Monday, June 26, 2017

দেশিয় জ্ঞানচর্চার ইতিহাস - ডাক, খনার বচন

সন্ধ্যা ভাষা বাংলা ভাষার উদ্ভব যুগের এক প্রকার প্রহেলিকাবৎ দ্ব্যর্থক শব্দযুক্ত ভাষা। মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজদরবার থেকে ১৯০৭ সালে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের আদি নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত একটি প্রাচীন পুথি আবিষ্কার করেন এবং ১৯১৬ সালে হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধ গান ও দোহা নামে সম্পাদনা করে তা প্রকাশ করেন। ওই গ্রন্থে ধর্ম সম্বন্ধীয় কিছু গান ও দোহা আছে। প্রথমগুলির নাম ‘চর্য্যাশ্চর্য্যবিনিশ্চয়’ (ধর্মসাধনার ব্যাপারে আচরণীয় ও অনাচরণীয়ের নির্দেশ)। পদ্যাকারে গ্রথিত হওয়ায় এগুলিকে চর্যাপদ বা চর্যাগীতি বলা হয়। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এগুলির ভাষাকে বলেছেন ‘সন্ধ্যা ভাষা’। সুকুমার সেনের মতে ‘সন্ধ্যা’ শব্দটিতে প্রকটভাবে রয়েছে ‘ধ্যৈ’ (বা ‘ধা’) ধাতুর অর্থ। যে ভাষায় অভীষ্ট অর্থ বুঝতে হয় অনুধাবনের মাধ্যমে বা মর্মজ্ঞ হয়ে [সম্+ধ্যৈ] অথবা যে ভাষায় ভাবার্থ বিশেষভাবে গুপ্ত [সম্+ধা] তা-ই সন্ধ্যা ভাষা।
চর্যার পদগুলিতে বৌদ্ধ বজ্রযানী সহজিয়া সাধক-সম্প্রদায়ের গুহ্য সাধন-পদ্ধতির কথা আছে। এতে গুরু-শিষ্যগম্য সঙ্কেত-রূপকের ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন বিধায় এ ভাষায় তার সৃষ্টিকালীন রূপটি নিহিত। ভাষাটি তখন প্রাকৃত, অপভ্রংশ ও অবহট্ঠএর স্তর পেরিয়ে বাংলার নিজস্ব সত্তায় প্রকাশিত হচ্ছিল। সৃষ্টিকালীন ওই স্তরে পূর্বরূপের কিছুটা বৈশিষ্ট্য এবং সহগামী অন্য ভাষা, যেমন উড়িয়া, মৈথিলী, অসমিয়া ইত্যাদির লক্ষণ তার মধ্যে থেকে গিয়েছিল। তাই প্রথম দিকে এই ভাষার কিছুটা বাংলা আবার কিছুটা বাংলা নয় এমন মনে হয়েছে।
চর্যায় তত্ত্ব-উপদেশ ও সাধনার ইঙ্গিত আবৃত করে রাখা হয়েছে কতিপয় পারিভাষিক শব্দ ও প্রতীকে, বাহ্য অর্থের অবগুণ্ঠনে। কিছু সন্ধ্যা ভাষা তথা সন্ধ্যা-অর্থের নমুনা: আলি-কালি (প্রশ্বাস-নিঃশ্বাস), চন্দ্র (প্রজ্ঞা), ডোম্বী (শুক্রনাড়িকা), নৌকা (মহাসুখকায়) ইত্যাদি। কাব্যিক ব্যবহার:
নানা তরুবর মৌলিলরে গঅণত লাগেলী ডালী
একেলী সবরী এবণ হিন্ডই কর্ণকুন্ডল বজ্রধারী \ ধ্রু\তিঅ ধাউখাট পড়িলা সবরো মহাসুহে সেজি ছাইলী
সবরো ভুজঙ্গ ণইরামণি দারী পেহ্ম রাতি পোহাইলী \ ধ্রু\
সাধু গদ্যে এর রূপান্তর: নানা তরুবর মুকুলিত হইল রে, গগনে লাগিল তাহার ডাল, কর্ণ-কুন্ডল-ধারিণী শবরী একা এই বনে ঢুঁড়িতেছে। ত্রৈধাতুক খাট পাতিল শবর, মহাসুখে শয্যা বিছাইল; ভুজঙ্গ (প্রেমিক) শবর, প্রেয়সী নৈরামণি, প্রেমে রাত্রি পোহাইল।
বচন
বচন বিশেষ অর্থবোধক বাক্য বা উক্তি। ইংরেজি saying, proverb বা বাংলা প্রবাদ শব্দ অনেকটা এর সমার্থক, কিন্তু বচনের তাৎপর্য আরও ব্যাপক ও ভিন্ন। শুভাশুভ, বিধিবিধান, নীতি ও উপদেশবাচক প্রতিপাল্য প্রাজ্ঞোক্তিই সাধারণ অর্থে বচন, যেমন গুরুর বচন, মহাপুরুষের বচন ইত্যাদি। বাংলায় ডাক ও খনার উক্তি বচনের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ডাকের বচন ‘ডাকের কথা’ বা ‘ডাক পুরুষের কথা’ নামেও পরিচিত। ডাক তাঁর বচনকে ‘ডাকর কথা’ বলেছেন, চাকমা ভাষায় যা ‘দাগর কধা’ নামে পরিচিত। ‘খনার বচন’ রচয়িতার প্রকৃত নাম লীলাবতী; লীলাবতী আর্যার প্রণেতা ও খনা একই ব্যক্তি।
বচন লোকসাহিত্যের একটি জনপ্রিয় শাখা। এর স্বতন্ত্র একটা প্রকৃতি, কাব্যরস ও গীতিধর্মিতা আছে। ডাক ও খনার বচনে মাঝে মাঝে ভণিতা আছে, যা লোকসাহিত্যের অন্য শাখায় সচরাচর লক্ষ করা যায় না। বচনে প্রাত্যহিক জীবনের মূল্যবান নীতিমালা ও নির্দেশনা পাওয়া যায়। খনার বচনের বর্তমান ভাষা তার মূল ভাষা নয়, তবে লীলাবতী আর্যার ভাষা অনেকটা মূল ভাষার কাছাকাছি। উড়িয়া ও অসমিয়া ভাষায় রক্ষিত খনার বচনে প্রাচীনত্বের ছাপ রয়েছে, কিন্তু বাংলা ভাষার বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলা খনার বচনেও ভাষাগত পরিবর্তন ঘটেছে।
ডাক ও খনার বচনের প্রকৃত সংখ্যা নির্ণয় করা দুঃসাধ্য। মৌখিকভাবে প্রচলিত ও স্মৃতি-আশ্রিত বলে বহু বচন লোপ পেয়েছে। উল্লেখ্য যে, অসমিয়া খনার বচনগুলি ডাকের কথার সঙ্গে সংমিশ্রিত। বাংলা খনার বচনে এমন কিছু গাণিতিক পরিভাষা আছে যা খুবই প্রাচীন, যেমন: চাঁদা ১, পক্ষ ২, নেত্র ৩, বেদা ৪, বাণ ৫, ছটে ৬, বসু ৮, ভা ২৭, হীন ০, খালী ০ ইত্যাদি। সমুদ্র, কুম্ভ ইত্যাদিও সংখ্যাবাচক পরিভাষা। অনুমান করা হয় যে, খনার বচন চর্যাপদের শেষযুগে রচিত। ডাক ও খনার বচনের ভণিতায় রচয়িতার নাম পাওয়া যায়।
তিববতি ভাষায় ডাক ও খনা শব্দদ্বয়ের অর্থ প্রজ্ঞাবান। তিববতি ভাষায় খনার ব্যুৎপত্তি হচ্ছে স্খম (খন)। নেপালে প্রাপ্ত বজ্রডাকতন্ত্রে ডাক ও খনার বচনের ন্যায় প্রবচনমালা রয়েছে। তিববতি ভাষায় ডাকার্ণব মানে জ্ঞানসাগর। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ও দীনেশচন্দ্র সেনের মতে ডাকার্ণব বাংলা ভাষার আদিগ্রন্থ। এটি কৃষি, জ্যোতিষশাস্ত্র, গণস্বাস্থ্য ও প্রাত্যহিক জীবন সংক্রান্ত প্রজ্ঞা-বচনের সমাহার। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র ও বরাহের বৃহৎসংহিতায় আবহবার্তা ও উপর্যুক্ত বিষয়সমূহে বহু শ্লোক রয়েছে। ডাকের বচনগুলিতে এই উভয় গ্রন্থের প্রভাব আছে। তবে ডাকের কথা ও খনার বচনে সমসাময়িক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অভিযোজিত হয়েছে।
অসমিয়া ডাকভণিতায় ডাকের কথার ১১টি প্রকরণের কথা বলা হয়েছে, যথা: জন্মপ্রকরণ, রন্ধনপ্রকরণ, নীতিপ্রকরণ, বৃষলক্ষণ, গৃহিণীলক্ষণ, কৃষিলক্ষণ, জ্যোতিষপ্রকরণ, বর্ষালক্ষণ ইত্যাদি। বাংলা বচনগুলির বিষয় হলো আবহাওয়াবার্তা, কৃষি, ফল ও ফসল, পশুপালন, গণস্বাস্থ্য, জ্যোতিষ ও হোরাশাস্ত্র, বর্ষফল, যাত্রালগ্ন, বিধিনিষেধ, পরমায়ুগণনা, নারীর লক্ষণ, গর্ভস্থ সন্তান, প্রশ্নগণনা ইত্যাদি। ডাকের জন্মপ্রকরণ আত্মকথামূলক। খনার বচনেও আত্মকথন আছে, যেমন: ‘আমি অটনাচার্যের বেটী। গণা বাছায় কারে বা অাঁটি\’ (উল্লেখ্য যে, খনার বাবা ছিলেন একজন আচার্য ঠাকুর)। অন্যান্য বিষয়েও ডাক ও খনার বচনের বক্তব্যে মিল আছে।
ডাকের কথা মোটামুটি একই ছন্দে রচিত, কিন্তু খনার বচনে ছন্দবৈচিত্র্য আছে। উভয় বচনে দুই চরণের অন্ত মিল আছে এবং মিলের জন্য অনেক সময় শব্দ বিকৃত হয়েছে। এক চরণের খনার বচন পাওয়া যায়, যা প্রবাদরূপে প্রচলিত; তবে দুই থেকে চার চরণের বচনের সংখ্যাই অধিক। কিছু কিছু খনার বচন গীতিকবিতার মতো বেশ দীর্ঘ। বাংলা ডাকের কথায় এক চরণ ও দুই চরণবিশিষ্ট বচনের সংখ্যাই বেশি। এক চরণের কিছু ডাকের কথাও প্রবাদে ঠাঁই পেয়েছে।
খনার বচন আসামেও সুপরিচিত, কিন্তু উড়িয়া ভাষার মতো অসমিয়া ভাষায় খনার বচনের কোনো সংগ্রহ-সংকলন নেই। অসমিয়া ডাকের কথায় বহু খনার বচন প্রবিষ্ট হয়েছে। সেগুলির শব্দ ও বিষয় বাংলা খনার বচনের মতোই, তবে শব্দরূপ প্রাচীন। উড়িয়া খনার বচন বাদ্যযন্ত্র সহযোগে এখনও গীত হয়; অনতিকাল পূর্বে বঙ্গদেশেও গীত হতো। অনাবৃষ্টির সময় বৃষ্টিসম্পর্কিত বচনগুলি গীত হলে বৃষ্টি হবে এরূপ একটি বিশ্বাস এক সময় প্রচলিত ছিল। উড়িয়া ভাষায় খনার বচনকে বলা হয় ‘খনাবচন’ এবং তার সংখ্যা বাংলা বচনের চেয়ে কম নয়।
খনার একটি আত্মকথামূলক বচনে আছে: ‘ভাষা বোল পাতে লেখি। বাচাহুব বোল পড়ি সাথি\’; এখানে ‘বোল’ মানে বুলি। দীনেশচন্দ্র সেন মনে করেন, বচনটিতে ভাষার প্রাচীনত্ব রক্ষিত হয়েছে। এর বক্তব্য থেকে ধারণা হয় খনা তাঁর বচনগুলি গাছের পাতায় লিখে পাঠ করতেন এবং এভাবেই তা বাঁচাতে চেয়েছেন।
খনার অনুসারী জ্যোতিষীদের মধ্যে প্রজাপতি দাস প্রণীত পঞ্চস্বরা বা গ্রন্থসংগ্রহ (আনু. ১৪শ শতক) গ্রন্থে প্রচুর খনার বচন, বিশেষত হোরাশাস্ত্রীয় বচন উদ্ধৃত হয়েছে। ইংরেজ আমলে কলকাতা থেকে গ্রন্থটি মুদ্রিত হয়। একই সময়ের ষষ্ঠীদাসের জ্যোতিষগ্রন্থেও বহু খনার বচন উদ্ধৃত হয়েছে। উনিশ শতকের শেষদিক থেকে বিশ শতকের তৃতীয় দশক পর্যন্ত আলোচনাসহ খনার বচনের বারোটিরও বেশি সংকলন প্রকাশিত হয়েছে। তার মধ্যে পি.এম ভট্টাচার্যের বৃহৎ খনার বচন প্রধান। এ সময়ের মধ্যে ডাকের কথা ও ডাকপুরুষের কথা শীর্ষক দুটি সংকলন প্রকাশিত হয়। কৃষি, কৃষিতত্ত্ব, কৃষক ইত্যাদি নামে প্রকাশিত অন্তত দশটি উৎকৃষ্ট সাময়িকপত্রের প্রতি সংখ্যায় অজস্র বচন উদ্ধৃত হয়েছে। অসমিয়া সাহিত্যর চাণেকী গ্রন্থে ডাক-ভণিতায় প্রায় এক হাজার ডাকের কথা সংকলিত হয়েছে।
খনার বচনে ব্যবহারিক কথা, আর ডাকের কথায় নীতিকথা বেশি; এ কারণেই হয়তো খনার বচন মানুষ বেশি স্মৃতিবদ্ধ করে রেখেছে। উড়িয়া ও বাংলা ভাষায় খনার বচনের একাধিক সংগ্রহ পুস্তিকা আজও পাওয়া যায়। কোনো কোনো বাংলা অভিধান ও পঞ্জিকায় বেশকিছু খনার বচন উদ্ধৃত হয়েছে। আলি নওয়াজ সম্পাদিত খনার বচন, কৃষি ও বাঙ্গালী সংস্কৃতি গ্রন্থে পাঠান্তরসহ ডাকের কথা, হিন্দি পরাশর বচন, মিথিলার ঘাঘ, ঢংক ও রাজস্থানের ভড্ডরীর বচন এবং তেলেগু কৃষিপ্রবচন সমেত সহস্রাধিক খনার বচন স্থান পেয়েছে। পাঠান্তরে লক্ষ্য করা যায় যে, বিভিন্ন ব্যক্তি প্রণীত বচনে খনার বচনের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। কিছু কিছু খনার বচন ও তেলেগু প্রবচনের মধ্যে অদ্ভুত মিল রয়েছে।
বাংলা ও অন্যান্য ভাষার তুলনীয় বচন-প্রবচন বিশ্লেষণ করে একটি নব ভাষাতাত্ত্বিক দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে। অন্যান্য প্রাদেশিক ভাষায় খনার বচনের অনুপ্রবেশের প্রধান কারণ কৃষিবিজ্ঞান। কৃষিপ্রধান বঙ্গদেশে ডাকের কথা ও খনার বচন প্রাচীন বাংলা ও আসামের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির বুনিয়াদ রচনা করেছিল। ‘পুবে হাঁস, পশ্চিমে বাঁশ, উত্তরে কেলা, দক্ষিণে মেলা।’ এই আদর্শে পল্লীবাসীরা পূর্বে বাড়িঘর নির্মাণ করত এবং আজও করে। এ বচনটি অসমিয়া ও বাংলা উভয় ভাষায় বিদ্যমান। ‘দক্ষিণ মুখী ঘরের রাজা’ খনার এ বচন সকলেই বিশ্বাস করে। যাত্রাকালে শূন্য কলসি দেখা বা হাঁচির শব্দ শোনাকে মানুষ আজও অশুভ বলে মনে করে। অসময়ে বাড়িতে দাঁড়কাকের ডাক শুনলে গৃহবাসী আতঙ্কিত হয়। ডাইনে সাপ ও বামে শেয়াল দেখলে পথিক আজও একে অশুভ লক্ষণ মনে করে। বিবাহের পূর্বে ভাগ্যবতী সুশীলা ও সুনিপুণা নারীকে নির্বাচন করা হয় ডাক ও খনার বচনের আদর্শে। বাঙালির দৈনন্দিন কার্যকলাপ, আচার-অনুষ্ঠান, সংস্কার ও বিশ্বাস আজও জ্ঞাত-অজ্ঞাতসারে ডাক ও খনার বচন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, যদিও আধুনিক সভ্যতা এতে প্রভাব বিস্তার করেছে। ডাকের কথা ও খনার বচনে লোকায়ত বাংলার স্বরূপ প্রকাশিত হয়েছে। খনার বচন যে চমৎকার কবিতাও তার প্রমাণ উদ্ধৃত নমুনা থেকে পাওয়া যাবে:
শ্যামাংগী সুকেশী তনু লোমরাজি কান্তা।
সুভুরু সুশীলা কিম্বা সুগতি সুদন্তা\
মধ্য ক্ষীণা যদি হয় পঙ্কজ নয়নী।
কুলহীনা হইলেও বরেষ্ট দায়িনী\
কুদন্তা অথবা হয় অধিক ব্যাপিকা।
পিঙ্গল লোচনা অঙ্গ ষষ্ঠী সলোমিকা\
মধুগুষ্টা যদি হয় রাজার বালিকা।
কুলে শ্রেষ্ঠা হইলেও অরিষ্ট দায়িকা\
নেপালে প্রাপ্ত একটি কাব্য-সংকলনের নাম কবীন্দ্রবচনসমুচ্চয়। এটি বাংলাদেশেই সংকলিত হয়েছে। কাব্যটির নাম থেকে প্রমাণিত হয় যে, প্রাচীনকালে ‘বচন’ শব্দদ্বারা কবিতাকেই বোঝাত। বচন বা কবিতা ছিল মানুষের আবেগ ও আনন্দ প্রকাশের মাধ্যম। তাই ছন্দের তালে তালে মানুষ বচন, প্রবচন, ছড়া ও গাথাকে পুরুষানুক্রমে সযত্নে স্মৃতিতে বহন করে আসছে।
সূত্রঃ http://bdtodays.com/news/21725

