Wednesday, January 11, 2017

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা৬৪ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার

৪। তাণ্ডার দিকে মীর জুমলার অভিযান
সুজার আশেপাশের ঘিরে থাকা পরাজয়ের জালটিকে আরও ঘণ করে সুজার ওপরে ফেলার চেষ্টা করে চললেন মীর জুমলা। প্রথমে মহানন্দা এবং পরে দক্ষিণের দিকের পালানোর পথটিতেও পাহারা বসিয়ে দিলেন। স্থানীর জমিদারদেরে থেকে খবর পেলেন যে বালাঘাটের কাছে নিচের অববাহিকায় হাঁটু জল থাকতে পারে এবং শত্রুর রসদ এই পথেই যায়। সেখানে গিয়ে মালদার পথ কেটে দেওয়ার নির্দেশ দিলেও এই ঘটনা আঁচ করে সময় মত সুজার পুত্র বুলন্দ আখতার এবং সেনাপতি সৈয়দ আলম ডান পাড় পাহারা দেওয়ায়, সম্রাটের বাহিনীর সেই উদ্দেশ্য পূরণ হল না। মীর জুমলা সময় নিলেন। মালদায় সুজার বাহিনী তার সেখানকার বাহিনীর থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী বুঝে তিনি দিলির খানকে নির্দেশ দিলেন মালদার বাহিনীকে জোরদার করতে এবং তাকে তিনি মালদা-বালাঘাট এলাকার সমস্ত কাজের সেনানায়ক বানিয়ে দিলেন। ২৭ ফেব্রুয়ারি শিবির ছেড়ে দিলির দক্ষিণের দিকে এগোলেন, রাস্তায় শীতলঘাটে সুজার সেনাপতি মির্জা বেগের বাহিনী হারিয়ে, মহানন্দায় সৈয়দ আলম এবং বুলন্দ আখতারের তীরের উল্টো দিকে ঘাঁটি গাড়লেন।

বাঁদিকের পাড়ের একটি অংশের সেনার হারের খবর সুজার কানে পৌঁছল। তখন তিনি কালিন্দির দক্ষিণ তীরে দাউদ খানের সেনার উল্টো দিকে জান বেগ আর ইবন হুসেনের ছোট বাহিনী নিয়ে পাহারা দিচ্ছিলেন। পুত্র বুলন্দ আখতার আর খানইআলমকে মহানন্দার পূর্ব পাড়ের অংশটা জোর দিতে বলে সুজা সমধার উল্টো দিকে তার নিরাপত্তা জোরদার করলেন। তিনি জানেন এটি হাতছাড়া হওয়া মানেই তার বাহিনীর কচুকাটা হওয়া এবং তার সাম্রাজ্যের পতন।

ঈশপের গল্পের এক চক্ষু হরিণের মত তার সব কিছু সমধার পতনে নির্ধারিত হবে এই চিন্তায় সুজা বড় ভুলটি করে ফেললেন। সুজাকে ব্যস্ত রাখতে মীর জুমলা তার উল্টো দিকে কিছু সৈন্য দাঁড় করিয়ে রেখে মহানন্দার পূর্ব পাড়ের অংশটির প্রতি নজর দিলেন। হেঁটে নদী পার হওয়ার একটাই অসুবিধে ছিল তাকে ব্যক্তিগতভাবে সেই কাজটায় জড়িয়ে থাকতে হবে, না হলে সমস্যা দেখা দিতে পারে। উত্তরের যুদ্ধ ক্ষেত্রে দাউদ খানকে সমস্ত দায়িত্ব দিয়ে সমধায় সুজন সিংকে ১০০০ সেনা আর ৫০০০ বন্দুকবাজ দিয়ে দাঁড় করিয়ে রেখে, মীর জুমলা চরটি ছাড়লেন ২৯ ফেব্রুয়ারি। পরের দিন মহানন্দা পার করে মালদার দিকে এগোতে থাকলেন(২ মার্চ)। ৬ তারিখ তিনি মালদার দক্ষিণে মহানন্দার কাছে পৌঁছলেন। পরের দিন তিনি উল্টো দিকে বুলন্দ আখতার এবং সৈয়দ কুলি উজবেগের বাহিনীর দিকে তাক করে পরিখায় কামান খাড়া করা দিলির খানের সাজসজ্জা পরিদর্শন করতে গেলেন।

মীর জুমলা ঢাকা থেকে শত্রুর কাছে পাঠানো রসদের রাস্তায় বাধা তৈরি করার উদ্যম নিলেন। সে অঞ্চল থেকে ঢাকার পথে যাওয়া তিনটি স্থলপথ। দুটি - একটি বালাঘাট হয়ে একটি মালদা হয়ে – নিয়ন্ত্রণ করছে সাম্রাজ্যবাদীরা। তৃতীয় পথটি শেরপুর হাজারাহাটির রাস্তাটি পাহারা দিতে লোদি খানকে নির্দেশ দিলেন।

সুজা আর মীর জুমলার মধ্যেকার দ্বৈত লড়াই এখন সময়ের অপেক্ষা। মীর জুমলা বিপক্ষকে ভুলপথে চালিত করার কাজ আগেও সফলভাবে করেছেন, এবারেও সেই নীতি অনুসরণ করলেন। উত্তরে সুজার বাহিনীর নজর টিকিয়ে রাখার জন্য মীর জুমলা কালিন্দির মধ্যে দিয়ে বলপ্রয়োগ করে সুজার পরিখা ভেদ করে দাউদ খানকে একটা পথ তৈরি করতে নির্দেশ দিলেন। এক মাসের জন্য সমস্ত সুযোগ সুবিধে এবং বিলাসিতা ছেড়ে তিনি মহম্মদাবাদের পড়ে রইলেন যাতে সুজার সঙ্গে যুদ্ধটা তিনি বর্ষার আগেই সেরে ফেলতে পারেন। কিন্তু যতটা সহজে কাজটা হবে ভেবেছিলেন, সুজার বাহিনী, পরিখায় দৃঢভাবে দাঁড়ানো সেনা, গোলান্দাজি, নদী আর নদীতে নৌবহরের জন্য মীর জুমলার কাজটা ততটাই কঠিন হয়ে উঠল।

দিলির খানের বহু চেষ্টা, বহু খোঁজাখুঁজি, বহু পাহারা না দেওয়া, বহুদিন না হাঁটা নদী পথ দেখে দেখে যখন ক্লান্ত, তখন স্থানীয় এক রাজার চেষ্টায় নদীতে একটা পায়ে হাঁটা পেরোবার পথ পাওয়া গেল বালাঘাটের ৪ মাইল নিচে। মীর জুমলা সঙ্গে সঙ্গে এই একমাত্র পথটি যাতে হাত ছাড়া না হয়, অবিলম্বে তার ব্যবস্থা করতে নির্দেশ দিলেন। প্রাথমিক সব প্রস্তুতি নেওয়ার পর শিবির ছেড়ে মহানন্দার পাড়ে দাঁড়িয়ে ৫ এপ্রিল ভোর তিনটের সময় ১০-১২ হাজার পদাতিক নিয়ে বালাঘাট থেকে দিলির খানকে তুলে ভোরে নদী হাঁটতে নামলেন। সূর্য উঠতে অবাক হয়ে দেখলেন উল্টো দিকে একটা ছোট শত্রু শিবির কয়েকটি কামান তাদের দিকে তাক করে বসে রয়েছে।

এক মুহূর্ত দেরি না করে মীর জুমলা তার বাহিনীকে জলে নামতে নির্দেশ দিলেন। দিলির খান, ইখলাস, মুখলিস এবং মুজফফর সবার আগে নেমে তাদের হাতি জলে ভাসিয়ে দিলেন। তার পরে রিসালা জলে নামল। দুই তীরের দুই পাশে গভীর জল, কিছু সেনা তাড়াতাড়িতে আবার শত্রুর গোলান্দাজির ভয়ে নদীতে নেমে হাঁটা পথ হারিয়ে ফেলে ডুবে গেল, কিছু শত্রুর গোলান্দাজিতে মারা পড়ল - এই সবে বিন্দুমাত্র দমে না গিয়ে তার দূরের লক্ষ্যে মীর জুমলা অটল রইলেন। ১০০০ সেনা মারা গেল। ততক্ষণে সাম্রাজ্যের সেনা নদী পেরিয়ে বিপক্ষকে কচুকাটা করে ফেলেছে, কিছু তাদের সমস্ত রসদ ফেলে পালিয়ে গিয়েছে। মীর জুমলা দীর্ঘ লক্ষ্য পূরণে এই ক্ষতি খুব একটা গায়ে মাখলেন না। বহু পরে শাহজাদা বুলন্দ আখতার আর সৈয়দ আলমের বাহিনী এল, ততক্ষণে তাদের বিশাল বাহিনী স্থানীয়ভাবে নৌকো জোগাড় করে সেতু বানিয়ে নদী পার হয়েগিয়েছে।

সিংহাসন দখলের লড়াইতে এই পর্বের যুদ্ধটায় মীর জুমলা জেতার খেলা খেললেন। বুলন্দ আখতার তাণ্ডা ছেড়ে পালালেন, আর সৈয়দ আলম পালিয়ে দুপুরে চৌকি-মীরদদপুরে পৌঁছে সুজাকে এই দুঃসংবাদ দিলেন। দাউদের তীরের উল্টোদিকে দাঁড়ানো সুজার তিনপাশ তখন ঘিরে ফেলেছে মীর জুমলার বাহিনী। তার সামনে একটাই পথ নদী পথে দ্রুত পালিয়ে যাওয়া। মির্জা জান বেগের পরামর্শে তিনি রাতে চৌকি-মীরদাদপুর ছেড়ে ভোর চারটেয় তাণ্ডা পৌঁছলেন ৬ এপ্রিল। সন্ধ্যে ৪টেয় কয়েকটি যুদ্ধ নৌকোয় চড়ে তিনি ঢাকার দিকে রওনা হয়ে গেলেন।

৫। তাণ্ডা-তারতিপুর-ঢাকা
সুজা পালিয়ে যাওয়ার, মীর জুমলা যথেষ্ট সময় পেলেন কেন না হাঁটু জলে নেমে তার বিশাল বাহিনী সামলাতে, নদীতে পড়ে যাওয়া নানান রদস এবং অস্ত্রশস্ত্র তোলার জন্য মাছ ধরার জাল ফেলতেই বহু সময় কাটিয়ে দিয়েছেন, ফলে তাণ্ডার দিকে তাড়াতাড়ি রওনা হতে পারেন নি।

৬ এপ্রিল যখন সুজা টাণ্ডার দিকে তখনও মীর জুমলা ব্যস্ত। সকালে তিনি তাণ্ডার দিকে রওনা হলেন। রাস্তায় তিনি কিছুটা বাঁয়ে তারতিপুরে গিয়ে সুজার গঙ্গার ওপর দিয়ে পালানোর পথ বন্ধ করতে গিয়ে রসদে বোঝাই ৪০০টি নৌবহর পেলেন। সেখানে তিনি ৬০০ বন্দুকবাজ সহ নুরুল হাসান আর মীর আজিরকে ওয়াকিয়ানবিশ হিসেবে রেখে এলেন। মধ্য রাত্রে ৪০০ সেনা বাহিনী নিয়ে তিনি তাণ্ডায় পৌঁছলেন।

মীর জুমলার পৌছন যেন ঘোলা জলে তেল পড়ার মত হল। কিছু ক্ষণের লুঠ খুন আর তাণ্ডবের পর, ৭ এপ্রিল তিনি সব কিছু নতুন করে সাজিয়ে তোলার নির্দেশ দিলেন। সরকারি সমস্ত সম্পদ, সম্পত্তি আর সেনা যে সব জিনিস লুটেছিল সেগুলি উদ্ধারে মন দিলেন। সুজা যে সব মহিলা হারেমের মহিলা ছেড়ে গিয়েছিল সেটির নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করে আধিকারিক আর খোজাদের দায় দায়িত্ব পালন করতে বলা হল। এই সন্ধ্যায় দাউদ খান মীরদদপুর হয়ে তাণ্ডায় পৌঁছলেন।

মীর জুমলা তাণ্ডায় ১২ দিন ধরে থেকে সব কিছু নিয়মতান্ত্রিকভাবে শৃঙ্খলিত করলেন। জেতার এলাকায় প্রশাসন বসালেন। পলাতক শাহজাদার থেকে সম্পত্তি এবং ভাণ্ডার উদ্ধার করতে দক্ষিণ দিকে মীর জুমলা নদীর পাড়ে পাহারা বসালেন। তারা তারতিপুরে ধনরত্নভর্তি দুটি ঘুরাব দখল নিল। হাজারাহাটি আর শেরপুরে সুজার আধিকারিক সহ নৌবহরের ৩০টি নৌকো দখল নিল লোদি খান। তারা মীর জুমলার সামনে ৯ এপ্রিল আত্মসমর্পণ করল এবং সম্রাটের সেবায় কাজে লেগে গেল।

যুদ্ধের বিশদ বর্ণনা আর দিলির খানের গুণবত্তা বর্ণনা দিয়ে দিয়ে মীর জুমলা সম্রাটকে চিঠি লিখলেন এবং আশা করলেন, সুজা হয়ত ঢাকায় না গিয়ে আরাকানের দিকে পালিয়ে যাবে। এছাড়াও যুদ্ধের সরঞ্জামগুলি তিনি দরবারে পাঠাবেন কি না সেই প্রশ্নও করলেন। ২০ এপ্রিল চিঠি পেয়ে সম্রাট খুব খুশি হলেন। তিনি সেনানায়ককে পুরষ্কৃত করে বললেন যাতে প্রত্যেক সেনাকে যথাযোগ্য বেতন দেওয়া হয়। রসদগুলি দরবারে পাঠিয়ে ঢাকায় গিয়ে সুজাকে তাড়িয়ে দিতে নির্দেশ দিলেন।

১৯ এপ্রিল মীর জুমলা তাণ্ডা থেকে তারতিপুরের দিকে রওনা হয়ে গেলেন। ইসলাম খানের যায়গায় রাজমহলের ফৌজদার করে তিনি মুখলিস খানকে পাঠালেন। ইসলাম খানের সঙ্গে মীর জুমলার ঝগড়ার পর সম্রাটের অনুমতি না নিয়ে সে দরবারের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যায়।

২০ এপ্রিল ঢাকার উদ্দেশ্যে স্থলপথে বেরিয়ে তারতিপুর ছেড়ে মীর জুমলা হিজরাপুরে পৌঁছলেন। তার সঙ্গে ছিলেন দিলির খান, দাউদ খান, রশিদ খান, সৈয়দ নাসিরুদ্দিন খান, ফরহাদ খান, উইঘুর খান, কারাওয়াল খান, এবং আবদুল বারি আনসারি। ঢকা থেকে সুজাকে তাড়াতে তিনি দ্রুত ঢাকা চললেন। যেসব জমিদার সুজাকেকে ছেড়ে গিয়েছে তাদের শাস্তি দিতে সুজা এখন অপারগ, অথবা তার দিকে এগিয়ে আসা সেনাপতির সঙ্গেও লড়ায়ের সাধ্য না থাকায় তার পূর্ব দিকের রাজধানী ছেড়ে ৬ মে আরাকানের রাজার থেকে সাহায্যের আশায় ঢাকা ছেড়ে পালালেন। ঢাকার বাইরে মীর জুমলা পৌঁছলেন ৯ মে। সুজা যে সব যুদ্ধ রসদ ছেড়ে গিয়েছেন সেগুলি সম্রাটের উদ্দেশ্যে পাঠালেন। এখন সমগ্র হিন্দুস্তান সম্রাটের আধীনে হল।
(চলবে)

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা৬৩ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার

পরিখা কাটার কাজ চলতে থাকলে সমধায় মীর জুমলা, চৌকি-মীরদাদপুরে থাকা সুজার শিবিরের ওপর গোলান্দাজি চালান। পরিখা কাটা শেষ হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও পরস্পরের ওপর গোলান্দাজি সপ্তাহ কাল ধরে চলতে থাকল। তা সত্ত্বেও দেখা গেল শত্রুর এলাকা ছাড়ার লক্ষ্মণ দেখা যাচ্ছে না, গঙ্গার পূর্বপ্রান্তের এক শাখা নদীতে মীর জুমলা হাঁটু জল খোঁজার চেষ্টা চালিয়ে গেলেন। পরিখা নিরীক্ষণ করার সময় ডুবুরি দিয়ে গঙ্গার তল খোঁজারও কাজ ব্যক্তিগত উদ্যোগে চালালেন। কিন্তু নদীর তল পাওয়া গেল না।

