Wednesday, March 28, 2018

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা১৭ - ঔপনিবেশিকতাবাদ এবং তার জ্ঞানচর্চার আঙ্গিক - সাম্রাজ্যের মন ও মান ।। বারনার্ড কোহন

অধ্যায়২
ভারতীয় ভাষা এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ গড়নের পথে
ফারসিঃ ভারতীয় রাজনীতির ভাষা
পলাশীর পরে পরেই কোম্পানির সেনাবাহিনী তৈরি এবং তাদের প্রশিক্ষিত করে তোলার জন্যে এবং ভারতের করমণ্ডল, উত্তরভারত এবং বাংলার মত ধনী এবং উর্বর অঞ্চলে স্বাধীন রাজন্যবর্গ নিয়ন্ত্রিত এলাকা দখল এবং একই সঙ্গে তাদের সাম্রাজ্যের অধীনে নিয়ে আসার পদ্ধতি নিরূপণের জন্যে ফারসি জানা ভীষণ জরুরি হয়ে পড়ল। এই রাজনৈতিক আবশ্যকতার মধ্যে দাঁড়িয়ে বাংলা সেনা বাহিনীর জনৈক উচ্চআধিকারিক উইলিয়াম ডেভি ফারসি জানাকে স্বচ্ছলতার পথ হিসেবে ধরে নিলেন। তার মনোভাব ছিল ভারতীয় বিভিন্ন সাহিত্য, নথি অনুবাদের কাজ অযোগ্য ভারতীয় দোভাষীদের হাতে ছেড়ে না দেওয়াই ভাল। এই গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্যে কি কি দক্ষতা প্রয়োজন, সেই গুণাবলী বিবৃত করে তিনি লিখলেন, ... একজন ফারসি দোভাষীকে শুধুই ফারসি গড়গড়িয়ে বললেই হবে না, সে যে চিঠি হাতে পাবে সেগুলিও যথাযোগ্যভাবে পরা জরুরি... তার গুরুত্ব অনুসারে সেই উত্তর নিজের হাতে লিখে দিতে হবে। না হলে সরকারের হাতে আসা নানান ধরণের গোপন চিঠিপত্রের মূল ভাবনাগুলি মুন্সি বা করণিকদের হাত বেয়ে প্রকাশ হয়ে পড়বে।
অবশ্য ডেভি ফারসি শেখেন জনৈক মুন্সির থেকে কোন ফারসি-ইংরেজি ব্যকরণ বা শব্দকোষের সাহায্য ছাড়াই। সে সময় একমাত্র ছাপা ফারসি-ল্যাটিন শব্দকোষটি ছিল ফ্রান্সিসিকাস মেনিন্সকির রচনা। এটি এ দেশে পাওয়া এতই দুষ্কর ছিল যে এটি পাওয়ার জন্যে ডেভি ১৭৭৩ সালের কলকাতায় ১০০ গিনি খরচ করেছিলেন। এই বইটা ডেভির কাজে আসে নি, কারণ ডেভির বিশ্বাস ছিল, মেনিন্সকি ফারসি নয় তুর্কি ভাষায় দক্ষ ছিলেন, যার ওপর ভিত্তি করে তিনি তার আরবি, তুর্কি এবং ফারসি শব্দার্থ পুস্তকটি তৈরি করেন। যার জন্যে ডেভি লিখলেন, ওয়ার্ডস ইন ওয়ান ল্যাঙ্গুয়েজ, বিয়ারিং আ ভ্যারাইটি অব সিগনিফিকেশনস, আর গিভন থ্রু দ্য মিডিয়াম অব ওয়ার্ডস ইন এনদার, হ্যাভিং অলসো ভেরিয়াস মিনিংস, এন্ড মেনি ডায়রেক্টলি কন্ট্রাডিক্টরি, ওয়ার ট্রান্সলেটেড বাই ওয়ার্ডস ইন আ থার্ড, হুইচ ইন মেনি সিগ্নিফিকেশনস, ডিফার্স টোটালি ফ্রম বোথ।
সপ্তদশ শতকের শেষের দিকে অক্সফোর্ডে আরবিক ভাষা শেখার একটি বিভাগ ছিল এবং ইওরোপিয় মহাদেশে এই ভাষা জানা হাতেগোনা জ্ঞানী ছিলেন, যারা উইলিয়াম জোনসের ভাষায় হ্যাড কনফাইন্ড দেয়ার স্টাডিজ টু মিনিট রিসার্চেস অব ভার্বাল ক্রিটিসিজম। জোন্সের আভিযোগ ছিল জ্ঞানীদের হ্যাভ নো টেস্ট, অ্যান্ড দ্য মেন অব টেস্ট হ্যাভ নো লার্নিং। প্রাচ্যের ভাষা সাহিত্য শিক্ষার জন্যে কোন পৃষ্ঠপোষকতা ছিল না। জোনস লিখলেন মেনিন্সকির বইটা তাকে হয়ত জ্ঞানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে, কিন্তু তাকে আর্থিকভাবে নিঃস্ব করে দেয়। জোনসের ভাষায় ফারসি ভাষা হল রিচ, মেলোডিয়াস এবং এলিগ্যান্ট, যেটিতে গুরুত্বপূর্ণ কবিতা, এবং ইতিহাস রচনা আছে, এবং এই জন্যেই ভারতে ফারসির সমঝদার বাড়ছে কারণ ভারত, ইওরোপিয় বণিকদের স্বচ্ছলতার ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে উঠছে। তিনি লিখলেন, দ্য সার্ভ্যান্টস অব কোম্পানি রিসিভড লেটার্স দে কুড নট রিড এন্ড ওয়ার এম্বিসাস অব গেইনিং টাইটলস হুইচ দে কুড নট কম্প্রইহেন্ড দ্য মিনিং; ইট ওয়াজ ফাউন্ড হাইলি ডেঞ্জারাস টু এমপ্লয় নেটিভস এজ ইন্টারপ্রিটার্স, আপন হুজ ফাইডালিটি দে কুড নট ডিপেন্ড; এন্ড ইট ওয়াজ এট লাস্ট ডিসকভার্ড দ্যাট দে মাস্ট এপ্লাই দেমসেলভস টু দ্য স্টাডি অব দ্য পার্সিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজ... দ্য ল্যাঙ্গুয়েজেস অব এশিয়া উইল নাউ পারহ্যাপস বি স্টাডিড উইথ আনকমন আরডর; দে আর নোন টু বি ইউজফুল, এন্ড উইল সুন বি ফাউন্ড টু বি ইন্সট্রাকটিভ এন্ড এন্টারটেইনিং।
উইলিয়াম জোনসের গ্রামার অব দ্য পার্সিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজ লন্ডনে ১৭৭১ সালে প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই জনপ্রিয় হয় এবং ১৮০৪ সাল পর্যন্ত ছয়টি সংস্করণ প্রকাশিত হয়। কোর্ট অব ডিরেক্টর তাদের আমলাদের এটি পড়তে নির্দেশ দিলেও এই বইতে কোন ভর্তুকি কোম্পানি দিতে অস্বীকার করে। যদিও এর আগে ও পরে তারা এ ধরণের বহু বইতে ভর্তুকি দিয়েছে।

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা১৬ - ঔপনিবেশিকতাবাদ এবং তার জ্ঞানচর্চার আঙ্গিক - সাম্রাজ্যের মন ও মান ।। বারনার্ড কোহন

অধ্যায়২
ভারতীয় ভাষা এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ গড়নের পথে

