Wednesday, April 19, 2017

মানসিক উপনিবেশ বিরোধী চর্চা - নিম্নবর্গের ঐতিহাসিক পার্থ চট্টোপাধ্যায়, আর তাঁর সাব্জেক্টস নিম্নবর্গ বিষয়ক আলোচনা

প্রখ্যাত এই মানুষদের লেখা পড়ে কান ঝাঁঝাঁ করে ওঠে... কি পরিমান অশ্রদ্ধা লুকিয়ে রয়েছে নিম্নবর্গের প্রতি - যে শব্দটাতেই আমাদের আপত্তি। 
একইভাবে সমপরিমান বা তার থেকেও বেশি পরিমান শ্রদ্ধা ছড়িয়ে রয়েছে পশ্চিমের জীবনযাত্রা, দর্শন, জ্ঞানচর্চার প্রতি।
গত বছর এই ইংরেজি তারিখে আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল সমাজবিজ্ঞানী, সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশ্যাল সায়েন্সেস-এ সাম্মানিক অধ্যাপক পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের লেখা। সেই মণিমুক্তোর কিছু অংশ...
...'ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পুঁজি সম্বল করে, পরিবারের সকলকে নিয়ে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে, পুলিশের ঘুষ আর ঝান্ডাধারীদের তোলা চুকিয়ে দারিদ্র সীমার আশেপাশে কোনও ক্রমে বেঁচে আছে অধিকাংশ মানুষ। হকারি, চায়ের দোকান, রিকশা বা অটো চালানো, শহরের মধ্যবিত্ত বাড়ির ঠিকে কাজ, সেখান থেকে শুরু করে নানা বিচিত্র জীবিকা খুঁজে বের করে তথাকথিত অসংগঠিত শিল্পের শ্রমিক-মালিকরা জীবনধারণ করছে,' - পার্থ চট্টোপাধ্যায়
নিম্নবর্গের কাজের ওপর কি সুগভীর শ্রদ্ধা! ভাবা যায় না।
লেখাটি প্রেক্ষিতে আমাদের সময়ক্রমে অসাধারণ মন্তব্য করেছিলেন শমীক সরকার, সেটাও তুলে দেওয়া গেল...
১) 'ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পুঁজি' -- এই কথাটা সেই বলতে পারে, যে বৃহৎ পুঁজিকে বৃহৎ মনে করে না। সেটাকেই স্বাভাবিক মনে করে। সেটাতে সে বিশেষণ লাগায় না।
২) 'পরিবারের সকলকে নিয়ে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে' -- এই কথাটা সেই বলতে পারে, যে পরিবারের সকলের খাটাটাকে স্বাভাবিক মনে করে না, তাতে অভ্যস্ত নয়, না ব্যবহারিক জীবনে, না তত্ত্বজীবনে। খাটুনি-র আগে 'হাড়ভাঙা' বিশেষণ সেই লাগাতে পারে, যে খাটুনি বলতে বোঝে গতরটাকে সামান্য নাড়ানো।
... এরকম ছত্রে ছত্রে প্রমাণ এই কথাটি যিনি বলছেন, তিনি একজন উচ্চবর্গের লোক, ব্যবহারিক এবং দর্শন -- এই দুদিক থেকেই। নিম্নবর্গ তার বিষয়।
তিনি তাকে উচ্চবর্গের দৃষ্টিতে দেখেন, এবং তার উচ্চবর্গের দৃষ্টিটি প্রচ্ছন্ন। তার কোনো স্বীকার নেই। ... 'নিম্নবর্গের ইতিহাসবিদ' ও 'নিম্নবর্গের তাত্ত্বিক'দের তাত্ত্বিক ভণ্ডামির তুলনা নেই।

উপনিবেশবাদ বিরোধী চর্চা - আমাদের নিজস্ব জ্ঞানচর্চা - কেরলিয় বিদ্যাচর্চা এবং নীলকান্ত সোমাইয়াজী

(http://iks.iitgn.ac.in/…/The-Traditional-Indian-Planetary-M…)
কৃষ্ণমূর্তি রামসুব্বামনিয়ম

শুদ্ধ ঔপনিবেশিক ভদ্রলোকীয় আধিপত্যিয় ইওরোপবাদী না হলে ভারতীয় জ্ঞানচর্চাকারী ব্যক্তিই স্বীকার করবেন ইওরোপে গ্রহনক্ষত্র জ্ঞান বিকাশের বহু আগে থেকেই কেরল বিদ্যাজীবিরা সে বিষয়ে বহু বছর এগিয়েছিলেন।
সঙ্গমগ্রামএর মাধবএর(১৩৪০-১৪২০) সময় থেকে যে কেরলিয় জ্ঞানচর্চা শুরু হয় তা প্রবাহিত হয়েছিল বহু শতাব্দ পরেও। কেরলিয় বিদ্যাজীবিরা পাইএর অসীম সিরিজ, সাইন কোসাইন চলক এবং তার ফাস্ট কনভারজেন্ট আপ্রক্সিমেশনও নির্ণয় করেন। এই লেখায় লেখক দেখিয়েছেন কিভাবে মাধবের শিষ্য বটসেরির পরমেশ্বর(১৩৮০-১৪৬০) ৫৫ বছর ধরে গ্রহ চলাচলের নানান তথ্য নিরূপন করেন। তিনি পুরোনো পরহিত ব্যবস্থার স্থলে দ্রাগ-গণিত চালু করেন। ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যা চর্চায় তাঁর অবদান সুপ্রচুর।

ত্রাক্কান্তিয়ুরের নীলকান্ত সোমাইয়াজী(১৪৪৪-১৫৫০) পরমেশ্বরের শিষ্য দামোদরের পুত্র। তিনি ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যায় প্রভূত অবদান পেশ করেন।
১৫০০ সালে রচিত তন্ত্র সংগ্রহতে নবতম গ্রহনক্ষত্রের অবস্থান নতুন করে রচনা করেন। বিশেষ করে মন্দচ্চ আর শীঘ্রচ্চ গ্রহগুলি বিষয়ে তাঁর গণন কৃতি অসাধারণ। ফলে পূর্বসূরী বা ইসলামি অথবা গ্রিকো-ইওরোপিয় জ্ঞানচর্চকদের থেকে তিনি কয়েক কদম এগিয়েছিলেন। কেপলার তারো একশ বছর পরে এই কাজটি করবেন। নীলকান্ত যে তাত্ত্বিক গণনা করেছেন, তাঁর সঙ্গে কেপলারের গণনার সাযুজ্য অসাধারণ।
ফলে যে পথ ভেঙে পথ তৈরি করার কাজটি ইওরোপের আগে নীলকান্ত সোমাইয়াজী করেছেন, এবং তা ইওরোপতুল্য হয়েছে এমন ইওরোপিয়মুখ্যতায় আমাদের আস্থা নেই - বরং দাবি তুলব এই জ্ঞান কি সত্যিই ইওরোপে গিয়ে সেখানে 'নতুন' জ্ঞান সৃষ্টিতে সাহায্য করেছিল?
তিনি আর্যভটিয়-ভাষ্যে কেন তিনি নতুন করে গ্রহ নক্ষত্র বিদ্যা আলোচনা করতে গেলেন সে বিষয়ে বিশেদে লিখেছেন। তাঁর কৃতির আগে ভারতীয় কেন, বিশ্বে নানান জ্ঞানচর্চায়, পৃথিবীর কক্ষের বাইরের আর তার কক্ষের আর সূর্যের মধ্যে গ্রহের অক্ষাংশ নির্নয় করা হত আলাদাভাবে। প্রথমোক্ত গ্রহগুলির অক্ষাংশ নির্ণয় করা হত মন্দষ্ফূট তত্ত্বের দ্বারা আর দ্বিতীংশের নির্ণয় হত শীঘ্রচ্চ তত্ত্বের দ্বারা। নীলকান্ত প্রথম বললেন, অন্যকিছুর নয়, একমাত্র গ্রহের সাপেক্ষে এই অক্ষাংশ নির্নয় হয়, তাঁর উভয় গ্রহের অক্ষাংশ নির্ণয় করা যাবে শীঘ্রোচ্চ তত্ত্বের দ্বারা।
এবং এই বইতে তিনি তাঁর প্রস্তাবিত গ্রহতন্ত্রের ছবিও এঁকেছেন। নতুন তত্ত্ব তিনি আরও বিশদে বর্ণনা করলেন গোলসার আর সিদ্ধান্ত-দর্পনে। তাঁর শিষ্য জ্যেষ্ঠদেব গণিতযুক্তিভাষা-য়(১৫৩০খ্রি) তাঁর গুরুর কাজ আরও বিশদ-ভাবে বর্ণনা করবেন।

Monday, April 3, 2017

ব্রিটিশপূর্ব বাংলায় শূদ্র-বৈশ্য বাণিজ্যচর্চা

বাংলা লুঠ বিষয়ে গবেষণার আগে বাংলার ব্যবসা নিয়ে সার্বিক নথিকরণকর্ম জরুরি

প্রস্তাবকঃ উইভার্স, আর্টিজান, ট্রাডিশনাল পার্ফর্মিং আর্টিস্টস গিল্ড(ওয়াটাগ)

তাত্ত্বিক অবস্থান
গ্রামীন বাংলার শূদ্র-বৈশ্য উতপাদন-বিতরণ ব্যবস্থার একটা সামগ্রিক ছবি দরকার বলে মনে করছে ওয়াটাগ। এই শিক্ষিত বিতর্কে অশিক্ষিত, অজ্ঞ, মুর্খ, কুসংকারাচ্ছন্ন, সভ্যতার ষড়ৈশ্বর্য না দেখে গ্রামের মধ্যে বাস করা কুপমণ্ডুক শূদ্র-বৈশ্যদের সংগঠনের পক্ষ থেকে কিছু কথা - গুছিয়ে বলতে পারব কি না জানি না চেষ্টা করছি। আমাদের মত করে মুখবন্ধ রচনা করা গেল। পছন্দ হলে এগোনো যাবে – তবে সতর্কতা, লেখাটা বড় হবে।

পুঁজির চরিত্র
ছোট্ট পুঁজি খুব বেশি মানুষ/গোষ্ঠীর হাতে পুঁজি পুঁজি জমতে দেয় না - অনেক ছোট উৎপাদক বিক্রেতা থাকলে সেই উতপাদন-বিতরণ ব্যবস্থায় লাভ ছড়িয়ে যায় সমাজের মধ্যে। ঐতিহাসিকভাবে ইওরোপিয় আগ্রাসনের পূর্বে ভারত/এশিয়া/লাতিন আমেরিকা/আফ্রিকা মূলত ছোট পুঁজির অঞ্চল ছিল – সামাজিক সম্পদ তৈরি করতে সেই উৎপাদন ব্যবস্থা মাহির ছিল – তাঁর জন্য বড় পুঁজির আগ্রাসী মনোভাবের প্রয়োজন হয় নি। বড় পুঁজি কি ছিল না? ছিল। চাঁদ বা শ্রীমন্ত বা ধনপতির মত সওদাগরেরা সপ্তডিঙ্গা মধুকর সাজিয়ে বিদেশে ব্যবসা করতে যেতেন, তাঁরা তো আদতে বড় পুঁজির প্রতিভূ –তাঁরা কিন্তু কর্পোরেট লুঠেরা পুঁজি হয়ে ওঠেন নি – বাণিজ্য করতে বিদেশে গিয়ে বকলমে বা সরাসরি সে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন নি। তাঁদের কর্মকাণ্ডের ওপর সামাজিক নিয়ন্ত্রণ প্রবল ছিল। তাকে ঘাড় ধরে সিএসআর করাতে হত না – বাংলাজুড়ে রাস্তা, পুকুর, চিকিতসাব্যবস্থা, সেচ ব্যবস্থা, জ্ঞানচর্চার পরিবেশ, উৎপাদন-বিতরণ ব্যবস্থা, সমাজে থেকেই উতপাদন-বিতরণের সামাজিক নিরাপত্তাবোধের যে ব্যপ্ত সামাজিক পরিকাঠামো গড়ে উঠেছিল, তা তাঁরা সামাজিক উদ্যমের অংশ হয়েই করতেন, সাধারণ আর বড় পুঁজি যৌথভাবে। বড় পুঁজি ছিল মূলত শহর ভিত্তিক। সে ব্যবসা বাড়াবার জন্য গ্রামের ব্যাপ্ত উপাদন ব্যবস্থার ওপর, বেশিতম উৎপাদনের অনাবশ্যক চাপ দেওয়ার সুযোগ পেত না।
পলাশি চক্রান্তের আগেও বাংলার সমাজে(ভৌগোলিকভাবে বৃহত্তর বাংলা বলতে পূর্বে বার্মা সীমান্ত, উত্তরে অসম, দক্ষিণে ওডিশা, পশ্চিমে দ্বারবঙ্গ=দ্বারভাঙ্গা) বড় পুঁজি সমাজ-রাষ্ট্রের সার্বিক নীতি নির্ধারণ করার অবস্থায় ছিল না। তার চলাচলে কিছু সামাজিক বিধিনিষেধ ছিল। এক উৎপাদক অন্য উতপাদকের উৎপাদন পরিকাঠামো কিনে নিতে পারত না - শিল্পবিপ্লবীয় উৎপাদন ব্যবস্থায় যেমন কোন উৎপাদক না চাইলেও তার ব্যবসা অন্য উৎপাদক কিনে নিতে পারেন হোস্টাইল টেকওভারএর মাধ্যমে - বড় পুঁজি আরও বড়দের আশীর্বাদ নিয়ে তার থেকে পাঁচগুণ বড় কোম্পানি কিনে নিয়ে তা সামলাতে না পেরে ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা হয় - এ তত্ত্ব-তথ্য খুব সম্প্রতির ইতিহাসে প্রমানিত। কৃষককে, গ্রামের বং পরম্পরার ছোট উতপাদকেদের যদি ছোট্ট পুঁজির উতপাদন ব্যবস্থার অংশ ধরি, রাষ্ট্রের মদতে সেই লাভের(কৃষিকে শুধু লাভজনক উতপাদন ব্যবস্থা হিসেবে দেখতে গিয়ে কৃষির কর্পোরেটাইজেশন ঘটছে, সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে) উতপাদন-ব্যবসাকে জোর করে সারা বিশ্বজুড়ে দখল করা হচ্ছে, নিশ্চিহ্ন করা হচ্ছে বুকে বন্দুকের নল ঠেকিয়ে। সেটা ছোট্ট পুঁজির নীতি ছিল না আজও নেই। কোন আর্থিক সঙ্গতিসম্পন্ন ফেরিওয়ালা তার পাশের কয়েকটা দোকান, বা ছোট উৎপাদক তার গ্রামের অন্যান্যদের উৎপাদন পরিকাঠামো অবলীলায় আজও কিনে নিয়ে বড় পুঁজি, কর্পোরেট পুঁজি হয়ে উঠতে পারেন না।