হঠাতই মীর জুমলার চরেরা মহানন্দার উপরের উচ্চ অববাহিকায় গুণরাখা নামক একটি এলাকায় হাঁটু জলস্তর আবিষ্কারের খবর আনল। সাম্রাজ্যের একটি শিবিরের থেকে ৮ মাইল দূরে, অন্যটির থেকে ৪ মাইল। যাইহোক সামগ্রিক রণনীতিতে এই খবরটির গুরুত্ব অপরিসীম। এলাকাটি জঙ্গলে পরিপূর্ণ, সেই জঙ্গলে বাস করে জংলি কুয়ার গোষ্ঠী এবং সেই এলাকা হেঁটে পার হওয়া সম্ভব। ১৬৬০ সালের ৩১ জানুয়ারির রাতে ফারাদ খানের সঙ্গে কারাওয়াল আর বেলদার দিয়ে নদী পার হয়ে সেখানে পরিখা খোঁড়ার কাজ দিলেন যাতে শত্রু পক্ষ তাদের রাস্তা আটকাতে না পারে। পরের দিন ১ ফেব্রুয়ারি জুলফিকার, ফিদায়ি এবং লোদি খান যুদ্ধ করার ভান করলে মীর জুমলা, মুখলিস খানকে নিয়ে দিনের দেড় প্রহরে নৌকোর সেতু বানিয়ে গঙ্গার পূর্বপ্রান্ত পার হয়ে গেলেন।

এবারে মীর জুমলা হাঁটু জলের এলাকা পার হওয়ার জন্য এগোলেন দিলির, দাউদ, মীর্জা, আর রশিদ খানকে সঙ্গে নিয়ে। মীর জুমলার ব্যক্তিগত তত্ত্বাবধানে বেলদার, কারাওয়ালা, উজবেগ এবং নানান রসদ নিয়ে ৫০ গজ চওড়া মহানন্দা পার হলেন ৩ দিনে ১–৩ ফেব্রুয়ারি। ঘোড়াগুলি সাঁতরে পার হল। মীর জুমলার নির্দেশে ৩০টা ডোবানো নৌকো তোলা হল – কোনটা কামান বাহক কোনটাকে সেতু তৈরির কাজে লাগানো হবে। ফারহাদের তৈরি পরিখা, এবং গোলান্দাজি, পীর মহম্মদের লাজবাব কারাওয়ালদের দৌলতে শত্রুদের দূরে থাকা একটা বাহিনী তাদের নদী পার হতে দেখলেও কিছু করে উঠতে পারল না, বরং তাদের নেতা আমীর কুলি মারা গেল।

সৈয়দ তাজ আর মিশকির উল্টোদিকে থাকা দিলির আর দাউদের কাটা পরিখার দায়িত্ব আবদুল্লা খানসারাই, সৈয়দ সালার খান, মিয়ানা খান, জামাল দিলিজাককে দিয়ে, মীর জুমলা স্বয়ং সমধায় এলেন, এখানেই সেনাবাহিনীর বড় অংশটাই শিবির গেড়ে ছিল, যাতে শত্রু নদী পেরোতে না পারে।

মীর জুমলার চালে মাত হয়ে যাওয়া সুজার দুই সেনাপতি সৈয়দ তাজ এবং মিশকি আতঙ্কিত হয়ে ৩ ফেব্রুয়ারি সুজার শিবিরে ফিরে গেল। সুজা শত্রুপক্ষের সহজে মহানন্দা নদী পার হওয়া, চরেদের হাতে ৩ জন সুজাপন্থী সেনা ধরাপড়ার ঘটনায় মর্মাহত হলেন। অথচ তার পক্ষে কোন পদক্ষেপ করা বা মুখোমুখি সংঘর্ষে যাওয়া সমুচিত বোধ হল না। হতাশ হয়ে পড়া সুজার মনোবল চাঙ্গা হয়ে উঠল ঢাকা থেকে সৈয়দ আলম জাইনুদ্দিন আর ১৫০০ রিসালা আর ২০০ কামান পৌঁছনোয়। বর্ষা পর্যন্ত জলে চোবানো দুর্গটি রক্ষা করার পরিকল্পনা করে তিনি সমধার উল্টো দিকের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে নির্দেশ দিলেন।

৫ ফেব্রুয়ারি দিলির আর দাউদ ছেড়ে যাওয়া পরিখার কাছে এলেন। চিরাগের নেতৃত্বে দিলিরের রোজবিহানী বাহিনী গোলান্দাজির জন্য সেতুটি আবিষ্কার করতে ব্যর্থ হলেও তারা উল্টো দিকে কিছু নৌকো দেখতে পেল। দিলির এবং দাউদের ২ মাইল দূরের মহানন্দার নালা হেঁটে পার হওয়ার কাজ দেখতে এবং তত্ত্বাবধান করতে মীর জুমলা গঙ্গা এবং মহানন্দার পূর্বপ্রান্ততম শাখাটি পার হলেন সেতু তৈরি করে ৭ ফেব্রুয়ারি। পরের দিন তিনি সৈয়দ সালার খান, মিয়ানা খান, জামাল দিলজাকের নেতৃত্বে ১০০০ ঘোড়সওয়ার, বহু পদাতিক এবং কামান মালদার দিকে পাঠালেন পূর্ব দিক থেকে সুজাকে ঘিরে ফেলতে এবং তার পূর্ব দিক হয়ে পালাবার পথ আটগকে দিতে। ইতিমধ্যে সুজার দক্ষিণ, পশ্চিম এবং উত্তরপ্রান্ত হয়ে পালানোর পথ যথাক্রমে রাজমহল থেকে সুতি এবং সমধা থেকে মহানন্দা পর্যন্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে পাহারা বসিয়ে। সুজা এখন সর্বনাশের মুখে দাঁড়িয়ে। সুজার বাহিনী মালদা ছেড়ে গেল। মীর জুমলার নির্দেশে দাউদ খান, আমীর খান, রসিদ খান এবং তাদের সবকটি বাহিনী গঙ্গা এবং মহানন্দার মধ্যে পরিখা কাটতে শুরু করল।

৩। শাহজাদা মহম্মদ সুলতান ফিরে এলেন
সুজার বিপদ চরমে দেখে শাহজাদা মহম্মদ সুলতান তার শ্বশুরকে ফেলে সম্রাটের শিবিরে ফেরত এলেন। আলমগীরনামা বলছে তার ধারণা হয়েছিল সুজা এখন হারা যুদ্ধ লড়ছে, হারার শিবিরের অংশিদার তিনি হতে চান না। তার ভুল বুঝতে পেরে শাহজাদা তাণ্ডায় তার অসুস্থ স্ত্রীকে দেখতে যাবার ছলে রাজমহলের সাম্রাজ্য শাসক ইসলাম খানকে খবর পাঠিয়ে বললেন দেওগাছি থেকে আসা তার বাহিনীর জন্য অপেক্ষা করতে। কিন্তু আসল কারণ ছিল অন্য। এর আগে বলা গিয়েছে সুজা যখন পশ্চিম প্রান্ত ছেড়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন তখন তিনি শাহজাদাকে আগে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। এবং পূর্বপাড়েও যখন নিজের সুরক্ষায় সুজা লড়ছেন, তখনও কিন্তু আমরা শাহজাদার দেখা পাইনি। সুজার পক্ষে শাহজাদাকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া তার চরিত্রের সঙ্গে খাপ খায় না, কেননা তিনি সুজাকে অনেক সেবা করেছেন, তার বহু আভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এটা বলা যায় যে সুজার মনে শাহজাদার বিষয়ে কিছু না কিছু সংশয় তৈরি হয়েছিল। এই সিদ্ধান্তে আমরা আসতে পারি আলমগীরনামা এবং সেই সময়ের ইওরোপিয় ভ্রমণকারীদের রচনা সূত্রে।

এই ঘটনার নেপথ্যে কিছুটা মীর জুমলার কূটনৈতিক চাতুর্য রয়েছে। এই চাতুর্যের ঘটনা মনে পড়িয়ে দেয় শাহজাদা আকবরের বিদ্রোহকে যেভাবে আওরঙ্গজেব সামলেছিলেন। আওরঙ্গজেবের পরামর্শে শাহজাদার উদ্দেশ্যে মীর জুমলা একটি চিঠি লেখেন যার সারতসার হল, তিনি চান শাহজাদা সুজার কাছে থাকুন যাতে তিনি সম্রাটের স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রাখতে পারেন এবং তিনি তার পিতাকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, সেই প্রতিশ্রুতি যতদিন না তিনি পূর্ণ করতে পারছেন, ততদিন যেন তিনি সুজার শিবিরেই অবস্থান করেন। উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে চিঠিটি সুজার হাতে পড়ল, স্বভাবতই সুজা সন্দেহ করতে শুরু করলেন শাহজাদার কাজকর্ম। শাহজাদা শ্বশুরকে জানালেন এই ঘটনায় তার কোন হাত নেই। এটা জাল, এবং এটা উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে সুজার সঙ্গে বিরোধ ঘটাতে লেখা হয়েছে। যদিও আলমগীরনামায় এই ঘটনার সঙ্গে মীর জুমলা বা আওরঙ্গজেবের জড়িত থাকার কোন সূত্র দেওয়া হয় নি; পরের লেখকেরা কিন্তু এই ঘটনায় মীর জুমলারই অদৃশ্য হাত দেখতে পেয়েছেন। ঈশ্বরদাস লিখছেন, তিনি তাবির এবং তাজবীর অনুসরণ করে খেলাটা খেলে দিলেন এবং শাহজাদাকে তার শিবিরে ফিরে আসতেই হল। সুজার সন্দেহ জাগার সঙ্গে সঙ্গে তার জামাইও ভাবলেন এই সুযোগে শিবির বদল করা যাবে। তিনি আর হেরো দলের সঙ্গে থাকতে চান না। তিনি যতদিন সুজার সঙ্গে চৌকি-মীরদাদপুরে ছিলেন ততদিন তার পক্ষে কোন পদক্ষেপ করা সম্ভব ছিল না। কিন্তু যখন তিনি তাণ্ডায় গেলেন – আলমগীরনামার কবিতা সূত্র বলছে সুজার নির্দেশে তাঁর অসুস্থ স্ত্রীকে দেখতে, সেই সময় তিনি দেওগাছি থেকে গোপনে ইসলাম খানের সঙ্গে চিঠি আদানপ্রদান করতে শুরু করলেন। ঢাকা থেকে সুজার পুত্র দীন মহম্মদের নির্দেশে খানইআলমের নেতৃত্বে নতুন বাহিনী এসে পৌঁছনয় শাহজাদার ব্যক্তিত্বে আঘাত লাগল। তার মনে হল তাকে বাদ দিয়েই সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে যাচ্ছে, এবং এটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার মুঘল ঐতিহ্যের পরিপন্থী বলে তার মনে হল। ঠিক যে রকম করে তিনি তার পিতা আর তার পিতার সেনানয়কএর ওপর রাগ করে একদিন শ্বশুরের শিবিরে যোগ দিয়েছিলেন ঠিক সেই রকম সিদ্ধান্ত হঠাতই সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি আমার তার পূর্বের ছেড়ে আসা শিবিরে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন। ৮ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় শাহজাদা তাণ্ডা ছাড়লেন দেওগাছি যাবার উদ্দেশ্যে। সেখানে তাকে স্বাগত জানাতে অপেক্ষা করছিলেন সেনানী ইসলাম খান, সঙ্গে ১৮টি ইরাণী সোনার কিংখাব (জরবাফত), মৃগনাভি, ৩৬টা সিন্দুকে সোনা, হিরে এবং একটা নীলকান্ত মণি। সুজা শাহজাদার এই কাজে গভীরভাবে দুঃখ পেলেন। তার মনে হল, তার হাত থেকে গ্রেফতারি এড়াতে শাহজাদা পালিয়ে গেলেন। তিনি বুঝতে পারলেন যে ভাগ্যের চাকা তাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, সুজা বললেন, আমার চোখের জল আমার ভাগ্য... যাকে আমি তৈরি করলাম, সেই আমার শত্রু হল।

সেই মাঝইরাতেই প্রথম সংবাদবাহক মীর জুমলাকে এই সংবাদটা দিল। মীর জুমলা মহানন্দার পূর্বপাড় থেকে সমধায় ফিরে এলেন ১২ ফেব্রুয়ারি শাহজাদাকে স্বাগত জানাতে। তাঁকে সম্মান জানিয়ে নিজে তার ঘোড়া থেকে নামলেন এবং ভেরি বেজে উঠল। তার জন্য সরকারি খাজাঞ্চিখানা থেকে প্রয়োজনীয় রসদ জোগাড় করাছিল, এ ছাড়াও তাকে দেওয়া হল ৪০ পেটি সোনা, নীলকান্ত মণি, জহরত, ৮টি ইরাণের সোনার কিংখাব, মৃগনাভি, রাম(?) এবং য়ুনান(?), ইজিপ্ট এবং সিরিয়া থেকে জোগাড় করা সোনার জিন সহ ৪০টা আরবি ঘোড়া, আর হাতি। এই আড়ম্বরীয় সম্মান দেখানোর পিছনে উদ্দেশ্য একটাই, শাহজাদাকে তার মার্জনাহীন পিতার হাতে তুলে দেওয়া। ইসলাম খানের পরামর্শে শাহজাদা মীর জুমলার আশ্রয়ে এসেছেন, যতক্ষণনা সম্রাটের থেকে কোন প্রতিক্রিয়া আসছে, তার পক্ষে সরাসরি সম্রাটের কাছ এই জটিল মামলা শাহজাদার পক্ষ নিয়ে পাঠানো খুব কঠিন হবে। মীর জুমলার চেষ্টায় পুত্রের ফেরত আসায় সম্রাট স্বস্তি প্রকাশ করলেন কিন্তু তার প্রধান সেনানীকে নির্দেশ দিলেন তাকে চোখে চোখে রাখতে। তবুও মীর জুমলা শাহজাদাকে চিন্তা না করতে বলে বললেন তার পিতা বরাবরের মত ক্ষমাশীল। ২৯ ফেব্রুয়ারি তিনি ফিদায়ি খানকে দিয়ে শাহজাদাকে দরবারের উদ্দেশ্যে পাঠালেন।
(চলবে)

দুই-বাংলাতেই ফিল্মশিল্পে স্ক্রিপ্ট রাইটারের অভাব

Saikat Bhattacharyya লিখেছেন দুই-বাংলাতেই ফিল্মশিল্পে স্ক্রিপ্ট রাইটারের অভাব, অথচ ধুনচুন কবি-সাহিত্যিকে ভর্তি।
আমাদের ভাবনা-
ব্রিটিশ আমলের আগে গেলেই শস্তা সহজলভ্য জীবনীমূলক পৌরাণিক সিনেমা সামাজিক সিনেমার মোড়কে। অথচ মীর জুমলা অনুবাদ করতে গিয়ে দেখছি, দিল্লির সিংহাসন দখলের লড়ায়ে সুজা আর মীর জুমলার মধ্যে বাংলায় যে যুদ্ধ হয়েছিল, তার নাটকীয়তা অসাধারণ, ৭০০+ নৌকো নিয়ে যুদ্ধ করছেন সুজা, নৌকো দিয়ে সেতু বানিয়ে বিশাল বিশাল কামান যার গোলার ভার ১০ থেকে ১৫ সের, পার করা হচ্ছে, পার হচ্ছে বিপুলাকায় হাতি, ঘোড়া। বাঙলার নদীমাতৃকতার চরিত্র দিয়ে যুদ্ধের রঙ্গটাই পালটে দিচ্ছেন সুজা নৌকো নিয়ে যুদ্ধ করে, হাওর, বিল, নালা ভর্তি বাংলায় নাকানি চোবানি খাচ্ছেন দৌর্দণ্ডপ্রতাপ সেনানায়ক মীর জুমলা। শেষ পর্যন্ত সুয়জা হারেন, কিন্তু যে রণনীতি তৈরি করে যান তা আজও আশ্চর্যের।
বা শশাঙ্কের জীবন বা গোপালের সময় বা রামপাল আমলে কৈবর্ত ভীম হরি আর দিব্যোকের লড়াই যার স্মৃতিতে দিনাজপুরে হরিরামপুর(হরি+রামপাল, হরি ভীমের পক্ষ ছেড়ে রামপালের পক্ষ নেয়, কৈবর্তরা হেরে যায়। আজও পূর্ববঙ্গে ভীমের জাঙ্গাল নামক হাঁটা পথ রয়েছে) আজও আছে। দিনাজপুর, মালদা, মুর্শিদাবাদ এ বাবদে স্মৃতির খণি।
বা সুলতানি আমলে যদু তার রাজত্ব বাঁচাতে মিং রাজের সাহায্য চায়, এবং জৌপুরের সেনা আক্রমন রুখতে ১০০০- চিনা সেনা আসে গৌড়ে, যে গৌড় শহরেই ৩টা টাঁকশাল চলত দিন রাত।
কি বর্ণময় ছিল সে সময়ের বাঙলা, সারা বিশ্বের মানুষ আসত এখানে ব্যবসা করতে।
এ সব নিয়ে ভাবার সময় নেই।
প্রখ্যাতরা সমাজপরিবর্তনের মৌতাতিয় ইওরোপিয় পিঠচাপড়ানির সিনেমায় বুঁদ।
বাঙলার কথা কেভাবে!

