Tuesday, March 29, 2011

বাংলার ধানের গোলা২


কড়ুই
বাখারির চাটাই দিয়ে মাটির মেঝে করে(বর্তমানে সিমেন্টের মেঝে) কড়ুই তৈরি হয়. সাধারণতঃ ঘরামিরাই এধরনের পরিকাঠামো তৈরি করেন. কাঠামো তৈরি পর জনে ভিজিয়ে রাখা হয়. তারপর শুকিয়ে আলকাতরা মাখানো হয় দীর্ঘ সময়ে বাঁচিয়ে রাখার জন্য.  উল্টো শঙ্কুআকৃতির হয় কড়ুই. ধান ঢালার জন্য ওপরে বড় দ্বার আর নিচে ধান বের করার জন্য ছোট দ্বার তৈরি হয়. কড়ুএএর ভিতরের দিকে মাটি, খড়েরকুচি, আর গোবর জলে গুলে প্রলেপ দেওয়া হয়. এই প্রলেপের জন্য কড়ুইতে অতিরিক্ত হাওয়া ঢুকতে পারে না. কড়ুইএর ছাদ মরাইএরমতই ছাওয়া হয়. ছোট থেকে বড় নানান আকৃতির কড়়ুই হয়. ৩০ থেকে ২৫০ মন পর্যন্ত ধান এই আধারে রাখা যায়. সাত থেকে ১০ হাত পর্যন্ত এইগুলি উঁচু হয়. মাঝেমধ্যে দেওয়ালে আলকাতরা লাগিয়ে আর মেঝেতে গোবরের প্রলেপ নিকিয়ে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়.
ডোল
অনেকগুলি চটের বস্তা পরপর সেলাই করে জুড়ে বড়সড় ব্যাগের আকার দেওয়া হয়. একেই ডোল বলে. এর মধ্যে ধান রাখা হয়. খড় মাটিতে বিছিয়ে তার ওপর সেলাইকরা ডোল রেখে তার ওপর দিয়ে ধান ঢালা হয় এবং এমন এক যায়গায় রাখা হয়, যাতে মাথার ওপর ছাউনি থাকে. বন্যাকবলিত এলাকায় প্রয়োজনে ধানের বস্তাগুলোকে সহজেই চালে ঝুলিয়ে রাখার ব্যবস্থা হল ডোল.
বাঁদি
নানান আদিবাসী অঞ্চলের ধান রাখার পাত্র বাঁদি. খড় দিয়ে কোকুনেরমত আধার তৈরি করা হয় তার নাম বাঁদি. আড়াই থেকে তিন ফিট আকারের এই বাঁদি হয়. বর দিয়েই জড়িয়ে এই বাঁদি তৈরি করা হয়. দু থেকে তিন মনেরমত ধান এই বাঁদিতে রাখা হয়. ঘরের উঁচু স্থানে বাঁদিগুলি মাচা বেঁধে রাখা হয়. কোড়া, সাঁওতাল সমাজ এই ধরনের আধারে ধান রাখেন. 
ধান্যগলি
হুগলির আরামবাগ অঞ্চলে মাটির বাড়ি তৈরির সময় দেওয়ালের মধ্যে কলাগাছের কান্ডেরমত পচনশীল সামগ্রী রেখে দেওয়াল তৈরি হয়ে গেলে দেওয়ালে ভেতরে খাঁকা অঞ্চল গলিরমত দেখতে হয়. তাই এই নাম গলি, আর ধান রাখা হয় বলে এর নাম ধান্যগলি. দুতিন তলা মাটির বাড়ি হলে এই এই গলিপথ বেশ বড় হয়. ওপর থেকে ধান ঢেলে নিচে ধান বের করানোর স্থানটি কপাট দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়. প্রয়োজনে কপাট খুলে ধান বের করা হয়.

