Monday, February 20, 2017

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা১১ - উনবিংশ এবং বিংশ শতে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র এবং দেশজ চিকিৎসা ব্যবস্থা ১৮০০-১৯৪৭

পুনম বালা

প্রাচীন চিকিৎসা ব্যবস্থার সঙ্গে য়ুনানির পার্থক্য করে দিল তার হাতে কলমে কাজের প্রয়োগবিদ্যার তাত্ত্বিকতা। ফিরোজ তুঘলকের সময়ে এ ধরণের শিক্ষা ব্যবস্থায় পরম্পরার বাড়ি ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে চিকিতসাবিদ্যার বিদ্যালয়ী করণের উদাহরণ পাওয়া যাচ্ছে৭২। মুঘল সময়ে ইরান এবং প্রতিবেশি দেশগুলি থেকে বহু বিশেষজ্ঞ চিকিতসক ভারতে আসেন। মুঘল রাজত্ব যে সব সেবা/রোগনির্নয়(ক্লিনিক)কেন্দ্র তৈরি করেছিল, সেগুলিতে এই চিকিতসকেদের পরবর্তী চার-পাঁচ প্রজন্ম সরাসরি যুক্ত থেকেছেন।

এই দুই চিকিৎসা ব্যবস্থা তাদের মধ্যের সাযুজ্যের জন্য বিকাশ লাভ যেমন করেছে, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতা। ফলে সেই সাহায্য য়ুনানি এবং আয়ুর্বেদের জ্ঞানভাণ্ডার সংহিতাকরণ করে লিখে রাখতে সাহায্য করেছিল। মধ্যযুগ পর্যন্ত দুই চিকিৎসাশাস্ত্রর এই সংহিতা করণের কাজ অবিচ্ছেদ্যভাবে চলেছে।

এমন কি মধ্য যুগে চিকিতসা জ্ঞানরূপে সংরক্ষণ এবং বিকাশের পথে চলেছে আয়ুর্বেদ চিকিতসাজ্ঞানশাস্ত্র। আয়ুর্বেদের প্রাচীন ধর্মীয় ঝোঁক মুসলমান শাসকদের খুব একটা খুশি করে নি। ফলে মুসলমান শাসকেরা পারস্য থেকে হেকিমদের নিয়ে আসেন চিকিৎসার জন্য। পরের দিকে ধর্মীয় গোঁড়ামি ছেড়ে ব্রাহ্মণেরা বৈজ্ঞানিক জ্ঞান এবং নব্য ব্যবস্থার নানান চরিত্র আত্তীকরণে স্বীকৃত হন। এই পর্বে আয়ুর্বেদ অতীতের গোঁড়ামি আর রক্ষণশীলতার খোলস ছেড়ে য়ুনানি চিকিতসাবিদ্যার প্রভাবে গতিশীলতার দিকে এগোতে থাকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, মুসলমান শাসকেরা পেশাদারিত্বের দিকে চিকিতিবিদ্যাগুলিকে ঠেলে দেওয়া। ফলে সমাজে চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা মানসম্মান বাড়ল।

ইলতুতমিসের(১২৯৬-১৩২১খ্রি) সময়ে বিপুল সংখ্যক য়ুনানি চিকিতসক রাজদরবারে প্রবেশলাভ করেন এবং তারা সেবা/রোগনির্নয়কেন্দ্র(ক্লিনিক) তৈরি করে অসুস্থদের নিদান দিতেন। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক বিকাশের ফলে সেই সময় প্রচুর চিকিতসক ভারতে আসেন। আলাউদ্দিন খলজি(১২৯৬-১৩২১)র রাজত্বে রাষ্ট্রীয় চিকিৎসালয়ে এবং রাজ দরবারে অন্তত ৪৫ জন চিকিৎসক কাজ করতেন।

পরের সময়েও চিকিতসকেদের ভারতে আসার ছেদ পড়ে নি। এই চিকিতসকেরা বহু চিকিৎসা সংহিতা রচনা করেন। মাজমা-ই-জিয়ে নামক একটি শাস্ত্র মহম্মদ তুঘলকের সময়ে সংহিতাকৃত হয়। এই কৃতিটি সেই সময়ের জ্ঞান এবং চিকিৎসা ব্যবস্থা আমাদের বুঝতে সাহায্য করে, যার ভিত্তি ছিল ভারত-আরব চিকিৎসা শাস্ত্র। এর ফলে সেই সময়ে ভারতীয় চিকিতসাবিদ্যার গুরুত্বটা বুঝতে পারি। মহম্মদ তুঘলকের সময়ে ৭০টির বেশি চিকিতসাকেন্দ্র শুধু দিল্লিতেই ছিল। এখানে ১২০০ চিকিৎসক যুক্ত ছিলেন৭৩।

চিকিৎসা জ্ঞানের প্রণালীবদ্ধ হওয়ার এই প্রচেষ্টা আয়ুর্বেদিয় ব্যবস্থাকেও জুড়ে নিল। মহম্মদ তুঘলকের পরে ফিরোজ তুঘলক তার চিকিতসকেদের শাস্ত্র লিখতে উতসাহ দিলেন। তিনি ব্যক্তিগতভাবে চিকিৎসা বিদ্যায় পারদর্শী এবং হাড়জোড়া ডাক্তারও ছিলেন। তিনি বড় একটা চিকিৎসাকেন্দ্র তৈরি করে নিজে সেই কেন্দ্রে চিকিৎসা করতেন৭৪। মহম্মদ শাহের চিকিসক আল মাহুমুদ ভগভট্টের(যতদূর সম্ভব সেটি রসরত্নসমুচ্চয়ঃ – অনুবাদকার) একটি বই পারস্যভাষায় অনুবাদ করেন। নাম হয় টিব্বি ফিরোজ শাহী৭৫। এছাড়াও সুলতান সংস্কৃত এবং আরবি নানান গ্রন্থ পার্সিতে অনুবাদ করার জন্য গুজরাটে একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। এইগুলির মধ্যে তারিখ ইবন খালিকান এবং মিশকাত শরিফ প্রখ্যাত।

শাহ সিকন্দর লোদির সময়ে প্রখ্যাত দরবারি চিকিৎসক বাওয়া বিন খাওয়াস, সুশ্রুত, চরক সংহিতা, রসরত্নাকর, শ্রাঙ্গধর, মাধবন, চিন্তামন এবং চক্রদতের আয়ুর্বেদিয় সংহিতাগুলি নির্ভর করে টিব্বি-সিকান্দরি রচনা করেন৭৬। ১৪১৪ সালের তুঘলক রাজত্বে দিল্লির সুলতানি শাসনভার সৈয়দদের কবলে যায় এবং তারা ১৪৫১ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। তারা লোদি আফগানদের জন্য দরজা খুলে দেয়। ১৪৮৯সালে বালহুল লোদির মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসা সিকান্দর লোদি মিয়াঁ ভোয়াকে রাজদরবারে নিযুক্ত করেন। ১৫১২ সালে ভোয়া প্রকাশ করেন মদন-উল-শিফা সিকন্দর শাহী নামক গ্রন্থ। যেখানে বলা হয়, ভারতের পরিবেশে বসবাস করা মানুষদের জন্য য়ুনানি ব্যবস্থা উপযুক্ত নয়, কেননা এই বিদ্যায় ব্যবহৃত ভেষজজগুলি গ্রিস বা আরবের পরিবেশ থেকে নেওয়া হয়েছে, তাই পার্সি ভাষায় আয়ুর্বেদের চিকিৎসা, ঔষধ ইত্যাদির নির্যাস নিয়ে একটি পুস্তক রচনা করা জরুরি।

সুলতানের প্রত্যক্ষ সমর্থনে ভোয়া তার সহায়ক হিসেবে বেশ কিছু জ্ঞানী হেকিমকে নিযুক্ত করেন। বিধিবদ্ধ চিকিৎসাকেন্দ্র তৈরি করে হেকিমদের সেই কেন্দ্রে চিকিৎসা বিদ্যা ঝালিয়ে নেওয়ার জন্য কাজ দেওয়া হল, এদের মধ্যে কয়েকজনের ব্যক্তিগত চিকিৎসাকেন্দ্রও ছিল। এই সময়ে আয়ুর্বেদের জ্ঞান শাসকদের মনে হল কাজে লাগতে পারে। পরের সময়ে দেখা যাবে যখন আয়ুর্বেদ তত্ত্ব মোটামুটি দেওয়া নেওয়ার মধ্যে দিয়ে য়ুনানিতে বিশেষভাবে স্থান পেয়েছে।
(চলবে)

উপনিবেশবাদ বিরোধীচর্চা - ভারতীয় অঙ্করচর্চায় বৃহত্তম এবং ক্ষুদ্রতম সংখ্যা গণন

গত কয়েকশ বছর ধরেই ভারতীয় নানান শাস্ত্রে বিপুল বিশাল সংখ্যার আধিক্য নিয়ে পশ্চিমি ঐতিহাসিক, সমাজতাত্ত্বিকেরা খুব হাসাহাসি করেছেন, বাঁকা কথা বলেছেন। প্রয়োগ নেই, মানে নেই এমন কিছু বিশালতম বা ক্ষুদ্রতম সংখ্যা নিয়ে পুরাণকার(আদতে এদেশের ঐতিহাসিকেরা)দের উৎসাহ নিয়ে তাঁদের কটু মন্তব্য বেশ প্রতুলই। যেমন বিনয় ঘোষ/সরকার বা বড় দেবীবাবুর রচনায় পুরাণকারদের ব্যবহৃত এ ধরণের অঙ্ক ব্যবহারের বিরুদ্ধউক্তি আজও পশ্চিমি জ্ঞানচর্চকদের মুখে মুখে ঘোরে। আমরা যারা ছোটবেলা থেকেই পশ্চিমি জ্ঞানচর্চা্র মানুষদের ভারতীয় জ্ঞানচর্চা, ইতিহাসচর্চা বিষয়ে উন্নাসিকতার পরিবেশে শিক্ষিত হয়ে উঠে, নিজেদের(মানে ব্রিটিশপূর্ব) সভ্যতা নিয়ে কথা বলার উৎসাহ, নিজেদের জ্ঞানচর্চা, নিজেদের শিক্ষাপদ্ধতির কথা বলতে গিয়ে রক্ষণশীল হয়ে পড়ি - কেননা সে সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য কেউই প্রস্তুত নই – কেননা সেই আলোচনা খুব একটা এই পরিসরে হয় না।
ভারত শুদ্র সভ্যতার জ্ঞানচর্চার পক্ষে(রামায়ণ এবং মহাভারতের রচয়িতা কিন্তুই শুদ্র) দাঁড়িয়ে একটা কথা বলা দরকার, যে তাঁরা সেই সংখ্যা ভাবার পরিকাঠামো তৈরি করে সেই খুব বৃহত আর খুব ক্ষুদ্র সংখ্যা ভাবার পরিবেশ তৈরি করেছিলেন। এবং পশ্চিম(প্রাতিষ্ঠানিক খ্রিষ্টধর্ম আচারিত অঙ্ক – যাকে আন্তর্জাতিক অঙ্ক নাম দিয়েছে পশ্চিম, যার উৎস নাকি প্রাচীন গ্রিসে, যে গ্রীসে শুন্যের ধারণাটাই ছিল না) বিগত চারশ বছর আগেও যেহেতু শূন্যকে শয়তানের প্রতিভূ বলে মনে করত ফলে সে বিশালতম বা ক্ষুদ্রতম অঙ্কের কাজ করবে কি করে। শেষে ইওরোপ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া জেসুইট পাদ্রিদের ভারত সভ্যতা নথি করণে দশমিক অঙ্ক ব্যবস্থা গৃহীত হল। তার পরে ইওরোপে শুরু হল বড় অঙ্ক করার পরবেশ।
ভারতে বড় অঙ্ক ভাবার সেই পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন ছিল কেননা দু সহস্র বছর ধরে ভারত পৃথিবীর ব্যাস বা আলোর গতিবেগ, বিভিন্ন নক্ষত্রের স্থান নির্ণয়, ধুমকেতুর পথ বা দশমিকের পরে ছাপান্নটি সংখ্যায় পাইএর মান নির্ণয় করে ফেলেছে।
তো এই পর্বে আমরা আলোচনা করব কত বড় সংখ্যা নিয়ে ভারতীয় শাস্ত্রবিদেরা আলোচনা করেছেন। সরস্বতী-হরপ্পা সভ্যতায় দশমিক ব্যবস্থার প্রয়োগ শুরু হয়ে গিয়েছে। মাইকেল ড্যানিনো বলছেন, সেই ধ্বংস হওয়া সভ্যতার জ্ঞানচর্চার রেশ চারিয়ে যাচ্ছে তার পূর্বের দিকে গড়ে ওঠা সভ্যতায়। যজুর্বেদে ঘাত হিসেবে এক(১০০) থেকে পরার্ধ(১০১২) পর্যন্ত আলোচনা করা হয়েছে(এই খেয়েছে ১০এর ঘাত বা আজকের ভাষায় টু দ্য পাওয়ার তো লেখা যাচ্ছে না ফেবুতে। পাঠকেরা দয়া করে দশের পরে যে অঙ্কটি আছে সেটিকে তার ঘাত হিসেবে পড়ুন)।
রামায়ণে রাবণের সৈন্য সংখ্যা বলা হয়েছে ১০১২ + ১০৫ + ৩৬(১০১০)। তার বিপরীতে যে সৈন্য বাহিনী রাম দাঁড়িয়ে রয়েছে তার সংখ্যা হল ১০১০ + ১০১৪ +১০২০ + ১০২৪ + ১০৩০ + ১০৩৪ + ১০৪০ + ১০৪৪ + ১০৫২ + ১০৫৭ + ১০৬২ + ৫ জন। এই প্রত্যেকটি ঘাতের নাম দেওয়া হয়েছে।
এর সঙ্গে গ্রিক সভ্যতার বড় সংখ্যার তুলনা করুণ ১০৪ এর ওপরে তাঁদের সংখ্যার নামই নেই – সাধে কি আর বার্ণল সাদা গ্রিস সভ্যতা নিয়ে হেসেছেন – আর বাংলার নাট্য বা জ্ঞনচর্চায় গ্রিসের নামে শিক্ষিত ভদ্রলোকেদের দুই কর জোড় হয়ে মাথায় উঠে যায়।
বা জৈন অঙ্কে আরও বড় সংখ্যা আলোচনা করা হচ্ছে ১ পূরবী = ৭৫৬ গুণ ১০১১ দিন; আর ১ শীর্ষ প্রহেলিকা = ৮৪০০০০০২৮ পূরবী(২৮ টা হল ৮৪০০০০০ ঘাত)। হিসেব করলে দেখা যাবে শীর্ষ প্রহেলিকায় রয়েছে ১৯৪টা সংখ্যা। আজও আমরা প্রহেলিকা শব্দটা ব্যবহার করি তার সূত্র না জেনেই।
১০ ঘাতের ক্রমাংক ধরে অতীত ভারতে প্রত্যেকটির নাম তৈরি করা হয়েছেল। আজকে যেমন আমরা খুব সহজেই ১৬৪৮৩৭৬কে ভেঙে বলতে পারি ১৬ লক্ষ ৪৮ হাজার তিনশ ছিয়াত্তর। যে ক্রমাঙ্কে সঙ্খ্যাগুলি বসেছে, সেটির একটি ওলটপালট হয়ে গেলেই গোটা সঙ্খ্যাই পালটে যাবে – এবং এই ব্যবস্থায় আসতে কত সহস্র বছর কেটেছে আমরা আজ হয়ত জানি না, বুঝিই না। এবার শুধু ভাবুন যে গুণীরা অতীত ভারতীয়দের বড় সংখ্যা ভাবা নিয়ে আজও কটাক্ষ করে চলেছেন, তাঁদের প্রিয় সভ্যতার রোমিয় অক্ষর দিয়ে যদি আমাদের আলোচ্য এই ছোটতম ১৬৪৮৩৭৬ সঙ্খ্যাকে প্রকাশ করতে হত? সেটা সাতটা সঙ্খায় আবদ্ধ থাকত না সাতের কয়েকশ গুণ সংখ্যা ব্যবহার করতে হত।
যেমন প্রথমে ভূত-সংখ্যা ৯টি সঙ্খার নাম দেওয়া হল। তাকে মনে রাখার জন্য জুড়ে দেওয়া হল প্রাত্যহিক জীবনে ব্যব্যহৃত কিছু ছবি/ধারণা। এক সূর্য/চন্দ্র, ২ পক্ষ/চোখ, ৩ নেত্র(শিবের), চার বেদ ইত্যাদি – এগুলিকে পর পর বসিয়ে পাওয়া যেত অঙ্ক বেদ সূর্য পক্ষ হল ২১৪(অঙ্কস্য বামগতি ধরে)। পরে এ নিয়ে আরও কথা বলা যাবে –ভারতে কোন কিছুরই স্টন্ডার্ডাইজেশন করা হয় নি - পক্ষ কোন জ্ঞানচর্চায় ২ আবার কোন জ্ঞানচর্চায় ১৫ রূপে ব্যবহৃত হত – এই বৈচিত্রতে ভারত সভ্যতা বেড়ছে, জোরদার হয়েছে। এর পর দশের সঙ্গে ১, ২, ৩ গুণ করে পেলাম দু সংখ্যার দশ, বিশ, ত্রিশ, চল্লিশ ইত্যাদি। এর পরে ১০এর ঘাতে ব্যবহৃত হল ১, ২, ৩ তৈরি হয়ে এল শত, সহস্র, আযুত, নিযুত, প্রযুত, অর্বুদ, নির্বুদ, সমুদ্র, মধ্য, অন্ত্য, পরার্ধ ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি। এই নামগুলির মধ্যে আমরা কিন্তু অঙ্ক ক্রিয়ারও নাম দিলাম যেমন ৫০-১ উনপঞ্চাশ।
এই নামগুলি দেওয়ার বড় কারণ হল মৌখিক জ্ঞানচর্চাকে সম্মান জানানো। আজ যেমন সাধারণ অঙ্ক করতে আমরা ক্যালকুলেটর ব্যবহার করি, সেকালে কেন কয়েক দশক আগেও এমনকি শহরেও অঙ্কের সূত্রগুলি ধরে সাধারণ মানুষ মৌখিকভাবেই মানসাঙ্ক করতেন। তার জন্য খাতা কলমের আয়োজনের প্রয়োজন পড়ত না। যে মানুষটা্র ওপর নির্ভর করে বণিকেরা সমুদ্রে ভেসেছেন বিপুল সম্পদ নিয়ে, তিনি কলণবিদ্যা অনুসরণ করে মানসাঙ্কতেই সূর্যের রশ্মির নতি মেপে নৌবহরটার দিক নির্ণয় করতেন, আর ছিল কমল নামক একটি যন্ত্র। ব্যাস।
এই দক্ষতা আর জ্ঞানচর্চা হাতিয়ার করে খাল কেটে ইওরোপিয় কুমির এনেছিল মালামো কানা, মেলিন্দে থেকে গোয়ায়।