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা৬২ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার
পঞ্চম পর্ব

১। গঙ্গা পারের উদ্যম
পশ্চিম পাড় থেকে সুজার পালানো এবং মীর জুমলার রাজমহলের দখল করায় দিল্লির সিংহাসন দখলের লড়ায়ের বাঙলার পর্ব শেষ পর্যায়ে পৌঁছল। পশ্চিম পাড় শত্রু কবল মুক্ত করলেই গঙ্গা পার হওয়ার সম্রাটের নির্দেশ পালন করতে মীর জুমলা বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট করলেন না। গঙ্গার ডান দিকের তীরটি শত্রুর হঠাত আক্রমণের থেকে বাঁচাতে তিনি উদ্যোগ নিলেন। ১০ জানুয়ারি দোগাছির আভিজাতদের সঙ্গে তিনি পরামর্শ সভা ডাকলেন। এছাড়াও বহুদিন ধরে শত্রুর আক্রমনে বন্ধ থাকা নদীর ধারের রাঙ্গামাটি থেকে তেলিয়াগড়ি হয়ে মুঙ্গের পর্যন্ত রাস্তা খুলে রাখার জন্য তিনি মহম্মদ মুরাদ বেগের অধীনে ৩০০০ পদাতিক এবং গোলান্দাজ বাহিনী নিযুক্ত করলেন। ১১ তারিখে রাজমহলে দাউদ খানের নৌকোয় গঙ্গা পেরোবার জন্য এগোলেন। রাস্তায় তিনি জানতে পারলেন সম্রাটের নির্দেশে দিলির খান(সঙ্গে ২৫০০ আফগান নিয়ে) আকবরপুরে থাকা দাউদ খানের মার্ফত মীর জুমলার নির্দেশ অনুযায়ী ৯ জানুয়ারি কদমতলা ফেরিতে গঙ্গা পেরিয়েছেন। রাজমহলের প্রশাসনের ভার দেওয়া হল ইসলাম খানকে। তাকে সাহায্যের জন্য কয়েকজন দক্ষ আধিকারিক নিয়োগ করা হল। আর দেওয়া হল ১০০০০ ঘোড়া। একজন করে ফৌজদার এবং কোতোয়ালও নিযুক্ত হল। নদীর পাড় জুড়ে পরিখা খোঁড়া হল এবং শত্রু যাতে অচকিতে আক্রমন না করতে পারে তার জন্য নিয়মিত খবর রাখার চেষ্টা হল। কর্মী এবং আধিকারিকদের চাকলা এবং পরগণায় পাঠানো হল। রাজমহলের থানেদার নিযুক্ত হল রসুল বেগ রোজবিহানী। দোগাছি এবং সুতির মধ্যে অনেকিগুলি থানা তৈরি হল। ৫০০০ সেনা নিয়ে ইসলাম খান দোগাছি পাহারায় রইলেন। দুনাপুরের দায়িত্ব দেওয়া হল আলি কুলি খানকে। রাঙ্গামাটি হয়ে রাজমহল এবং তেলয়াগড়ির মধ্যের বড় জাঙ্গালের নিরাপত্তা দায়িত্ব পেলেন রাজা কোকালত উজ্জয়নিয়া তেলয়াগড়ি এবং মুঙ্গের এলাকা রক্ষার দায়িত্ব পেলেন রাজা বাহারোজ।

খুব তাড়াতাড়ি এই ব্যবস্থাপনা করে মীর জুমলা, জুলফিকার খান, রাজা বাহারোজ, রাজা কোকলত এবং অন্যান্য অভিজাত নিয়ে ১১ জানুয়ারি রাজমহলের উত্তরাঞ্চল, পীরপাহাড়ে শিবির ফেললেন। পরে তিনি কদমতলা(বা দোধা)য় শিবির স্থাপন করেন। মীর জুমলা তার অভিযানের খরচ হিসেবে সৈয়দ নাসিরুদ্দিন খানকে পাঠিয়ে মুঙ্গের থেকে ১৭ লক্ষ টাকা আনানোর দায়িত্ব দিলেন। ১৬৬০ সালের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি তিনি সমধায় ফিরে আসেন সাড়ে চৌদ্দ লক্ষ টাকা নিয়ে।

সুজার সমধা, চৌকি-মীরদাদপুর, তাণ্ডা এবং মালদায় শিবির ভাঙ্গার কাজের দিকে এবারে নজর দিলেন মীর জুমলা – এই পরিকল্পনাটি রূপায়ণ করতে তার লেগেছিল মোট আট মাস।

২। সমধায় মীর জুমলা
১৩ জানুয়ারি দাউদের পুত্র শেখ হামিদ ১৬০টি নৌকোর বহর দোধায়(কদমতলা) নিয়ে এল। এখানে গঙ্গা তিন ভাগে বিভক্ত হয়েছে। একটি ছোট ধারায় নৌকো সেতু বেয়ে মীর জুমলা পার হলেন ১৫ জানুয়ারি। এবারে সেই নৌকোগুলি রাজমহলের উল্টো দিকের বড় দুটি নদীতে নিয়ে এসে স্থাপন করা হল এমনভাবে যাতে বিপুল পরিমান সেনা ও রসদ নদী পার হয়ে চরে পৌঁছতে পারে। ১৭ জানুয়ারি মীর জুমলা নিজে চরে পৌঁছলেন দ্বিতীয় বড় নদীটি পেরিয়ে।

মীর জুমলার দ্রুত পদচারণ সুজার পরিকল্পনা নষ্ট করে দিল। তিনি প্রস্তাব দিলেন মহম্মদ সুলতানকে কামান এবং নৌকো দিয়ে মহানন্দায় দিলির এবং দাউদ খানের অভিযানে বাধা দান করতে। তিনি নিজের সব নৌকো ডাক দিলেন, শাহজাদার কাছে যেগুলি ছিল সেগুলিও চেয়ে পাঠালেন এবং চরেদের নিয়োগ করলেন সমধার নাবিকদের অপহরণ করতে।

সুজার এই পদক্ষেপ রুখতে মীর জুমলাও পরিকল্পনা ছকতে শুরু করেছেন। যথা শীঘ্র সম্ভব তৃতীয় নদীতে নৌকোর সেতু তৈরি করার উদ্যম নিলেন। সুজার চরেদের আটকানোর ব্যবস্থা করলেন। স্থানীয় মাঝিরা যাতে সুজার পক্ষে যোগ দিতে না পারে তার জন্য তিনি ১০০০ বাহিনীর একটি থানা তৈরি করলেন সমধায়। সমধায় যে দিন মীর জুমলা উপস্থিত, সেই দিন দুপুরেই আকবরপুর(নদীর উলতো দিক থেকে) থেকে দিলির দাউদ এবং রশিদকে ডাকিয়ে এনে বৈঠক হল।

মীর জুমলার সমস্যা যে শুধু সুজার থেকে কম নৌকো তাই নয়, তার বিশাল বাহিনীও এই হাওর, প্রচুর নালা, বিশাল জঙ্গুলে এলাকায় বোঝা হয়ে দাঁড়াল কেননা তারা যে খুব তাড়াতাড়ি চলতে পারছেনা সেটা তার কাছে পরিষ্কার। তিনি মন্তব্য করলেন, এই এলাকা খুবই খারাপ, এরা প্রত্যেক বাঁকে যেন একটা করে নালা গুঁজে রেখেছে।

খোলা মাঠে সাম্রাজ্যের বাহিনীকে তাদের বহরের জোরে পারবেন না বুঝে সুজা তাদের প্রতিরোধের রাস্তা নিলেন মহানন্দা এবং কালিন্দী ধরেই। মীর জুমলার সরাসরি তাণ্ডায় যাওয়া আটকাতে মহানন্দার শাখা কালিন্দিতে তিনি দুই সারি পরিখা খনন করলেন এবং সেটির দায়িত্ব দিলেন সৈয়দ তাজ এবং মিশকিকে। সমধার উল্টো দিকে চৌকি-মীরদাদপুরের ঘাটে মহম্মদ সুলতানের সঙ্গে সুজা স্বয়ং রইলেন।

মীর জুমলাকে হুঁশিয়ার আর সাবধান হয়েই পদক্ষেপ করতে হবে। শত্রুপক্ষ সমধার মাত্র চার মাইল দূরে কালিন্দিতে ভারি কামান সাজিয়ে রেখেছে, ফলে তিনি তক্ষুণি সেখান ছেড়ে আরও পূর্বের দিকে এগোনো সমীচীন বোধ করলেন না। এটি ছেড়ে যাওয়ার অর্থই হল সমধার পতন এবং রাজমহলকে সরাসরি শত্রুর আক্রমনের নিশানায় নিয়ে আসা। তিনি যদিও তৃতীয় ধারাটি তাড়াতাড়ি পেরোতে চাইছিলেন, আগামী কয়েকদিন, অন্তত ২৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি তার সদরটি সমধায় রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

এ ছাড়াও মীর জুমলার পক্ষে সুজাদের কাটা পরিখা এবং সৈয়দ তাজ এবং মিশকির তৈরি করা নিরাপত্তা ভেদ করা আত্মহত্যার সামিল হবে। প্রথমে তিনি কালিন্দি আর মহানন্দার মোহলায় কালিন্দি পার হওয়ার চেষ্টা করবেন এবং তার পরে অভিজ্ঞ দাউদ এবং দিলিরের পরামর্শ অনুযায়ী মহানন্দা পার হওয়ার চেষ্টা চালাবেন। কিন্তু তার কাজ থেকে শত্রুপক্ষের দৃষ্টি ঘোরাতে তিনি দুজন খানকে নির্দেশ দিলেন শত্রুর মুখোমুখি কোথাও একটা দেখিয়ে দেখিয়ে পরিখা কাটার অভিনয় করবেন।
(চলবে)

Tuesday, January 10, 2017

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা৬১ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার

৫। পূর্ব পাড় থেকে সুজাকে তাড়িয়ে দিলেন মীর জুমলা
পালাতে থাকা সুজাপন্থী সেনানায়ক খ্বোয়াজা মিশকি শত্রুপক্ষের হাত থেকে সমধের বড় চর রক্ষার জন্য ঘাঁটি গেড়ে বসলেন। চারদিকে জলে ঘিরে থাকা এই চরটি মোটেই সুরক্ষিত নয়। অথচ এই চরটি সুজার বিরুদ্ধে আসা আক্রমণকারীদের আক্রমণ রোখার শেষতম স্থল। এটি হারানোর অর্থই হল তাণ্ডার উদ্দেশ্যে দাউদের অভিযানের রাস্তা খুলে দেওয়া এবং সেখানে রাখা সম্পদ এবং সুজার পরিবারের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা। উদ্বিগ্ন হয়ে সুজা যুদ্ধ সমিতির বৈঠক ডাকলেন। মিশকির হাত শক্ত করতে চরে বাহিনী পাঠানোর অর্থ বর্তমান যুদ্ধ এলাকায় যুদ্ধদক্ষ সেনা হারানো এবং মীর জুমলার হাতে নিশ্চিত পরাজয় বরণ। তাই সেই মুহূর্তে মীর জুমলার প্রতি সরাসরি আক্রমন না করে ঠিক হল সৈন্য নিয়ে সুজা মালদার উদ্দেশ্যে রওনা হবেন, সমধের সুরক্ষা নিশ্চিত করে দাউদের অভিযান রুখবেন। দীর্ঘকালীন দৃষ্টিতে আন্দাজ করা হল, বর্ষা কালে পূর্ব পাড়ের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে না এবং বর্ষার শেষের আগেই তিনি ফিরে এসে আবার সম্রাটের বাহিনীর মহড়া নিতে পারবেন। শাহজাদার পরামর্শে তার অবর্তমানে সুজা তার বাহিনীর পিছনের অংশটা হাতির বাহিনীর দ্বারা সুরক্ষিত করার পরিকল্পনা করলেন এই হুঁশিয়ারি দিয়েই, যারা পালাবার কথা ভাববে তাদের পরিবারকে মেরে ফেলা হবে এবং পারিবারিক সম্পত্তি কেড়ে নেওয়া হবে। শত্রু যদি এগিয়ে আসে তাহলে কামান দিয়ে তাদের আগ্রগমণ রোধ করা হবে। ২৬ ডিসেম্বরের নসিপুরে গিয়ে সুজা ভাগীরথী পার হলেন তাণ্ডার পথে যেতে সুতি পার হলেন।

কারাওয়াল(চর)দের থেকেই সুজার পশ্চাদপসরণের খবর পেয়ে মীর জুমলা প্রতিআক্রমনে গেলেন। গিরিয়ার অভিজ্ঞতায় তিনি প্রত্যেককে হুঁশিয়ারি দিলেন, যারা ভয়ে পিছনে থেকে যাবে তাদের জন্য কফিনের দরজা খোলা রইল। ২৭ ডিসেম্বর সকাল ৯টায় তিন মাইল এগিয়ে তিনি বাঙলার সুবাদারকে দেখলেন একটি কাদাওয়ালা জমিতে নালার পিছনে দাঁড়িয়ে তার দুপাশে কামান সাজিয়ে রেখেছেন। এই ধরণের হাওর এলাকায় মীর জুমলার অগ্রগমণ সম্ভব ছিল না। সন্ধ্যে পর্যন্ত আক্রমনের পরিকল্পনা মুলতুবি রেখে আর এগোলেন না, শিবিরে ফিরে এলেন। সম্রাটের রসদের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। ২৮ ডিসেম্বর সুজা পালালেন। সকালে সেনাপতিরা দক্ষভাবে নালাটা আর হাওর পেরিয়ে গিয়ে সুজার পিছু নিলেন। চরেরা খবর আনল সুজা তরতিপুরে ফেরি পার হবেন। দুমাইল এগোনোর খবর পেলেন, (এটি ভুল তথ্য) সুজা সুতির দিকে যাচ্ছেন। ইখলাস খান এটি জাচাই করে দেখার পর মীর জুমলা নিজে পলাতক শাহজাদার পিছন ধরলেন। পাঁচ মাইল গিয়ে তিনি ফতেপুরে বিশ্রাম নিলেন। মহম্মদ মুরাদ বেগের কামান বাহিনী রাতে এল। পরের দিন সকালে সুতি পেরিয়ে আধ মাইল গিয়ে চিলমারিতে সুজার মুখোমুখি হলেন মীর জুমলা।