উৎপাদন, বিতরণ আর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র বড় পুঁজির চিরন্তন শত্রু – তাই তাঁর উদ্যম বিশাল বৈচিত্রময় স্থানীয় উতপাদন-বিতরণ ব্যবস্থা ধ্বংস করে কেন্দ্রীভূত উতপাদন-বিতরণ ব্যবস্থা তৈরি করা। এই বৈচিত্রময় উতপাদন-বিররণ ছোট্ট পুঁজির জোরের জায়গা। সে যথাসম্ভব স্থানীয় সম্পদ, শ্রম, জ্ঞান, দক্ষতা নির্ভর করে উতপাদন-বিতরণ ব্যবস্থা তৈরি করে। তাঁর জোর নিজ সমাজ বিকশিত জ্ঞান, দক্ষতা আর বংশপরম্পরায় তৈরি করা পরিকাঠামো। তার জোর ধারের নয়, নিজস্বতা।

ভারত বহুকাল ধরে বহু কৃষি ও শিল্প উৎপাদন সারা বিশ্বে একচেটিয়া ব্যবসা করে এসেছে - নীল থেকে ইস্পাতের মণ্ড পর্যন্ত - তখন জ্ঞানচর্চা, প্রযুক্তি তার নিজস্ব ছিল। তার জোরে ১৮০০ পর্যন্ত সে ছিল ব্যবসায় উতবৃত্ত দেশ। বড় পুঁজির(এমন কি ছোট্ট পুঁজিও খুব বড় করে – ফেরিওয়ালার প্রথম লিখিত বিবরণ পাই জাতকে সেরিবা-সেরিবান গল্পে – সে অন্তত ২০০০ বছরের ইতিহাস) বিতরণ ব্যবস্থা সে উৎপাদনগুলি নিয়ে বিদেশে গিয়েছে, কিন্তু সামগ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থায় দাঁত ফোটাতে পারে নি। প্রসন্নন পার্থসারথি বা ওম প্রকাশজী বা পেড্রো মাচাডো তাঁতি আর তাঁত বস্ত্র বিষয় গবেষণা বলছে, পলাশীর আগে পর্যন্ত তাঁতিরা ব্যবসায়ীদের দাদন ফিরিয়ে দিতে পারতেন - তাঁদের রোজগার ছিল ইওরোপের তাঁতিদের তুলনায় অনেক বেশি – তাঁরা সারাবিশ্বজুড়েই ব্যবসা করতেন। নীল উতপাদন-বিতরণ ব্যবস্থাই ধরা যাক, ২০০০ বছর আগে রোমে ভারতীয় নীল যেত - নাম ইন্ডিগো – উৎপাদনের ভৌগোলিকতার সূত্র ধরে - নীল লাতিন আমেরিকা থেকেও সে সময়ের ইওরোপে আসত - তারও নাম ছিল কিন্তু ইন্ডিগো – এই প্রায় একচেটিয়াসম ব্যবসাকে ১৮০০ সালের পর রাষ্ট্রের মদতে, বড় কর্পোরেট পুঁজি, উতপাদ-বিতরকদের বুকে বন্দুক ঠেকিয়ে দখল - ধ্বংস করল। অথচ অন্তত ২০০০ বছর ধরে নানান ধরণের কৃষি বা শিল্প উতপাদনের একচেটিয়া ব্যবসা করেও কেন্দ্রিয় দখলদারির, চাষীদের নিংড়ে লাভের শেষ কপর্দক তুলে নেওয়ার নীলকর তৈরি হয় নি। ম্যাঞ্চেষ্টারের অতিরিক্ত উতপাদনের কাপড় মিলগুলি লাভ করতে ততদিন পারে নি, যতদিন না বন্দুকের মুখে দাঁড় করিয়ে ভারতের আড়ংগুলি ধ্বংস করা হয় নি, নীল চাষ-ব্যবসা দখল করা হয় নি, ইওরোপে ইস্পাতের (ধাতুর) কারখানা চলে নি যতদিননা ভারত ব্যপ্ত ৩০০০০ চলন্তিকা ছোট্ট গলনচুল্লির ধারক-বাহক, দেশের ছোট সামাজিক উৎপাদন ব্যবস্থার অংশ ডোকরা উতপাদকেদের ধ্বংস করা হয় নি - এই ইস্পাত মণ্ড দিয়ে এক সময় বিশ্ববিখ্যাত দামাস্কাস তরোয়াল তৈরি হত বা বাংলার ব্রিটিশপূর্ব সময়ে বানানো প্রচুর লোহা/ধাতু সামগ্রী আজও আকাশের তলায় পড়ে থাকে মরচে বিহীন হয়েই।

আর্যভটের হাত ধরে আরও হাজারো গুনীর চেষ্টায় যে নিয়ন্ত্রণমুক্ত কলন বিদ্যার জ্ঞানচর্চা তাঁতিদের, নাবিকদের, চাষীদের হাতে প্রতিকূলতা জয় করার করার সুযোগ করে দিয়েছি্ল, বাংলা তথা ভারতের বিশিল্পিয়ায়নের ব্রিটিশ উদ্যমে সেই ব্যপ্ত কেন্দ্রবিহীন ভারতজোড়া বিদ্যাচর্চাকে উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে ধ্বংস করা হল, ইওরোপে গিয়ে সেই মুক্ত প্রাথমিক জ্ঞানচর্চা হয়ে উঠল উচ্চতম শিক্ষাব্যবস্থার অংশ – যারা সেই জ্ঞানচর্চাকে দখল করলেন তাঁরা তখন সেটির ওপরে পেটেন্টের ঘোমটা পরাতে ব্যস্ত ছিলেন। বাংলা তথা ভারতের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অন্যতম ধারক বসন্তের টিকাকারদের নিষিদ্ধ করে জেনারের উদ্ভাবিত টিকা ব্যবস্থাকেই চালাতে হয়েছে।

দেশজ প্রযুক্তির চরিত্র
ছোট্ট উৎপাদন ব্যবস্থায় উতপাদকের নিয়ন্ত্রণে থাকে প্রযুক্তির প্রয়োগ। বাংলার বাণিজ্য প্রচেষ্টা জানার ক্ষেত্রে প্রযুক্তি একটা বড় উপাদান। প্রযুক্তি কার নিয়ন্ত্রণে, এই তত্ত্ব-তথ্য আলোচনা ব্যতিরেকে, ব্রিটিশপূর্ব বাংলার বাণিজ্য প্রচেষ্টার আলোচনা ব্যর্থ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বাণিজ্য আলোচনায় প্রথমে বোঝা প্রয়োজন প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ আদৌ উতপাদকের হাতে রয়েছে কি না। অর্থাৎ যে প্রযুক্তি প্রয়োগ করে সে উৎপাদন করছে, তা বড় পুঁজির কেন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণ মুক্ত কি না – মোটা ভাষায় বলা যায়, কাজ করতে করতে প্রযুক্তির হাতিয়ারগুলি বিকল হলে সে নিজে বা স্থনীয়ভাবেই সেটা সারিয়ে নিতে পারে কিনা, না তাঁকে সমাজের বাইরের ওপর নির্ভর করতে হয়। একটা ছোট উদাহরণ দেওয়া যাক – বাংলার শাঁখারিদের শাঁখের করাত উপহার দিয়েছিলেন বর্ধমানের কামারেরা। তাঁরা এমনভাবে সেই করাত তৈরি করেছিলেন যাতে সেটি বংশপরম্পরায় ব্যবহার করা যায়, নিজেরাই সেই করাত ধার করে নিতে পারেন – কামারদের ওপর যাতে নির্ভর না করতে হয়। অশ্লীল পেটেন্টের কথা তুলছিই না।

শিল্পবিপ্লবের আগে থেকেই কেন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণযুক্ত বড় পুঁজি চেষ্টা করেই যাচ্ছে প্রযুক্তি, জ্ঞানচর্চা পেটেন্ট, কপিরাইট ইত্যাদি ব্যবস্থা প্রয়োগ করে দখলে নিয়ে আসতে।উদ্দেশ্য সামগ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থায় দখলদারি নিশ্চিত করা। উৎপাদন ব্যবস্থার চরিত্র বিচারে আমাদের প্রাথমিক প্রশ্ন প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ কার হাতে, পুঁজির চরিত্র কি - সে অন্য উৎপাদন ব্যবস্থাকে কন্সোলিডেশনের নাম করে, উন্নয়নের নাম করে সমাজের সম্পদ দখল করার ছাড়পত্র পায় কি না।

অন্য সভ্যতার কথা জানি না, ভারত মূলত শূদ্র সভ্যতা - জ্ঞানচর্চা, উতপাদন বিতরণ ব্যবস্থায় তাদের নিয়ন্ত্রণহীন পকড় নতুন ভাবে ভারতকে বসিয়েছিল বিশ্ব উতপাদন ব্যবস্থায়। ইতর, ছোটলোকেদের হাতে ছিল দেশের মূল উতপাদন বিতরণ ব্যবস্থা - তাঁরাই তৈরি করেছিলেন এই ব্যবস্থার দর্শন। কয়েক হাজার বছর ধরে শূদ্ররা, বৈশ্যরা, নিজেদের বিকেন্দ্রিভূত উৎপাদন দর্শন তৈরি করেছিলেন - যে দর্শনকে ধ্বংস করার চেষ্টা করে গিয়েছে ইওরোপ ৫০০ বছর ধরে। পলাশির পর রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে বিশিল্পিয়ায়ন, জ্ঞানচর্চা ধ্বংস, লুঠ, খুন ব্যবস্থা নামিয়ে এনে সেই দর্শন ধ্বংস বাস্তবে রূপ পায়, তা চরম রূপ ধারণ করেছে স্বাধীনতার পর - তার জন্য কয়েক কোটি গ্রামীন শূদ্রকে উচ্ছেদ করতে হয়েছে - সে লড়াই চলছে আজও। তবুও রক্তবীজের বংশধরেরা তাদের মত করে দেশের গ্রাম উতপাদন ব্যবস্থা ধারণ করে রয়েছেন বলেই বিশ্ব মন্দা ভারতে প্রভাব ফেলে না।

তাই আজকের বাংলার ব্রিটিশপূর্ব বাণিজ্য চর্চা আলোচনার কাজে প্রাথমিকতা হওয়া দরকার পুঁজির চরিত্র আর প্রযুক্তির চরিত্র বিশ্লেষণ করা। শিল্পবিপ্লবীয়(যে উদ্যম আদতে নব্য দাস ব্যবস্থা তৈরি করেছে - যার সঙ্গে বিপ্লবনামক বহুব্যাপ্ত ব্যঞ্জনাযুক্ত শব্দটির কোন সম্পর্ক নেই) সময়ে যে প্রযুক্তির বিকাশ ঘটল, চরিত্রের দিক থেকে সেগুলি কেন্দ্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। প্রযুক্তির চরিত্র এমন, শুধু প্রযুক্তির জ্ঞানচর্চা বিক্রি করে অনন্ত লাভ করা যায়। পশ্চিমে বিকশিত প্রযুক্তির বড় প্রযোগবাদিতা ছিল সামরিক বিদ্যা বিকাশে - আর্কিমিদিস থেকে গ্যালিলিও থেকে নিউটন থেকে ওপেনহাইমার, বোর পর্যন্ত পশ্চিমি প্রযুক্তি বিকাশের ইতিহাস তাই বলে। জনগনের অর্থে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে গবেষণাগারে বিকশিত সামরিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে মূলত বিশ্বজোড়া সম্পদ লুঠের কাজে, মানুষের মন নিয়ন্ত্রণের কাজে। ফলে পশ্চিমি প্রযুক্তির মূল চরিত্র লুঠেরার। শ্রমের যাতায়াত কোথায় উন্মুক্ত হল? ইওরোপ/আমেরিকার অভিবাসন আইন দেখলেই বোঝা যাবে। বিশ্বায়নের যুগে বড় পুঁজির বাজার উন্মুক্ত হয়েছে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপে - যেখানে সে পারে নি, সেখানে অস্ত্রের ব্যবহার করেছে।