বাংলার ধানের গোলা১

সারা পৃথিবীর ধান্যউত্পাদক অঞ্চলেই ধান রাখার আগারের কথা পাওয়া গিয়েছে. বাংলার নানান প্রান্তে নানান ধরনের ধান গোলা তৈরি হয়. গঠণের তারতম্যে এদের ভিন্ন ভিন্ন নামকরণ হয়. মরাই বা তলা, কড়ুই, বাঁদি, ডোল ইত্যাদি.
গোলা
প্রচুর পরিমান ধান রাখা যায়. অন্ততঃ ৫ থেকে ১০ মন পর্যন্ত. সেগুলির চেহারা অনেকটা আয়তকার বাড়িরমত. মেঝে সাধারণতঃ মাটিরই হয়, আবার পাকাও হতে পারে. এর স্থান মাটির কিছু ওপরেই. এর ভেতরে এক বা অনেক কুঠুরিও থাকতে  পারে. গোলার দেওয়ালে থাকে জানালা. মই বা সিঁড়িতে উঠে এই গোলাতে ঢুকতে হয়. গোলার দেওয়াল নিকোনো মাটিরও হতেপারে আবার আজকালের রীতি অনুযায়ী সিমেন্ট দিয়ে লেপাও হয়. গোলার নিচের ছোট দ্বার খুলে দিয়ে নানান সময়ে প্রয়োজনে ধান দেরকরা হয়.
মরাই
মরাই নানান কিছু দিয়েই হতে পারে. দক্ষিণ বঙ্গের নানান জেলায় হাওড়া, হুগলি, মেদিনীপুর পূ, বর্ধমান, বীরভূম, বাঁকুড়া প্রভৃতি জেলায় খড়ের দড়ি পাকিয়ে পাকিয়ে প্রায় শঙ্কু আকৃতির ২০ থেকে ৪০ হাত পর্যন্ত উঁচুও মরাই তৈরি হয়. এছাড়াও বাঁশের বাঁখারির বুকো বা বোনা চাটাই দিয়েও মরাই তৈরি হয়. মরাইতে সাধারণতঃ ১ থেকে ৪ মন পর্যন্ত ধান রাখা যায়. মরাই তৈরির পদ্ধতি দেশজ কারিগরি দক্ষতার একটি বড় শৃঙ্গ.
মরাইএর প্রধান উপকরণ পাকানো অথবা বিনুনি পাকানো খড়ের দড়ি, বীরভূমে যাকে বর বলে.  খড়গুলিকে আগি ভিজিয়ে রেখে শুকিয়ে নিয়ে নরমন করা হয়. এবার পাকানোর কাজ. একহাতে কাজ হলে বিনুনিটি বেশ চওড়া হয় আর দুই হাতে - একজন পাকানো আর এক জন খড়ের যোগান দিলে সেই বিনুনি অনেক সরু হয়. খড়ের পর খড় জুড়ে দীর্ঘ বিনুনি তৈরি করা হয়. সাধারণতঃ নিম্ন আয় সম্পন্ন বাড়িতে এক জন সাহায্যকারী থাকেন যিনি দক্ষ কারিগরকে হাতজুড়ে সাহায্য করেন.
মরাই তৈরির জন্য মাটির ওপর সমান্তরাল দুটি মাটির দেওয়াল তৈরি করা হয়. একে পায়া বলে. এক ওপর সমান্তরালভাবে বাঁশ সাজিয়ে মেঝেটা ঘন করা হয়. মেঝে হয় দুই হাত থেকে তিন হাত ব্যাসের. মাটি থেকে দেড় থেকে ৩ হাত উঁচু হতে পাকে এই মেঝে. মেঝেয় ঘনকরে সাজানো বাঁশের ওপর খড় বিছিয়ে দেওয়া হয়. যেমন আকৃতির মরাই গৃহস্থ চাইছেন সেই আকৃতির মেঝে করে সেটির ওপরে বরকে গোল করে ঘুরিয়ে রাখা হয়. এই বরগুলেকে ঠিকঠাক গোল করার জন্য বাঁশের বাতা দিয়ে টেনে রাখা হয়, যাতে এগুলি গুটিয়ে না যায়. নিচের থেকে ওপরের অংশ এনেকটা চওড়া হয়. বরের ভেতরের অংশে বরগুলিকে ঘণকরে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়.
এবারে মরাইএর ওপরে ছাওয়ার পালা. আরএক প্রকার পাকানো দড়ি যাকে বুট বলে, তা নিচেরদিকে বেড় দেওয়া হয়. বেড়ের ভেতর খড়কে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়. পুরো মরাই তৈরি হয়ে গেলে মাথা ছাওয়ার কাজ. খড়ের গোড়র দিকটা ছাউনির ভেতরে থাকে আর মাথার দিকটা বাইরে. প্রায় শপণেরমত খড় লাগে একটা মরাই ছাইতে. ছাওয়ার পর এবার মাথায় খড় দিয়ে মুকুট তৈরি হয়, যাতে ভেতরে জল না পড়ে. 
মরাইতে দুতিন বছর পর্যন্ত ধান রাখা যায়. ধান বের করা হয়েগেলে বরগুলি গুছিয়ে রাখতে হয়. ধান বের করার দরকার হলে নিচের দিকের দুচি বরের মাঝখানে শাবল দিয়ে ফাঁক করে এই ফাঁকে একটা বাতা গুঁজে ফাঁকটা রেখে দেওয়া হয়. এবার সামনে মেচলা বা যে কোনো পাত্র ধরলে সেই পাত্রে ধান পড়ে. তবে খুব বেশি ধান এই মরাই থেকে বের করা হয় না, ধসে পড়ার আশংকা থাকে.