দেশিয় জ্ঞানচর্চার ইতিহাস - হরপ্রসাদ, নাড়, ডাক ও হিন্দুত্বের রাজনীতি

হরপ্রসাদ বলছেন জ্ঞান(যেখান থেকে জ্ঞানক>নানক শব্দটা এসেছে - সুহৃদ ভৌমিক বলছেন বাঙালির মত অনুনাসিক শব্দ অনেকেই উচ্চারন করতে পারত না - কিছুটা অস্ট্রেলিয় আদিবাসী যারা এদেশ থেকে গিয়েছে তারা পারে - তিনি বলছেন দেখা গিয়েছে বাঙালিদের মধ্যে নাকের ভেতরে একটা বড় খোঁদল আছে - তাই) শব্দটা থেকেই নাড় শব্দটা এসেছিল। নাড়পাদ আর তাঁর স্ত্রী নাড়ী ছিলেন তখনকার এক ধরণের জ্ঞান চর্চার অন্যতম ধারক বাহক। যে জন্য বলভদ্র একদিনে বৈষ্ণব করেন প্রচুর নেড়ানেড়ীকে।
নেড়ানেড়ী-রা বহুকাল ধরে থেকে যান অকেন্দ্রিভূত জ্ঞানচর্চার ধারক বাহক - যেমন করে ডাক আর ডাকিনী - গ্রাম বাংলায় আজও ডাকের বহু দৈনন্দিনের নানান বিষয় নিয়ে ছড়া রয়েছে - ডাকিনী আদিবাসি সমাজের সঙ্গে জড়িত। পলাশীর পর ভদ্রলোকেদের ক্ষমতায়ন হওয়ায় ডাকিনীদেরকে সমাজচ্যুত করেন এবং ছোটলোকেদের প্রভাবিত করে তাঁদের হত্যা করতে প্ররোচিত করেন(ডাকের বচন অতটা প্রখ্যাত হয় নি বলে তার ভাষার প্রাচীনতা অনেকাংশেই রক্ষা পেয়েছে। বাংলাবাদী দীনেশচন্দ্র সেন বঙ্গভাষা ও সাহিত্যে অবশ্য ডাক'কে বঙ্গের সক্রেতীস্‌ বলেছেন। চাকমারা একে দাগর কথা বলেন)।
অতীশ দীপঙ্কর যখন তিব্বতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তখন একটা বৌদ্ধ সঙ্গীতি হয়। সেই সঙ্গীতিতে নাঢপাদ অতীশকে তিব্বতে যেতে বারণ করেন - বলেন তিনি গেলে ভারত অন্ধকার হয়ে যাবে - জ্ঞান নষ্ট হয়ে যাবে, কিন্তু তিনি তার গুরুর কথা না শুনেই তিব্বতে যান।
বৌদ্ধ মঠ সরাসরি রাজপোষিত। কেন্দ্রিয় জ্ঞানচর্চার নিজস্ব একটা ভালনারেবিলিটি আছে - যা অকেন্দ্রিয় স্থানিক জ্ঞানচর্চায় থাকে না। হরপ্রদাস স্টেটিস্ট ছিলেন। মনে করতেন কেন্দ্রিভূত রাষ্ট্রীয় মদতপুষ্ট জ্ঞানচর্চা নষ্ট হলে দেশের জ্ঞানচর্চা ধ্বংস হবে - তা হয় নি - এবং এই ধারণা নিয়েই ওরিয়েন্টালিস্টদের উত্থান - ব্রিটিশ শাসনের প্রতি সমর্থন - কেননা ব্রিটিশেরা নাকি নষ্ট হয়ে যাওয়া জ্ঞানচর্চা ফিরিয়ে আনছে।
অথচ ১৮৩৪এ চার্লস উইশ অন্ধ্রর একটি গ্রামে কলন বিদ্যা পড়ানোর উদাহরণ দেন। কিন্তু আমরা হরপ্রসাদকে ছাড় দিই কেন না তিনি চরম হিন্দুত্ববাদের যুগে বৌদ্ধ বাই ফিরিয়ে এনেছিলেন। এটা হিন্দু মেলা বা স্বদেশির সময়ের ঔপনিবেশিক হিন্দুত্বকে মোকাবিলা করতে সহায়তা করেছিল।

পলাশী ও আমাদের বক্তব্য

পলাশীর আগে থেকেই বাঙালি অভিজাত, তারমধ্যে কিছু মুসলমান, অধিকাংশ অমুসলমান ব্রিটিশদের সহায়ক হয়েছিলেন। শূদ্র-বৈশ্য-মুসলমানের যৌথ উদ্যোগে গড়ে তোলা বাণিজ্য উদ্বৃত্ত বাংলাকে বিশ্বাসঘাতকতা করে কর্পোরেট পশ্চিমি শাসনের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। বঙ্কিমের আগে এই ভিত্তি গড়ে দিয়েছিলেন রামমোহন-দ্বারকানাথ-বিদ্যাসাগর ত্রয়ী। তাঁদের তৈরি করা তত্ত্বকে ফলেফুলে ভরিয়ে তোলেন বঙ্কিম।
আমরা এই পুরো ব্যাপারটাকে অন্য দৃষ্টভঙ্গীতে দেখি। মূলত ধর্মযুদ্ধের(ক্রুসেড) সময় থেকেই বাণিজ্যে অধমর্ণ পশ্চিম, পূর্বের ভারত-পারস্য-চিনের যৌথ বাণিজ্য চাকাটাকে তাঁদের দিকে ঘোরাবার চেষ্টা করছিল। কোন কোন শক্তি এদিকে এসেছিল তা আমরা ইতিহাসের সূত্রে জেনে গিয়েছি - পর্তুগিজ, ডাচ, ফরাসি, ব্রিটিশ চেষ্টা করেছে এই উপমহাদেশকে, বিশেষ করে বাংলাকে পদদলিত করার, যে উৎপাদন ব্যবস্থা শূদ্র-বৈশ্য-মুসলমানের যৌথ উদ্যোগে গড়ে উঠেছিল, তার হেঁটমুণ্ড উর্ধ্বপদ করানো। ভারত-আরব যে বিকেন্দ্রিত বাণিজ্য এবং জ্ঞানচর্চা গড়ে উঠেছিল, তকে ধ্বংসকরে কর্পোরেট কেন্দ্রিভূত বাণিজ্য জ্ঞানচর্চা চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল।
পলাশী তার সূচনাবিন্দু। ভদ্রদের ক্ষমতায়ন এবং শূদ্র-বৈশ্য-মুসলমান উৎপাদন ব্যবস্থার ধ্বংস সাধন।
আমরা এখনও মনে করি শূদ্র-বৈশ্য-মুসলমান কারিগরেরাই এই উদ্বৃত্ত বাংলা তৈরি করেছিলেন, সেখানে অভিজাতদের কোন নলচল ছিল না। যেহেতু পলাশীর আগে পর্যন্ত সম্রাট বা সুলতান বুঝতেন কারিগর আর চাষীর থেকে আসা রাজস্ব তাঁদের বেঁচে থাকা সুনিশ্চিত করে, তারা কারিগর আর চাষিদের যতটা পারাযায় পালন করতেন। কারিগর চাষীদের ওপরে যে কোন অত্যাচার কড়া হাতে দমন করা হত পলাশী পর্যন্ত। ১৮৩৬সালের উইলিয়াম এডামের বাংলার শিক্ষা সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে শূদ্র-বৈশ্য-মুসলমান ছাত্ররাই পাঠসালা, মাদ্রাসাগুলিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ, উচ্চবর্ণ মাত্র ১৫%। ফলে গোটা জ্ঞানচর্চা আর উৎপাদন ব্যবস্থা ছোটলোকেদের হাতে ছিল যার রক্ষা কর্তা ছিলেন নবাব বা সুলতান। 
আমরা যারা গাঁইয়া উতপাদকেদের সঙ্গঠন করি যেখানে মূলত শূদ্র-বৈশ্য-মুসলমানেরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ তারা মনে করি অভিজাতরা এই উৎপাদন ব্যবস্থা ধ্বংস করতে সুলতানি তুলে ব্রিটিশদের সহায়তা করে কর্পোরেট ব্যবস্থার গোড়াপত্তন করেছিলেন। 
যখন বাংলা নিজের জ্ঞান, প্রযুক্তি, নিজের বাজার, প্রজ্ঞা নিয়ে উৎপাদন এবং নিজের শিক্ষা ব্যবস্থা আপন করেছিল ততদিন বাংলা বিশ্বজয়ী ছিল - উপমহাদেশের জিডিপি ছিল ২৫ তারমধ্যে বাংলারই ৫। এবং গোটা উৎপাদন ব্যবস্থা, প্রযুক্তি আর বিতরণ ব্যবস্থাই ছিল শূদ্র-বৈশ্য-মুসলমানের হাতে। তাই পলাশী ঘটে। 
অথচ আজ উভয় ধর্ম নির্বিশেষে যখন আমরা পশ্চিমি জ্ঞানচর্চা আর প্রযুক্তির দ্বারস্থ হয়েছি। পলাশীর পরে অভিজাতদের চেকনাই বেড়েছে কিন্তু সার্ভিকভাবে বাংলা এবং বাঙালির অধগমন শুরু হয়েছে এটা বলা যায়। যে বাংলা ভাষার ৪০০টি শব্দ চিনারা চিনা ভাষাভ অনুদিত করে, যে বাংলায় সাঁরা বিশ্বের মানুষ ব্যবসা করতে আসত সেখানে আজ বাঙালি বিদেশে চাকরি করতে যায়। পরের ধার করা ধনে নতুন করে বাংলা গড়ে তোলা অসম্ভব।
যতদিননা আমরা ১১৬৪/১৭৫৭য় বাংলা যে অবস্থায় ছিল সেই অবস্থায় পৌঁছতে পারছি, ততদিন বাংলার মুক্তি নাই।

