি৩ - চন্দ্র ভান ব্রাহ্মণ - উপনিবেশপূর্ব ইতিহাসকে কেন নতুন ভাষ্যে লিখতে হবে

চন্দ্র ভান ব্রাহ্মণের সময় আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ নতুন ইতিহাস লেখার কাজে। গবেষকদের ভাষায় 'মৌলবাদীদের হাতে চলে যাওয়া' মুঘল প্রশাসনে বিপুল ব্যপ্ত অমুসলমান প্রতিনিধত্ব তাঁর লেখা সূত্রেই উঠে আসে।বাবা ধরম দাস ষোড়শ শতকে পাঞ্জাবেরই লাহোরে পারসি শিখে স্থানীয় প্রশাসনে চাকরি করেছেন, অসামান্য দক্ষতায়(নাওয়িসান্দাই করদানি বুদ) প্রশাসনিক কাজ করে মনসবদারও হয়েছেন। পারসি শেখা, ব্রাহ্মণ হয়ে মুঘল দরবারে কাজ নেওয়া নিয়ে বাবার কিন্তু কিন্তু থাকলেও চন্দ্র ভান নিজের সামাজিক শ্রেণী(তাইফা) পদমর্যাদা বজায় রেখেই নিঃশঙ্ক চিত্তে সারা জীবন কাজ করেছেন।
চন্দ্র ভান জানিয়েছেন তাঁর ভাইএরা শুধু পারসি সাহিত্যেই দক্ষ ছিলেন না, প্রশাসনিক নানান কাজে অসামান্য যোগ্যতা প্রদর্শন করেছিলেন। এক ভাই রায় ভান শেষ পর্যন্ত সন্ন্যাসী হয়ে যান। তৃতীয় ভাই উদয় ভান প্রশাসনিক কাজে নিজেকে দক্ষ করে তোলেন(সরগ্রমই নাশায়ি রোজগার শুদ) প্রখ্যাত অভিজাত আকল খাঁ(শিরাজি)এর সঙ্গ করে।
চন্দ্র ভান, পুত্র তেজ ভানকেও পারসি সাহিত্য এবং প্রশাসনিক কাজে দক্ষ করে তোলেন। তেজ ভান ১৬৬০এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ঔরঙ্গজেবের প্রশাসনের মাঝারি গোছের রাজস্ব কর্তা থাকা ছাড়া তাঁর সম্বন্ধে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।
চাহর চমনে তিনি লিখছেন, এই ফকির প্রতাপ রায় কায়স্থের পুত্র, বিদ্বান (বাকামালই মাকুলিয়ত ওয়া ফাহ্মিদাগি আরাস্তা অস্ত) কোষাগার আধিকারিক(মুশরিফ) বনারসি দাসের কাছে তালিক অক্ষরে পারদর্শী হন। তাঁর শিক্ষকের আরেক ভাই সুন্দর দাস মির্জা মুহম্মদ হুসেইনের অনুসারী ভাঙা অক্ষর(খতই শিকস্তা) লেখায় দক্ষতা অর্জন করেন।
চন্দ্র ভানের লেখায় রাজস্ব দপ্তরে বিপুল সংখ্যক শূদ্র আধিকারিকের নাম পাচ্ছি। যৌবনে চন্দ্র ভান ভাঙা অক্ষরে(খতই শিকস্তা) শিক্ষা নেন বুদ্ধিজীবি (আজ কাফাসই জিসমানি বর আমাদা বা আলমই রুহানি খিরামিদা) জাত(ট?)মল শূদ্রের অধীনে। তাঁর ভাই নিসবত রাওএর সাহিত্য চেতনা (মাতানতই কলম)ও গভীর ছিল। ছিলেন তালিক আর শিকস্তা অক্ষরে মাহির গোপীচাঁদ শূদ্র। শূদ্র সমাজে(আওয়াম)র প্রখ্যাতরা ছিলেন ভগবন্ত রায়, নারায়ণ দাস।
চন্দ্র ভানের চিঠিপত্রে তাঁর সময়ের বেশ কিছু অমুসলমান অভিজাত - রাজা মাখম সিং, রাজা ঢোকল সিং, রাজা নাজব সিং, রায় মোহন লাল, রায় ঠাকুর দাস, রায় গোবিন্দ দাসের নাম পাওয়া গিয়েছে। বিপুল সংখ্যক চিঠিতে সমসাময়িক বন্ধুদের মুঘল দরবারে চাকরিতে সুপারিশ করেন। ভাই উদয় ভানকে সম্বোধন করে লেখা চিঠিতে বেরিলির ফৌজদার জনৈক বিহারী দাসের সাহিত্যিক যোগ্যতা সম্বন্ধে লেখেন। একই সঙ্গে উজির ইসলাম খাঁএর দপ্তরেও আরেকটি সুপারিশ লেখেন বিহারীর যোগ্যতা বিষয়ে - মর্দএ শুকানফাহম (ওয়া) মুদ্দাআআনবিশ (ওয়া) খুশসুবত অস্ত।
চন্দ্র ভানের চিঠিতে উল্লখিত বিহারী দাস ছাড়াও মুঘল ইতিহাসে যাঁরা সূত্র রেখে গিয়েছেন, তাদেরও নাম পাওয়া যায়, এদের মধ্যে ছিলেন শঙ্কর দাস, সুরত সিং, প্রাণ নাথ, খ্বাজা সাগর মল ইত্যাদি। এদের মধ্যে অনেকেই চন্দ্র ভানের সাহিত্যিক ক্ষমতার কাছাকাছি ছিলেন।

মুঘল দরবারের মুন্সি২ - চন্দ্র ভান ব্রাহ্মণ - উপনিবেশপূর্ব ইতিহাসকে কেন নতুন ভাষ্যে লিখতে হবে

রাজীব লিখছেন মোটামুটি আকবর পাদশার পরের সময়ের ইতিহাস লিখতে গিয়ে প্রত্যেক গবেষকই বলে দিচ্ছেন যে জাহাঙ্গীর থেকে আকবর পর্যন্ত ইসলামিক মৌলবাদেরই পদধ্বনি শোনা গিয়েছে। কিন্তু লেখক বলছেন, যদি আমরা ধরেই নি, আকবরের সময়ের পর থেকে মুঘল সমাজে মৌলবাদ জাঁকিয়ে বসেছে, দরবারে গোঁড়া মৌলভিদের প্রভাব বাড়ছে এবং অমুসলমানেদের ধর্ম পরিবর্তনে বাধ্য করা হচ্ছে, তাহলে কেন দরবারে কাজ করা প্রখ্যাত আমলার লেখায় সে বিষয়ে ইঙ্গিতটুকুও নেই তাই নয় এই আপাত গোঁড়ামির সময়েই কিন্তু অন্যান্য মুসলমান আমলার মতই ব্রাহ্মণ চন্দ্র ভানের পদন্নোতি ঘটছে।

আদতে বিভিন্ন প্রখ্যাত গবেষকদের মুঘল সাম্রাজ্য বিষয়ক বিষদ্গার সরিয়ে আবার চন্দ্র ভানের লেখাপত্তর আমাদের নতুন করে পড়া দরকার, সে সময়ের 'সত্য' নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলা দরকার। তবেই ইতিহাসের ঋণ শোধ হবে।

নীচে লেখকের বিস্তৃত উদ্ধৃতি তুলে দেওয়া গেল -

Perhaps there is some kernel of truth to all this conventional wisdom. But if post-Akbar Mughal society really did witness such a “revival of a strident and uncompromising Islam,” then wouldn’t we expect to see at least some evidence of it in the testimony of a prominent Hindu who lived through this period? Would we not expect a Brahman like Chandar Bhan, who spent the better part of five decades interacting daily with Muslims in Mughal politics, administration, and society, to show at least some indication that he felt threatened by the “much more orthodox Muslim stance” of Akbar’s successors, harried at every turn by the growing influence of “conservative clerics . . . pushing non-Muslims [like him] to convert”? Wouldn’t the “social division and cultural insularity” of such a “re-Islamized Mughal society” make it impossible for a high-caste Hindu to move up the social ladder and forge such amicable professional relationships with so many Muslim denizens of the court, much less earn considerable literary fame among those very same networks?

century suggests a rather different interpretation of the post-Akbar period. It may be just one voice, but it is a powerful one, and while Chandar Bhan’s life and experience by themselves may not be enough to undo generations of scholarly conventional wisdom, they will definitely force us to ask some hard questions concerning what we really know about the period.