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা১০ - উনবিংশ এবং বিংশ শতে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র এবং দেশজ চিকিৎসা ব্যবস্থা ১৮০০-১৯৪৭

পুনম বালা

মধ্য যুগে চিকিৎসা ব্যবস্থা
প্রাচীন যুগের শেষে আয়ুর্বেদের চিকিৎসা পদ্ধতি এবং তত্ত্বের লিখিত সংস্করণ তৈরি হয়েছিল। তার সময়ের শাসকদের অনুমতিক্রমে চিকিৎসক বা সংহিতাকার বা সম্পাদকেরা বছরের পর বছর ধরে প্রয়োজনীয় ওষুধগুলিকে চিকিৎসাশাস্ত্রে অঙ্গীভূত করার কাজ করেগিয়েছেন নিরলসভাবে।

মধ্যযুগে ভারতে ইসলাম অভিযানের সঙ্গে সঙ্গে গ্রিসিয়-আরবিয় ইয়ুনানি চিকিৎসা ব্যবস্থার ভারতে আগমন ঘটল। য়ুনানিরর তত্ত্বগুলি মিশর এবং গ্রিসের চিকিৎসা শাস্ত্র নির্ভর করে বিকশিত এবং বাগদাদী খলিফার পৃষ্ঠপোষকতায় আরব আর পারস্যে এসে সেটি একটি নির্দিষ্ট অবয়ব ধারণ করে। সে সময়ের পারস্য ভারত চিন মধ্য এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলির চিকিৎসা ব্যবস্থার জোরের দিকগুলি আহরণ করে আরবেরা এই চিকিৎসা ব্যবস্থাটিকে সমৃদ্ধ করে। পরের দিকে মুঘলেরা এটিকে আরও সুসংবদ্ধ করে।

মধ্য যুগের ভারতে আলোচ্য দুটি চিকিৎসা ব্যবস্থার বন্ধুত্বপূর্ন সহাবস্থান ঘটেছিল তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মিলের জন্য - এগুলি হল সংহিতা করণের ওপরে গুরুত্ব দেওয়া, দৈহিক ধাত তত্ত্ব এবং চিকিৎসা জ্ঞানের হস্তান্তর।

সিদ্দিক৬৮ এবং ইসরায়েলি৬৯র বয়ানে পাচ্ছি, মধ্যযুগের রাজা, সুলতানেরা চিকিতসকেদের চিকিৎসার সংহিতা প্রকাশ করে চিকিৎসার জ্ঞানকে বিস্তৃতির সুযোগ করে দিয়েছিলেন। চিকিতসকেদের নিয়ে চিকিৎসা কেন্দ্র, রোগ নির্নয় কেন্দ্র তৈরি করেন।

য়ুনানানির নানান সংকলনের মধ্যে মাদানু-শিফা সিকারশানি নামক পুঁথিতে য়ুনানি চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে বিশদে আলোচনা রয়েছে। এটিতে য়ুনানি এবং আয়ুর্বেদে ব্যবহৃত নানান ভেষজ থেকে তৈরি ওষুধের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।
মনে হয়, এই সময়ের চিকিৎসকেরা তাদের সারা জীবনের অধীত জ্ঞান এবং বিদ্যা উজাড় করে দিয়েছিলেন পুঁথি লেখার কাজে যাতে তারা রাজা রাজরাদের খুশি করতে পারেন। অন্য চিকিতসকেদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা তো ছিলই, একে অন্যকে দমিয়ে দিতেও চেষ্টা করেছেন, যাতে একজন অন্যের থেকে বেশি সুযোগ এবং খ্যাতি অর্জন করতে পারেন। এগুলি সেসময়ের চিকিৎসা ব্যবস্থা – ওষুধ, ভেষজ, রোগের বিশ্লেষণ এবং ওষুধ রোগীর দেহে কিভাবে কাজ করছে সেই সবের সংহিতা মাত্র। সে সময় এ ধরণের প্রচুর সংহিতা প্রকাশিত হয়েছিল, যেগুলিকে নতুন বৈজ্ঞানিক কাজরূপে আজ ভুল করা হয়। বাস্তবে দুটি ব্যবস্থারই চিকিতসকেরা রাজ দরবারে স্থান পেয়েছন, ধনার্জন করেছেন, প্রখ্যাত হয়েছেন। চিকিৎসার ক্ষেত্রে অগ্রগতির কোন বিশেষ চরিত্রের সন্ধান পাওয়া যায় না, যেহেতু পার্সি ছিল রাজদরবারের ভাষা, সেহেতু চিকিৎসা শাস্ত্রগুলি পার্সি ভাষাতেই রূপান্তরিত হয়েছে। এটি শুধু য়ুনানি বা হেকিমি চিকিতসকেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রইল না, ভারতীয় প্রাচীন চিকিতসাবিদ্যার চিকতসক বৈদ্যরাও এ ধরণের সংহিতা তৈরিতে জুড়ে গেলেন। তাদের মাঠেঘাটের অভিজ্ঞতার জ্ঞান সংহত করে তারা নতুন করে প্রাচীন চিকিৎসা শাস্ত্রকে নতুন করে লিখলেন। আয়ুর্বেদ আর য়ুনানি চিকিতসকেরা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে চিকিতসাবিদ্যার সংহিতাকরণের কাজ করতে থাকলেন।

দেহের ধাত বা রস(বডি হিউমার) সংক্রান্ত তত্ত্ব কিন্তু আয়ুর্বেদ এবং য়ুনানি এই দুই চিকিতসাবিদ্যার ভিত্তি – পার্থক্য মাত্র হল রস বা ধাতের সংখ্যায়। হেকিমেরা টেট্রাহিউমরাল(চাররস) তত্ত্ব ভিত্তিতে চিকিৎসা করতেন, অন্যদিকে বৈদ্যরা নির্ভর করতেন ট্রিহউমরাল(তিনরস) তত্ত্বে। পার্থক্য বলতে শুধু এইটুকু।

হেকিমেরা রসকে চার ভাগে ভাগ করতেন, রক্ত, কফ, হলুদ এবং কৃষ্ণ পিত্তরসে। এইগুলিই শরীরের ব্যথা এবং স্বাস্থ্য নির্ভর করে। দুটি চিকিসা ব্যবস্থাই এই রসগুলি পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে মিশিয়ে তত্ত্ব তৈরি করে রোগ আর স্বাস্থ্য বিচার করে। এইগুলির কোনোটার অভাব বা কোনটার আধিক্য দেহের সাম্যাবস্থায় গলদ এনে দেহকে অসুস্থ করে, অন্যদিকে এগুলির ঠিকঠিক অনুপান দেহকে সুস্থ রাখে। দেহের তাপমাত্রার ওপরে নির্ভর করে হেকিমরা স্যাঙ্গুইন, ফেলম্যাটিক, কলেরিক এবং মেলানকলিক(য়ুনানিতে ব্যবহৃত প্রাযুক্তিক শব্দগুলি জানিনা তাই পুনমের ব্যবহৃত শব্দগুলি ব্যবহার করলাম) অবস্থার ওষুধ ব্যবহার করেন। ফলে মোটের ওপরে মোটামুটি সৌসাদৃশ্যই দুটি চিকিৎসা ব্যবস্থার পরম্পরের সঙ্গে মিলেজুলে থাকার কারণ।

মধ্যযুগে বা মুসলমান শাসনের প্রথম দিকে শিক্ষকেরা গুরু হিসেবে শিক্ষা দান করতেন। সে অর্থে হেকিমির কোন শিক্ষা কেন্দ্র ছিল না, হেকিমেরা ছাত্রদের নিয়ে হাতে কলমে চিকিৎসা শেখাতেন। শিক্ষক আর ছাত্রের মধ্যে একটা ব্যক্তি নির্ভর নীতিমূলক(ডিডাকটিভ) শিক্ষা দানের পরিবেশ গড়ে উঠেছিল। শিক্ষকের চিকিতসাকেন্দ্র বা বাড়িই হয়ে উঠত শিক্ষা কেন্দ্র। এই চিকিৎসা ব্যবস্থা মূলত পারিবারিক ছিল, পিতার কাজের উত্তরাধিকার আর্ষাত পুত্রের ওপরেই৭০। এই পারিবারিক উত্তরাধিকারের পরম্পরা দীর্ঘদিন ধরে চলেছে এবং আজও সেই ধরণের প্রাচীন কিছু পরিবারের সন্ধান পওয়া যায়৭১। হেকিমদের এই ধরণের বংশলতিকা ইমতিহান-উল-আলবা-লে-কাফাত-ইল-আল-তিবা নামক চিকিৎসাশাস্ত্রে পাওয়া যায়।

মুসলমান শাসন যুগে চিকিৎসাবিদ্যা অনেকটা বৈদিক ব্রাহ্মণ জ্ঞানচর্চার মত হয়ে উঠছিল। শিক্ষক আর ছাত্রের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এই শিক্ষা ব্যবস্থার মূলে। এই জন্যই য়ুনানি পদ্ধতির সঙ্গে আয়ুর্বেদিয় পদ্ধতির কোন বিরোধ ঘটল না, বরং তারা উভয়েই মুসলমান সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতা অর্জন করল অথচ এর সঙ্গে ব্রাহ্মণ জ্ঞানচর্চা নির্ভর শিক্ষাদানের অমিল যথেষ্টই। ভারতে শাসকদের সেবা করতে যে সব পার্সি চিকিতসকেরা এলেন, তাদের আকাঙ্ক্ষা উদ্দেশ্য এবং কর্মপদ্ধতি প্রাচীন ভারতের চিকিতসকেদের থেকে আলাদা। মুসলমান ধর্মবিশ্বাস য়ুনানি চিকিৎসা বিদ্যার বিকাশে মাথা গলায় নি। ফলে চিকিৎসা শিক্ষা নির্দিষ্ট চিকিৎসা সংক্রান্ত সংস্থাগুলি থেকেই করা হত।
(চলবে)

Sunday, February 19, 2017

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা৯ - উনবিংশ এবং বিংশ শতে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র এবং দেশজ চিকিৎসা ব্যবস্থা ১৮০০-১৯৪৭