অন্তঃপুরের জ্ঞান ও দক্ষতা চর্চা

আমাদের অন্তঃপুরের এই জ্ঞানচর্চা, দক্ষতা, প্রজ্ঞান, পরিবারকে ধরে রাখার, পরিবারের পুষ্টি, পরিবারের ছেলে মেয়েদের ঠিকঠাক বড় হওয়া বড় করারা ধৈর্য, একটা রান্না করা, বাড়িঘর সামলানো, কাপড় কাচা, বাজার নজরদারি করা, বাড়ির লোকজনের নানান বাস্তব সমস্যার নিরন্তর সমাধান করা, পরিবেশ, প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা - তারপর পরিবারের জন্য রোজগার করা, দিনের পর দিন বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ এই একঘেঁয়ে বিরক্তিকর কাজগুলো করে যাওয়া তাঁদের ধর্ম।
যে মহিলা মায়ের বাড়ি থেকে শ্বশুর বাড়ি আসেন তিনি একটা সংস্কৃতি থেকে উপড়ে এসে নতুন একটা সংস্কৃতিতে নিজেকে শুধু মানিয়েই নেন না, দুটি সংস্কৃতি মিলিয়ে নতুন একটা পারিবারিক সংস্কৃতি গড়ে তোলেন সেই ভৌগোলিকভাবে নির্দিষ্ট সমাজের মধ্যে থেকেই। 
কিন্ত্য সমস্যা হল এই দক্ষতা, জ্ঞান, প্রজ্ঞা, প্রযুক্তি লালন পালন এবং অর্জনকে রাষ্ট্র বা বড় পুঁজি বিন্দুমাত্র নম্বর দেয় না। কর্পোরেট এবং নব্যউদারবাদ চেষ্টা করে মহিলাদের স্বাধিকার মুক্তির নাম করে এই লুঠেরা সংস্কৃতিতে যত বেশি মহিলাদের জুড়ে নেওয়ার যায় সেই চেষ্টা করা। কেননা স্বাভাবিকভাবে মহিলাদের পরিচালন দক্ষতা অসাধারণ। কোন বেকার পুরুষকে এই কাজ করতে দিলে সে ল্যাজেগোবরে হবে। একজন মহিলাকে কত কী খুঁটিনাটি যে মনে রাখতে হয় তা চিন্তা করতেগেলে পাগল হয়ে যেতে হয়। বাপেরবাড়ি এবং শ্বশুরবাড়ির যে বৃহত্তর পরিবারের সে ধারণ করে চলে নিয়মিত, তার সমস্ত কিছু নখদর্পণে থাকে তার। সে যেন চলন্ত পারিবারিক কোষ।
অথচ এই মহিলারা লক্ষ লক্ষ বছর আগে কোন বীজ পুড়িয়ে খেতে হয়, কোন বীজ সেদ্ধ করে খেতে হয়, কোন বীজ কাঁচা খেতে হয় তা পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে আবিষ্কার করে সমাজ এবং পরিবারের পুষ্টি যাতে নিশ্চিত হয় তার ব্যবস্থা করেছিলেন। এই কাজে কত মহিলার যে প্রাণ গিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই কেননা এই পরীক্ষায় বিষ বীজও তাদেরকে খেয়ে দেখতে হয়েছে। 
এ রকম হাজারো দক্ষতার কথা বলে যেতে পারি একের পর এক।
তো এই কাজগুলোকে বর্তমানে কর্পোরেট কোন দিন গুরুতে দেয় না। কেননা মেয়েদের জন্য সে আলাদা বাজার বানাতে চায়। শুধু ব্যক্তি মেয়েদের জন্য কি বশাল বাজার তৈরি হয়েছে কর্পরেটদের দয়ায়। 
কিন্তু আমরা যারা কর্পোরেট বিরোধী সমাজের লক্ষ্যে কাজ করি তাঁদের কাছে এই জ্ঞান চর্চার গুরুত্ব অসাধারণ। প্রত্যেকটা পরিবারের নিজস্ব টোটকা ছিল। সেই জ্ঞান কর্পোরেট মহিলারা আর জ্ঞান হিসেবে মানতে চাইছেন না, রাস্তার ধারে ওষুধের দোকান আছে সেখানে যাও ব্যাস, দুমিনিটের ম্যাগির মত সমস্যার চটজলদি সমাধান।
ফলে এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করার আছে। একটু সময় নিয়ে একটা বড় করে প্রদর্শনী করার আছে। 
তার জন্য মাসিমাদের মত মানুষের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা জরুরি। তারপরে কাজে নামা, মাঘের দিকে।

Sunday, June 25, 2017

মানুষ ধর্ম কেন বদল করে - দেবজ্যোতি মিত্রের উত্তরে

বাঙালির আত্মনুসন্ধানের ইতিহাস আমরা লিখি না - যারা লিখেছেন তাঁরা বাঙালির নমস্য সব নাম - আমরা মার্ক্সের ভাষায় আনপড়, গাঁইয়া - আমাদের তুচ্ছ কাজ ছোটলোকেদের ব্যবসা আর প্রযুক্তির ইতিহাস খুঁজে বার করা - ছোটলোক বাঙালির সম্পদ লুঠ নিয়ে কিছু খোঁজ খবর করা আর তা সবার সামনে তুলে ধরা।
যেহেতু আমি/আমরা ভদ্রশ্রেণীর মানুষ, জাগতিক ধর্ম বা আচারিক ধর্ম বা ধর্ম পরিবর্তন বিষয়ে আমার/আমাদের আগ্রহ তুলনামূলক কম - যতটা কর্পোরেট বা রাষ্ট্র সম্বন্ধে আমাদের আগ্রহ তার অনেক কম আগ্রহ ধর্ম সম্বন্ধে আলোচনায় - তার ওপর ছোটবেলাটা বামপন্থী আবহাওয়ায় কেটেছে - আমার পৈতেটাও হয় নি দিদিমার করুণ আবেদন সত্ত্বও, আমি কোন দিন পাড়ার পুজো কমিটিতেও ছিলাম না - খুব বয়স পর্যন্ত ধর্মের কোন আচারাচরণও জানতাম না। আজও জানি না খুব একটা।
ছোটবেলা থেকেই আমি মনে করি ভারতে ধর্ম মানে রেলজিয়ন বোঝানো হয় না - এটা পশ্চিমি ধারণা। আম গাঁইয়া ভারতীয়দের জন্য নৈতিকতা বা ঈমান খুব জরুরি শব্দ বা আচার - ধর্ম শব্দটা চরিত্র বোঝানোর জন্য ব্যবহার হয় - অন্তত ব্রিটিশ আসার আগে পর্যন্ত হত - যেমন শিক্ষকের ধর্ম পড়ানো বা জলের ধর্ম নিচের দিকে যাওয়া ইত্যাদি - ছোটলোকেরা এইভাবেই ধর্মটা দেখে বলেই আজও খুব বেশি দাঙ্গা হয় না এই বাংলায়, ভারতের কথা জানি না - সেই জন্যই ফকির সন্ন্যাসীরা যৌথভাবে পলাশীর পাঁচ বছর পর অস্ত্র হাতে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে নেমে পড়ে।
মানুষ কেন মরতে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা দিয়ে প্রাইভেট হাসপাতালে যায়? ঠিক সেই জন্য মানুষ তার জাগতিক ধর্ম পরিবর্তন করে - যখন সে আতান্তরের শেষ পর্যায়ে পৌঁছে যায় - তার আর কোথাও যাবার থাকে না - মানসিকভাবে সে শেষ হয়ে যায় - সে মনে করে যে চরিত্রটা সে এতদিন বহন করে এসেছিল সেটা আর সে বইতে পারছে না।
আমরা উন্নাসিক নই - মানুষকে ধান্ধাবাজ বলার অধিকার আমাদের নেই - অনেক কষ্ট করে একজন মানুষ তার চেতনা বিকাশ করে - তাকে অজ্ঞান বলে দেওয়ার অধিকার আমাদের কারোর নেই - আমরা যে যতই হনু হই না কেন - আমরা যারা ব্যক্তি মানুষের ধর্ম পরিবর্তনের সমালোচনা করছি তারা কেউ কি একবারও তাঁদের কারোর পাশে দাঁড়াবার চেষ্টা করেছি? মমতা ব্যনার্জী যখন ধর্মতলায় অনশন করছিলেন, যখন তিনি বারবার গ্রামে গ্রামে দলের আক্রান্ত কর্মীদের জন্য ছুটে যেতেন তখন কেউ কি আমরা তাঁর পাশে থেকেছি? ঠিক তেমনি মানুষ কত খাদের পাশে দাঁড়ালে তার চেনা পরিজন, সমাজ চেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় - সে রাতের অন্ধকারে একা একা সিদ্ধান্ত নেয়, কারণ সে জানে তারপাশে দাঁড়াবার মত কেউ নেই- লুঠেরা রত্নাকরের পাশে বউ বাবাই দাঁড়ায় নি।
আমাদের মনে হয় এই বিতর্ক অনভিপ্রেত। আপনি প্রাজ্ঞ মানুষ। বিশেষ করে এই খোলা বাজারে এত ভারি বিতর্ক কোথায় যে কিসের জন্ম দেয় কে জানে? এই চর্চাটা নিজের মনের গভীর আত্মানুসন্ধানের বিষয় - অন্ধকারে ধ্যান করে উত্তর খোঁজার বিষয়।
শেষে অনুরোধ করব রিচার্ড ঈটনের রাইজ অব ইসলাম এন্ড দ্য বেঙ্গল ফ্রন্টিয়ার বইটা সময় করে পড়বেন, আপনি যে বিষয়গুলোর খোঁজ চালাচ্ছেন তার কিছুটার সূত্র হয়ত এখানেও পেতে পারেন -
শুভেচ্ছা রইল। ফাঁকা কলসি বেশিই আওওয়াজ করলাম।
ভাল থাকবেন।
https://archive.org/details/EatonRichardTheRiseOfIslamAndTheBengalFrontier