Saturday, January 27, 2018

মুঘল দরবারের মুন্সি - চন্দ্র ভান ব্রাহ্মণ - উপনিবেশপূর্ব ইতিহাসকে কেন নতুন ভাষ্যে লিখতে হবে


চন্দ্র ভান পাঞ্জাবের এক সাধারণ ঘরের সন্তান।পাঞ্জাবে করণিক হিসেবে কাজ শুরু করে, আকবরএর রাজত্বের শেষ সময়, জাহাঙ্গির হয়ে শাহজাহানএর সময় মুঘল দরবারে উচ্চপদে কাজ করেছেন।আওরঙ্গজেবএর রাজত্বের প্রথম কিছু বছর চিঠিপত্রে নবীন সম্রাটের সঙ্গে চন্দ্র ভানের ভাবনার আদানপ্রদান হয়।
পারসি ভাষায় লিখে গিয়েছেন দরবারি স্মৃতিকথা চার চমন(চার বাগান) এবং বিভিন্ন নামে লেখা ব্যক্তিগত চিঠিপত্রে, বিশেষ করে মুনসাতইব্রাহ্মণএ। চন্দ্র ভানের পদ্যের লিখন শৈলী(ইনশা) কয়েক প্রজন্মের লেখকের আদর্শ ছিল।অষ্টাদশ শতকের শেষেও ১৭৯৫ সালে ফ্রান্সিস গ্লাডউইন রচিত পারসি পাঠ্যপুস্তক দ্য পারসিয়ান মুন্সিতে চার চমন থেকে উদ্ধৃত হয়েছে। এই বইটি কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটি এবং প্রাচ্যবিদদের অবশ্য পাঠ্য ছিল।
চার চমন এবং মুনসাতইব্রাহ্মণএ চন্দ্র ভান বিশদে ইন্দো-পারসি প্রশাসনিক দায় দায়িত্বের চরিত্র ইত্যাদি বিষয়ে শুধু লেখেন নি, তিনি রাজনৈতিক নেতৃত্ব, শিল্প সৃজনের সামাজিক মূল্য, জন জীবনে সাহিত্য, অতীন্দ্রিয়বাদের গুরুত্ব, জনজীবনকে আরও ভাল ভাবে সেবা দেওয়ার জন্য মুঘল সাম্রাজ্যের প্রশাসনে কি কি পরিবর্তন আনা দরকার সে সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও যথাযোগ্য মন্তব্য করে গিয়েছেন।
মুন্সি, উজির এবং অন্যান্য প্রশাসক, তাঁদের কৃষ্টিগত ভূমিকা এবং নৈতিক দায় দায়িত্ব জানতে গভীর ইন্দো-পারসি কবিতা এবং নসিহত-নামা আঙ্গিকের পরামর্শ সাহিত্য জাতীয় যে সব পুঁথি অনুসরণ করতেন, চার চমন সেগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল।
সম্রাটের ব্যক্তিগত সচিব এবং দিনপঞ্জী লেখক(ওয়াকিয়ানবিশ) থাকার দরুণ, মুঘল সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগে তিনি রাজ পরিবারের সদস্যদের গৃহস্থি, দরবার এবং প্রশাসনিক কাজকর্ম ইত্যাদি নিজের চোখে দেখেন। বিভিন্ন সম্রাটের সঙ্গে কাজ করার সুবাদে চন্দ্র ভানের দরবারি রাজনীতি, বিভিন্ন মুঘল অভিজাতর সঙ্গে তার সম্পর্ক, বিভিন্ন দৌত্য এবং সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়ার যে বিপুল অভিজ্ঞতাি পারসিক ভাষায় অসামান্য আঙ্গিকে লিখে গিয়েছেন। চার চমন পড়লে আন্দাজ করা যায় মুন্সি বা উজির যেমন রাজা টোডরমল্ল, আফজল খাঁ শিরাজি, সাদ আল্লা খাঁ এবং রাজা রঘুনাথ হতে গেলে কি ধরণের কৃষ্টিগত এবং প্রশাসনিক দক্ষতার মিশেল থাকা চাই।
তিনি বুঝিয়ে গিয়েছেন প্রশাসনিক সাফল্য শুধু সামরিক কর্তৃত্বে(ইমারত) তৈরি হয় না, তার সঙ্গে জুড়তে হয় প্রশাসনিক দক্ষতা(উজিরত) এবং গভীর অতীন্দ্রিয়বাদ এবং সাহিত্যিক সংবেদনশীলতা(মারিফত) এবং স্বস্বার্থের ওপরে উঠে গভীরভাবে জনকল্যান কর্ম বিষয়ে নজরদারি।
চন্দ্র ভান বিষয়ে লিখছি এটা বোঝাতে যে, মানুষটা সারাজীবন নিজের নামের পিছনে ব্রাহ্মণএর মত সামাজিক পদমর্যাদা বোঝানোর উপসর্গ নিয়ে কাটিয়েছেন মুঘল দরবারের উচ্চপদে ধর্ম পরিবর্তিত না হয়েই। অথচ মুঘল সম্রাটেরা ঔপনিবেশিক ঐতিহাসিকদের কলম পেষায় নিন্দনীয় হয়ে রয়েছেন ধর্ম পরিবর্তনকারী হিসেবে।
উপনিবেশ বিরোধী চর্চায় সাহিত্যিক প্রশাসক চন্দ্র ভানের গুরুত্ব ইতিহাস পুনর্লিখনে।

(রাজীব কিনরার রাইটিং সেলফ, রাইটিং এম্পায়ার, চন্দ্র ভান ব্রাহ্মণ এন্ড দ্য কালচারাল ওয়ার্ল্ড অব দ্য ইন্দো-পারসিয়ান স্টেট সেক্রেটারি অনুসরণে)

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা - চাহিদা১ - ইভান ইলিচ

যেখানেই যান মনে হয় চিনি চিনি। বিশ্বজুড়ে কুলিং টাওয়ার, পার্কিং লট, কৃষি ব্যবসা আর মেগাসিটির রমরমা। এতদ সত্ত্বেও যেন মনে হচ্ছে উন্নয়নের ধারা শেষ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে – যেন মনে হচ্ছে এই বিপুল বিশাল অট্টালিকার ঝাঁক বিশ্বের জন্য বেমানান মনে হচ্ছে। বিশ্বজোড়া এই ধরণের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো একে একে খণ্ডহর, অব্যবহার্যে পরিণত হচ্ছে। আতঙ্কের হল আগামী দিনে এই আবর্জনার মধ্যেই আমাদের বেঁচে থাকা অভ্যেস করতে হবে। কুড়ি বছর আগে (এই বইটি সম্পাদিত হচ্ছে ২০০৯ সালে, লেখাটা তৈরি হয়েছে ১৯৯০ নাগাদ) উন্নয়নের পুজায় প্রণিপাত যে প্রত্যাঘাত (counterintuitive) করবে সেটা মোটামুটি বোঝা যাচ্ছিল। আজ টাইম ম্যাগাজিন বিশ্বজোড়া এই আবর্জনাকে খবর করে প্রচ্ছদের বিশ্বধ্বংসের ছবি ব্যবহার করে। আমরা কেউই জানি না - জলবায়ুর পরিবর্তন, জিন শূন্যতা (depletion), দূষণ, বিভিন্ন সুরক্ষা কবচের ধ্বংসপ্রাপ্তি, সমুদ্র স্তরের উল্লম্ফন এবং কোটি কোটি মানুষের গৃহহীন হওয়া – এই চারটি ধ্বংসের ঘোড়সওয়ারকে কিভাবে সামলানো যাবে। এই বিষয়গুলি আলোচনায় দুটি প্রতিক্রিয়া উঠে আসে – হয় আতঙ্ক নয় আসূয়া। এই বিশ্বপরিবর্তনের সঙ্গে বেঁচে থাকার থেকে আরও ভীতিপ্রদ হল, বিগত চার দশকের উন্নয়নের সংজ্ঞায় অসীম চাহিদাকে সঙ্গে নিয়ে বেঁচে থাকা। উন্নয়নের বর্ষা নৃত্য মন্থনের যে অসীম চাহিদার উদ্ভব ঘটল তা শুধু বিশ্বকে লুঠে দূষণের হলাহলে ঢেকে ফেলার থেকেও গভীরতর প্রভাব ফেলেছে। মানুষের চরিত্রেই মৌল পরিবর্তন(transmogrified) এনেছে। তারা Homo sapiensকে Homo miserabilisএ পরিণত করেছে। আজ মনে হয় মৌল চাহিদা যেন উন্নয়ণের কুটিল উত্তরাধিকার(insidious legacy), যাকে সে পিছনে ফেলে এসেছে।
এই পরিবর্তনটা ঘটেছে কয়েক শতাব্দ জুড়ে। এই সময়ে শেকড়ে পরিবর্তন এসেছে, একে কখোনো বলা হয়েছে প্রগতি, কখনো উন্নয়ন, কখোনো বৃদ্ধি। এই যুগব্যাপী প্রক্রিয়ায় মানুষ কৃষ্টি আর প্রকৃতিতে সম্পদ আবিষ্কার করে ফেলার দাবি করেছে – সেগুলো যেন জনগণের সম্পত্তি – তারা সেগুলির সঙ্গে অর্থনৈতিক মূল্যমান জুড়ে দিয়েছে। অভাব বা ঘাটতির ঐতিহাসিকেরা এই গল্পসূত্র জুড়তে পারেন। সর ফেটালে যেমন ঘন হয়ে মাখনে পরিণত হয়, হঠাতই যেন এক রাতের মধ্যে অভাবের নায়ক Homo economicus, থেকে অভিযোজনের মাধ্যমে পরিণত হল Homo miserabilisএ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী প্রজন্ম এই পরিবর্তন চোখের সামনে দেখল, সাধারণ মানুষ কিভাবে চাহিদাবন্ত মানুষে পরিণত হয়। বিশ্বে  জন্মানো অর্ধেক Homoই কিন্তু এই নতুন মানুষে পরিণত হল।
প্রত্নতত্ত্বিক সাক্ষ্য থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার Homo sapiens নামক পূর্ণ বয়স্ক মানুষের অতীত ৫ লক্ষ কোটি বছরের বেশি নয়। তারা প্রথম পাথর যুগের Lascaux গুহার শিকারের ছবি থেকে পিকাসোর বিশ্ব কাঁপানো গুয়ের্নিকায় সময়ে বেঁচেছে - দশ হাজার প্রজন্ম তৈরি করেছে, হাজার হাজার ভাষায় হাজার হাজার রকমের জীবনযাত্রা নির্বাহ করেছে, তারা কেউ বরফে বাস করেছে, কেউ গরু পালন করেছে, কেউ রোমান কেউবা মোঘল, কেউ নাবিক কেউ যাযাবর। নিড়ানি, টাকু, কাঠ, কাঁসা, লোহার হাতিয়ার নির্ভর প্রত্যেকটি জীবনযাত্রার একটাই শর্ত প্রত্যেকটি প্রত্যেকটির থেকে সম্পূর্ণভাবে আলাদা। কিন্তু প্রত্যেকটি নিশ্ছিদ্র শর্ত ছিল নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট স্থানে গোষ্ঠীর প্রথার প্রতি পূর্ণ আনুগত্য প্রদর্শন। প্রত্যেক কৃষ্টি এই প্রয়োজনীয়তার শাসনকে ভিন্ন ভিন্ন লব্জে গ্রথিত করেছে। প্রত্যেকটি চাহিদার দৃষ্টিভঙ্গী প্রকাশিত হত ভিন্ন ভিন্ন ভঙ্গীতে মৃতকে কবর দেওয়া থেকে শুরু করে জাদুর ভয়(exorcize fears) পাওয়া পর্যন্ত। চাহিদার নমনীয়তার বিপুল বৈচিত্র্যময় কৃষ্টির প্রাবল্য প্রত্যেক সমাজে, ব্যক্তিতে আলাদা আলাদা ছিল। নতুন কিছু করতে টনগানেরা(Tongans) হাজার হাজার মাইল সমুদ্র পেরিয়ে এসেছে। Toltecsরা মেক্সিকো থেকে উইসকন্সিনে এনে মন্দির তৈরি করেছে। মঙ্গোলিয়ার মুসলমানেরা কাবায় আসে, স্কটেরা পুণ্য ভূমিতে পদার্পণ করে। এই সব যন্ত্রণা ভয় বিষ্ময় সন্ত্রাসের সব রকম রূপ সত্ত্বেও মানব সভ্যতার অর্ধেক পরিমানে উত্তরপুরুষ বর্তমানে যে চাহিদার সংজ্ঞায় জীবনধারণ করেছে, কোনদিন মানুষ তার ধারে পাশেও পৌঁছতে পারে নি।
(ক্রমশঃ)