১৭৭০ থেকে ১৭৮৫ এই ১৫ বছর সময়কে আমরা দেখতে পারি যখন, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ভারত শাসনের অঙ্গ হিসেবে ভারতীয় ভাষাগুলিকে নিজেদের স্বার্থে বিকাশ ঘটানোর প্রকল্প নিল। একের পর এক ব্রিটিশ আধিকারিক ভারতের সংস্কৃত, ফারসি আর আরবির মত ‘ধ্রুপদী’ ভাষাসহ অন্যান্য অসংস্কৃত ভাষাগুলিও শিখতে শুরু করে। এই সময় ব্রিটিশেরা ভাষার জন্য এবং অন্যান্য ভাষা থেকে নানান হাতিয়ার যেমন ব্যকরণ, শব্দকোষ, ভাষা বিষক প্রবন্ধ, পাঠ্যপুস্তক এবং অনুবাদ প্রকাশ করার উদ্যম নেয়। আমার এই আলোচনার মূল প্রতিপাদ্য হল, এই সময় বা আগামী সময়ের প্রকাশনাগুলির মাধ্যমে তারা ভাষার গড়ন নির্দেশ করা, জ্ঞানচর্চার ভূমিকা ঠিক করে দেওয়া, আলোচনার ভিত্তি(প্রাচ্যবাদ) নির্নয় করে ভারতীয় জ্ঞানচর্চাকে ইওরোপিয় ঢঙ্গে পরিবর্তিত করার উদ্যম নেবে। ভারতে ব্রিটিশ শাসন ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষদের প্রথম এবং একমাত্র উদ্যম হল ভারতীয় ভাষাগুলিকে ইওরোপিয় লব্জে ব্যকরণিক, শব্দকোষিয়, এবং শিখন প্রণালীর জামা পরানো।
এই ধরণের কিছু প্রকাশনা হল ফ্রান্সিস বেলফোরের ‘হরকরণ’ বা গ্ল্যাডউইনের ‘আইন’। এই দুটি প্রকাশনা এই পথে যাওয়ার দিক নির্দেশিকা হয়ে উঠল। প্রথমটি একজন কায়স্থর চিঠি লেখা সংক্রান্ত মুঘল সময়ের নির্দেশাবলী অন্যটি সেই সময়েরই প্রশাসনিক কাজকর্মের নির্দেশনামা। ডাও আর ডেভির ফারসি আখ্যানগুলির অনুবাদের অন্যতম লক্ষ্য হল পূর্ববর্তী সাম্রাজ্যের কাজকর্ম বোঝা এবং চোখে আঙ্গুল দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা কেন তারা শাসন করতে বিফল হল। হ্যালহেদের জেন্টু ল আর উইলকিনসের গীতা অনুবাদের সূত্রধরে ব্রাহ্মণদের নিয়ন্ত্রিত হিন্দু আইন এবং ধর্মর নিগড়ে ধাক্কা মারা হল।
এই পুস্তকগুলি প্রকাশ করে, শাস্ত্র হিসেবে কয়েক হাজার বছরের বিভিন্ন মতবাদের ভারতীয় জ্ঞানী, বুদ্ধিজীবি, শিক্ষক, পুজারী, আইনজ্ঞ, আধিকারিক, ব্যবসায়ী এবং ব্যাঙ্কারদের জ্ঞানচর্চার বিচরণ ক্ষেত্রে ব্রিটিশেরা অনুপ্রবেশ করল, এবং এই বিপুল মানুষজনকেও ভারত সাম্রাজ্য শাসনের অংশীদার করে নিল। এরা এবারে সাম্রাজ্যের দৈনন্দিন কাজকর্ম দেখা সাদা সাহেবদের কড়া নজরদারির অধীনে বাবু, করণিক, অনুবাদক, নজরদার, তহশিলদার, দেশমুখ, দারোগা এবং মামলতদারে পরিণত হল।
হাতে গোণা ব্রিটিশ আধিকারিকের এই বিপুল জ্ঞান নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টার উদ্দেশ্যই ছিল সাম্রাজ্য সংক্রান্ত নির্দেশিকা জারি করা এবং বিপুল পরিমানে বাড়তে থাকা তথ্যভাণ্ডারের তথ্য সংগ্রহ আর নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি নির্নয় করা। এই তথ্যগুলি তাদের অতীব প্রয়োজন ছিল যাতে তারা যতটা পারা যায় শস্তায় এবং কার্যকরভাবে রাজস্ব আদায় এবং শাসন শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারে; এবং এই তথ্যগুলি ভারতের সমাজের চরিত্র বিশ্লেষণ আর সমাজকে বিভক্ত করার কাজে আসে। ভারতীয় সমাজে সহায়ক অভিজাত খুঁজে পাওয়া জরুরি হয়ে গেল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শাসন প্রবাহ বজায় রাখার জন্যে। দেশজুড়ে রাজনৈতিক কৌশল ও কার্যপদ্ধতি নির্ণয় করে সংকলিত এবং সুগ্রন্থিত করে সফল দৌত্যে পরিবর্তন করা জরুরি হয়ে পড়ল, যাতে ক্ষমতাসীনদের অধীন করে ফেলা যায়। বিপুল বিশাল ভারতীয় সামাজিক বিশ্বকে ভেঙ্গেচুরে ইওরোপিয় শাসন সুবিধার্থে চরিত্রায়িত, শ্রেণীভুক্ত, এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হল। যে ভাষায় ভারতীয়রা কথা বলত এবং লেখাপড়া করত তাকে বদলে ফেলা হল। সাম্রাজ্যের শাসনের আওতার মধ্যে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন সামাজিক স্বার্থগোষ্ঠীর বিপুল বৈচিত্র স্বার্থের দিকে নজর রেখে তাদের নিজস্ব আলোচনার আজেন্ডা তৈরি করে দেওয়া হল। উনবিংশ শতকের ভারতের সামাজিক এবং রাজনৈতিক মানচিত্রে জ্ঞাননর্ভর আলোচনার বৈচিত্রকে প্রতিষ্ঠিত এবং বিধিসম্মত করে তোলা গেল।
আমি যে ভাবনাটা ভাবতে চাইছি, সেটা স্বাভাবিভাবে মাইকেল ফুকো প্রভাবিত। আমার কাজ হল তিনি ইতিহাস দেখার অঙ্গ হিসেবে যেভাবে কিছু প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন সেটিকে ধরে অগ্রসর হওয়া, যার অধিকাংশই ভারতের অতীত আলোচনার ছাত্রদের ভাবনায় খাপ খেয়ে যায়। ভারতীয় ইতিহাসের ছাত্রদের নিশ্চই মনে পড়বে, কিভাবে ১৭৭০ থেকে ১৮২০র সময়টিতে ভারতীয় ভাষাগুলি শিখন প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং এর জন্যে তাত্ত্বিক এবং জ্ঞানচার্চিক হাতিয়ারগুলি বিকশিত হয়। আমরা আলোচনা করব এই সময়ের দুটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাকেন্দ্র কলেজ অব ফোর্ট উইলিয়াম এবং ফোর্ট সেন্ট জর্জের কলেজটি।

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা১৫ - ঔপনিবেশিকতাবাদ এবং তার জ্ঞানচর্চার আঙ্গিক - সাম্রাজ্যের মন ও মান ।। বারনার্ড কোহন

অধ্যায়২
ভাষার আধিপত্য আর আধিপত্যের ভাষা
ব্রিটিশেরা যেভাবে ভারতে জীবনযাত্রা নির্বাহ করত, তাতে ভাষা শেখার একটা প্রতিবন্ধকতা তো ছিলই তার সঙ্গে যুক্ত হল ভারতীয় সংস্কৃতিতে যুক্ত না হওয়ার তাদের মানসিক বাধা। সপ্তদশ শতকের মাঝখান থেকে অষ্টদশ শতকের মধ্যিখানের সময় পর্যন্ত ভারতে কোম্পানির হাতে গোণা চুক্তিবদ্ধ আমলা ছিল। ১৭৪০ সালে ১৭০, ১৭৫৬য় পলাশীর আগের সময় পর্যন্ত ২২৪ জন। অধিকাংশ আমলাই বন্দর শহর আর উপকূলে মূলত তাদের কুঠির আশেপাশে বাস করত। তাদের যোগাযোগের ঘেরাটোপ ছিল মূলত ইওরোপিয় সমাজ। কোম্পানির ভারতীয় গৃহভৃত্য বা দপ্তরভৃত্যরা কিছু বাণিজ্য(পিজিন) ইংরেজি আর পর্তুগিজ জানত – যে দুটো আদতে উপকূলীয় বাণিজ্য ভাষা হিসেবে মান্য ছিল। অধিকাংশ ব্রিটিশ মনে করত যে তারা এই দুটি ভাষার সঙ্গে আর কিছু স্থানীয়, তাদের ভাষায় মুর ভাষা ব্যবহার করেই কাজ চালিয়ে নিতে পারবে। তাই ভাষা ভাল জানত না বলে অধিকাংশ কোম্পানি আমলা খুব কম দিনই ভারতে চাকরিতে থাকত – কোম্পানির নিয়মে খুব বেশি হলে পাঁচ বছর তারপরে ইংলন্ডে ফিরে যেত। কেউ অসুখে বা সেনা বাহিনীতে কাজ করতে গিয়ে মারা যেত। মূলত পর্তুগিজ এবং ভারতে জন্মানো ইওরোপিয়রাই ভারতীয় ভাষা জানত এবং বলতেও পারত। এদের অধিকাংশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিচের স্তরে কাজ করত এবং তার সঙ্গে ছোটখাট ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করত। কোম্পয়ানি কর্তারা এদের সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখত। কর্তারা মনে করত নিচুস্তরের কোম্পানি ভৃত্যরা খুব বেশি বিশ্বাসের পাত্র নয় এবং নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থ, কোম্পানির স্বার্থের কাছে জলাঞ্জলি দেবে না।
১৭১৩ সালে ভারতের আভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে শুল্ক কম করার জন্যে এবং তাদের ব্যবসার প্রথম সময় থেকে পাওয়া নানান ধরণের সুবিধে একসঙ্গে করে একটা স্থায়ী ফরমান পাওয়ার চেষ্টা করছিল, সে সময় বাংলায় এই দরকষাকষির কাজটি করার জন্য ফারসি ভাষা জানা কোন ব্যক্তিকে তারা জোগাড় করে উঠতে পারে নি। ফলে তাদের এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করতে আরমেনিয় বণিকের স্বারস্থ হতে হয়। দোভাষীকে নিয়ে নানান ঝামেলা ঝক্কির পরে ব্রিটিশ কুঠি এবং দৌত্যের প্রধান ব্যক্তি, জন সুরনাম ফারসি শিখে নেয়। তাদের দৌত্য সফল হয়, কিন্তু কলকাতায় ফিরেই সুরনাম মারা যান এবং ফারসির জ্ঞান তার সঙ্গে কবরে চলে যায়।
১৭৪০ এবং ৫০এর দশকে ক্রমান্বয়ে কোম্পানির অধিকাংশ আমলা কোন না কোন ভারতীয় ভাষা শিখে নেয় এবং উপকূল ছাড়িয়ে তারা ভারতের অভ্যন্তরেও কোম্পানির সেবা করতে থাকে এবং এই ভাষা শেখার জন্যে আরও বেশি দিন তাদের ভারতে থাকার মেয়াদ বাড়ে। সুরাটে ১৯ বছর ধরে কাজ করা জেমস ফ্রেজার ফারসি শিখে পারসিক সূত্রে প্রাপ্ত পারসিক এবং মুঘলদের চিঠি বিনিময়ের সূত্র ধরে নাদির শাহের দরবারের ইতিহাস লেখেন। তিনি একজন পারসিকের থেকে ফারসি শেখেন এবং ক্যাম্বের মুসলমান আইন সম্বন্ধে জ্ঞানীর থেকে তিনি পাঠও নেন।
সেই শতের মাঝখান থেকে অধিকাংশ ব্রিটিশ আধিকারিক তাদের লব্জে মুর বা ইন্দোস্তানি ভাষা আর ফারসি এবং অন্যান্য ভারতীয় অসভ্য(ভালগার) ভাষা শিখতে থাকে। ওয়ারেন হেস্টিংস কাশিমবাজারে ব্যবসায়িক এবং দৌত্যাদি করার সময় ফারসি আর মুর ভাষা শেখে। ব্ল্যাকহোল (কু)খ্যাত হলওয়েল যথেষ্ট বাংলা অর্থাৎ ইন্দোস্তানি জানত যার বলে সিরাজের কলকাতা আক্রমনের বছরে জমিদারি আদালতে বিচারকের চাকরি করত এবং হিন্দুস্তানি শাস্ত্র ইংরেজিতে অনুবাদ করে। উইলিয়াম ওয়াটস, হেনরি ভ্যান্সিস্টার্ট বা লুক স্ক্রাফটনের মত ইওরোপিয়রা এত ভাল দেশিয় ভাষা জানত যে তারা পলাশীর চক্রান্তে সামিল হয়ে উমিচাঁদের মত রাজনৈতিক দালালকে ঘোল খাইয়ে দিতে পেরেছিল। তবে পলাশীর মূল নায়ক ক্লাইভ কিন্তু পর্তুগিজ বাণিজ্য ভাষা ছাড়া বোধহয় অন্য কোন ভাষা জানতেন না। ফলে সে শাসকদের সঙ্গে দরকষাকষি আর অনুবাদকর্মে মূলত তার বানিয়ান নবকৃষ্ণের ওপরে পুরোটাই নির্ভর করত। পলাশী জয় এবং তারপরে রাজস্ব লুঠের কাজে জুড়ে থাকার ফলে প্রচুর আমলা নানান ধরণের ভারতীয় ভাষা শিখতে শুরু করে।

