Showing posts with label উন্নয়ন. Show all posts
Showing posts with label উন্নয়ন. Show all posts

Thursday, March 1, 2018

C.V. Seshadri - Development and Thermodynamics

C.V. Seshadri, Development and Thermodynamics বইতে বলছেন কিভাবে মেট্রোপলিটন নতুন করে শক্তির সংজ্ঞা নির্ধারণ করে জৈবিক শক্তিকে বেড়ার ধারে ঠেলেফেলে দিল, যাতে লুঠেরা ভর্তুকিভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা চালাতে তার কোন প্রতিযোগী না থাকে।
বইটা নেটে পাওয়া যায় খুঁজে পেতে পড়ে নিতে পারেন।

Saturday, January 27, 2018

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা - চাহিদা১ - ইভান ইলিচ

যেখানেই যান মনে হয় চিনি চিনি। বিশ্বজুড়ে কুলিং টাওয়ার, পার্কিং লট, কৃষি ব্যবসা আর মেগাসিটির রমরমা। এতদ সত্ত্বেও যেন মনে হচ্ছে উন্নয়নের ধারা শেষ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে – যেন মনে হচ্ছে এই বিপুল বিশাল অট্টালিকার ঝাঁক বিশ্বের জন্য বেমানান মনে হচ্ছে। বিশ্বজোড়া এই ধরণের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো একে একে খণ্ডহর, অব্যবহার্যে পরিণত হচ্ছে। আতঙ্কের হল আগামী দিনে এই আবর্জনার মধ্যেই আমাদের বেঁচে থাকা অভ্যেস করতে হবে। কুড়ি বছর আগে (এই বইটি সম্পাদিত হচ্ছে ২০০৯ সালে, লেখাটা তৈরি হয়েছে ১৯৯০ নাগাদ) উন্নয়নের পুজায় প্রণিপাত যে প্রত্যাঘাত (counterintuitive) করবে সেটা মোটামুটি বোঝা যাচ্ছিল। আজ টাইম ম্যাগাজিন বিশ্বজোড়া এই আবর্জনাকে খবর করে প্রচ্ছদের বিশ্বধ্বংসের ছবি ব্যবহার করে। আমরা কেউই জানি না - জলবায়ুর পরিবর্তন, জিন শূন্যতা (depletion), দূষণ, বিভিন্ন সুরক্ষা কবচের ধ্বংসপ্রাপ্তি, সমুদ্র স্তরের উল্লম্ফন এবং কোটি কোটি মানুষের গৃহহীন হওয়া – এই চারটি ধ্বংসের ঘোড়সওয়ারকে কিভাবে সামলানো যাবে। এই বিষয়গুলি আলোচনায় দুটি প্রতিক্রিয়া উঠে আসে – হয় আতঙ্ক নয় আসূয়া। এই বিশ্বপরিবর্তনের সঙ্গে বেঁচে থাকার থেকে আরও ভীতিপ্রদ হল, বিগত চার দশকের উন্নয়নের সংজ্ঞায় অসীম চাহিদাকে সঙ্গে নিয়ে বেঁচে থাকা। উন্নয়নের বর্ষা নৃত্য মন্থনের যে অসীম চাহিদার উদ্ভব ঘটল তা শুধু বিশ্বকে লুঠে দূষণের হলাহলে ঢেকে ফেলার থেকেও গভীরতর প্রভাব ফেলেছে। মানুষের চরিত্রেই মৌল পরিবর্তন(transmogrified) এনেছে। তারা Homo sapiensকে Homo miserabilisএ পরিণত করেছে। আজ মনে হয় মৌল চাহিদা যেন উন্নয়ণের কুটিল উত্তরাধিকার(insidious legacy), যাকে সে পিছনে ফেলে এসেছে।
এই পরিবর্তনটা ঘটেছে কয়েক শতাব্দ জুড়ে। এই সময়ে শেকড়ে পরিবর্তন এসেছে, একে কখোনো বলা হয়েছে প্রগতি, কখনো উন্নয়ন, কখোনো বৃদ্ধি। এই যুগব্যাপী প্রক্রিয়ায় মানুষ কৃষ্টি আর প্রকৃতিতে সম্পদ আবিষ্কার করে ফেলার দাবি করেছে – সেগুলো যেন জনগণের সম্পত্তি – তারা সেগুলির সঙ্গে অর্থনৈতিক মূল্যমান জুড়ে দিয়েছে। অভাব বা ঘাটতির ঐতিহাসিকেরা এই গল্পসূত্র জুড়তে পারেন। সর ফেটালে যেমন ঘন হয়ে মাখনে পরিণত হয়, হঠাতই যেন এক রাতের মধ্যে অভাবের নায়ক Homo economicus, থেকে অভিযোজনের মাধ্যমে পরিণত হল Homo miserabilisএ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী প্রজন্ম এই পরিবর্তন চোখের সামনে দেখল, সাধারণ মানুষ কিভাবে চাহিদাবন্ত মানুষে পরিণত হয়। বিশ্বে  জন্মানো অর্ধেক Homoই কিন্তু এই নতুন মানুষে পরিণত হল।
প্রত্নতত্ত্বিক সাক্ষ্য থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার Homo sapiens নামক পূর্ণ বয়স্ক মানুষের অতীত ৫ লক্ষ কোটি বছরের বেশি নয়। তারা প্রথম পাথর যুগের Lascaux গুহার শিকারের ছবি থেকে পিকাসোর বিশ্ব কাঁপানো গুয়ের্নিকায় সময়ে বেঁচেছে - দশ হাজার প্রজন্ম তৈরি করেছে, হাজার হাজার ভাষায় হাজার হাজার রকমের জীবনযাত্রা নির্বাহ করেছে, তারা কেউ বরফে বাস করেছে, কেউ গরু পালন করেছে, কেউ রোমান কেউবা মোঘল, কেউ নাবিক কেউ যাযাবর। নিড়ানি, টাকু, কাঠ, কাঁসা, লোহার হাতিয়ার নির্ভর প্রত্যেকটি জীবনযাত্রার একটাই শর্ত প্রত্যেকটি প্রত্যেকটির থেকে সম্পূর্ণভাবে আলাদা। কিন্তু প্রত্যেকটি নিশ্ছিদ্র শর্ত ছিল নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট স্থানে গোষ্ঠীর প্রথার প্রতি পূর্ণ আনুগত্য প্রদর্শন। প্রত্যেক কৃষ্টি এই প্রয়োজনীয়তার শাসনকে ভিন্ন ভিন্ন লব্জে গ্রথিত করেছে। প্রত্যেকটি চাহিদার দৃষ্টিভঙ্গী প্রকাশিত হত ভিন্ন ভিন্ন ভঙ্গীতে মৃতকে কবর দেওয়া থেকে শুরু করে জাদুর ভয়(exorcize fears) পাওয়া পর্যন্ত। চাহিদার নমনীয়তার বিপুল বৈচিত্র্যময় কৃষ্টির প্রাবল্য প্রত্যেক সমাজে, ব্যক্তিতে আলাদা আলাদা ছিল। নতুন কিছু করতে টনগানেরা(Tongans) হাজার হাজার মাইল সমুদ্র পেরিয়ে এসেছে। Toltecsরা মেক্সিকো থেকে উইসকন্সিনে এনে মন্দির তৈরি করেছে। মঙ্গোলিয়ার মুসলমানেরা কাবায় আসে, স্কটেরা পুণ্য ভূমিতে পদার্পণ করে। এই সব যন্ত্রণা ভয় বিষ্ময় সন্ত্রাসের সব রকম রূপ সত্ত্বেও মানব সভ্যতার অর্ধেক পরিমানে উত্তরপুরুষ বর্তমানে যে চাহিদার সংজ্ঞায় জীবনধারণ করেছে, কোনদিন মানুষ তার ধারে পাশেও পৌঁছতে পারে নি।
(ক্রমশঃ)

উলফগাং শ্যাকস সম্পাদিত দ্য ডেভেলাপমেন্ট ডিক্সনারি, আ গাইড টু নলেজ এজ পাওয়ার থেকে