উলফগাং শ্যাকস সম্পাদিত দ্য ডেভেলাপমেন্ট ডিক্সনারি, আ গাইড টু নলেজ এজ পাওয়ার থেকে

উপনিবেশ পূর্ব শূদ্র প্রযুক্তি চর্চা - লোহা-ইস্পাত প্রযুক্তি পরম্পরা - লোহার, লোহা কারিগর

দুবছর আগে বোলপুর গিয়েছিলাম - খুব তাড়াতাড়ি ফিরছি - দাঁড়াবার সময়টুকু নেই।

বোলপুরের দেখলাম লোহারেরা তাঁদের লোহা তৈরি প্রযুক্তিকর্ম নিয়ে বসে রয়েছেন রাস্তার ধারে। ঠিক যেমন করে কয়েক হাজার বছর ধরে পরিযায়ী তাঁরা ভারতের বিভিন্ন গ্রামের বাইরে বসতেন জংছাড়া লোহা পেটানো সরঞ্জাম নিয়ে, গৃহস্থদের নানান দ্রব্য তৈরি করে দিতেন। পেতেন জীবন চালাবার মত নানান বিনিময় দ্রব্য। সে গ্রামের কাজ শেষ হলে পাততাড়ি গুটিয়ে চলে যেতেন অন্য গ্রামে। গৃহস্থকে এই সেবা কত বছর ধরে তাঁরা দিয়ে আসছেন কেউ জানে না। পশ্চিম এক ধরণের প্রগতির কথা বলেছে, লোহা যুগ, তামা যুগ ইত্যাদি। আমাদের সে সব নিয়ে মাথাব্যথা নেই।

আজ কয়েক হাজার বছরের প্রযুক্তিবিদদের বাংলার এই আন্তর্জাতিক শহরে দেখে মনে হল এটাই ভারতবর্ষ। হাজার হাজার বছর ধরে হাজারো খুনে, লুঠেরা, অভিযাত্রী এদেশে এসেছেন এদেশের সম্পদের টানে, কেউ থেকেছে নিজের দেশ হিসেবে, কেউবা চলে গেছে, কেউবা থকে গিয়েও লুঠেরাদের মত চরিত্র প্রকাশ করেছে। লুঠের জন্য ব্রিটিশরা ভারতকে নিজেদের মত করে বদলাতে চেয়েছে। কিছুটা যে বদল হয় নি তাও বলা যাবে না। বহু জ্ঞানী মহাজন সাধারণ মানুষকে পাল্টাতে চেয়েছেন তাঁদের ধারণায়। তাঁরাও কিছুটা সফল।

কিন্তু সাধারণে এই সব অসাধারণ জ্ঞানী, প্রযুক্তি বাহক, দক্ষতা সম্বল করে নিজেদের মত করে বয়ে নিয়ে চলেছেন গ্রামীন শূদ্র ভারতে বিকশিত আত্মাকে, ভারতে বিকশিত অকেন্দ্রিভূত দর্শনকে, গ্রাম ভারতের অসামান্য প্রযুক্তিকে। তাঁদের সঙ্গে সঙ্গত করেন গ্রামে থাকা, শহরে থাকা গ্রাম থেকে নানা কারণে উচ্ছেদ হয়ে আসা গ্রামীনেরা - যারা এই মানুষদের সেবা নেন, বিপুল বড় কর্পোরেটদের এই ধরণের উৎপাদন থাকা সত্ত্বেও, তাঁরা তাঁদের চাহিদা কেনেন এই পরম্পরার প্রযুক্তি বাহকদের থেকে। আজও তাঁরা বেঁচে রয়েছেন বহাল তবিয়তে। সমাজে বাস করা ৬% ভদ্রবিত্তকে এড়িয়ে এই আবহমানকালের বাজারের রেশে খুঁজে পাই ধরতে পারি আমার মানুষকে, আমার স্বজনকে।

এত দুর্বিপাক, এত বিভীষিকা, এত জ্ঞানচুরি, জ্ঞানহত্যার পরেও এই জ্ঞানী গোষ্ঠীবদ্ধ মানুষ কয়েক হাজার বছরের ভারতীয় পরম্পরা বয়ে নিয়ে চলেন অবহেলে, উন্নয়নের সমস্ত হাতছানি ব্যর্থ করে, ইওরোপিয় জীবনযাত্রা দুচ্ছাই করে, আধুনিকপ্রযুক্তির দিকে না তাকিয়েই।











তাঁদের সঙ্গে আজও জড়িয়ে রয়েছেন গ্রামের সাধারণ, ভারতের শেকড়ে দাঁড়িয়ে থেকে দৃঢভাবে। আর শহুরে গবেষকদের লুপ্ত/লুপ্তপ্রায় প্রযুক্তি/জীবনযাত্রা শব্দবন্ধ ব্যবহারের মুখে নুড়ো ঘষে।

এই আমার ভারত। যে ইন্ডিয়া থেকে বহু দূরে কিন্তু আমাদের সংগঠনের কেন্দ্রবিন্দুতে বাস করে।

সেই দেশ, সেই মাটি, সেই মানুষকে প্রণাম।

জয় গ্রামীন ভারত!