উপনিবেশবাদ বিরোধী চর্চা - কি পড়ব, কেন পড়ব - কি জানব কেন জানব

নীলকান্ত সোমাইয়াজীর তন্ত্রসংগ্রহ পড়া এবং উতফুল্ল হয়ে সেটি বন্ধু পাঠকদের জন্য তুলে দেওয়ার প্রেক্ষিতে গত বছর আমার এক পিতাসম দাদাস্থানীয় বাম-বন্ধু প্রশ্ন তুলেছেন আমি আদৌ বিদ্যালয়ে জ্যোতির্বিদ্যা পড়েছি কি না।
বামাচারী ব্যক্তিগত আক্রমণ সরিয়ে সরাসরি ঢুকে পড়াযাক নিজেদের সঙ্গে আলাপ আলোচনায়, যার মাধ্যমে আমরা যারা ভারতের প্রযুক্তির/জ্ঞানচর্চা বিজ্ঞানের ইতিহাস খুঁজতে কাজ করছি বলে দাবি করছি, তারা এই বইটি বা এই ধরণের বই কেন পড়ছি বা পড়া দরকার, বা এই কাজটি কেন করছি তার উত্তর খুঁজছি। বুঝতে পারছি এটাও একটা উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলনের অংশ। আসুন বামৈপনিবেশিক আক্রমণ গায়ে না মেখে ঢুকে পড়া যাক নিজেদের সঙ্গে বাক্যালাপে।
প্রথমদিকে আমি শব্দটি খুব বিব্রত করবে পাঠকদের - যেহেতু দলের হয়ে ব্যক্তি আমাকেই, আমার যোগ্যতা নিয়ে, ত্রিকোণমিতি, কলনবিদ্যা আমার খুব প্রিয় ছিল। যদিও আমি পড়াশোনায় মাঝারি গোছের ছাত্র ছিলাম।
কিন্তু আমরা মনে করি না কোন ব্যক্তিরর/দলের অধীত বিদ্যাচর্চা তার/তাঁদের পাঠ্যক্রমে না থাকলে সেই বিদ্যাচর্চার যোগ্যতা তার/তাঁদের থাকে না। এটা পশ্চিমকেন্দ্রিক ভাবনা - ভারতের মত বহু বৈচিত্রের দেশে পড়াশোনায়/জ্ঞানচর্চায় এ ধরণের শ্রেণী বিভাগ ছিল না কোনো দিনই। এ পোড়ার দেশে এ রকম হাজারো উদাহরণ রয়েছে পাণিনী থেকে জগদীশ্চন্দ্র - বেশি তথ্যের বোঝা বাড়াব না।
গত দুশ বছরে দেশিয়, বিজাতীয় বিশেষজ্ঞদের হাতে পড়ে দেশের ইতিহাসচর্চার কি হাল হয়েছে তা সর্বক্ষণ বিষ্ফারিত চোখে দেখছি।আমরা ভারতীয় প্রযুক্তি/বিজ্ঞান/অঙ্ক ইতিহাসের ছাত্র। পশ্চিমি বিজ্ঞানের ইতিহাসের বিশেষজ্ঞদের হাতে পড়ে ভারতীয় প্রযুক্তির আর বিজ্ঞানের ইতিহাসের অবস্থা কি হয়েছে তা হরবখত অনুভব করি - জ্যোতির্বিজ্ঞানী বিমান নাথ জানেনই না ভারতে আর্যভট্ট বলে কোন গণিতবদ ছিলেন না, ছিলেন আর্যভট, শুদ্র, সরকার পোষিত এক বিদ্যাচর্চা কেন্দ্রে তার মূর্তিতে পৈতে পরিয়ে দেওয়া হয়েছে। নার্লিকর সম্পাদিত দশম শ্রেণীর এনসিইআরটির অঙ্ক বইতে আলেকজান্দ্রিয়ার অঙ্কবিদদের ককেসাসিয়ান চেহারায় দেখানো হয়েছে। টেলর সিরিজের মত বহু প্রমান তার বহু আগে এদেশে উতপন্ন হলেও তাকে আজও এদেশে পশ্চিমি নামে পড়ানো হয়, আর কোপার্নিকাস যে এশিয় জ্ঞান টুকলি করেছেন তা বলার যোগ্যতা আজও বহু জ্ঞানচর্চকের হয় নি।
আমরা জানি, ভারতীয় বিজ্ঞানের ইতিহাস আমাদের মত দেশজ মানুষদের দিয়েই সাধন করতে হবে, তার আগে প্রয়োজন নিজেদের চোখে পরানো পশ্চিমিপ্রভূত্বমূলক চশমা খোলা, উপবিনেশবাদ থেকে উত্তরণ আর নিজের দেশ আর তার মানুষকে জানা, তাদের কথা শোনা, তাদের বিদ্যাচর্চা(বিধিবদ্ধ বিদ্যালয়ীও নাও হতে পারে) সম্বন্ধে অবহিত হওয়া।
জ্ঞানচর্চকদের নানান স্থানে বিশেষ করে পশ্চিমের স্বার্থে টিকি বাঁধার কারণে সে কাজ খুব বেশি হয় নি। কেউ কেউ করছেন সাহস করে, তাঁদের জ্ঞানচর্চায় এক ঘরে করে দেওয়া হয়েছে। চন্দ্রকান্ত রাজু ভারতীয় অঙ্ক, বিজ্ঞানের ইতিহাস চর্চায় উপনিবেশবাদের ওপর আঘাত হানায় তাকে ভারত ছেড়ে মালেশিয়ায় পড়াতে চলে যেতে হয়েছে। ভারতে প্রোথিত পশ্চিমি উপনিবেশবাদের ওপর আঘাত হানার সম্ভাবনা কমে যাচ্ছে - জ্ঞানচর্চকেরা নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত - টিকি বাঁধা পশ্চিমি প্রভুত্ববাদে।
আমাদের সুবিধে, আমাদের বাঁধা গত নেই।
আমাদের কোন পিছুটান নেই।
আমাদের রাস্তা তৈরি করি আমরাই।
কোন তাত্ত্বিকতায় বাঁধা নই। ফলে বহু মানুষ রুষ্ট হবেন।
আমরা নাচার।
শুধু জানি এ কাজ আমাদের-আর ঔপনিবেশিকতা বিরোধী বন্ধুদেরই করতে হবে।ঔপনিবেশিক ভিমরুল দাদাদের মনের গহন রন্ধ্রপথের চাকে ঘা পড়লে কিছু কামড় খেতে হয় তাও জানি।

বাংলার চিকিতসাবিদ্যার ইতিহাস চর্চা - নাথ কবিরাজ

আয়ুর্বেদ, য়ুনানি চিকিৎসার বাইরে গ্রামীন চিকিৎসা নিয়ে সংঘের নারায়ণ মাহাত গবেষণা করছেন।
কিন্তু বাংলার আয়ুর্বেদ বা য়ুনানির ইতিহাস নিয়ে খুব বেশি কাজ হয় নি।
বিডন স্ট্রিটে যে আয়ুর্বেদিক কলেজ আছে, যতদূর সম্ভব কবিরাজ গণনাথ সেনের পরিবারের(তাঁরা ভগভট্ট সঙ্কলিত, রসরত্নসমুচ্চয়ঃ অনুবাদ ও প্রকাশ করেন) - এখন রাজ্য সরকারের তত্ত্বাবধানে, এখানকার এক অধ্যাপক বছর দেড়েক আগে বলছিলেন কলেজের উল্টো দিকের বাড়িটি ভাঙ্গার আগে বসন্ত ঔষধালয় ছিল তা তিনি দেখেছেন। তার ধারণা ছিল সেটি বসন্ত নামে কোন ব্যক্তির। একদিন অকারণ কৌতুহলে, দোকানের ইতিহাস জানতে প্রশ্ন করেছিলেন বসন্ত কে ছিলেন? দোকানি উত্তর দিয়েছিল, তার পূর্বপুরুষ বসন্তের টিকা দিতেন, তাই দোকানের নাম বসন্ত ঔষধালয়। সেই টিকা দেওয়ার নথি করণের ইতিহাস কম করে ৩০০ বছরের পুরোনো। দোকানটা খুব কম করে ১৫০-২০০ বছরের।
এই সব ইতিহাস হেলায় হারিয়ে যাচ্ছে। পুরোনো আয়ুর্বেদ বৈদ্যদের পরিবারগুলিকে নিয়ে একটা গবেষণা করা দরকার। আর খোঁজা দরকার নাথ, দেব, দেবনাথ উপাধিধারী পরিবারের পুরোনো মানুষদের - এঁরা নাথ পরম্পরার মানুষ। ভবানীপুরের পদ্মপুকর রোডের খালসা বিদ্যালয়ের কাছের একটা গলিতে প্রচুর নাথ পরিবার বাস করেন। এই বৈদ্যদের পরিবারে সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলার স্বাস্থ্যের আর চিকিতসাবিদ্যার ইতিহাস।
দেবনাথ, নাথ, দেব, দে, সেন, গুপ্ত পদবীর মানুষদের কি মনে পড়ে তাদের পূর্বজরা চিকিৎসক ছিলেন? প্রাচীন ভারত ভ্রমণকারীদের লেখায় পাওয়া যাচ্ছে নাথ চিকিৎসকেরা সোরা আর গন্ধক নির্দিষ্ট অনুপানে মিশিয়ে খেয়ে দীর্ঘজীবন লাভ করতেন। দীপঙ্করদা বলছিলেন তাঁর পূর্বজ চিকিৎসক ছিলেন।
এলোপ্যাথির আগে বাংলার চিকিতসাবিদ্যার ইতিহাস লেখা হয় নি। যদি এই পরিবারের মানুষেরা এগিয়ে আসেন পারিবারিক ইতিহাসের ঝাঁকি নিয়ে।



জয় বাংলা!