সন্ধ্যে পর্যন্ত গোলান্দাজি করলেন সুজা। সম্রাটের বাহিনীর উদ্দেশ্যে আবদুল মজিদ ডেকানি, পীর মহম্মদ উইঘুর এবং অন্যান্যদের নেতৃত্বে ১০০ জনের একটি ডাকাবুকো বাহিনী তরোয়াল হাতে সুজার বাহিনীর ডানদিকের দেওয়াল ভেদ করে ঢুকে গেল। রাত একটা নাগাদ যুদ্ধ শেষ হল। সুজার পক্ষে আর জেতা নয় বুঝে নুরুল হাসান মীর জুমলার বাহিনীতে যোগ দেন। সুজা বুঝলেন যে তার পক্ষে আক্রমন আর গোলান্দাজি সমানতালে শানানো সম্ভব নয়। মীর জুমলার চেষ্টা হল সেখান থেকে সুজা যাতে নদী পার না হতে পারেন সেটা লক্ষ্য রাখা।
রোজ হাতাহাতির অসংখ্য ঘটনা ঘটতে লাগল। সেখানে নদী পার হওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করে সুজা ১ জানুয়ারি ১৬৬০ সালের রাতে উত্তরে দুনাপুরের(দানাপুর?) দিকে পালানোর পরিকল্পনা করলেন। প্রচুর নালা পেরিয়ে নালার ওপর তৈরি সেতু ভেঙ্গে দুনাপুর থেকে দোগাছিতে পালালেন বিপক্ষের দেরি করিয়ে দেওয়ার রণনীতি নিয়ে। মীর জুমলা তার পিছনে পড়ে রইলেন কিন্তু হাওর, নালা আর ভাঙা সেতু তার অগ্রগতি রোধ করছিল। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় দুনাপুরে মীর জুমলা বাহিনী আর গোলান্দাজি বাহিনীকে নালা পেরোতে হয় সেটি কাদা দিয়ে বুজিয়ে এবং খুব ধীরে ধীরে সেই পথে কামানগুলি পার করা হয় সেতু তৈরি করে। এখানে সুজার ছেড়ে যাওয়া কিছু নৌকো, গোলাবারুদ, ১০টি কামান ২০০টি হাউই উদ্ধার করলেন।

দেওগাছিতে মীর জুমলা আত্মরক্ষায় পরিখা কাটলেন। সুজা এর আগে যে সফল যুদ্ধ নীতি নিয়েছিলেন সেটি এবারেও অনুসরণ করার চেষ্টা করতে চাইলেন – দেওগাছি আর গিরিয়ার উল্টোদিকের চর দখল করা। তার বাহিনীকে অযথা গোলা বারুদ নষ্ট না করতে লুকিয়ে থাকতে নির্দেশ দিলেন তিনি, যদি শত্রুরা আক্রমণ করে তাহলেই জবাব দিতে। বিপক্ষের বিচক্ষণ সেনাপতি এই ধরণের চালাকিতে পা দিলেন না, কেননা এই খবরটি তিনি আগেই কারাওয়ালাদের থেকেই পেয়েগিয়েছিলেন। যেহেতু গোলান্দাজিতে তিনি সুজার তুলনায় পিছিয়ে রয়েছেন, সেহেতু সঠিক নজর না করে তিনিও জবাব দিতে উতসুক হলেন না। ফতে জং এবং ইসলাম খান খোঁজ খবর না নিয়ে পথপ্রদর্শকদের নিয়ে দেওগাছির নালার কাছে চলে যায়। সুজার বাহিনী হঠাতই গোলা বর্ষণ শুরু করাতে তারা আর এগোতে পারেন না।

ফিদায়ি খান এবং জুলফিকারকে সঙ্গে নিয়ে মীর জুমলা চাপ দিতে শুরু করলেন এবং চেষ্টা করলেন যদি সুযোগ আসে তো তিনি নালাটা পার হয়ে শুধুই সংখ্যাধিক্যে বিপক্ষের ওপর আক্রমন করার চেষ্টা করবেন এবং পালাবার সমস্ত পথ বন্ধ করে দেবেন। কিন্তু বিপক্ষের গোলান্দাজিতে এই আগ্রগমণ সম্ভব হয় না। তার হাল্কা কামান নিয়ে মীর জুমলা ভারি গোলান্দাজির বিরুদ্ধে দিনের শেষ থেকে মাঝ রাত পর্যন্ত লড়ার যথাযাধ্য চেষ্টা করতে থাকেন কিন্তু প্রচুর ক্ষতি হয়। এতদ সত্ত্বেও মীর জুমলা আক্রমণের ঝাঁঝ বজায় রাখেন শত্রুকে নিশ্বাস নেওয়ার সুযোগ করে দেন না, এবং কোন সুযোগ এলে সেটাও তিনি ছেড়ে দেন নি।

প্রতিদ্বন্দ্বীর গুরুতর আক্রমণের বিরুদ্ধে মীর জুমলার জোরদার প্রতিরোধ সুজাকে এতই হতোদ্যম করে দেয় যে, সে দাঁতে নখ কাটতে শুরু করে।
মীর জুমলার পক্ষে ভারি কামান এসে গেলে সেগুলিকে শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে যথাযোগ্যভাবে কাজে লাগাবার উদ্যম নেন তিনি এবং সেগুলি সুজার বাহিনীর পক্ষে ঘাতক হয়ে দাঁড়ায়। ফলে হাতাহাতি লড়ায়ের দিন শেষ। মাঝরাতে সুজার গোলান্দাজি বন্ধ হল। মীর জুমলাও বন্ধ করলেও কামানের মুখ শত্রু শিবিরের দিকে তাক করে রাখেন।

২ জানুয়ারি সুজা পূর্ব পাড়ে এবং মীর জুমলা তাকে অনুসরণ করে নালার পশ্চিম পাড় ধরে রাজমহলের দিকে অগ্রসর হলেন। সুজা চিন্তিত হলেন। তীরে শত্রু, ফলে নদী পার হওয়া খুব কঠিন কাজ হল। তিনি যদি নিজে সেনার আগে পার হওয়ার চেষ্টা করেন তাহলে তাকে তার বাহিনী চেড়ে চলে যাবে, আর যদি তার আগে সেনা নদী পার হয়, তাহলে তারা শত্রুর হাতে গ্রেফতার হওয়ার ভয় থাকবে। সুজা এখন তার শিবির ঘিরে গভীর পরিখা কেটে সেখানে কামানের সারি বসিয়ে দিলেন। মহম্মদ সুলতানের মতিগতি তার সন্দেহজনক মনে হওয়ায় তাকে তিনি তাণ্ডায় পাঠিয়ে দিলেন। সুজা নৌকো সেতু গড়ার চেষ্টা করলে মীর জুমলা তার দিকে বৃথা গোলা ছুঁড়তে লাগলেন। ৯ জানুয়ারি ১৬৬০, সেই সেতু করে সুজা নদী পার হয়ে গেলেন।
(চলবে)

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা৬০ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার

৪। দাউদ খানের পাটনা থেকে মালদার দিকে আগমন
সুজার ভাগ্য পরিবর্তনের বিষয়টা বোঝা যাবে না যদি আমরা মে মাসে সম্রাটের নির্দেশবলে মীর জুমলার চিঠি পাওয়ার পর থেকে দাউদ খানের কর্মপদ্ধতিটি বুঝতে না পারি। মীর জুমলার চিঠি পাওয়ার পরে দাউদ তুরন্ত কাজ করতে শুরু করে দেন। তার সেনানায়ককে তিন মাসের অতিরিক্ত বেতন দিয়ে তিনি সম্রাটের কাজের জন্য নির্দিষ্ট বাহিনীর প্রধান করে দেন। এবং বিশাল সেনা বাহিনী তৈরি করেন। মেশি আর দ্বারভাঙ্গা থেকে দু জন পালোয়ান আর তাদের বাহিনী, অর্থ এবং সম্পদ চাইলেন, মানকালী পরিবার এবং ককর নেতাদের ডাকলেন। তিনি স্থানীয় মাঝিদের থেকে প্রচুর কিস্তি এবং ঘুরাব নৌকো কিনে নেন এবং প্রত্যেকটি নৌকোকে ১০টি গোলান্দাজ বাহিনী এবং গোলাবারুদ দিয়ে সাজিয়ে তোলেন।
এই প্রস্তুতি নিয়ে দাউদ তার ভাই শেখ মহম্মদ হায়াতকে তার অধীনে নিয়ে ১৩ মে পাটনা ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন ১৫০০ রিসালা(অশ্বারোহী), ২০০০ পদাতিক নিয়ে। গঙ্গা পেরোলেন নৌকোর সেতুতে এবং তার পরে ভরা বর্ষার সরযূ আর গণ্ডকে শত্রুর নানান বাধা পেরিয়ে ভাগলপুরের উল্টো দিকের গ্রাম কাজি-কেরিয়ায় উপস্থিত হন তিন মাস পরে। রোজবিহানীরা তখন ভাগলপুরে অপেক্ষা করছে, তাদের আনতে ৯০টি নৌকো পাঠালেন। সেখানে আগেই খাসা এবং ঘুরাব যুদ্ধ জাহাজের বিপুল নৌবহর নিয়ে উপস্থিত ছিলেন সুজার সেনানায়ক খ্বোয়াজা মিশকি(ইতিবর খান)। তার সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হয়। প্রথম দিনে যুদ্ধে শুধুই গোলাগুলি চলে, রাতে দাউদ ১০টি কামানে সাজানো নৌকো আর ১০টা সাঁজোয়া নৌকো নদীর সুরক্ষায় সাজিয়ে রাখতে নির্দেশ দিলেন। পরের দিন লড়াইয়ে খ্বোয়াজার হারের পর ১০ জুন মীর জুমলার রশিদ এবং রোজবিহানী সেনাবাহিনী এবং তার নেতৃত্ব চিরাগ দাউদের সঙ্গে দেখা করে সুলতান মহম্মদের পলায়নের খবর দেন এবং বর্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি যেন কাজি-কেরিয়া না ছাড়েন মীর জুমলার এই নির্দেশ পৌঁছে দেন। কোশি, কালিন্দি আর মহানন্দায় বিপুল বন্যার জন্য দাউদকে সেখানেই বসে থাকতে হল। দাউদের নির্দেশে তীর জুড়ে রশিদ নিজের বাহিনী নিয়ে বিপক্ষের গোলান্দাজির নিরাপত্তা বিধান করলেন। পরের দিন দাউদকে আক্রমণে সফল না হয়ে মিশকি ভাগলপুর ফিরে যেতে বাধ্য হয়। সেখানে তিনি মীর জুমলার ফৌজদারকে গ্রেফতার করেন। পরে সুজার দল মীর জুমলার সেনানী আলি কুলির(শামসের) ভাইপোর ১০০ বাহিনীর হাতে হেরে যায়। আলি কুলি ফৌজদারকে ছাড়িয়ে আনেন, যুদ্ধের সঞ্জাম উদ্ধার এবং খরাজ আদায় করে।

ঠিক এই সময়ে ২২ আগস্ট সুজা রাজমহল দখল করেন। সেই উত্তেজনায় তিনি ফিদায়ি খানকে নির্দেশ দেন মুঙ্গেরে গিয়ে ভাগলপুর থেকে সুরাজগঞ্জের মধ্যের এলাকার সম্রাটের বাহিনীর সঙ্গে লড়াই করে নদীপথ, গ্রাম দখল করে নদী পারাপার নিজের সেনা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে। তাকে খ্বোয়াজা মিশিকির সঙ্গে যোগ দিয়ে দাউদকে আক্রমন করতেও নির্দেশ দেওয়া হয়। দাউদ তখন ভাগলপুর আর কলগঙ্গের মাঝে একটা এলাকায় ছিলেন। আলি কুলির ভাস্তা শামসের বিপক্ষের ফিদায়ি খানের বিপুল বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে সরাসরি যায় না, ভাগলপুর থেকে জাহাঙ্গিরা(সুলতানগঞ্জের কাছে)য় উপস্থিত হন। ভাগলপুর থেকে তাড়াতাড়ি দিয়ে শত্রুর ছেড়ে যাওয়া জাহাঙ্গিরা দখল করেন ফিদায়ি ইসমাইলের কবল থেকে, প্রচুর অর্থ এবং রসদ উদ্ধার করেন, প্রত্যেক গ্রামে তরফদার এবং রহদার নিয়োগ করে ফেরি নিয়ন্ত্রণ করে সুজার পরবর্তী নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। যুদ্ধে ইসমাইল আহত হন এবং মুঙ্গেরে মারা যান।

দাউদ যতক্ষণ বেঁচে রয়েছেন এবং তার এলাকাটি নিজের নিয়ন্ত্রণে না নিয়ে আসতে পারছেন, ততক্ষণ সুজা নিজেকে নিরাপদ ভাবছেন না। মুঙ্গেরের দুর্গ মহম্মদ হোসেন এবং তার পাঁচ সাথী নিরাপদে রেখেছিলেন। একজন মারা গিয়েছেন ইসমাইল; অন্য চার জন রাসুল, মির্জা, হাসান এবং শামসের তখনও রয়েছেন। তাকে মুঙ্গেরে দিকে না পাঠিয়ে সুজা নির্দেশ দিলেন সব ফেরি দখল নিয়ে সেখান থেকে টাকা তুলতে এবং দাউদের বিরুদ্ধে জলযুদ্ধ যুদ্ধ শুরু করতে। সেই যুদ্ধে জিতলে দাউদ ছাড়া চার ভাইকে হত্যার নির্দেশও দিয়ে তার বাহিনীকে মীর জুমলার সঙ্গে লড়ায়ের কাজে বাংলায় পাঠিয়ে দিতে। ফিদায়ের হাতে জাহাঙ্গিরা ছেড়ে দিয়ে চলে যাওয়ার সময় তিনি তাকে নির্দেশ দিয়ে গেলেন দাউদকে তার বহর দিয়ে ঘিরে ফেলতে।

দাউদের সঙ্গে দ্বিতীয়বারের যুদ্ধ শুরু হল। প্রথম দিনের যুদ্ধে গোলান্দাজির পর দ্বিতীয় দিনে খুব খারাপ টিপ করে সুজার বাহিনী গোলান্দাজি করতে থাকায় দাউদের খুব বেশি ক্ষতি হল না। দাউদের নিষেধ এবং বিপুল গোলান্দাজি সত্ত্বেও বিপক্ষের নৌকোগুলি ক্ষতি করতে নদীতেই প্রচুর ঘোড়া নামিয়ে দেয় রশিদ এবং চিরাগ। সুজার বাহিনী ক্রমে বন্যার প্রকোপে ৭০০ নৌকো নিয়ে জাহাঙ্গিরায় চলে যেতে বাধ্য হয়। এই সংবাদে সুজা হতাশ হয়ে মন্তব্য করলেন ভাগ্যলক্ষ্মী তার প্রতি অপ্রসন্ন হয়েছেন। জাহাঙ্গিরায় মিশকিকে রেখে, মাসুমবাজারে থাকা ফিদায়ি খানকে সুজা নির্দেশ দিলেন সেপ্টেম্বরে(?) মীর জুমলার দখলে থাকা রাজমহল আক্রমন করতে আসা দাউদের অভিযানে নৌকো নিয়ে বাধা সৃষ্টি করতে। এই সময়ে দাউদ আওরঙ্গজেবের থেকে খবর পেলেন মুঙ্গেরে গঙ্গা পার হয়ে দিল্লি থেকে অর্থ, অস্ত্রশস্ত্র এবং রসদ, ১০০০ উইঘুর এবং উজবেগ সেনা, আবু নাবির নেতৃত্বে ৫০ জন রোজবিহানী সেনা নিয়ে আসা ফারহাদ খান আসছেন, তার জন্য অপেক্ষা করতে – এবং সেই অর্থ থেকে সৈনিকদের তিন মাসের অগ্রিম এবং নৌকোয় দিল্লি থেকে আনা ৪০টি কামান বসিয়ে ফিদায়ি এবং মিশিকির প্রতিরোধ গুড়িয়ে দিতে। তারপর দাউদ খানকে মীর জুমলার সাহায্যে পাঠিয়ে তার নির্দেশ অনুসরণ করতে। দাউদ সম্রাটের এই নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে জানালেন, পাঁচ মাস ধরে যে নিরবিচ্ছিন্ন যুদ্ধ চলছে, তার জন্য খান সেনাপতিদের কিছু পুরষ্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া প্রয়োজন। সম্রাট দাউদের এই অনুরোধ মান্য করে সঙ্গে সঙ্গে চিরাগের নেতৃত্বে রোজবিহানী বাহিনীকে পুরষ্কার দিতে নির্দেশ দিলেন এবং স্বয়ং দাউদের পদ মনসবদারি আরও ১০০০ বাড়ল।