Friday, January 26, 2018

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা, জোড়া পাতা - পশ্চিমি বিজ্ঞান কারে কয় - ক্লদ আলভারেজ

ক্লদ আলভারেজের লেখার খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল জোড়াপাতাটি যেখানে তিনি অতিরিক্ত পাঠের নিদান দিচ্ছেন। জানি অনেকের ভাল লাগবে না, কিন্তু দেওয়া রইল। যদি কারোর কাজে লাগে।
আমার মন কেড়ে নিয়েছে শেষ স্তবকটি, এটা আমার মনেরও কথা। এখানে তিনি লিখছেন, But no work of academia can be as compelling as human experience. Enmeshed in day-to-day village cosmology, it was not too long before the scales fell quickly from my eyes. If one attempts to live close to the peasants or within the bosom of nature, modern science is perceived differently: as vicious, arrogant, politically powerful, wasteful, violent, unmindful of other ways. Life in Thane, a village north-east of the state of Goa, on India’s West Coast, and for the past six years in Parra, a more accessible coastal village, provided me with enough education to see through the emperor’s new clothes.
FURTHER READING
Mahatma Gandhi’s vigorous attack on the claim of modern science to truth in M.K. Gandhi, ‘Hind Swaraj’, in Collected Works of Mahatma Gandhi, Delhi: Government of India, vol. 􀀓, pp. 􀀗􀀐–􀀑􀀏􀀗, has been most important to me. A few decades later, a kindred spirit, Lewis Mumford, examined similar trends and pointed to the violence inherent to science in L. Mumford, ‘Reflections’, in My Works and Days, New York: Harcourt Brace Jovanovich, 􀀐􀀘􀀖􀀘, and, of course, in his The Myth of the Machine, New York: Harcourt Brace Jovanovich, 􀀐􀀘􀀕􀀓. Among the more recent inquiries into the epistemological limitations of science, see for instance P. Feyerabend, Against Method: Outline of an Anarchistic Theory of Knowledge, London: Verso, 􀀐􀀘􀀖􀀔, or K. Hübner, Critique of Scientific Reason, Chicago: University of Chicago Press, 􀀐􀀘􀀗􀀔. It is also worthwhile consulting L. Fleck, Genesis and Development of a Scientific Fact, Chicago: University of Chicago Press, 􀀐􀀘􀀖􀀘, an early essay (written in 􀀐􀀘􀀒􀀕) on science as a social construction.
The vicious link between science and development has been explored in A. Nandy (ed.), Science, Hegemony and Violence: A Requiem for Modernity, New Delhi: Oxford University Press, 􀀐􀀘􀀗􀀗, and by myself in C. Alvares, Science, Development and Violence, New Delhi: Oxford University Press, 􀀐􀀘􀀘􀀑. I found very insightful C.V. Seshadri’s seminal work Development and Thermodynamics, Madras: Murugappar Chettiar Research Centre, 􀀐􀀘􀀗􀀕, and also J.P.S. Uberoi, Science and Culture, New Delhi: Oxford University Press, 􀀐􀀘􀀖􀀗. For two case studies in India, see D. Sharma, India’s Nuclear Estate, New Delhi: Lancers, 􀀐􀀘􀀗􀀒, and V. Shiva, The Violence of the Green Revolution: Ecological Degradation and Political Conflict in Punjab, Penang and London: Third World Network and Zed Books, 􀀐􀀘􀀘􀀐.
Stunning critiques of science have emerged from gifted practitioners of life husbandry. In the field of agriculture there is M. Fukuoka, The One Straw Revolution, Hoshangabad: Friends Rural Centre, 􀀐􀀘􀀗􀀔, and in the field of health M. Kothari and L. Mehta, Cancer:Myths and Realities, London: Marion Boyars, 􀀐􀀘􀀖􀀘, and Death, London: Marion Boyars, 􀀐􀀘􀀗􀀕. I. Richards, Indigenous Agricultural Revolution: Ecology and Food Production in West Africa, London: Hutchinson, 􀀐􀀘􀀗􀀔, testifies to the appropriateness of indigenous knowledge of cultivation, while F. Apffel-Marglin, ‘Smallpox in Two Systems of Knowledge’, in F. Apffel-Marglin and S. Marglin, Dominating Knowledge, Oxford: Clarendon Press, 􀀐􀀘􀀘􀀏, pp. 􀀐􀀏􀀑–􀀓􀀓, shows the inner cultural logic of a non-scientific way of seeing smallpox. Furthermore, there is obviously a long history of non-Western science. Thanks to the monumental work of J. Needham et al., Science and Civilization in China, vols 􀀐–􀀖, Cambridge:
Cambridge University Press, 􀀐􀀘􀀔􀀓, rich material on China is available; while Dharampal, Indian Science and Technology in the 􀀐􀀗th Century, New Delhi: Impex, 􀀐􀀘􀀖􀀐, highlights the
Indian patrimony of knowledge before colonization. S. Goonatilake, Aborted Discovery: Science and Creativity in the Third World, London: Zed Books, 􀀐􀀘􀀗􀀒, discusses the attempts and difficulties in redefining science from a non-Western perspective.

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা১১ - পশ্চিমি বিজ্ঞান কারে কয় - ক্লদ আলভারেজ

পশ্চিমি বিজ্ঞানের জ্ঞানচর্চার হিংসাত্মক ক্ষেত্র বিস্তৃতি নির্দিষ্টভাবে অন্যান্য জ্ঞানচর্চার অধিকারের ওপর দীর্ঘকালীন নগ্ন হস্তক্ষেপ। রাষ্ট্রীয় নীতি যেহেতু একটি জ্ঞানচর্চার পৃষ্ঠপোষণা করে, সেহেতু অন্য জ্ঞানচর্চাকে সে ক্ষতিকরে এবং অগ্রাহ্যও করে। শুধু একটা উদাহরণ নিতে পারি চিকিতসাবিদ্যা। যেভাবে ভারতীয় পদ্ধতিতে চিকিতসাকে প্রায় উপেক্ষা করে সাগরপারের এলোপ্যাথি চিকিৎসা ব্যবস্থার পৃষ্ঠপোষণা করা হচ্ছে সরকারি উদ্যমে, সে তথ্য নিশ্চই নথি করণ করে বোঝাতে হবে না।
সব সাম্রাজ্যই অসহমান এবং হিংসার মদতদাতা। নিজের জ্ঞানচর্চা বিষয়ে পশ্চিমি বিজ্ঞানের ঔদ্ধত্যের দরুণ নানান বিকল্পকে সক্রিয়ভাবে ধ্বংস করে সেগুলির ওপর নিজের নকল পদ্ধতিতে শেখা বিদ্যাটি চাপিয়ে দিয়েছে। ফলে এই পদ্ধতিটি সীমাহীন এবং স্থানীয় হিংসা অত্যাচার সৃষ্টি করেছে এই অভিচারের ফলশ্রুতিতে আধুনিক বিজ্ঞান প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর অপটুভাবে এবং অযথাযথভাবে দখল নিয়েছে। যেভাবে ইওরোপ উত্তর এবং দক্ষিণ আমেরিকা এবং বিশ্বের নানান দেশের কোটি কোটি আদিবাসিন্দাকে নির্বিচারে হত্যা করে নিজেদের বসতি তৈরি করেছে, ঠিক সেইভাবে তাদের চিকিতসাবিদ্যা সেই দেশগুলোর চিকিতসাবিদ্যা, সেই দেশের বীজ ইওরোপিয় বীজ দিয়ে উৎখাত করেছে। তাদের জ্ঞানচর্চাকে তারা আধুনিক বিজ্ঞান নাম দিয়ে অন্য সব ধরণের দ্যাখা, কাজের এবং পরমার্থকে মুছে দিয়েছে।  
জ্ঞানই ক্ষমতা। কিন্তু ক্ষমতাও জ্ঞান। ক্ষমতা নির্ধারিত করে কোনটা জ্ঞান আর কোনটা নয়। ফলে আধুনিক বিজ্ঞান তার অপ্রতিযোগী অথচ ভিন্ন ধরণের মানুষে মানুষে যোগাযোগ, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষ প্রকৃতি এবং মানুষের সঙ্গে ব্রহ্মাণ্ডের সম্পর্ক ধ্বংস করে, না পারলে তাকে ন্যুন করার উদ্যম নেয়। আধুনিক বিজ্ঞান, নিজেকে বাদ দিয়ে সব ধরণের জ্ঞানচর্চার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে যাতে নিজের সূত্র আর তৈরি করা ধারণার একচ্ছত্র কর্তৃত্ব বজায় থাকে। এই তৈরি করা ধারণাই পশ্চিমি সংস্কৃতির আগ্রাসী রূপের সঙ্গে যুক্ত।
সাধারণভাবে একটা ভ্রম তৈরি করা হয়েছে এই বলে যে আধুনিক বিজ্ঞান, সত্য জ্ঞানের বিপুল সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছে। বাস্তবে এটি জ্ঞানকে মানুষের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে। সে নিজের ক্ষেত্র বিপুলভাবে বাড়িয়েছে, অন্যান্যদের ধ্বংস বা চেপে দিয়েছে। মানুষের অভিজ্ঞতার ফসলের সঞ্চয়ের যে সম্ভাবনার সুযোগ ছিল, সেই দ্বারটাকে সে সঙ্কুচিত করে রেখেছে। মনে হতে পারে সে বিপুল তথ্যের স্ফূরণ ঘটিয়েছে। কিন্তু তথ্য, তথ্যই, জ্ঞান নয়। শুধু বলা যায়, জ্ঞানের অবনমন এবং বিকৃতি ঘটেছে। বোঝা দরকার বিজ্ঞানকে কিন্তু ব্যবহার করা হচ্ছে না জ্ঞান বৃদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে, বরং শুধুমাত্র জ্ঞানের উপনিবেশ এবং নিয়ন্ত্রণ কায়েম করার এবং একই সঙ্গে একটি সোজা সঙ্গীন পথে একটি নির্দিষ্ট প্রকল্প রূপায়নের উদ্দেশ্য মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণের জন্যে পশ্চিমি বিজ্ঞান কাজ করে চলেছে।
তাহলে কি পরাজয় সম্পূর্ণ হয়েছে? না। আধুনিক বিজ্ঞানের কাছে বিশ্বের প্রত্যেকটি অংশ মাথা নোয়ায় নি। কৃষি ও খাদ্য ব্যবসা, পারমাণবিক চুল্লি, বিপুল বিশাল বাঁধ – যেগুলি আদতে আধুনিক বিজ্ঞানের বাহ্যিক চিহ্ন, সারা বিশ্বজুড়ে প্রতিরোধের মুখোমুখি পড়ছে। বহু মানুষ যারা আধুনিক বিজ্ঞানের ফাঁকা ফলটি ভক্ষণ করে আপাতত মোহমুক্ত, তারা শুধু নয়, বিপুল সংখ্যক মানুষ সেই ফলটি খেতে অস্বীকার করছে। কোটি কোটি চাষী কৃষি ব্যবসায়ীদের হাত থেকে প্রতিদিন মুক্তির পথ তৈরি করে নিচ্ছেন, কোটি কোটি মানুষ আধুনিক এলোপ্যাথি চিকিৎসার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। লক্ষ লক্ষ মানুষ আধুনিক বিজ্ঞানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বিকৃত নৈতিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে উদগ্রীব।
স্বাধীনতার পর থেকে দীর্ঘকালব্যাপী পশ্চিমি বিজ্ঞানের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষণা সত্ত্বেও ভারতের হৃতগৌরব ফিরে আসে নি। ১৯৭৬ সালে ইন্দিরা গান্ধী ভারতীয় নাগরিক কর্তব্য হিসেবে বৈজ্ঞানিক মানিসিকতাকে যুক্ত করেছিলেন সংবিধান সংশোধন করে। এতদ সত্ত্বেও বৈজ্ঞানিকদের সমাজে ব্যর্থতার সঙ্কট কাটে নি এবং প্রত্যেক দশকে তারা ভারতের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছেন।
এই বৈজ্ঞানিক ব্যর্থতার ফলে ভারতকে খুব সহজে আধুনিক পশ্চিমি বিজ্ঞানের সুতোয় নাচানো যাচ্ছে না। অপশ্চিমি সমাজের মানুষেরা সাধারণভাবে পশ্চিমি জ্ঞানের ভাণ্ডারে ঝাঁপ দিয়ে পড়ছেন না। বহু ক্ষেত্রে আগ্রাসীভাবে তারা অসহযোগ দেখিয়ে চলেছে। জনগণ, গোষ্ঠী, গ্রাম সমাজ উন্নয়নের আধুনিকতাকে বর্জন করে নিজেদের পরম্পরার জীবনধারণে, প্রকৃতির সঙ্গে আত্মীয়তা এবং পরম্পরার শিল্পচর্চায় খুশি থাকছেন। উন্নয়নের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ আদতে আরেক স্তরের আধুনিক পশ্চিমি বিজ্ঞান আর তার হিংসার বিরুদ্ধে বিরুদ্ধতা। এটি মহাত্মা গান্ধীর কথা। যারা প্রকৃতি ও মানুষের স্বাভাবিক অধিকার নিয়ে চিন্তিত এটা তাদেরও কথা।
(শেষ)
উলফগাং শ্যাকস সম্পাদিত দ্য ডেভেলাপমেন্ট ডিক্সনারি, আ গাইড টু নলেজ এজ পাওয়ার থেকে