Tuesday, March 27, 2018

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা১৪ - ঔপনিবেশিকতাবাদ এবং তার জ্ঞানচর্চার আঙ্গিক - সাম্রাজ্যের মন ও মান ।। বারনার্ড কোহন

অধ্যায়২
ভাষার আধিপত্য আর আধিপত্যের ভাষা
ব্যক্তি, গোষ্ঠী, দেশ(কাওয়াম) এবং শাসক এবং শাসিতের মধ্যে যে সম্পর্ক, তা ইওরোপ এবং ভারতে ভিন্ন রূপী ছিল। সপ্তদশ শতকের ভারতে তারা মনে করত এদেশের সব কিছু এবং প্রত্যেক মানুষকে দাম দিয়ে কেনা যায়। উপহার/উপঢৌকন/খেলাত ইত্যাদির মাধ্যমে যে সম্পর্ক তৈরি হয়, সেগুলিকে নির্দিষ্ট মূল্যে মাপ ও দাম ধার্য করা যায় বলেও তারা মনে করত। যেমন তারা যে কাপড় কেনাবেচা করত, সেটি ব্যবহার্য্য বস্তু হিসেবেই চিহ্নিত হত এবং ইওরোপিয় নীতি অনুযায়ী সেটির দাম বাজারেই নির্ধারিত হত। তারা বুঝতে চেষ্টা করে নি, কিছু ধরণের কাপড়, গয়না, অস্ত্রশস্ত্র এবং পশুপাখির বাজার নির্ধারিত দামে কেনা যায় না, বরং তার চরিত্র নির্ভর ক’রে, ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা কোন ব্যক্তি বা সামাজিক সম্পর্ক সেই বস্তুটির ওপর কিভাবে আক্ষরিকভাবে কৃষ্টিগত চরিত্র আরোপ করছে এবং সেই ধারনাটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে প্রবাহিত হচ্ছে।
হিন্দু এবং মুসলমান উভয়েই বস্তু এবং ব্যক্তিত্বের অনির্দিষ্ট মৌলিক তত্ত্বের ওপরে নির্ভরশীল। শাসকের দেহটাই তার শাসন, যেটি বিভিন্ন রূপে শাসিতের দিকে প্রবাহিত/ধাবিত হয়, ইওরোপিয়রা এগুলিকে শুধুই জাগতিক বস্তু হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কাপড়, শস্ত্র, গয়না বা কাগজের মাধ্যমে শাসক তার পছন্দের প্রার্থীকে তার শাসন ক্ষমতার গুরুভারের একাংশ অর্পণ করে। ক্ষমতাধরের নজরে বা সামনে থাকা, বা তার অন্ন গ্রহণ করা বা তার শব্দ শ্রুত হওয়াই সেই ব্যক্তিকে প্রভাবিত করে।

ইংরেজি ভাষায় ব্রিটিশেরা কোন একটি শব্দের, শব্দবন্ধের অথবা বস্তু অনুবাদ করতে গিয়ে, ‘স্বাভাবিক/প্রাকৃতিক(ন্যাচুর‍্যাল’) বিশ্বের কাছাকাছির কোন বস্তুকে চিহ্নিত করে সেগুলির প্রতিশব্দ হিসেবে ভেবে নেয়। ভারতীয়দের কাছে এইভাবে কোন শব্দের মানে তৈরি হয় না। যজ্ঞে উচ্চারিত সংস্কৃত শ্লোকের মানে আর সেগুলি শোনার মানের পার্থক্য ইওরোপিয়দের কাছে ধরা দেবে না, শব্দব্রহ্মের এবং তার সাহিত্যিক শক্তির প্রভাব তারা জানেও না, বোঝেও না। যখন কোন মুঘল শাসক নির্দিষ্ট পরওয়ানা বা ফরমান জারি করেন, সেটা যেমন একটি নির্দেশের থেকে অনেক বেশি, এটি প্রাপককের ক্ষমতায়নের(এন্টাইটলইমেন্ট) থেকেও অনেক বেশি। এটি নথির দেহে লিখিত শব্দের অর্থের থেকে অনেক বেশি জোর বহন করে, যা ব্রিটিশদের চোখে অধিকার অথবা চুক্তিমাত্র। ফলে একটি চুক্তি, চিঠি ইত্যাদি নথি হাতে পেয়ে তারা সেটির অবলীলাক্রমে শাব্দিক অনুবাদ করিয়ে নিত এবং সেই অর্থগুলি বাস্তবিক অর্থেই প্রয়োগ করত। নথিটির কাগজের চরিত্র, লিখন ভঙ্গিমা, অক্ষরের ছাঁদ, লব্জগুলির বিবরণাদি, ব্যকরণ, পাঞ্জার ছাপের চরিত্র, লেখকের স্তর, প্রাপকের হাতে পৌঁছনোর মাধ্যম, বাহক – ইত্যাদির প্রত্যেকটার নির্দিষ্ট মানে ছিল। 

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা১৩ - ঔপনিবেশিকতাবাদ এবং তার জ্ঞানচর্চার আঙ্গিক - সাম্রাজ্যের মন ও মান ।। বারনার্ড কোহন

অধ্যায়২
ভাষার আধিপত্য আর আধিপত্যের ভাষা
কোম্পানি ভারতে ব্যবসা কর্ম শুরু করার সময় থেকেই ব্রিটিশেরা ভারতীয় শাসক মূলত মুঘলদের থেকে আইনি বৈধতা এবং নিরাপত্তা দাবি করেছে। এই লক্ষ্যে ১৬১৫ সালে টমাস রো কোম্পানি আর প্রথম জেমসের প্রতিনিধি হয়ে মুঘল দরবারে আসেন মূলত ব্যবসা করার অধিকার চাইতে এবং দুই রাজকীয় শক্তির মধ্যে দীর্ঘকালীন শান্তি এবং ভালবাসা বজায় রাখার বার্তা নিয়ে। রো ভারতের রাজনৈতিক বিশ্ব পা দিয়ে ভারতকে বোঝার চেষ্টা করলেন ইওরোপের মত করেই; বুঝলেন তাঁকে এই বিরুদ্ধ সভ্যতায় মানিয়ে নিতে হবে এবং মাথা নিচু করা আর ঘুষঘাস দেওয়া ছাড়া তার লক্ষ্য পূরণ হবে না। রো, রাজসভার ভাষা ফারসি জানতেন না, এবং কাউকে বিশ্বাস করে দেশ থেকে সম্রাট জাহাঙ্গীরকে সম্বোধন করে আনা প্রথম জেমসের চিঠি অনুবাদ করানো যায় এমন কাউকেই পেলেন না। রো তার চাকরিদাতাকে অনুযোগ করে লিখলেন, আমি আরও একটা সমস্যায় পড়েছি, আমারও কোন দোভাষী নেই। এখানে দালালেরা আমার আনা চিঠিগুলো বদলে দিতে পারে বলে আশংকা করছি কারণ আমার সম্রাটের নাম মুঘল সম্রাটের নামের আগে লেখা হয়েছে, এবং আমি এই পরিবর্তন ঘটানো এটা সহ্য করব না।
ভারতে থাকার সময় রো নানান ধরণের দোভাষী নিয়োগ করেছিলেন। জাহাঙ্গীরের রাজসভা থেকে একজন গ্রিক, একজন আরমেনিয়, একজন নাকউঁচু ব্রিটিশ এবং এক সময় একজন ইতালিয় যিনি ফারসি নয় তুর্কিটা জানতেন এমন নানান দোভাষী ব্যভার করেছেন। ক্যারিবিয় অঞ্চলে থাকার সময় যে স্পানিশ শিখেছিলেন সেই ভাষায় তার শেষ দোভাষীর সঙ্গে কাজ চালানোর চেষ্টা করেছেন। ইতালিয় দোভাষীটি দরবারে তুর্কি আর ফারসি ভাষা জানা এক আমলার সাহায্যে রো’র ভাষ্য অনুবাদ করিয়ে নিতেন।
সপ্তদশ শতে ব্রিটিশেরা বুঝতে পারল, যদি মুঘল দরবারে তাদের কাজ করিয়ে নিতে হয়, তাহলে তাদের ফারসিটা শিখতেই হবে। ফারসিকে তারা কাজের ভাষা হিসেবে দেখে যা ব্যবহার করে তারা ভারতীয় আমলাদের সঙ্গে আলাপআলোচনা, অনুরোধউপরোধ, অক্ষমতা প্রকাশ ইত্যাদি করে তাদের উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারে। ফারসি জানা খুব উচ্চদরের জ্ঞানচর্চা, বিশেষ করে কাগজ নির্ভর মুঘল দরবারে যেখানে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের জন্য নানান ধরণের আঙ্গিকে অনুরোধের বয়ান লিখতে হত। ফারসি, ভাষা হিসেবে, বৃহত্তর মানে ব্যবস্থাপনার(লার্জার সিস্টেম অব মিনিং) অংশ, যার ভিত্তি নির্দিষ্ট সংস্কৃতির ধারণা ভিত্তিক ক্রিয়া। ভারতীয়রা যে আঙ্গিকে এবং শব্দের মানে ধরে ফারসিকে প্রয়োগ করত, ব্রিটিশ ইংরেজি সেই ভিত্তর থেকে শতযোজন দূরে অবস্থিত ছিল।
সপ্তদশ শতকে ইওরোপিয়রা মূলত স্বাক্ষর আর চিঠিচাপাটির ওপর নির্ভর করত, সেখানে ভারতীয়দের অবলম্বন ছিল ফলিতার্থ(সাবস্ট্যান্স)। রো’কে যে দরবারি প্রথায় প্রবেশ করতে হয়েছিল, তাকে তিনি অপকৃষ্টতা বলছেন, তিনি সেখানে স্বাভাবিকভাবে জুড়তে পারছেন না, যেখানে তিনি শাসকের বন্ধু হতে পারতেন।

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা১২ - ঔপনিবেশিকতাবাদ এবং তার জ্ঞানচর্চার আঙ্গিক - সাম্রাজ্যের মন ও মান বারনার্ড কোহন