কেন পলাশি

পলাশীর আগে থেকেই বাঙালি অভিজাত, তারমধ্যে কিছু মুসলমান, অধিকাংশ অমুসলমান ব্রিটিশদের সহায়ক হয়েছিলেন। শূদ্র-বৈশ্য-মুসলমানের যৌথ উদ্যোগে গড়ে তোলা বাণিজ্য উদ্বৃত্ত বাংলাকে বিশ্বাসঘাতকতা করে কর্পোরেট পশ্চিমি শাসনের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। বঙ্কিমের আগে এই ভিত্তি গড়ে দিয়েছিলেন রামমোহন-দ্বারকানাথ-বিদ্যাসাগর ত্রয়ী। তাঁদের তৈরি করা তত্ত্বকে ফলেফুলে ভরিয়ে তোলেন বঙ্কিম।
আমরা এই পুরো ব্যাপারটাকে অন্য দৃষ্টভঙ্গীতে দেখি। মূলত ধর্মযুদ্ধের(ক্রুসেড) সময় থেকেই বাণিজ্যে অধমর্ণ পশ্চিম, পূর্বের ভারত-পারস্য-চিনের যৌথ বাণিজ্য চাকাটাকে তাঁদের দিকে ঘোরাবার চেষ্টা করছিল। কোন কোন শক্তি এদিকে এসেছিল তা আমরা ইতিহাসের সূত্রে জেনে গিয়েছি - পর্তুগিজ, ডাচ, ফরাসি, ব্রিটিশ চেষ্টা করেছে এই উপমহাদেশকে, বিশেষ করে বাংলাকে পদদলিত করার, যে উৎপাদন ব্যবস্থা শূদ্র-বৈশ্য-মুসলমানের যৌথ উদ্যোগে গড়ে উঠেছিল, তার হেঁটমুণ্ড উর্ধ্বপদ করানো। ভারত-আরব যে বিকেন্দ্রিত বাণিজ্য এবং জ্ঞানচর্চা গড়ে উঠেছিল, তকে ধ্বংসকরে কর্পোরেট কেন্দ্রিভূত বাণিজ্য জ্ঞানচর্চা চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল।
পলাশী তার সূচনাবিন্দু। ভদ্রদের ক্ষমতায়ন এবং শূদ্র-বৈশ্য-মুসলমান উৎপাদন ব্যবস্থার ধ্বংস সাধন।
আমরা এখনও মনে করি শূদ্র-বৈশ্য-মুসলমান কারিগরেরাই এই উদ্বৃত্ত বাংলা তৈরি করেছিলেন, সেখানে অভিজাতদের কোন নলচল ছিল না। যেহেতু পলাশীর আগে পর্যন্ত সম্রাট বা সুলতান বুঝতেন কারিগর আর চাষীর থেকে আসা রাজস্ব তাঁদের বেঁচে থাকা সুনিশ্চিত করে, তারা কারিগর আর চাষিদের যতটা পারাযায় পালন করতেন। কারিগর চাষীদের ওপরে যে কোন অত্যাচার কড়া হাতে দমন করা হত পলাশী পর্যন্ত। ১৮৩৬সালের উইলিয়াম এডামের বাংলার শিক্ষা সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে শূদ্র-বৈশ্য-মুসলমান ছাত্ররাই পাঠসালা, মাদ্রাসাগুলিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ, উচ্চবর্ণ মাত্র ১৫%। ফলে গোটা জ্ঞানচর্চা আর উৎপাদন ব্যবস্থা ছোটলোকেদের হাতে ছিল যার রক্ষা কর্তা ছিলেন নবাব বা সুলতান।
আমরা যারা গাঁইয়া উতপাদকেদের সঙ্গঠন করি যেখানে মূলত শূদ্র-বৈশ্য-মুসলমানেরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ তারা মনে করি অভিজাতরা এই উৎপাদন ব্যবস্থা ধ্বংস করতে সুলতানি তুলে ব্রিটিশদের সহায়তা করে কর্পোরেট ব্যবস্থার গোড়াপত্তন করেছিলেন।
যখন বাংলা নিজের জ্ঞান, প্রযুক্তি, নিজের বাজার, প্রজ্ঞা নিয়ে উৎপাদন এবং নিজের শিক্ষা ব্যবস্থা আপন করেছিল ততদিন বাংলা বিশ্বজয়ী ছিল - উপমহাদেশের জিডিপি ছিল ২৫ তারমধ্যে বাংলারই ৫। এবং গোটা উৎপাদন ব্যবস্থা, প্রযুক্তি আর বিতরণ ব্যবস্থাই ছিল শূদ্র-বৈশ্য-মুসলমানের হাতে। তাই পলাশী ঘটে।
অথচ আজ উভয় ধর্ম নির্বিশেষে যখন আমরা পশ্চিমি জ্ঞানচর্চা আর প্রযুক্তির দ্বারস্থ হয়েছি। পলাশীর পরে অভিজাতদের চেকনাই বেড়েছে কিন্তু সার্ভিকভাবে বাংলা এবং বাঙালির অধগমন শুরু হয়েছে এটা বলা যায়। যে বাংলা ভাষার ৪০০টি শব্দ চিনারা চিনা ভাষাভ অনুদিত করে, যে বাংলায় যারা বিশ্বের মানুষ ব্যবসা করতে আসত সেখানে আজ বাঙালি বিদেশে চাকরি করতে যায়। পরের ধার করা ধনে নতুন করে বাংলা গড়ে তোলা যাবে না।
যতদিননা আমরা ১১৬৪ বঙ্গাব্দে বাংলা যে অবস্থায় ছিল সেই অবস্থায় পৌঁছতে পারছি, ততদিন বাংলার মুক্তি নাই।

উপনিবেশবাদ বিরোধী চর্চা - অভীক সরকারের পতন ও মুর্চ্ছা - ছোটলোকেদের রাজনীতি

(গত বছরের লেখা)

অরূপশঙ্করদা ফেবুতে লিখেছেন অসাধারণ এক ব্যজস্তুতি, সেটা তুলে দেওয়া গেল-
আনন্দবাজার-অভীক সরকার=%$&#;)(+$!
চিন্তায় রাতের ঘুম উবে গেছে বাঙালির বিবেকবান কবি শিল্পী সাহিত্যিক নাট্যব্যক্তিত্বর দল!
আমাদের কী হবে?
কিচ্ছু হবেনা! নিশ্চিন্ত থাকুন!
আনন্দবাজার+অরূপ সরকার= উন্নততর আনন্দবাজার!
হে আনন্দিত ভক্ত বুদ্ধিজীবীগণ,
আপানারা নিশ্চিন্তে আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ করুন!
'' আগুনে পোড়ে না
হুশ করলে ওড়ে না,
বাসে-ট্রামে-ইউরিনালে
পাবলিক ভাবে সে বলছে,
আসলে বলছে আনন্দবাজার"
(চন্দ্রিল)
পাবলিক ভাবে সে বলছে, আসলে বলছে আনন্দবাজার! পাবলিক ভাবে সে বলছে, আসলে বলছে আনন্দবাজার! পাবলিক ভাবে সে বলছে, আসলে বলছে আনন্দবাজার!
---
এবারে আমাদের মত-
আমরা 'উন্নততর আনন্দবাজার' নিয়ে Arupsankarদার মতই নাক উঁচুত্বে ভুগছি - বাংলার তাবড় তৈরি করা ভাববার মাথাদের তার সৃষ্টির সামনে মাথা নামাতে বাধ্য করিয়েছেন, এটা অভীক সরকারের যোগ্যতা ১৯৮৩ থেকে ২০১৬ এই এক প্রজন্মের বেশি সময়ধরে করেছেন, এখন তাঁর বর্তমানে?

১। পার্থক্য হবেই হতেই হবে - আপনি যাই মনে করুন না কেন - অভীক সরকার মধ্যবিত্ত বাঙ্গালিকে বড় পুঁজির সেবাদাস হওয়ার দুশ বছরের পরম্পরার ইতিহাসের সঙ্গী করেছিলেন বুকে পুষে রাখা একটুকরো ইওরোপের(কয়েক দশক ধরে ইওরোপের যায়গা একটু একটু করে দখল করছিল আমেরিকা) ঝুটা কোয়ালিটি অব লাইফ - এবং দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হয়ে ওঠা আর সেখানকার তুলনার কম মাইনেতেই "ভাল" জীবনযাত্রার স্বপ্ন দেখিয়ে।এটা সফলভাবে রূপায়িত করতে ধঁক লাগে, যেমন পলাশীর পরে গ্রাম-বিপ্লবী বাংলার দিকে সেনা লেলিয়ে আর মধ্যবিত্তের পিঠ ফিরিয়ে ব্রিটিশিয় ট্রেভরিয়ান-মেকলে জুটি সফলভাবে বলে বলে করতে পেরেছিল। তাদের আগে ক্লাইভ, হেস্টিংস, কর্নওয়ালিস অত্যাচার করেছে, লুঠ করেছে, ধ্বংস করেছে কিন্তু ভদ্রদের পুরোপুরি দাস বানাতে সক্ষম হয় নি, যতদিননা সংস্কৃত কালেজ, গৌরমোহন আঢ্যের পথ বেয়ে, রামমোহন-দ্বারকানাথ জুটির সঙ্গত আর বঙ্গীয় 'মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ ধুলার পরে' জাতীয় ঔপনিবেশিক কলক্কাত্তিয়া মধ্যবিত্ত নাট্যশালায় তালপাতার চটি আর খেঁটো ধুতি পরা বিদ্যাসাগরের প্রবেশ ঘটে নি আর সাংস্কৃতিক দাসত্বে গলায় গড্ডলের গলবন্ধ পরতে উন্মুখ বাঙালির জন্য কর্পোরেটিয় ট্রেভরিয়ান-মেকলে জুটি আসেন নি।
.
২। স্বাধীনোত্তরকালে অভীকবাবু তাঁদের যোগ্যতম উত্তরসূরী - আগামী কয়েক বছরের জন্য হয়ত - আনন্দবাজারের এই বঙ্গীয় দবদবা নিশ্চই থাকবে - শঙ্খ-সুনীল-শীর্ষেন্দু-স্বপ্নময় বানানো আর উচ্চজীবনযাত্রার স্বপ্ন দেখানো রাজনীতি থাকবে - অভীকবাবুর তৈরি করা দাসত্বের অনুরণন এত তাড়াতাড়ি মুছে যাবে না - এবাবদে অভীক সরকারের রণনীতি ট্রেভলিয়ন-মেকলে সূচক, বোধহয় তাঁর থেকেও বেশি - এবং তাঁর পদত্যাগটা যদি লোকদেখানো পরিবর্তন না হয় - দৈনন্দিনের মধ্যবিত্ত বাঙ্গালিকে ইওরোপ আমেরিকার দাস হওয়ার স্বপ্ন দেখানোতে অভীকিয় ক্ষুরধার(মধ্যবিত্তের ভাষায় -আর আমাদের ভাষায় গাড়োলিয়) বুদ্ধির ঘাটতি পড়বেই - এবং আনন্দবাজার এবং ইংরেজিশিক্ষিত দেরিদাফুকো কপচানো মধ্যবিত্ত সেই ঘাটতি অনুভব করবে আরও কিছু বছর পর। এটা আমি নিশ্চিত - আশাকরি ততদিন আমি আপনি বেঁচে থাকতে পারব - সেই আনন্দময় দুর্দশা চাক্ষুষ দেখতে

৩। এবং এই ঘটনাটার সঙ্গে চেপে থাকা মানুষের উত্থানের বড় যোগ থাকবে - থাকবেই।

জয় বাংলা!

পলাশির দুশষাট বছরে ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে

১১৬৪র আষাঢের প্রথম হপ্তায় পলাশি ঘটেছিল ব্রিটিশ-অভিজাত-ভদ্র বাঙালির বিশ্বাসঘাতকতায়।
বাংলায় বিশ্বাসঘাতকদের অন্যতম ইঙ্গ-বঙ্গ-প্রতিনিধি খবরদার সরকার মশাইয়েরও বিদায় ঘটল গত বছর পলাশির দিনেই।
পলাশীর দুশ ষাট বছর পর গত বছর ব্রিটেনে গণভোট হঠতই যেন ইওরোপের জাতিসত্ত্বার বন্ধ ঝোলার আগল খুলে দিয়েছে। চাপিয়ে দেওয়া ইওরোপিয় ইউনিয়ন যেন সোনার পাথরবাটি মনে হচ্ছে ইওরোপিয়দের।
আজ যেন ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে বাংলার তথা বিশ্বের ইতিহাস-অর্থনীতি বদলাবার দিনের বদলা নেওয়ার সময় আগত।
কোমর বাঁধ বন্ধুরা।
বড় কর্পোরেট পুঁজির শেষের দিন সমাসন্ন।
এবারে বাংলার পথ বেয়ে গ্রামের দক্ষতা, জ্ঞান, গাঁইয়া প্রযুক্তি, তার নিজস্ব বাজার এবং অকেন্দ্রিভূত পুঁজির নিজের মত করে লড়াই করার দিন আসছে।
চাপানো ভাবনা, তত্ত্বের দিনের পরিসমাপ্তি।
জয় বাংলা!
জয় জয় বাংলা!
জয় কারিগর বাংলা!
জয় বাংলার অদম্য গাঁইয়া জ্ঞানচর্চা!