তাত্ত্বিক, ব্যবহারিক প্রতিজ্ঞা
ক। তত্ত্ব - প্রাথমিকভাবে বাংলা তথা ভারত তথা এশিয়ার উৎপাদন ব্যবস্থা শিল্পবিপ্লবীয় উৎপাদন দর্শনের থেকে আলাদা ছিল। এই উৎপাদন ব্যবস্থা মূলত বড় পুঁজির প্রতিস্পর্ধী অবস্থান। সামাজিক সাম্যের দিকে অনেক বেশি নজর দেওয়া। একে সামাজিক ব্যবসাও বলা যায়। আজকে লুঠেরা কর্পোরেট পুঁজিকে ঠেলেঠুলে যে কাজ করানো যাচ্ছে না – সেই আদ্যিকালের যুগে - যে যুগকে অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগ বলে দাগিয়ে দিতে পশ্চিমি জ্ঞানচর্চকদের বিন্দুমাত্র দ্বিধা হয় না - বণিকেরা বাংলায় সব থেকে বেশি জনপূর্তির পরিকাঠামো তৈরির জন্য বিনিয়োগ করেছিলেন। তাঁরা হয়ত জানতেন সেই বিনিয়োগ উতপাদন-ব্যবসার কাজে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করবে।

অ। প্রাথমিকভাবে ছোট পুঁজি, ছোট পুঁজি ভিত্তিক উতপাদন-বিতরণের সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে হবে। বড় এবং কর্পোরেট পুঁজি থেকে সে কেন আলাদা, সেই তাত্ত্বিক অবস্থান নির্ণয় করতে হবে।

খ। ব্রিটিশপূর্ব বাংলার শিল্প-ব্যবসার বিষয়ে খুব বেশি কাজ হয়েছে কি না বলা যাবে না। আন্তভারতীয় বা আন্তএশিয়া ব্যবসা নিয়ে কিছু কিছু কাজ হয়েছে – কিছুটা গিল্ড নিয়ে হয়েছে - কিন্তু সে প্রচুর পুরনো সময়ের - সেখানে বাংলা ভিত্তিক আলাদা করে কোন কাজ হয়েছে বলে জানা নেই – নরেন্দ্র কৃষ্ণ সিংহ বা তপনবাবুর আকবরের সময়ের কাজ বা অঞ্জলী চ্যাটার্জীর ঔরঙ্গজেবের সময়ের বাংলা বইতে বিদেশিদের চোখে বাংলার ব্যবসার কিছু ওপর ওপর কাজ ছাড়া বিশেষ কিছু কাজ হয় নি। যা হয়েছে ইওরোপিয়দের সঙ্গে বাংলা/ভারতের যোগাযোগের দিন নিয়ে – প্রচুর ঐতিহাসিক কাজ করেছেন। সমস্যা হল, যারা ঔপনিবেশিক ইতিহাস লিখলেন তাঁরা যেমন উপনিবেশের, তার অর্থনীতি্র গুণ গাইতে তার মাহাত্ম্য তৈরি করলেন, আবার বিরোধীরা – যেমন ঔপনিবেশিক তত্ত্বের বিরোধীরা - নরেন্দ্রকৃষ্ণ সিংহ বা দাদাভাই নৌরজী বা রমেশ দত্ত (সঠিকভাবেই) লুঠের তত্ত্ব খাড়া করতে ঔপনিবেশিক সময়কেই ধরলেন - আজকের বাংলার বাইরে পটানা - বৃহত্তর বাংলা নিয়ে কাজ করেছেন কুমকুম চ্যাটার্জী তাঁর মার্চেন্টস পলিটিক্স অ্যান্ড সোসাইটি ইন আর্লি মডার্ন ইন্ডিয়ায়। যদিও ইওরোপের সঙ্গে ভারত/বাংলার ব্যবসার পরিমান ছিল মাত্র ১০% - বাকি ৯০% এশিয় এবং দেশিয়। আর ইওরোপ বলতে ব্রিটিশ বুঝলাম। পর্তুগিজেরা যে ভারতে মুঘলদের আগে এসেছিল সেই হার্মাদদের ব্যবসা ব্রাত্য হয়ে গেল - তাদের সঙ্গে ব্যবসার ইতিহাস ধরতে পারলে কিন্তু ১৪০০ সালের শেষের দিকের বাংলা্র ব্যবসার একটা দিক পাওয়া যেত। ব্রিটিশবাবাদের নিয়ে কাজের বাইরে দারুণ গবেষণা করেছেন ওম প্রকাশজী - ডাচেদের ব্যবসা নিয়ে। ভারতে যেহেতু প্রাথমিকভাবে তারা বাংলাতেই ঘাঁটি গেড়েছিলেন, তাই ব্রিটিশ ছাড়া ডাচেদের ব্যবসার কথা পাই - বিশেষ করে পলাশীর আগে তাঁরা কিভাবে কাজ করতেন, কিভাবে স্বাধীনভাবে তাঁতিরা কাজ করতে পারতেন, দাদন ফিরিয়ে দিতে পারতেন তা অসম্ভব নতুনত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন তিনি। বা শ্রীলা ত্রিপাঠি বলছেন হিপ্পালাসের মৌসুমী বায়ু 'আবিষ্কার'এর আগে থেকেই বাংলার নাবিকেরা দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় যেত - যার রেশ আজও থেকে গিয়েছে ওডিশার বালি যাত্রা উতসবে, বাংলার নানান ব্রতে, উতসব মেলায় - গুজরাটের নাবিকেরা লোহিত সাগর এবং আফ্রিকায় - প্রসন্নন পার্থসারথি, জর্জিও রিয়েলো বা পেড্রো মাচাডোরা দেখিয়েছেন ৩০০০ বছরের পুরনো বস্ত্র ব্যবসার কুড়।

আ। ব্রিটিশপূর্ব পূর্ব ভারতের অভ্যন্তরের বা ভারত এশিয়ার মধ্যে ব্যবসা কি ছিল তা নজর খুব একটা পড়ে না – ইওরোপ-ভারত ব্যবসার পরিমান ছিল মূল উৎপাদনের ১০% মাত্র, বাকি এশিয় আর দেশজ বাণিজ্য– আফ্রিক বিশেষ করে গ্রিস আর মিশরের সঙ্গে বিপুল বাণিজ্য হত – তা নিয়ে আলোচনা কোথায়? ইওরোপিয় গবেষণা নিবদ্ধ হয়েছে মূলত জামাকাপড় আর মশলা ব্যবসায়। এমন এমন একটা ধারণা তৈরি হয়ে গিয়েছে, এই বাণিজ্যের বাইরে আর কিছু খুব একটা লাভজনক পণ্য ছিল না। কিন্তু সোরা থেকে নুন থেকে তামাক থেকে সুপুরি থেকে লোহা থেকে চাল, আরও কি না কি ছিল বিশাল রপ্তানির পণ্য – একদা বাংলা থেকে গুজরাটের বন্দর হয়ে যে এত সুপুরি আরব দেশ বা লেভন্ট এলাকায় যেত যে সেই পণ্যের নাম থেকে বন্দরের নামই হয়ে গেল সোপারা। হেস্টিংস সে তিনিটি পণ্য প্রথম একচেটিয়া ব্যবসার অধীনে আনেন সেগুলি হল তামাক, সুপুরি আর নুন – বস্ত্র বা আফিম বা মশলা নয়।

প্রাতিষ্ঠানিক গবেষকদের সমস্যা বুঝি। তাঁরা যে জ্ঞানচর্চার পরিবেশে বেড়ে উঠেছেন, সেই জ্ঞানচর্চা মূলত লেখ্য জ্ঞানচর্চার ধারা, ইওরোপমুখ্যতাভিত্তিক, তার বাইরে কিছুই চোখে পড়ে না, পড়লে মনে ধরে না, মনে ধরলে কাজের সুযোগ হয় না। ফলে এই শ্রুতির দেশে, যেখানে খুব সহজে মনে রাখা্র ক্ষমতা তৈরি করা হয় ছোটবেলা থেকেই নানান সহজতম জ্ঞানচর্চার প্রক্রিয়ায়, বা এই গরম, জলীয়বাষ্প-মধুর দেশে, যেখানে খুব কঠিন কাগজ বা কোনোকিছু লেখ্য তথ্য সংরক্ষণ করা, সেখানে কি করে পূর্বজদের কাজ মূল্যায়ণ করা যাবে, তথ্য নিষ্কাশন করা যাবে তার তাত্বিকতা ভেবে বার করতে হবে। নইলে সামগ্রিক উদ্যম নষ্ট হয়ে যেতে পারে – কেননা, তাহলে আবার সেই অন্য দর্শনের জ্ঞানচর্চার ওপর নির্ভর করতে হবে।

এ নিয়ে যোগ্য আলোচনা দরকার। সমস্যা হল পদ্ধতি নিয়ে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তেলেভাজার অর্থনীতি নিয়ে বলে জোর গাল খাচ্ছেন অথচ এই বাংলার অর্থনীতিটা ছিল ছোট উৎপাদন ব্যবস্থাভিত্তিক। গবেষকেরা, অধ্যাপকেরা মনে করেন বড় কারখানা না হলে তা অর্থনীতি নয়, যেমন বাংলাদেশে আমাদের এক অধ্যাপক বন্ধু মাটির বাড়ি,মাটির মসজিদ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে শুনেছেন মাটির বাড়ি/মসজিদকে কবে থেকে স্থাপত্য ধরা হল? সেই শিক্ষা তাঁরা পেয়েছেন ইওরোপের শিল্পবিপ্লবীয় উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে। অথচ যতদিন নিজেদের অর্থনীতি, নিজেদের প্রযুক্তি, নিজেদের শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল ততদিন বাংলা ছিল বাণিজ্যে উদবৃত্তের দেশ। সেটা যেন মনে রাখি।

Tuesday, March 21, 2017

বাংলার বাণিজ্য চর্চা - তারানাথ তর্কবাচস্পতি

খুব সম্প্রতি সরকার নির্ভর পুঁজিবাদ নিয়ে খুব তর্ক বিতর্ক উঠছে।

ব্রিটিশ উপনিবেশে পলাশীর কুশিলবেরা কর্নওয়ালিসের পরিকল্পনায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কল্যাণে বড় মানুষ হয়ে উঠছেন - কোম্পানির রাজত্বের কর্ণধারদের সঙ্গে ওঠা বসার সুযোগে ধনবান হয়ে উঠছেন দ্বারকানাথ-রামমোহন জুটি - এমনকি বিদ্যাসাগর মশাইও ব্যবসায়ে সরকার নির্ভরতার পথ ধরতে কুণ্ঠা বোধ করেন নি।

অথচ তারানাথ বাচস্পতি সংস্কৃত কলেজে পড়েও তাঁর সহধ্যায়ীদের মত চাকুরিজীবিও হননি, আবার সরকারি সুযোগ সুবিধে নিয়েও ধনী হননি। চিরাচরিত ব্যবসায়ী বাংলার অতীত ঐতিহ্য মেনে কলকাতার বাইরে চালিয়েছেন বিশাল কর্মযজ্ঞ।

সেই মানুষটির প্রতি ছোট ব্যবসায়ীদের উইভার্স, পার্ফরমিং আর্টিজান, ট্রাডিশনাল পার্ফরমিং আর্টিস্টস গিল্ডএর শ্রদ্ধার্ঘ-

---
কালিদাস সার্বভৌমের পুত্র তারানাথ তর্কবাচস্পতি ১৮১২ খৃষ্টাব্দে কালনায় জন্মগ্রহণ করেন। বিদ্যাসাগরের চেয়ে তারানাথ প্রায় আট নয় বছরের বড় ছিলেন। সংস্কৃত কলেজের ততকালীন অধ্যক্ষ, বেঙ্গল ব্যাঙ্কের দেওয়ান রামকমল সেন মশায়ের সঙ্গে কালনার 'বাঙাল ভট্টাচার্য' পরিবারের ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছিল।

রামকমল প্রায়ই কালনায় যেতেন। তিনিই তারানাথ ও তাঁর জৈষ্ঠতাতপুত্র তারাকান্তকে কলকাতায় নিয়ে এসে সংস্কৃত কলেজে ভর্তি করে দেন। তারানাথ প্রথমে অলংকার শ্রেণীতে ভর্তি হন। পরে প্রসিদ্ধ নৈয়ায়িক নিমচাঁদ শিরোমণির কাছে ন্যায়শাস্ত্র আধ্যয়ন করেন। যখন তিনি ন্যায়শাস্ত্রের ছাত্র, তখন বিদ্যাসাগর আলঙ্কার শ্রেণীর ছাত্র। প্রতিদিন বিকেলবেলা ছুটির পর বিদ্যাসাগর, তারানাথের ঠনঠনিয়ার বাসায় যেতেন। তখনকার কলকাতার বড় বড় পণ্ডিতসভায় তারানাথ বিচারের জন্য আমন্ত্রিত হতেন এবং বালক ছাত্র বিদ্যাসাগরকে সঙ্গে করে নিয়ে তিনি যেতেন সভায়। বিদ্যাসাগরকে দিয়েই তিনি সবায় প্রায়ই 'পূর্বপক্ষ' করাতেন। পনের বছরের বালক বিদ্যাসাগরের 'পূর্বপক্ষ' করা দেখে সকলে বিস্মিত হতেন। পরে তারানাথ উঠে সভাস্থ পণ্ডিতদের বিচারে পরাস্ত করতেন।