পুনম বালা

খ্রিস্টপূ প্রথম শতক পর্যন্ত ব্রাহ্মণ্যবাদ আর বৌদ্ধদের মধ্যে বিপুল বিবাদ ঘটতে ঘটতে শেষ পর্যন্ত পরস্পরের মধ্যে বিবাদ মিমাংসার উদ্যোগ দেখা দেয়। আমরা এর সঠিক কারণ জানি না। তবে হাতে যতটুকু সূত্র রয়েছে তাতে মনে হয় রাজা এবং অভিজাতরা দুটি ধর্মকেই পৃষ্ঠপোষণা দেওয়া করলেন বলে হয়ে পরস্পরের মিলের সূত্র উদ্ভুত হল।

রাজা অশোক একইসঙ্গে বৌদ্ধ মঠ, এবং শৈব মন্দির একই সঙ্গে স্থাপন করছেন। দুটি ধর্ম এই সময়েই একই সঙ্গে বিকাশলাভ করেছিল, এবং সেসময়ে একজন মানুষ দুটি ধর্মের অনুগামী হয়েছেন, এমনও দেখা গিয়েছে৬১। চিকিতসা শাস্ত্রের ইতিহাসে অশোকের সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি সারা ভারতে সেবাকেন্দ্র (হাসপাতাল) স্থাপন করেন, যেখানে চিকিতসকেরা অসুস্থদের রেখে চিকিতসা করতেন৬২। আয়ুর্বেদের প্রত্যেকটি ধারা বৌদ্ধ শ্রমনদের মার্ফত বৈদেশিক মাটিতে পা রাখে এবং ভবিষ্যতে সেই দেশগুলিতে মঠ ব্যবস্থা স্থাপিত হয়।

খ্রিষ্ট পাঞ্চাঙ্গের প্রথম সময়েই আয়ুর্বেদ মিশর, গ্রিস, রোম এবং আরবে পৌছিয়ে সেখানকার চিকিতসা ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে। বৌদ্ধ শ্রমণদের প্রখ্যাতিতেই আয়ুর্বেদের ওপরে বিদেশে আলো পড়তে শুরু করে। বিদেশে আয়ুর্বেদ শুধু যে চিকিতসা শাস্ত্র রূপে প্রতিভাত হয় তাই নয় এটি ভারতীয় সংস্কৃতিরূপেও অভিহিত থাকে। বিদেশ থেকে প্রচুর শিক্ষার্থী ভারতীয় বিজ্ঞান এবং শিল্পকলা শিখতে ভারতে আসতে থাকে। দক্ষিণ ভারতে যে আয়ুর্বেদিয় ব্যবস্থা চালুছিল তার নাম সিদ্ধা – এটি আয়ুর্বেদের তামিল সংস্করণ। তবে আমার আলোচনায় আমি মুলত উত্তর ভারতের চিকিতসা ব্যবস্থা নিয়েই বেশি মনোযোগ দেব।

মৌর্যদের পরে শুঙ্গ আর শকদের সময়ের চিকিতসার ইতিহাস সম্বন্ধে কিছুই আমরা জানি না প্রায়। তারপরে শাসনকর্ম চালানো কুশান বংশ স্তুপ তৈরিতে বিপুল বিনিয়োগ করতে থাকে। কুশানদের শেষ রাজা কনিষ্ক, ব্রাহ্মণ্য ধর্ম অনুগামী হন। তিনি রসায়নাবিদ নাগার্জুনের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তার রাজসভায় চরকও ছিলেন। কুশান রাজত্ব ধর্মীয় এবং সাহিত্যিক কর্মকাণ্ডে পরিপূর্ণ। কণিষ্কর সময়ে খণিজকে আয়ুর্বেদের ওষুধ শাস্ত্রে (ফার্মাকোপিয়া) অন্তর্ভূক্ত করানো হয়। চিকিতসকেরা রাজা এবং রাজসভার পূর্ণ পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছেন এই সময়ে।
গুপ্ত রাজত্বও ব্রাহ্মণত্বের অনুগামী হলেও বৌদ্ধদের প্রতিও তাদের সমদৃষ্টি ছিল। এই সময়ে ভাগবত এবং শৈব শাস্ত্রগুলির উতপত্তি ঘটে। দুটি ধর্মই রাজার পৃষ্ঠপোষণা পেয়ে কাছাকাছি এসেছে। এই সময়ে বেশ কিছু চিকিতসা সংহিতা তৈরি হয়। সম্রাটের নির্দেশে চিকিতসকেরা চিকিতসাবিদ্যা বিষয়ে বিভিন্ন বই লিখেছেন, এবং বিভিন্ন শাস্ত্রে চিকিতসাবিদ্যার প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। এই সময়ে চরক এবং সুশ্রুত লিখিত রূপ ধারণ করে। প্রচুর সংহিতা বিকশিত হয়, কিন্তু সংহিতাকারেরা চিকিতসা উপকরণগুলির বিশদ বিবরণ দেন নি। পঞ্চম-ষষ্ঠ শতের চিকিতসক ভগভট্ট চরক সংহিতাকে আটটি অধ্যায়ে সংহত করেন, পরের দিকে এর নাম হয় অষ্টাঙ্গ সংহিতা বা অষ্টাঙ্গ সমগ্র বা অষ্টাঙ্গ আয়ুর্বেদ। বিক্রমাদিত্যের রাজসভায় ধন্বন্তরি নামক চিকিৎসক ছিলেন। ]
আমরা জেনেছি প্রাচীন ভারতীয় সমাজে পুরোহিত এবং ব্রাহ্মণদের ধার্মিক যথেষ্ট প্রভাব ছিল এবং তারা ধর্মের লগুড় ব্যবহার করে জ্ঞান দখল করতেন। এইভাবে তারা সব ধরণের জ্ঞানকে ধর্মীয় ঘোমটা পরাতে চাইলেন। প্রাচীন কাল থেকেই যেহেতু ওষুধের প্রাথমিক লক্ষ্য হল প্রায়োগিক জ্ঞানার্জন, ফলে সবার আগে সেটি ব্রাহ্মণদের কোপে পড়ল। গুপ্ত যুগে যখন আয়ুর্বেদ সম্পাদিত হচ্ছিল, ব্রাহ্মণেরা প্রায়োগিকতার জন্য চিকিতসকেদের আক্রমন করেছেন। ধর্মীয় বিধান হিসেবে আয়ুর্বেদ গুপ্ত যুগেই লিখিত হয়েছে। পরের সময়ে চিকিৎসা সংক্রান্ত শাস্ত্রগুলি ধর্মীয় কুসংস্কারের আখড়া করে তোলা হয়েছে।

সংহিতাকরণের গুরুত্বপূর্ণ কাজটি গুপ্ত-পরবর্তী সময়েই সংহত হয়েছে। এই শাস্ত্রগুলিতে ব্রাহ্মণ্যবাদি ঝোঁক স্পষ্ট। প্রায়োগিক ক্রিয়া ছাড়া চিকিৎসার পুঁথির শুষ্ক জ্ঞানসম্ভারই শিক্ষাদর্শ হল। গোঁড়া পুরোহিততন্ত্রের নীতিগুলি অনুসরণ করতে গিয়ে চিকিৎসাশাস্ত্রে নতুন অধ্যায় যোগ করতে হল। চরক সংহিতায় আত্মাতত্ত্ব এবং তার মুক্তির কথা বলা হল।
(চলবে)

Saturday, February 18, 2017

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা৮ - উনবিংশ এবং বিংশ শতে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র এবং দেশজ চিকিৎসা ব্যবস্থা ১৮০০-১৯৪৭

পুনম বালা

আয়ুর্বেদ চিকিতসার দর্শনের সঙ্গে প্রাচীন ভারতের ধার্মিক দর্শনের বিন্দুমাত্র মিল ছিল না। আয়ুর্বেদিয় চিকিৎসকেরা তাদের প্রায়োগিক দর্শনে অনেক বেশি বস্তুগত দর্শনের কাছাকাছি ছিলেন। এর নাম লোকায়ত দর্শন, যার পিতৃপুরুষ চার্বাক। চার্বাক এবং বস্তগত দর্শনের অনুগামীরা বেদ বিরোধী। তারা পুনর্জন্ম তত্ত্বে অবিশ্বাসী কিন্তু পঞ্চভূত ক্ষিতি অপ তেজ মরুত ব্যোম দিয়ে যে শরীরের গঠন সেটা স্বীকার করে। যেহেতু ব্রাহ্মণদের সঙ্গে বস্তুবাদের তাত্ত্বিক বিরোধ লাগল, ফলে চার্বাকীয় বস্তিবাদী দর্শনের খুব বেশি বিকাশ ঘটল না। আয়ুর্বেদে শরীরের সঙ্গে পরিবেশ-প্রকৃতির যে অদ্বৈততার কথা বলা হয়েছে, তার সঙ্গে বস্তুবাদী দর্শনের মিল রয়েছে। কিন্তু বস্তুবাদী দর্শনে যা বলা হয়েছে আয়ুর্বেদ তার থেকে অনেকটা এগিয়ে গিয়েছে। ঘটনা নিরীক্ষণ এবং বিচার করা আর গবেষণামূলক তথ্যে যুক্তিবুদ্ধির বিচার করে সিদ্ধান্তে আসা ভারতীয় চিকিৎসা শাস্ত্রের খুব গুরুত্বপূর্ণ দুটি স্তম্ভ। এই দর্শনে অচিকিতসাযোগ্য রোগের কারণ হিসেবে পূর্বজন্মের কর্মফলের প্রভাবের বিষয়টি অন্তত আয়ুর্বেদ মানে না বোঝা গেল।

চিকিৎসকেরা ধার্মতাত্ত্বিকদের রোষের শিকার হলেন। চিকিতসা অভিজাতদের পক্ষে খুব নিম্নশ্রেণীর পেশা হিসেবে চিহ্নিত হল। বৌধায়নের সূত্র অনুসারে চিকিৎসকেরা হলেন আর্যসম্ভূত একটি নিম্নশ্রেণীর জাতি, যাদের নাম অম্বষ্ঠ। বাংলায় অম্বষ্ঠদের উদ্ভবের বিষয়ে বিতর্ক রয়েছে। রিজলে বলছেন এই শব্দটির সঙ্গে বৈদ্য শব্দের যোগ রয়েছে। তবে মনু সংহিতায় বৈদ্য নামী পেশা বা জাতির উল্লেখ নেই। তবে বলা হয় ব্রাহ্মণ পুরুষ আর বৈশ্য কন্যার মিলনে উদ্ভুত সন্তানকে অম্বষ্ঠ বলা হয়েছে। বাংলায় মনু কথিত অম্বষ্ঠরা প্রাচীন কাল থেকেই চিকিতসাকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন।

পরের দিকের বৈদিক সাহিত্য যেমন যজুর্বেদ আর ব্রাহ্মণে এই প্রথম সরাসরি প্রাচীন চিকিৎসকেদের সঙ্গে পুরোহিতদের বিবাদের উল্লেখ দেখতে পাই৪৭। কৃষ্ণ এবং শুক্ল যজুর্বেদের মধ্যে কৃষ্ণতে চিকিতসকেদের জাত নষ্ট হওয়ার বিশদ বর্ণনা রয়েছে। কৃষ্ণ যজু অনুগামী তৈত্তরীয় সংহিতায় সরাসরি চিকিৎশাস্ত্রীদের প্রতি নতুন করে পুরোহিতদের মনোভাব স্পষ্ট করে বলা হয়েছে। শতপথ ব্রাহ্মণে সাধারণ মানুষের সঙ্গে একাত্মতার জন্য দুজন চিকিতসক অশ্বিন দেবের জাত খোয়ানো হয়েছে। কৃষ্ণ যজুর্বেদের অনুগামী মৈত্রয়ানী সংহিতা, কথক সংহিতা, এবং কপিস্থল সংহিতাতেও অশ্বিন দেবদ্বয়ের এই জাত খোয়ানোর বিষয়টি সমর্থন করা হয়েছে দুটি কারণে, ১) যেহেতু তারা চিকিতসক, ২)তাদের সমাজে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করতে হয়৪৮।

গোঁড়া ব্রাহ্মনীয় শাস্ত্রীয় নিদানের বিরুদ্ধে গেলেন একমাত্র চিকিতসকেরাই, প্রত্যক্ষ দর্শনের ফলে উতপত্তি হওয়া জ্ঞানভাণ্ডারের জোরে তারা গোঁড়া রক্ষণশীলদের বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন, কেননা তাদের শিক্ষায় গোঁড়ামির পাশে থাকা কার্যন্ত অসম্ভব ছিল৪৯।

চিকিৎসআ অতিন্দ্রিয় পদ্ধতিতে হয় এমত ধারণা ছড়িয়েছে ব্রাহ্মণেরা। জাগতিকভাবে তৈরি ওষুধ দিয়ে চিকিৎসকেদের রোগ সারানোয় শাসক গোষ্ঠী অসন্তুষ্ট হতে থাকল। প্রাচীনকালে তাই পুরোহিতেরা বৈদ্যদের বিরুদ্ধেই গেলেন। তারা এমন একটা অবস্থা তৈরি করলেন যাতে চিকিৎসকেরা সামাজিকভাবে পিরামিডে ক্ষমতাবান হয়ে না ওঠে এবং তাদের গোঁড়ামিকে প্রশ্ন করতে পারে। এই জন্য ব্রাহ্মণেরা দূষণ এবং বিশুদ্ধতার দোহাই দিলেন এবং সামাজিক পিরামিডে ওপরের দিকে থাকা চিকিৎসকেদের সামাজিকভাবে নিচু করে দিলেন যাতে তারা মাঠেঘাটে গবেষণা করতে না পারেন।

ব্রাহ্মণদের দাবি ছিল আয়ুর্বেদের ঐশ্বরিক উদ্ভবের। ব্রাহ্মণেরা যে প্রায়োগিক বাস্তবধর্মী চিকিতসাকর্ম অপছন্দ করতেন তার প্রচুর উদাহরণ প্রাচীন ভারতে পাওয়া যাবে। এর বড় কারণ হল চিকিৎসকেরা প্রায়োগিক জ্ঞানের অনুবর্তী হয়ে গোঁড়া ধর্মীয় তত্ত্ব বাতিল ঘোষণা করছিলেন।