কাজি কেরিয়ায় থেকে ডিসেম্বরের শুরুতে অর্ধেক বাহিনী এবং নিজেকে নৌবহরে চাপিয়ে, রশিদকে বাকি অর্ধেক সেনা নিয়ে শীঘ্র ঘোড়ায় চেপে মুঙ্গেরের দিকের গঙ্গার বাঁদিকের তীরে টহল দিতে বললেন, যদি শত্রুপক্ষ তাকে আক্রমন করে বসে। জাহাঙ্গিরায় মিশকি দাউদের অগ্রগমণ রোধ করলেন যতদূর সম্ভব পর্তুগিজ আর মেস্টিকোজদের নেতৃত্বে নিজের নৌবহর নিয়ে। মিশকির আক্রমণ চিরাগ বেগের বাহিনী রুখে দিলে, ৩ রাত ৩ দিনের চেষ্টায় দাউদ মুঙ্গেরের বাঁদিকের তীরে খুব কষ্টে উঠতে সক্ষম হন। দুর্গের হাবিলদার শত্রুর অগ্রগতি গোলান্দাজি এবং চিরাগের নেতৃত্বে ৪০টি নৌকো দিয়ে আটকে দেয়। সুজার বাহিনী ৪০টি কামান ও ১০০০০ রকেট হারিয়ে জাহাঙ্গিরায় পালিয়ে যায়। কিন্তু সেখানেও মুঙ্গের থেকে ঘোড়ায় দাউদ নিজে এবং ৭০০ নৌকোয় দুভাগে বিভক্ত আক্রমন শানিয়ে জাহাঙ্গিরা ছাড়া করেন। দাউদ সেখান থেকে মীর জুমলার বাহিনীকে সাহায্যের জন্য আবুন নবি, হাসান, মির্জা, শামসের এবং মহম্মদ রসুলকে পাঠান। তবে মিশকি মাঝেমধ্যেই দাউদকে আক্রমন করতে থাকে। এর মাঝে মীর জুমলা তাকে নির্দেশ দিলেন গঙ্গা পার হয়ে তাণ্ডায় অভিযান করে শত্রুর ধনসম্পদ দখল করে তার জন্য অপেক্ষা করতে। আর যদি তিনি বাঁদিকের তীর পার হন, তাহলে সুজাকে ধরার কাজ শুরু করতে। এর উত্তরে দাউদ বললেন এই কাজগুলি সম্পাদন করতে তার দেরি হয়ে যাবে। চিরাগের গোয়য়েন্দাদের হাতে খবর পেয়ে ভাগলপুরে সুজার সেনাপতির য়ুসুফ খানের শিবির লুঠের আক্রমন প্রতিহত করেন। মীর জুমলা দাউদের নেতৃত্ব, তার সফলতার প্রশংসা করলেন।

কলগঙ্গে যাবার দিনই দাউদের বাহিনীকে আক্রমন করে মিশকি ৭০০ নৌকো নিয়ে। কিন্তু প্রতিহত হয়ে পালানপুরে পালিয়ে যেতে হয়। তাণ্ডার দিকে যেতে গিয়ে গড়ি(তেলয়াগড়ি)তে দেখলেন রাজমহলের পথ বন্ধ করে দিয়েছে সুজার সেনাপতি বারহার সৈয়দ তাজুদ্দিন, মিশকি এবং জামাল ঘোরি। সেই মুহূর্ত্তে শক্তিশালী বিরোধী পক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করে তিনি বেলদারদের বললেন নদী থেকে একটা খাল কাটতে যাতে তার নৌকো নিয়ে তিনি তাদের কাটিয়ে বেরিয়ে যেতে পারেন। দুদিক থেকে শত্রুপক্ষ তাড়াতাড়ি এসে পড়লে দাউদের পুত্র হামিদ, কাদির এবং চিরাগের নেতৃত্বে কোশিতে যুদ্ধ শুরু হল। জামাল সেই যুদ্ধে মারা যায়। মিশকি পালিয়ে গিয়ে সমধে(রাজমহলের বিপরীতে) কামান নিয়ে নতুন করে বাধা সৃষ্টি করে। মুঘল, শেখ এবং পাঠানদের নিয়ে দাউদ কোশি পার হলে পুর্ণিয়ার এক ঘোড়সওয়ার তাকে খবর দেয় যে তার বক্সী ফাতাউল্লা ৫০০ জনের বাহিনী নিয়ে পুর্ণিয়ার সুজাপন্থী ফৌজদার থেকে ৩০০০০ দিরহাম, কামান সহ ২০টি কোষা নৌকো, হাতি সুইভেল এবং প্রচুর হাউই উদ্ধার করে সম্রাটের বাহিনীর সেবার জন্য উদ্দিষ্ট করেছেন। এই বিশাল পরিমান রসদ নিয়ে নদী পেরিয়ে দাউদ অপ্রতিহত গতিতে এগোতে থাকলেন। সিক্রিগলির পূর্ব দিকে আকবরপুরে দারাইসিয়া(কালিন্দি) পার হয়ে আরও এগোবার আগে নতুন রসদ আসার জন্য অপেক্ষা করতে থাকলেন।
(চলবে)

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা৫৯ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার

৩। বেলঘাটা, গিরিয়ার যুদ্ধ
রাজমহল দখল করে উজ্জীবিত সুজা তার পরবর্তী পদক্ষেপের কথা ভাবতে শুরু করলেন। তিনি কি রাজমহলের দিকে অভিযান করা দাউদ খানের বিরিদ্ধে অভিযান করবেন না দক্ষিণে মীর জুমলার বাহিনীর ওপর আক্রমন করবেন এই দ্বন্দ্বে পড়লেন। শাহজাদা মহম্মদ আজমের পরামর্শতে বর্ষার ঠিক পরে পরেই তিনি নিজে মীর জুমলা আর তার বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়ায়ের ময়দানে নামার সিদ্ধান্ত নিলেন, কেননা মীর জুমলাকে হারাতে পারলেই দাউদ খানের অভিযান ব্যর্থ হবে। যদিও তিনি দাউদ খাননের অভিযানকে বিন্দুমাত্র তুচ্ছ করছেন না, তার বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী সামলানোর দায়িত্ব দিলেন ফিদায়ি খান এবং খ্বোয়াজা মিশকি(ইতাবর খান)কে। বর্ষা শেষ হতে না হতেই সুজা ৮০০০ বর্ম পরা সেনা নিয়ে খাসা এবং ঘুরাব নিয়ে রাজমহল থেকে দুনাপুর, দোগাছি এবং সুতি হয়ে বেলঘাটা পৌছঁলেন দুমাসের মধ্যে।

ইতোমধ্যে ছাউনিতে থাকা বাহিনীকে যুদ্ধের জন্য উপযোগী করে ফেলেছেন মীর জুমলা। রথে নেতৃত্ব দিচ্ছেন জুলফিকার খান, ডানদিকে মুজফফর, বাঁয়ে ফিদায়ি(খান কোকা), গোলান্দাজ বাহিনী মহম্মদ মুরাদ বেগের নেতৃত্বে আর মহম্মদ আঘর(উইঘুর) হারনাওয়াল(?) হিসেবে ছিলেন। মাসুমবাজার থেকে ২০ মাইল দূরে বেলঘাটায় তিনি ভাগীরথীর তীরে ঢুকে যাওয়া একটি গভীর নালাকে পরিখা হিসেবে বেছে নিলেন। একটি বাহিনী মূল বাহিনীর কাছে, অন্য বাহিনীটি এক মাইল দূরে রেখে তিনি তাদের মাথা সুরক্ষা আচ্ছাদনে ঢাকলেন। একতাজ খান বাঁদিকের বাহিনীর হয়ে লড়ায়ের দায়িত্ব পেলেন। সেনাপতিদের পালিয়ে যাওয়া রুখতে হাতির বদলে তিনি ঘোড়া চড়তে নির্দেশ দিলেন। কেউ তার নির্দেশ অমান্য করলে হাতি দিয়ে মাড়িয়ে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে রাখলেন তিনি। মীর জুমলার বাহিনীর অগ্রগমনের সংবাদে সুজার বাহিনীতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল।

নালা দিয়ে বিভক্ত দুই বাহিনীর মধ্যে প্রথমে গোলার লড়াই শুরু হল ৬ ডিসেম্বর দিনের দেড় পহর(প্রহর? তিন ঘন্টায় এক প্রহর আর যাম হিসেবে ছটায় সকাল ধরলে দুপুর এগারোটা নাগাদ শুরু হল লড়াই - অনুবাদক) থেকে। কয়েকদিন ধরে গোলা বিনিময় এবং খণ্ডযুদ্ধের পর মীর জুমলার বাহিনীকে টেনে আনতে রাজমহলের দিকে পিছু হঠার ভান করল। সেই সুযোগে মীর জুমলার বাহিনী সুজার ছেড়ে যাওয়া যায়গা দখল করে সুজার বাহিনীকে ঘিরে নেওয়ার চেষ্টা করলে সুজার সেনানী মহম্মদ সুলতান মাত্র ৪০০ বাহিনী নিয়ে সামনের দিক পাহারা দেওয়া একতাজ খানের বাহিনী ঘিরে নেয়(১৫ ডিসেম্বর)। মুখ্য পাহারাদার একতাজ, তার বাহিনীর সাহায্যের জন্য মীর জুমলাকে নতুন বাহিনী পাঠাবার অনুরোধ করলেন। মীর জুমলা জুলফিকারকে বললেন আঘার(উইঘুর) এবং রোজবিহানীদের ৭০০০ মেলানো মেশানো বাহিনী পাঠাতে। এবং যদি তারা জয় নিশ্চিত করতে পারে তাহলে যেন তারা শাহজাদার পিছন ধাওয়া করে। কিন্তু বিপক্ষের গোলাগুলিতে আহত একতাজকে সঙ্গে নিয়ে নালার সেতু পেরিয়ে পিছিয়ে আসতে বাধ্য হয় জুলফিকার।

মীর জুমলা নতুন করে দাবার ঘুঁটি সাজাতে বসলেন। সুজার তিনজন সেনানায়কের মধ্যে, এই বাহিনীর সঙ্গে লড়াই করার অভিজ্ঞতা হয়েছে সামনে লড়াই দেওয়া শাহজাদার যিনি বাঁদিকের সেতু দখলের দিকে এগোচ্ছিলেন। মীর জুমলা পাশ এবং পিছন দিয়ে সুজার বাহিনীকে ঘেরার পরিকল্পনা করলেন স্বভাবসিদ্ধ রণনীতিতে। সামগ্রিক সেনা চালনার দায় জুলফিকার খানকে দিয়ে মীর জুমলা বাঁদিকের সেতু ধরে নালা পেরিয়ে ধীর গতিতে জঙ্গল, কাদা পেরিয়ে গিরিয়ার কাছে ভাগীরথীর তীরে সুজার সেনার পিছনে মীর ইসফানদিয়ার মামুরির বাহিনীর ওপর গোলান্দাজ বাহিনী, হাতি এবং উট হাউই(সুইভেল?) বাহিনী নিয়ে তীব্র আক্রমন শানালেন। মীর জুমলার আক্রমন এতই তীব্র হয়েছিল যে, শাহজাদাকে তার সেনার উদ্ধারে চলে আসতে হল এবং জিতলে হিন্দুস্তানের অর্ধেকটা তাকে উপহারও দেওয়া হবে এমন লোভ দেখালেন। জুলফিকারের বিপক্ষে লড়াইতে গোলাবারুদের দারোগা ইবন হুসেইনকে সামনে রেখে সুজা ছোট কিন্তু দক্ষ সেনা বাহিনী নিয়ে সর্বশক্তিমানের ওপর ভরসা রেখে তাকে বার বার বিপদে ফেলা বৃদ্ধ যোদ্ধা, মীর জুমলাকে শিক্ষা দিতে এলেন।

দিনের তিন পহর পার হয়ে গেলেও সুজা জোরদার যুদ্ধ করলেন। তার পিছনটি সুরক্ষিত একটি গ্রাম এবং সামনে কামানের সারি দিয়ে। মির্জা জান বেগ মীর জুমলার আক্রমণের সামনে পাহাড়ের মত দাঁড়িয়ে থেকে কামান থেকে ১০ থেকে ১৫ সেরের গোলা ছুঁড়ছিলেন। তার পরিকল্পনা প্রায় বিফলে যেতে বসেছিল। কিছু সময় তিনি এগোতেও পারছিলেন না, পিছোতেও পারছিলেন না। আলমগিরনামায় বলা হয়েছে মীর জুমলার বাহিনীর সেনাপতিরা পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলছিলেন না। তারা নিজেদের মত আক্রমন সাজাচ্ছিলেন বিচ্ছিন্নভাবে। ফলে কেন্দ্রিভূতভাবে একজন কারোর পক্ষেই নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল ছিল না।
দুই পক্ষই রণক্লান্ত হয়ে পড়েছিল।মীর জুমলার গোলা শেষ হয়ে গেল এবং তিনি বিপুল বাহিনী নিয়ে একটি খাঁড়ির মধ্যে আটকে পড়লেও সুজা তার ওপরে খুব বেশি গোলা ছুঁড়ল না। সুজার ঐতিহাসিক বলছেন, তিনি যদি এই আক্রমনটা জোরদার করতে পারতেন, তাহলে হয়ত মীর জুমলার বাহিনীকে হারিয়েও দিতে পারতেন। কিন্তু এই যুক্তিটা খুব সাজানো মনে হল। শেষ দুটি লড়ায়ে একটি বাঁদিকের বাহিনীর ওপরে এবং গিরিয়ায় নিজের বাহিনীর পিছনের অংশে তিনি প্রাথমিক সাফল্য পেয়েছিলেন তার গোলান্দাজির জন্য। মীর্জা জানের বিপুল কামান বাহিনীর গোলার ভাণ্ডার শুন্য হয়ে গিয়েছিল ততক্ষণে। ফলে গোলার সুরক্ষা না নিয়ে তিনি মীর জুমলার বিপুল বাহিনীর সঙ্গে হাতে হাতে যুদ্ধের ঝুঁকি নিতে চান নি। অন্য দিকে গিরিয়ার যুদ্ধে মীর জুমলা পরিকল্পিত ভাবে আটকে পড়া বাহিনীকে উদ্ধারের কাজ করছিলেন ব্যক্তিগত তদারকিতে। এবং হয়ত তিনি বুঝতে পারেন নি যে সুজার বাহিনীর গোলা ফুরিয়ে গিয়েছে এবং রাতে সুজার গোলার প্রাবল্যের ধাক্কায় তার হতোদ্যম সেনাপতিদের নিয়ে তিনি হয়ত আর যুদ্ধ খুব একটা এগোতে পারতেন না।

তার পূর্ব রণনীতিতে পরিকল্পিত সময়ের পিছনে চলছিলেন মীর জুমলা। বর্ষার শেষে তিনি দাউদ খানকে বলেছেন(তখন মুঙ্গেরে) কোশি পেরিয়ে তাণ্ডার দিকে এগোতে। তিনি প্রত্যেকদিন আশা করছেন, দাউদ খানের বাহিনীর আসার খবর পেয়ে সুজা এই যুদ্ধ ছেড়ে তার শিবির বাঁচাতে কখন দৌড় লাগাবেন। এদিকে সম্রাটের পাঠানো দিলির খানের নেতৃত্বে গোলান্দাজ বাহিনীর অপেক্ষা করছিলেন তিনি, ফলে খালি হাতে লড়ে তার বাহিনীকে আর নষ্ট করতে চাইছিলেন না। ফালে তিনি তাড়াতাড়ি নালা পেরিয়ে মুর্শিদাবাদের দিকে চললেন।

মীর জুমলার পশ্চাদাপসরণ দেখে এবং নিজের পিছনে দাউদ খানের আক্রমণের কথা ভুলে গিয়ে সুজা মীর জুমলাকে মুর্শিদাবাদ থেকে বিচ্ছিন্ন করার উদ্যম নিলেন। ভাগীরথী পেরিয়ে মীর জুমলার সমান্তরালভাবে মুর্শিদাবাদের উত্তরে নসিপুর (নাসিরপুর) পেরিয়ে আবার নদীর ওপর পারে গিয়ে মীর জুমলার রসদের রাস্তা বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা চালালেন। বহুদিন ধরে দুইতীরে পরস্পরের মধ্যে গোলান্দাজির প্রতিযোগিতা চলল। ডিসেম্বরের ২৬ তারিখের রাতে যখন সুজা ফেরি পের হচ্ছেন, সেই সময় খবর পেলেন কোশি পেরিয়ে তার সেনানায়ককে হারিয়ে দাউদ খান দ্রুত তাণ্ডার দিকে এগোচ্ছেন।
(চলবে)