অধ্যায়২
ভাষার আধিপত্য আর আধিপত্যের ভাষা
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যে সব নথিপত্র তৈরি করেছে যেমন দ্য লেটার্স রিসিভড ফ্রম ইটস সার্ভ্যান্টস ইন দ্য ইস্ট বা দ্য ফোর্ট উইলিয়াম-ইন্ডিয়া হৌস করেসপন্ডেন্স এবং ভারতের মহাফেজখানাগুলো যেমন ন্যাশনাল আর্কাইভস অব ইন্ডিয়া বা ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে যে সব তথ্যনির্ভর পাণ্ডুলিপি রয়েছে, সেগুলি নির্ভর করে সাধারণত ঐতিহাসিকেরা ভারতে ব্রিটিশ আধিপত্য এবং উপনিবেশিক তত্ত্ব আর সংগঠনগুলির স্থাপন আর বেড়ে ওঠার গল্প লেখেন। মহাফেজখানাগুলোতে যে সব নথি রক্ষিত আছে, সেটি কয়েকশ বছর ধরে বিপুল সংখ্যক কোম্পানি আমলার পরিশ্রমে(কোহন ব্যবহার করেছেন ট্রিবিউট শব্দটি) গড়ে উঠেছে। ওয়েবস্টার কলেজিয়েট ডিক্সনারি(১৯৪৮)তে ট্রিবিউটের অন্য একটা মানে করেছে, ‘আ পেমেন্ট পেইড বাই ওয়ান রুলার অর নেশন টু এনাদার, আয়দার এজ এন একনলেজমেন্ট অব সাবমিশন, অর অব দ্য প্রাইস অব প্রোটেকশন’।
এই প্রবন্ধে আমি বলব ছাপা অক্ষরে যে ট্রিবিউট তৈরি হয়েছে, তা আদতে ভারতীয়দের তৈরি এক জটিল এবং বিষম জ্ঞানচর্চা ভাণ্ডার, যেটি ইওরোপিয়রা নথিকৃত, সংহত এবং প্রচার করে। ভারতাধিকার আদতে উপমহাদেশিয় জ্ঞানের ওপর অধিকার। এই বিস্তৃত সরকারি সূত্র ধরে আমরা দেখব জ্ঞানের পরিবর্তিত রূপটি কি দাঁড়াল। একই সঙ্গে এটাও দেখব কিভাবে দখলদারেরা তাদের উদ্দেশ্যপূরণে কোন জ্ঞান ব্যবহারযোগ্য (ইউজফুল) সেটা দেগে দিল। সপ্তদশ এবং অষ্টদশ শতে কোম্পানির মূল ভাবনা ছিল সওদাগরি বাণিজ্য, যেখানে আমরা পণ্যের তালিকা, দাম, বাণিজ্য পথ বিষয়ে তথ্য, উপকূলীয় এবং আভ্যন্তরীণ বাজার আর মুঘল সাম্রাজ্য সম্পর্কে রাজনৈতিক নানান তথ্য বিশেষ করে কোম্পানির কাজকর্মের সঙ্গে সংযুক্ত থাকা মোঘল সাম্রাজ্যের স্থানীয় প্রশাসনের আমলাদের কাজকর্ম ইত্যাদি। এই পাণ্ডুলিপিতে আবদ্ধ নানান তথ্যের মধ্যে ছড়িয়ে আছে কোম্পানিতে কর্মরত বা তার সঙ্গে যুক্ত ভারতীয়র নাম ধাম যাদের জ্ঞান আর তথ্য, যা অবলম্বন করে এদেশে তারা বাণিজ্য কর্ম সাধন করতেন।
এই আমলাদের ব্রিটিশিয় লব্জে নামগুলির মধ্যে কয়েকটি হল আখুন্দ, বানিয়ান, দালাল, দুবাশি, গোমস্তা, পণ্ডিত, স্রফ এবং উকিল(ভকিল)। কোম্পানির আঞ্চলিক কুঠির অবস্থান অবলম্বন করে এই উপাধিগুলি হয়ত পরিবর্তিত হত, কিন্তু এই উপাধিধারী ভারতীয়রা আদতে বিশেষ জ্ঞানে জ্ঞানী ছিলেন, কেউ বাজারের দামে বিশেষজ্ঞ, কেউ মুদ্রার মূল্যমান বিষয়ে বিশেষজ্ঞ, বিশেষ ধরণের পণ্যের উতপাদনস্থল বিষয়ে জ্ঞানী, কেউ বা বাজারের আঞ্চলিতা বিষয়ে জ্ঞানী, বিভিন্ন প্রবাহশীল বাণিজ্য পণ্যের বাণিজ্য শৃঙ্খল বিষয়ে জ্ঞানী, কেউ কেউ সাম্রাজ্যের স্থানীয় প্রশাসনে বিশেষজ্ঞ, কেউ কেউ দৌত্য বা সামগ্রিক রাজনীতি বিষয়ে বিশেষ জ্ঞানী, কেউবা শাসকদের চরিত্রসম্বন্ধে নিখুঁত ধারণা পেশ করতেন – এই সকল ধরণের মানুষের সফল কাজের ওপর ব্রিটিশদের বাণিজ্য নিরাপত্তা নির্ভর করত। এই জ্ঞানীরা বহুবোলি ছিলেন, বিভিন্নস্তরে কাজ করা দেশি বিদেশি মানুষের বাণিজ্যের জন্যে তৈরি উপযুক্ত ভাষা বলতে পারতেন।
করমণ্ডল উপকূলের দুবাসি তাদের উপাধি অনুযায়ী কাজ করতেন, যার অর্থ দ্বিভাষী – দুটি ভাষা জানতেন। বাংলায় আখুন্দ উপাধিধারীদের সম্বন্ধে বলা হয়েছে মুসলমান বিদ্যালয় শিক্ষক যাদের কাজ ছিল ফারসি ভাষায় লিঠি লেখা এবং সেই ভাষায় আসা চিঠির মর্মোদ্ধার। আখুন্দেরা বিভিন্ন দৌত্যের কাজে নিযুক্ত হতেন এবং মুঘল দরবারে বিভিন্ন স্তরের আমলাকে চিঠি দেওয়ার কাজ করতেন। আখুন্দদের মতই উকিল বা ভকিলেরাও ভারতীয় ব্রিটিশপূর্ব প্রশাসনের সঙ্গে দরাদরি করতেন। তারা শুধু্ ফারসি ভাষা সম্বন্ধে জ্ঞানী ছিলেন তাই নয় দরবারি নানান প্রথা এবং ব্যক্তিত্বদের সম্বন্ধেও সম্যক পরিচিত ছিলেন। তারা মুঘল সাম্রাজ্যের সঙ্গে কোম্পানির নানান আইনি এবং ব্যবসায়িক দরকষাকষি নিয়ে আমলাদের পথ দেখাতেন।

১৬৭০এর দশকের সুরাটে শিবাজীর সঙ্গে কোম্পানি বিভিন্ন স্তরে আলাপআলোচনা করছিল। বিষয় ছিল কোম্পানির রাজাপুরের মত কয়েকটি কুঠিতে শিবাজীর সেনার আক্রমনের ক্ষতিপূরণ বিষয়ক দাবি আর শিবাজীর অধিকারে থাকা এলাকায় বাণিজ্যাধিকার অর্জন। এই সময়ে বেশ কিছু ভারতীয় বিশেষ করে পর্তুগিজ কেরানী রামা সেনাভি এবং কোম্পানির ভাষাবিদ নারায়ণ সেনাভি নামে দুই ভাই, কোম্পানির এই দাবির সপক্ষে সফলভাবে শিবাজীর সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে কোম্পানির দাবি আদায় করে। 

Monday, March 26, 2018

ভাবনার ঈশ্বর - শ্যামল গাঙ্গুলি২

"চাষি ফকিরচাঁদ ডুবন্ত সূর্যের দিকে মুখ করে তিন দিনের অঙ্কুরিত ধানবীজ হাতের বিশেষ প্রক্রিয়ায় পাঁক - মাটিতে ছুঁড়ে দিচ্ছিল। সেগুলিই পরে ধানচারা হয়ে দাঁড়াবে।
বললাম - এ রকম শিখলি কোত্থেকে, ফকিরদা? 
 -ছোট ঠাকুদ্দার কাছ থেকে - 
আমি সেই বিকেলে পরিষ্কার দেখতে পেলাম - আমাদের বীজতলার খানিক দূরে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ফকিরচাঁদের ছোটঠাকুদ্দা,তস্য ছোটঠাকুদ্দা, তস্য ছোটঠাকুদ্দা। এরই নাম বোধ হয় সভ্যতা। "

ভাবনার ঈশ্বর - শ্যামল গাঙ্গুলি১।

আমার খুব পছন্দের লেখক নয়... তবুও...।
'...এপ্রিল মাস। ফলন্ত বোরো ধান জলের অভাবে চুয়ে যাবে। পাম্পসেট খারাপ হয়ে গেছে। এক রিকশায় চড়িয়ে সারাতে নিয়ে গেলাম। সারিয়ে ফিরতে বেলা তিনটে। রিকশাওয়ালাকে এতক্ষণ আটকে রাখার জন্যে অতিরিক্ত পয়সা দিতে গেলাম,নিল না।অবাক কান্ড। লোকটির সঙ্গে পরিচয় হল। লোকটিকে টাকা দিয়ে কয়েকখানি রিকশা বানিয়ে দেবার প্রস্তাব দিলাম। প্রত‍্যাখ‍্যান করল। বলল, বানাতে জানি। অনেক ছিল। থাকলেই ঝামেলা। এই বেশ আছি। স্টেশন-প্লাটফর্মে থাকি। কলের জল খাই। ভগবানের কথা ভাবি। মাঝে মাঝে রিকশা চালিয়ে ভগবান দেখতে বেরোই।
ভাবতে অবাক লাগল। একটা লোক ভগবান দেখতে প‍্যাডেল করে রিকশা নিয়ে উত্তরে যায়, দক্ষিণে যায়।
গল্প লিখলাম : চন্দনেশ্বরের মাচান তলা।'

সমাজকর্মী কারা?