Wednesday, June 21, 2017

মমতা বামপন্থীদেরমত ইউরোসেন্ট্রিক নন, অভিজাত নন, আজকের দিন পর্যন্ত এটাই ভরসা

ভাল... ভাল... এক দু জন ছাড়া সম্প্রতি আবাপ গোষ্ঠীর দিকে আঙ্গুল তুললেন না কেউই। আজ(২১/৬/১৩) আবাপর দু স্তম্ভের প্রতিবেদন- শহরের জমি দখলের ঊর্ধ্বসীমা তুলে দিতে বনিক সভা লবি করবে। ববি-মমতা সিপিএমি এই কাজে সংগ দেয় নি বলে তাদের গলা কাটা হয়েছে এবিপিতে রোজ রাতে। গারডেনরিচ ঘটনায় অসত্য-অর্ধসত্য প্রচার করে ববিকে কচুকাতা করা হয়েছে। বেচু সিপিএম শহরের জমির ঊর্ধ্বসীমা তুলে দিতে খুব চেষ্টা করেছিল। শুধু সে বেচারা ২০১১য় হেরে গেল। তাই পারেনি।
সিপিএমের আমলেই তৈরি হয়েছিল এমন হকারি আইন, যাতে রাস্তায় হকারি করে ধরা পড়লে ৬ মাসে বিনা বিচারে জেল হয়। বেলটি কিন্তু মিলবে না। ধর্ষণ করলে, খুন করলে কিন্তু বেল হবে।
হেরে না গেলে ম্যাকিন্সেকে দিয়ে চুক্তি চাষের কৃষি নীতি প্রয়োগের জন্য তৈরি হয়েই গিয়েছিল। জ়েনেটিক বীজ নিয়ে মনসান্তো বাঙলায় পা রেখেছিল তাদেরই আমলে। কোকাকোলা আর পেপসিও। গনশক্তিতে লাল-নীল বিজ্ঞাপন ছিল এক পাতা। ভুলে গেলেন? সিপিএমের বড় কৃষক নেতা, জয়া মিত্রদিদিকে ব্যাঙ্গ করে বলেছিলেন আপনারা চাষাকে চাষাই রাখতে চান। আমরা চাকরি দিতে চাই। তার উন্নয়ন চাই। কলকাতা টিভিতে সেই বিখ্যাত আলোচনাটার রেকরডিংটি াকলেও থাকতে পারে। ইতিহাস লিখতে কাজে লাগবে।
তাই একদিকে গৌতমএর ক্যাডার একদিকে বুদ্ধএর পুলিসকে সম্বল করে গ্রাম তুলে, চাষ তুলে, চা বাগান তুলে, গ্রামের মানুষকে বন্দুক আর ক্যাডারের গুঁতোর সামনে ফেলে, বাংলাজুড়ে নতুন নতুন শহরীকরণএর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করছিল। জেএনএনয়ুআরএমের সব থেকে বড় সমালোচক আর খাতক ছিল বামফ্রন্ট।
জরুরী অবস্থায় সিআরপিএফএর ধারনার বিরুদ্ধে লড়াই করা বামফ্রন্ট জঙ্গলমহলে তাদের সাদরে নিয়ে এল, যাতে জিন্দালেরা, একসময় ব্রিটিশদের সঙ্গে মিলে আফিম ব্যাবসা করে পুঁজি জোগাড় করা টাটারা বাঙলা লুঠতে পারে। গ্রাম তুলে নতুন বিমান বন্দর, নতুন স্বাস্থ্য শহরের(মানে কি??)ও পরিকল্পনা করেছিল। প্রায় প্রত্যেকটা বিষয়েই এই নীতিএগুলোর বিরুদ্ধে দিল্লিতে ধরনা দিয়েছে, দেশজুড়ে আন্দোলন করেছে, টিভিতে বকবক করেছে দ্বিরাচারী সিপিএম।
এত সহজে ভুলেগেলে হবে কমরেড? আমরা কিন্তু সহজে ভুলিনি, মমতা খুচরো বাজারে বাঙলায় এফডিআই আসতে দেন নি। মমতা বাঙলায় একটাও এসইজেড হতে দেন নি। সিপিএম এসইজেড করে গিয়েছে একের পর এক। মমতা বড় শিল্পএর বিরুদ্ধে। সরাসরি। মমতা বড় বড় রাস্তা হতে দিচ্ছেন না বেশি। এই বিষয়গুলো নিয়ে এবিপি কি চায়, আমরা পিছিয়ে পড়ারা, সকলেই জানি। সিপিএমকে ঘোমটার আড়ালে, ক্যামেরার সামনে নিয়ে গ্রামের জনগণকে বোড়ে করে তারা বিভিন্ন ভাবে মমতাকে প্রভাবিত করতে চেষ্টা করছেন, যেভাবে ন্যানোর সময়, নন্দীগ্রামের সময় করেছিল। মমতা এখনও পর্যন্ত প্রভাবিত হন নি। এইটুকুই আশ্বাস। তারা এবং ২৪ ঘন্টা ঘুটি সাজাচ্ছে।
তারা ভেবেছিল, হয়ত সিপিএমের থেকেও বড় উন্নয়নবাজ হবেন কংগ্রেসি রাজনীতি করে আসা মমতা। তাদের বাড়া ভাতে চাই পড়েছে। গালে হাত দিয়ে তাই আবার সিপিএমের ক্ষমতায় আসার পরিকল্পনা। বড় পুঁজিও চেষ্টা চালাচ্ছে। মার্কিন রাষ্ট্রদূত দুএকবার দেখা করে গিয়েছেন। মমতাকে এবিষয়গুলো নিয়ে নাড়ানো যাচ্ছেনা বিন্দুমাত্র। সিপিএম ক্ষমতায় এলে এগুলো করবেই করবে। কায়দা করে। বামপন্থী মধ্যবিত্তের উন্নয়নের ঘোমটা পরিয়ে।
......৩৪ বছরএর বামপন্থী ফান্দা আর ডাণ্ডা এত তাড়াতাড়ি ভুলে যাব কমরেড??? কোথায় ছিলেন কমরেড, যখন দুবরাজপুরে লড়াই করা সাঁওতাল যুবক-যুবতীদের খাদান মাফিয়ারা পুলিস দিয়ে পেটাচ্ছিল, আর সিপিএম আদিবাসী আর মুসলমানদের মধ্যে কৌশলে দাঙ্গা লাগাবার চেষ্টা করছিল? কোথায় ছিলেন কমরেড যখন মরিচঝাঁপিসহ হাজারো গণহত্যা হয়েছিল? কোথায় ছিলেন কমরেড যখন জন মেজর কলকাতায় এলে কলকাতা আর বাংলাজুড়ে রাতের আঁধারে হকার উচ্ছেদ হয়েছিল? কোথায় ছিলেন কমরেড যখন কলকাতার খালপাড়গুলোতে সংস্কার উন্নয়ন আর সৌন্দর্যায়নের নামে পুলিস, ক্যাডার লাঠি ঘুরিয়ে ঝুপড়ি তুলে বহ্নু মহোৎসব করছিল? কোথায় ছিলেন কমরেড যখন ডিএফাইডির টাকা নিয়ে কারখানার শ্রমিকদের ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বার করে দিয়েছিলেন? কোথায় ছিলেন কমরেড যখন রাজারহাটে কৃষকদের ভিক্ষেমুষ্টি দিয়ে, পুলিসের জল কামান লেলিয়ে কিছু জলা, আর অধিকাংশ উর্বর জমিগুলো কেড়ে নেওয়া হল? কোথায় ছিলেন কমরেড যখন সারদারা, টাওয়ারেরা জেলা থেকে মুঠি মুঠি টাকা তুলছিল আর আপনাদের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো সেই তোলা টাকা থেকে কোটি কোটি টাকা দান নিয়ে সমাজ সেবা করছিল? কোথায় ছিলেন কমরেড যখন একমাস আগে এডিবি দিল্লিতে এজিএম করছিল, মানুষ উচ্ছেদের জন্য উন্নয়নের টাকা বরাদ্দ করছিল আর দিল্লি বা দেশ সে খবর জানতেই পারে না।
কি আন্দোলন করেছিলেন তখন? কেন বড় পুঁজি খেপে যাবে তাই? আর সব নানান কাণ্ড ঘটনা বহুবার বলা হয়েছে, নতুন করে বলার দরকার নেই, সকলেরই স্মৃতি জেগে উঠবে, চোখ জলে ভেসে যাবে। সিপিএম এখনও চিনের, ইওরোপ, আমেরিকার দেখানো বড় পুঁজির পথের মত করে উন্নয়ন চায়। ইয়িচুরিবাবু ছত্তিসগড়ে তাইই দাওয়াই দিয়েছেন।
মমতা বামপন্থীদেরমত ইউরোসেন্ট্রিক নন। এলিট নন। আজকের দিন পর্যন্ত এটাই ভরসা।
চার বছর আগের লেখা...

Tuesday, June 20, 2017

গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনঃ গোর্খাল্যান্ডের আওতায় থাকা ছোটলোক বৈশ্য-শূদ্র-মুসলমান কারিগরেরা শঙ্কিত

বন্ধুরা বাংলা রেজিমেন্টের জন্য দরবার করছেন। অতীতে Dipankarদা দাবি করেছেন। গোর্খা রেজিমেন্টের গোর্খাল্যান্ডের জন্য বন্দুক তোলার হুমকির ভিডিও দেখে আমাদের বাংলাদেশের বন্ধু Sihabul Islamও দাবি জানাচ্ছেন। 
বাংলা রেজিমেন্ট থাকলেও কি হত আমরা জানি না। খুব বেশি হলে বিদ্রোহ করত। আপাতত ভারত রাষ্ট্রের যা সামরিক বাহুবল তাতে কতদূর কী হত বলা মুশকিল।
কিন্তু গোর্খাল্যান্ড বিষয়ে সমস্যা হল বাঙালি শহুরে বাম-উদার-ভদ্রলোকেদের মানসিকতা। তারা কি চান তারাই জানেন না। তাদের না আছে নিজস্ব সম্পদ, না আছে সাংগঠনিক জোর। অথচ তাঁরা নিজেদের চাকরি-ব্যবসা-দালালি ঠিক রেখে রাষ্ট্রের, আন্দলনের নীতি নির্ধারণের শেষ কথা হয়ে উঠেছেন।
আমরা যারা খেটেখাওয়া ছোটলোক কারিগর, তারা পাহাড়ের আন্দোলনকারীদের দাবি আর সমতলে তাঁদের বন্ধুদের দাবির মাঝে পড়ে শঙ্কিত হয়ে রয়েছি। কেননা পাহারিয়া আন্দোলনকারীদের দাবি এক ধরণের আর তাঁদের সমতলের বন্ধুদের দাবি অন্যরকম। কয়েক বছর আগে বহু উস্কানিতে ভোটের আগে গোর্খারা সমতলে নেমে লড়াই করেছিল। আজও এই অবস্থা হবে কিনা জানি না।
যেভাবে গোর্খা সেনা বাহিনী(কথা বলছেন একজন কিন্তু তাঁকে সমর্থন করছেন পিছনের সেনারা) প্রকাশ্যে বন্দুক তুলে এই আন্দোলনকে মদত দিচ্ছেন, সেটা শঙ্কাজনক শুধু এই বারুদভরা আন্দোলনের প্রেক্ষিতেই নয় সামগ্রিকভাবে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সুসম্পর্ক রাখায়। সাধারণত ভারতের সেনাবাহিনী রাজনীতিতে খুব একটা মাথা গলায় না - ক্ষমতার নির্দেশ ছাড়া। তাহলে কি এ ক্ষেত্রে ক্ষমতা নতুন সমীকরণ চাইছে?
এ নিয়ে নতুন করে ভাবা দরকার।
অন্তত আমরা, বৈশ্য-শূদ্র-মুসলমান এবং অন্যান্য পরম্পরার সমাজের কারিগরেরা সাঙ্গঠনিকভাবে তো ভাবব সেটা নিশ্চিত - আগামী সপ্তাহে দিনাজপুরে ওয়াটাগের বৈঠক আছে।
সেখানে কিছু না কিছু সিদ্ধান্ত তো হবেই।