Monday, March 28, 2011

ধূসর মৃত্যুর ছায়া – লোকনাট্যের সন্ধানে এক পরিক্রমা৬


সাধারণতঃ ছোকরাদের ছাড়া আর কোনও শিল্পীর পোষাকের প্রতি নজর দেওয়া হয় না একটা ময়লা ধুতি, ছেঁড়া চটি পরে কোনও অভিনেতা হয়ত মঞ্চে এসে বলেন সে অমুক দেশের রাজা বা তমুক গ্রামের মোড়ল এই অতিশয়াক্তিতে কোনো দর্শকের বিন্দুমাত্র চিত্র বিক্ষেপ ঘটে না আর যে অভিনেতা আগের মুহূর্তে রাজার বা রানীর চরিত্রে অভিনয় করে মাতিয়ে দিয়ে গেল বা বাজনদারদের সঙ্গে প্রকাশ্য মঞ্চে বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে ধুয়া ধরছিল তারস্বরে সেই হয়ত মাথায় ঘোমটা টেনে অর্থাত মাথায় পেতে রাখা গামছাকে মুখের ওপর একটু ঝুঁকিয়ে দিয়ে ঘোমটারমত করে রাজবাড়ির দাসী হয়ে অভিনয় করে আবার নিরুপদ্রবে ধুয়ো ধরতে বসে যায় আধুনিক নাটকের এটাচমেন্ট – ডিটাচমেন্ট তত্ব তাঁরা শতাব্দর পর শতাব্দধরে প্রয়োগ করে চলেছেন তারা বোধহয় জানেন না এর পরেও পশ্চিমি ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত উচ্চবর্নের শহুরে সমালোচকেরা চসমা উঁচিয়ে, ভুরু তুলে, নাক কুঁচকে নিদান দেবেন গ্রামের লোকনাট্যে সূক্ষ্মতার পরিবর্তে স্থূলতাই বেশি করে প্রকাশ ঘটে
কয়েক বছর আগে পশুপতি প্রসাদ মাহাতোর ভাঁড় যাত্রা দেখার অভিজ্ঞতা শেনাচ্ছিলেন, বলছিলেন কীভাবে থার্ড থিয়েচারের বীজ ছড়িয়ে রয়েছে তথাকথিত নিরক্ষর অথচ অভিকর শিল্পে জ্ঞাণীগুণী মানুষদের কাজে আগেই উল্লেখ করা গিয়েছিল, লোকনাট্যের অনেক আঙ্গিকেই প্রথাগত সাজঘর না থাকায়, অভিনেতারা অভিনয় করার পর বাদ্যকরেদের সঙ্গে বসে কালক্ষেপ করেন. তাদের সঙ্গী হয়ে ধুয়াও ধরেন. চারদিক খোলা মঞ্চে অভিনয়ের জন্য বর্তমান আধুনিক প্রসেনিয়াম নাটকে প্রযুক্ত ক্লক ওয়াইজ আর এন্টি ক্লক ওয়াইজ পদক্ষেপণের জন্য দেহারদের