বৈদ্যদের বিরুদ্ধে আড় হয়ে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়া আইনি লড়াইতে পর্যবসিত হল। খ্রিপূ ষষ্ঠ শতে এর উদাহরণ পাওয়া যায়৫০ অপস্তম্ব, গৌতম এবং বশিষ্ঠদের স্মৃতি শাস্ত্রতে। খ্রিষ্টিয় শত থেকে মনু পর্যন্ত সময়ে স্মৃতিশাস্ত্রগুলি কিন্তু চিকিতসকেদের ওপরে খড়গহস্ত। ফলে রক্ষণশীলরা চিকিতসকেদের অপবিত্র দাগিয়েদিলেন, তারা এতই অপবিত্র যে কোন স্থানে তাদের উপস্থিতি ঐ স্থানকে অপবিত্র করে তোলে, তারা যে খাদ্য পরিবেশন করে সেগুলি এতই নোংরা যে তা গ্রহন করা যায় না, এবং তাদের যে খাওয়ার দেওয়া হয় তাও বিষে রূপান্তরিত হয়৫১।
গৌতমের স্মৃতিশাস্ত্রের নিদান হল একজন ব্রাহ্মণ শ্রমিক, শল্য চিকিতসক এবং দুষ্কৃতির হাত থেকে খাদ্য নাও নিতে পারেন। মনুর সময়ের কাছাকাছি প্রাচীন আইন শাস্ত্র ধর্মশাস্ত্র, যা পরে স্মৃতিশাস্ত্রে রূপান্তরিত হয়েছিল, সাধারণভাবে হাতে কলমে কাজ করা শ্রমিক, চিকিতসকের উপস্থিতি বলি দেওয়ার মত পুতপবিত্র স্থানকে অপবিত্র করার জন্য যথেষ্ট, তাই তাদের সেই স্থানে প্রবেশের অধিকার ছিল না। তবে চট্টোপাধ্যায় ধর্মশাস্ত্রকে স্মৃতিরূপে স্বীকার করেন না কেননা, সেটি ধার্মিক দোহাই দিয়ে মানুষের সামাজিক অবস্থান নির্নয় করে, আইন বলে নয়। উইন্টারনিতজ বলছেন এগুলি ব্রাহ্মণ এবং পুরোহিতদের ধর্মীয় রচনা, এর সঙ্গে আইনি বাস্তবতার কোন সম্পর্ক নেই৫৩।

অন্যদিকে ধর্মীয় গোঁড়ামির চিকিতসকেদের চিকিতসার প্রতি সরাসরি আঘাতের বিরুদ্ধে প্রাচীন ভারতে দেশজ চিন্তাধারা চিকিতসকেদের ওপর আঘাতের বিরুদ্ধে বর্ম হয়ে দাঁড়ায়। খ্রিপূ ষষ্ঠ শতের ভারতে ব্রাহ্মণেরা সমাজে নিয়ন্ত্রন কায়েম করে। এই সময়ের ভারতে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম বিকাশ লাভ করে। বৌদ্ধধর্ম গ্রামীন শূদ্র সমাজে বিস্তৃত হয়। বৌদ্ধ ধর্মের বিস্তৃতি ব্রাহ্মণ্য ধর্মের ক্ষমতায় আঘাত করতে থাকে, বিশেষ করে তারা বেদ এবং স্মৃতিকারদের ক্ষমতাকেই প্রশ্ন করতে থাকে। এগুলি ব্রাহ্মণেরা ভালভাবে নিচ্ছিল না। যদিও পরে দিকে বুদ্ধ অবতার গণ্য হলেন কিন্তু সেই পথ খুব স্বচ্ছল ছিল না।

বুদ্ধের সময়ে নানান পেশার মধ্যে চিকিৎসকেরা খুব গুরুত্ব অর্জন করলেন। বিভিন্ন বৌদ্ধ শাস্ত্রে পরম শ্রদ্ধায় জীবকের নামাচ্চোরণ এই তত্ত্ব প্রমান করে। বৌদ্ধিক নীতিশাস্ত্র বিনিয়পিটকে চিকিৎসাশাস্ত্রের প্রতি বুদ্ধদেবের ব্যক্তিগত আসক্তির কথা জানা যায়। মহাভগগতে বিভিন্ন রকমের চিকিৎসার কথা বলা হয়েছে, যা আদতে সেই সময়ের চিকিৎসাবিদ্যার ইতিহাসও বটে। এটি রোগ নিরাময়ে কর্মফলের প্রভাবকে নস্যাত করে বলে রোগীর সুস্থ হওয়া নির্ভর করছে চিকিতসক, সেবাদাত্রী এবং রোগীর নিজের ওপরেও। এই জন্য প্রখ্যাত বৌদ্ধ চিকিতসাবিদ্যালয় তক্ষশীলাকে ব্রাহ্মণেরা অপবিত্র দাগিয়ে দেয়।

এই সময় বৌদ্ধমঠভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু হয়। এবারে চিকিৎসা ব্যবস্থা ঐন্দ্রজালিকতা থেকে যুক্তিবুদ্ধিভিত্তিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হয়। তার জন্য প্রয়োজন হয় প্রায়োগিক চিকিৎসা প্রদর্শন শিক্ষা। চিকিৎসক হতে গেলে চিকিৎসা শিক্ষা প্রয়োজনীয় হয়ে গেল এবার থেকে। সাত বছর ধরে শিক্ষার্থীদের শিক্ষার পাঠ্যক্রম চালু হল। বলা হয় জীবন মগধের রাজ চিকিৎসক হতে পেরেছিলেন কেননা তিনি এই কটা বছর সফলভাবে পড়াশোনা এবং রোগের চিকিৎসা করেছিলেন৬০।

মঠে পড়ানোর ব্যবস্থা ব্রাহ্মণ্যবাদ বিরোধিতা করে। ব্রাহ্মণ্যবাদী পড়াশোনায় উপনয়ন একতা বড় অংশ ছিল, এছাড়াও ধর্মীয় সূত্রগুলি মুখস্থ করতে হত। যেহেতু ব্রাহ্মণেরা চিকিৎসাশাস্ত্র এবং ধর্মশাস্ত্র দখল করেছিল, চিকিতসাবিদ্যার পুঁথিগত জ্ঞান ধর্মীয় শিক্ষার অঙ্গীভূত হয়ে গেল। পুরোহিতদের বাড়িই শিক্ষাকেন্দ্র হয়ে উঠল।
(চলবে)

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা৭ - উনবিংশ এবং বিংশ শতে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র এবং দেশজ চিকিৎসা ব্যবস্থা ১৮০০-১৯৪৭

পুনম বালা

চিকিৎসা শাস্ত্র শিক্ষা গ্রহনের পরের ধাপ যুক্তি। যুক্তিবুদ্ধির মাধ্যমে প্রাকৃতিক নানান উপাদানগুলি প্রয়োগের হাতে কলমে শিক্ষা দান। যুক্তি শুধুই শুকনো জ্ঞানচর্চা নয়, বরং আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের থেরাপিটিক সাফল্যের বৌদ্ধিক যৌক্তিক প্রয়োগের প্রকাশ২৫। চরকের মতে সিদ্ধি যুক্তান প্রতিষ্ঠিতা/তিষ্ঠতি উপরি যুক্তিজ্ঞানহঃ দ্রব্যজ্ঞানবতম সদা। অর্থাৎ শুধু উপাদানগুলির পুঁথিগত জ্ঞানার্জন নয়, যুক্তিবুদ্ধি প্রয়োগ করে জ্ঞানের প্রায়োগিক বিদ্যা অনেক বেশি উচ্চমার্গের। শেষতমভাবে বলা যায়, যে পুঁথি এবং হাতে কলমে প্রায়োগিক চিকিৎসাশাস্ত্রজ্ঞান চিকিৎসক লাভ করলেন, সেটি আন্তঃবিদ্যা বিতর্ক এবং আলোচনায় আরও বেশি বিকশিত এবং বিস্তৃত হবে এই ব্যবস্থা তৈরি প্রাচীন ভারতের আয়ুর্বেদজ্ঞ তাত্ত্বিকেরা২৭। এটি কিন্তু প্রাচীন ভারতের চিকিৎসাশাস্ত্রের তাত্ত্বিক অবস্থানের খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় – শুকনো জ্ঞানার্জন নয়, সেটির প্রায়োগিক ব্যবহার।

প্রাচীন ভারতে শল্য চিকিতসা অতিরূপে বিকশিত হয়েছিল। কিন্তু সঠিক তথ্যের অভাবে আজ আর বলা সম্ভব নয়, কেন শল্য চিকিতসা পরে বাতিল হল। দেহতত্ত্ব এবং শরীরজ্ঞানের সঠিক ত্থ্য আহরণের জন্য মৃত দেহ প্রয়োজন হত, কিন্তু মৃতদেহ ছোঁয়া নিয়ে যে বিরুদ্ধতার খড়্গ উঠেছিল প্রাচীন কালে, সেই বিষয়ে আমরা আলোচনা করেছি। তার জন্যই মনে হয় এটি ঘটেছে। তবুও হাড় জোড়াবিদ্যা নতুন উচ্চতায় পৌঁছয়। এর সঙ্গে জোড়া যাক নাকের ওপর প্রয়োগ করা শল্যবিদ্যা যা আজকে পশ্চিমি চিকিৎসাবিদ্যায় রাইনোপ্লাস্টি নামে পরিচিত। সেই চিকিৎসাবিদ্যাটিও অসীম উচ্চতায় পৌঁছেছিল২৮।

বলা দরকার অতীতে ভারতই একমাত্র দেশ যেখানে চিকিৎসাবিদ্যায় শল্য জ্ঞানের প্রয়োগ হত। শল্যচিকিৎসা বিদ্যাটি প্রাচীন গ্রিসে বাতিলজ্ঞান রূপে অভিহিত থাকে। শল্যচিকিৎসকেদের নরসুন্দরদের স্তরে নামিয়ে আনা হয়। শুধু গ্রিসই নয়, অন্যান্য সভ্যতায় মনে করা হত ভগবানের রোষেই রোগের উতপত্তি, কেননা মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করেন ভগবানই। ভারতের সঙ্গে তৎকালীন গ্রীসের চিকিৎসাবিদ্যার তুলনা করলেই দুটি চিকিতসাপদ্ধতির মূলগত পার্থক্যটা বোঝা যাবে।

গ্রিক চিকিতসাতাত্ত্বিকেরা প্রয়োগের থেকে পুঁথিগত বিদ্যাকেই জোর দিতেন, অন্যদিকে ভারতীয় চিকিতসা তাত্ত্বিকেরা ঠিক এর উল্টোটা করতেন সে তথ্য আমরা কিছু আগেই আলোচনা করেছি। আদতে খ্রিপূ ৫ম শতক থেকে গ্রিসের শাসকেরা শ্রমকে ঘৃণা করতে থাকেন। ফ্যারিংটন বলছেন, হাত মাথার মধ্যে বিচ্যুতি (তৈরি হল)২৯। ধনাঢ্য শ্রেণীর মধ্যে প্রয়োগ বিদ্যার সঙ্গে তত্ত্বজ্ঞানের বিরোধ ঘটল, তত্ত্বজ্ঞানই প্রধান হয়ে দাঁড়াল, প্রয়োগ নয়। চিকিৎসাবিদ্যায় ভেষজ সংগ্রহের দায়িত্ব যাদের ছিল, তারা সমাজপিরামডের নিম্নস্তরে চলে গিয়ে শুধুই শ্রমিকের পর্যায়ে পৌঁছে গেলেন। চিকিৎসকেরা ওষুধের নতুন জ্ঞান লাভ করা থেকে বঞ্চিতই থেকে গেলেন। চাইল্ড চিকিতসকেদেরকে বলছেন তাত্ত্বিক গবেষক। এরা চিকিতসাবিদ্যাকে প্রায়োগিক বিদ্যা থেকে কল্পনাভিত্তিক শাস্ত্রে পরিণত করলেন। সেই সময়ে ভারতে কিন্তু অবস্থা ঠিক উল্টোটা, প্রাচীন ভারতীয় চিকিৎসাশাস্ত্রে, বিভিন্ন ভেষজ সংগ্রহ করে, সেগুলি প্রায়োগ করে চিকিতসা জ্ঞানের বিকাশের বিশদ বিবরণ বর্ণিত হয়েছে। গ্রিসের চিকিতসকেদের পথে না হেঁটে ভারতীয় চিকিৎসকেরা আইনরূপায়কদের বেঁধে দেওয়া সীমার মধ্যেই ভেষজ এবং তার প্রয়োগের ফলের বিপুল জ্ঞান আহরণ করেন।

গ্রিসে চিকিৎসকেরা শুধু ভেষজিক ওষুধের প্রায়োগিক জ্ঞান অর্জন থেকে বঞ্চিত হলেন তাই নয়, অন্যান্য ওষুধ বিষয়েও সাধারণ জ্ঞানার্জন থেকে বঞ্চিতই থেকে গেলেন৩১। আমরা গ্রিসীয় চিকিৎসাবিদ্যার ইতিহাসের সঙ্গে আয়ুর্বেদের তুলনা করলে দেখব, ভারতে চিকিতসকেদের ভেষজ সংগ্রহে যথেষ্ট গুরুত্ব ও উতসাহ দেওয়া হচ্ছে যাতে তার পুঁথিগত বিদ্যার বিস্তৃতি ঘটতে পারে বিশেষভাবে। গ্রিসে হিপোক্রিটের পরবর্তী প্রজন্মের চিকিৎসকেরা এই বিশেষ জ্ঞানার্জন থেকে বঞ্চিতই থেকেছেন। চিকিৎসকেদের হাতে কলমে কাজ করে উতকর্ষ লাভের যে পথনির্দেশ ভারতীয় চিকিতসাবিজ্ঞান দিচ্ছেন, সেখানেও ভারতের সঙ্গে গ্রিসিয় চিকিৎসাবিদ্যার মৌলিক তফাত ঘটে গিয়েছে। চরকসংহিতায় বলা হয়েছে, চিকিতসাসাস্ত্রীয় উপাধিওয়ালা চিকিতসাশাস্ত্রীর হাতে কলমে কাজ, উত্তম চিকিতসকে রূপান্তরিত হতে সাহায্য করে৩২। গ্রিসিয় চিকিৎসকেরা প্রকৃতির আরোগ্যদানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে ফলপ্রসূ চিকিতসাজ্ঞানের নিদান দান করতে পারতেন না।

ভারতীয় চিকিতসাবদ্যার ওপর গ্রিসিয় চিকিৎসাবিদ্যার বিশেষ প্রভাব রয়েছে এই তত্ত্বের মূলে কুঠারাঘাত করে আমাদের আলোচ্য গ্রিসিয় বনাম ভারতীয় চিকিৎসাজ্ঞান। চিকিৎসাবিদ্যার দৃষ্টিভঙ্গীর এই বিপুল পার্থক্য নিয়ে এই প্রভাবতত্ত্বে আস্থাবান হওয়াটাই মুশকিল। তবে এখানে দুটি তত্ত্ব বিদ্যমান – কুতুম্বিয়ার৩৩ মতে গ্রিসিয় চিকিতসাবিদ্যা বিকাশের বহু আগেই ভারতীয় চিকিৎসাজ্ঞানের বিকাশ ঘটেছিলে৩৪। য়লি আর ফিলিওজাটের বক্তব্য দুই সভ্যতার চিকিৎসাশাস্ত্র পরস্পরের ওপর প্রভাব বিস্তার না করেই সমান্তরালভাবে বিকাশলাভ করেছিল। ফরাসি সংস্কৃতবিদ ফিলিওজাটের বক্তব্য, সামগ্রিক পশ্চিম এবং পূর্বগোলার্ধর কিছুটা অংশজুড়ে গ্রিসিয় চিকিৎসাবিদ্যার বিকাশের সঙ্গে, বৌদ্ধ ধর্মের হাত ধরে প্রতিবেশী দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় ভারতীয় চিকিৎসাবিদ্যার বিস্তার ঘটার তুলনা করা যায়।