Saturday, November 4, 2017

গরীব কাহারে কয়১২ - উন্নয়নের বিশ্ব রাজনীতি তত্ত্ব

এনকাউন্টারিং ডেভেলাপমেন্টঃ দ্য মেকিং এন্ড আন্মেকিং অব দ্য থার্ড ওয়ার্লডঃ আর্তুরো এসকোবারএর বই থেকে
দ্বিতীয় অধ্যায়
এই সমীক্ষা কিন্তু যোগ্য প্রতিনিধিত্বের কথা বলেছে। অবশ্যি মানবতাবাদ এবং স্বাধীনতা রক্ষার ঘোমটায় কিন্তু সমীক্ষার আসল লক্ষ এবং সেটি পৌঁছনোর জন্য রণনীতি তৈরি হল - দেশ এবং তার সম্পদের ওপর সম্পূর্ণ কব্জা করা। এবং প্রত্যাশা অনুযায়ী দলটি ধনী পশ্চিমের উন্নয়নের ধারনার প্রতিধ্বনি করল, যাকে পশ্চিমি দেশগুলি স্বাভাবিক উন্নয়ন আর প্রগতির পথ বলে বিচার করে থাকে। আমরা আরও দেখব, প্রগতিকে এই সব লব্জে চুবিয়ে নিয়ে, বিশ্বকে পশ্চিমি মুখী করে তোলার নানান রণনীতি গড়ে উঠতে শুরু করেছে। ১৯৪৯ সালে কলম্বিয়ায় বিশ্ব ব্যাঙ্কের প্রথম অভিযান এই নতুন কার্যক্রমের প্রথমতম বাস্তব প্রকাশভঙ্গী।
উন্নয়নের প্রতর্কের পূর্বক্ষণ এবং অতীত ইতিহাস
আমরা দেখব কলম্বিয়ায় ১৯৪৯ সালে যে দল গিয়ে উন্নয়নের প্রতর্ক শুরু করে সেটি আদতে একটি জটিল ঐতিহাসিক সংযোগমাত্র। উন্নয়ন নামক একটি কার্যক্রমের সূচনা ঘটল এই দলটির মাধ্যমে। তার ফলে এক দিকে ইওরোপ এবং আমেরিকার মধ্যে সম্পর্ক নতুন করে বিন্যাস ঘটল, অন্য দিকে এশিয়া আফ্রিকা এবং লাতিক আমেরিকার দেশগুলির মধ্যেও নতুন সম্পর্কের সূচনা হল। পরের দিকে ইওরো-আমেরিকিয় কৃষ্টিতে ঢেলে সাজা নতুন ধরণের শাসক শ্রেণীর আবির্ভাব ঘটল এইসব দেশগুলিতে। কিন্তু সে জ্ঞানচর্চা বা প্রতর্কের জন্ম ঘটল তার গুণমান নিয়ে আমাদের অবশ্যই আলোচনা করা দরকার; কিন্তু এর রাজকীয় আবির্ভাবের পূর্বলক্ষনগুলি আমরা বুঝতে পারছিলাম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঠিক পরে পরেই।
আফ্রিকায় উন্নয়নের জোয়ার পৌঁছনোর ধীরগতির বিষটি বুঝতে বেশ কিছু গবেষণা আমাদের সুযোগ করে (Cooper 1991; Page 1991) দিয়ে বলে যে, ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থার পতনের সঙ্গে উন্নয়নের রাজনীতির সংযোগ খুবই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বর্তমান। দুটি যুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থা তুলে নিয়ে উপনিবেশ এবং মেট্রোপলিসের মধ্যে সম্পর্ককে ঢেলে সাজাতে বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সংগঠন তৈরি করা হয়। কুপার বলছেন, ১৯৪০ সালের ব্রিটিশ ডেভেলাপমেন্ট এক্ট – উন্নয়নের ধারনার সর্বপ্রথম বাস্তবিকিকরণের পথে হাঁটা – এবং ১৯৩০এর দশকে যখন ব্রিটিশ উপনিবেশের বিরুদ্ধে জনমত মোটামুটি উচ্চকিত, সেই সময় থেকেই ভাবনাচিন্তা শুরু হয়ে গিয়েছে কি করে উপনিবেশ ছেড়ে গিয়েও ঘোমটা দিয়ে তাত্ত্বিকভাবে ঔপনিবেশিক লুঠেরা কাজকর্ম চালানো যায়। দক্ষিণ আফ্রিকার সেটলার্স স্টেটগুলির উদাহরণে পরিষ্কার, যেখানে খাদ্য এবং শ্রমের প্রশ্নে আফ্রিকিয় জনগণের একাংশকে আধুনিকিকরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। Page (1991) বলছেন, এটা ঘটল মহিলাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা সামাজিক আফ্রিকিয় সংস্কারের বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার প্রণোদনায়। ১৯৫০এর প্রথম দিকে সমাজ উন্নয়ন প্রকল্পের  সূচনায় এই ধারণা রূপায়ন হল। আফ্রিকা এবং আমেরিকার নানান দেশে উপনিবেশ বিরোধী ব্যবস্থা শুরু করতে লিগ অব নেশনস যে নির্দেশাবলী তৈরি করল তাও খুব গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরেই আন্তর্জাতিক সঙ্গঠনগুলি এই ব্যবস্থাপনাকে ব্যবহার করল সাধারণভবে দেশগুলিকে উপনিবেশবাদ থেকে মুক্তি এবং উন্নয়নের ধারনা বিকাশে (Murphy and Augelli 1S93)।
সাধারণভাবে বলতে গেলে ১৯২০ থেকে ১৯৫০ পর্যন্ত এই সময়টা যে উপনিবেশবাদী সময় থেকে উন্নয়নমূলক ঔপনিবেশিক সময়ের সূচনা, সেটা আমরা আজও বুঝতে চেষ্টা করিনি। যদিও উত্তর এবং প্রান্ত-সাহারা আফ্রিকার শ্রমিকদের দুরবস্থা বা স্বনির্ভর খাদ্য উৎপাদন এবং কৃষ্টিকে ধ্বংস করে শ্রেণী, লিঙ্গ, জাতি ইত্যাদি নির্বিশেষে চাষীদের আধুনিক করে তোলা, রোজের শ্রমিকদের অআদিবাসীকরন, লিঙ্গ লড়াই বাড়িয়ে তোলা, এবং শিক্ষা নিয়েও লড়াই, বা মেট্রোপলিটনের স্বার্থে, যুক্তিতে এবং সুরে সুর মিলিয়ে সেই অঞ্চলের কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং শহর বিকাশে নিযুক্ত বিশেষজ্ঞরা গলা চড়ানো এবং তাদের সরবরাহ করা তথ্যে উপনিবেশকে সাজানোর চেষ্টা করা বা যে লড়াই উপনিবেশের মানুষেরা মেট্রেপলিটনের বিরুদ্ধে দিচ্ছেন, সেই জ্ঞান, প্রতর্ক আর হাতিয়ারগুলিকে আত্মিকরণ করে নেওয়ার চেষ্টার কাজ আমরা নানান ভাবে দেখেছি(এর জন্য দেখুন Cooper and Stoler 1989; Stoler 1989; Packard 1989; Page 1991; Rabinow 1989; Comaroff 1985; Comaroff and Comaroff 1991; Rau 1991)।
তবে আফ্রিকার তুলনায় ল্যাটিন আমেরিকার উন্নয়নের পথ আলাদা ছিল, কিন্তু উন্নয়নপূর্ব সময় এবং আলোচনাগুলি এ প্রসঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন। উনবিংশ শতকের শুরু থেকেই লাতিন আমেরিকার দেশগুলি স্বাধীন হতে শুরু করে, এবং বহু স্তরে তারা সে সময় ইওরোপিয় অর্থনীতি আর কৃষ্টির সমপর্যায়ে দাঁড়িয়ে ছিল। বিংশ শতের শুরুতে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের উত্থান পর্যায় অনুভূত করতে থাকে এই অঞ্চল। সেই শতকে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র-লাতিন আমেরিকার সম্পর্ক দ্বিমুখী তরোয়ালের মত হয়ে দাঁড়ায়। সে সময় লাতিন আমেরিকার দেশ সমূহে যারা ক্ষমতায় ছিলেন, মনে করছিলেন পরস্পরের মধ্যে আদান-প্রদান করা সম্ভব, কিন্তু আমেরিকার ক্ষমতাধরেরা মনে করছিল যে তারা লাতিন আমেরিকার বিষয়ে নাক গলাতে প্রস্তুত। শতাব্দের প্রথম দিকের আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপবাদী নীতি এবং ১৯৩০ নাগাদ শান্ত প্রতিবেশী দেশ, এই দুই কূটনৈতিক পর্যায় দেখেছে লাতিন আমেরিকা। মনে রাখা দরকার হস্তক্ষেপবাদী নীতির তুলনায় শান্ত প্রতিবেশী কূটনীতি অনেক বেশি প্রভাবশালী।