সমাজকর্মী আদতে একটি ইওরোপিয় ঔপনিবেশিক শব্দবন্ধ, যেখানে ভদ্রবিত্ত নিজেকে সমাজকর্মী আখ্যা দিয়ে 'পিছিয়ে পড়া' সমাজের বাইরের উঁচু মঞ্চে দাঁড় করিয়ে রেখে নিচে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের 'ভাল'র জন্যে কাজ করার কথা ভাবে - দুরকম করে
 ক) নিজের সিদ্ধান্তকে সরাসরি চাপিয়ে দিয়ে
খ) অথবা সমাজে যারা বঞ্চিত ভাবছে, যারা পুঁজির তৈরি উতপাদন ব্যবস্থায় যুক্ত হতে না পেরে মানসিক যন্ত্রণা বোধ করছে, কৌশলে নিজের সিদ্ধান্তকে নানান কর্পোরেট পদ্ধতিতে আলোচনার মাধ্যমে তাদের ওপর নাচাপানোর আছিলায় সেই সিদ্ধান্তটিই নিতে বাধ্য করে।
দুটি পদ্ধতির শেষ লক্ষ্য হল নানান আছিলায় তথাকথিত পিছিয়ে পড়া সমাজের এক গুচ্ছ গরীব দেগে দেওয়া, অশিক্ষিত দেগে দেওয়া, অকম্মা দেগে দেওয়া, অজ্ঞানী দেগে দেওয়া মানুষকে শিরদাঁড়া বেঁকিয়ে কর্পোরেটিয় গণতন্ত্রিক কেন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণযুক্ত বড় পুঁজি নির্ভর উতপাদন প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা।

Friday, March 23, 2018

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা১১ - ঔপনিবেশিকতাবাদের জ্ঞানচর্চার আঙ্গিক - সাম্রাজ্যের মন ও মান ।। বারনার্ড কোহন

উপনিবেশউত্তর পর্বে তদন্ত পদ্ধতি
অবশ্যই সমাজবিজ্ঞান শিক্ষণ ও চর্চা তার সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রকেও সাহায্য করেছে। সমাজ বিশ্লেষণের মনসমীক্ষণিক বিদ্যা যুদ্ধের সময় দারুণ চলেছিল। উদাহরণস্বরূপ কারেন হর্নি এবং এরিখ ফ্রম জার্মানদের অবস্থা বিশ্লেষণে মন দিয়েছিলেন সামাজিক রোগবিদ্যা(সোসাল প্যাথলজি) চর্চাবিদ্যা অবলম্বন করে। জাতীয় চরিত্র বিদ্যার স্রষ্টা প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ মার্গারেট মিড এবং রুথ বেনেডিক্ট দ্য ক্রিসেন্থিমাম এন্ড দ্য সোর্ড লিখে আমেরিকার জাপান সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গীকে যথেষ্ট প্রভাবিত করেন। ঐতিহাসিকেরা তাদের দক্ষতাকে শানিয়ে বিপুল বিশাল সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং সরাসরি সামরিক প্রকল্পগুলিতে তাত্বিক কাজ পান। অনেকেই ওএসএস-এ(অফিসার ইন স্ট্রাটেজিক সার্ভিসেসে) জুড়ে ছিলেন। নতুন বিজিত, বা সদ্যস্বাধীন দেশে কাজের জন্যে ভাষাবিদদের কাজে লাগানো হয়। এই কাজে তারা আমলাদের আপাত অখ্যাত অজানা ভাষা শিক্ষা দেন। প্রথম যুগের ফরাসি এবং জার্মান ভাষাবিদেরা অন্যান্য ভাষায় অনুপ্রবেশ করেছেন।
যুদ্ধের পরে নানান বিশ্বজ্ঞানচর্চা কেন্দ্রে যে সব আমেরিকিয় গবেষক শিক্ষক ঢুকে কি করলেন? যুদ্ধের নানান আঙ্গিকের সঙ্গে জুড়ে থাকা বেশ কিছু গবেষক-শিক্ষক তাঁদের নানান ধরণের ক্ষেত্রঅভিজ্ঞতা, অন্যান্য সমাজ এবং তাদের বলা ভাষার প্রত্যক্ষ দক্ষতা সম্বল করে আবির্ভূত হলে বিশ্ব ক্ষেত্রে। এইভাবে আমেরিকিয় শিক্ষা ক্ষেত্রে শুরু হল এরেনা স্টাডি প্রোগ্রামগুলি। এরেনা স্টাডি প্রোগ্রাম হল যুদ্ধের অভিজ্ঞতার প্রাপ্ত অসম্পূর্ণ তথ্যাবলী সম্বল করে যুদ্ধ যেভাবে এগোতে থাকে তার দিকে লক্ষ্যে রেখে এবং সেখান থেকে যে সব ভাঙ্গাচোরা জ্ঞান ঝরে পড়তে থাকে, তাকে অবলম্বন করে ব্যবস্থা(সিস্টেম) তৈরি করা। নানান কারণে ক্ষেত্রে না যেতে পেরে সমাজ বিজ্ঞানী আর নীতি প্রণয়কেরা যখন সেই ক্ষেত্রের সমীক্ষা করতে পারেন না, তখন আন্তর্বিষয়ক জ্ঞানচার্চিক মিলন ঘটিয়ে অথবা তাদের পূর্বজদের করা অন্যান্য তদন্তমূলক পদ্ধতি অবলম্বন করেঅবস্থা বিশ্লেষণ করেন।
যুদ্ধ পরবর্তীকালের সামাজিক বিজ্ঞান চর্চা, বিশেষ করে রাষ্ট্রবিজ্ঞান, বিবর্তনবাদী দৃষ্টিকোণ অবলম্বন করল। উন্নয়নের রাজনীতিতে এটা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হল, যা আগামী দিনে আমেরিকার বিদেশনীতির অঙ্গ হয়ে উঠবে ওয়াল্ট রস্টো, ড্যানিয়েল লের্নার ইত্যাদির তাত্ত্বিকতায়। নৃতত্ত্বে জুলিয়ান স্টুয়ার্ডের সম্পাদনায় কন্টেমপোরারি চেঞ্জ ইন ট্রাডিশনাল সোসাইটিজ বইটিতে এই তত্ত্ব মূর্ত হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন ক্রস-কালচারাল প্রেক্ষিত ‘আধুনিকীকরণের সমস্যা’ নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত থাকে - টু ডেভেলাপ আন্ড টেস্ট আ সিস্টেমেটিক আপ্রোচ তু দ্য প্রবলেমস অব মডার্নিটি। বিশ্বমানচিত্রে সদ্যস্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশগুলি আধুনিকতার তাত্ত্বিক প্রেক্ষিতটা বুঝতে চাইল, যারা পশ্চিমি উন্নয়নের ধারনা থেকে আলাদা করে নিয়ে নিজেদের মত করে বিকাশ ঘটাতে উন্মুখ। পদ্ধতিগতভাবে বিশ্বের নানান দেশের বিভিন্ন ক্রস-কালচারাল গবেষণা প্রকল্প তৈরি হল ক্ষেত্রসমীক্ষা নির্ভর বিভিন্ন প্রকল্পে। হিরিফ প্রকল্পের জ্ঞানচর্চার সূত্রগুলি থেকে সরাসরি জাত এই গবেষণা প্রকল্পগুলির লক্ষ্য হল, আ পসিবল ট্যাক্সনমি অব কন্টেমপোরারি সসাইটিজ[থ্রু] দ্য প্রসেস অব সোসাল চেঞ্জ... ইন এন এফোর্ট টু আন্ডারস্টান্ড ক্রসকালচারাল ডিফারেন্সেস এন্ড সিমিলারিটিজ। এই গবেষনাগুলির গুরুত্বপূর্ণতম দিকটি হল, সমাজ যখন পরম্পরা থেকে আধুনিকতার দিকে যায়, তখন তার কাজ হল সেই সামাজিক বক্রপথটিকে খুঁজে বার করা।
স্থিতিশীলতার(স্ট্যাসিস) পরিবেশ ধরে নেওয়া হল, এবং বলা হল ইতিহাস আর ঔপনিবেশিক পদ্ধতিটি থেকে সমাজ চ্ছিন্ন হয়েছে। এটি সরাসরি বির্তনীয় মতবাদ যার একটা অংশ ডুরখামানিয় তত্ত্বে সামাজিক অনোমি ছায়ায় থাকা। এই কৃষ্টিগত বিশ্লেষণের কেন্দ্রবিন্দুটি বিশ্লেষিত হল তাত্ত্বিক লব্জে এবং নানান আমেরিকিয় শক্তিশালী তাত্ত্বিকদের যে ভয়, সমাজতাকি সত্যিই পরম্পরা থেকে আধুনিকতার দিকে যাত্রা করছে সেটাকে মাথায় রেখেই।

Thursday, March 22, 2018

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা১০ - ঔপনিবেশিকতাবাদের জ্ঞানচর্চার আঙ্গিক - সাম্রাজ্যের মন ও মান ।। বারনার্ড কোহন