প্রভাবের তত্ত্বটি আজও বিতর্কিত থেকে গিয়েছে। কিন্তু আয়ুর্বেদের বিকাশের উচ্চতম স্তরের যে ইতিহাস আমরা আলোচনা করেছি, সেই যুক্তিতে আমরা সরাসরি কুতুম্বিয়ার তত্ত্বে আস্থা পেশ করতে পারি।
(চলবে)

Friday, February 17, 2017

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা৬ - উনবিংশ এবং বিংশ শতে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র এবং দেশজ চিকিৎসা ব্যবস্থা ১৮০০-১৯৪৭

পুনম বালা
চরক সংহিতা আটটি বিষয় ১২০টা অধ্যায়ে বিভক্ত
১। সূত্রস্থান- ৩০টি অধ্যায়ে ওষুধের ইতিহাস, সাধারণ চিকিৎসা সূত্র, তাত্ত্বিকভিত্তি ইত্যাদি
২। নিদানস্থান – ৮টি অধ্যায়ে বিভিন্ন রোগের কারণ আর তার উপসর্গগুলি আলোচিত হয়েছে,
৩। বিমানস্থান – ৮টি অধ্যায়ে বিভিন্ন উপাদানের চরিত্র আর গুণাগুন, চিকিৎসার পদ্ধতি এবং চিকিৎসকেদের চিকিৎসা করাবার নীতি এবং নির্দেশিকা সমূহ আলোচিত হয়েছে
৪। শরীরস্থান – ভ্রুণতত্ত্ব এবং শারীরবদ্যা ৮টি অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে,
৫। ইন্দ্রিয়স্থান – ১২ অধ্যায়ে রোগের পূর্বাভাষ এবং চিকিৎসা
৬। চিকিৎসাস্থান – ৩৬ অধ্যায়ে ভেষজ, পথ্য, ফার্মাকোলজি বিষয়ে আলোচনা আর আয়ুর্বেদের আরোগ্যতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা
৭। কল্পস্থান – ভারতীয় ঔষধের ফার্মাকোপিয়া নিয়ে ১২ অধ্যায়ে আলোচনা
৮। সিদ্ধিস্থান – এনিমা(ডুশ?), রেচন, মুত্রাধার বিষয়ক আলোচনা ১২টি অধ্যায়ে
অসুস্থতার কারণ হিবে ধরা হয় পরিবেশগত উপাদানগুলির কোনটা বা মিলিয়ে মিশিয়ে অসামঞ্জস্য বা আধিপত্য ঘটা। চিকিৎসা সাধারণত ভূমিপরীক্ষা বা অসুস্থ মানুষের পরিবেশ পরীক্ষা হওয়ার কথা বলে, তাহলেই রোগির সঠিক অবস্থা পরিজ্ঞাত হওয়া যায়। পরিবেশ পরীক্ষা অর্থে তার রোগে সামাজিক অবস্থা যেমন খাদ্যাভ্যাস, জীবনচর্যা, এবং অন্যান্য রীতিনীতি কি প্রভাব ফেলছের তা জানা। সুশ্রুত সংহিতাতেও সরাসরি রোগীর চিকিতসায় ইন্দ্রিয়-উপলব্ধি(সেনস-পার্সেপসন) প্রয়োগ করার কথা বলা হয়েছে। মানবের শারীরিক গঠন জানতে পারলে চিকিতসা করতে সুবিধে হয়, এমন কথা বলেছে সুশ্রুত সংহিতা।
আয়ুর্বেদে চিকিতসাবিদ্যা(থেরাপিটিকস) বিকশিত হয়েছে পরিবেশের উপাদান এবং শারীরিক উপাদানের সম্মিলিত জ্ঞানের সমন্বয়ে, কেননা স্বাস্থ্য এবং রেগের চরিত্র সরাসরি নির্ভর করে পরিবেশের নানান উপাদানের ওপর। দেহের মধ্যে জাগতিক উপাদানের কিছু উপাদান প্রবেশ করলে বায়ু, কফ আর পিত্তের আলাদ আলাদা অথবা যৌথ বিকার ঘটে। চরক এগুলিকে সামান্য এবং বিশেষ, দুভাগে ভাগ করেছেন। এই দুটির ওপর নির্ভর করে আয়ুর্বেদে নিদান, ঔষধ আর চিকিৎসার প্রকরণ নির্ধারিত হয়।
আয়ুর্বেদকে বিজ্ঞান রূপে অভিধা দেওয়া যায় তার দ্বি-নিদানতত্ত্ব অনুসারে ১)আরোগ্যদায়ক(কিউরেটিভ) ২) নিবারক(প্রিভেন্টিভ)। প্রথমটি দেহের ভিতরের ও বাইরে ওষুধ দিয়ে সারাবার প্রক্রিয়া, এবং দ্বিতীয়টি ব্যক্তিগত এবং সামাজিক স্বাস্থ্যপ্রকরণ, যা দিয়ে মানুষ উজ্জীবিত বা নিরোগ হতে বা দৈহিক ক্ষয়কে পিছিয়ে দিতে পারে গাছগাছড়া ব্যবহার করে। আর শেষতম হল যোগে রোগ আরোগ্য এবং দেহ ও মনের শান্তি।
চিকিতসা স্থানের চিকিৎসাবিদ্যাগত(থেরাপিটিক) চরিত্র ব্যবহার বিষয়ে চরক সংহিতায় বলা হয়েছে, ইতি সর্ব-বিকরণম ইতদ চিকিতসম, স্থানম এতদ হি তন্ত্রস্য রহস্যম পরম উত্তমম।
চরক এবং সুশ্রুত সংহিতার মৌলিক পার্থক্য হল, এই দুটি সংহিতা চিকিৎসা শাস্ত্রের দুটি আলাদা আলাদা বিষয় নিয়ে লিখিত হয়েছে। সুশ্রুত সংহিতা ১২০টা অধ্যায় সম্বলিত ৫টি পুঁথিতে বিভক্ত –
১) সূত্রস্থান – শল্য চিকিৎসার হাতিয়ার সমূহ এবং শল্যকিচিকিতসাবিদ্যা আলোচিত হয়েছে ৪৬ অধ্যায় জুড়ে,
২) নিদান স্থান – অসুখের নিদানসূত্র আলোচিত হয়েছে ১৬ অধ্যায় জুড়ে,
৩) শরীর স্থান ১০ অধ্যায় জুড়ে শারীরবিদ্যা, ভ্রুণবিদ্যা এবং কাটাছেঁড়ার পদ্ধতি শিক্ষা,
৪) চিকিতসা স্থান ৪০ অধ্যায় জুড়ে আয়ুর্বেদিয় চিকিতসকেরা যে থেরাপিটিক পদ্ধতিগুলি অনুসরণ করেন, সে নিয়ে আলোচনা,
৫) কল্পস্থান – ৮ অধ্যায়ে বিষবিদ্যা আলোচিত হয়েছে।
দুটি সংহিতাতেই উপনয়ন প্রক্রিয়া দিয়েই চিকিতসকেদের প্রশিক্ষণের প্রক্রিয়া শুরু হয়। তারপর সারি দিয়ে সূত্র বা শ্লোকগুলি মনে রাখার প্রক্রিয়া শুরু, এরপর আলোচনা এবং অধ্যাপকের সঙ্গে কথাবার্তা। শল্য চিকিৎসায় নির্দিষ্ট পথের নির্দেশেনা ছাড়াও সুশ্রুত কিন্তু প্রায়োগিক হাতে কলমে আর্জিত জ্ঞানের ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলছেন একজন ছাত্র শিখবে, মৃত পশুর নাড়ি উন্মোচন করতে, পোকায় খাওয়া কাঠ ও বাঁশে পরীক্ষা করতে, পুতুলের ওপর বাঁধাছাঁদা প্রয়োগ করবে, নরম মাংসকে কস্টিক দিয়ে দহন এবং ছ্যাঁকা দেওয়ার কাজ করতে।২৪
(চলবে)

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা৫ - উনবিংশ এবং বিংশ শতে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র এবং দেশজ চিকিৎসা ব্যবস্থা ১৮০০-১৯৪৭

পুনম বালা

অথর্ব বেদে ২০টা পুঁথি জুড়ে ৭৩১টা স্তোত্র, জাদুমন্ত্র উল্লিখিত হয়েছে। এটি রচিত হয় ১২০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে। লিখিত চিকিতসাশাস্ত্র, যার নাম আয়ুর্বেদ, মূলসূত্র কিন্তু আহৃত হয়েছিল বেদ থেকেই। অনেকে মনে করেন অথর্ব বেদের সঙ্গে আয়ুর্বেদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সাযুজ্য রয়েছে। তবে এই ধারনায় বিতর্কও রয়েছে।
চরক এবং সুশ্রুত দুজনে মূল দুটি চিকিৎসা শাস্ত্র প্রণেতা। তারা বেদ এবং আয়ুর্বেদের এই সম্পর্ক নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত। সুশ্রুত বলছেন, আয়ুর্বেদ হল অথর্ববেদের একটি উপাঙ্গ এবং বিশ্ব সৃষ্টি আগেই ব্রহ্মা এটি প্রণয়ণ করেন। কিন্তু দাশগুপ্ত এই ধারনাকে নস্যাৎ করে বলছেন অথর্ববেদের বহু স্তোত্র আয়ুর্বেদে দেখা যায়।

আয়ুর্বেদে ১০০০০ আর অথর্ববেদে ৬০০০ স্তোত্র রয়েছে। চরক এবং সুশ্রুত দুজনেই এটিকে ঐশ্বরিক দান রূপে গণ্য করেছেন। অথচ চরক আয়ুর্বেদের বিকাশ এবং সংকলনে দীর্ঘকাল লাগার কথা স্বীকার করে নিচ্ছেন। তিনি বলছেন নতুন চিকিৎসা ব্যবস্থা কোন একটি জাদুমন্ত্রে হঠাতই আবির্ভাব ঘটে নি, বরং এটি বিকাশে দীর্ঘদিন ধরে বৈজ্ঞানিক পরিমণ্ডলের প্রয়োজন হয়েছিল। এটি একটি শুরু ছিল, এবং প্রায়োগিক ব্যবস্থা হিসেবেই, শুরু হয়েছিল অথর্ববেদ লেখার পরের সময়ে। বাস্তবে, এর সঙ্গে অথর্ববেদের মিল একটা যায়গায় সেটি হল দুটি শাস্ত্রই অসুখ চিকিৎসার মাধ্যমে দীর্ঘজীবন লাভের কথা বলে, আয়ুর্বেদ বলে চিকিৎসার মাধ্যমে আর অথর্ববেদ বলে ঐন্দ্রজালিক ব্যবস্থার মাধ্যমে। তবুও অথর্ব বেদের সময়েও ওষুধ দিয়ে অসুখ সারানোয় নিদানশাস্ত্রের (ফার্মাকোপিয়া) বিস্তৃত ভুমিকা ছিল।

যদিও আয়ুর্বেদের উদ্ভবএর সঙ্গে পরাবস্তবতা এবং ধর্মতত্ত্ব জড়িয়ে রয়েছে, তবুও সাধারণভাবে স্বীকৃত যে১২, এটিতে বৈজ্ঞানিক চিন্তার স্ফূরণ ঘটেছে এবং এটি সে সময়ের মানুষের জীবন এবং স্বাস্থ্য বিষয়ে একটি দিশা দান করে১২। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের উদ্ভবের ইতিহাস আলোচনায় প্রতিভাত হয় যে চিকিৎসাশাস্ত্র অতীতের ঐন্দ্রজালিক এবং ধর্মতত্ত্বের পথ ছেড়ে এটি ক্রমশ যুক্তিগ্রাহ্য এবং বৈজ্ঞানিক পথ ধরেছিল।

পূর্বের বেদগুলির মতই আয়ুর্বেদ সম্পূর্ণতম শাস্ত্র। কিন্তু এটিতে যে চিকিৎসা বিদ্যার কথা বলা হয়েছে সেটি আলাদা চরিত্রের এবং স্তরের। নথিকরণের পরে এটি ব্রাহ্মণদের হাতে চলে যায়, কিন্তু সে বিষয়ে তারা কতটা ভূমিকা পেশ করেছে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। বেদপরবর্তী সময়ের প্রথমদিকে আমরা দেখেছি ব্রাহ্মণেরা কিভাবে বাড়তে থাকা চিকিৎসা শাস্ত্রের জ্ঞান এবং চিকিতসাকে দমিয়ে রেখেছিল। পরের দিকে হয়ত চিকিৎসা জ্ঞানকে দমন করতে না পেরে এটিকে নথিবদ্ধ করে এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার বিকাশ ঘটায়। এই জন্য ব্রাহ্মণেরা এটিকে উদ্ভবের ধর্মীয় মোড়ক দেয় এবং এবং রক্ষণশীলতায় ঢেকে রাখে।

আয়ুর্বেদের বৈজ্ঞানিকতার চরিত্র আমরা বিশ্লেষণ করতে পারি প্রাচীন চিকিৎসা শাস্ত্রগুলির ঔষধের জ্ঞানের বহরে। চরক সংহিতা, সুশ্রুত সংহিতা এবং অষ্টাঙ্গসংহিতাকে এক সঙ্গে বৃদ্ধত্রয়ী নামে অভিহত করা হয়। চরক সংহিতায় রয়েছে রোগের বিশদ নামকরণ, রোগের নিদানতত্ত্ব, রোগ নিরূপণ এবং রোগ চিকিৎসা। সুশ্রুত সংহিতায় রয়েছে শল্য চিকিৎসার বিবরণ। আর অষ্টাঙ্গ সংহিতা চিকিৎসার সারকোষ, এই দুই সংহিতা শাস্ত্রের সংহিতা বা সঙ্কলন। চরক এবং সুশ্রুত সংহিতা আমাদের বুঝতে সাহায্য করে অতীতের চিকিতাসাস্ত্রের তত্ত্ব এবং প্রয়োগের ইতিহাস এবং তার সঙ্গে চিকিতসকেদেরও। এই শাস্ত্র যে নীতিগুলির ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে - ১) প্রত্যেক রোগ সৃষ্টির পিছনে কারণ রয়েছে, ২) এগুলি যতটা না পারমার্থিক তার থেকে বেশি জাগতিক, ৩) সাধারণ রোগের যেমন চিকিৎসার পথ এবং পদ্ধতি রয়েছে, তেমনি জটিল এবং অনারোগ্য রোগেরও চিকিৎসার পদ্ধতি রয়েছে।