বাম দৃষ্টিভঙ্গীতে চিরস্থায়ী ব্যবস্থাঃ লুঠ না গ্রাম বিকাশের হাতিয়ার৪

তথ্যভিত্তি - সামাজিক ইতিহাসের ধারাঃ বিনয় ঘোষ
পলাশির পরের লুঠ এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে ১১৭৬ সালে বাংলায় মন্বন্তর, আমাদের ভাষায় গণহত্যা অনুষ্ঠিত হয় – সেই সময় সব থেকে বেশি রাজস্ব আদায় হয়। দেশজুড়ে তখন ফকির-সন্ন্যাসীদের ব্রিটিশ বিরোধী লড়াই। লুঠ, খুন আর অত্যাচারের আবহে ফিলিপ ফ্রান্সিস আসেন ১১৮১ সালে। দুবছর পরে তিনি চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কাছাকাছি একটা প্রস্তাব পেশ করেন। ১১৯৭তে দশসালা পরিকল্পনা আর ১১৯৯ সনে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ঘোষণা হল। বিনয় ঘোষ বা অন্যান্য নিম্নবর্গএর ঐতিহাসিকদের বক্তব্য ছিল ব্রিটিশ এই কাজটা করেছিল কেননা তাদেরে ধারনা ছিল রাজস্ব সুনির্দিষ্ট করে দিলে জমিদার জমিদারি সুষ্ঠুভাবে চালাতে উতসাহিত হবেন, চাষবাসের উন্নতি হবে, গ্রাম সমাজের উন্নতি হবে এবং দেশের শ্রীবৃদ্ধি হবে – লুঠেরা অত্যাচারী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাসীদের ওপর তাদের কী আশা! কিন্তু তাদের কারোর চোখে পড়ল না যে এই পরিকল্পনাটা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ধারাবাহিক বাংলা লুঠের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর আগে বহুবার ব্রিটিশদের চাপে পড়ে মীরজাফর থেকে মীর কশিম, জমিদারদের রাজস্ব বাড়িয়ে, জমিদারদের বকলমে রায়তদের শেষণ করেছেন। রয় মক্সহ্যাম দেখালেন যে, নুনের ওপর কয়েক শতগুণ শুল্ক চাপানোয়, তার দাম হেস্টিংসের সময় এতই বেড়ে যায়, আর রায়তদের রোজগার এতই কমে যায় যে রায়তেরা নুন খাওয়া কমিয়ে দেয়।
লুঠ চলতেই থাকে। অনুপস্থিত জমিদারদের সংখ্যা বাড়তেই থাকে। জমিদারির ভাগ হতে হতে জমিদারির সংখ্যা দ্রুত হারে বেড়ে চলতে থাকে। প্রায় বিশ বছর পর সিলেক্ট কমিটির ফিফথ রিপোর্টে বলা হল বহু অযোগ্য জমিদারদের হাতে রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে। এতে এদের কোন যোগ্যতাই নেই। বুদ্ধিহীন, নির্বোধ, উচ্ছৃঙ্খল বিলাসী অমিতব্যয়ী স্বেচ্ছাচারী নিষ্ঠুর স্বার্থপর ডাকাত পোষক অভধায় জমিদারদের অভহিত করল ফিফথ রিপোর্ট।
জমিদারি না চলার সমস্ত দায় বিনয়বাবুরা চাপিয়ে দিয়েছেন শুধুই জমিদারদের ওপরে – ব্রিটিশদের তিনি খোলা ছাড় দিয়ে রেখেছেন। বইতে তিনি মন্তব্য করছেন, এই অভিধায় অভিযুক্ত জমিদারশ্রেণীর হাতে ইংরেজ শাসকেরা গ্রাম্য সমাজের দায়িত্ব অর্পণ করে নিশ্চিন্ত হলেন। এবং তিনি আরও বলছেন যে জমিদারদের এমন কতগুলি ক্ষমতা দেওয়া হল যাতে তারা নিজেদের অস্তমিত সুদিন ফিরিয়ে আনতে পারেন। কিন্তু চিরদিনের বিলাসিতার অভ্যাস ও স্বভাবশৈথিল্যের জন্য জমিদারদের অনেকেই নির্দিষ্ট দিনক্ষণে দেয় রাজস্ব মেটাতে পারে নি – তাদের অজুহাত প্রজাদের দুরবস্থা ও খাজনা অনাদায়। বিনয়বাবুদের তার মনোভাবটা এমন যে ব্রিটিশ জমিদারদের যে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিল তা জমিদারেরা সঠিকভাবে পালন করতে পারেন নি।
দায় মেটাতে পারে নি বলেই সূর্যাস্ত আইনে জমিদারি সম্পত্তি লাটে ওঠে ও অন্য কারোর কাছে বিক্রি হয়ে যায়। ঠিক এইরকমভাবে রামমোহন তার পিতার দায়িত্বপ্রাপ্ত জমিদারির খাজনা সময় মত না শোধ করায় পিতা কারারুদ্ধ হন এবং না দেয় সেই উদ্বৃত্ত অর্থ অবলম্বন করে কুসীদজীবিতায় অবতীর্ণ করেন। আদতে এই সব জমিদারি যারা কেনেন, তাদের অধিকাংশ ইংরেজদের দয়ায় দেওয়ানি-বেনিয়ানি-মুচ্ছুদ্দিগিরি করে, হাট-বাজারের ইজারা নিয়ে প্রচুর ধন আহরণ করেছেন। ইংরেজদের বদান্যতায় পলাশীর পরে বঙ্গ লুঠেরা বাবুদের উত্তরপুরুষদের সিন্দুকে অমিত ধন সঞ্চিত ছিল। কর্নওয়ালিস এবং সাম্রাজ্য এই তত্ত্ব জানতেন এবং কর্নওয়ালিস ১২০০ সনে ডিরেক্টরদের একটা চিঠিতে লেখেন, দেশিয়দের হাতে যে বিপুল পরিমান অর্থ জমে আছে, তার বিনিয়োগের যায়গা নেই...আমরা যদি জমিদারির সময় নির্দিষ্ট করে আয় নিশ্চিত করতে পারি, তাহলে এই বিপুল অর্থ জমিদারিতে বিনিয়োজিত হবে।
ব্রিটিশেরা তো গ্রামের উৎপাদন ব্যবস্থা ধ্বংস করার পাশাপাশি রাজস্ব লুঠছিল। সে সময় ব্রিটেনে বিপুল ভর্তুকি দিয়ে তৈরি হচ্ছে লুঠেরা শিল্প বিপ্লব ব্যবস্থা। এবারে তাদের চোখ পড়ল বাবুদের সিন্দুকে। সারা বাংলা তখন ব্রিটিশ বিরোধী লড়াইতে থরথর। প্রয়োজন ছিল গ্রাম বাংলার রায়তদের ব্রিটিশ বিরোধী লড়ায়ের সামনে জমিদারদের এনে ফেলা যাতে স্বাধিনতাকামীদের বিরুদ্ধে সরাসরি ব্রিটিশ না লড়ে বাঙালি জমিদারদের লড়িয়ে দেওয়া যায়। দ্বারকানাথ ঠাকুর, রামদুলাল দে, মতিলাল শীল, লাহা, মল্লিক, পাইকপাড়ার সিংহরা, হাটখোলার বা রামবাগানের দত্তরা সকলেই সঞ্চিত লুঠেরা অর্থ বিনিয়োগ করল জমিদারিতে। লুঠের বৃত্ত পূর্ণ হয়ে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলল।
১২৯০ সনের জর্হ ক্যাম্ব্যালের বাংলা সরকারের প্রশাসনিক রিপোর্টে দেখা যায় যে জমিদারির সংখ্যা দেড় লক্ষেরও বেশি হয়। তার মধ্যে ৫৩৩টা হল বর জমিদারি ২০ হাজার একরের ওপরে, ১৫৭৪৭টা মাঝারি ২০ হাজার থেকে ৫০০ একরের মধ্যে আর ১৩৭৯২০৩ হল ছোট জমিদারি – ৫০০ একর বা তার কম।
১২৮৯সনের বেভারলের সেন্সাসে কৃষক আর জমিদারদের মধ্যবর্তী কর্মচারীদের একটা পরিচয় কৃষক – ৬৩৯১০৭৪, জমিদার – ৪২৬১৮, ইতমামদার – ৫৪৬, ঠিকাদার – ৩০৩, ইজারাদার – ৩৩৫৪, লাখেরাজদার – ২৩০৭০, জায়গিরদার – ৩৬৫, ঘাটোয়াল – ৬৬৮, আয়মাদার – ২০০৪, মকরারিদার – ৯৯৩৩, তালুকদার – ৯৬০৫০, পত্তনিদার – ৩৩৭২, কোদকস্তপ্রজা – ৭৫৫২, মহলদার – ১১২৮, জোতদার – ১৯৫৬৪, গাঁতিদার – ৩৮২৪, হাওলাদার – ৯৩৪৩, গমস্তা -১৮৪৭২, তহশিলদার – ১০৪৫৬, পাটোয়ারি – ১৩৭৩, পাইক – ১৪৭৯৭, জমিদারের ভৃত্য – ১১০৩০, দফাদার – ২০২, দেওয়ান – ১০৪, মণ্ডল – ১৬২০, নায়েব – ৫৮১, এস্টেট ম্যানেজার – ২১।

বাম দৃষ্টিভঙ্গীতে চিরস্থায়ী ব্যবস্থাঃ লুঠ না গ্রাম বিকাশের হাতিয়ার৩

তথ্যভিত্তি - সামাজিক ইতিহাসের ধারাঃ বিনয় ঘোষ
বাংলা ১১শত শতের প্রথম পর্বে ১১০৭-১১৩৪, মুর্শিদকুলিখাঁর দেওয়ানি সুবাদারির সময়। এটিকে জাফরখানি বন্দোবস্ত বলছেন ব্রিটিশেরা – জাফর খাঁএর উপাধি ছিল মুর্শিদ কুলি। মুর্শিদাবাদ স্থাপন করে তার লক্ষ্য পড়ল রাষ্ট্রীয় আয়ের একমাত্র উৎস বাণিজ্য শুল্ক। তাই তিনি রাজস্ব বৃদ্ধির দুটি উপায় স্থির করলেন। প্রথমত বাংলার জায়গিরগুলি খালসা জমিতে রূপান্তর করা, জায়গিরদারদের বাংলার বদলে ওডিসার বনাঞ্চল জায়গির দেওয়া। দ্বিতীয় উপায় হল রাজস্ব আদায়ে ইজারা বা কন্ট্রাক্ট দেওয়া। হিন্দু রাজত্ব এবং সুলতানি আমলে যে সব মুসলমান জমিদার তৈরি হয়েছিল, তারা কলেবরে আর ক্ষমতায় অনেক বড় হয়ে উঠেছিল। তাদের কাছে রাজস্ব আদায় মুশকিল ছিল। তাদের থেকে রাজস্ব আদায়ের মাল-জমিনি ব্যবস্থা চালানোর জন্য ইজারাদার নিয়োগ করেন মুর্শিদ কুলি। জমিদার রইলেন কিন্তু ইজারাদারদের অধীনে।
বেশ কিছু পুরোনো জমিদারেরা লুপ্ত হয়ে গেলেন – নব্য ইজারাদারেরা রাজা মহারাজা নাম নিয়ে জমিদার হয়ে বসলেন। এদের অধিকাংশ হিন্দু। যেমন উত্তরবঙ্গের বারেন্দ্রে রঘুনন্দন। মুর্শিদকুলি খাঁর পৃষ্ঠপোষণায় বহু জমিদারি ভাই রামজীবনের নামে হস্তান্তর করেন। ১১২১এ সীতারামের পতনের পরে ভূষণা তাঁর হস্তগত হয়। রামজীবনের মৃত্যুর পর পোষ্যপুত্র রামকান্ত জমিদারি সনদ পান ১১৪০ সনে। রামকান্তের স্ত্রী ভবানী। বিপুল চেহারা নিয়ে উত্তরবঙ্গের নাটোর বর্ধমান রাজের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে। পুরোনো ১৩০০০ মাইল বিস্তৃত রাজশাহী জমিদারি(যা পরে তৈরি হওয়া রাজশাহী জেলার তিনগুণ ছিল) এবং রাজস্ব ছিল ২৭ লক্ষ টাকা – মুর্শিদ কুলির আমলে খণ্ড খণ্ড হয়ে নাটোর রাজের সূচনা হয়।
রঘুনন্দনের বিস্বস্ত কর্মচারী দয়ারাম রায়, বঙ্কিম চ্যাটুজ্যের হিন্দু নায়ক সীতারামকে ক্ষমতাচ্যুত করার চক্রান্তের প্রধান পাণ্ডা। দয়ারাম পুরষ্কৃত হলেন। রাজশাহীর দিঘাপাতিয়া বংশ প্রতিষ্ঠিত হল। নাটোরের জমিদারি ইংরেজদের চক্রান্তে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়, তখন এক দক্ষিণ রাঢী কায়স্থ যশোরের নড়াইল রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেন। অবশ্য রাজসাহির তাহিরপুর পুঁটিয়া নাটোরের চেয়ে পুরাতন জমিদারি। কিন্তু তখন তাদের অবস্থা পড়ন্ত। দুজন বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ মুর্শদকুলির অনুগ্রহ পায় - বগুড়ার শ্রীকৃষ্ণ হালদার আর মুক্তাগাছার(ময়মনসিংহ) শ্রীকৃষ্ণ আচার্য চৌধুরী। সুলতানের আগের জমিদারিগুলির মধ্যে বিষ্ণুপুরের মল্লবংশ, বীরভূমের আসাদৌল্লার বংশ, পঞ্চকোটের রাজবংশ হাত বদল হয় নি।
১১৯৫ সালের মিনিটে জন শোর বলছেন বাংলার বড় জমিদারদের শেকড় খুঁজে পাওয়া যায় শেষ দেড় শত বছরের ইতিহাসে। জেমস গ্রান্ট বলছেন অতীতের জমিদারিগুলি তাদের স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে জাফর খাঁএর করদে পরিনত হয়। যদিও বিনয় ঘোষ ব্রিটিশদের তথ্য উল্লেখ করে বলছেন, মুর্শিদ কুলি খাঁ যে সব ইজারাদারদের জমিদারে রূপান্তরিত করেছিলেন, ইংরেজ শাসকেরা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করে তাঁদের পদমর্যাদা ও বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকার ভিত্তি পোক্ত করেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে জাফর খানি বন্দোবস্তের আগের সব জমিদারি কিন্তু সবকটা ছত্রভঙ্গও হয় নি মর্যাদাচ্যুতও হন নি – যেমন দিনাজপুর, বর্ধমান, নদিয়া, নলডাঙ্গা ইত্যাদি। এগুলি মুর্শিদ কুলির আগের সময়ের। কিন্তু ব্রিটিশ আমলে এদের পতন দ্রুত হতে থাকে। জমিদারি খণ্ড খণ্ড হয়ে যায়।