Thursday, November 2, 2017

গরীব কাহারে কয়১১ - উন্নয়নের বিশ্ব রাজনীতি তত্ত্ব

এনকাউন্টারিং ডেভেলাপমেন্টঃ দ্য মেকিং এন্ড আন্মেকিং অব দ্য থার্ড ওয়ার্লডঃ আর্তুরো এসকোবারএর বই থেকে
দ্বিতীয় অধ্যায়
উন্নয়নের ধারণার বিকাশ
নতুন রণনীতি উদ্ভাবন

১৯৪৯ সালের জুলাই ১১ থেকে নভেম্বর ৫ তারিখ পর্যন্ত ইন্টারন্যাশনাল ব্যাঙ্ক ফর রিকন্সট্রাকশন এন্ড ডেভেলাপমেন্ট, সাধারন উন্নয়নের প্রস্তাবনা নিয়ে কলম্বিয়া যায়। কোন এক অনুন্নত দেশে ব্যাঙ্কের পক্ষে এই প্রথম কোন প্রতিনিধি দল গেল। এই দলে চৌদ্দ জন আন্তর্জাতিকস্তরের বিশেষজ্ঞ ছিলেন – আন্তর্জাতিক মুদ্রা বিনিময়, যানবাহন, শিল্প, জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎ, বড় রাস্তা এবং জলপথ, সামাজিক যুযোগসুবিধে, কৃষি, স্বাস্থ্য এবং কল্যাণ, আর্থিক এবং ব্যাঙ্কিং, অর্থনীতি, জাতীয় হিসেব রক্ষা, রেলরাস্তা এবং পেট্রোলিয়াম শোধনাগার। এই আন্তর্জাতিক দলের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে কলম্বিয়ার একটি দল।
আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি দলের কাজকর্ম এবং কাজের শর্ত আর কাজের চরিত্র ইত্যাদি নিয়ে প্রস্তাবনায় যে মন্তব্য করেছিল সেটা হল - We have interpreted our terms of reference as calling for a comprehensive arid internally consistent program. . . . The relationships among various sectors of Colombian economy are very complex, and intensive analysis of these relationships has been necessary to develop a consistent picture. . . . This, then, is the reason and justification for an overall program of development. Piecemeal and sporadic efforts are apt to make little impression on the general picture. Only through a generalized attack throughout the whole economy on education, health, housing, food and productivity can the vicious circle of poverty, ignorance, ill health and low productivity be decisively broken. But once the break is made, the process of economic development can become self-generating. (International Bank 1950, xv)।
এই উদ্যমটিকে বর্ণনা করা হল, অর্থনীতির সব কটি দিককে মাথায় রেখে ‘উন্নতি এবং সংস্কারের বহুমুখী পরিকল্পনা’(multitude of improvements and reforms) রূপে। এই প্রস্তাবনাটির পদ্ধতি দেশের সামাজিক এবং আর্থিক বাস্তবতার দিক থেকে এক্কেবারে নতুন রকমের। এই রণনীতির অন্যতম চরিত্র হল, এটি বহুধা বিস্তীর্ণ এবং একইভাবে সংহতও। এই কর্মকাণ্ডের বহুধা বিস্তির্ণতার দাবি হল সব গুরুত্বপূর্ন সামাজিক এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং সেই সঙ্গে কাজের সুষ্ঠু সম্পাদন নির্ভর করবে সযত্ন পরিকল্পনা, সংগঠন, এবং সম্পদ নির্ধারণ/ব্যবস্থাপনার ওপর। সমীক্ষায় লক্ষ্য এবং বোঝা যায়(quantifiable) এমন অভিষ্ঠ, বিনিয়োগের চাহিদা, সে কাজের পরিকল্পনার চরিত্রগুলি(design criteria) কাজের বিশদ নিদান, কর্ম পদ্ধতি এবং সময় পর্যালোচনা বিশদে করে দেওয়া হল।
সে সময়ের আন্তর্জাতিক ক্ষমতাবানদের কাজের লক্ষ্য আন্দাজ করতে আমরা সেই সমীক্ষার শেষ স্তবকটি উল্লেখ করতে পারি, সেখানে বলা হয়েছে - One cannot escape the conclusion that reliance on natural forces has not produced
the most happy results. Equally inescapable is the conclusion that with knowledge of the underlying facts and economic processes, good planning in
setting objectives and allocating resources, and determination in carrying out a program for improvements and reforms, a great deal can be done to improve the economic environment by shaping economic policies to meet scientifically ascertained social requirements. . . . Colombia is presented with an opportunity unique in its long history. Its rich natural resources can be made tremendously productive through the application of modem techniques and efficient practices. Its favorable international debt and trade position enables it to obtain modem equipment and techniques from abroad. International and foreign national organizations have been established to aid underdeveloped areas technically and financially. All that is needed to usher a period of rapid and widespread development is a determined effort by the Colombian people themselves. In making such an effort, Colombia would not only accomplish its own salvation but would at the same time furnish an inspiring example to all other underdeveloped areas of the world. (International Bank 1950, 615)

এই সমীক্ষা পত্রের সমাধানের অংশটির মন্তব্যগুলিতে প্রায় মসিহা ক্ষমতাবান সুলভ মন্তব্য এবং আধা-ধার্মিক উত্তাপ লক্ষ্য করার মত। salvation শব্দটির ব্যবহার লক্ষ্য করার – এর একটাই অর্থ উন্নয়ন। এই উন্নয়নের মাধ্যমেই অনুন্নত দেশগুলির ক্ষেত্রে কলম্বিয়া একটি অনুসরণ এবং উদ্দীপন শলাকা হয়ে উঠতে পারে। তবুও বলতে হবে স্যালভেশন/উন্নয়নএর কাজটি বেশ জটিল। ভাগ্যভাল এই কাজ সম্পাদনের জন্য যে সব হাতিয়ার দরকার – বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, পরিকল্পনা এবং আন্তির্জাতিক সংগঠনগুলি – সেগুলি ইতোমধ্যেই তেনারা তৈরি করে রেখেছেন, যার মুল্যমান এতদিন ধরে পশ্চিম নিজের ওপরে প্রয়োগ করে দেখিয়ে দিয়েছে। আরও বড় কথা এই হাতিয়ারগুলি নিরপেক্ষ, চাহিদাবন্ত এবং বিশ্বজনীনভাবে প্রয়োগযোগ্য। উন্নয়নের আগে এই সব দেশে কিছুই ছিল না – মানুষ শুধু প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভর করত, যা দিয়ে মনমুগ্ধকর কোন ফলই ফলে নি। উন্নয়ন আলোকবর্তিকা, যে আলো বৈজ্ঞানিকভাবে যুক্তিগ্রাহ্য পূর্বনির্ধারিত সামাজিক প্রয়োজনীয়তা পূরণ করতে সাহায্য করে। এই দেশ তার অতীতের গয়ংগচ্ছ মনোভাব ত্যাগ করে উজ্জীবিত হয়ে উঠে স্যালভেশনের পথ অনুসরণ করুক, সে কাজ সে দেশের দীর্ঘ ইতিহাসে পড়ে পাওয়া চৌদ্দ আনা বলা যেতে পারে(আরও বলা ভাল অন্ধকার থেকে আলোর দিকে যাত্রা)।