আয়ুর্বেদের ব্যবহারিক ঔষধ বিজ্ঞান(মেটিরিয়া মেডিকা)এ রয়েছে পরিপূর্ণ ব্যবহারিক এবং পরিবেশগত জ্ঞান। চরক সংহিতা আমাদের বিভিন্ন রোগের ছয়শ ওষুধের বিবরণ প্রদান এবং বিপুল সংখ্যার বিকারতাত্ত্বিক (প্যাথলজিক্যাল) অবস্থা বর্ণনা করে। অন্যদিকে সুশ্রুত সংহিতা প্রাথমিকভাবে চিকিৎসা শাস্ত্রে শল্যবিদ্যায় গুরুত্ব প্রদান করে।

দুটি শাস্ত্রতেই আয়ুর্বৈদিক বিজ্ঞান আটটি ভাগে বিভক্ত
১। সাধারণ চিকিতসা
২। শিশুরোগ চিকিৎসা
৩। শল্য চিকিৎসা
৪। বিষবিদ্যা
৫। মানসিক অসুস্থতা
৬। ভিরিলিফিক্স(?)
৭। শক্তি বাড়ানোর জন্য ওষুধ ও শক্তিবর্ধক
৮। কান, নাক, চোখ, ঠোঁট, জিভের চিকিৎসা

এছাড়াও এটি দুটিভাগে বিভক্ত একটি স্বাস্থ্য প্রচারের কাজ দ্বিতীয়টি সব ধরণের ওষুধ এবং খাদ্যের গুনাগুন, চরিত্র, স্বাদ এবং সর্বোচ্চ কার্যকারিতার ওপর নির্ভর করে বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা।

চরক এবং সুশ্রুত সংহিতা পুরুষকে প্রকৃতির অংশ রূপে দেখে, এবং সারা বিশ্ব যে সব উপাদানে তৈরি পুরুষও সেই উপাদানগুলির সমন্বয়ে তৈরি। মানুষ, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ক্ষুদ্র প্রতিরূপ। প্রকৃতি এবং দেহ দুটিই ক্ষিতি অপ তেজ মরুত ব্যোম এই পঞ্চভূতেরর সমাহার। পঞ্চভূততত্ত্ব প্রাচিন চিকিৎসার মৌলিক তত্ত্ব১৭। প্রাচীন চিকিতসকেদের বক্তব্য, প্রত্যেকটা উপাদান প্রকৃতির স্বভাবে হাজারো জীব এবং জড়ের রূপে পরিবর্তিত হয়। এছাড়া প্রত্যেক বস্তুর স্বভাব আলাদা আলাদ, আগুন যেমন গরম তেমন জল ঠাণ্ডা ১৮। পঞ্চভূত ছাড়া দেহ তিনটি তত্ত্বে তৈরি ধাত, মন এবং আত্মা। শেষের দুটি জুড়ে আয়ুর্বেদ মনদৈহিক চরিত্র দিয়েছে। দেহের তিনটি ধাত বা দোষ - বাত, পিত্ত আর কফ। এইতত্ত্বগুলি সম্বল করে আয়ুর্বেদে রোগ নির্নয়, চিকিৎসা ও নিদান দেওয়া হয়। চিকিতসকের মানব দেহ আর প্রকৃতিকে আলাদ করে দেখেন না। যেহেতু মানুষ আর প্রকৃতি একীভূত, সেহেতু প্রকৃতির কোন কিছুই চিকিৎসার কাজে আবঞ্ছিত এবং অগুরুত্বপূর্ণ নয়।
(চলবে)

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা৪ - উনবিংশ এবং বিংশ শতে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র এবং দেশজ চিকিৎসা ব্যবস্থা ১৮০০-১৯৪৭

পুনম বালা

দ্বিতীয় অধ্যায়
প্রাচীন এবং মধ্যযুগের ভারতে দেশজ চিকিৎসাঃ ব্রিটিশ শাসনের আগের অবস্থা
প্রাচোন কালে দেশজ চিকিৎসা

তৃতীয় খ্রিস্ট পূর্ব সহস্রাব্দে সিন্ধুর কাছে মহেঞ্জোদারো এবং পাঞ্জাবের কাছে হরপ্পার উতখননে অসাধারণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং নানান ধরণের চিকিৎসা যেমন বাতের চিকিৎসার নানান উপকরণের খোঁজ পাওয়া গিয়েছে১।

ভারতীয় চিকিৎসার দুটি পর্ব ধরা হয়েছে, ১) বৈদিক সময় - ১৫০০ খ্রিপূর সময় থেকে, ২)  খ্রিপূ ৬০০ পরবর্তী সময় থেকে।
কিন্তু এই বর্গীকরণের যথেষ্ট সমস্যা দেখা দেয়, কেন না, আমরা দেখতে পাচ্ছি, বেদপরবর্তী সময়ের যে মূল পাঠ্য, সেটি কিন্তু বৈদিক সাহিত্য অর্থাৎ প্রায় প্রত্যেকটি বেদের সঙ্গে যুক্ত।

এই দুই পর্বে সমাজে ব্রাহ্মণদের প্রভাব ছিল যথেষ্ট। কিন্তু বাস্তব সমস্যা হল, ব্রাহ্মণেরা যেহেতু প্রায়োগিক স্তরে জ্ঞান আহরণের বিষয়ে খুব বেশি উৎসাহিত ছিল না, তাই খুঁজে দেখতে আমাদের দেখতে হবে, কিভাবে বেদ পরবর্তী সময়ে প্রায়গিক চিকিৎসার বাড়বাড়ন্ত হল। তবে এটা দেখা যাচ্ছে, বৈদিক এবং বেদ পরবর্তী সময়ে ব্রাহ্মণেরা এই প্রায়োগিক জ্ঞান অর্জন না করেই কিন্তু সেগুলি লিপিবদ্ধ এবং প্রয়োগ করার কাজ করেছেন এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার বিকাশ ঘটিয়েছেন। ফলে চিকিৎসা জ্ঞানে ভারতে একটি বদ্ধ এবং অসমপূর্ণ শাস্ত্রের বিকাশ ঘটল। কিভাবে এটি ঘটল, সেই বিশদ বর্ণনাটি আমরা দেব ব্রিটিশ ভারতে দেশজ এবং পশ্চিমি চিকিৎসাবিদ্যার সম্পর্ক বিশ্লেষণের সময়।

১। বৈদিক যুগ
প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতি এবং চিকিৎসাবিদ্যার মূল কোষগ্রন্থ চারটি বেদ - ঋক, সাম, যজু এবং অথর্ব। ঋক সঙ্কলনের প্রথম যুগেই(১৫০০ খ্রিপূ) চিকিৎসার উদাহরণ পাওয়া যায়। সেন বলছেন, বৈদিক দেবতাদের মধ্যে দুজন আশ্বিন চিকিতসক হিসেবে অবতীর্ণ হয়ে নানান অসুখের নিদান দিয়েছেন, ফলে ঋগ্বেদে আমরা চিকিৎসার সূত্র পাচ্ছি।৩

গ্যারিসন৪ বলছেন, বৈদিক সময়ে চিকিৎসাশাস্ত্রর রোগের কারণ বিশ্লেষণে সম্পূর্ণভাবে ছিল অলৌকিকত্বে ভরপুর, ঐন্দ্রজালিক এবং পরাবস্তবের সমাহার। চিকিৎসার উদ্দেশ্যটাই ছিল অসন্তুষ্ট দেবতা বা দেবীকে ভর দেখিয়ে এবং জন্মান্তরবাদের মাধ্যমে রোগমুক্ত করার পদ্ধতি নির্ণয়। অবশ্য সিগারস্ট৫ দাবি করছেন, এর সঙ্গেও বাস্তব গবেষণামূলক এবং যুক্তিসম্মত চিকিতসাবিদ্যারও প্রয়োগ হত, এমন কি সংহিতা সম্পূর্ণভাবে ধার্মিক হলেও চিকিৎসা পদ্ধতিগুলি ছিল যুক্তিসংগত।

শেষতম বেদ অথর্বতে সিগারিস্টের দাবির প্রমান পাওয়া যায়। এতে দু ধরণের চিকিৎসার কথা বলা হচ্ছে, ১) ঐন্দ্রজালিক মন্ত্র/স্ত্রোত্র পাঠ করে চিকিৎসা, ২) ঐন্দ্রজালিক অনুপানে ওষুধ ব্যবহার করে চিকিৎসা।

ঋগ্বেদে ১০৫২২টি শ্লোকের মধ্যে ১০২৮টি স্ত্রোত্র রয়েছে, যেগুলি দেবতাদের উদ্দেশ্যে বলির জন্য উতসর্গীকৃত, তাদের মধ্যে সোম, বরুণ এবং রুদ্রের মত চিকিতসক দেবতাও রয়েছে এবং তাদের সুস্থ করার ঐশ্বরিক ক্ষমতার কথা বলা হয়েছে৬। যেমন বরুণ দেবতার সম্পর্কে বলা হয়েছে তিনি অসুস্থদের জন্য অন্তত শত শত ওষুষ প্রয়োগ করেন৭।

ঋগ্বেদ আর সামবেদ খুব কাছাকাছি সম্পর্ক যুক্ত এবং এই দুটি ভারতের ধর্মীয় জীবনকে ৩০০০ বছর ধরে প্রভাবিত করে আসছে এবং আজও এটি হিন্দুদের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মগ্রন্থ৮।

সামবেদে দেবতাদের জন্য বলির উদ্দেশ্যে ১৮১০টি স্তোত্র উল্লিখিত হয়েছে। যজুর্বেদ প্রথম খ্রিষ্টপূর্বাব্দের রচনা। এতে মন্ত্র, ধর্মীয় শ্লোক এবং যজু সহ নানান নামে বলির সূত্র উল্লিখিত হয়েছে। যজু দুইভাগে বিভক্ত। একটি শুক্ল যজুর্বেদ এবং অন্যটি কৃষ্ণ যজুর্বেদ। কৃষ্ণযজুর্বেদে বলির নানান পদ্ধতি উল্লিখিত হয়েছে। এর কিছু স্তোত্রর সঙ্গে আবার শুক্লর স্তোত্রগুলির মিল রয়েছে। এছাড়াও ইন্দ্রজাল এবং বলি দেওয়ার আচার, যজ্ঞ ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা রয়েছে। এর সঙ্গে জুড়ে যে বৈদিক সাহিত্য রয়েছে তর নাম ব্রাহ্মণ। এতে ব্রাহ্মণদের পারমার্থিক নানান গুনাগুণ বর্ণনা করা হয়েছে, এবং যখন শাসক ব্রাহ্মণদের ক্ষমতা/কর্তৃত্ব এবং সুযোগসুবিধেগুলির বিরুদ্ধাচরণ করা হচ্ছিল। সে সময় রাজা এবং অভিজাতরা পুরোহিতদের ক্ষমতা/কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে রাষ্ট্র চালনায় নিজেদের পকড় বাড়াবার চেষ্টা করছিলেন। আগের বেদগুলিতে যে সামাজিক সাযুজ্যতার কথা বলা হয়েছে, সেটি সে সময় লঙ্ঘিত হচ্ছিল। পুরোহিতেরা এই সময় তাদের বেশ কিছু ক্ষমতা হারান।

মনুর সূত্র অনুসারে, ব্রাহ্মণেরা দেবতা ব্রহ্মার ঔরস থেকে জন্মগ্রহণ করে জ্ঞানের ভাণ্ডার হিসেবে পরিগণিত হন। বেদ লেখা, এবং তার যথার্থকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরার একমাত্র ধাত্রী হিসেবে ব্রাহ্মণদের তুলে ধরা হল এবং বলা হল ব্রাহ্মণেরাই একমাত্র বেদ পাঠের পাত্র। মনুর সূত্র অনুসারে তারা আর দেশ শাসনের একমাত্র অধিকারী থাকলেন না, তাদের ধর্মীয় এবং আধ্যাত্মিক ক্ষমতাও বেশ কমিয়ে দেওয়া হল। তবুও চিকিতসার লিখিত সংস্করণ ব্রাহ্মণ পুরোহিত এবং অধ্যাপকেদের হাতে রইল।

এখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি, সিগারিস্টের মতবাদ বেদের বিষয়গুলির সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। কিন্তু চিকিৎসাশাস্ত্র ব্রাহ্মণদের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও, সেটি হল মূলত বদ্ধ এবং ধর্মীয় আচার সর্বস্ব। প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে শাস্ত্রকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সমস্ত চেষ্টা রুদ্ধ করে দেওয়া হল, নতুন কোন জ্ঞান, পদ্ধতি, কর্ম চিকিতসাভাণ্ডারে জমা হল না। ব্রাহ্মণদের বিপুল ক্ষমতা সত্ত্বেও ব্রাহ্মণ্যবাদের যুগে চিকিৎসাশাস্ত্রে বেশ কিছু নতুন ধারণা যোগ হতে শুরু করল, তাদের রক্ষণশীলতা এবং চিকিৎসা পদ্ধতি বিষয়ে অনৌৎসুক্য সত্ত্বেও। তবে এইটি ভাবা খুব কষ্টের যে ব্রাহ্মণদের দ্বারা এই ক্ষতিটা ঘটেছিল। উদাহরণস্বরূপ মনুস্মৃতিতে বলা হচ্ছে, যারা মৃতদেহ ছোঁবে তাদের পরিশুদ্ধি/প্রায়শ্চিত্তের উদ্দ্যেশ্যে নির্দিষ্ট কিছু আচার পালন করতে হবে। যদিও ব্রাহ্মণেরা চিকিৎসাশাস্ত্র লিখেছিল, কিন্তু তারা চিকিৎসায় খুব একটা উতসাহী ছিল না।
(চলবে)

Wednesday, February 15, 2017

পাঁচমুড়োর পঞ্চাননমঙ্গল - আমাদের বক্তব্য


এবছরও কিছু ভাবনা যোগ করলাম...
মূল বক্তব্য একই রইল... কিছু নতুন তথ্য জোড়া গেল ...