বাম দৃষ্টিভঙ্গীতে চিরস্থায়ী ব্যবস্থাঃ লুঠ না গ্রাম বিকাশের হাতিয়ার২

তথ্যভিত্তি - সামাজিক ইতিহাসের ধারাঃ বিনয় ঘোষ
১৭৯৩এর চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের লুঠ কর্মের হাতিয়ার। পলাশির পরে পরেই ক্লাইভের গাধা মিরজাফরের ঘাড় ভেঙ্গে বাংলা লুঠের প্রবর্তনা শুরু ক’রে সাম্রাজ্যের পক্ষে এদেশে শাসনভার চালানো ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ক্লাইভের পর হেস্টিংস এসেছেন লুঠের কাজে দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে – ইতোমধ্যে ঘটে গিয়েছে ছিয়াত্তরের গণহত্যা – বাংলা ও পূর্ব ভারত জুড়ে পলাশীর পাঁচ বছর পর থেকেই ফকির-সন্ন্যাসীদের নেতৃত্বে গ্রামীনদের লড়াই শুরু হয়েছে। থরথর করে কাঁপছে বাংলা। ব্রিটেনে শুরু হয়েছে কেন্দ্রিভূত প্রযুক্তি, পরিচালনা এবং সাম্রাজ্য লুঠের সম্পদভিত্তিক শিল্পবিপ্লব নামক এক লুঠেরা উৎপাদন ব্যবস্থা – যার স্থায়িত্ব এবং বেড়ে ওঠা সে দিন থেকে আজও নির্ভর করছে বৈদেশিক সাম্রাজ্য লুঠের সম্পদের ওপর। ফলে ব্রিটেনে নব্য উৎপাদন ব্যবস্থাকে চালিয়ে যেতে বাংলায় লুঠেরা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ব্যবস্থার প্রাথমিক কাজ হল স্থানীয়দের ব্রিটিশ লুঠের কাজে জুড়ে নেওয়া – যা শুরু হয়েছিল পলাশী পরবর্তী সময়ে দেবীসিংহ, কাশিনাথ, নন্দকুমার, রেজা খাঁ, নবকৃষ্ণ, কান্তবাবু, গঙ্গাগোবিন্দ সিঙ্গি মার্ফত। কলিকাতার কথায় রায়বাহাদুর প্রমথনাথ মল্লিক লিখছেন (লুঠের আর অত্যাচারে) দেবীসিংহ, কাশিনাথ, নবকৃষ্ণ, কান্তবাবু ও গঙ্গাগোবিন্দ পঞ্চপান্ডব ও ওয়ারেন হেস্টিংস শ্রীকৃষ্ণ ছিলেন। বাংলায় সেই লুঠকর্মটি কত ভাল ও সুচারুভাবে হতে পারে, সেটি নিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা করেন হেস্টিংস, গ্রান্ট, শোর, কোলব্রুক, হ্যারিংটন, ফিলিপ ফ্রান্সিস সহ বহু সাম্রাজ্য বিশেষজ্ঞ – যে কর্মকে ব্রিটিশমুগ্ধ বিনয়বাবু বলছেন জমিদারি বিষয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা।
জমিদারদের স্বরূপ নির্নয়
বিনয়বাবু ব্রিটিশপূর্ব জমিদারদের বুঝতে হ্যারিংটনের তত্ত্ব টেনেছেন। ১৭৮০ থেকে ১৮২৩ পর্যন্ত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের লুঠের স্বর্ণযুগে হ্যারিংটন কোম্পানির বড় আমলা হিসেবে কাজ করেছেন। ফলে তার মতকে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করেছেন বিনয় ঘোষ – এবং উল্লেখযোগ্য হ্যারিংটন চাকরিতে ঢোকার মাত্র তিন দশক আগেই সুলতানি প্রশাসন বাংলায় রীতিমত বর্তমান ছিল। তিনি ব্রিটিশপূর্ব জমিদারির চরিত্র সম্বন্ধে বলছেন, এদেশে জমিদারেরা এমন এক শ্রেণীর জীব যাঁদের এক কথায় ইংরেজি ভাষায় কোন পরিচয় দেওয়া যায় না। রাষ্ট্রের পক্ষে রায়ত ও জমির উপসত্ত্বভোগীদের কাছ থেকে আঞ্চলিক রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব পালন করেন জমিদার। জমিদারির উত্তরাধিকার তিনি লাভ করেন বটে, কিন্তু নতুন করে দেশের সম্রাটের কাছ থেকে তার জন্য সনদ নিতে হয় এবং সম্রাটকে পেশকাশ ও প্রাদেশিক নাজিমকে নজরানা দিতে হয়। জমিদারি তিনি কিনতে পারেন, তবে তার জন্য সম্রাট ও নাজিমের কাছ থেকে অনুমতি নেওয়া বিধেয়। এক দিক থেকে তাঁকে তাঁর জমিদারির নির্দিষ্ট রাজস্বের বাৎসরিক কন্ট্রাক্টার বা ইজারাদার বলা যায়। অন্য কোন কর্মচারী বা ইজারাদার দিয়ে গভর্নমেন্ট যদি, বিশেষ কোন কারণে, সেই রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা করেন, তাহলে জমিদারকে তার জন্য উচ্ছেদ করা হয় না, আলাদা ও কিছু সম্পত্তি দিয়ে তাঁকে পোষণ করা হয়। অষ্টাদশ শতকের গোড়ায় দেখা যায় নিজস্ব এলাকার মধ্যে জমিদার ‘আওবাব’ ও ‘কর’ আদায়ের আধিকার ভোগ করছেন। এই অধিকারও নিরঙ্কুশ নয়, দেশিয় সরকার যখন খুশি হস্তক্ষেপ করতে পারেন। নিজের জমিদারির কাজকর্মের সুবিধার জন্য প্রজাদের কাছ থেকে জমিদার নানারকমের উপঢৌকনও আদায় করতে পারেন। তাঁর নিজস্ব অঞ্চলে শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষার প্রাথমিক দায়িত্ব তাঁর উপর ন্যস্ত থাকে, অথচ এক্ষেত্রে তাঁর সম্পূর্ণ দায়িত্ব স্বীকার করা হয় না।
বিনয় ঘোষ বলছেন, জমিদারির স্বরূপ-নির্ণয়ের এই প্রকাশভঙ্গী থেকে বোঝা যায় যে এই প্রথা বুঝতে ব্রিটিশদের কি বেগ পেতে হয়েছে। রাষ্ট্রীয় নিয়মের বাঁধা সড়কে নয় সামাজিক প্রথার বেড়াজালেতেই ব্রিটিশপূর্ব জমিদারিত্বের বিকাশ ঘটেছে। ফলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে এমন একটা কাঠামো তৈরি করতে হল তা তাদের রাজত্বের পূর্বসূরীদের পরিকল্পনার তুলনায় সহজবোধ্য – আমাদের ভাষায় লুঠকর্মে কার্যকরী এবং সামগ্রিকভাবে সাম্রাজ্য এবং ব্রিটিশ বিকাশপন্থী। হ্যারিংটন তাই বন্দোবস্তের পরবর্তী জমিদারদের সংজ্ঞা দিচ্ছেন জমিদার তাঁর জমিদারির মালিক – উত্তরাধিকার, দান বা কেনাবেচা থেকে তিনি এই মালিকানাসত্ত্ব লাভ করতে পারেন – তার দায়িত্ব হল – তার জমিদারির নির্দিষ্ট স্থায়ী রাজস্ব যথাসময়ে গভর্মেন্টকে পরিশোধ করা। তাঁর দেয় রাজস্ব চুকিয়ে দিয়ে তিনি আইনসঙ্গতভাবে উপসত্ত্বভোগী ও প্রজাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত মুনাফা ও খাজনা যতটা সম্ভব আদায় করতে পারেন এবং তা ভোগও করতে পারেন। পতিত জমি বা বনজঙ্গল হাসিল করা জমি প্রজাদের বিলি করতে পারলে তার খাজনা তাঁর প্রাপ্য ও ভোগ্য হবে।
তবে ব্রিটিশমুখী জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকার লিখছেন, ইংরেজদের ভূমিরাজস্বনীতির প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলির আসল উৎস হল মুর্শিদকুলি খাঁ। সেই বৈশিষ্ট্যগুলির পরিচ্ছন্ন ও কঠোর রূপ দিয়েছিলেন কর্নওয়ালিস চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বিষয়ে আলোচনার প্রবেশের আগে বোঝা যাক মুর্শিদিকুলি খাঁর প্রণীত রাজস্ব নীতি কি ছিল। কেননা আলিবর্দি খানও তার পূর্বসূরীর রাজস্ববন্দোবস্ত পাল্টান নি। এই ব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে ব্রিটিশদের পলাশী পরবর্তী লুঠ কর্মের পরিকল্পনা তৈরি করতে হয়েছে।

বাম দৃষ্টিভঙ্গীতে চিরস্থায়ী ব্যবস্থাঃ লুঠ না গ্রাম বিকাশের হাতিয়ার১

তথ্যভিত্তি - সামাজিক ইতিহাসের ধারাঃ বিনয় ঘোষ
মুখবন্ধ
প্রাথমিকভাবে বলে নেওয়া দরকার আমাদের প্রিয় প্রবন্ধকার বিনয় ঘোষ অন্যান্য ভারতীয় মার্ক্সবাদীর মত মোটামুটি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নব্যভারত গড়তে বড় কর্পোরেট পুঁজি, নব্য নিয়ন্ত্রণমূলক প্রযুক্তি এবং ইওরোপিয় পরিচালন ব্যবস্থার দায়িত্ব এবং কর্তব্য বিষয়ে যথেষ্ট গুণগ্রাহী এবং যুব মার্ক্সের ব্রিটিশ রাজত্বের প্রথমে বাংলার পরে ভারত জোড়া উৎপাদন ব্যবস্থা ভাঙ্গাকর্মর ঔপনিবেশিক তত্ত্ব আর নিদানের চরমতম সমর্থক-ভক্ত ছিলেন। প্রথম জীবনে নবজাগরণীয় তত্ত্বে মুখ ডুবিয়ে এবং শেষ জীবনে সেই তত্ত্ব থেকে বেরিয়ে এসেও তাঁর মূল অভিযোগ, আক্ষেপ ছিল বাংলায় বড় সম্পদওয়ালা জমিদার থাকা সত্ত্বেও কেন বড় পুঁজির বিনিয়োগ তৈরি হল না – কেন বাংলায় ইওরোপিয় শিল্পবিপ্লব তৈরি হল না। তাঁর আরও বড় অভিযোগ চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত জমিদার আর রায়তদের জন্য আদর্শ পরিকল্পনা ছিল – সেটা বাঙালি জমিদারদের অদূরদর্শিতায় আর অবিমৃশ্যকারিতায় বিফলে যায়। পরিকল্পনাটা ঠিকঠাক রূপায়িত হলে গ্রাম বাংলায় ঘি-মধুর স্রোত বইত – এবিষয়ে তিনি ব্রিটিশ পরিকল্পনার বিন্দুমাত্র গলদ দেখতে পান নি। আমরা যারা পুঁজি বিহীন উৎপাদন ব্যবস্থার অংশিদার, তারা মনে করি শিল্পবিপ্লবীয় কর্পোরেট বড় পুঁজির কাজই হল লুঠ খুন আর দখলদারি।
প্রবন্ধটি তৈরি হয়েছে বিনয়বাবুর বাংলার সামাজিক ইতিহাসের ধারা বইটির গ্রাম্য সমাজের পরিবর্তনের গতি অধ্যায় ভিত্তি করে। আমাদের গোটা প্রবন্ধই তার তত্ত্বের সমালোচনা। সেই বইতে তিনি কোনভাবেই ব্রিটিশ পরিকল্পিত নব্য চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জমিদারিত্বকে ব্রিটিশ লুঠেরা কর্ম বলে আখ্যা দিচ্ছেন না তার পরবর্তী কালের সাবঅল্টার্ন ঐতিহাসিকদের মতই – বরং বলছেন চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে জমিদারদের এমন কতগুলি ক্ষমতা দেওয়া হল যাতে জমিদারেরা তাঁদের অস্তমিত সুদিন ফিরিয়ে আনতে পারেন। কিন্তু চিরদিনের বিলাসিতার অভ্যাস ও স্বভাবশৈথিল্যের জন্য জমিদারদের অনেকেই নির্দিষ্ট দিনক্ষণে দেয় রাজস্ব মেটাতে পারে নি – তাদের অজুহাত প্রজাদের দুরবস্থা ও খাজনা অনাদায়। তাই শাস্তিস্বরূপ ব্রিটিশেরা সূর্যাস্ত নিয়মে তাদের জমিদারি নিলামে তুলত।
অথচ বিনয়বাবুর আগেই দাদাভাই নৌরোজী বা রমেশ দত্ত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তকে প্রগতিশীল নীতি বলেও ব্রিটিশ লুঠের কাছা খুলে দিচ্ছেন। উলটে বিনয়বাবু মন্তব্য করছেন জমিদারি বিষয়ে ব্রিটিশ চর্চার উদ্দেশ্য প্রাথমিকভাবে লুঠকর্মর পথ বাছা নয়, বরং লক্ষ্য ছিল, এদেশের বনেদি জমিদারেরা বাস্তবিক ভূসম্পত্তির কোনো বংশানুক্রমিক স্বত্ত্ব ভোগ করতেন কিনা, এবং যদি করে থাকেন তাহলে তাঁদের সামাজিক আর্থনীতিক সঠিক ভূমিকা বা রূপ কী ছিল, তাই নিয়ে পণ্ডিতি আলোচনা। ...ইংরেজরা যখন বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভ করে, তখন থেকে ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রবর্তন পর্যন্ত, প্রায় ২৮ বছর ধরে, শুধু আলোচনা নয়, রাজস্ব-সংগ্রহের নানারকম কৌশলের ভিতর দিয়ে এদেশের জমিদারদের সামাজিক রূপ বিদেশী শাসকদের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ঐতিহাসিক বা প্রথানুগ রূপ যতটা নয়, জমিদার সম্বন্ধে তাঁদের নিজস্ব ধারনাগত রূপই তার চেয়ে অনেক বেশি তাঁদের কাছে বাস্তব সত্যরূপে প্রতিভাত হতে থাকে। এই ধারণাগত রূপ অবশ্য ইংরেজদের প্রশাসনিক স্বার্থগত রূপ। এই প্রশাসনিক স্বার্থ লুঠ না শুদ্ধ প্রশাসন উপহার দেওয়ার উদ্যম, সে সম্বন্ধে তিনি নীরব।