Wednesday, November 1, 2017

গরীব কাহারে কয়১০- উন্নয়নের বিশ্ব রাজনীতি তত্ত্ব

গরীব কাহারে কয়১০
উন্নয়নের বিশ্ব রাজনীতি তত্ত্ব
এনকাউন্টারিং ডেভেলাপমেন্টঃ দ্য মেকিং এন্ড আন্মেকিং অব দ্য থার্ড ওয়ার্লডঃ আর্তুরো এসকোবারএর বই থেকে
দ্বিতীয় অধ্যায়
দারিদ্র বিষয়ে উদ্যম সমাজ(social)কে নতুন খাসমহল দখল করাতে সাহায্য করল। পুঁজির বাল্যকালে শিল্প বিপ্লব, বৈদ্যুতিক প্রযুক্তি যৌথভাবে যতটা না আঘাত ফেলেছে, তার থেকে বেশি প্রভাব ফেলেছে আধুনিকতা - গাঁইয়াদের বড় পুঁজির উৎপাদনের ভোক্তা এবং তাদের পশ্চিমি জ্ঞান আর ব্যবস্থাপনার গ্রাহক তৈরি করে। এই কর্মদ্যোম আসলে, ‘“a techno-discursive instrument that made possible the conquest of pauperism and the invention of a politics of poverty” (Procacci 1991, 157).।’ জিওভানা প্রোক্রাসি বলছেন, কাঙ্গালপনার সঙ্গে ভাল হোক মন্দ হোক, গতায়াত, ভবঘুরেমি, আত্মনির্ভরতা, পরিশ্রম, বিমূঢতা, অজ্ঞতা এবং সামাজিক দায়িত্বগুলি পালন করার অস্বীকৃতির মত বিষয়গুলি জুড়ে, শুধুই ‘চাহিদা’র দর্শনে পরিণত হয়েছে। একইভাবে দারিদ্রের ব্যবস্থাপনা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্নতা, নৈতিকতা, চাকরির ব্যবস্থাপনায় হস্তক্ষেপ করে সামাজিক যোগাযোগ, সঞ্চয়, বাচ্চাকে বড় করার মত অভ্যেসগুলিকে কেড়ে নিতে শুরু করে। বহু গবেষক বলছেন, এই হস্তক্ষেপগুলি ‘সামাজিক’ নামে তথাকথিত গরীবদের গায়ে বর্মের মত সেঁটে বসে(Donzelot 1979, 1988, 1991; Burchell, Gordon, and Miller 1991)।
জ্ঞান এবং হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে সামাজিকতা নামক ব্যাপারটি উনবিংশ শতকে জায়মান হয়ে উঠতে শুরু করে, এবং বিংশ শতাব্দে জনকল্যানমূলক রাষ্ট্রের আবির্ভাবে সেটি পাকাপোক্ত হয়ে সামাজিক কর্মের নানান কীর্তিকলাপের মাধ্যমে সংঘবদ্ধ হয়। শুধু দারিদ্র নয়, শহরগুলোর স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিচ্ছন্নতা, চাকরিবাকরি, খারাপ জীবন যাপনও সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখা হতে শুরু হল, যার জন্য এই জনসংখ্যার বিশদ তথ্য এবং জ্ঞান আহরণ করে বহুধা সামাজিক পরিকল্পনার সূচনা ঘটল(Escobar 1992a)। ‘সমাজের সরকার’এর কটাই দায়িত্ব হল, এই অর্থনীতিটিকে বাস্তবে গৃহীত করাবার কাজ করেগিয়েছে সুচারুভাবে। গরীব নামে একটি আলাদা শ্রেণী তৈরি হল(Williams 1973)। এতদসত্ত্বেও এই ঘটনাক্রমের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল, একটি নতুন জ্ঞানভাণ্ডারের হাতিয়ার আর ক্ষমতাকেন্দ্র তৈরি করা, যা জীবনকে দেখতে এবং উপভোগ শেখায় আধুনিক এবং তথাকথিত ‘বৈজ্ঞানিক’ পরিবেশে। আধুনিকতার ইতিহাস যে শুধু একদেশদর্শী জ্ঞানচর্চা আর অর্থনীতির বিষয় নয়, আরও খোলাখুলিভাবে বললে এটা নব্য সামাজিকতার(social)এর ইতিহাস১।
এতক্ষণ আমরা যে অবস্থা বুঝলাম, তার মানে দাঁড়াচ্ছে উন্নয়নের ইতিহাস অর্থ হল, অন্য অঞ্চলে নব্যসামাজিকতা (social)র ইতিহাস নির্ভরতা তৈরি করা। রহনিমা যে দারিদ্রের প্রত্নতত্ত্বের কথা বলছিলেন এটা তার দ্বিতীয় পথবিচ্যুতি – দারিদ্রের বিশ্বায়নে। ১৯৪৫এর পরে বিশ্বের দুই তৃতীয়াংশ মানুষকে দারিদ্র ঘোষণা করে দেওয়া হল। বাজার নির্ভর সমাজে গরীবদের সংজ্ঞায়িত বলা হল ধনীদের সম্পদ আর আর্থিক স্বচ্ছলতার বিপরীতে যারা অবস্থান করেন। একইভাবে দরিদ্র দেশগুলিকে বলা হল, যে দেশগুলি আর্থিক স্তরে সুবিধেপ্রাপ্ত, উন্নত এবং ধনী, আর তাদের মত সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করে না। এই উন্নয়ন মাপার গজকাঠি হল বাৎসরিক মাথা পিছু আয় মাপার তরিকা। দারিদ্রের ধারণাটি বিশ্বজনীনভাবে ফেরি করা হল যা ‘১৯৪০র দশকে শুরু হওয়া তুলনামূলক সংখ্যাতত্ত্বের হাতসাফাইয়ের কারসাজি’মাত্র(Sachs 1990)। এই ক্ষমতার কারসাজিতেই ১৯৪৮ সালে, বিশ্বব্যাঙ্কের হিসেবে যে সব দেশের মানুষের রোজগার বছরে ১০০ পাউন্ডের নীচে তাদেরই গরীব বলে দাগিয়ে দেওয়া হল, অর্থাৎ বিশ্বের দুইতৃতীয়াংশ মানুষ গরীবিরেখার নীচে চলে গেল। আর যদি সমস্যাটা দাঁড় করানো যায় রোজগারের অভাব, তার নিদান দেওয়া হল অর্থনৈতিক উন্নতি।

এইভাবে দারিদ্র হয়ে উঠল ক্ষমতার ধারণা এবং নব্য সমস্যাবাদের হাতিয়ার। যে কোন সমস্যাবাদের(Foucault 1986) মতই, সমস্যা হিসেবে দারিদ্র নতুন প্রতর্ক এবং চর্চা-অনুশীলনের নতুন যুগের আরম্ভ করল। ফলে তৃতীয় বিশ্বের একমাত্র চিহ্ন হল তার দারিদ্র এবং তার নিদান হল অর্থনৈতিক উন্নতি এবং উন্নয়নের চাহিদা হল স্বতঃসিদ্ধ, প্রয়োজনীয় এবং বিশ্বজনীন সত্য। এই অধ্যায়ে আমরা আলোচনা করব ঐতিহাসিক ঘটনাটির ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়িত করতে কি কি পথ পেরোতে হয়েছে। এটি স্থির করে দিল তৃতীয়বিশ্বের একমাত্র চাহিদাই হল উন্নয়নশীলতা এবং এর মত প্রগতিশীল ব্যবস্থা প্রায় নেইই বলা চলে, এবং রাষ্ট্রগুলির একমাত্র কেন্দ্রিয় দায় হল দারিদ্র দূরীকরণ, এবং সে কার্যক্রম কিছু নির্দিষ্ট পথ, কার্যক্রম বেয়ে চালিত হবে। এই অধ্যায়ে আমরা আলোচনা করব তিনটি বিশ্ব বিষয়ে, এবং বিশেষ করে তৃতীয়টির উন্নয়ন ধারনাটি কি তা নিয়ে। এই তিনিটি বিশ্বের যে গল্প শুরু করে দেওয়া হয়েছিল চারের দশকে, যেতে যেতে দেখা গেল দ্বিতীয় বিশ্বটি বাস্তবিক এবং রাজনৈতিক ধারনার বিশ্ব থেকেই লোপ পেয়ে গিয়েছে কেন that works by the negotiation of boundaries achieved through ordering differences(Haraway 1989a, 10) – কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের ধারনাটি তখনও পর্যন্ত অটুট এবং আরও বলশালী হয়ে চলেছে। তৃতীয় বিশ্ব এমন একটা ক্ষমতার তৈরি করা ধারণা যেখানে কৃষ্টি, লিঙ্গ, জাতি, এবং শ্রেণী গভীরভাবে এবং পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়েমড়িয়ে বেড়ে উঠেছে। ক্ষমতা, রাজনৈতিক এবং আর্থিক মাণদণ্ডে যে তিনটি বিশ্বের এবং উন্নয়নের ধারনা তৈরি করল, যা নতুন জ্ঞানচর্চার অঙ্গ হিসেবে বিকশিত হয়েছে বিগত তিন দশক, সেই জ্ঞানচর্চাকে ক্রমান্বয়ে প্রশ্ন এবং স্থানচ্যুত করতে চেষ্টা করছে তৃতীয় বিশ্বের মানুষ জন।