গত বছর ইপ্সিতারা তাঁদের গুরুচণ্ডালী ব্লগে এই বইটি নিয়ে আলোচনা করেছেন। সেই আলোচনায় কেউ কেউ বলছেন কিছুটা হলেও এই বইটিতে নাকি বলা হয়েছে মুসলমানের হানাদারিতে বাংলার জ্ঞানচর্চা গোল্লায় গেল। এছাড়া উপন্যাস হিসেবে এটি খুব খাজা - নীরদ চৌধুরীর ভাষায় শস্তা পেপারব্যাক জাতীয়।

আমাদের উত্তর-

ইসলামি আমলে সব জ্ঞানবিজ্ঞানচর্চা নষ্ট হয়ে গেল প্রীতম বসু তা বলেছেন এমন কথা বলা মুশকিল - উনি তা বলতে চেয়েছেন কি না প্রথম পাঠে বুঝি নি - বুঝতে হবে পরের দিকে কোনো একসময় পড়ে - একটু গোলা লোক আমরা - মাথা খুব পরিষ্কার নয় - প্রথম পাঠে সবকিছু বুঝতে পারি না। শ্রুতি একটা বড় অবলম্বন ছিল পড়ুয়া আর অধ্যাপকদের। শুধু পুঁথি বা প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যাপ্রযুক্তিচর্চা জ্ঞানচর্চার অবলম্বন ছিল না - এটা আমরা সক্কলে জানি - শুধু জ্ঞানদেওয়ার মত করে বলাগেল।

প্রায় দুশো বছর আগে ১৮০০ সালের তিরিশের দশকে চার্লস উইশের কলণ সম্বন্ধে লেখাটি তথাকথিত যুদ্ধবাজ ইসলাম পরবর্তী ব্রিটিশ অন্ধ্রে ভারতীয় অঙ্কচর্চার দুহাজার কাছাকাছি বছরের ধারাবাহিক উদাহরণ - এটা দেখিয়েছেন ভারতীয় অঙ্কের ইতিহাসকার ও গবেষক তাত্ত্বিক চন্দ্রকান্ত রাজু।

তবে আমাদের ব্যক্তিগতভাবে মনে হয় না যে জ্ঞানচর্চার উদাহরণ দিয়েছেন সেগুলি শুধু বাংলার জ্ঞানচর্চা। যে অঙ্কের উদাহরণ দিয়েছেন, তা হয়ত ভারতীয় জ্ঞানচর্চা। তবে বাংলায় এ সময়ের আগেই ধাতুবিদ্যার রসরত্নসমুচ্চয় বা কৃষি পরাশরের মত প্রযুক্তির বিষয় কিন্তু লেখা হয়েছে, তন্ত্রে প্রচুর রসায়ন ধাতু ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা হয়েছে, অঙ্কে শ্রীধর এসেছেন, রাজা ভোজের নামে চলা যুক্তিকল্পতরু নামক জাহাজ গড়ার শাস্ত্র যে বাঙালির রচনা তা উল্লেখ করেছিলাম পরমের নৌবিদ্যা সংখ্যায় - যার ছাপ পাচ্ছি আওরঙ্গজেবের হয়ে সুজার বিরুদ্ধে লড়া মীর জুমলার বাংলার নৌ বহরে বা মীর জুমলার অসম আভিযানের বর্ণনায়।

শেষমেশ উপন্যাসের আঙ্গিক নিয়ে আমাদের বলার কিছু নেই। সে বিচারের অধিকার আমাদের মত গ্রামীনদের আছে বলে মনে করি না। বাংলা লেখায় মা সরস্বতী আমাদের দলের সক্কলে। তার সময়ে সব থেকে বড় সাম্রাজ্য বন্ধু, মহাপণ্ডিত বিদ্যাসাগর মশাই বলে গিয়েছেন তিনি বাঙলা বাজারে দেবী সরস্বতীকে বাঁদর নাচ নাচাচ্ছেন - আমাদের লাখো টোল, চতুষ্পাঠী তিনি ব্রিটিশ সহযোগে তুলে দিয়েছেন, ইংরেজি শিক্ষিত বাঙালির আর্থিক উদরপূর্তির জন্য। আমরা তুচ্ছ গ্রমীনেরা তো এবাবদে কোন ছার। আমাদেরও কিছুমিছু বলার আছে তাই বাধ্য হয়ে কলম ধরিমাত্র, তার বেশি কিছুই নয়।

আমরা শুধু বলতে চেয়েছিলাম প্রীতম বসুমশাই যা করেছেন, তা অন্তত বাঙলা ভাষায় ঐতিহাসিক উপন্যাস রচনায় ব্যতিক্রম - কেননা বাংলা/ভারতের জ্ঞানচর্চার ইতিহাস খুব বেশি উপন্যাসে ধরা নেই - যদিও বাংলা ভাষায় খুব বেশি উপন্যাস পড়েছি এমন দাবি করা যাবে না। অধিকাংশ উপন্যাস রাজনীতির ঘণঘটা - হাজারি প্রসাদ দ্বিবেদীর বানভট্ট কি আত্মকথার অনুবাদই বাণভট্টের আত্মকথাই হোক বা মহাশ্বেতা দেবীর বর্গি হামলার সময়ের আন্ধারমাণিকই হোক বা চৈতন্যর সমসাময়িক মহাশ্বেতার বিবেকবিদায় পালাই হোক - উপন্যাসের কেন্দ্রে রাজনৈতিক ঘটনা - বিন্দুমাত্র জ্ঞানচর্চা বা প্রযুক্তি পরিচয়ের ছাপ নেই। একমাত্র বাংলার অর্থনীতি ধ্বংসের সময়টি অপূর্ব দক্ষতায় ধরেছিলেন চণ্ডীচরণ সেন মশাই - তথ্যে দাঁড়িয়ে থেকে।

ফলে উপন্যাসটি পড়ার এক বছর পরে বলতে পারি, তথ্যের গুণগত মানে প্রীতম বসুর উপন্যাস যথেষ্ট ব্যতিক্রমী। অনুরোধ থাকবে ঘটনার ঘনঘটা থেকে বেরিয়ে আপনারা নজর দিন তথ্যের ভিত্তিতে। তবেই বাংলার জ্ঞানচর্চা বাখানে প্রীতম বসুরদাদার চেষ্টা সার্থক হবে।

Tuesday, February 14, 2017

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা৩ - উনবিংশ এবং বিংশ শতে রাষ্ট্র এবং দেশজ চিকিৎসা ব্যবস্থা ১৮০০-১৯৪৭

পুনম বালা

প্রথম অধ্যায়ের পাঠ্যাবলী
জে সি হিউম, মেডিসিন ইন পাঞ্জাব, ১৮৪৯-১৯১১ঃ এথনিসিটি এন্ড প্রফেশনালাইজেশন ইন দ্য কন্ট্রোল অব অকুপেশন, গবেষণা, ডিউক ইউনিভার্সিটি
এ আর দেশাই, সোসাল ব্যাকগ্রাউন্ড অব ইন্ডিয়ান ন্যাশনালিজম
ডি আর গ্যাডগিল, ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভলিউশন ইন ইন্ডিয়া ইন রেসেন্ট টাইমস, ১৮৬০-১৯৩৯, ওইউপি
এস এইচ রুডলফ এবং এল জে রুডলফ সম্পাদিত এডুকেশন এন্ড পলিটিক্স ইন ইন্ডিয়া বইতে, পল ব্রাস, দ্য পলিটিক্স অব আয়ুর্বেদিক এডুকেশনঃ আ কেস স্টাডি অব রিভাইভ্যালিজম এন্ড মডার্নাইজেশন ইন ইন্ডিয়া প্রবন্ধ, ওইউপি
বি চন্দ্র, এ ত্রিপাঠি, বরুণ দে, ফ্রিডম স্ট্রাগল, এনবিটি
র‍্যালফ ক্রোজিয়ার, মেডিসিন এন্ড মর্ডানাইজেশন ইন চায়না, ১৯৭০, ১২ সংখ্যা
ডি কুমার, ল্যান্ড কেস ইন সাউথ ইন্ডিয়া
বি ওয়ারেন, ইম্পিরয়ালিজমঃ পাইওনিয়ার আব ক্যাপিট্যালিজম
এন চার্লসওয়ার্থ, ব্রিটিশ রুল এন্ড ইন্ডিয়ান ইকনমি, ১৮০০-১৯১৪, ম্যাকমিলান
আর দত্ত, দ্য ইকনমিক হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়ান(না ইন্ডিয়া?) ইন দ্য ভিক্টোরিয়ান এজ ফ্রম দ্য এসেসন অব কুইন ভিক্টোরিয়া ইন ১৮৩৭ টু দ্য কমেন্সমেন্ট অব টুয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি
ডলিউ ডিগবি, প্রসপারাস ব্রিটিশ ইন্ডিয়া
পি গ্রিফিথস, দ্য ব্রিটিশ ইম্প্যাক্টস অন ইন্ডিয়া
এস ওবিনিয়ারি, কার্ল মার্ক্স অন কলোনিয়ালিজম এন্ড মর্ডানাইজেশন, নিউ য়র্ক
এন এইচ কেশোয়ানির সম্পাদনায় দ্য সায়েন্স অব মেডিসিন এন্ড ফিজিওলজিক্যাল কন্সেপ্টস ইন এন্সিয়েন্ট এন্ড মেডিভ্যাল ইন্ডিয়া বইতে সম্পাদকের প্রবন্ধ মেডিক্যাল হেরিটেজ অব ইন্ডিয়া
ডি এম বোসের সম্পাদনায় আ কন্সাইজ হিস্ট্রি আব সায়েন্স ইন ইন্ডিয়া বইতে আর সি মজুমদারের মেডিসিন প্রবন্ধ
ডি ব্যানার্জী, প্লেস ইন ইন্ডিজেনাস এন্ড ওয়েস্টার্ন সিস্টেমস অব মেডিসিন ইন হেলথ সার্ভিসেস অব ইন্ডিয়া
সি লেসলির সম্পাদনায়, এশিয়ান মেডিক্যাল সিস্টেমসঃ আ কম্পারেটিভ স্টাডি বইতে বি গুপ্ত, ইন্ডিজেনাস মেডিসিন ইন নাইন্টিন্থ এন্ড টুয়েন্টিওয়েথ সেঞ্চুরি বেঙ্গল প্রবন্ধ
ক্যালকাটা রিভ্যুতে অনির্নেয় হিন্দু মেডিসিন এন্ড মেডিক্যাল এজুকেশন
ডি আর্নল্ড, মেডিক্যাল প্রায়রিটিজ এন্ড প্র্যাক্টিশ ইন নাইন্টিন্থ সেঞ্চুরি ব্রিটিশ ইন্ডিয়া
ডি পি চট্টোপাধ্যায়, সায়েন্স এন্ড সোসাইটি ইন এন্সিয়েন্ট ইন্ডিয়া
লেসলির সম্পাদিত উপরিউক্ত বইতে এফ এল ডুন, ট্রাডিশনাল এশিয়ান মেডিসিন এন্ড কসমোপলিটন মেডিসিন এজ এডাপ্টিভ সিস্টেমস প্রবন্ধ
আর এন উইলসন, দ্য সোসিওলজি অব হেলথঃ এন ইন্ট্রোডাকশন
টি পার্সন্স, দ্য সোসাল সিস্টেমস
সম্পাদক লেসলির বইতে সম্পাদকের দ্য এম্বিগুইটিজ অব মেডিক্যাল রিভাইভ্যালিজম ইন মডার্ন ইন্ডিয়া প্রবন্ধ
সম্পাদক লেসলির বইতে সম্পাদকের মুখবন্ধ
পি এস শর্মা, হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়ান মেডিসিন
পি এস শর্মা, রিওয়ালমস অব আয়ুর্বেদ
বি বার্নস, সোসিওলিজি আব সায়েন্স
(চলবে)

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা২ - উনবিংশ এবং বিংশ শতে রাষ্ট্র এবং দেশজ চিকিৎসা ব্যবস্থা ১৮০০-১৯৪৭

পুনম বালা

ব্রিটিশ ভারতের চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে গবেষণায় অতীতের সম্পর্কটি কি ছিল, সে বিষয়ে আলো ফেলাটা খুব জরুরি। চট্টোপাধ্যায়ের সায়েন্স এন্ড সোসাইটি ইন এন্সিয়েন্ট ইন্ডিয়া২৪ বইটি এই আলোচনায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। চিকিতসাবিদ্যা বিকাশের ইতিহাস আলোচনায় এটি আমাদের সামনে নতুন একটা দিগন্তের দ্বার উন্মোচন করে। তিনি অসাধারণ প্রজ্ঞায় বলছেন, অতীত সম্বন্ধে বিভিন্ন আলোচনায় আয়ুর্বেদের সঙ্গে ধর্ম এবং রাজনীতির শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের যে মিথ তৈরি হয়েছে তা সচেতন নির্মান, তার সঙ্গে বাস্তবতার বিন্দুমাত্রও মিল নেই। তিনি বলছেন অতীতে চিকিৎসা শাস্ত্র বহু বাধার সম্মুখীন হয়েই এগিয়েছিল। বিভিন্ন পৌরাণিক এবং স্মৃতি শাস্ত্র সূত্রে দেখতে পাচ্ছি চিকিতসকদের নানান উদ্যম শাসকদের ধর্মীয় মতান্ধতায় বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। প্রশাসনের কঠোর বাধা অতিক্রম করতে বৈজ্ঞানিকদের শাসকদের ইচ্ছেতেই আত্মসমর্পন করতে হচ্ছে। এই বিরোধ এড়াতে বৈজ্ঞানিকেরা চিকিৎসা শাস্ত্রে ধর্মীয় মোড়ক পরিয়ে দিলেন। এ বিষটয়ে আমরা চট্টোপাধ্যায়ের মন্তব্য তুলে দিলাম, পুরোহিতদের প্রতি আত্মসমর্পনের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন শাস্ত্রে(যেমন চরক সংহিতায়) আত্মা এবং তার মুক্তি নিয়ে একটি অধ্যায় আলোচিত হল।

ভারতীয় চিকিতসাবিদ্যা কোন স্থির-বদ্ধ নীতিসমূহের সংহিতা নয়, বরং শতাব্দের পর শতাব্দ ধরে বৈদেশিক অভিযান এবং আত্তীকরণের ফল। দ্বিতীয় অধ্যায়ে বিশদে এই অগ্রগতির খতিয়ান আমরা দেখতে চেষ্টা করব। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়টি এই তিনটি শর্তে আমরা দেখার চেষ্টা করব, ১) প্রাচীন এবং মধ্য যুগে কারা প্রখ্যাত চিকিতসক ছিলেন এবং এদের মধ্যে কারা শাসকীয় রাজদরবারে নেকনজর লাভ করেছেন? ২) কোন কোন প্রখ্যাত শাস্ত্র(টেক্সট) লেখা হয়েছিল, এবং সেগুলির মধ্যে কোন কোনটি শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছিল এবং একই সঙ্গে বিরাগভাজন হয়েছিল ৩) রাষ্ট্র কি সে সময়ে চিকিৎসাশাস্ত্রীদের শাস্তিদান করেছিল? ব্রিটিশ শাসনের সময় পশ্চিমি ওষুধ ভারতে আসে। এই গবেষণার বাকি অংশটা প্রাচীন এবং মধ্য যুগের চিকিৎসা ব্যবস্থার আলোকে এবং প্রভাবে ব্রিটিশ প্রশাসকদের অনুসৃত নানান নীতি বিশ্লেষণ করা হবে।