কলেজের পাঠ শেষ হওয়ার পর বাচস্পতি মশায় বর্ধমানের সদর আমিন পদের নিয়োগপত্র প্রত্যাখ্যান করেন। বৃত্তিভোগ করা বা চাকুরী করার মতন মনোভাব তাঁর কোনকালেই ছিল না, স্বাধীনভাবে ব্যবসা করে উন্নতি করাই বাচস্পতি মশায়ের কাম্য ছিল। ...কালনায় নিজ বাড়িতে টোল ...খুললেন ...এবং কাপড়ের দোকান খুললেন বাজারে। তখন বিলেতী কাপড়ের আমদানি পূর্ণোদ্যমে শুরু হয় নি। বিলেতী সুতো কিনে আম্বিকা-কালনায় প্রায় বারোশ তন্তুবায়কে দিয়ে তিনি কাপড় বুনিয়ে ব্যবসা করতেন এবং বাইরেতেও কাপড় চালান দিতেন। কিছুদিন পরে তারানাথ মেদিনীপুর জেলার রাধানগর গ্রামে কাপড়ের কুঠি প্রতিষ্ঠা করেন। কাশী, মির্জাপুর, কানপুর, মথুরা, গোয়ালিয়র প্রভৃতি অঞ্চলে তিনি কাপড় পাঠাতেন। তখনও কিন্তু রেলপথ সর্বত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। গরুর গাড়িতে আথবা মুটের মাথায় পণ্ডিত মশায় লক্ষ লক্ষ টাকার কাপড় চালান দিতেন। কলকাতার বড়বাজারেও তাঁর কাপড়ের দোকান ছিল। কাশী-আমৃতশহর থেকে তখন প্রায় ছয় লক্ষ টাকার শাল বাংলাদেশে আমদানি হত। তাঁর মধ্যে প্রায় এক লক্ষ টাকার শাল বাচস্পতি মশায় নিজে আমদানি করতেন। এ-ছাড়া হীরা-জহরত, সোনা-রূপার আলঙ্গারেরও তাঁর ব্যবসা ছিল। বীরভূমের দশ হাজার বিঘে জঙ্গল কিনে তিনি চাষ আরম্ভ করেন এবং পাঁচশ গরু কেনেন দুধ-ঘিয়ের ব্যবসার জন্য। মুটের মাথায় করে কলকাতায় ঘি এনে তিনি বিক্রী করতেন। কালনাতে তিনি নেপালে ও তরাই অঞ্চল থেকে কাঠ আমদানি শুরু করেন এবং কাঠের ব্যবসাতেই কয়েক লক্ষ টাকা উপার্জন করেন। এই সময় কালনাতে তিনি প্রাসাদের মত বিরাট অট্টালিকা তৈরি করেন বসবাসের জন্য। কাপড় কাঠ ছাড়া চালের ব্যবসা করতেও বাচস্পতি মশায় ছাড়েননি। কালনায় কয়েক শত ঢেঁকি বসিয়ে তিনি ধান ভানতে আরম্ভ করেন, কারণ চালের কল তখনও তেমন আমদানি হয় নি। ঢেঁকির শব্দে অতিষ্ঠ হয়ে কালনাবাসী যখন অভিযোগ করেন, তখন তিনি তাঁর ঢেঁকিশাল বা ঢেঁকির কারখানা দূরের গাঁয়ে সরিয়ে নিয়ে যান।

বিনয় ঘোষের পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি্র থেকে(বই কৃতজ্ঞতাঃ সৌমেন নাথ)

প্রাকৃত বাংলা স্বাস্থ্য ব্যবস্থা - বাংলার পরম্পরাগত চিকিৎসা ব্যবস্থা

সহায়তায় ইন্ডিয়ান স্ট্যাস্টিটিক্যাল ইনস্টিটিউটের ঘিলু ল্যাব
এটা আবার কি? আয়ুর্বেদ? নয় কেন? কেন প্রাকৃত বাংলা স্বাস্থ্য ব্যবস্থা?
সত্যি তো,আয়ুর্বেদ চিকিৎসা ব্যবস্থা ছেড়ে কেন গ্রাম্য প্রাকৃত চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে মাথা ঘামাল ওয়াটাগ, বঙ্গীয় পারম্পরিক কারু ও বস্ত্র শিল্পী সঙ্ঘ, কলাবতী মুদ্রা, কনকটি বোড়ো কৃষ্টি আফাত এবং আরও বেশ কিছু সংগঠন?
সঙ্গঠনগুলো থেকে তাত্ত্বিকভাবে আমরা মনে করি রোগ আঞ্চলিক - নির্ভর করে জীবনযাত্রা, দেহতন্ত্র, পরিবেশ, পেশা এবং ভূপ্রকৃতির ওপর। দূর দেশে কোন ওষুধ তৈরি হলে, সেটি যে বিশ্বজনীন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে এই তথ্য আমরা বড় পুঁজির সঙ্গবাদমাধ্যমের প্রচারে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছি। এলোপ্যাথির মতই আয়ুর্বেদ কেন্দ্রিয় শাস্ত্র নিদান নির্ভর। কিন্তু প্রাকৃত চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রায়োগিকভাবে ভীষণভাবে আঞ্চলি জ্ঞান-প্রযুক্তি-সম্পদ-পরিবেশ নির্ভর, রোগী/অসুস্থতা কেন্দ্রিক এবং সংহত।
ঠিকই আয়ুর্বেদ নিয়ে কাজ করাটা খুব সোজা ছিল। তার একটা দেশজ-আন্তর্জাতিক ব্রান্ডিং আছে। বড় পুঁজির স্নেহধন্য। মানুষকে বোঝাতেই হত না কেন আয়ুর্বেদ? এবং আমাদের মত চাঁদা নির্ভর সংগঠনে এটা আশীর্বাদ হত, খাটনি কম হত, চরক শুশ্রুত বা বাঙালি ভগভট্টের সংস্কৃত নিদান তুলে দিলেই কেল্লা ফতে - দুবার প্রশ্ন করার সুযোগই থাকত না।
তাহলে? পরম্পরার প্রাকৃত চিকিৎসাটি বাংলার, ভীষণই রোগীকেন্দ্রিক। রোগ যদি আঞ্চলিক হয়, তা হলে সেই অঞ্চলেই তাঁর প্রতিষোধক প্রকৃতি দিয়ে রেখেছে। চিকিতসাকর্মীর দায় সেই অঞ্চলের নির্দিষ্ট ভেষজ, খণিজ বা প্রাণীজ উপাদানটি ব্যবহার করা। তাত্ত্বিকভাবে প্রাকৃত চিকিৎসা যদিও আয়ুর্বেদের ত্রিদোষ তত্ত্ব বা পঞ্চতত্ত্বের কাছাকাছি কিন্তু প্রায়োগিকভাবে অনেক স্বাধীনিতা পান প্রাকৃত চিকিৎসায়। চিকিৎসক/সেবকের দায় থাকে রোগীর বাড়ি বাড়ি গিয়ে সেবা দেওয়ার। আমরা জেনেছি, প্রাকৃত চিকিৎসক চেষ্টা করেন প্রাথমিকভাবে খাদ্য, তাঁর পরিবেশ/জীবনযাত্রা পরিবর্তন করে নিরাময়ের। সর্বশেষে ওষুধ প্রয়োগ। সব থেকে বড় জোরের যায়গা হল তাঁর জ্ঞানের বৈচিত্র্য - সমাজে সমাজে, সমাজের মধ্যে পরিবারে পরিবারে যা আদতে বড় পুঁজির আতঙ্ক - বেঁচে থাকাটাই হুমকির সম্মুখীন।
এই জ্ঞান আর প্রজ্ঞা সারা বাংলার বিভিন্ন সমাজে ছড়িয়ে রয়েছে। মেচ, রাভা, গারো, টোটো, রাজবংশী, সাঁওতাল, মুসলমান, কুর্মী সহ আরও বেশ কিছু সমাজের হাজার হাজার বছরের পরম্পরার প্রাকৃত চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে নথি করার কাজ করেছেন নারায়ণ মাহাত কয়েক বছর ধরে। পরম পত্রিকার গ্রাম্য চিকিৎসা ব্যবস্থা সংখ্যার আমন্ত্রিত সম্পাদক ছিলেন নারায়ণ। পারিবারিকভাবে এবং পেশাগতভাবে প্রাকৃতিক চিকিৎসা শিখেছেন তিনি। বহু প্রবন্ধ ছাড়াও তাঁর একটা বই দেশজ ভেষজতে তিনি গাছ-গাছড়া এবং রোগ-অসুখ নিয়ে বিশদে আলোচনা করেছেন তিনি।
এই বৈচিত্র্যময় জ্ঞানকে সঙ্গঠনগুলি এবারে তাদের বৈচিত্র্যকে সম্মান জানিয়ে প্রায়োগিকতার স্তরে নিয়ে যাচ্ছে। বলা দরকার এই জ্ঞান সমাজগুলিতে বহুকাল ধরে রয়েছে। শুধু শস্তা নয়, তাঁর এফিকেসির জোরে - যদি আপনারা গাঁইয়াদের অজ্ঞ, মুর্খ, অশিক্ষির না ভাবেন।
গত দুবছর ধরে, বাংলার পরম্পরার প্রাকৃত চিকিৎসা ব্যবস্থা নথি করণ করতে নারায়ণ মাহাতর নেতৃত্ব দিয়ে এসেছেন। সেই চেষ্টাটা রূপ পাচ্ছে আগামী ৮,৯,১০,১১ এই চারদিন কলকাতায় নারায়ণের নেতৃত্বে গ্রামীন স্বাস্থ্য বিধায়কদের(গ্রামীন পরম্পরার চিকিতসকেদের এই নাম দিয়েছেন তিনি) প্রথম বৈঠক। সামগ্রিকভাবে এই বিষয়টা নিয়ে আলোচনা হবে সেই চারদিনের বৈঠকে। কথা হয়েছে ইন্ডিয়ান স্ট্যাস্টিটিক্যাল ইনস্টিটিউটের গর্গ চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে চলা ঘিলু ল্যাব এই প্রক্রিয়ায় সামিল হবে।
ইতোমধ্যে শহরে এই চিকিতসাব্যবস্থা নারায়ণ আর বঙ্গীয় পারম্পরিকের সম্পাদক মধুমঙ্গল মালাকারের নেতৃত্বে পা রেখেছে - প্রাথমিকভাবে কয়েকজন বন্ধু আর তাদের বাড়িতে এই তত্ত্ব প্রয়োগ করে চিকিৎসার কাজ চলছে।
তো এর পরের কাজ বাড়ি বাড়ি গিয়ে সেবা দেওয়া। শুধু ওষুধ দেওয়া নয়, যদি প্রত্যোজন হয় তা হলে খাদ্যাভ্যাস, জীবনধারণের প্রক্রিয়া বদলে দিয়েও রোগারোগ্য হতে পারে। আদতে শুধু রোগ নিরাময় নয় সার্বিকভাবে স্বাস্থ্য ফেরানো প্রাথমিক কাজ - ঠিক যে জন্য গ্রাম বাংলা এলোপ্যাথি ছাড়াই বহাল তবিয়তে বেঁচে রয়েছে।
কলকাতায় এই চারদিনের শেষ দিন বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা আর কিছুটা চিকিৎসার পরামর্শ দান শুরু।
আরও অনেক কথা বলার রইল। আমরা কি করতে চলেছি, তাঁর বিশদ আগামী দিনে পরের কোন প্রকাশনায়।
সঙ্গের ছবিগুলি আজ, ৬ চৈত্র ১৪২৩ সালে দীপঙ্করদার বাড়িতে।
অরূপদা এই বিষয়টা নিয়ে ছবিও করছেন।

Wednesday, March 15, 2017

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা২ - পঞ্চাঙ্গ প্রভাকর পঞ্চানন সাহিত্যাচার্য ।। ১৩১২সালে প্রকাশিত

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা২
পঞ্চাঙ্গ প্রভাকর
পঞ্চানন সাহিত্যাচার্য
১৩১২সালে প্রকাশিত

জানি খুব বেশি মানুষ পড়বেন না, তবুও...