উপনিবেশউত্তর পর্বে তদন্ত পদ্ধতি
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে যুগান্তকারী ঘটনায় আমেরিকা বিশ্বক্ষমতাধর শক্তি হিসেবে উঠে এল। সেই অবস্থায় বিশ্বরাজনীতি এবং নানান জ্ঞানচর্চায় আমেরিকার অবস্থান বুঝতে এবং আমেরিকার খোলামেলা সাম্রাজ্যবাদিতাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে আমেরিকিয় রাজনীতিকদের সঙ্গে শিক্ষাসমাজ(একাদেমিয়া)ও সক্রিয় হয়ে উঠল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত নানান সমাজ বিজ্ঞান গবেষণা, বিশেষ করে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে এই সংক্রান্ত অন্তর্বিষয়িক প্রকল্পটির নাম হল ইন্সটিটিউট অব হিউম্যান রিলেশনস। ইন্সটিটিউট একই সঙ্গেও সমাজতাত্ত্বিক, নৃতাত্ত্বিক, মনসমীক্ষক এবং মনস্তত্ত্ববিদদের যোগ করল এবং যে বৌদ্ধিক পরিবেশটি তৈরি হল, তার নাম হল পজিটিভিজম।
ইন্সটিটিউট অব হিউম্যান রিলেশনস কতগুলি গবেষণা প্রকল্প গ্রহণ করল। নৃতাত্ত্বিক দপ্তরের গবেষণায় শুরু হল গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হিউম্যান রিলেশনস এরিয়া ফাইলস(হিরিফ)। হিরিফ আগামী দিনের বিশ্ব কৃষ্টির বর্গীকরণ সূত্র নির্ণিত হল এবং যা নির্ভর করে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্বজুড়ে ক্রস-কালচারাল সমীক্ষা শুরু হল এবং তার উপসর্গ হিসেবে নেব্রাস্কা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্লেইনস ইন্ডিয়ান সার্ভে শুরু হয়। হিরিফএর অন্যতম উদ্দেশ্য হল, বিপুল ডেস্ক্রিভিটিভ লিটাচেরর নির্দিষ্ট এবং বিশ্লেষণী ঠাট(কাঠামো) নির্ধারণ করা – দ্য ‘ডেস্ক্রিভিটিভ ডেটা হুইচ নো আদার সোসাল সায়েন্সে ক্যান ইভন রিমোটলি কম্পেয়ার ইন কোয়ান্টিটি উইথ ইন ওয়েলথ অব এথনোগ্রাফিক ডিটেইল আভেলেবল’। হিরিফ হল ‘কোয়াপারেটিভ এন্টারপ্রাইজ অব ফিফটিন ইউনিভার্সিটিজ, অপারেটিং উইথ দ্য এইড অব ফাউন্ডেশন এন্ড গভর্নমেন্ট গ্রান্টস, ফর দ্য এসেম্বলি, ট্রান্সলেশন্স এন্ড ক্লাসিফিকেশন্স অব দ্য ডেস্ক্রিভিটিভ মেটিরিয়াল অব এন্থ্রোপলজি।’   
হিরিফএর প্রথমতম কম্মটি হল, কৃষ্টিগত একককে বর্ণনা করা(ডেলিনেটিং কালচারাল ইউনিটস)। কোন সামাজিক গোষ্ঠী কৃষ্টিগত একক হিসেবে স্বীকৃত হবে? বিশ্ব কৃষ্টি আদর্শ নমুনার যুক্তিটি হল, বৃহত্তর সামাজিক এককের মধ্যে থাকা ক্ষুদ্রতম একককে জৈবিক রূপক দিয়ে চিহ্নিত করা। ফলে কৃষ্টিগত ছোট দল হয়ে উঠল জীববিদ্যার অধিপ্রজাতি(সাবভ্যারাইটি)। কোন সমাজের কৃষ্টিগত ব্যবস্থাপনাকে বলা হল লোকাল কালচারাল ভ্যারিয়্যান্ট। ক্রস-কালচারাল ম্যাপিংএ জৈবিক বিবর্তনের লব্জগুলো জুড়ে দেওয়া হল – ‘ইন দ্য রিয়াম অব কালচার, দ্য ইকুইভ্যালেন্ট অব ইনব্রিডিং ইন ডিফিউশন এন্ড ব্যারিয়ার্স টু ডিফিউশন মে বি ইউজড টু সেপারেট কালচারাল স্পেসিস’। হিরিফের অন্তর্গত যুক্তি হল সামান্যিকরণ নির্ধারণ করা যাতে, ‘ডিস্ক্রিমিনেট বিটুইন সুপারফিসিয়াল এন্ড ফাণ্ডামেন্টাল ডিফারেন্সেস ইন ওয়েজ অব লাইফ। ইট ওয়াজ দেন নেসেসারি টু ডিফাইন এন্ড ক্লাসিফাই দ্যাট হুইচ ইজ কম্পারেবল ফ্রম অনে সোসাইটি টু এনাদার’।

হিরিফ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উদ্যমের গুরুত্বপুর্ণ অঙ্গ হয়ে উঠল। কর্তারা মনে করলেন ক্রস-কালচারাল জ্ঞান বিশ্বজোড়া সামরিক রণনীতি রূপায়নের গুরুত্বপুর্ন সহায়ক হয়ে উঠতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, আমেরিকিয় নৌসেনা, জাপানি নিয়ন্ত্রণ থেকে মাইক্রোনেসিয়া এবং মেলানেশিয়াকে মুক্ত করার উদ্যমে নিজেদের এই এলাকাগুলোর সরকারে যুক্ত হয় এবং ‘নেটিভ’ শ্রমিকদের দিয়ে বিমানপোতের কাজগুলি করায়। নৌসেনা আধিকারিক এবং নীতি নির্ধারকদের সামাজিক প্রথা এবং অভ্যাসগুলি তাড়াতাড়ি জেনে নেওয়ার কাজে হিরিফ সাহায্য করে। সামান্যিকরণিক নীতি নির্ভর একটি প্রত্যক্ষ্যবাদী সমাজ বিদ্যা(বিজ্ঞান) যা মানব সমাজকে জীববিদ্যার তত্ত্বের সঙ্গে তুলনা করার ওপরে নির্ভরশীল – এই প্রায়োগিক জ্ঞান তাত্ত্বিক সংস্কৃতির জন্মদেয় যা বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানচর্চার চত্তর ছাড়িয়ে ব্যবসা এবং বাস্তববাদী রাজনীতিকে সাহায্য করাঊ অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।  

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা৯ - ঔপনিবেশিকতাবাদের জ্ঞানচর্চার আঙ্গিক - সাম্রাজ্যের মন ও মান ।। বারনার্ড কোহন

উপনিবেশউত্তর পর্বে তদন্ত পদ্ধতি
ঐতিহাসিক এবং নৃতত্ত্ববিদ উভয়েই সরাসরি ঔপনিবেশিক সময়ে ক্ষমতার হাতে তামুক খেয়েছেন – যদিও এই তকমায় নৃতত্ত্ববিদেরা খুব খুশি হবেন না বলাই বাহুল্য। একটি আলাদা জ্ঞানচর্চা হিসেবে নৃতত্ত্বর উদ্ভব কিন্তু ইওরোপিয়দের নিজেদের দেশের এবং বহির্দেশের উপনিবেশ সূত্রে। গোটা উপনিবেশিক সময় ধরেই কিছু নৃতত্ত্ববিদ এঁড়ে তর্ক করে গিয়েছেন যে তাদের বিশেষ একটি কাজ হল ঔপনিবেশি শাসক আর উপনিবেশের শাসিতের মধ্যে যোগসূত্র রচনা করা। যখন থেকে নৃতত্ত্ব নিজেকে আলাদা জ্ঞানচর্চা হিসেবে উপস্থাপনের দাবি করেছে, সে দিন থেকেই ভারত উপনিবেশে সরকারিভাবে ঔপনিবেশিক জনতত্ত্বের তাত্ত্বিক অবস্থান তৈরির জন্যে পরিশ্রম করে গিয়েছে। নৃতাত্ত্বিকেরা বলেছেন তারা এমন একটা পদ্ধতি বার করার চেষ্টা করছেন, যেখানে না কি তারা ঔপনিবেশিক প্রভাব ছাড়াই মৌলিক দেশিয় কৃষ্টি বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করছেন। ইওরোপিয় ঔপনিবেশিকরা দেশের উপনিবেশ এবং বৈদেশিক উপনিবেশের প্রজাদের জীবন প্রভাবিত করতে এই জ্ঞানচার্চিক বিশ্বটিকে বিশ্লেষণ করেছে সমাজ তত্ত্ব বিষয়ে ইওরোপিয় ধারনা এবং ক্ল্যাসিফ্যাক্টরি স্কেমা অবলম্বন করে।
বিংশ শতাব্দের শুরুর সময়ে পেশাগতভাবে নৃতত্ত্ববিদেরা পরম্পরার সমাজের সঙ্গে কাজের সময় কি দায়িত্ব পালনীয় হতে পারে, সেটি নিজেদের মধ্যের আলাপচারিতার সময় ক্ষমতা সেই সমাজগুলিকে নিয়ন্ত্রণের জন্যে যে সব শব্দবন্ধসূচক ভাষ্য তৈরি করেছিল যেমন নেটিভ বা আদিবাসী বা ওয়াল্ড ম্যান, তাঁরাও সেই হিসেবেই বলতে শুরু করলেন। রাজনৈতিক উপনিবেশ শেষ হলে নৃতাত্ত্বিকেরা তাদের ঔপনিবেশিক কর্মকে ইতিহাসে রূপান্তরিত করলেন, এবং তারা যে জ্ঞানচার্চিক পরিমণ্ডল তৈরি করেছেন, তাকেও তার্কিকভাবে বুঝতে এবং সমালোচনা করতে চাইলেন। নৃতাত্ত্বিকদের তদন্তের পদ্ধতিগত চরিত্রই হল জনতাত্ত্বিক ক্ষেত্রসমীক্ষা; ঔপনিবেশিক সময়ে জনতাত্ত্বিক ক্ষেত্রসমীক্ষায় যে প্রবন্ধ এবং ক্ষেত্রসমীক্ষাগুলি লেখা হল, এবং তাত্ত্বিক ক্ষেত্র বিস্তৃত হল, সেটি কিন্তু আদতে উপনিবেশের কৃষ্টি প্রকল্পই এটাও কিন্তু মনে রাখা দরকার।
সাম্রাজ্যের কোন উপনিবেশের রাষ্ট্রীয় শাসন শুধুই পশ্চিমি সমাজ বিজ্ঞানীদের তদন্তমূলক কাজকর্মকে প্রভাবিত করে নি। বিংশ শতাব্দের মধ্য এবং শেষ পাদে এসে বিশ্বক্ষমতাধর শক্তি হিসেবে ব্রিটেনকে প্রতিস্থাপিত করল আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, ফলে অন্য(আদার – যেমন নেটিভ আমেরিকান বা জাপানি)দের বোঝার, তাদের সম্বন্ধে তথ্য জোগাড়ের চেষ্টা চলল সে সময়ের প্রাতিষ্ঠানিক তাত্ত্বিকতার ঘেরাটোপের মধ্যে দাঁড়িয়েই। সমাজবিজ্ঞানীরা ডিপ্রেসনের সময় ভীষণভাবে সরকারি নানান প্রকল্পের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে থাকলেন; যেমন অর্থনীতিবিদ এবং সমাজতাত্ত্বিকেরা নিউ ডিলের সামাজ উন্নয়নের নীতি নির্ধারণ এবং সেগুলি মাঠে নামিয়ে আনার ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারিগর হিসেবে কাজ করে গিয়েছেন।
১৯৩০এর দশকে নৃতাত্ত্বিকেরা নিজেদেরকে নেটিভ আমেরিকানদের নানান কাজে জড়িয়ে ফেলতে শুরু করলেন। এই কাজে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটি হল, নেটিভ আমেরিকানদের রাষ্ট্রীয় সংরক্ষণ এবং স্বশাসন দিতে যে ব্যুরো অব ইন্ডিয়ান এফেয়ারের তৈরি হল, তার দৈনন্দিনের কাজকর্মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া। নৃতাত্ত্বিকদের ডেকে বলা হল ইন্ডিয়ান মধ্যশ্রেণীর মার্ফত যে ইতিহাস এবং সমাজতত্ত্ব বিষয়ে যে তথ্য পাওয়া গিয়েছে, সেগুলি নির্ভর করে ইন্ডিয়ানদের ইতিহাস এবং সমাজতত্ত্বচর্চা স্থাপন করা – যেটি নির্ভর করে আদিবাসী সমাজের যে ফেডারেশন তৈরি হচ্ছে তার ভিত্তি নির্ণয় হবে। ডিপার্টমেন্ট অব এগ্রিকালচারের মাধ্যমে ইন্ডিয়ানদের সংরক্ষণ দিতে যে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরিকল্পনা পর্ষদ তৈরি হল, সেখানেও বিপুল সংখ্যায় নৃতাত্ত্বিক এবং সমাজতাত্ত্বিকেরা কাজ পেলেন। সংরক্ষণকাজে কৃষি অর্থনীতিবিদদের যুক্ত করে ডিপ্রেশন থেকে বেরোনোর দাওয়াই এবং চরিত্র বিশ্লেষণে আমেরিকিয় অর্থনীতির তাত্ত্বিক সমান্তরাল চিন্তাভাবনার শুরুয়াত হয়। অভিজ্ঞতার সূত্রে ইন্ডিয়ানদের জন্যে যে নিউ ডিল তৈরি হল, তার কাজ হল তাদের প্রাতিষ্ঠনিক অর্থনীতি আর কৃষ্টিতে টেনে এনে ইওরোপিয়ত্বের দেহে আত্মীকরণ করানো।