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা১১ - পশ্চিমি বিজ্ঞান কারে কয় - ক্লদ আলভারেজ

আধুনিক বিজ্ঞানের অবিনিময়যোগ্যতা, বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের সব থেকে বড়াই করা বস্তুনিষ্ঠতার দাবি, তথ্যের নিরপেক্ষতা, বিভিন্ন ধর্মের, নীতির এবং দেশের শিক্ষিত এবং যুক্তিপূর্ণ মানুষের কাছে খুবই গ্রহণযোগ্য বিষয়। যুক্তিপূর্ণতা, বৈজ্ঞানিক মানসিকতা এবং আধুনিক শিক্ষা মানুষের জীবনে প্রশ্নাতীত এবং গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
বিজ্ঞান ভুলে যায় সে জ্ঞানার্জন করেছে তর্ক করতে করতে, বিরোধের মধ্যে দিয়ে, সূত্রগুলির মধ্যে বিতর্ক ধরে, অথচ সে বৈজ্ঞানিক সমাজের বাইরের মানুষের বিজ্ঞান বিষয়ক যুক্তি, তত্বের অথব তার কর্মপদ্ধতির খামতি ধরানোর বিষয়ে খুব স্পর্শকাতর। বৈজ্ঞানিক স্বতঃসিদ্ধতা, পদ্ধতি এবং জ্ঞানের non-negotiabilityটাকে নিয়ে, কয়েকশ বছর ধরে অজ্ঞানী প্রচারকদের প্রচার একটি ক্ষমতার মিথ তৈরি করে দিয়েছে, যার মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি কিভাবে সে বেড়ে উঠে তার অনতিক্রম্য স্থানটি তৈরি করেছে।
ওপরে আমরা দেখলাম, বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে আবেগ, বর্ণ, সম্প্রদায়, ভাষা, ধর্ম, এবং বহুজাতিকতা প্রাথমিক এবং পছন্দের হাতিয়ার হয়ে উঠে সবার স্বার্থে শুধু নয় সবার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হল। এ বিষয়ে সারা বিশ্বের প্রায় প্রত্যেকটি দেশের উদারপন্থী, সাম্যবাদী, প্রক্রিয়াশীল, গান্ধীবাদী, রক্ষণশীল এমন কি বিপ্লবী বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে বিজ্ঞানের একনায়কতন্ত্রের ওপর অগাধ নির্ভর্শীলতা লক্ষ্য করেছি।
আধুনিক বিজ্ঞানের আর অন্যান্য জ্ঞানচর্চার মধ্যে বৈরিতাপূর্ণ ক্ষমতার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। এই বিষয়কে নির্ভর করে উন্নয়ন ভাবনা একটি গতিশীল(সক্রিয়ভাবে ঔপনিবেশিক) ক্ষমতা তৈরি করে, এবং বিপুল সংখ্যক মানুষের বেঁচে থাকার দৈনন্দিনতার রসদের ওপর হুমকি হিসেবে কাজ করে। পশ্চিমি বিজ্ঞানের ধারণা পরম্পরার মানুষের জ্ঞান তার প্রতিযোগী, তাই এটি তার বিরুদ্ধপক্ষ। সে যেহেতু পরম্পরার বিজ্ঞানকে নিচু চোখে দেখে, প্রাকৃতিক ধনসম্বলের ওপর জনগনের অধিকারের বিষয়েও তার শ্রদ্ধা নেই।
সবার ওপরে, উন্নয়ন বিষয়ে আধুনিক জাতি রাষ্ট্রের এই অত্যধিক স্বার্থনির্ভরতার জন্য উন্নয়ন নিজে ব্যক্তির অধিকার, রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং সৃষ্টিশীলতার বিরুদ্ধে সংঘাতে যায়, ধ্বংস করে, এবং প্রায়ই সেগুলির গুরুত্ব গুরুতরভাবে হ্রাস করে। যে কোন একটি গণতন্ত্রে জনগনই প্রশাসক। কিন্তু জনগণ সেই কাজটি করে উঠতে পারে না, কেননা তাদের সরকার প্রায়শই সক্রিয় থাকে যাতে পশ্চিমি বিজ্ঞানের দর্শনানুসারে মানুষের মধ্যে পরিবর্তন আনা যায়।
একবার মানুষের জ্ঞানচর্চার অধিকারের মূল্য অবমূল্যায়িত হলে, রাষ্ট্র মোটামুটি সরকারিভাবে 
পশ্চিমি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির নির্দিষ্ট কিছু ধারণা এবং চাহিদা অনুসারে এই অধিকারগুলি উচ্ছেদ করার 
কাজে অগ্রসর হয়।
বিজ্ঞানের প্রচার হল, সে একমাত্র প্রকৃতির বৈধ বিররণ দিতে পারে, এবং সে হাতে একটি লাঠি নিয়ে পরম্পরার বিজ্ঞানের(trans-scientific, or folk-scientific) প্রকৃতি বর্ণনাকে পিটিয়ে পিটিয়ে বিকৃত করতে শুরু করে। ভারতের বিভিন্ন ‘people’s science movement’ সরকারি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সঙ্গঠনগুলির হয়ে এই দায়িত্বটা তারা নিজেদের কাঁধে স্বেছায় তুলে নিয়েছে এবং তারা গ্রামের তান্ত্রিক বা জাদুকরদের বর্বরতাকে আধুনিক বিজ্ঞানের বৈদ্যুতিক চিকিৎসা বা frontal lobotomies(মানসিক রোগের একটি ভুলে যাওয়া একদা ‘বৈজ্ঞানিক’ মার্কা চিকিৎসা - অনুবাদক) দ্বারা প্রতিস্থাপিত করতে সর্বদা উৎসুক।
 