এর আগের পর্বে যে সাতটি প্রশ্ন এবং উত্তর এই জ্যোতিষ সম্মেলনে তৈরি করা হয়েছিল সেগুলি উল্লেখ করব লিখেছিলাম।

আমাদের ধারণা সেই প্রশ্ন-উত্তরগুলি দেখলে আজকের যারা মেকলিয় পদ্ধতিতে কর্পোরেট লুঠেরা অন্যকে অস্বীকার করার জ্ঞানচর্চা করেন তাদের ধাঁধা লাগবে। কেন না এই শিক্ষা এবং জ্ঞান দান পদ্ধতি পশ্চিমি শিক্ষা আর জ্ঞানদান পদ্ধতি থেকে আলাদা - এর লব্জগুলো আলাদা, এর সংখ্যা লেখা, ব্যবহৃত চিহ্ন, পাঠপদ্ধতি সম্পূর্ণ আলাদা চর্চার বিষয় - ঠিক যেমন পশ্চিমি জ্ঞানচর্চায় তাঁর নিজস্ব ধারা রয়েছে, পূর্বের জ্ঞানচর্চাতেও নিজস্ব ধারা রয়েছে - কিন্তু পশ্চিম যেহেতু এটাকে জ্ঞানচর্চা বলে স্বীকার করে না(যদিও বহু জ্ঞান এখান থেকে সে চুরি করেছে) তাই একে সে মিথ্যা জ্ঞানচর্চা বলতে একটুও বাধে না।

যিনি ছোটবেলা থেকে অন্য জ্ঞানচর্চার মধ্যে দিয়ে বড় হয়েছেন, তিনি অন্যের জ্ঞানটা নাও জানতে পারেন - না সেটা তো স্বাভাবিক। কিন্তু তাঁর জন্য আপনার অজানা সম্পূর্ণ জ্ঞানচর্চা ব্যবস্থাটাকেই কুসংস্কার, মিথ্যা, অলৌকিক বলে দাগিয়ে দেবেন সেটা তো আর চলবে না।

প্রতিশ্রুতি মত নিচে সেই সাতটি প্রশ্ন-উত্তর দিলাম - এবারে বুঝে নিন এই প্রযুক্তি চর্চা আপনার কাছে কুসংস্কার আর বোধ আর গোচরহীন - কোনটা।

প্রথম প্রশ্ন
পঞ্জিকা গণনা করিতে সূর্য্যের বৎসর পরিমান কত দিন, কর দণ্ড, কত পল ইত্যাদি স্বীকার করিতে হইবে? এবং সূর্য্য ভিন্ন অন্য গ্রহের গতির মান(যেমন এক দিনের গতি) কিরূপে স্বীকার করিতে হইবে?
উত্তর
সূর্য্য সিদ্ধান্তোক্ত বর্ধমান স্বীকার করিতে হইবে। সূর্য্যাতিরিক্ত গতিতে, বোধোপলব্ধ বীজ(যন্ত্রাদি দ্বারা গ্রহ গতির পরীক্ষা করিয়া যে অন্তর পাওয়া যায় তাহা) সংশোধন করিয়া লইতে হইবে।

দ্বিতীয় প্রশ্ন
বৎসরের অয়ন গতির মান কি, স্বীকার করিতে হইবে?
উত্তর
সূর্য্য সিদ্ধান্তোক্ত সূর্য্যের বর্ষপরিমান যাহা স্বীকার করা হইয়াছে, তদনুসারে বর্ষে, অয়নগতি কিঞ্চিত আধিক ৫৮ বিফলা হইবে। তাহাতেও যদি বোধস্থলে বৈগুণ্য উপস্থিত হয়, তাহা হইলে, বোধোপলব্ধ বীজ সংস্কার ক্রিয়া গ্রহণ করিতে হবে।

তৃতীয় প্রশ্ন
আয়নাংশ ভিন্ন ভিন্ন মতে ১৮ হিতে ২৩ অংশের অধিক পাওয়া যায়। গ্রন্থারম্ভ কালে অয়নাংশ, কত স্বীকার করিতে হইবে?
উত্তর
আমাদের গ্রন্থারম্ভ কাল শকাব্দা ১৮২৬ হইতে ২২ অংশের অধিক ও ২৩ অংশের কম অয়নাংশ স্বীকার করিতে হইবে।

চতুর্থ প্রশ্ন
আরম্ভ স্থান (ভগনাদি) কি, স্বীকার করিতে হইবে?
উত্তর
ক্রান্তিবৃত্ত আরম্ভস্থান, অয়নাংশ অনুসারে সচল ও নিশ্চল, দুইই স্বীকার করিতে হইবে। এবং পঞ্জিকার সায়ন সংক্রান্তি ও নিরয়ণ সংক্রান্তি, দুইই দেখাইতে হইবে। আয়নারম্ভ দ্বয়, প্রত্যক্ষ সিদ্ধ হইবে।

পঞ্চম প্রশ্ন
দৃকপ্রত্যয়ের জন্য বোধোপলদ্ধ নব্য সংস্কার গ্রহণ করা যাইবে কি না?
উত্তর
দৃক প্রত্যয়ের জন্য যে বিষয়ের যে যে সংস্কার আআবশ্যক সে সকলই বীজ সংস্কাররূপে গ্রহণ করিতে হইবে।

ষষ্ঠ প্রশ্ন
তিথি কিরূপে সাধন করিতে হইবে?
উত্তর
স্ফূট চন্দ্র ও সূর্য্য হইতে তিথিমান সিদ্ধ করিতে হইবে, স্থূল ও সূক্ষ্ম উভয় রীতিতেই করণ গ্রন্থে দেখাইতে হইবে।

সপ্তম প্রশ্ন
মধ্যরেখা কি স্বীকার্য্য?
উত্তর
করণ গ্রন্থে কক্ষত্র সাধন, সাভিজিৎ, নিরাভিজিৎ এই উভয় প্রকারেই দেখাইতে হইবে।

আপনি পশ্চিমি জ্ঞানচর্চায় বড় হয়েছেন, স্বাবভাবিকভাবে এই প্রাযুক্তিক লব্জগুলি জানে না, তাঁর মানে কি এই জ্ঞানটা মিথ্যা হয়ে গেল?

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা১ - পঞ্চাঙ্গ প্রভাকর পঞ্চানন সাহিত্যাচার্য ।। ১৩১২সালে প্রকাশিত

লুঠেরা কর্পোরেট জ্ঞানচর্চায় আমাদের আপনারা নিলেনই না, তাতে আমার বয়েই গেল।
***তিথি হল এক দিনে চন্দ্র সূর্যের মধ্যে যে কৌণিক পার্থক্য হয় তাঁর মান - ১২ ডিগ্রি। ৩০টা তিথিতে এক মাস। অর্থাৎ ৩৬০ ডিগ্রি। মেকলে পদ্ধতিতে শিক্ষিতরা একে অঙ্ক বা জ্যোতির্বদ্যা না বলে কুসংস্কার বলেন - সেটা আসলে তাঁর শিক্ষা। এর সঙ্গে সংস্কার-কুসংস্কারের যোগ নেই।***



পশ্চিমি প্রাচ্যবিদ্যার্ণবেদের প্রচারে যে বন্ধুরা মনে করেন দেশিয় জ্ঞানচর্চা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল প্রাচীন যুগের পরে, মনে করিয়ে দেওয়া যাক চার্লস উইশ ১৮৩৪ সাল নাগাদ তেলেঙ্গা প্রদেশে কলন বিদ্যাচর্চা দেখেছিলেন, লিখেছিলেন জ্ঞানলুঠের জন্য তৈরি এশিয়াটিক সোসাইটির পত্রিকায়। জ্ঞানচর্চা সংক্রান্ত এ রকম হাজারো উদাহরণ দেওয়া যায় - সে কাজটি করেছেন ধরমপালজী তাঁর নানান লেখায় - উতসাহীরা দেখে নিতে পারেন।

বিদ্যাসাগর বা রামমোহন বা দ্বারকানাথ দেশে জ্ঞান-বিজ্ঞানের অভাবের জন্য কর্পোরেট লুঠেরা, খুনি, অত্যাচারী শিক্ষা ব্যবস্থা এ দেশে প্রণয়নের জন্য ধুয়া তুলেছিলেন, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা, উদ্দেশ্য প্রণোদিত এবং কর্পোরেট স্বার্থবাহী এবং দেশের স্বার্থ বিরোধী।

এই বইটি প্রমাণ যে দেশে দেশজ জ্ঞান, লব্জ নির্ভর পণ্ডিতি যুক্তি(তা পশ্চিমি পদ্ধতিতে নাও হতে পারে) তর্কের অবকাশ শেষ হয়ে গিয়েছিল এ কথা যারা মনে করেন, তারা হয় লুঠেরা জ্ঞানচর্চার তরফদারি করছেন নয়ত মিথ্যা বলছেন। এর ফলে আমরা মনে করি পশ্চিমি জ্ঞানচর্চায় নাদ, জল্প, বিতণ্ডা(যেগুলোর মানে আপনারা ভুলে গিয়েছেন - মনে রেখেছেন ডিসকোর্স) ইত্যাদির স্থান আছে, দেশিয় বিদ্যা চর্চায় নেই।

পঞ্চানন মহাশয় দেশিয় পদ্ধতিতে অঙ্ক করেই কামাখ্যানাথ তর্কবাগীশের মত খণ্ডন করেছেন সেটাও উল্লেখ্য - সেটা আজ থেকে ১০০ বছর আগে। তিনি বলছেন, 'কোন সংক্রান্তির কত পূণ্যকাল? কোন মকর সঙ্ক্রান্তিতে গঙ্গাস্নান করিতে হয় বা তিল দান করিতে হয়, সে ব্যবস্থা স্মার্ত্যরা করিবেন। জ্যোতিষ শাস্ত্রের সহিত তাহার কোন সম্বন্ধ নাই। জ্যোতিষ শাস্ত্র সূক্ষ্ম সংক্রমণ কাল গণনা করিয়া দিয়া প্রস্থান করিবে।'। পণ্ডিতি আলোচনা মানে ধর্মীয় আলোচনা এমন তথ্য মিথ্যা প্রমান করে এই উদাহরণ।

১৩০০ সালের প্রথম দশকে দ্বারকামঠের অধীশ্বর শ্রীশ্রীশঙ্করাচার্যের নেতৃত্বে বোম্বাইতে একটি পঞ্চাঙ্গ শোধন মহাসভা আয়োজিত হয়। দৃকপ্রত্যয়সিদ্ধান্ত ও ধর্মশাস্ত্রের শৌত স্মার্ত্ত কর্মানুষ্ঠান, পজিকার গণনা কিভাবে করতে হবে তাই নিয়ে সেই সভায় সারাদেশের ১৫০ জন পণ্ডিতের স্বাক্ষরযুক্ত একটি নির্ণয়পত্র প্রকাশিত হয়। বাংলা থেকেও প্রতিনিধিত্ব করেন ৯ জন পণ্ডিত, তাঁদেরও স্বাক্ষর ছিল (যেমন গুপ্তপ্রেস পত্রিকার গণক বিশ্বম্ভর জ্যোতিষার্ণব, ধীরানন্দ কাব্যনিধি ইত্যাদি)। বিচারের সময় নাদ জল্প এবং বিতণ্ডা হয়.৮ দিন ধরে যে বিচার চলে তাঁর সাতটি প্রশ্ন আর সমাধান তারা ছাপান। সেটি ৩ ফেব্রুয়ারি ১৯০৫ সালে হিতবাদীতে ছাপা হয়।

সংস্কৃত কলেজের জ্যোতিষের অধ্যাপক পঞ্চানন সাহিত্যাচার্য সেই সমগ্র বিষয়টি নিয়ে একটি বই লেখেন যার নাম পঞ্চাঙ্গ প্রভাকর। এখানে তিনি বিশদভাবে সাতটি প্রশ্নের কূট সমাধান বিষয়ে আালোচনা করেছেন।

সেটি নিয়ে আম জনতার আগ্রহ থাকবে না ধরে নিয়ে পরের লেখাতে দিচ্ছি।

এই প্রকাশনায় শুধু বলতে চাচ্ছি, লেখক এই বইএর উপসংহারে কামাখ্যানাথ তর্কবাগীশের গ্রহের গ্রহণ, উদয়, অস্ত ইত্যাদিতে সূর্য সিদ্ধান্ত অশুদ্ধ শুদ্ধ করার ইচ্ছেয় সম্মতি প্রকাশ করলেও তিথির সমস্ত পারিভাষিক মিথ্যের দাবিকে অযৌক্তিক বলে মনে করেন। তিনি লিখছেন, (এই বইতে) 'তিথি যে মিথ্যা কল্পনা নহে, যথার্থ, ইহার পদার্থ আছে, ইহা উত্তমরূপে বুঝাইয়াছি।...গ্রহণে ও তিথিতে গ্রহস্ফুটীকরণের প্রভেদ দেখাইবার জন্য, কতগুলি সিদ্ধান্ত বাক্য তুলিয়া তাহার সম্পূর্ণ মিথ্যা অর্থ কল্পনা করিয়া, যে কথার উত্থাপন করিয়াছিলেন, আমরা সেই সেই সিদ্ধান্ত বাক্যের যথার্থ অর্থ, করিয়া উত্তমরূপে মীমাংসা করিয়া দিয়াছি, যে প্রসিদ্ধ শাস্ত্র প্রণেতৃগণ তিথি ও গণনার জন্য একই প্রকার স্ফূট গ্রহ ব্যবহার ক্রিয়া থাকেন। স্ফূটী করণ ভেদ কোন সিদ্ধান্ত শাস্ত্রে নাই। যথার্থ উত্তরায়ণ সংক্রান্তির প্রায় বাইশ দিন পরে মকর রাশির স্নগক্রান্তি হয়। এই উভয় সংক্রান্তিতেই সূক্ষ্ম সংক্রমণ কাল গণিত দ্বারা নিরূপিত হয়া থাকে। কোন সংক্রান্তির কত পূণ্যকাল? কোন মকর সঙ্ক্রান্তিতে গঙ্গাস্নান ক্রিতে হয় বা তিল দান করিতে হয়, সে ব্যবস্থা স্মার্ত্যরা করিবেন। জ্যোতিষ শাস্ত্রের সহিত তাহার কোন সম্বন্ধ নাই। জ্যোতিষ শাস্ত্র সূক্ষ্ম সংক্রমণ কাল গণনা করিয়া দিয়া প্রস্থান করিবে।'