Sunday, March 18, 2018

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা৮ - ঔপনিবেশিকতাবাদের জ্ঞানচর্চার আঙ্গিক - সাম্রাজ্যের মন ও মান ।। বারনার্ড কোহন

নজরদারি(সার্ভিল্যান্স) পদ্ধতি
গোটা উনবিংশ শতক জুড়ে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকেরা দূর থেকে – ঘোড়ায়, হাতি, নৌকোয় বা রেলে বা অন্যান্য বাহনে চেপে সমীক্ষা করাতে স্বস্তি বোধ করেছে। বাজারে, সরু গলিতে, হাটে বা মেলায় – যেখানে ভারতীয় প্রজাদের সঙ্গে গা ঘেঁসতে হয়, সেখানে গিয়ে সমীক্ষায় খুব একটা উৎসাহী হয় নি।
ভারতে ভ্রমণ বা জীবন কাটানোর তাদের যে অভিজ্ঞতা আমরা পড়ি, সেখানে অভিজাত পরিবারের কিছু মানুষ বা তাদের ব্যক্তিগত সহকারী বা চাকর ছাড়া খুব কম ভারতীয়র নামোল্লেখ পাই। যে সব ভারতীয় সাম্রাজ্যিক দৃষ্টিতে প্রতিভাত হয়েছে, তাদের যোগ্যতাই ছিল ব্রিটিশ নির্দেশিত নাটুকে পরিচ্ছদে সজ্জিত হয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ক্ষমতার অলিন্দ আলো করে দাঁড়ানো এবং সেই ক্ষমতাকে আরও সংহত করার কাজে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া। তারা সেই সব লেখায় উল্লিখিত হয়েছে সাম্রাজ্য নির্দিষ্ট পরিধেয় পরিধান করে, উপনিবেশের তৈরি করে দেওয়া প্রথা অবলম্বন করে যে সাম্রাজ্যিক জ্ঞাননির্ভর প্রথা তৈরি হল, সেই ঘেরাটোপের মধ্যে ঘোরাফেরা করে রাজকীয়রা কিভাবে প্রতিভাত হবে সেই আলেখ্য বর্ণনে। শাসক এবং শাসিত, প্রত্যেকেই ঔপনিবেশিক সামাজিক নাট্যমঞ্চে নির্দিষ্ট কতগুলি প্রথা মেনে অভিনয় করে গিয়েছে।
তবে সে সময় এই অভিজাত আর ভদ্র সমাজের বাইরে অবশ্যই কিছু গোষ্ঠী বা সমাজ ছিল যাদের কাজকর্ম বা প্রথা সাম্রাজ্যের কাছে হুমকি স্বরূপ ছিল এবং হয়ত অস্বিত্বের সঙ্কট ডেকে আনতে পারত। সেই সব লেখায় উল্লিখিত সমাজ ব্যবস্থার বাইরে থাকা চরিত্রগুলি চিহ্নিত হল সন্ন্যাসী, সাধু, ফকির, ডাকাত, গুণ্ডা, ঠগ, পশুপালক, মেষপালক, পরিযায়ী গোষ্ঠী এবং বিনোদনকারীরা। সাম্রাজ্যের যত্নে তৈরি করা আভিজাতিক এবং ভদ্রবিত্ত সমাজের বাইরে থাকা মানুষ, গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ন্ত্রণের জন্যে ব্রিটিশেরা কিছু বিশেষ পদ্ধতি তৈরি করে গবেষণার কাজ করে। তারা ভাবনাচিন্তা করতে থাকে কিভাবে তাদের দাগি সহ বিভিন্ন ছাপে ছুপিয়ে দেওয়া যায়।
অষ্টাদশ শতকের শেষ পাদ থেকে কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠী, জাতি এবং গ্রামকে চিহ্নিত করা হল যে তারা শিশুভ্রুণ হত্যাকারী। যে দুষ্কর্ম যদি কিছু হয়ে থাকে তা ব্যক্তিগত গোষ্ঠীগত নয়; এবং ব্রিটিশ আদালতে প্রমান করা কঠিন ছিল যে এই কাজে গোটা সমাজ জড়িত। পরের দিকে নারীভ্রুণ হত্যা হয়ে উঠল সাম্রাজ্যের হাতে তৈরি করা সংখ্যাতাত্ত্বিক দুষ্কর্ম, যেখানে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়ার ক্ষমতা হাতে তুলে নিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্য।
১৮৩৫ সালে ঠগি আর ডাকাতি দপ্তর তৈরি হল, যাদের কাজ হল গোষ্ঠীগত খুন আর ডাকাতি তদন্ত করে শাস্তি দেওয়া। সাম্রাজ্যের প্রথম কাজ হল সরকার যাদের অভিযুক্ত করছে, যেমন বিভিন্ন ধার্মিকদের হত্যা এবং পথচারীদের হত্যার পদ্ধতির তথ্য সংগ্রহ করা। এই শাস্তি সম্পাদন করতে রাষ্ট্রের সামনে সংশ্লিষ্ট কিছু মানুষকে উপস্থাপন করে রাষ্ট্রীয় সাক্ষ্য দান করানো হল এবং পরে তাদের রাজ সাক্ষী এবং এদের থেকে ঠগীদের কৃষ্টি সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য সংগৃহীত হল। ঠগী এবং ডাকাতি দপ্তরের উদ্যোগে তৈরি হল অপরাধ এবং অপরাধী সংক্রান্ত জনতত্ত্ব মহাফেজখানা। এই উদ্যোগের ফল হল বিপুল সংখ্যক জনসমষ্টিকে অপরাধী আদিবাসী এবং জাতি দাগিয়ে দেওয়া।
ভারতে ব্রিটিশ(পশ্চিম শহুরে ইওরোপের পুলিশদের মত) প্রশাসন যে সব জাতি, গোষ্ঠী এবং সমাজ অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে আছে বলে সন্দেহ করছিল, তাদের সহজে নিয়ন্ত্রণ এবং ধ্বংস করার কাজ করে উঠতে পারছিল না। ফলে তাকে পদ্ধতিগতভাবে সেই সব গোষ্ঠী সমাজকে দাগিয়ে দেওয়ার জন্যে এমন কিছু স্থায়ী চরিত্র নির্ধারণ করার কাজে গবেষণা করতে হল, সেই সব চরিত্র দিয়ে সেই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করা যাবে। যদিও আলোকচিত্র দিয়ে ব্যক্তির বাহ্যিক গঠন নথিভূক্ত করা যেত, কিন্তু বিপুলাকায় ভারতের জন্যে প্রয়োজন হল কয়েক হাজারের নমুনা নিয়ে সেটাকে সার্বজনীন বলে চালিয়ে দেওয়ার তত্ত্ব নির্ধারণ করা।
গোটা গোষ্ঠীকে না হয় অপরাধী চিহ্নিত করা গেল। ব্যক্তিকে কিভাবে সহজে চিহ্নিত করা যায়? এই ভাবনা বিভিন্ন ঔপনিবেশিক কর্তাদের ভাবাচ্ছিল। এই লক্ষ্যে উনবিংশ শতকের শেষে, পুলিশ নির্দেশক আলফোনস বার্টিলঁ একটি এন্থ্রোপোমেট্রিক ব্যবস্থা তৈরি করলেন, মনেকরা গেল, এই প্রযুক্তি আর জ্ঞান দিয়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে নির্ভুলভাবে চিহ্নিত এবং চরিত্র নির্ধারণ করা যাবে।


আলফোনস বার্টিলঁর প্রায় একই সময়ে উইলিয়াম হার্শেল, জঙ্গিপুরে কর্মরত এক ভারতীয় আমলা দুর্নীতি আর জালিয়াতির বিরুদ্ধে আঙুলের ছাপকে প্রমান হিসেবে গণ্য করার গবেষণা করছিলেন। বাংলা ছাড়ার পরও তিনি গবেষণা চালিয়ে যান এবং সেই গবেষণা আরও এগিয়ে নিয়ে যান ফ্রান্সিস গ্যালটন। তিনি, হার্শেল এবং আরও কিছু পুলিশ আধিকারিক এমন একটি আঙুল ছাপ নির্ণয় করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেন যা দিয়ে ব্যক্তি মানুষকে চিহ্নিত করা যায়।