Tuesday, October 31, 2017

গরীব কাহারে কয়৯ - উন্নয়নের বিশ্ব রাজনীতি তত্ত্ব

এনকাউন্টারিং ডেভেলাপমেন্টঃ দ্য মেকিং এন্ড আন্মেকিং অব দ্য থার্ড ওয়ার্লডঃ আর্তুরো এসকোবারএর বই থেকে

দ্বিতীয় অধ্যায়
THE PROBLEMATIZATION OF POVERTY – তিন বিশ্বের কথা এবং উন্নয়ন
আমাদের সময়ে দারিদ্র একটা গুরুত্বপূর্ণ শব্দ। প্রত্যেকেই এই শব্দটিকে নিয়ে বিপুলভাবে ধর্ষণও করেছেন আবার ব্যবহারও করেছেন। দরিদ্রের নামে বিপুল পরিমান অর্থ খরচ হয়। গরীবদের সমস্যার সমাধান করতে হাজারে হাজারে বই ছাপা হয়, বিশেষজ্ঞরা তাঁদের বহুমূল্য রায় দিয়েই থাকেন নিয়মিত। মজার হল যাদের জন্য এই সব আয়োজন, সেই গরীব এবং তাদের সঙ্গে জুড়ে থাকা দারিদ্র দূরকরার মানুষজনও জানেন না আসলে দারিদ্র কাকে বলে। দারিদ্র বিষয়ে বিশ্বজোড়া যে সব সংজ্ঞা আজ চলছে সেগুলি অধিকাংশ ‘উনতা’ বা ‘অনটন’ – এই দুই বিষয়কে ঘিরেই আবর্তিত হয়ে চলছে। এটা আসলে দারিদ্র বিষয়ে ভাবনার দারিদ্র। প্রয়োজনটা আদতে কি এবং কার জন্যে? এবং কে এই বিষয়টি সংজ্ঞায়িত করার কাজে উপযুক্ত – এটা ভাবা দরকার?(Majid Rahnema, Global Poverty: A Pauperizing Myth, 1991)

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ের সব থেকে বড় যে পরিবর্তনটা ঘটে সেটা হল, প্রথম বিশ্ব এশিয়া, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকায় দারিদ্র্য খুঁজে পেল। তুলনামূলকভাবে অস্পষ্ট এবং বাস্তবিকতায় যুক্তিসম্মত এই আবিষ্কারে বিশ্বজোড়া সংস্কৃতি আর রাজনৈতিক অর্থনীতিতে ঘটে গেল বিপুল পরিবর্তন। যুদ্ধ নতুন সামাজিক বাস্তবতায় প্রবেশ করল এবং যুদ্ধ শুরু হল নতুন ভৌগোলিক এলাকায় – তৃতীয় বিশ্বে। পিছনে পড়ে রইল ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে লড়াই। বিশ্বায়িত আমেরিকার ক্ষমতায়ন নতুন সময়ে ঢুকে পড়ে, শুরু হল সারা বিশ্বজুড়ে নতুন এক লড়াই। তৃতীয় বিশ্বে দারিদ্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এক্কেবারে বিশ্ব রঙ্গমঞ্চের সামনের সারিতে এসে বসল। নতুন যুদ্ধের সমর্থনে নানান ধরনের মনোলোভা তথ্য অস্ত্রশস্ত্ররূপে পরিবেশিত হতে থাকল, ‘১৫০০০০০ মিলিয়ন মানুষ, মোটামুটি বিশ্ব জনসংখ্যার দুইতৃতীয়াংশ, শনাক্তযোগ্য অপুষ্টির কবল আর অবর্ননীয় দারিদ্রের কবলে পড়ে আছে। এই ক্ষুধা হল দারিদ্র্য, ক্ষুধা আর দুঃখের কারণ ও প্রভাব(উইলসন, ১৯৫৩)’ ইত্যাদি।

গোটা চল্লিশ আর পঞ্চাশের দশক জুড়ে এই ধরণের এজাহারি চলতে লাগল(Orr 1953; Shonfield 1950; United Nations 1951)। নতুন জিগিরে বোঝা বোঝা যেতে শুরু করল যেন, বিভিন্ন দরিদ্র দেশে বাড়তে থাকা পৌনপুনিক দারিদ্র এবং তার ফলে উদ্ভুত সামাজিক হিংসা আদতে প্রথম বিশ্বের কাছে হুঁশিয়ারি স্বরূপ। এর ফলে গরীব এলাকার সমস্যাগুলি ক্রমশঃ আন্তর্জাতিক রঙ্গমঞ্চে ঠাঁই পেতে শুরু করল। রাষ্ট্রসংঘ ১৯৪৯ সালে আবিষ্কার করল আমেরিকার মাথাপিছু আয় ১৪৫৩ পাউন্ড আর ইন্দোনেশিয়ার ২৫ পাউন্ডও নয়। ভাবা হতে শুরু করল বিশ্বে স্থিতিশীলতা আর অসহনীয় হয়ে ওঠার আগেই নতুন কিছু উদ্যম নেওয়া দরকার। প্রথম বিশ্ব হাত বাড়িয়ে বলল, ধনী আর গরীব দেশগুলোর নিয়তি একসঙ্গে জুড়ে রয়েছে। ১৯৪৮ সালে বিশ্বের এক বিশেষজ্ঞ দলের মন্তব্য, ‘বিশ্বের সত্যিকারের সমৃদ্ধি অবিভাজ্য’। ‘বিশ্বের এক প্রান্ত যদি দারিদ্র আর অস্বাস্থ্যের মধ্যে ডুবে থাকে তাহলে সমৃদ্ধি অন্যপ্রান্তে বেশি দিন সমৃদ্ধ থাকতে পারে না(Milbank Memorial Fund 1948, 7; see also Lasswell 1945)’।

বিশ্বজোড়া দারিদ্র আসলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধত্তোর সময়ের আবিষ্কার। স্যাক্স আর রাহেনমা সুত্রে আমরা জানতে পারছি, দারিদ্রের ধারণা আর তার নির্মূলীকরণের নিদান ১৯৪০এর আগে আলাদা রকমের ছিল। উপনিবেশ ভাবত নেটিভদের অর্থনৈতিক বিকাশের কোন লক্ষ্য নেই, এবং যতদিননা নেটিভেরা উপনিবেশের দ্বারা আলোকিত হচ্ছে, ততদিন তাদের অর্থনৈতিক দারিদ্র থেকে মুক্তি নেই। নেটিভদের বিজ্ঞানপ্রযুক্তির বিকাশ শূন্য ভাবা হত(Adas 1989)।

আদাস তাঁর Machines as the Measure of Men বইতে বলছেন, এশিয়, আফ্রিকিয় এবং লাতিন আমেরিকিয়ূ এমন কি অধিকাংশ ইওরোপিয় ইতিহাসে, পরম্পরার সমাজ দারিদ্রকে রুখত, সংযম, সামাজিকতা আর স্বনির্ভরতার সূত্রে। তাদের পরম্পরাকে আদর্শ হিসেবে নাও দেখে, বলা যায়, আধুনিক অর্থে বিপুল দারিদ্র বলতে যা বোঝায় সেটির উদ্ভব হয়েছিল বাজার অর্থনীতির বিস্তার, কোটি কোটি মানুষকে জীবন, জীবিকা, ভূমি, জল আর অন্যন্য সম্পদ থেকে বিচ্যুত করার পরেই। পুঁজিবাদের শেকড় চারিয়ে যাবার পর থেকেই মানুষের কাঙ্গালিকরণের সময়ের শুরু।

দারিদ্রের প্রত্নতত্ত্বে প্রবেশ না করে, রাহেনমা বলছেন, দারিদ্রের ধারনা আর ব্যবস্থাপনাকে ভেঙ্গে বেরিয়ে আসতে গেলে বুঝতে হবে, এটি প্রথমে শুরু হয়েছিল উনবিংশ শতকে ইওরোপে পুঁজিবাদের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে এবং তৃত্রীয় বিশ্বের ধারনাটির বিকাশের মাধ্যমে। রাহেনমা বলছেন উনবিংশ শতকে বিভিন্ন নৈর্বক্তিক সঙ্গঠনগুলি দারিদ্রের ধারনাটির ব্যবস্থাপনার মধ্যে দিয়ে। এই রূপান্তরের সময়ে লোকহিতৈষণা(Philanthropy) একটা বড় ভূমিকা পালন করেছে(Donzelot 1979)।