আদতে এই বিতর্ক হয় কর্পোরেট পড়াশোনার বাইরের জগতে - যার খবর মেকলে-ট্রেভলিয়নের পপৌত্র মধ্যবিত্ত আজও রাখে না।

আমাদের আপনারা আপনার লুঠেরা কর্পোরেট জ্ঞানচর্চায় নিলেনই না, তাতে আমার বয়েই গেল।

ধন্যবাদ।

Sunday, March 12, 2017

দেশিয় বণিক সমাজের ইতিহাস - গৌড়ে সুবর্ণ বণিক ।। শিবচন্দ্র শীল

অসাধারণ বই। ১০০ বছরেরও বেশি আগের রচনা। বইটির উল্লেখযোগ্য বিষয়, রাঢের সুবর্ণ বণিকদের গাঁই গোত্র সমাজের বিস্তৃত বর্ণনা। আমাদের কাছে উল্লেখযোগ্য লেগেছে আত্মনিয়ন্ত্রণের অনুশাসন তৈরির উদ্যমের ইতিহাস – যেটি চতুর্দশ কর্ম হিসেবে শেষ স্তবকে উল্লিখিত হয়েছে। এই বইএর ষষ্ঠ অধ্যায় থেকে কিছু তথ্য-চুম্বক তুলে দেওয়া গেল।

বইটিতে বাংলার রাঢীয় স্বর্ণবণিকদের ইতিহাস লেখার বহু উপাদান ছড়িয়ে রয়েছে। এটি গবেষকদের কাজ - আমরা শুধু দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারি। তিনি একটি বন্দনাংশ উল্লেখ করেছেন যেখানে শ্রীকৃষ্ণের উপাসনা করা হচ্ছে। এর থেকে মনে হয় দেশিয় বণিকেরা শুধু যে শৈব বা শাক্ত উপাসক ছিল এ ধারনা ভুল, তারা বৈষ্ণবও অনুগামীও ছিল। শ্রীচৈতন্যর নববৈষ্ণব ধর্মে উদ্ধারণ দত্তের মত বিপুল সংখ্যক বণিকের স্থান দেখতে পাই। আজকে কাজ হল দল বেঁধে এই গ্রামগুলোয় বণিকদের শেকড় খুঁজে এবং প্রয়োজনে তাদের পরিবারে রাখা পুঁথি পত্র বিধান ইত্যাদি বার করা।

***বইটি প্রকাশ পায় বঙ্গাব্দ ১৩১৭ আশ্বিন মাসে। লেখকই প্রকাশক। ঠিকানা চুচুঁড়া – শীলগলি। বইটি ছাপেন কে বি দত্ত, হিন্দুধর্ম প্রেস, ১২৪ আপার চিতপুর রোড, কলকাতা।***

## ভূমিকার প্রথম স্তবকেই লিখছেন ‘এ পর্য্যন্ত সুবর্ণ বণিকদের প্রকৃত জাতীয় ইতিহাস, একখানি গ্রন্থও প্রকাশিত হয় নাই, তাহাতেই আমার এই ইতিহাস লিখিবার উদ্যম।’##

...কালান্তরে দেখিতে পাই বণিকগণ, রাঢ দেশে ৬টি সমাজভুক্ত হইয়া বাস করিতেছেন। ছয় সমাজের নাম – ১ বিহরণ, ২ সপ্তগ্রাম, ৩ বর্দ্ধমান, ৪ নবগ্রাম, ৫ আজাপুর, ৬ কর্জনাপুর।

১৪১৪ শাকে কর্জনা নিবাসী অমরাক্ষ মল্লিক এক যজ্ঞের আয়োজন করেন। কর্জনার নিকটস্থ খড়্গেশ্বরী নদীর দক্ষিণ তটে, এক ক্রোশ স্থান ব্যাপিয়া যজ্ঞভূমি এবং তন্মধ্যে সভামণ্ডপ ও বণিকদিগের বাসগৃহ স্থাপিত হইল। ...শুভদিনে সভামণ্ডপে সভার প্রথম অধিবনেশন হইল। পূর্বোক্ত ছয় সমাজের ৪০ খানি গ্রামের ৭৯২ ঘর বণিক সভাস্থলে অধষ্ঠিত হইলে রাজা অমরাক্ষ, কৃতাঞ্জলিপুটে সভার বন্দনা করিলেন...(লেখক বলছেন ‘শ্রীকৃষ্ণের বন্দনা হইতে বৈষ্ণব ধর্ম্মের প্রভাব লক্ষিত হইতেছে। এ সময়ে ১৪১৪ শাকে শ্রীমান মহাপ্রভুর বয়স ৭ বৎসর মাত্র – সুতরাং একালে তাঁহার বৈষ্ণব ধর্ম প্রচারিত হয় নাই’ এবং ‘এই সভা বন্দনায় বিহরণ, নবগ্রাম, আজাপুরের নাম নাই’)।

এখানে আর বিশদে সভাবন্দনার কবিতা উল্লেখ করব না, শুধু ৪০টা গ্রামের নাম বলব যেখান থেকে বণিকদের ৭৯২ ঘর এসেছিলেন – কর্জ্জনা, ব্রাহ্মণভূমি, ভুরসুট, চন্দ্রকোণা, মুক্তিপুর, গঙ্গাপুর, আজাপুর, সপ্তগ্রাম, ফড়িঙগাছি, মঙ্গলকোট(উজ্জয়নী), কৃষ্ণপুর, মেদিনীপুর, নীলপুর, রামপুর, অযোধ্যা, হরিপাল, বেণ্যাটি, মন্দারণ, বালিগিরি, বিহরণ, নবগ্রাম, বর্দ্ধমান, বীরহট, বীরভূমি, বটগ্রাম, বালি, চাম্পানগর, ক্ষীরপাই, কাশিজোড়া, জয়পুর, পানসানি, মহানাদ, গোলাহাট, রাধানগর, বিদুরপাড়া, বাকলসা, বিষ্ণুপুর, মোরগ্রাম, নুদিপুর, চিত্রপুর।

এই বৈঠকে বণিকেরা ব্রাহ্মণ গোবর্ধন মিশ্রকে বণিকদের কুল পুস্তক লিখতে অনুরোধ করলেন – এই বিধান অনুসারে রাঢীয় স্বর্ণ বণিকদের মধ্যে ১২ জন কুলীন, ৬ জন রাঢী, ৩৫ জন বংশজ, ৩৬ জন গৌণ বংশজ, ২২৩ জন মৌলিক, ১২৮ জন কষ্ট মৌলিক, ৩৪৯ জন অতিকষ্ট মৌলিক ও একজন সম্মানিতে ভাগ করা হল।

দ্বাদশ কুলীনের নাম – ১ কৃষ্ণদাস চন্দ্র, ২ অনন্ত আঢ্য, ৩ গোপাল দেয়, ৪ কুলপতি দত্ত, ৫ জগন্নাথ শীল(এই পাঁচ জন কুলীন ও প্রাথমিক – মধুসূদন শীল ও চন্দ্রশেখর শীল{চন্দ্রশেখরের বংশধরগণ, বর্গির হাঙ্গামায় বলগনা হইতে সপরিবারে ঢাকায় পলায়ন করেন।} পশ্চাৎ কুলীন হইয়া জগন্নাথ শীলের সঙ্গে মিলিয়া ছিলেন) ৬ নীলাম্বর দত্ত, ৭ পতিরাজ দেয়(কুলীন কুলরাজ গোষ্ঠীপতি) ৮ চক্রপাণি দত্ত, ৯ বক্রেশ্বর দত্ত, ১০ লম্বোদর দত্ত, ১১ লক্ষ্মণ দত্ত, ১২ কালিদাস দত্ত।

অষ্ট রাঢী
১ মার্কণ্ডেয় সিংহ, ২ মথুরাদাস দাস, ৩ মাধব নন্দী, ৪ অশ্বধর সেন, ৫ শিখরমল্ল লাহা, ৬ রত্নসেন বর্দ্ধন, ৭ খুল্লন পাল, ৮ মিত্রসেন ধর

সম্মানী
১ সাগর বড়াল

জগন্নাথ শীলকে চতুর্দশ কর্মের অধিকারী করা হল –
১ নিমন্ত্রণ, ২ গুবাকগ্রহণ, ৩ কুলকর্ম্মে মধ্যস্থ্য, ৪ কুলকর্ম্মে পণের নিরূপণ করণ, ৫ বিরোধভঞ্জন, ৬ সমন্বয়ের ব্যবস্থা, ৭ অনুচিত কর্ম্মকারীগণের দণ্ড বিধান, ৮ বণিক ভোজন প্রভৃতি কর্ম্মে তত্ত্বাবধায়ণ, ৯ বর প্রদক্ষিণকালে কন্যাসন ধারণের ব্যবস্থা করা, ১০ মাল্যচন্দন ব্যবস্থা, ১১ কর্ম্মান্তে ব্রাহ্মণ দক্ষিণা প্রদান, ১২ মর্ম্মে বণিকের সংখ্যা করা, ১৩ গুবাকের নিরূপণ করা, ১৪ মর্য্যাদা নির্ণয় করা।

এই শেষ চতুর্দশ কর্মের সিদ্ধান্তটাই আত্মশাসনের প্রক্রিয়া, যা যৌথভাবে নেওয়া হল। একজন কুলপতিকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হল।

Monday, March 6, 2017

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা৩৪ - উনবিংশ এবং বিংশ শতে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র এবং দেশজ চিকিৎসা ব্যবস্থা ১৮০০-১৯৪৭

পুনম বালা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে এবং ১৯১৯ সালের সংস্কারে আয়ুর্বেদের পুনর্জাগরণের মূল আন্দোলনটি দাঁড়িয়েছিল জাতিয়তাবাদী ধারার আন্দোলনের সাফল্যের ওপরে। পুনায় নতুন আয়ুর্বেদ কলেজের শুরুর সময়ের রাজনৈতিক ঘটনায় আমরা বুঝতে পারি যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে যে কিভাবে পুনর্জাগরণ আন্দলন একটি রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়। বলা দরকার আয়ুর্বেদ কলেজগুলিতেও ছাত্র আন্দোলন লেগেই থাকত। অসহযোগ এবং আইনঅমান্য আন্দোলন ছাত্রদের ডাক দিল সব সরকারি বিদ্যালয় এবং বিদেশি পণ্য বর্জন করতে। এর উত্তরে ছাত্ররা সারা ভারতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলি বর্জন করে। পুনায় রাজনৈতিক নেতারা লোকমান্য তিলক বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে সেখানে অন্যতম বিষয় হিসেবে আয়ুর্বেদের পাঠ্যক্রম শুরু করলেন। ১৯৩২ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি কেড়ে নেওয়া হল এবং ১৯৩০-৩৪ সালের অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেওয়ার অপরাধে ছাত্রদের কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। এর উত্তরে জাতীয়তাবাদীরা ১৯৩৩ সালে পুনায় আরও একটি আয়ুর্বেদ কলেজের গোড়াপত্তন করেন, যা স্বাধীনতার পরে রাষ্ট্রীয় মান্যতা পায়।

১৯২১ সালে বাংলায় অসহযোগ আন্দোলনের অংশ হিসেবে গৌড়িয় সর্ববিদ্যায়তন একটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়ুর্বেদ পাঠ্য হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করা হয়। এর পাশাপাশি আয়ুর্বেদিয় চিকিতসকেদের উতসাহে বেশ কিছু আরও কলেজ স্থাপিত হয়। প্রখ্যাত আয়ুর্বেদাচার্য কবিরাজ শ্যামাদাস এই কাজে প্রভূত সাহায্য করেন। ১৯২২ সালে কাশিমবাজারের মহারাজার অনুপ্রেরনায় এবং সাহায্যে গোবিন্দ সুন্দরী আয়ুর্বেদ কলেজ স্থাপন করেন কবিরাজ রমেশচন্দ্র মল্লিক, ১৯৩২ সালে বিশ্বনাথ আয়ুর্বেদিয় কলেজ স্থাপিত হয় যার উদ্দেশ্য ছিল বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে আয়ুর্বেদের পুনর্জাগরণ এবং প্রায় সব বিষয়ে ছাত্রদের প্রশিক্ষিত করা।
প্রত্যেকটি শিক্ষাকেন্দ্রে আয়ুর্বেদের পাশাপাশি পশ্চিমি চিকিৎসা বিদ্যাও পড়ানো হয়েছে।