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা৫৮ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার
চতুর্থ পর্ব
গঙ্গার পশ্চিমের যুদ্ধ

১। মীর জুমলার বাড়তে থাকা অস্বস্তি
শাহজাদার মীর জুমলার শিবির ছেড়ে যাওয়া যুদ্ধের মোড় ঘোরানো ঘটনা ছিল। এত দিন ধরে গঙ্গার যুদ্ধে প্রায় একতরফা আক্রমন করে আসছিলেন মীর জুমলা, আঘাত সামলাচ্ছিল বিপক্ষ দল, বিশেষ করে মীর জুমলার রাজমহল দখল করার পরের সময়ে। এত দিন ধরে সুজা আত্মরক্ষামূলক রণনীতি অনুসরণ করছিলেন। গঙ্গা যুদ্ধের গতি পালটে এই প্রথম অনিচ্ছাকৃতভাবে প্রতিআক্রমনে যেতে শুরু করলেন তিনি এবং শেষ বারের মত। এবার যুদ্ধ নতুন পর্বে প্রবেশ করল তাই নয়, দৃশ্যপটও পরিবর্তন হয়ে গেল। শাহজাদা পশ্চিম পাড় থেকে পূর্ব পাড়ে চলে যাওয়ায় যুদ্ধের প্রকোপটা ছিল গঙ্গার ওপরে, সেটি ঢলে পড়ল পশ্চিম দিকে। সুজা এবারে রাজমহল আক্রমণের সুচিন্তিত প্রস্তুতি শুরু করলেন।

শাহজাদার শিবির পরিবর্তন কিন্তু মীর জুমলার পক্ষে হাজারো বাধা তৈরি করল। অবশই শাহজাদা চলে যাওয়ায় সৈন্যবাহিনীর সংখ্যা সঙ্কুচিত হয় নি, কিন্তু মনে মনে যে বোঝা যাচ্ছিল যে কোথাও একটা তার কেটে গিয়েছে। আর যেহেতু মীর জুমলার যুদ্ধ সমিতিতে তিনি ছিলেন, তাই তার যুদ্ধ করার পদ্ধতি এবং সেনা বাহিনীর গোপন খবরাখবর দিয়ে সুজাকে যুদ্ধের মাঠে কয়েক কদম এগিয়ে দেবে বলাই বাহুল্য। আর শাহজাদার শুধু উপস্থিতিই সুজার বাহিনীকে এতই চাঙ্গা করে তুলেছিল যে তারা নতুন করে যুদ্ধর শেষ দেখে ছাড়ার পরিকল্পনা করে আক্রমনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। বালেশ্বরের কুঠিয়ালেরা ১৫ ডিসেম্বর চমতকৃত হয়ে দেখল যে, সুজা এখন গঙ্গা যুদ্ধের শেষ পর্ব নিয়ন্ত্রণের অবস্থায় চলে এসেছেন। এবং বর্ষার উতপাতও মীর জুমলাকে কিছুটা পিছিয়ে দিল। বর্ষা, বন্যা শুধু যে দু পক্ষের ৬০ মাইলের অলঙ্ঘ বাধা তৈরি করল তাই নয়, মীড় জুমলার বড় বাহিনীর জন্য কাদা রাস্তাগুলি যাতায়াতের অনুপযুক্ত হয়ে উঠল, এবং মীর জুমলার শিবির আশংকায় থাকল সাম্রাজ্যের বাহিনীর জন্য তেরি রসদ সরবরাহের পথগুলি সুজা কেটে দিতে পারেন।

এই সবক’টি কারণ মিলে আশংকার গহ্বরে ডুবে গেল সাম্রাজ্যের বাহিনী। অন্যদিকে সুজা নতুন উদ্যমে মীর জুমলার বাহিনিকে আক্রমন করার পরিকল্পনা রচনা করা শুরু করে দিলেন। সুজার বাহিনীর কাছে প্রধান প্রশ্ন হল, মুকসুদাবাদ না রাজমহল, কোন শিবিরে সুজা আগে আক্রমন শানাবে। সিদ্ধান্ত হল গঙ্গার পশ্চিম পাড়ের রাজমহল। মুর্শিদাবাদের আক্রমনে অনেক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। গঙ্গার ওপর থেকে সরাসরি নৌবহর থেকে মুর্শিদাবাদের উঁচু টিলায় বসে থাকা মীর জুমলার বাহিনীর ওপর আক্রমণের অনেক অসুবিধে রয়েছে। সুজার আশংকা ইওরোপয়দের – তার ডাকে তারা সাড়া দেয় নি – এ সময় হুগলী এবং কাশিমবাজারের কুঠিয়ালেরা একসঙ্গে যদি মীর জুমলার পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে যুদ্ধের মোড় ঘুরে যেতে পারে। অন্যদিকে রাজমহলে গঙ্গা থেকে সরাসরি কামান দাগা যেতে পারে। রাজমহল দখল হয়ত যুদ্ধের গতি পাল্টাতে পারবে না, কিন্তু তাদের সম্মান পুনরুদ্ধার করতে সাহায্য করবে। উত্তর-পশ্চিম থেকে দাউদ খান বা দক্ষিণ থেকে মীর জুমলার শিবির থেকে ত্রাণ নিয়ে পৌঁছনো সেখানে মুশকিল হবে।
সুজার রণনীতিতে রাজমহল দখল করে সাম্রাজ্যবাদীদের হাতে মারার সঙ্গে সঙ্গে হুগলী মুর্শিদাবাদের ইওরোপিয় কোম্পানিগুলির থেকে রসদের যোগান কেটে দিয়ে তাদের ভাতে মারারাও পরিকল্পনা ছিল। মুর্শিদাবাদ থেকে গঙ্গা বক্ষ দিয়ে যে রসদের ভাণ্ডার পাঠানো হচ্ছিল মুর্শিদাবাদে, সেগুলি সুজার বাহিনী দখল নিল। বিহার এবং বাঙলার পশ্চিম অঞ্চলের বহু জমিদারকে নিজের দিকে টেনে এনে সুজা তার নিজস্ব রসদের ভাণ্ডারটি জোরদার করলেন। শুধু গঙ্গাই নয়, রাস্তা ধরে পাঠানো রসদের বহরও দখল করতে শুরু করে সুজার বাহিনী। মাজোয়ার রাজা হরচাঁদকে সুজা প্রলুব্ধ করে সেই অঞ্চলের প্রত্যেক বণিককে গরুর গাড়ি বোঝাই করে খাদ্যশস্য নিজের শিবিরে পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন। ৫ জুলাইয়ের কাশিমবাজারের জমিদারকে লেখা এক চিঠি থেকে জানা যাচ্ছে, যে কোন বেনিয়া বা সেনার টাকাকড়ি বা সম্বল লুঠ করার পূর্ণ অধিকার দিয়েছিলেন সুজা এই শর্তে যে তার চাহিদা মত তাকে রসদ পৌঁছতে এবং যুদ্ধ হাতি সরবরাহ করতে হবে। হুগলি আর কাশিমবাজারের মধ্যে এখন একটা ত্রাসের তাজত্ব তৈরি হল, যে কোন বানিয়াই লুঠের আশংকায় তাদের রসদ নিয়ে এমন কি কোন হরকরাও চিঠিপত্র নিয়েও সেই বাধা পার হতে পারল না।
২। সুজার রাজমহল দখল
মীর জুমলা রাজমহল উদ্ধারে কিচ্ছু করে উঠতে পারলেন না। নৌবাহিনীর অভাবে দূর থেকে বসে দেখলেন আস্তে আস্তে শত্রুর শক্তিশালী নৌবহরে জলরুদ্ধ হয়ে শহরটা তার হাতছাড়া হয়ে গেল। শহরের বাসিন্দাদের জন্য তিনি যে রসদ ত্রানের জন্য পাঠালেন তা রাস্তাতেই লুঠ হয়ে গেল। ঐতিহাসিক মাসুম রাজমহলের মানুষের তৈরি করা এই মন্বন্তরের চোখে দেখা বিবরণ দিয়েছেন, দানা শস্যের দাম দাঁড়াল সোনার মূল্য। এক টাকায় নষ্ট, দুর্গন্ধ মোটা চাল আর ডালের দাম দাঁড়াল টাকায় ন’সের। ...খাদ্যের অভাবে মানুষ বিষও খেতে শুরু করল। মাংসের দাম প্রতি সের একটাকা হল। গরীবেরা নিজেদের মাংসও চিবিয়ে খেতে শুরু করল। নিজেদের ঠোঁট চেবাতে শুরু করল তারা। মাসুমকে দানা শস্য কেনার জন্য ২০-৩০তাকা খরচ করতে হল। ফাঁকা দোকানের সামনে কুকুর বেড়াল অভুক্ত অবস্থায় বসে। মন্দির মসজিদ জনশূন্য হয়ে পড়ল। মন্বন্তরের লেলিহান শিখা গ্রাস করল রাজমহলকে। মীর জুমলার রোজবিহানী সেনারাও মানল যে রুটির একটা টুকরো যেন জলের মত প্রাণদায়ী মনে হতে লাগল। আকিল খান বলছেন, নিজেদের যকৃতের রক্ত পান করে জলের তেষ্টা মেটাতে লাগল মানুষ। মন্বন্তরের সঙ্গে এল বন্যার হাহাকার। ঘোড়া আর গরুর মরতে থাকল শয়ে শয়ে। রাজমহলে মীর জুমলার বাহিনীর এখন তখন অবস্থা। হতাশ, বিশৃঙ্খলতার ঘড়া কাণায় কাণায় পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় সেনাপতিদের রাজমহল ছেড়ে যাওয়া ছাড়া আর কোন উপায় দেখা গেল না।

সেই মুহূর্তে সুজা আক্রমণ করলেন। বিপক্ষের বিন্দুমাত্র প্রতিরোধ না পেয়ে রাজমহলের দক্ষিণে পাটুরা দখল করে সুজার সেনাপতি শেখ আব্বাস রাজমহল দখল করার সাজসজ্জা শুরু করলেন। কিছু সময় পরে সুজা পশ্চিম তীর পার হওয়ার জন্য ছটফট করতে শুরু করলেন। তাণ্ডায় সেরাজুদ্দিন জাবরি, মীর আলাউদ্দিন, দেওয়ান মুহম্মদ জামান এবং মীরইজামানকে রেখে তিনি পাটুরার দিকে রওনা হলেন ১৮ আগস্ট। ২২ আগস্ট তিনি নৌবহর নিয়ে রাজমহল দখল করে বসলেন। সাম্রাজ্যের সেনানীদের মধ্যে উঁচু স্থানে থেকেও অসুস্থ জুলফিকার খান লড়াই দিতে পারলেন না, যতটুকু লড়াই করার রাজা ইন্দ্রদুম্ন করলেন। শহরের সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা ইসলাম খান এবং ফিদায়ি খান শত্রুর আক্রমণের সামনে দাঁড়িয়ে হতোদ্যম হয়ে যৌথভাবে আক্রমণ রোখার পরিকল্পনাটাই তৈরি করে উঠতে না পেরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মার খেলেন। সক্কলে মিলে ঠিক করলেন শহর ছেড়ে মুর্শিবাদাদে মীর জুমলার কাছে ফিরে যাওয়ার। পাহাড়ের তলায় নতুন শহরের মধ্যে দিয়ে শত্রুর গোলাগুলির সয়ে সাম্রাজ্যের বাহিনী শহর ছেড়ে রওনা হলেন, যদিও সরকারি ইতিহাসে বলা হয়েছে সেই আক্রমণ যথেষ্ট জোরদার ছিল না। তাদের ছেড়ে আসা সমস্ত কিছু দখল করল সুজার বাহিনী। রাজমহল দখল করে সুজা গঙ্গার পশ্চিম পাড় নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করল। 
ছত্রভঙ্গ হয়ে সেসে পৌঁছন সেনাবাহিনীকে একহাত নিলেন মীর জুমলা। হতচ্ছাড়া, তোমরা যুদ্ধের উপযোগীই নও। তোমাদের ছেঁড়া খোঁড়া পোষাক, বাগানে বাইজদের সঙ্গে ফুর্তি করার মাতালদের মত চরিত্র নিয়ে তোমরা শত্রুর মুখোমুখি হয়েছিল? পুরুষের মূল্য তার সাহসিকতায়, আর সাহসিকতার নীতি দাঁড়ায় মনুষত্বের মহিমার ওপর নির্ভর করে। তোমাদের মত বুড়ো শেয়ালদের সেই যোগ্যতা নেই। তোমরা সেনাহীন, দক্ষতাহীন উদ্যমহীন বাহিনীর কাছে হেরে পালিয়েছ। সেনানায়কের এই দুর্বাক্যের রকমাত্র প্রতিবাদ করেন জুলফিকার। তিনি বললেন সম্মানিত সেনাপতিদের মুনুষত্বহীন ভীরু বলার অধিকার সেনানায়কের নেই। জুলফিকার নিজে দারা এবং সুজার যশোবন্ত সিংএর বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হয়েছেন, কিন্তু তাকে গোটা সেনাবাহিনী নিয়ে এই যুদ্ধ স্থল ছাড়তে হয়েছে সুজার বাহিনীর পরাক্রমে নয়, তার চতুরতার জন্য এবং রসদের অভাবের জন্য, খালি পেট থাকার জন্য। জুলফিকারের কথার সারবত্তা অনুভব করে মীর জুমলা তাকে সান্ত্বনা দিলেন এবং তার পূর্বের বীরত্বের জন্য এবং মীর জুমলা বললেন, তিনি যে শহর নতুন করে দখল করেছিলেন, সেই শহরটাকে সুজার আক্রমণের সামনে নয়, রসদের অভাবে ছেড়ে আসতে হয়েছে সেই দুঃখ তার চিরকাল থাকবে। তিনি বাকি সেনাদের হতাশ হতে বারণ করলেন এবং রাজমহল উদ্ধারের আশা ছাড়তে বারণ করলেন। এবং তার বিশ্বাস তিনি এই শহর সুজার বাহিনীর হাত থেকে উদ্ধার করেই ছাড়বেন।
হঠাত আক্রমন করে বিপক্ষকে হতচকিত করে দিয়ে সুজা রাজমহল দখল করলেন, কিন্তু মীর জুমলার দক্ষিণের রসদের যোগানের রাস্তাটি বন্ধ এবং মীর জুমলাকে একাকী করার কাজ পারলেন না। তাঁর মুর্শিদাবাদের সেনা ছাউনিতে গোটা বর্ষায় মীর জুমলা বিশ্রাম তো নিচ্ছিলেনই না, বরং তার বিপুল সেনাবাহিনীর সংখ্যাধিক্যের জোরে তিনি হুগলী দিকে এবং থেকে দক্ষিণের রাস্তা পরিষ্কার করার কাজ করতে লাগল, বিশেষ করে আবাধে ঘোরাফেরা করা সুজাপন্থী জমিদারদের ওপরে নজরদারির কাজ করতে শুরু করলেন তিনি। জুলাই মাসে তিনি ঘোর একজন ৫০০ ঘোড়ার ফৌজদার (মহম্মদ শরিফ?) নিয়োগ করে কাশিমবাজার থেকে হুগলির মধ্যেকার রাস্তা পরিষার করার কাজে হাত দেওয়ালেন যাতে তিনি হুগলি এবং এমন কি মেদিনীপুরও দখল করতে পারেন। এর উত্তরে সুজা, হিজলির প্রশাসক মির্জা ইসফানদার(ব্রিটিশদের নথিতে মেজর স্পিলন্ডার)কে ৬০০০ পদাতিক এবং ৫০০ ঘোড়সওয়ার আর কিছু গেরিলা (জলবা) বাহিনী নিয়ে হুগলির প্রশাসকের হাত শক্ত করার দায়িত্ব দিলেন। কিন্তু তিনি সঠিক সময়ে সেখানে পৌঁছতে পারেন নি। যদিও কাশিমবাজারের ব্রিটিশ কুঠিয়ালেরদের আশংকা ছিল যে মীর জুমলার বাহিনীকে কঠিন পরীক্ষার মধ্যে পড়তে হবে হয়ত, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নির্বিঘ্নে তারা হুগলী দখল নিলেন। সেপ্টেম্বরের শুরুতে যখন মীর জুমলার বাহিনী মেদিনীপুর দখল নিচ্ছে তখনও মেদিনীপুর শহরের ১৭ কিমি দক্ষিণ-পূর্বে নারায়ণগড়ে রয়েছে সুজার বাহিনী।
(চলবে)