গরীবকে গ্রাহক হিসেবে তৈরি করার মাধ্যমে বিশ্ব রাজনীতি আর অর্থনীতিতে বিপুল পরিবর্তন ঘটল। দারিদ্রের ‘আধুনিকতা’য় দেশিয় সম্পর্কগুলো শুধু ভেঙ্গে গেল তাই নয়, নতুন ধরণের নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাপনার সময় শুরু হল। ক্রমশ গরীবদের সামাজিক অসুবিধে হিসেবে দেখা হতে শুরু করল, এবং এটাও ভাবা হল যে সমাজে এর জন্য নতুন ধরণের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। দারিদ্র আদতে জীবন, অর্থনীতি, অধিকার এবং সামাজিক ব্যবস্থাপনাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করা শুরু করল। ‘কাঙ্গালপনা, রাজনৈতিক অর্থনীতি আর সমাজের আবিষ্কার পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত(Polanyi 1957)।’

Sunday, October 29, 2017

গরীব কাহারে কয়৮ - উন্নয়নের বিশ্ব রাজনীতি তত্ত্ব

এনকাউন্টারিং ডেভেলাপমেন্টঃ দ্য মেকিং এন্ড আন্মেকিং অব দ্য থার্ড ওয়ার্লডঃ আর্তুরো এসকোবারএর বই থেকে

নৃতত্ত্ব এবং উন্নয়ন বিতর্ক
উপনিবেশ সম্পর্কিত তার প্রবন্ধগুচ্ছ নিয়ে রচিত বই, Anthropology and the Colonial Encounter (1973), তালাত আসাদ বলছেন আজও পেশাদার নৃতাত্ত্বিকেরা তাঁদের অধীতবিদ্যার মধ্যে যে ক্ষমতার কাঠামোটা রয়েছে, সেটা স্বীকার করতে গড়মসি করেন, বিশেষ করে খুবই ঝামেলার দুটি বিষয় উপনিবেশবাদ এবং নব্যউপনিবেশবাদ, এবং তাদের রাজনৈতিক অর্থনীতি এবং সঙ্গঠনগুলো বিষয়কে তারা উপেক্ষা করতে থাকেন। উপনিবেশবাদ একসময়ে একটি নৈকট্যমূলক ভূমিকা পালন করেছিল - যার দ্বারা মনে হয় তারা উপনিবেশের মানুষের একটা এক ধরণের মানবিক নৈকট্য তৈরি করছে। আদতে সে নৈকট্যের ভিত্তি নৃতত্ত্বের মাঠকর্ম নির্ভরশীল, এবং সেটা নিশ্চিত করে যে সেই নির্ভরতা এক রৈখিক এবং শর্তাধীন। এরই সঙ্গে বলা যায়, যদি ঔপনিবেশিক আমলে নৃতত্ত্বের লক্ষ্যচ্যুতি উপনিবেশের বৈষম্যমূলক বিশ্ব তৈরিতে হুঁশিয়ারি না হয়ে ওঠা বোঝায়, তাহলে কি একই অবস্থা আজকের উন্নয়নের অবস্থায় ঘটছে বলা যাবে না? মোটামুটি একই প্রাসঙ্গিকতায় আমরা বলতে পারি না নৃতত্ত্বের সঙ্গে উন্নয়নের বিতর্ক হোক।

এটা ঠিক যে উন্নয়ণের বিতর্কে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে যে মধ্যে যে প্রতর্কে গরীব ধনী এই বর্গে রাষ্ট্রগুলি বিভাজিত হল, সেই বিতর্কে সে সরাসরি অংশ নেয় নি বা সেটায় বড় ভূমিকা তার ছিল না এটা সত্য। যদিও অধিকাংশ নৃতাত্ত্বিক উন্নয়নের মূল উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, বিশেষ করে পরম্পরার মানুষদের পক্ষে দাঁড়িয়ে১২, কিন্তু বিপুল সংখ্যক নৃতাত্ত্বিক উন্নয়নের মূল কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংগঠন বিশ্বব্যাঙ্ক, ইউএসএইডএর মত সংস্থার সঙ্গে উন্নয়নের কাজে জুড়ে থেকেছেন। ১৯৭৫-১৯৮৫ পর্যন্ত এই সময়ে তাঁদের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহন বিষয়ে আমি বিশদে অন্য নানান যায়গায় আলোচনা করেছি। Stacy Leigh Pigg (1992) স্পষ্টভাবে বলছেন প্রায়োগিক নৃতাত্ত্বিক হিসেবে নৃতাত্ত্বিকেরা সরাসরি উন্নয়নকর্মের সঙ্গে জড়িয়েছিলেন, বা তারা উন্নয়ন প্রক্রিয়ার বাইরে দাঁড়িয়ে দেশজ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গী এবং তাঁদের কৃতি বর্ণনা করে গিয়েছেন। উন্নয়নকর্মের ভিতরে দাঁড়িয়ে অথবা বাইরে থেকে তাকে সমালোচনা করে উন্নয়নের কর্মকে কৃষ্টির রূপ দেওয়ার চেষ্টাকে প্রশ্ন করেছেন। হাতে গোনা কিছু নৃতত্ত্ববিদ((Taussig 1980; Fals Borda 1984; Scott 1985; Ong 1987; see also Comaroff 1985 and Comaroff and Comaroff 1991 for resistance in the colonial context)) সরাসরি উন্নয়নের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে লড়ায়ের প্রচেষ্টার ব্যখ্যাকার হয়েছেন।

উন্নয়ন একটি প্রশাসনিক বিষয়, নৃতত্ত্ববিদদের এই প্রতর্কে না ঢোকাটা একটা দুঃখজনক বিষয়। যদি সত্য হয় যে তৃতীয় বিশ্বের ধারণা তৈরির প্রচেষ্টা থেকে উপনিবেশবাদ অনেকটা সহনশীল, কিন্তু মনে রাখতে হবে সাম্রাজ্যবাদীদের থেকে উন্নয়নবাদীরা কম অনুপ্রবেশকারী(pervasive) এবং কার্যকর ছিলেন না। হয়ত এই দুটি বিষয় অনেক কাছাকাছিরও বটে। সঈদ দুঃখ করে বলছেন, সাম্প্রতিক আমেরিকিয় তাত্ত্বিকেরা আলোচনায় আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী তাত্ত্বিকতা কিভাবে আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী দখলদারি চরিত্রকে তৈরি করল, সে বিষয়ে প্রতর্কেযুক্ত থাকেন না বলা চলে। এই সাম্রাজ্যবাদী দখলদারির নানান স্তর রয়েছে অর্থনৈতিক, সামরিক, রাজনৈতিক, এবং কৃষ্টিগত – যেগুলিকে উন্নয়নের কারবারিরা একসঙ্গে জুড়ে নিয়ে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ করেন। সঈদ আরও বলছেন, যেভাবে পশ্চিমি তাত্ত্বিকেরা তৃতীয় বিশ্বের জ্ঞানচর্চকদের সমালোচনামূলক উপনিবেশ, ইতিহাস, পরম্পরা এবং কর্তৃত্ব – এবং এখানে আমি জুড়তে পারি উন্নয়ন বিষয়ক – আলোচনা নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথা ঘামান এমন কোন নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায় না। তৃতীয় বিশ্ব থেকে উন্নয়নের প্রতর্ককে এক্কেবারে রদ করার গলা চড়ছে নৃতাত্ত্বিকদের এটা সুখবর।

১৯৭০র দিকে নৃতত্ত্বের বিপুল গভীর পরিবর্তন আসে, সে বলার চেষ্টা করে শুধু পশ্চিমী জীবনযাত্রাই একমাত্র পথ নয় বরং সারা বিশ্বজুড়ে নানান ধরণের পথ আছে এবং সেটা তৃতীয় বিশ্বের মানুষের পক্ষে উপযোগী (Strathern (1988, 4))। এই আত্মসমালোচনামূলক মন্থন থেকে একটা বিষয় উঠে আসে, সেটা হল, অন্যদের নিয়ে লেখালিখি, বিতর্ক নিয়ে কোন ঝামেলা নেই, কিন্তু সেটা করতে গিয়ে প্রান্তিক দাগিয়ে দেওয়ার অধিকার কারোর নেই। এই প্রতর্কে নিগুঢ এবং গঠনমূলক ধারণা ক্রমশ উঠে এল যে, কৃষ্টি আদতে মিথস্ক্রিয় এবং ঐতিহাসিক(Clifford 1986,)। নৃতাত্ত্বিক লেখালিখিতে এই বিষয়ে যে পরিবর্তন ঘটল ‘তারা অভূতপূর্ব রাজনৈতিক এবং ঐতিহাসিক চেতনা নিয়ে কৃষ্টিগত বৈচিত্রকে উপস্থাপন করতে লাগলেন।(Marcus and Fischer 1986)’।