১৯১৬ সালের বাংলায় সংবাদপত্রের দাবি ছিল সরকারের উচিত দেশিয় পদ্ধতির চিকিৎসা ব্যবস্থাকে উতসাহিত করা... এদেশের সরকারের দায় হল আয়ুর্বেদ এবং য়ুনানির পুনর্জাগরণ ঘটিয়ে বৈজ্ঞানিকভাবে আধুনিক নীতি অনুসরণ করে গবেষণায় উৎসাহ দানকরা এবং রোগীদের সারিয়ে তোলার দায় গ্রহন করা।
১৯১৭ সালে প্রথমবার মাদ্রাজ প্রাদেশিক সরকার আয়ুর্বেদ নিয়ে উৎসাহ দেখিয়ে ড কোমানকে দায়িত্ব দিলেন রাজ্যের দেশিয় চিকিৎসা বিষয়ে সমীক্ষা চালাতে।৯৩ স্টেইনথাল বলছেন আয়ুর্বেদের পুনর্জাগরণীদের আন্দোলনের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে মাদ্রাজ সরকার এই সিদ্ধান্ত নেয়।

বাড়তে থাকা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের চাপে প্রাদেশিক সরকারগুলি দেশিয় চিকিৎসা বিদ্যা পুনর্জাগরণের বিষয়ে কিছু কার্যকরী সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করে। ১৯১৯এর সংস্কারের পরে যেহেতু বহু ক্ষমতা, বিশেষ করে স্বাস্থ্য বিষয়টি, প্রাদেশিক মন্ত্রীদের হাতে চলে আসে, এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপও বাড়তে থাকে। দেশিয় চিকিৎসার অবস্থা সমীক্ষা করতে বেশ কয়েকটি প্রাদেশিক সরকার কমিটি তৈরি করে।

বিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে দেশিয় পেশাদারদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ছিল প্রাদেশিক মেডিক্যাল দপ্তরের ওপর; তবে ক্ষেত্র বিশেষে নীতি পালটে যায়। প্রত্যেক প্রদেশে একটি করে আয়ুর্বেদিক কংগ্রেস তৈরি করা হয়, যে সংগঠনের উদ্দেশ্য ছিল প্রাদেশিক সরকারের কাছে দেশজ চিকিতসকেদের দাবিদাওয়াগুলি পেশ করা। ১৯৩১এ বাংলা প্রদেশে চিকিৎসকেরা(মেডিক্যাল মেন) আয়ুর্বেদ চিকিতসায়, শিক্ষাদানের প্রমিতিকরণ এবং স্বীকৃত আয়ুর্বেদিক কলেজগুলিতে পরীক্ষা নিয়ে সার্টিফিকেট এবং ডিপ্লোমা দেওয়ার জন্য জেনারেল কাউন্সিল এবং স্টেট ফ্যাকাল্টি তৈরি করে। হয়ত য়ুনানি চিকিৎসা ব্যবস্থার জন্যও নিশ্চই এ ধরণের একটি সংগঠন তৈরি হয়েছিল, কিন্তু তার বাস্তবে বেঁচে থাকার কোন নিদর্শন পাওয়া যাচ্ছে না। প্রাদেশিক সরকারগুলি দেশিয় চিকিৎসা ব্যবস্থায় এগিয়ে আসবে এমন একটা আশা দেখা গেল। ১৯৩৬ সালে এমসিআই তৈরি হলেও জাতীয়তাবাদীদের দাবি এবং প্রতিবাদ সত্ত্বেও সেটি থেকে দেশিয় চিকিতসকেদের বাদ দেওয়া হল। এই সময় থেকে পশ্চিমি চিকিৎসকেদের সঙ্গে দেশিয় চিকিতসকেদের দূরত্ব যোজন প্রমান হয়ে গেল – স্পষ্ট বলা হল যদি পশ্চিমি চিকিৎসকেরা অতিন্দ্রিয়, পৌরানিক, আধা-ধার্মিক গল্পগাছার ঘোমোটাওয়ালা এই চিকিৎসাবিদ্যার সঙ্গে জুড়ে থাকেন, তাহলে তাদের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি কেড়ে নেওয়া হবে৯৬।

সামগ্রিকভাবে ঔপনিবেশিক সরকার ১৯০০ সাল থেকে দেশে বিভিন্ন ধরণের চিকিৎসা ব্যবস্থা, চিকিতসকদের এবং পাঠ্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ জারি করতে থাকে। এই ধরণের রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার উত্তরে দেশিয় এবং পশ্চিমি চিকিৎসকেরা নিজেদের সঙ্গঠিত করে সরকারের কাছে আরও স্বীকৃতি দাবি করলেন৯৭।

সিদ্ধান্ত
আমি মত প্রকাশ করেছিলাম যে ব্রিটিশ ভারতে বাংলা সরকার চিকিৎসা বিদ্যা প্রসারে পৃষ্ঠপোষণা করেছিল। এই কাজে আমরা দেখলাম বিভিন্ন চিকিৎসা গোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় নীতিকে পরাজিত করে পেশাদারি স্বীকৃতি লাভ করার চেষ্টা করেছিল। এর থেকে প্রমানিত হল রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় চিকিৎসা ব্যবস্থার বিকাশ ঘটলেও পেশাদারিত্বের বিকাশ নাও ঘটতে পারে। বাংলা প্রদেশ এই ধরণের ব্যার্থতার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।

আমাদের দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত হল যে ভারতে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের চরিত্র পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে চিকিতসকেদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষণার উদ্যম ব্যর্থ হয়েছে। যুদ্ধ পরবর্তী সংস্কারের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের উত্থানে বিবাদের পরিবেশ তৈরি হয় ফলে আমাদের দেশে পেশাদারি মনোপলি অবস্থার বদলে পেশাদারি অলিগোপলি অবস্থা তৈরি হল। স্বাধীনতার সময়ে ভারতে চার ধরণের চিকিৎসক গোষ্ঠী ছিল, যারা তাদের গোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকদের স্বার্থ পূরণ করার চেষ্টা করত। এরা হল

১) মেডিক্যাল কলেজগুলির ছাত্র যারা ধনী অভিজাত এবং সেনাবাহিনীর সেবা করত।
২) মেডিক্যাল স্কুলের ছাত্ররা ব্রিটিশ টেরিটরির সেবা করত
৩) মেডিক্যাল স্কুলের ছাত্ররা দেশিয় জনগনের সেবা করত।
৪) এর বাইরে ছিলেন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ছাড়া দেশিয় চিকিৎসকেরা যারা দেশের সাধারণ মানুষের সেবা করত।
(চলবে)

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা৩৩ - উনবিংশ এবং বিংশ শতে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র এবং দেশজ চিকিৎসা ব্যবস্থা ১৮০০-১৯৪৭

পুনম বালা

১৯৩৩ সালে চিকিতসার ডিগ্রি জারি, মানদণ্ড নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করতে অল ইন্ডিয়া মেডিক্যাল কাউন্সিল তৈরির বিল এল। গভর্নমেন্ট অব ইন্ডিয়া এক্ট প্রতিপালিত হওয়ার পরে সেই ডিগ্রিগুলি আবার নতুন করে স্বীকৃত হল। ভারত এবং ব্রিটেনে এই ডিগ্রিগুলি পারস্পরিকভাবে মান্যতা পাবে সেটাও স্থির হল।

পশ্চিমি চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রশাসকেরা পুরোনো চিকিৎসা শিক্ষার বদল এনে বাংলায় এবং ভারতের অন্যান্য এলাকায় শিক্ষা ব্যবস্থা নতুন করে ঢেলে সাজার কাজ যখন করছেন, তখন দেশিয় চিকিৎসার সঙ্গে যুক্তরা নিজেদের স্বাধিকার বুঝে নিতে চাইলেন। বিংশ শতকের শুরুতে স্বদেশি আন্দোলনে এই চাহিদার পালে হাওয়া লাগে। অসহযোগ আন্দোলনের সময় রোগীরা পশ্চিমি চিকিতসকেদের কাছে না গিয়ে দেশিয় চিকিতসকেদের কাছে যান, তার জন্য আন্দোলনকারীরা দেশ জুড়ে আবেদন করলেন। ১৯১২ এবং ১৯১৪ সালের মেডিক্যাল রেজিস্ট্রেশন এক্টএ জাতীয়তাবাদীদের রোষ বাড়িয়ে দেয় এবং জাতীয়তাবাদীরা সরকারের ওপর প্রভূত চাপ তৈরি করে। যদিও এই আইনে দেশিয় চিকিতসকেদের নথিভূক্ত করা হয় নি এবং বলা হয়েছিল, শুধু মাত্র সরকারি নথিভুক্ত চিকিতসকেরাই সরকারি চাকরি এবং সরকারি কেন্দ্রগুলিতে চিকিৎসা করার জন্য যোগ্য বিবেচিত হবে।

ভারতের ইতিহাসে আয়ুর্বেদ জাগরণের আন্দোলন বড় ভূমিকা পালন করেছে। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিতে এবং পৃষ্ঠপোষকতায় সেএই আন্দোলন শিক্ষা কেন্দ্র খোলার জন্য দেশ জুড়ে আন্দোলন তৈরি করে। সরকার নিয়ন্ত্রণ নিরপেক্ষ সংস্থা তৈরি হল আয়ুর্বেদ এবং য়ুনানির চিকিতসকেদের জন্য – একদিকে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশন বৈদ্যদের এবং হেকিমদের নথিকরণের কাজ করতে থাকে, অন্যদিকে বাংলার মহামেডান লিটারারি সোসাইটি এবং ন্যাশলান মহামেডান এসোসিয়েসন হেকিমদের নথিকরণ করার কাজে এগিয়ে আসে। জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পক্ষ থেকে এই কাজ সরকারের ওপর যথেষ্ট চাপ তৈরি করে৮৮।
বিংশ শতের শুরু থেকেই সারা দেশে দেশিয় এবং পশ্চিমি চিকিৎসা শিক্ষার একটা সমান্তরাল শিক্ষা ব্যবস্থা চালু হতে থাকে। এই আন্দোলন আরও জোরদার রূপ পায় ১৯০৭ সালে দেশিয় চিকিতসকেদের উদ্যমে অল ইন্ডিয়া আয়ুর্বেদিক কংগ্রেস নামক একটি সংগঠন তৈরি হওয়ায়।

আয়ুর্বেদ পুনর্জাগরণের আন্দোলনের মূলস্বরগুলি ছিল, সরকারি স্তরে রাজনৈতিক সাম্য, স্বীকৃতি এবং সমর্থন। ব্রাস এই আন্দোলনকে এইভাবে দেখছেন, একটি শিক্ষা বিষয়ক গোষ্ঠী, যাদের উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক পদ্ধতিতে স্বীকৃতি এবং পেশাদারিত্ব আদায়।৮৯

কিন্তু আয়ুর্বেদ আন্দোলন পেশাদারিত্ব অর্জনের রাজনৈতিক সমাধানে উস্থাপিত হওয়ার পদ্ধতিটাই তৈরি করে উঠতে পারল না। এই দুর্বার আন্দোলনেও পশ্চিমি চিকিৎসা ব্যবস্থার স্পর্ধিত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকার পরিকাঠামোই তৈরি হল না ভারতে। শিক্ষার অভিন্ন পাঠ্যক্রম বা চিকিতসার পেশাদারি মাপদণ্ড তৈরিও করা গেল না। আয়ুর্বেদ নবজাগরণ আন্দোলনের এই ব্যার্থতার কয়েকটি কারণ ব্রাস তুলে ধরেছতসারদেশিয় চিকিৎসার নবজাগরণের পদ্ধতি নিয়ে আন্দোলনকারীদের মধ্যে মৌলিক বিভেদ ছিল। কেউ কেউ শুদ্ধ আয়ুর্বেদের প্রচার চাইছিলেন, আবার পশ্চিমি চিকিতসা পদ্ধতির সঙ্গে আয়ুর্বেদের ধারনাকে জুড়ে, আয়ুর্বেদের বিকাশের তত্ত্বের মানুষও কম ছিলেন না। শুদ্ধতাবাদীদের বিরুদ্ধে তাদের বক্তব্য ছিল যে, ভারতের সেই সময়ের গণস্বাস্থ্য পরিকাঠামোয় যে শূন্যতা রয়েছে, সেটি একা শুদ্ধ আয়ুর্বেদিয় চিকিৎসায় সমাধান করা যাবে না, এর সঙ্গে পশ্চিমি চিকিৎসা ব্যবস্থাকে জুড়ে নিতে হবে। তৃতীয় অধ্যায়ে আমরা দেখেছি এমনকি পশ্চিমি চিকিৎসা ব্যবস্থা মহামারীর সময় দেশিয় ব্যবস্থাকে সঙ্গে নিতে পিছপা হয় নি। পাঠ্যক্রমের মৌল বিষয় নিয়ে মতভেদ থাকায় পেশাদারিত্বে উপনীত হওয়ায় চেষ্টা, চেষ্টাই থেকেই গেল।
(চলবে)

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা৩২ - উনবিংশ এবং বিংশ শতে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র এবং দেশজ চিকিৎসা ব্যবস্থা ১৮০০-১৯৪৭