তৃতীয় এবং চতুর্থ অধ্যায়ে দেশজ এবং বৈদেশিক চিকিৎসা শাস্ত্রের সম্পর্কটা বোঝার চেষ্টা করেছি। উপনিবেশের প্রথম দিকে ভারতে দেশজ ঔষধ ব্যবহার এবং দেশজ চিকিৎসাশাস্ত্রীদের প্রশিক্ষণ এবং ব্যবহারিক বিদ্যা প্রয়োগের উৎসাহ দেওয়া হয়েছিল। রোগের নিদান এবং চিকিৎসায় উভয় ব্যবস্থাকেই সমান গুরুত্ব পায়।

দেশজ চিকিৎসাবিদ্যা বিষয়ে ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গী উনিবংশ শতকের শেষের দিকে পাল্টাতে শুরু করল। আমি চতুর্থ অধ্যায়ে আলোচনা করেছি, এই সময়ে পশ্চিমি চিকিৎসাবিদ্যাকে পেশাদারিত্বের মোড়ক দেওয়ার চেষ্টা চললেও ভারতীয় চিকিৎসাশাস্ত্রের বহুত্ববাদের জন্য সেই উদ্যমটি অঙ্কুরেই ব্যর্থ হল। পঞ্চম অধ্যায়ে আমি বলার চেষ্টা করছি, ব্রিটেনে চিকিতসকেদের পেশাদারিত্ব সফল হয়েছিল গণস্বাস্থ্য উদ্যমের নীতির ব্যপকতায়। কিন্তু ভারতে সেই ধরণের উদ্যম এবং তার ফলজ সফলতা দেখা যায় নি।

রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষনার আপ্রতুলতা, রোগ নির্ণয়ে নিদান বিদ্যার অভাবের জন্যই এই ব্যার্থতা ঘটেছিল। গণস্বাস্থ্য উদ্যমের অভাবই পশ্চিমি চিকিতসাবিদ্যা দেশিয় চিকিৎসাবিদ্যার সঙ্গে পেরে উঠল না, বরং পেশাদারিত্বের পূর্ণ বিকাশ ঘটল না।
এই গবেষনার শেষ পর্বে আমি দেখাতে চেষ্টা করেছি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষণায় যে পশ্চিমি চিকিৎসাবিদ্যার প্রসার ঘটল, তার ব্যপ্ত হলনা, বরং সেটি ভারতের মুষ্টিমেয় ধনী ভদ্রলোকেদের সমাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে গেল। পশ্চিমি চিকিতসায় চিকিতসিত হওয়ার সঙ্গে জুড়ে গেল ‘উচ্চ’ সামাজিকতার অবস্থান এবং ভদ্রলোকিয় সামাজিকস্তরের ধারনাটি। তবে জাতীয়তাবাদের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজি শিক্ষিতরাই কিন্তু এই চিকিতসাব্যবস্থার পাশাপাশি দেশজ চিকিৎসাবিদ্যার প্রতি নমনীয় হলেন এবং তাকে কিছুটা হলেও গ্রহন করলেন। এই সময়ে দেশজ চিকিৎসাবিদ্যা ধর্মীয় আচার আচরণ থেকে বেরিয়ে গবেষণা আর পরীক্ষানিরীক্ষার দ্বার উন্মোচন করল।

আমার গবেষণায় পশ্চিমি চিকিৎসাবিদ্যা নামক যে শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেছি, তা আমি পশ্চিমের চিকিৎসাবিদ্যা, বিশেষ করে সে সময়ে ব্রিটেনে অনুসৃত চিকিৎসাবিদ্যা বোঝাতে চেয়েছি। চিকিৎসা ব্যবস্থা বলতে হেলথ কেয়ার ডেলিভারিকেও বুঝিয়েছি। স্বাস্থ্য বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংগঠনের তত্ত্ব, শুধুই রোগভোগের অভাব নয়, শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিকভাবে ভাল থাকাই স্বাস্থ্য আপাতত সঠিক। তবু স্বাস্থ্যের সার্বজনিক সংজ্ঞা নির্ণয় করা খুব কঠিন। কেননা কোন একটি বিষয় কোন সমাজে হয়ত স্বাস্থ্যকর রূপে প্রতিভাত হয়, আবার কোন সমাজে সেইটাই চরম অস্বাস্থ্যকর রূপে নিন্দিত হয়ে থাকে। আমরা অনেকটা উইলসনের অনুগামী, আইডিয়া অব হেলথ আস ফাংশনাল কম্পিটেন্স ইন এনেক্টিং রোলস। অসুস্থতা বিষয়ে পার্সনস বলছেন, স্টেট অব ডিস্টারবেন্স ইন দ্য ‘নর্মাল’ ফাংসানিং অব টোটাল হিউম্যান ইন্ডিভিজুয়াল, ইনক্লুডিং বোথ দ্য স্টেট অব দ্য অর্গানিজম এজ আ বায়োলজিক্যাল সিস্টেম এন্ড অব হিজ পারসোনাল এন্ড সোসাল এডজাস্টমেন্টস। ফলে এটি কিছুটা শারীরিকভাবে এবং কিছুটা সামাজিকভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে২৮।

ডুন২৯ স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে স্থানীয়, আঞ্চলিক এবং বহুজাতিকতায় বিভক্ত করেছেন। স্থানীয় এবং আঞ্চলিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা দেশজ এবং পারম্পরিক চিকিতসাব্যবস্থার সমাহার এবং তার একটি আন্তসাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটও রয়েছে বটে, তবে সে অন্য সংস্কৃতি থেকে দেওয়ানেওয়ায় বাধা দান করে না। স্থানীয় চিকিৎসাব্যবস্থা, লৌকিক ঔষুধের সঙ্গে দাই, হাড়জোড়া চিকিতসক, বিভিন্ন ধরণের অতীন্দ্রিয় চিকিৎসক, এবং অন্যান্য লৌকিক স্বাস্থ্য বিধায়ক জুড়ে থাকেন। লৌকিক চিকিৎসাবিদ্যায় রসতত্ত্বের নির্ভরতা, মহাজাগতিক ভাবনাচিন্তা এবং ঐন্দ্রজালিকতা প্রয়োগ হয়ে থাকে৩০। আয়ুর্বেদ এবং য়ুনানির(এমন কি চৈনিকও) হল আঞ্চলিক চিকিতসাবিদ্যার উদাহরণ। লেসলি৩১ একে ধ্রুপদী এবং পেশাদারিত্বের ভাগে ভাগ করেছেন। আয়ুর্বেদে চরক সুশ্রুত সংহিতা এবং আরবি য়ুনানিকে ধ্রুপদী অভিহিত করেছেন। পেশাদারি আয়ুর্বেদ আর য়ুনানি চিকিৎসাক হিসেবে তিনি তাদের বলেছেন, যারা অতীতের চিকিতসাবিদ্যাকে আধুনিকযুগের পশ্চিমি চিকিৎসাবিদ্যার সঙ্গে মিলিয়ে মিশিয়ে ঐতিহ্যে এবং সংগঠনে পরিবর্তন আনেন। আর কসমোপলিটন চিকিৎসাবিদ্যা হল একান্তই পশ্চিমি চিকিৎসাবিদ্যা। এই তিন প্রকারের চিকিৎসা ব্যবস্থার পার্থক্য তত্ত্বে বা বাস্তবে থাকলেও তিনিটি বিদ্যাতেই একটা জিনিস বিজ্ঞানের আওতার বাইরে সেটি হল রোগীর সঙ্গে চিকিতসকের আলাপচারিতা। এই গবেষণায় আমি আয়ুর্বেদ আর য়ুনানিকে আঞ্চলিক চিকিৎসাবিদ্যা হিসেবে গণ্য করেছি যা পশ্চিমি চিকিৎসাবিদ্যার মত নিজেকে পেশাদারিত্বের দিকে নিয়ে যেতে চায়, কিন্তু বাস্তবে সংঘ তৈরি করা তার পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না।


এই গবেষণার যৌক্তিকতা
চিকিৎসাবিদ্যার ইতিহাস গবেষণায় আমরা বিশেষ বিশেষ চিকিৎসা ব্যবস্থা বিকাশে কি ধরণের প্রভাব পড়েছিল সে বিষয়ে নজর টানতে পারি। এটি আমাদের কোনও ব্যবস্থার জোর বা অদক্ষতার দিকে আঙুল তুলতে, এবং কিভাবে একটি ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করা যায় সে দিকে আমাদের চোখ ফেরাতে সাহায্য করে। দেশিয় চিকিৎসাবিদ্যার ইতিহাস আলোচনায় আমরা বিজ্ঞানভিত্তিক এবং জাদু এবং ধর্মীয় প্রথাভিত্তিক চিকিৎসার মধ্যে পার্থক্য টানতে পারি। যদি আমরা ভারতীয় চিকিৎসাবিদ্যাকে বাস্তবমুখী তত্ত্বভিত্তিক এবং গবেষণামূলক নিরীক্ষণ রূপে নির্ধারণ করতে পারি তাহলে সেটিকে কিন্তু বিজ্ঞান রূপে পরিগণিত করা যায়৩২। কিন্তু বিজ্ঞান আর্থে যদি সঠিক মাপন এবং প্রযুক্তি বা যন্ত্রপাতির ব্যবহার হয়, তাহলে এটি অতটা বিজ্ঞানরূপে পরিগণিত হবে না হয়ত। ব্রিটিশ শাসিত ভারতে পশ্চিমি চিকিতসাবিদ্যার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পর মোটামুটি বলা যায়, দেশিয় চিকিৎসাবিদ্যায় প্রাযুক্তিক বিকাশ প্রায় ঘটেইনি, যদিও পশ্চিমে উদ্ভাবন এবং আবিষ্কারগুলি চিকিৎসা ব্যবস্থায় বাস্তবে প্রযুক্ত এবং আত্তীকৃত হয়েছিল একমাত্র তার কর্মক্ষমতার পরিচয়টের পরেই। সিগরিস্টের দাবি চিকিৎসাবিদ্যার ইতিহাস কিন্তু চিকিৎসা এবং ইতিহাস এই দুই শাস্ত্রের যৌথ সম্মেলন, সেই কাজে ইতিহাসের দায় হল অনুক্রমিক চিকিৎসা সংঘ এবং চিকিতসন বিষয়ে আলোচনা এবং চিকিৎসার কাজ হল, অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রায়োগিক তাত্ত্বিক, ধারণা, ভাবনার এবং গবেষণালব্ধ তথ্যের বিবর্তনের পটভূমিকা রচনা৩৩।

মার্টন বিজ্ঞানকে সামাজিক সঙ্গঠনরূপে দাবি করেছেন যার চরিত্র মূল্যবোধ(ইথস) এবং কার্যকর বিশ্লেষণ (ফাংশানাল এনালাইসিস)ভিত্তিক। বিজ্ঞানের মূল্যবোধ হল বহু জটিল নৈতিক এবং প্রথার সমাহার, যা একজন বৈজ্ঞানিক মানুষকে বেঁধে রাখে৩৪। বিজ্ঞানের এই বিশ্লেষনী মতবাদটির মাধ্যমে মার্টন, বৃহত্তর সমাজে আলো ফেলতে যথেষ্ট সাহায্য করেছেন। অন্যদিকে বার্নেস বড়শিল্পনির্ভর সমাজে বিজ্ঞানের বিবর্তন বিষয়ে যা বলেছেন, সেটি যথেষ্ট প্রনিধানযোগ্য, দ্য প্রভিশন অব ফুললি ডিফারেন্সিয়েটেড সায়েন্টিফিক রোলস এজ কেরিয়ার্স, এন্ড প্রোলঙ্গড ফুল টাইম ট্রেনিং অন দেম, দেয়ার আইসোলেশনস এন্ড কন্সেন্ট্রেশন ইন্টু ল্যাবরেটরিজ, এন্ড দেয়ার ফরমাল ডিভিশন ইন্টু ডিসিপ্লিনস এন্ড স্পেশালিটিজ, ওয়্যার অল নাইন্টিন্থ-সেঞ্চুরি ইনোভেশনস, হুচ রিফ্লেক্টেড দ্য জেনারেল ট্রেন্ডস টুওয়ার্ডস প্রফেশনালাইজেশন এন্ড স্পেশালাইজেশনস, ক্যারেক্টারিস্টিক অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল সোসাইটি এজ আ হোল৩৫।

পশ্চিমে চিকিৎসাবিদ্যার বিকাশ আসলে বানেসের ধারনার বিজ্ঞানের সঙ্গে মিলে যায়।

চিকিৎসাবিদ্যা অন্যান্য শাস্ত্রের মত, সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে, গবেষণালব্ধ আবিষ্কার এবং নতুন গবেষণার পদ্ধতি আত্তীকৃত করেছে। এটা ঠিক যে খ্রীপূ ষষ্ঠ শতক পর্যন্ত ভারতীয় চিকিৎসাবিদ্যা ধর্মীয়তার আঙ্গিকেই আবদ্ধ ছিল এবং অসুখ ও তার নিদানকে অতিন্দ্রীয়র হাতে সঁপে দিয়েছিল। এই ঘটনার মধ্যে দিয়ে আমরা বিজ্ঞান এবং ধর্মের মধ্যে লক্ষ্মণরেখা টানতে পারি। ধর্মীয় চিকিতসার সঙ্গে জড়িত প্রথাগুলি অনেক বেশি জাগতিক এবং গবেষণামূলক উৎস নির্দেশ করে। তাই চিকিৎসাবিদ্যাকে বলা হল আয়ুর্বেদ, যা লিপিবদ্ধ হওয়ার অনেক আগে থেকেই বর্তমান ছিল। য়লি ভারতীয় চিকিৎসাবিদ্যার প্রাচীনত্ব সম্পর্কে বলছেন, এটি ভারতীয় বিজ্ঞানগুলির মধ্যে প্রাচীনতম এবং প্রমান করে দেওয়া যায় এই বিজ্ঞানেই প্রথম ভারতীয়রা বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠেছিল৩৬।

(চলবে)
 
(চলবে)