গরীব কাহারে কয়৭ - উন্নয়নের বিশ্ব রাজনীতি তত্ত্ব

এনকাউন্টারিং ডেভেলাপমেন্টঃ দ্য মেকিং এন্ড আন্মেকিং অব দ্য থার্ড ওয়ার্লডঃ আর্তুরো এসকোবারএর বই থেকে
আরেকটি বিনির্মানিক প্রচেষ্টা হল স্যাক্সের The Development Dictionary: A Guide to Knowledge as Power। উন্নয়নের প্রতর্কে বাজার, পরিকল্পনা, জনসংখ্যা, পরিবেশ, উৎপাদন, সাম্য, অংশগ্রহণ, চাহিদা, দারিদ্র এবং এই ধরণের নানান শব্দ ব্যবহার করে বিশ্লেষণ করা হয়। ইওরোপিয় (অ)সভ্যতায় এই শব্দ(বা ধারণা)গুলোর বিবর্তন লক্ষ্য করে প্রত্যেক অধ্যায়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে ১৯৫০এর পর আজ পর্যন্ত এই ধারনাগুলো কিভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।
এই বইএর উদ্দেশ্য হল এই ধারনাগুলির যদৃচ্ছ ব্যবহারের বিরুদ্ধে কলম ধরা, সেগুলির কৃষ্টিমূলক ও ঐতিহাসিক কুড় খুঁজে বার করা এবং কিভাবে এই ধারণাগুলি ব্যবহার করা হয়েচক্সহে তৃতীয়বিশ্ব নামক একটি বিমূর্ত ধারণা তৈরি করতে৮। এই ধরণের আরেকটি দল কাজ করছেন ‘জ্ঞানের ব্যবস্থা’ নামক বিকাশশীল একটি জ্ঞানচর্চায়। এই দলটি বিশ্বাস করে কৃষ্টি, শুধু প্রথা বা নৈতিকতা ভিত্তি করে গড়ে ওঠে না, বরং কিভাবে জ্ঞান অর্জিত হচ্ছে সেটার ওপরেও নির্ভর করে। উন্নয়ন শুধু একটা জ্ঞানচর্চা অর্থাৎ আধুনিক পশ্চিমি জ্ঞানচর্চার ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে। এই জ্ঞানচর্চার একাধিপত্য অপশ্চিমি জ্ঞানচর্চাকে প্রান্তিক বা অযোগ্য প্রমান করে ছেড়েছে। এই পরবর্তি জ্ঞানচর্চাগুলিতে এই লেখক সমেত, আগ্রহী এবং গবেষকেরা আর্থিক বা খণ্ডিতকরণের বাইরে বেরিয়ে এসে সামাজিক কাজকর্মগুলিকে অন্যরকমভাবে বোঝার চেষ্টা করছেন।
১৯৭০এর দশকে হঠাৎ আবিষ্কার করা গেল মহিলাদের এড়িয়ে উন্নয়ন কর্মীরা কাজ করে চলেছেন। এই ‘আবিষ্কার’ ঘটায় ১৯৭০ এবং ১৯৮০র দশকগুলোয় নতুন এক ধারনার বিকাশ ঘটল উন্নয়নে নারীরা(উইমেন ইন ডেভেলাপমেন্ট)। এই ধারণাটাকে পরের দিকে চন্দ্রা মোহান্তি এবং এডিলে মুলার(Adele Mueller)এর মত গবেষক বিশ্লেষণ করবেন। এরা বলছে কিভাবে নামী উন্নয়নের সঙ্গঠনগুলো তাদের গ্রহীতা তৈরি ব্যবস্থাপনা করে। এ ধরণের আরও দুটি বিষয়, অর্থনীতি এবং পরিবেশ, কিভাবে উন্নয়নের বিষয়গুলিকে প্রভাবিত করে সেটি আমরা আগামী অধ্যায়গুলিতে আলোচনা করব১০।
একদল সুইস নৃতাত্ত্বিক তাদের কাজ হিসেবে বেছে নিয়েছেন, কিভাবে উন্নয়ণ এবং আধুনিকতাকে ব্যবহার, প্রশ্ন, এবং তাকে বাঁকিয়েচুরিয়ে বিভিন্ন সামাজিক কন্টেক্সটে বিশ্বের বিভিন্ন এলাকায় ব্যবহার করা হয়েছে। সামগ্রিক ব্যবহারের, কর্মপদ্ধতির, এইসব লব্জ ব্যবহারের প্রভাব, যা আদতে খুবই স্থানিক, এই সব ধারনাপুঞ্জ তারা আবিষ্কার করার চেষ্টা করেছেন এবং তা ক্রমশ বাইরে আসছে। পাপুয়া নিউগিনির কোন গ্রাম, বা কেনিয়া বা ইথিয়োপিয়ার ছোট শহরে জটিল এক প্রক্রিয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে পরম্পরার রীতিনীতি, উপনিবেশের ইতিহাস, এবং সেই সময়ের বিশ্বের অর্থনীতিতে নানান পণ্য এবং প্রতীককে অনুযায়ী আধুনিকতা আর উন্নয়নের ধারনাকে (Dahl and Rabo 1992) স্থানিক করার চেষ্টা করা হয়েছে। ঠিক এই ভাবে পিগ কাজ করেছেন নেপালের স্বাস্থ্যব্যবস্থা বিষয়ে। পরের অধ্যায়গুলিতে আমরা এই সব নিয়ে আলোচনা করব।
বিভিন্ন উন্নয়ন প্রতর্কে কিভাবে নানান পরম্পরার জ্ঞানচর্চা প্রভাব ফেলে তা নিয়ে কিছু কাজের বর্ননা দেব। ১৮৮৫ সালে Irene Gendzier লিখলেন Managing Political Change: Social Scientists and the Third World। এতে তিনি বললেন কিভাবে ১৯৫০এর দশকে রাষ্ট্র বিজ্ঞান জাতীয় নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক উপদেশাবলী নিয়ে আধুনিকতার ওপর প্রভাব ফেলে। এ ছাড়াও Kathryn Sikkink (1991) ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনায় ১৯৫০এর দশকে উন্নয়নবাদের যে সব মডেল ছেয়ে গেল তার উদাহরণ নিয়ে আলোচনা করেছেন বিশদে১১। চিলির Pedro Morande (1984) গবেষণা করেছেন, ১৯৫০ এবং ১৯৬০এর দশকে ল্যাটিন আমেরিকা জুড়ে উত্তর আমেরিকার পরম্পরাকে আধুনিকীকরণের তত্ত্ব গৃহীত এবং প্রযুক্ত হল তার ইতিহাস। Kate Manzo (1991) বললেন, উন্নয়নের সঙ্গে জুড়ে থাকা আধুনিকতার ধারণা সংক্রান্ত ভুলত্রুটিগুলি বিশেষ করে উন্নয়নের জন্য নির্ভরতার তত্ত্ব, এবং তিনি একই সঙ্গে বললেন উন্নয়ন-বিরোধী তত্ত্ব, যা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির শেকড়ে লুকিয়ে রয়েছে, তাকে তুলে আনতে হবে। উন্নয়নের মূলে কৃষ্টির ধারণাকে ফিরিয়ে আনতে তিনি তার বইতে বারবার বলেছেন।
এই আলোচনায় আমরা দেখলাম ছোটকরে, কিন্তু সঠিক দিশায় উন্নয়ন বিরোধী আলোচনা শুরু হয়েছে। আমার এই বই এ বিষটে খুবই সাধারণ আলোচনা বিশেষ।