(ক্রমশঃ)
উলফগাং শ্যাকস সম্পাদিত দ্য ডেভেলাপমেন্ট ডিক্সনারি, আ গাইড টু নলেজ এজ পাওয়ার থেকে

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা১০ - পশ্চিমি বিজ্ঞান কারে কয় - ক্লদ আলভারেজ

যে তর্কাতীত জ্ঞানের কথা বিজ্ঞান বলল সেটি কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষেত্রের বাইরে রেখে দেওয়া হল – এটিকে দরদামযোগ্যতার বা পছন্দের বাইরে রাখা হল। ফলে বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের বাইরে অন্য ধরণের জ্ঞানকে পছন্দ করার সুযোগ দেওয়া হল না। বলে দেওয়া হল বৈজ্ঞানিক জ্ঞান একমাত্র সত্যজাত জ্ঞান। কারোর পক্ষে বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে প্রশ্ন করার, বাতিল করার সুযোগ দেওয়া হল না, যেভাবে যে কেউ ধর্মীয় বা শৈল্পিক জ্ঞানকে বাতিল করে(এবং সে কাজে উৎসাহও দেওয়া হয়)। যদি কোন ব্যক্তি বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের মৌলিক বিশ্বদৃষ্টিকে বাতিল করার ঝুঁকি নেয়, তাকে শুধু অশিক্ষিত বলে দেওয়াই হল না, তাকে নিন্দুক(এবং নিন্দনীয়), অযৌক্তিক এবং বিপথগামীও দাগিয়ে দেওয়া হল।
এখানে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মাথায় রাখা দরকার। প্রথমটি হল ভ্রমপ্রবণ মানুষ(fallible beings) আরও ভ্রমপূর্ণ প্রমানপত্র যুক্তিকে সঙ্গী করে দাবি করছে সে অভ্রম জ্ঞান উৎপাদনের এবং বিশ্লেষণের পদ্ধতি তৈরি করেছে। দ্বিতীয়ত যুক্তিবাদকে সংকীর্ণ এবং পক্ষপাতদুষ্ট বৈজ্ঞানিক যৌক্তিকতায় নামিয়ে আনা, যার সঙ্গে মানুষের মন কিভাবে ভাবে তার বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই, যদিও এটি দিয়ে বোঝা যায় হাতে গোনা মানুষ কিভাবে ভাবনা চিন্তা করতে পারে।
যেহেতু পশ্চিমি আধুনিক বিজ্ঞানের একটাই লক্ষ্য ক্ষমতা দখল, তাই সে যাকে প্রকৃতি বলে দাবি করে, তাকে প্রশ্ন করে এমন কোন দাবি গ্রাহ্য করা তার পক্ষে বিপজ্জনক। তার দাবি যে সে সব ধরণের জ্ঞানচর্চায় মাথা ঢুকিয়ে মধ্যস্থ হিসেবে কাজ করবে এবং এমন ভাব দেখায় যাতে এই কাজটা সে নিরপেক্ষ ভাবে করছে। আধুনিক বিজ্ঞানের শংসাপত্র দেওয়ার সুযোগ যতই বাড়ল, সে ততই অগণতান্ত্রিক হয়ে উঠতে শুরু করে। এবং জ্ঞানের রাজ্যে প্রবেশাধিকার দেওয়া হতে শুরু করল বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্তকে এবং বিশেষভাবে দক্ষদের। এই জ্ঞানের বাইরের মানুষকে শুন্যমনা হিসেবে দ্যাখা হতে থাকল এবং মনে করা হতে শুরু করল এই শূন্যস্থানে বিজ্ঞানের নানান তথ্য পুরে দেওয়ার উপযোগী সে। তার জ্ঞান এবং জ্ঞানের অধিকার থেকে চ্যুত হল।
এখানে আরেকটি বিরোধাভাস আছে। এত দিন বলে আসা হয়েছে বৈজ্ঞানিক যুক্তি ব্যক্তি নিরপেক্ষ এবং ব্যক্তি কেন্দ্রিক স্বেছাচারিতামুক্ত। সে এমন কিছু সূত্র আবিষ্কার করছে যা মানব নিরপেক্ষ। অথচ এই শংসাপত্র দেয় ব্যক্তি, এমন ব্যক্তি যাদের স্বার্থ নিহিত রয়েছে বৈজ্ঞানিক ক্ষমতায় সাপেক্ষে এবং অধিকাংশের জীবিকা নির্ভর করছে এই ক্ষমতার চলনের ওপর। ভ্রান্তশীল মানুষ তার শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত সম্মানকে পুঁজি করে রাজনৈতিক ক্ষমতার অংশিদার হয়। ব্যালটকে সুস্পষ্টভাবে প্রতিস্থাপিত করা হল, অনুমান নির্ভর জ্ঞানচর্চার নতুন বৈজ্ঞানিক পৌরোহিত্যর দ্বারা।
এই পদ্ধতিটি অবশ্যই গণতান্ত্রিক কাজকর্মের সম্পূর্ণ বিপরীতাত্মক, যেখানে অধিকার অনন্য, বিশ্বজনীন এবং প্রাথমিকভাবে ব্যক্তিসাপেক্ষ, কেননা তারা একই প্রজাতির অংশ। এই ধরণের অধিকারগুলি হল সত্য জ্ঞানের দাবির অধিকার এবং ব্যক্তিনিরপেক্ষ জ্ঞানকে বাতিল করারও অধিকার। এটা এমন অধিকার, অন্যভাষায় জ্ঞানকে শংসাপত্র দেওয়ার ক্ষমতার অধিকারও অন্তর্ভূক্ত। কিন্তু নতুন আধুনিক বিজ্ঞানের স্বৈরশাসনে এই অধিকারগুলির ওপরে আঘাত হানা হল, তারপরে নষ্ট করে ফেলা হল, এবং মনে করা হল না সাধারণ মানুষের পক্ষে তাদের নিজেদের কাজকর্মের ফল হিসেবে বিশ্বজনীন জ্ঞান চর্চা বা জ্ঞান তৈরির করার ক্ষমতা রাখে। বৈজ্ঞানিক একতান্ত্রিকতার আশেপাশে থাকা প্রত্যেক মানুষের হাত থেকে এই রাজনৈতিক অধিকার ছিনিয়ে নেওয়া হল। যে সব ক্ষমতাসীন মনে করলেন মানবাধিকারকে খুব তাড়াতাড়ি গণতন্ত্রীকৃত করে ফেলা হয়েছে, তাদের জন্য বিজ্ঞান নিয়ে এল এক হাতিয়ার যার দ্বারা সে একসময় যে অধিকার দিতে বাধ্য হয়েছিল, তাকে ফিরিয়ে নিতে শুরু করল।
ফলে পরিকল্পনা, বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি – প্রকৌশলীরা –জ্ঞান উৎসারণ দখল, মানুষের জ্ঞান উতসারণের অধিকার হরণ, জনস্বার্থের সাধারণ মানুষের যোগ দেওয়ার অধিকার অথবা নিজেদের বেঁচে থাকার অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে দক্ষ হয়ে উঠলেন।
(ক্রমশঃ)

উলফগাং শ্যাকস সম্পাদিত দ্য ডেভেলাপমেন্ট ডিক্সনারি, আ গাইড টু নলেজ এজ পাওয়ার থেকে

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা৯ - পশ্চিমি বিজ্ঞান কারে কয় - ক্লদ আলভারেজ