বাংলার ব্রিটিশ-পূর্ব অর্থনৈতিক অবস্থা

বাংলা দেশের ইতিহাস – দ্বিতীয় খণ্ড - রমেশ্চন্দ্র মজুমদার থেকে
ব্রিটিশ-পূর্ব অর্থনৈতিক অবস্থা
১৬৮০-১৬৮৪র এই ৪ বছরে ইংরেজরা ১৬ লক্ষ টাকার পণ্য কিনেছিল। ওলান্দাজেরা এর কাছাকাছি একটু বেশিই কিনত। দুই বিদেশি কোম্পানি বাংলায় ৪ বছরে ৮ লক্ষ টাকার জিনিস কিনেছে। ১৯৩৮এর হিসেবে প্রতি বছর ১ কোটি ৬০ লক্ষ টাকা দুটো ইওরোপিয় কোম্পানি বাংলাকে দিত। এছাড়া আভ্যন্তরীণ এবং অন্য দেশ আর অন্যন্য কোম্পানির বাণিজ্য তো ছিলই।
বছরে বাংলা থেকে গড়ে ১ কোটি টাকা দিল্লিতে যেত। শুজার ১২ বছরের রাজত্বে মোট ১৪৬২৭৮৫৩৮টাকা দিল্লি গিয়েছে। শায়েস্তা খাঁ ২২বছরে ৩৮ কোটি টাকা সঞ্চয় করেন। আজিমুসসান ন বছরে ৮ কোটি টাকা নিয়ে যান। অন্যান্য সুবাদারও একইভাবে বাংলা লুঠেছে।
মালদহের মসলিন মির্জা নাথান কেনেন ৪০০০ টাকায়। নৌকো ছিল বড় শিল্প। শুধু ঢাকার নদীপাড়ে দুই ক্রোশ জুড়ে নৌকো তৈরি করার সূত্রধরেরা বাস করত। অলঙ্কার নির্মানও প্রচুর হত। শাঁখ বড় শিল্প ছিল। বীরভূমে লোহার খণি ছিল। রেনেল বলছেন সিউড়ি থেকে ১৬ মাইল দূরে লোহা পিণ্ড তৈরি করে দামারা আর ময়সারাতে লোহার পণ্য তৈরি হত। মুল্লারপুর পরগণা আর কৃষ্ণনগরে ডেউচ্যা আর মহম্মদবাজারে কারখানা ছিল। কলকাতা কাশিমবাজারে দেশিয়রা কামান তৈরি হত, বারুদও তৈরি হত। শীতে বরফ তৈরি হত। গরম জল মাটিখুঁড়ে রেখে বরফ তৈরি করা হত।
চিনেরা লিখেছেন গাছের বাকল দিয়ে কাগজ তৈরি হত। সাদা রঙ আর হরিণের চামড়ার মত মসৃণ। লাক্ষা আর রেশমও প্রচুর হত।
ইবন বতুতা আর বার্নিয়ে বিপুল পরিমান ধান ফলার কথা বলেছেন – তাদের মতে মিশর নয় বিশ্বের সেরা উৎপাদনশীল দেশ বাংলা। তা জলপথে মছলিপত্তনম, লঙ্কা আর মালদ্বীপে যেত। চিনি যেত গোলকূণ্ডা, কর্ণাটক, আরব আর পারস্য আর মেসোপটেমিয়ায়। গম প্রচুর হত। তা দিয়ে বিস্কুট হত বিদেশে যাওয়া নাবিকদের জন্য। সুতো আর রেশম জাপান আর ইওরোপে যেত। লাক্ষা, আফিম, মৃগনাভি, লঙ্কা, ঘি বিদেশে যেত।
বাংলায় এসেছে আমেরিকা থেকে তামাক আর আলু। পাট নীল আর চাও বাণিজ্য পণ্য ছিল। গুড়, সুপারি, তামাক, তেল, আদা, পাট, মরিচ, তাড়ি প্রদেশ ও বিদেশে চালান যেত। ১৭৫৬র আগে ৫০ জাহার মণ চিনি রপ্তানি হত। নুন, গালা, আফিম, মশলা, ওষুধ, খোজা, ক্রীতদাস এশিয়ার নানা দেশে যেত।
চিন ছাড়া ম্যানিলা, খোরসান, পারস্য, তুরস্ক, আফ্রিকায় বাংগালী ব্যবসা করত। মঙ্গল কাব্যে এর প্রচুর নিদর্শন আছে। বাঙালি বঙ্গোপসাগর পার হয়ে ব্রহ্মদেশ, ইন্দোচিন, ইন্দোনেশিয়ায় যেত। ইবন বতুতা সোনারগাঁও থেকে চল্লিশ দিনে সুমাত্রায় গিয়েছিলেন। সমুদ্র যাত্রার মধ্যে যে বন্দরগুলোর নাম পাওয়া যায় – পুরী, কলিঙ্গপত্তন, চিল্কাচুলি(চিকাকোল), বাণপুর, সেতুবন্ধরামেশ্বরম, লঙ্কা, বিজয়নগর।
নৌকো নির্মানে বাংলা বিখ্যাত ছিল – নিকলো কন্টি বলছেন ইওরোপের তুলনায় বাংলার নৌকো মজবুত আর বড় এবং দ্রুতগামী। প্রধান মাঝির নাম ছিল কাণ্ডারী – আজকের কাঁড়ার উপাধিধারীরা। সাবরেরা সারিগান গেয়ে দাঁড় টানত। থাকত সূত্রধর, ডুবুরি আর কর্মকার। আর ছিল পাইক।
ভারথেমা বলেছেন বাংলার মত ধনী বণিক কোন দেশে দেখেন নি। জাঁয়া দা বারোজ বলছেন গৌড় বাংলার প্রধানতম রাজধানী ছিল, ৯ মাইল দীর্ঘ এই শহরে কুড়ি লক্ষ মানুষ বাস করত, সুলতানি আমলে তিনটে টাঁকসাল চলত একটা শহরে।
বাংলায় ব্যবসা করতে আসত কাশ্মীরী, মুলতানি, আফগান বা পাঠান, শেখ, পগেয়া, ভুটিয়া, সন্ন্যাসীরা। পগেয়া কি মাথায় পাগড়ি পরা উত্তরভারতীয় – সেখান থেকে কলকাতার পগেয়াপট্টি? সন্নাসীরা হিমালয় থেকে আনত চন্দন, ভুর্জপত্র, রুদ্রাক্ষ, লতাগুল্ম। হলওয়েল বর্ধমান সম্বন্ধে বলছেন দিল্লি ও আগ্রার পগেয়া ব্যবসায়ীরা সীসে, তামা, টিন, লঙ্কা, কাপড় কিনত বিনিময়ে নগদ টাকা, আফিম, সোরা বা ঘোড়া বিনিময় করত। কাশ্মীরীরা দাদন দিয়ে সুন্দরবনে নুন তৈরি করাত। কাশ্মীরী আর আর্মেনিয়ানেরা বাংলা থেকে নেপালে ও তিব্বতে চামড়া, নিল, মণিমুক্তা, তামাক, চিনি, মালদহের সাটিন নিয়ে যেত।
১৭৭২ সালের জয় নারায়নের হরিলীলায় লিখিত আছে একজন বৈশ্য হস্তিনাপুর, কর্ণাট, বঙ্গ, কলিঙ্গ, গুর্জর, বারাণসী, মহারাষ্ট্র, কাশ্মীর, পাঞ্চাল, কাম্বোজ, ভোজ, মগধ, জয়ন্তী, দ্রাবিড়,  নেপাল, কাঞ্চী, অযোধ্যা, আবন্তী, মথুরা, কাম্পিল্য, মায়াপুরী, দ্বারাবতী, চীন, মহাচীন, কামরূপে ব্যবসা করত। চন্দ্রকান্ত নামে এই সময়ের আরেকটি গ্রন্থে লেখা আছে – চন্দকান্ত নামী এক মল্লভূম নিবাসী গন্ধবণিক সাতটি নৌকো নিয়ে গুজরাট গিয়েছিলেন।
বাংলাদেশের ঐশ্বর্য অতুলনীয় ছিল – চিনা রাজদূতদের বর্ণনায় আছে ভোজের পরে সোনার বাটি, পিকদানি, সুরাপাত্র ও কোমরবন্ধ ও তার সহকারীদের ঐ সব রূপোর দেওয়া হয়েছিল। তারিখ-ই-ফিরিস্তা আর রিয়াজ-উস-সালাতিনে আছে গৌড় আর পুর্ববঙ্গের ধনীরা সোনার থালায় খেতেন। আলাউদ্দিন হোসেন সাহ গৌড় লুঠ করে ১৩০০ সোনার থালা আর বহু রত্ন পেয়েছিলেন। চৈতন্য চরিতামৃতে আছে হিরণ্য-গোবর্ধন নাম দুই সহোদর।/ সপ্তগ্রামে বার লক্ষ মুদ্রার ঈশ্বর।।
সিজার ফ্রেড্রিক লিখছেন সপ্তগ্রাম থেকে প্রতি বছর ৩০-৩৫টা বড় জাহাজ মাল নিয়ে আসত আর পণ্য বোঝাই করে ফিরে যেত।
ইবন বতুতা পণ্যের দামের তালিকা দিয়েছেন – মজুমদার মশায়ের বই লেখার সময়ের পয়সায় মূল্য(কবে? বইতে এই সময় বলে ১৯৩৮ একবার বলা আছে)
১ মন চাল ১২ পয়সা, ১ মন ঘি ১৪৫ পয়সা, ১ মন চিনি ১৪৫, ১ মন তিল তেল ৭৩, ১৫ গজ ভাল কাপড় ২০০, ১টা দুধ দেওয়া গরু ৩০০, ১২টা বড় মুরগী২০, ১টা ভেড়া ২৫ পয়সা। এক বৃদ্ধ মুসলমান তাঁকে বলেছিলেন তিনি তার স্ত্রী আর তার এক ভৃত্যের সারা বছরের খাওয়া খরচ ১টাকা ছিল।
কবিকঙ্কণ চণ্ডীতে দুর্বলার বেসাতিতেও দামের ধারণা পাওয়া যায়।
মুর্শিদাবাদের ১৭২৯ সালের দাম প্রতি টাকায়

বাঁশফুল ভাল ১ মন ১০ সের, ঐ মাঝারি, ১মন ২৩ সের, ঐ তৃতীয় ১ মন ৩৫ সের, মোটা দানা দেশনা ও পূরররবী চাল ৪ মন ২৫ সের, মোটা মুশসারা ৫ মন ২৫ সের, মোটা কুরাশালী ৭ মন ২০ সের, ভাল গম ৩ মণ, দ্বিতীয় ৩ মন ৩০ সের, তেল প্রথম ২১ সের, ঐ দ্বিতীয় ২৪ সের, ঘি প্রথম সাড়ে দশ সের, ঐ দ্বিতীয় সোয়া ১১ সের, কাপাস তুলো মণ প্রতি ২ থেকে আড়াই টাকা।