Sunday, October 22, 2017

গরীব কাহারে কয়৬ - উন্নয়নের বিশ্ব রাজনীতি তত্ত্ব

এনকাউন্টারিং ডেভেলাপমেন্টঃ দ্য মেকিং এন্ড আন্মেকিং অব দ্য থার্ড ওয়ার্লডঃ আর্তুরো এসকোবারএর বই থেকে
এই বইটির প্রাথমিক উদ্দেশ্য দ্বিতীয়বিশ্বযুদ্ধত্তোর সময় থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত উন্নয়নকে যেভাবে একটা জ্ঞানচর্চার অংশ করা হয়েছে, সেটিকে এবং এই কাজে তার ব্যবহৃত হাতিয়ার সমূহ নিয়ে বিশদে আলোচনা করা। দ্বিতোয় বিশ্বযুদ্ধত্তোর সময়ে অনুন্নয়ন কিভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠিত করল সেটি নিয়েও আলোচনা করা দরকার। এবং এই বিশেষ ক্ষেত্রে জ্ঞান উতসারণ আর ক্ষমতা সংহত হওয়ার যেসব হাতিয়ারগুলি ব্যবহৃত হয়েছিল - যেমন গ্রামোন্নয়ন, সাস্টেনেবল ডেভেলাপমেন্ট এবং মহিলা এবং উন্নয়ন ইত্যাদি সেগুলি নিয়েও আলোচনা জরুরি। শেষমেশ উন্নয়ন-পরবর্তী সময়কে কিভাবে আমরা ভাবার চেষ্টা করব এবং আজকের তৃতীয় বিশ্বের সামাজিক আন্দোলনকে বুঝে, সেই উন্নয়ন ধারণার বিপরীতে প্রতিষেধক হিসেবে কোন তত্ত্ব আমরা উপস্থাপন করব।
অনেকেই বলতে পারেন এটা উন্নয়নবাদের প্রতর্ক। সইদের প্রাচ্যবাদের তাত্তিকতার উলটোপথে দাঁড়িয়ে আমি উন্নয়নবাদের জ্ঞানচর্চাকে প্রায়োগিক রূপে দেখার চেষ্টা করব। আমি দেখাবার চেষ্টা করব তৃতীয় বিশ্বজনিত তাত্ত্বিক জ্ঞানচর্চার ফলে একটি প্রয়োগবাদী নির্দিষ্ট কর্মপদ্ধতি উৎসারিত হয়েছে। যে উদাহরণ আমি দেওয়ার চেষ্টা করব সেটি হল সাত এবং আটের দশকের লাতিন আমেরিকার গ্রামোন্নয়ন, স্বাস্থ্য এবং পুষ্টি প্রকল্পগুলির নানান দিক। হোমি ভাবা প্রাচ্যবাদ বিয়ে যে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, সেটা মাথায় রেখেই সঈদের ওয়েয়েন্টালিজমএর কয়েকটা তাত্ত্বিক অবস্থান থেকে আমি এক পা দূরে দাঁড়িয়ে দেখার চেষ্টা করব, তৃতীয় বিশ্বের তাত্ত্বিকতা সেই অঞ্চলের গ্রহীতাকে পুরোপুরি পেড়ে ফেলে না। এই সতর্কতা আমার মাথায় থাকবে এবং দেখব কিভাবে তৃতীয় বিশ্বের মানুষেরা এই তত্ত্বের সমান্তরাল উদ্যম ভাবতে এবং তৈরি করতে চেষ্টা করছেন।
আফ্রিকিয়বাদ বিষয়ে মুদাম্বের গবেষণার মত করে আমিও তৃতীয় বিশ্ব মানেই অনুন্নত, এই জ্ঞানচর্চা আর তার প্রতর্কের ভিত্তিটার ঘোটা উন্মোচব করতে চাই। উন্নয়ন শব্দটা কিভাবে জন্ম নিল তার মানচিত্রটা খোঁজা এখন জরুরি কাজ। নৃতত্ত্ব বা দর্শনের ওপর ভর না করে আমি চেষ্টা করছি উন্নয়নের যুগটাকে আমি আদুনিকতার সঙ্গে জুড়ে বুঝতে চাইছি, বিশেষ করে আধুনিক অর্থনীতি চর্চার ভিত্তিতে। এই দৃষ্টিভঙ্গীতে উন্নয়নকে দেখা যায় আধুনিকতার নৃতত্ত্ব রূপে। অর্থাৎ ঐতিহাসিক এবং কৃষ্টির ভিত্তিতে পশ্চিমি আধুনিকতার ওপর গবেষণা হলেই উন্নয়ন শব্দের শেকড় খুঁজে পাওয়া যাবে। যদি এটা সত্যি হয় তাহলে আধুনিক তন্ত্র (মডার্ন অর্ডার) এবং তার মানবিক বিজ্ঞানের কোন একটি নৃতাত্ত্বিক কাঠামো(এন্থ্রোপলজিক্যাল স্ট্রাকচার>ফুকো) থাকবে। এটিকে গবেষনার ক্ষেত্রে নিয়ে এসে বুঝতে হবে কিভাবে, আধুনিকতার বিশেষ অভিযোজন বলে এই কাঠামো উন্নয়ন প্রানলীর(রেজিম) বিকাশ ঘটাতে পারল। এই আধুনিকতার নৃতত্ত্বর দিকচিহ্ন ইতোমধ্যে আমাদের বুঝিয়েছে পশ্চিমের কৃষ্টিজ পণ্যগুলি অদ্ভুত(এক্সটিক)ঃ ...আমাদের পশ্চিমকে নৃতত্ত্বায়িত করতে হবে, দেখাতে হবে এর বস্তিবিক বিধান(কন্সটিটিশন অব রিয়ালিটি) কতই আলাদা অদ্ভুত(এক্সটিক); সেই কার্যক্ষেত্রগুলিকে(ডোমেইন)অবশ্যম্ভাবী পালনীয়(টেকন ফর গ্রান্টেড এজ ইউনিভার্সাল) হিসেবে ধরতে হবে(এর মধ্যে রয়েছে জ্ঞানচর্চা এবং অর্থনীতি); একে ঐতিহাসিকভাবে যতটা সম্ভব বিশেষ হিসেবে দেখাও; দেখাও তাদের দাবি কতটা সামাজিক প্রথার(সোসাল প্রাক্টিশ) সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে, ফলে এটি সামাজিক বিশ্বের জন্য অত্যন্ত কার্যকর হবে(রাবিনাউ, ১৯৮৬)। আধুনিকতার নৃতত্ত্ব নির্ভর করবে সরাসরি জাতিতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গীতে যা জ্ঞান এবং ক্ষমতার ঐতিহাসিক উপজাত হিসেবে সামাজিক বিন্যাসগুলিকে দেখে। এটি(আধুনিকতার নৃতত্ত্ব) গবেষণা আমাদের সূচিত করে কিভাবে নানান প্রতীক এবং প্রথা সত্যতার দাবি ভিত্তি করে সামাজিক জীবনকে প্রভাব ফেলে।
উন্নয়নকে কাটাছেঁড়া
উন্নয়নের সমালোচনামূলক লেখাপত্তর শুরু হয়েছিল ১৯৮০র শেষের দিকে, চলেছিল ১৯৯০ পর্যন্ত, একই সঙ্গে সমান্তরাল মত তৈরির ভাবনারও কাজকর্মও চলছিল। কিন্তু উন্নয়নকে নিয়ে কাটাছেঁড়ার কাজ খুব বেশি ঘটে নি। জেমস ফারগুসনের লেসোথোর উন্নয়ন বিষয়ে বই(The Anti-Politics Machine. “Development” and Bureaucratic Power in Lesotho) আমাদের সামনে উন্নয়নের কাটাছেঁড়ার একটি বাস্তবধর্মী প্রতিবেদন পেশ করে। বিশ্বব্যাঙ্কের আর্থিক অনুদানে যেসব গ্রামীন উন্নয়নের কাজ চলছে সেগুলি গভীরে গিয়ে আলোচনা করেন। প্রকল্পের মৌল উদ্দেশ্যগুলি পূরণ না হলেও, প্রাথমিকভাবে রাষ্ট্রের ক্ষমতা বৃদ্ধি, গ্রামীন সামাজিক সম্পর্ককে নতুন করে বিন্যাসের চেষ্টা করা, পশ্চিমি আধুনিকীকরণের বিপুল প্রভাব এবং সমস্যাগুলির বিরাজনীতিকরণ ছিল লেসোথোর গ্রাম উন্নয়নের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ দিক। ফারগুসন তার গবেষণার সূত্রে দাবি করেন এই ধরণের প্রকল্পগুলির প্রোডাক্টিভিটি/কার্যকারিতা আরও বাড়াতে হবে।