একটি সর্বগ্রাসী দৃষ্টিভঙ্গী
একমাত্র গণতান্ত্রিক ভাবনাই আধুনিকতার এই দুই দলনকে প্রতিহত করতে পারে, যে গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হল মানবিক অধিকার। এবারে আমরা দেখি, আধুনিকতার সর্বগ্রাসী মনোভাব দমনকরতে এই হাতিয়ারের কিভাবে ক্ষতিসাধন করা হয়েছে।
এর আগে আমরা দেখেছি জন্মগতভাবে একই গর্ভে আধুনিক বিজ্ঞান আর উন্নয়নের উদ্ভব হয়েছে এবং উভয়েই প্রথম থেকেই মানুষ আর পরম্পরার শিল্পের ওপর খড়গহস্ত। আমরা আলোচনা করেছি কি ভাবে নতুন জাতিরাষ্ট্র আকর্ষনীয় বিজ্ঞানকে হাতিয়ার করে, তাদের অগ্রগতির সজ্ঞা অনুযায়ী মানুষকে বদল করার চেষ্টায় উন্নয়ন প্রকল্পে নিবেদিতপ্রাণ হয়ে উঠেছে।
আধুনিক বিজ্ঞান/আধুনিক রাষ্ট্রের এই দুই চরিত্রই মানুষের স্বভাবিক অধিকারের পরিপন্থী। প্রাথমিকভাবে বিজ্ঞান প্রকৃতি এবং পরম্পরার প্রযুক্তিকে অযোগ্য, নিকৃষ্ট এবং ন্যুনতার প্রান্তিক মানক(marginal value) হিসেবে দেগে দেয়। এই সুযোগে বড় পুঁজির শিল্প(পুঁজিবাদী বা রাষ্ট্রবাদী উভয়েই) বিজ্ঞানের সরবরাহকরা কর্মপদ্ধতি বাস্তবায়িত করার উদ্যম নেয়। মনে রাখতে হবে, শিল্প বিপ্লবের আগে পর্যন্ত, মানুষের ইতিহাসের জীবন রক্ষার জন্য প্রযুক্তিক জ্ঞান ছিল বিকেন্দ্রিত এবং আমূল বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে থাকা। বাস্তবিক, লক্ষ লক্ষ শিল্প এবং প্রযুক্তি বেঁচেছিল মূলত পারিপার্শ্বিক তাপ প্রয়োগ করে সংগৃহীত জ্ঞান এবং মানুষের উভাবিত ধারণা, কাঁচামাল, ইঙ্গিতময়তার যৌথতায়। বহু ক্ষেত্রে মানব প্রজাতির প্রাযুক্তিক বিপুল বৈচিত্র, প্রকৃতির জিনগত বৈচিত্রের সঙ্গে তুলনীয়।
দ্বিতীয় উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি, মানবীয় স্বাভাবিক অবস্থা(human normality)কে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করা হল। যতক্ষণনা মানুষ আধুনিকতার কাছে মাথা নোয়াচ্ছে, ততক্ষণ তার মানবিক বোধ নিয়ে কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার অধিকারটাও কেড়ে নেওয়া হল। তাদের অবমানুষ(deficient) হিসেবে ধরে নিয়ে নতুন করে ছাঁচে ঢালা শুরু হল। এর আগে ভারত সরকারীর ঘোষিত বৈজ্ঞানিক নীতিমালাটির উল্লেখ করেছি, সেখানে বলা হল, ভারতের বিপুল মানবসম্পদ দক্ষ এবং শিক্ষিত করলে আধুনিক বিশ্বে তারা সম্পদ হয়ে উঠতে পারে(‘India’s enormous resources of manpower can only become an asset in the modern world when trained or educated’)। এই হয়ে ওঠার পদ্ধতিতে পড়ে তারা যদি কোন এটা বলশালী কৃষ্টির ম্লান ভাঁড়(pale caricatures) হয়ে ওঠে, তাতেও তাদের বিন্দুমাত্র ক্ষতিবৃদ্ধি হয় না। বিজ্ঞান এবং তার বিশেষজ্ঞরা ঠিক করলেন কিভাবে মানুষকে ‘মানুষ’, শিক্ষিত, সংস্কৃত করে তোলা যাবে, এবং তারাই ঠিক করে দেবে এই নব্য মানুষেরা কি কি আত্মীকরণ করবে।
প্রাথমিকভাবে আধুনিক বিজ্ঞানের পক্ষে এই উদেশ্য পূরণ করা খুব কঠিন কাজ হবে না ধরে নেওয়া হল। কেননা তার দাবি ছিল সে অতি দক্ষ এবং তার ব্যাখ্যা শক্তিও বিপুল। সে বলেই দিল অতীতে মানুষ তার তত্ত্ব তথ্য বিশ্লেষণ করেছে, সে সবের তুলনায় তার ক্ষমতা এবং কার্যকারিতা অনেক গুণ বেশি, কারণ সে পক্ষপাত বিহীন এবং বিষয়মুখী। এই বিষয়মুখিতার সঙ্গে সহজেই জুড়ে দেওয়া গেল সাম্য আর গণতন্ত্রকে কেননা অপক্ষপাত সক্কলের জন্য উপকারী। (উদাহরণস্বরূপ যে কোন রাজকীয় প্রশাসনকে কুখ্যাতবলে দেওয়া যায়)। তার ফলে আধুনিক বিজ্ঞান আধুনিক গণতন্ত্রের জন্য সর্বরোগহর।
ইঙ্গিতেই বুঝিয়ে দেওয়া হল, যা ‘অ-বৈজ্ঞানিক’ তা মূল্যহীন, বিষয়ী এবং নির্বিচারে তা প্রান্তিক মান বিশিষ্ট, এবং জননীতি তৈরি করতে এগুলিকে ভিত্তি ধরা চলে না।
সপ্তদশ শতকের বৈজ্ঞানিক বিপ্লব চিন্তার জগতে চিন্তার বিপ্লব। এই বিপ্লব আমাদের মাথায় ঢুকয়ে ছাড়ল, মানব সভ্যতার ইতিহাসে এই প্রথম মানুষ জ্ঞানকে শাস্ত্রের বাইরে বের করে এনে, আলাদাভাবে জ্ঞান হিসেবে দেখার, বোঝার যোগ্যতা অর্জন করল। এবং এই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে জ্ঞানার্জনের পদ্ধতিটা এতই বিশ্বাসযোগ্য যে, যে জ্ঞান আর্জিত হল নতুন করে, তা বাস্তবিকভাবে অবিনিময়যোগ্য (non-negotiable) বলে দেওয়া হল। আদতে এই দাবি সর্বপ্রথম মানুষের স্বাভাবিক অধিকারের ওপর আঘাত হানল।
(ক্রমশঃ)

উলফগাং শ্যাকস সম্পাদিত দ্য ডেভেলাপমেন্ট ডিক্সনারি, আ গাইড টু নলেজ এজ পাওয়ার থেকে

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা৮ - পশ্চিমি বিজ্ঞান কারে কয় - ক্লদ আলভারেজ