পুনম বালা

বিংশ শতকের শুরুর দিকে ঘটনাক্রমের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটতে থাকে। চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক বিবাদ শুরু হয়। জাতীয়তাবাদী স্বাধীনতা আন্দোলনে বিজ্ঞানের পুনর্জাগরণের ধারণার সঙ্গে চিকিৎসা বিজ্ঞানের নবজাগরণের ধারণাটি জুড়ে গেল। ১৯১২ এবং ১৯১৯এর মধ্যে মেডিক্যাল রেজিস্ট্রেশন এক্ট চালু হওয়ায় বিরুদ্ধাচরণ করলেন দেশিয় চিকিৎসক গোষ্ঠী। এই সময়ে পশ্চিমি চিকিতসাবিদদের সঙ্গে দেশিয় চিকিতসকেদের বিবাদ প্রকাশ্যে এসে পড়ে। ১৯১৪ সালের বেঙ্গল মেডিক্যাল এক্ট বাংলায় একটি মেডিক্যাল কাউন্সিল এবং চিকিতসকেদের নথিভূক্ত করার কাজ করে। এই ধরণের আইন বম্বে এবং মাদ্রাজে চালু হয়। দেশিয় চিকিৎসার ওপরে এই আইনটির প্রভাব এই ঘটনা ক্রমের প্রভাবে দেখা যেতে পারে-

পশ্চিমি চিকিৎসায় শিক্ষত মাদ্রাজের কৃষ্ণ স্বামী আইয়ার এবং পি পি বৈদ্যর নাম প্রাদেশিক নথিকরণের খাতা থেকে হঠিয়ে দেওয়া হয় ১৯১৫ সালে দেশিয় চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে। ড আইয়ারকে বলা হয় তিনি যদি নিজেকে ট্রিপলিকেনের কালাভালা কুন্নুম চেট্টিয়ার ফ্রি ডিস্পেনসারির প্রশাসনিক ব্যবস্থা থেকে সরিয়ে না নেন, তাহলে চিকিৎসক হিসেবে সরকারি নথি থেকে তার নাম কাটা যাবে। বম্বের একই হুমকি দেওয়া হয় ড বৈদ্যকে। তিনি তার পিতার পিতার স্মৃতিতে চলা একটি আয়ুর্বেদিক পোপট প্রভুরাম কলেজে যুক্ত ছিলেন।
আন্দোলনকারীরা এবং সংবাদপত্র এবং দেশিয় চিকিৎসকেরা কাউন্সিলের এই নীতিকে নিন্দা করেন। দৈনিক ভাষ্কর মিত্র লিখল মাদ্রাজ কাউন্সিলের এই সিদ্ধান্ত প্রতিহিংসাপরায়ন এবং অসন্তোষজনক। সঞ্জীবনী এবং হিতবাদী বলল এই ঘটনা আতঙ্ককর এবং দেশিয় চিকিৎসা পদ্ধতির পক্ষে অপমানজনক।

চিকিৎসা বিদ্যালয়গুলি স্বীকৃতির মাধ্যমে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র পশ্চিমি চিকিৎসা বিদ্যাকে স্বীকৃতি দিয়ে পশ্চিমি পদ্ধতিতে শিক্ষিত চিকিতসকেদের স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করতে শুরু করল। বাংলার প্রাদেশিক সরকার ১৯০৬ সালে ক্যালকাটা মেডিক্যাল স্কুলকে স্বীকৃতি দিয়ে বলল সেই বিদ্যালয় থেকে কৃতকার্য হয়ে শংসাপত্র নিয়ে বেরোনো ছাত্ররা নথিভুক্ত হবে। ১৯১৬ সালের ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল(বোগাস ডিগ্রি) এক্টএর প্রভাবে এই ধরণের বেসরকারি বিদ্যালয়ে ছাত্রদের ভর্তি হওয়া বন্ধ হয়ে গেল। এই আইন অনুযায়ী ১৮৯৭-৯৮ সালে শুরু হওয়া বেলিগাছিয়ার কলেজ অব ফিজিশিয়ান্স এন্ড সারজনসএর মত প্রত্যেকটি বেসরকারি কলেজের ডিপ্লোমা দেওয়া নিষিদ্ধ করে দিল। আইএমএসএর এক আধিকারিক রায় কালিদাস চন্দ্র বোসের তথ্য অনুযায়ী সে সময়ে কলকাতায় এরকম চারটি শিক্ষা কেন্দ্র ছিল, যারা সারা দেশের জন্য বিপুল সংখ্যক বোসের দৃষ্টিভঙ্গী অনুযায়ী হাতুড়ে(বোগাস) ডাক্তার তৈরি করত।

১৯১৬ সালে বিলটি আইনে পরিণত হওয়ার আগে তার বিধিনিষেধগুলি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। কেউ কেউ৯ বিলে পশ্চিমি চিকিৎসার নিয়ন্ত্রণের ধারার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এই আইনে আয়ুর্বেদ, য়ুনানি, হোমিওপ্যাথিকেও যুক্ত করার জোরালো দাবি তুললেন। এমন কি উপনিবেশিক সরকারের মধ্যেও বিলের উদ্দেশ্য নিয়ে দ্বিমত ছিল। সেখানে কেউ কেউ চিকিৎসার স্তরকে উচ্চে তুলতে পশ্চিমি চিকিৎসার সঙ্গে দেশিয় চিকিৎসা পদ্ধতির মিলন ঘটাতে চাইত আবার অন্যেরা দুটি পদ্ধতির স্বাতন্ত্রের পক্ষে ছিল।

১৯১৮-১৯ সালে মন্তেগু(সেক্রেটারি অব স্টেট) এবং চেমসফোর্ড(ভাইসরয়) উপনিবেশিক ভারতের রাষ্ট্র চরিত্রে এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত নীতিতে পরিবর্তন আনেন। প্রশাসনিক সংস্কারে সৃষ্টি হল দ্বৈত নিয়ন্ত্রণ নীতি - স্থানীয় সরকারের হাতে কিছু রাজনৈতিক ক্ষমতা তুলে দেওয়া হল এবং তার মাথায় রইল কেন্দ্রিয় সরকার। তারা বিষয়গুলি দুভাগে ভাগ করলেন - ট্রানসফার্ড এবং রিজার্ভড ক্ষেত্র। ট্রানসফার্ড ক্ষেত্রটির কয়েকটি বিষয় যেমন শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং তাদের মনোনীত মন্ত্রীদের হাতে থাকবে। অন্যদিকে রিজার্ভড ক্ষেত্রটিতে রইল অর্থ, রাজস্ব, পুলিশ এবং অন্যান্য কিছু যা নিয়ন্ত্রণ করবে কেন্দ্রিয় সরকার। যুদ্ধর সময়ে প্রশাসনিক সেবায় ভারতীয়দের ভুমিকা বাড়তে থাকে। এর সঙ্গে চিকিৎসা জুড়ে গেল ট্রানসফার্ড বিষয়ে – চিকিৎসা সেবাতেও প্রচুর ভারতীয় প্রবেশ করতে লাগল। ১৯১২ সালের রয়্যাল কমিশন অব ইন্ডিয়ায় উপনিবেশের পূর্ত বিভাগে আরও বেশি ভারতীয়কে নেওয়ার সুপারিশ করে।৮১

গ। ১৯২০ থেকে স্বাধীনতা পর্যন্ত
মন্তেগু-চেমসফোর্ড সংস্কার স্থিতি পেলে ভারতীয় মন্ত্রীরা পৃষ্ঠপোষকতার সুযোগ পেলেন। দ্রুত ভারতীয়করণ, ক্ষমতার বিকেন্দ্রিকরণ এবং বিস্তারে মন্ত্রীদের হাতে বেশি বেশি ক্ষমতা আসায় যে পরিবর্তনটি ঘটল, তার ছোঁয়া লাগল চিকিৎসা ব্যবস্থায়। দেশজ মন্ত্রীরা হয়ত পশ্চিমি চিকিৎসা শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সঙ্গে দেশিয় চিকিতসা শিক্ষা ব্যবস্থা জুড়ে দিতে পারেন এই ভয়ে রেগুলেশন অব মেডিক্যাল স্টান্ডার্ড নিজেদের হাতে রাখল সরকার। চিকিৎসা শিক্ষার প্রমিতকরণের কাজে জেনারেল মেডিক্যাল কাউন্সিল বা জিএমসির নিয়ন্ত্রণ থাকায় শিক্ষা কেন্দ্রগুলিতে অত্যধিক ছাত্র প্রবেশে বাধা ঘটল। ব্রিটেনের ১৮৮৬ সালের মেডিক্যাল এক্টএ মেডিসিন এবং সার্জারিতে দাই এবং সার্জারিতে পরীক্ষার সুপারিশ ছিল। এর ফলে পাঠ্যের সময় বাড়ল এবং পরীক্ষা বিধি আরও কঠোর হল। ১৮৯২ সালে ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়া ডিগ্রি জেনারেল মেডিক্যাল কাউন্সিল স্বীকার করল।
প্রাথমিকভাবে জিএমসি ব্রিটেনের মত ভারত উপ্নিবেশে চিকিৎসা শিক্ষা কেন্দ্রগুলি পরিদর্শনের কাজ খুব একটা উৎসাহ দেখায় নি; তারা যে ছোট খাট পরিবর্তন প্রস্তাব করত সেগুলি সহজেই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ রূপায়ন করতে পারত। কিন্তু এই অবস্থা দীর্ঘ দিন চলল না। বাংলায় শিশু মৃত্যুর হার বেড়ে চলার তথ্যের সুযোগ নিয়ে ১৯০৭ সালে জিএমসি দাইদের স্তর উন্নীত করতে তাদের শিক্ষার প্রস্তাব দিল।

ভারতীয় হাসপাতালগুলিতে জিএমসির পরিদর্শনের প্রতিবেদনে দাইদের প্রশিক্ষণের অভাবকে চিহ্নিত করা হল। কলকাতায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে জিএমসি প্রশাসকদের বিরোধ বাধল।

১৯২২ সাল পর্যন্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়া চিকিৎসা ডিগ্রির ওপরে কোন রকম নিষেধাজ্ঞা জিএমসি জারি করে নি। ১৯২৪ সালে আর এ নিডহ্যামের পরিদর্শন-সমীক্ষা হাতে না পাওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়া কোন ডিগ্রিকে বাতিল না করার সিদ্ধান্ত নেয় জিএমসি। ইন্সপেক্টর জেনারেল অব মেডিক্যাল এডুকেশন, নিডহ্যামকে ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ডিগ্রির যোগ্যতা অর্জনের শেষতম পরীক্ষাটি বিষয়ে মন্তব্য করতে বলা হয়। ১৯২২ এবং ১৯২৩এর দাইদের পরীক্ষা নিডহ্যামএর আনুকূল্য অর্জন করে নি। ১৯২৪এর পরীক্ষাতেও একই ঘটনা ঘটলে নিডহ্যাম লিখলেন, গর্ভপাত(লেবার) বিষয়ে ছাত্রদের যথেষ্ট শিক্ষায় ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। ৮৪

১৯২৪ সালের নিডহ্যামের সমীক্ষা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঝড় তুলল। বিশ্ববিদ্যালয় নিডহ্যামকে তাদের পরীক্ষা নিরীক্ষণ করতে দিতে অস্বীকার করে এই যুক্তিতে যে তারা ছাত্রদের মেডিসিন, সার্জারি এবং মিডওয়াইফারিতে প্রয়োজনীয় শিক্ষা দিচ্ছে এবং তাদের ছাত্রদের অর্জিত দক্ষতা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় সন্তুষ্ট। ১৯২৪এর পর থেকে জিএমসি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা সংক্রান্ত ডিগ্রিকে মান্যতা দিতে অস্বীকার করে। ১৯২৭ সালের জুলাইতে জিএমসি নতুন করে এই বিষয়টি নিয়ে নাড়াচাড়া করে এবং ইন্সপেক্টর জেনারেল অব মেডিক্যাল কোয়ালিফিকেশনসকে নির্দেশ দেয় নতুন করে সমগ্র বিষয়টি নিরীক্ষণ এবং সমীক্ষা করতে। এর এক বছর পরে জিএমসি ভারতে মেডিক্যাল কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া তৈরির প্রস্তাব দেয়। কেন্দ্রিয় সরকার এমসিআই তৈরির প্রস্তাব নিয়ে খুব স্বচ্ছন্দ ছিল না, এবং প্রাদেশিক সরকারগুলি কেন্দ্রকে জানাল যে এই প্রস্তাবে কেন্দ্রিয় কাউন্সিল প্রাদেশিক স্বাধীনতার ওপর অবাঞ্ছিত আঘাত হানছে। প্রাদেশিক স্বাস্থ্য মন্ত্রীদের একটি সম্মেলনে এই দৃষ্টিভঙ্গী উঠে এল৮৫। এই বিতর্কে জিএমসি ১৯৩০ সাল থেকে ভারতীয় সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা শিক্ষা সংক্রান্ত ডিগ্রি দেওয়ার ক্ষমতা বাতিল করে এই যুক্তিতে যে, হাতে একটা ডিগ্রি থাকা মানেই চিকিৎসকের চিকিৎসার ন্যুনতম জ্ঞান থাকার প্রমানপত্র নয়।
(চলবে)