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা৫৭ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার

৪। ৩ মে ১৬৫৯, মীর জুমলার হার
সাফল্যের আত্মপ্রসাদে মীর জুমলা আরও বড় হামলার পরিকল্পনা করলেন। কিন্তু ততক্ষণে সুজার বাহিনী নিজেদের ঢিলে ঢালা সুরক্ষা কষে বেঁধে নিয়েছে, তিনি সেনানায়ক নুরুল হাসানকে বদল করে দক্ষ সেনানী বারহার সৈয়দ আলম (খানইআলম)কে দায়িত্ব দিয়েছেন। কয়েকটি ব্যাটারি তীরে আলগোছে ফেলে রাখার টোপ দিয়ে পিছনে সৈয়দ আলম এবং মুথাশাম খানের নেতৃত্বে কয়েকটি যুদ্ধ হাতি সম্বলিত বাহিনী লুকিয়ে রাখলেন। ২ মে রাতে মীর জুমলার একটা বাহিনী আক্রমনে গেল কিন্তু সেটা বিফল হল। ৩ তারিখ ভোরে মীর জুমলার ৭৩টি নৌবহর করে কাশিম খান এবং শাহবাজ খানের নেতৃত্বে ২০০০ সেনার বাহিনী উল্টোদিকের তীরে গিয়ে বাধাহীনভাবে উঠে পরিখায় উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে টোপ হিসেবে কয়েকজনকে বসিয়ে রাখা সেনা আক্রমন করে এলাকা দখল নেয়। হঠাতই সুজার বাহিনী যুদ্ধ হাতি নিয়ে রে রে শদে তেড়ে যায় এবং মীর জুমলার ছোট বাহিনীকে ঘিরে ধরে কচুকাটা করতে থাকে। আক্রমনকারীরা প্রবল পরাক্রমে যুদ্ধ করলেও উল্টো দিকে বসে থাকা মীর জুমলা হতাশ এবং আতঙ্কিত অবস্থায় দেখতে থাকেন নিজেদের সেনার ওপরে আক্রমন, এবং সেই আক্রমন ঠেকাতে পারে না। প্রায় অর্ধেক সেনা মারা যায়। ৫০০ গ্রেফতার করে মালদা ফিরোজপুর ও অন্যনায় এলাকায় পাঠানো হয়, কিছুকে মৃত্যু দণ্ড দেওয়া হয়। এই হারের ব্যাপকতা হারের থেকেও বেশি হয়, নৈতিকভাবে মীর জুমলার বাহিনী ভেঙ্গে পড়ে। তিনি নিজেও হতাশ হয়ে পড়েন। এবং এই দুর্বিপাক তাঁর বর্ণময় জীবনে কলঙ্কের দাগ হয়েই রইল। তিনি সব ঝেড়ে উঠে নতুন করে জেতার পরিকল্পনা নিলেন। এই হার তাঁর আগামী দিনের লড়াইতে আশীর্বাদস্বরূপ হয়ে দেখা দিল, এবং তিনি এর পর থেকে সদা সতর্ক হয়েই তাঁর আগামী সব রণনীতি তৈরি করতেন।

সুজার পক্ষের ঐতিহাসিক মাসুম মীর জুমলার হারের কারণ সঠিকভাবেই নিরূপন করেছেন, এই আক্রমন হয়ত সময়োচিত এবং প্রাজ্ঞার প্রকাশ ছিল তিনি শত্রুর বহর না আঁচ করেই বেহুদা আক্রমণ করতে মুয়াজ্জম খান বাহিনী পাঠিয়েছিলেন, আশাছিল তার সেনা আরও একবার বিপক্ষকে বেমওকা পেয়ে যাবে। আদতে মীর জুমলা কিন্তু সত্যিকারের বিপক্ষের ওজন, রণনীতি আঁচ না করেই আক্রমনের পরিকল্পনা রচনা করেছিলেন। নিজের সেনা আর রণনীতির ওপর অত্যধিক আস্থা এবং অহংএর বহিঃপ্রকাশ এই বিফল আক্রমনের জনক। স্যর যদুনাথ সরকার বলেছেন বিপক্ষকে তুচ্ছ করতে গিয়ে মীর জুমলা খুব ক্ষতি ডেকে আনলেন। তাঁর রোজবিহানী অনুগামীদের প্রতি এক স্বগতোক্তি মূলক লেখায় মীর জুমলা বলছেন, আমার বয়স ৭০ বছর। এই পরিণত বয়সে এই রকম হারের মুখোমুখি হলাম! ব্রিটিশ কুঠিয়ালেরা বলছে সাম্রাজ্যবাদীরা ছোট ছোট ডিঙ্গিতে ছিল আর সুজার বাহিনী ছিল জালিয়ার মত বড় নৌকোয়। সুজার বাহিনীতে ছিল প্রচুর গতিশীল কোষা নৌকোর বহর। অথচ মাত্র ৬টি নৌকোয় ১০০০ সেনা এনেছিল মীর জুমলার বাহিনী, তাই তাদের সব নৌকো যে ছোট ছিল একথা সত্যি নয়। তাও বলা যায় সত্যই মীর জুমলা বাহিনীর নৌকগুলি সত্যিকারের ছোট তো ছিলই এবং কিছুটা তাঁর জন্য হার যে হয়েছে তা না স্বীকার করা মুর্খামি।
৫। নতুন আক্রমণের পরিকল্পনায় মীর জুমলা
পুরোনো হারের হতাশা ঝেড়ে ফেলে নতুন আক্রমণের দাবার গুটি সাজাতে বসলেন মীর জুমলা। নষ্ট হয়ে যাওয়া নৌকোগুলি তাঁর নতুন পরিকল্পনায় বাধ সাধছিল যেমন, তেমনি নতুন রণনীতি তাঁর চরম একাগ্রতা মনোযোগ দাবি করছিল। হুগলি, মুর্শিদাবাদ এবং বর্ধমান থেকে নৌবহরের আরও সরঞ্জাম জোগাড়ের চেষ্টা করতে লাগলেন। নৌকো কারিগর এবং চলতি নৌকো জোগাড়ে আবার নেমে পড়ল তাঁর বাহিনী। নদীতে চলাচল করা যত বড় নৌকো সব হুকুম দখল নেওয়া হল, মুকসুদাবাদ পেরিয়ে কোন নৌকোই আর আসতে পারছিল না। পর্তুগিজদের বিরুদ্ধে ইওরোপিয় ডাচ বা ব্রিটিশ সেনানীদের জোগাড়ে বিহার বাংলায় মীর জুমলা তাঁর পদমর্যাদা কাজে লাগালেন। কাশিমবাজার থেকে মাত্র ৩৫ মাইল দূরে থাকায় তিনি ডাচেদের ডাক্তার এবং গোলান্দাজদের তাঁর বাহিনীতে যোগ দিতে বললেন। ব্রিটিশেরা তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এল না, কিন্তু ডাচ নির্দেশক ম্যাথায়াস ভ্যান্ডেনব্রোক হুগলী থেকে তাঁর সঙ্গে মোলাকাত করতে এলেন। জনশ্রুতি সাম্রাজ্যের সেনাপ্রধান ডাচেদের সহায়তার বিনিময়ে দুলক্ষ টাকা দেওয়ার নাকি প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এর আগে ১৬৫৯ সালের জুলাই মাসে প্রধান নির্দেশক মীর জুমলাকে সব ধরণের সাহায্য এবং তাদের যত শ্লুপে কামান রয়েছে সে সবগুলি মুঘল সাম্রাজ্যের হয়ে নদী পাহারা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন।

মীর জুমলা এত দিনে ওডিসায় আওরঙ্গজেবের শাসন বিস্তৃতির পরিকল্পনা করলেন। সাম্রাজ্যের যুদ্ধকে সাহায্য করার জন্য বালেশ্বর এবং অন্যান্য শহরের প্রশাসনকে দূত এবং নির্দেশ পাঠান। বালেশ্বরে সুজাপক্ষী আধিকারিককে চিঠি লিখে মুহম্মদ সুলতানের সঙ্গে দেখা করার নির্দেশও দেন। কিন্তু তারা তখনও সুজাকে ছাড়তে ভয় পাচ্ছিল, এবং ব্রিটিশদের আশা ছিল মীর জুমলা শীঘ্রই বালেশ্বর দখল করবেন এবং তখন বাধ্য হয়ে প্রশাসকের মীর জুমলার পক্ষে যাওয়ার চিন্তা করা ছাড়া আর কোন উপায় থাকবে না।
মীর জুমলা বুঝলেন যতই সামনা সামনি আক্রমন করা যাক, তা দিয়ে নদীর সামনে ঘাঁটি গেড়ে বসা সুজার বাহিনীকে হঠনো যাবে না। সুজার বাহিনীর পিছন দিকে আক্রমন করে তাঁর দৃষ্টি ঘুরিয়ে দিতে হবে, কায়দা করে সিংহের গুহায় ঢুকতে হবে। তাঁর বাহিনীকে পূর্ব, পশ্চিম এবং উত্তর দিক থেকে আক্রমন করতে হবে। এই পরিকল্পনা রূপায়ণে তাকে বিহারের সুবাদার দাউদ খানের ওপরে নির্ভর করতে হবে।

দাউদ খানকে এক চিঠিতে মীর জুমলা লিখলেন নতুন সেনা জোগাড় করতে। এর সঙ্গে তিনি বললেন রণজয়ী হাদি বা আবদুল মাল আলি খান বা কাকারদের মত আভিজাত এবং তাঁর বাহিনীকে দলে পেতে গেলে তাকে সিন্দুক খুলে দিতে হবে এবং যতগুলি পারা যায় কস্তি এবং ঘুরাব(কামান দাগার নৌকো) সংগ্রহ করতে এবং প্রত্যেক নৌকোয় প্রয়োজনীয় গোলাবারুদকামান দিয়ে সাজিয়ে তুলতে। বন্যার সময়টা এড়াতে তাকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সেনা নিয়ে চলে আসতে বললেন এবং তাঁর পরে বড় নৌকোগুলো পাঠালেই হবে। কোশি পার হওয়ার সময় তিনি যেন চিরাগ বেগের নেতৃত্বাধীন রোজবিহানী বাহিনী এবং সুতিতে রশীদ আর দেওগাছিতে মহম্মদ সুলতানের সঙ্গে আলোচনা করে নেন। দাউদ খান, রশিদ এবং চিরাগের যুক্ত বাহিনী গঙ্গার বাঁ পাড়ে সুজার বাহিনীকে আক্রমন করবে এবং তার পরেই দাউদের নৌকোগুলি করে মীর জুমলা আক্রমন করে শেষ পেরেকটি মেরে শত্রুর শেকড় উপড়োবার কাজটি শেষ করবেন।

৬। সুজার বাহিনীতে মহম্মদ সুলতানের পলায়ন
৩ মের হারের ক্ষত পূরণ করতে এবং আগামী দিনে যাতে আর নতুন করে আক্রমণের মুখে না পড়তে হয়, সে পরিকল্পনা করতে নতুন করে যখন আক্রমণের ঘুঁটি সাজাতে ব্যস্ত ছিলেন মীর জুমলা, তখনই ৮ মে রাতে তাঁর সহযোগী সেনানায়ক শাহজাদা মহম্মদ সুলতান দেওগাছি ছেড়ে সুজার শিবিরে যোগ দেয়। এই খবর মীর জুমলার কাছে বিনা মেঘে বজ্রাঘাত। এই খবরে হয়ত গোটা মীর জুমলার বাহিনীই ছত্রভঙ্গ হয়ে যেত, কিন্তু পোড় খাওয়া বহু যুদ্ধের সেনানী মীর জুমলা উপস্থিত বুদ্ধি, সেনানীদের ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ এবং অপরিসীম সাহসের জন্য সেই বাহিনী টিকে গেল শুধু নয়, নতুন আক্রমণের উদ্যম নিতে শুরু করল।
শাহজাদার পালানোটা অবশ্যম্ভাবীই ছিল - সুজার মেয়ের প্রতি তাঁর ভালবাসা, সিংহাসনের প্রতি তাঁর দুর্নিবার আকর্ষণ, এবং তাকে কাকার বারবার লোভ দেখানো ছাড়াও মীর জুমলার নিচে তাঁর থাকা, মীর জুমলার শত্রুদের বারবার কান ভাঙ্গানো, এবং সাম্রাজের নির্দেশে মীর জুমলা তাকে গ্রেফতার করতে পারেন এই ভয়টাও নাকি তাঁর ছিল। সুজাপন্থী ঐতিহাসিকদের বক্তব্য, সম্রাটের প্রতি তাঁর পুত্রের মনোভাব নির্ধারণ করেছিল দুটি বিষয় - প্রথমটি ছিল মীর জুমলা সরাসরি সম্রাটকে চিঠি লিখে জানান যে ৩ তারিখের যে অভিযান হয়, তাঁর পুত্র সে সম্বন্ধে তাঁর লোকদেখানো অজ্ঞতা এবং অবহেলার প্রকাশ করেছেন, যা আসলে সেই অভিযানের ব্যর্থতার অন্যতম কারণ বলে মীর জুমলার ধারণা দ্বিতীয়ত একটি কবিতা সূত্রে জানতে পারা যাচ্ছে সম্রাটের নির্দেশে সেনাবাহিনীর আনুগত্যের পারদ খোঁজ করা নিয়ে দুটি চরের মতের বিরুদ্ধে শাহজাদা উল্টো মত প্রকাশ করেছিলেন। এই ঘটনা সম্বন্ধে সম্রাট মীরকে লেখেন, সাধারন বা বিশেষ, তোমার ওখানে বা এখানে সব ঘটনা তোমার নির্দেশেই পরিচালনা করে থাকি। যদি আমার পুত্র তোমার নির্দেশ পালন না করে আর তুমি যদি মনে কর তোমায় আর তাঁর দরকার নেই তাহলে শীঘ্রই তাকে ফেরত পাঠিয়ে দেবে। সম্রাটের এই নির্দেশকে চরেরা মনে করছিল বাস্তবিক তাঁর গ্রেফতারি এবং সেই অবস্থায় তাকে দিল্লি পাঠানোর নির্দেশ। শাহজাদা সমস্ত ধৈর্য হারিয়ে সেই রাতেই নদী পেরিয়ে তাঁর কাকার আশ্রয় নেওয়াকেই তাঁর নিশ্চিত নিরাপত্তা রূপে ভাবলেন।
সুতিতে থাকা মীর জুমলা এই ঘটনায় হতবাক হয়ে যান। নিজের বাহিনীকে শান্ত করে তিনি পরের সকালেই দেওগাছির পানে রওনা হয়ে যান। রাস্তায় আওরঙ্গজেবের নিযুক্ত চরেদের সঙ্গে দেখা হয়, তারা পলায়ন কাণ্ডে হতবুদ্ধি শাহজাদার রক্ষীদের কবল থেকে পালাতে পেরেছিল। তাদের থেকে আদত খবর পেয়ে তিনি নিশ্চিন্ত হন।