উন্নয়নও বিশ্বজুড়ে তার অগ্রগতি বজায় রাখতে পারে নি। সে যতটুকু অগ্রসর হতে পেরেছে তার কারন হল, নব্য স্বাধীন হওয়া জাতিরাষ্ট্রগুলির ক্ষমতার সঙ্গে মিলমিশ করে, রাষ্ট্রের হাত ধরে এবং অতীতের নিয়ন্ত্রণ চরিত্র এবং পরিচালন চরিত্রের জন্যই। প্রত্যেকটি জাতি রাষ্ট্র পুলিশ এবং ম্যাজিস্ট্রেট ব্যবস্থা মার্ফৎ নাগরিকের ওপর উন্নয়নের হাতিয়ারগুলো চাপিয়ে দেয়। যেন তার নাগরিক এতই অজ্ঞ যে তারা উন্নয়নের সুফলগুলো নিজেরা কুড়িয়ে নিতে পারবে না। নতুন জাতিরাষ্ট্রগুলি তাদের নাগরিকদের ‘মুক্ত থাকার জন্য বাধ্য করে’।
উন্নয়ণ হয়ে ওঠে সঙ্ঘর্ষএর অন্য নাম – উছেদ হয়ে যাওয়া গ্রামীনদের পুনর্বাসন, বাধ্যতামূলক সমবায়, ‘মানুষের নিজের সুবিধার জন্য’ মানুষকে নতুন ধরণের সংগঠনে বেঁধে ফেলা ইত্যদি। সুদানের দক্ষিণ অঞ্চলের প্রেসিডেন্ট আবেল আলিয়ার বিতর্কিত জংলেই খাল বিষয়ে একটি আলোচনা সভায় বলেছিলেন, ‘আমরা মানুষকে লাঠির বাড়ি মেরে স্বর্গে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করছি, আমরা সেই কাজটাই করে যাব, এবং তার পরে পরে ভালত্বের মাঠাগুলো তাদের পিছু ধাওয়া করবে’। আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা মানুষের উন্নয়নে সামিল হতে তো দেয়ই না, তাদের এই অধিকার স্বীকার করা তো দূরস্থান।
আমাদের মনে রাখতে হবে উন্নয়নের প্রতি রাষ্ট্রের অঙ্গীকার আদতে উঠে আসে আধুনিক বিজ্ঞানের প্রতি তার নিবেদনের প্রক্রিয়া থেকেই। বিজ্ঞান তার পূরক বিকল্প, কেননা বিজ্ঞান উন্নয়নের বাস্তবতা পুনর্নিমান করতে সাহায্য করে। সে নতুন ধারণা এবং আইন তৈরি এবং পুনর্নিমান করেই কিন্তু বাস্তবতা পুনর্নিমান করে। প্রকৃতি কিভাবে কাজ করে, বা আরও গুরুত্বপূর্ণ, কিভাবে করা উচিৎ, সে দিকে আঙ্গুল নির্দেশ করে সে নতুন তত্ত্ব তৈরি করে।
ফলে যখন অপশ্চিমি সভ্যতার কোন রাষ্ট্র উন্নয়নের জোব্বা গায়ে চাপিয়ে নিয়ে, নতুন নতুন উন্নয়নের মন্দির মসজিদ তৈরি করে নব্য সমাজ আর অর্থনীতি গড়তে বদ্ধ পরিকর হয়ে ওঠে, তখন পশ্চিমি বিজ্ঞান তার অকৃত্রিম, স্বাভাবিক, আকর্ষণীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ারে পরিণত হয়। ঠিক এই কারণেই নেহেরুই উচ্ছেদ, ধ্বংস এবং অত্যাচারী বিপুল বিশাল উন্নয়ন যজ্ঞকে বলেছিলেন এ যুগের মন্দির।
রাষ্ট্রের উদ্যোগে বিজ্ঞানগর্ভ উন্নয়নবাদের যজ্ঞের বলি হয় সাধারণ মানুষ আর প্রকৃতি। আজ সরকারি বাস্তুতন্ত্রের অন্যতম কাজ হল প্রকৃতিকে নতুন করে তৈরি করা। এর একটা উদাহরণ হল বৈজ্ঞানিকদের জঙ্গল উন্নোয়নের প্রকল্প। জঙ্গল আর প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হয় না। কিন্তু সেটায় তাদের মাথা ব্যথা নেই। তারা একটা নব্য উপায় উদ্ভাবন করেছেন যার নাম দেওয়া হয়েছে আবাদী(plantations) এবং তারা মনোকালচারকে বৈজ্ঞানিকভাবে জঙ্গল তৈরির ছাপ্পা দিছেন। প্রকৃতিকে নিকৃষ্ট বিকল্প দিয়ে প্রতিস্থাপিত করা হচ্ছে। বাস্তবে আধুনিক বিজ্ঞান যাকে জঙ্গল তৈরি করা বলছে, সেটা আদতে জঙ্গল ধ্বংসই।
রাষ্ট্র আধুনিক বিজ্ঞানের দেওয়া নির্দেশিকা, যেটা আদতে পশ্চিমের একটা কৃষ্টিগত উৎপাদন, নির্ভর করে প্রকৃতি আর মানুষকে উন্নত করার অধিকার দাবি করে। এই বিপুল বিশাল উন্নয়নের ধ্বংসযজ্ঞে মানুষের ভূমিকা মরা সৈনিকের বেশি কিছু নয়। এর বিনিময়ে তাদের একটি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ প্রাযুক্তিক বিষ্ময়ের খাতক হয়ে উন্নয়ন আর বিজ্ঞানের প্রচারের ধ্বজাধারী হয়। উন্নয়নের পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে, রাষ্ট্রের পদতলে এই আত্মনিবেদনে সে তার স্বাভাবিক অধিকার জলাঞ্জলি দেয়। যারা এই উন্নয়ন যজ্ঞে সামিল হতে পারে না, বা হয় না, তারা তাদের অধিকার থেকে বিচ্যুত হয়। তারা তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা সম্পদ এলাকা থেকে উচ্ছেদ হয় এবং সেই সম্পদ বড় পুঁজির হাতে অর্পিত হয়।
(ক্রমশঃ)

উলফগাং শ্যাকস সম্পাদিত দ্য ডেভেলাপমেন্ট ডিক্সনারি, আ গাইড টু নলেজ এজ পাওয়ার থেকে

নেহরুর উচ্ছেদময় বিজ্ঞান নির্ভরতা

"ফলে যখন অপশ্চিমি সভ্যতার কোন রাষ্ট্র উন্নয়নের জোব্বা গায়ে চাপিয়ে নিয়ে, নতুন নতুন উন্নয়নের মন্দির মসজিদ তৈরি করে নব্য সমাজ আর অর্থনীতি গড়তে বদ্ধ পরিকর হয়ে ওঠে, তখন পশ্চিমি বিজ্ঞান তার অকৃত্রিম, স্বাভাবিক, আকর্ষণীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ারে পরিণত হয়। ঠিক এই কারণেই নেহেরু উচ্ছেদ, ধ্বংস এবং অত্যাচারী বিপুল বিশাল উন্নয়ন যজ্ঞকে বলেছিলেন এ যুগের মন্দির।" - ক্লদ আলভারেজ
ঠিক যে জন্য ষাটের দশকে কোন মোড়কের কোন বামপন্থী দক্ষিণপন্থী দলই ফোর্ড ফাউন্ডেশনের মত সাম্রাজ্যবাদী নিদানযুক্ত নেহেরুসুলভ উন্নয়নের পথের বিরোধিতা করে নি। তাদের প্রত্যক্ষ্য অপ্রত্যক্ষ মদতে অবাধে আদিবাসীদের জমি দখল উচ্ছেদ, দেশিয় প্রথায় চাষ উচ্ছেদ করে, বড় পুঁজির ব্যাঙ্ক ব্যবস্থা গ্রামে ঢুকিয়ে মধ্যবিত্তের চাকরি দালালি নিশ্চিত করা গিয়েছে।
স্বাভাবিকভাবেই সব ধরণের বিপ্লবী নেতা বা তাঁদের পুত্র-প্রপৌত্রের রাষ্ট্র-করপোরেটে চাকরি দালালি নিশ্চিত হয়েছে।

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা৭ - পশ্চিমি বিজ্ঞান কারে কয় - ক্লদ আলভারেজ

বিজ্ঞান সম্বন্ধীয় নেহরুর এই সরল, নিষ্পাপী এবং দেবশিশুসুলভ মনোভাব চারিয়ে গিয়েছিল দেশের আমলাদের মধ্যেও। ১৯৫৮ সালের মার্চে ভারত রাষ্ট্র সে বৈজ্ঞানিক নীতি প্রনয়ণ করল তাতে বলা হল, The dominating feature of the contemporary world is the intense cultivation of science on a large scale, and its application to meet a country’s requirements. It is this which, for the first time in man’s history, has given to the common man in countries advanced in science, a standard of living and social and cultural amenities, which were once confined to a very small privileged minority of the population. Science has led to the growth and diffusion of culture to an extent never possible before. It has not only radically altered man’s material environment, but, what is of still deeper significance, it has provided new tools of thought and has extended man’s mental horizon. It has thus even influenced the basic values of life, and given to civilization a new vitality and a new dynamism.
Science and technology can make up for deficiencies in raw materials by providing substitutes or, indeed, by providing skills which can be exported in return for raw materials. In industrializing a country, a heavy price has to be paid in importing science and technology in the form of plant and machinery, highly paid personnel and technical consultants. An early and large development of science and technology in the country could therefore greatly reduce the drain in capital during the early and critical state of industrialization.
Science has developed at an ever-increasing pace since the beginning of the century so that the gap between the advanced and backward countries has widened more and more. It is only by adopting the most vigorous measures and by putting forward our utmost effort into the development of science that we can bridge the gap. It is an inherent obligation of a good country like India, with its tradition for scholarship and original thinking and its great cultural heritage, to participate fully in the march of science, which is probably mankind’s greatest enterprise today।
একইভাবে ভারতের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার রূপায়কেরা লিখলেন, In the planned economy of a country, science must necessarily play a specially important role … Planning is science in action, and the scientific method means planning।
এই নিজেই নিজের পিঠচাপদে দেওয়ার মনোভাব, স্বনির্বাচিত সত্য ঘোষণা করার স্বনিযুক্তি উদ্যম এবং নিজেই নিজেকে শংসাপত্র দেওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয়ড় সাংগঠনিক এই প্রক্রিয়া তৃতীয় বিশ্বের অধিকাংশ মানুষের, বিশেষ করে আদিবাসী, চাষী এবং অন্যান্য কারিগরদের কাছে স্বউদ্ভাসিত নয়, এরা এই Western paradigmএ বিশ্বাসও করেন না। বাস্তবিকভাবে যদি আধুনিক বিজ্ঞানের সুফলগুলি তাদের কাছে না পৌঁছয় তাহলে উন্নয়ন কখোনোই তাদের কাছে উন্নত নিত্যকর্মের সমার্থক হবে না। বিপরিতার্থকভাবে সাধারণ মানুষের কাছে উন্নয়ণ আদতে একটি মৃত্যু-ক্রীড়া(con-game)র বেশি কিছু নয়। আধুনিক বিজ্ঞান আরও আরও বেশি ত্যাগ, আরও বেশি কাজ, আরও বেশি বিরক্তিকর কাজের বিনিময়ে মানুষকে অনিরাপদ জীবিকার দিকে ঠেলে দেয়। সে পরনির্ভর অনিরাপদ লুঠ হয়ে যাওয়া শ্রমের মূল্যের বিনিময়ে জীবন্ত মানুষের দাস বৃত্তি দাবি করে(এবং তার সম্পর্কিত স্বশাসনেও)।
(ক্রমশঃ)

উলফগাং শ্যাকস সম্পাদিত দ্য ডেভেলাপমেন্ট ডিক্সনারি, আ গাইড টু নলেজ এজ পাওয়ার থেকে