দেওগাছিতে গিয়ে দেখলেন শিবিরের অবস্থা ছিন্নভিন্ন অবস্থায় পড়ে রয়েছে। মীর জুমলা ঘুরে দেখলেন প্রত্যেকেই নির্দেশ অমান্য করতে বসে রয়েছে, শিবির জুড়ে দিশাহীনতা এবং হতাশার পরিবেশ। কিন্তু মীর জুমলা মানুষের জন্ম নেতা। তিনি জানেন এই রকম ছিন্নভিন্ন বাহিনীর মনোবল কিভাবে বাড়ানো যায়। যুদ্ধ সমিতির বৈঠকের আগে প্রত্যেক সেনার সামনে বক্তৃতা দিতে উঠলেন মীর জুমলা মুয়াজ্জম খান। তিনি মনোবল বাড়াবার জন্য রঙ্গিন বক্তৃতা দিলেন।আগামী দিনের যুদ্ধে হারই সম্বল এই মনোভাবের প্রতিবাদ করে তিনি বললেন, শেয়ালের মত পালিয়ে বেড়ানো শত্রুর ভয়ে মরছ? সে আমাদের দেখে পালাচ্ছে, না তার ভয়ে আমরা? তিনি তখন তাদের মনে বিশ্বাস পুরে দিলেন, শত্রুকে আজ মনে হচ্ছে সূর্যের মত উজ্জ্বল কিন্তু তোমরা জান আমিও মেঘ, আমি উজ্জ্বল সূর্যকে ঘিরে ফেলব... আমি তাদের ফিরিঙ্গিদের(পর্তুগিজ) কাছে তাড়িয়ে নিয়ে যাব। শাহজাদার পালিয়ে যাওয়াটা বাস্তবে কোন ঘটনাই নয়, তিনি বললেন, সম্রাট আমার সেনাপতি নির্বাচন করেছেন, তাকে আমার সঙ্গে শুধু পরামর্শ করতে পাঠিয়েছিলেন, এর বেশি কিছুই নয়। এর পরে আগামী দিনের তাদের কর্মপদ্ধতি, তাদের পরিকল্পনা ইত্যাদি আলোচনা করে তাদের মন জিতে নেন আওরঙ্গজেবের সেনাপতি মীর জুমলা।

তাঁর বক্তৃতা, তাঁর রাগের বহিঃপ্রকাশ, আশার চেতনা বয়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা তাঁর উদ্দেশ্যপূরণে সহায়ক হল। যারা আগের মুহূর্তেও নড়বড়ে হয়ে বিদ্রোহের তোড়জোড় করছিল, তারা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মীর জুমলাকে তাদের একমাত্র নেতা রূপে বৃত করে নিল। উত্তেজিত মীর জুমলা সেনাপতিদের হয়ে তাদের পদন্নোতি এবং বেতন বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে সম্রাটকে চিঠি লেখার প্রতিশ্রুতি দিলেন। খাজাঞ্চিখানার দারোগাকে সেনাদেরকে তিন মাসের অগ্রিম দিতে নির্দেশও দিলেন।

সেনাদের মন জিতে মীর জুমলা শাহজাদার ছেড়ে যাওয়া মালপত্র নিতে আসা একটা বাহিনীকে তাড়িয়ে দিলেন এবং পলাতক শাহজাদার সম্পত্তিীবং খাজাঞ্চি সম্রাটের নামে ক্রোক করারও নির্দেশ দিয়ে তাঁর সেনাকে সম্রাটের বাহিনীতে অন্তর্ভূক্ত করে নিলেন। ফলে মীর জুমলার নেতৃত্বের গুণে নেতাহীন একটি বাহিনীও মনে নতুন আগুণ জ্বেলে এগোল। এ প্রসঙ্গে আকিল খান মন্তব্য করলেন আমরা একজনশাহজাদাকে মাত্র হারালাম।

ফিদায়ি খানকে সুতি ইসমান খানকে দেওগাছি রেখে এবং জুলফিকারকে রাজমহলে পাঠিয়ে নিজে সুতিতে ফিরে গিয়ে ১০ জুনে রশিদ খানকে দাউদ খানের কাছে এবং তাঁর পরে কাজি কেরিয়ার কাছে পাঠালেন।

বাংলায় তখন পূর্ণ বর্ষা। মীর জুমলা তাঁর বাহিনীকে ছাউনিতে পাঠিয়ে দিলেন। তাঁর রণনীতি হল মনোযোগ এবং প্রত্যাহার। দেওগাছি দুনাপুর এবং সুতি থেকে সেনা তুলে নিয়ে শুধু দুটি জায়গায় সেনা রাখলেন। ১৫০০০ সেনা নিয়ে মাসুমবাজারে(মুর্শিদাবাদে)এ একটি উঁচু জায়গায় রইলেন স্বয়ং তিনি প্রচুর রসদ নিয়ে। রাজমহলে রইলেন জুলফিকার খান, ইসলাম খান, ফিদায়ি খান, সৈয়দ মুজফফর খান, ইখলাস খান, রাজা ইন্দ্রদুম্ন, কিজিলবাস খান এবং অন্যান্যরা।
(চলবে)

Monday, January 9, 2017

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা৫৬ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার

২। মীর জুমলার দোগাছিতে প্রথম প্রত্যাঘাত
নতুন যুদ্ধ নাট্যশালায় দুর্বিপাক উপস্থিত দেখে নিশ্চুপ না থেকে মীর জুমলা তাঁর বিরুদ্ধ পরিবেশটি পাল্টানোর চেষ্টা করতে লাগলেন আন্তরিকভাবে। রাজমহল(১৩ এপ্রিল) পুনর্দখল করার পরে তাঁর প্রথম কাজ হল যুদ্ধ নৌকো জোগাড় করার চেষ্টা করা, কেননা জলযান ছাড়া এই পরিস্থিতিতে এক পাও এগোন যাবে না। প্রায় একপক্ষকাল ধরে দূর দূর এলাকায় খোঁজ করে বেশ কিছু জলযান জোগাড় হল।

নৌকো ছাড়া কিছুই করা যাবে না বুঝে, রাজমহলে সময় নষ্ট না করে তিনি আরর ১৩ মাইল দক্ষিণে দোগাছির দিকে এগোলেন শাহজাদাকে নিয়ে ১৪ এপ্রিল। সেখানে তিনি শিবির ফেললেন। সেখানে নদীর মধ্যের চরে শত্রুর বিপক্ষ পাড়ে একটা উঁচু ভূমি ছিল। উল্টো দিকে বাকারপুরে সুজার সেনাপতি সৈয়দ কুলি গোলান্দাজ বাহিনী নিয়ে শিবির করে ছিলেন আর সুজা স্বয়ং নদীতে যুদ্ধ ডিঙ্গি করে টহল দিচ্ছিলেন। তাঁর মনে হল এই এলাকার রণনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম, কিন্তু তাঁর সঙ্গে যেহেতু তখনও কোন ডিঙ্গি নেই, সেহেতু সুজার বাহিনী এক রাতে সেটি দখল করে নিয়ে সেখানে গোলান্দাজ বাহিনী বসিয়ে দিয়ে বিপক্ষের ওপরে গোলাফেলার পরিকল্পনা করতে থাকে।

হাতে কয়েকতা ডিঙ্গি এলে মীর জুমলা সেগুলি নির্ভর করে সেই চরটি দখল করতে সুজার বাহিনীর ওপর আক্রমণ করা, সম্ভব হলে নদী পেরিয়ে সরাসরি সুজার বাহিনীর ওপরে হামলা চালাবার সিদ্ধান্ত নিলেন। রাত-জুড়ে ছোট ছোট বাহিনীতে ভাগ হয়ে মীর জুমলার দক্ষ ব্যবস্থাপনায় এবং ব্যক্তিগত নির্দেশে নৌকো করে ২০০০ পদাতিক, কিছু সেনানী - জুলফিকার, ফতে জং, রশিদ খান আনসারি, লোদি খান, সুজন সিং বুন্দেলা, তাজ নিয়াজি সহ অন্যান্য অনুগামী ২০০ বেলদার এবং কড়েকটি কামান নিয়ে চরে ঘাঁটি গাড়লেন। পরের দিন সকাল হতে না হতেই সুজার বাহিনী বিপক্ষকে দেখতে পেয়ে জোর আক্রমন চালালেও তাদের ছেড়ে যাওয়া চরে মীর জুমলার বাহিনী ঘাঁটি গাড়তে সক্ষম হয়।

পরের দিক সুজার বাহিনীর সেনানী ফিদায়ি খান তাঁর সমগ্র নৌ বহর নিয়ে মীর জুমলার গোটা বাহিনীর ওপর জোরদার আক্রমন শানান। দুপক্ষের গোলাগুলিতে নদী দুপাশ ধোঁয়ায় ধোঁয়ায় ভরে যায়। ধোঁয়ার আড়ালে তিনি চরের এক দিকে উঠে এলে তাকে আক্রমন শানান তাজ নিয়াজী এবং তাঁর আফগান যোদ্ধারা। কিছু সময়য় ধরে সমানে সমানে তালে তাল ঠোকা চলল দুপক্ষের। তীরে বসে এই হাতাহাতি লড়াই দেখতে দেখতে মীর জুমলা লড়াইয়ের ফল, সর্বশক্তিমানের ইচ্ছের ওপর ছেড়ে দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত সুজার বাহিনী পিছু হঠতে বাধ্য হয় এবং তাদের কয়েকটি ডিঙ্গি ডুবেও যায়। তাঁর পরেও আরও একটি বিশাল যুদ্ধের পর, যেখানে কামানে কামানের গর্জনে জলের মাছগুলিও অস্থির হয়ে উঠছিল, রণকৌশলগত দিক থেকে চরটি মীর জুমলার বাহিনী সুরক্ষিতভাবে দখল করতে সক্ষম হয়।

৩। সুতিতে মীর জুমলার নৌঅভিযান
বাস্তবে মীর জুমলার প্রথম আঘাতটি যদিও ডাকাবুকোর মত হয়ত হঠাত হঠকারীর মত মনে হতে পারে কিন্তু গভীরে দেখলে যথেষ্ট পরিকল্পনা মাফিক। তিনি নৌকো জোগাড় করেন প্রায় বিদ্যুতগতিতে। সুজার বিরুদ্ধে তিনি প্রথম লড়াইতে জিতলেন কেননা সুজার নিজের নৌবাহিনীর গরিষ্ঠতা এবং দক্ষতার ওপর আত্মসন্তুষ্টি এবং মীর জুমলার নৌ বাহিনীতে তাচ্ছিল্যের ভাব এসে গিয়েছিল, এবং মীর জুমলার এই হতচকিত আক্রমণকেও বিন্দুমাত্র দূরদৃষ্টিতে দেখতে পান নি সুজা। এই হারে সুজা শিক্ষা নিয়ে নতুন করে আক্রমন শানাতে কোমর বাঁধলেন। তাঁর নৌবহর রাজমহল থেকে দেওগাছির মধ্যে টহল দিলেও, রাজমহলে যেখানে নদী সবথেকে চওড়া, সেই রাজমহলে তিনি সব থেকে বেশি গোলান্দাজ নৌকোর টহল চালালেন। ফলে মীর জুমলা বুঝলেন হাতে মাত্র কয়েকটি নৌকো আর নোকোয় ভাসমান কামান নিয়ে ছোট ছোট বাহিনীতে ভাগ হয়ে ওপারের তীরে গিয়ে সদা জাগ্রত বাহিনীকে গেরিলা আক্রমণের রণনীতি এখন আর সফল হবে না। এবং দীর্ঘ লড়াইএর পরেও বিপক্ষের বাহিনীকে এই ধরণের যুদ্ধে তাঁর পক্ষে হারানো সম্ভব হবে না। ফলে অবশ্যম্ভাবীভাবে মীর জুমলাকে রণনীতি পরিবর্তন করতে হল। তিনি সময় নিলেন। উত্তরে রাজমহল থেকে ২৮ মাইল দক্ষিণ পূর্বে সুতির মধ্যের এলাকাটি কয়েকজন বাছা বাছা সেনা নায়কের হাতে ছেড়ে দিলেন; রাজমহলের দায়িত্ব দিলেন মহম্মদ মুরাদ বেগের হাতে, সুজার শিবিরের উল্টোদিকের দোগাছির নেতৃত্ব দিলেন শাহজাদার সঙ্গে জুলফিকার খান এবং ইসলাম খান এবং বিশাল বাহিনীর অধিকাংশ নিয়ে; আরও আট মাইল দক্ষিণে দুনাপুরে আলিকুলি এবং মীর জুমলা নিজে হাজার সাতেক সেনা নিয়ে সুতিতে শিবির করলেন।

সুতিতে মীর জুমলার নিজের ঘাঁটি গাড়া খুব বড় রণনৈতিক পরিকল্পনা ছিল। তার হাতে যথেষ্ট নৌবহর ছিল না। কিন্তু সুতিতে নদীর পরিসর খুবই সরু। স্থানীয়দের থেকে খবর পেলেন এখানে নদী হেঁটে পারাপার হওয়া যায়। এর আগেও তিনি এই রণনীতিতে জিতে এসেছেন। শাহজাদাও মীরের এই প্রস্তাব মেনে নিলেন যে সুজার বাহিনী আর নৌবহরকে নদী পার হতে দেওয়া যাবে না। সেই জন্য এই রণনীতি সক্কলকে জানিয়েও দিলেন। নদীর সমস্ত ফেরি এবং পারাপার হওয়ার রাস্তা বন্ধ হল। এই নিষেধাজ্ঞা এবং নজরদারি এতই কঠিন এবং কড়া করে লাগু হল যে ছিঁচকে চোরেরাও সেই কয় দিন চুপিসাড়েও নদী পার হতে পারে নি, যদি কেউ ধরা পড়ত তাদের নাক কান কেটে ফেলা হত।

শিবির ফেলার পরের দিন মীর জুমলা নদী পার হওয়ার চেষ্টা করলেন। কিন্তু নদীর গভীরতা বুঝতে ভুল হয়েছিল তাঁর। তিনি বুঝলেন স্থানীয় মানুষের কথায় তিনি প্রতারিত হয়েছেন। এবং দেখা গেল ১৪ দিন আগে যে জলস্তর ছিল, তা হঠাত বেড়ে গেল। বেশ কিছু ক্ষতি হল, কিন্তু আরও বড় দুর্ঘটনা থেকে অন্তত সেনাবাহিনী বেঁচে গেল।

মীর জুমলা উল্টোদিকে অবস্থান করছে বুঝে সুজা সুতির উল্টোদিকের পাড়ে নুরুল হাসান এবং দুনাপুরের উল্টদিকে ইসফান্দিয়ার মামুরি এবং তাঁর বড় ছেলে জায়িনুদ্দিনকে তাণ্ডায় দায়িত্ব দিলেন, সে তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে তাদের নিয়ে সেখানে গেল।

মীর জুমলা অতি গোপনে উল্টো দিকের তীরে সেনানী পাঠাবার রণনীতি তৈরি করে যেতে লাগলেন, পরিকল্পনা, কোন একদিন সেখানে গিয়ে তিনি নিজে নেতৃত্ব দেবেন। এই কাজে তাঁর দরকার প্রচুর নৌকো। তিনি পদস্থ আধিকারিকদের হুগলি, কাশিমবাজার বা এই সব এলাকায় যে কোন ধরণের নৌকো – কিস্তি বা ঘুরাবের খোঁজে পাঠালেন। হুঁশিয়ারি দিলেন ব্যর্থ হলে তাঁর পরিবার এমন কি তাঁর দেশকেও তিনি ধুলোয় গুঁড়িয়ে দিতে দ্বিধা করবেন না। হুঁশিয়ারিতে ফল ফলল। ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে তারা শয়ে শয়ে নৌকো জোগাড় করে এনে দিল মীর জুমলাকে। জুলফিকারও তাকে ৪০টি নৌকো দিল। এই নৌকোগুলির সাহায্যে মীর জুমলা সুজার যে কোন আক্রমন আটকাতে পারবেন। ফলে মীর জুমলা পূর্ব তটের ৪০ ৫০ লিগ এলাকা তাঁর নৌবাহিনী নিয়ে টহল দিতে লাগলেন।
পশ্চিম পাড় হাতছাড়া হয়ে গেলে সুজা শত্রুর বাহিনী লক্ষ্য করে গোলা দাগতে ৮টি বিশাল কামান বসালেন। অন্যদিকে মীর জুমলা তাদের ওপর আক্রমণ রুখতে এক রাত্রিতে তিনি ১০ টা নৌকো বোঝাই করে বাছাই সেনা পাঠালেন বিপক্ষের কামান দখল করতে। কিন্তু সেটি সফল হল না। তিনি সময় পরিবর্তন করলেন। পরের দিন দিনে দুপুরে ২০ সেনা পাঠানোর পরিকল্পনা করলেন এবং তাঁর এই পরিকল্পনা অযাচিতভাবে সফল হল। বাতাসে অনুকূলে তর তর করে উজিয়ে গিয়ে হঠাত আক্রমনে বিপক্ষকে হতচকিত করে দিয়ে আটটি কামান এবং ব্যাটারিগুলি কোন ক্ষয় ক্ষতি ছাড়াই তুলে নিয়ে এল।
(চলবে)