অক্ষদণ্ডধরে অভিনেতারা অভিনয় করেন. এখানেই লোক নাটকের প্রয়োগবাদিতার সমাপ্তি ঘটেনা. সাধারণতঃ যে অঞ্চলে কালাকুশলীরা অভিনয় করতে যান, সেই অঞ্চলেরই কোনও এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নিয়ে পালাগান বাঁধেন তাঁরা. পুরোটাই কিন্তু গানের ওপর নির্ভর করে. আর অধিকাংশ অভিনেতা নিরক্ষর হওয়ায় তাঁরা কণ্ঠস্থ রাখেন সমগ্র গানগুলি. এই গানগুলির ওপর বিনি সুতোর মালা গাঁথা হয় তাত্ক্ষণিক কথোপকথনের মাধ্যমে. মনসা মঙ্গল বা বিষহরি পালার শেষে অভিনেতারা মনসার উদ্দেশ্য নিবেদিত থালা হাতে করে নেমেযান দর্শকাসনে. গ্রাম্য মহিলারা থালার রাখা প্রদীপের পাশের সিঁদুরে আঙুল ছুঁইয়ে চুড়িতে, সিঁথিতে বুলিয়ে দেন আর প্রদীপের শিখার ওপর হাতের চেটো ধরে সেই তাপ সঞ্চার করেদেন পরবর্তী প্রজন্মের বুকের অন্তরে. প্রতিদানে অবশ্যই দেন কিছুমাত্র দক্ষিণা.
যার মধ্যে এত সম্ভাবনা, যে সংস্কৃতির মধ্যে অন্তঃসলিলা স্রোতেরমত বয়ে চলে দেশজ মানুষের সমষ্টির সবাইকে নিয়ে বাঁচার দর্শণ, যার টানে আজও গ্রামে-গঞ্জে টিভি-সিনেমা-যাত্রার মায়াকুহকময়বিতংস ছাড়িয়েও দর্শক ভিড় করেন পালাগানের টানে, যে ভারতীয় ঐতিহ্যকে সমস্ত কালাপাহাড়ি আক্রমণ থেকে বাঁচিয়ে নিয়ে চলেছেন এই দুর্দিনে, কেন তার গায়ে অস্তগামী সূর্যের ম্লান কিরণরেখা, কেন তাকে আজও স্বীকার করতে কুণ্ঠা, এই এত কেনর উত্তর পাওয়াটা বেধহয় খুব একটা শক্ত কাজ নয়. তবুও লেটোর হরকুমার, আলকাপের করুণাকান্ত বা অন্যান্য পালাগানের সংদারদের অসম্ভব দেশজ হাল না ছাড়া জেদেই মাটির সুর আর মাটির গান টিকে রয়েছে টিমটিম করে, প্রত্যকটি সমাজের নতুন প্রজন্মের আর সরকারি সমস্ত উপেক্ষা সত্বেও. আজ এক সন্ধিক্ষণ সমাসন্ন, যে সময়ে নতুন করে এই সমস্ত সহজ অথচ অনির্দেশ্য উত্তরগুলি খোঁজার সময় এসেছে শহুরে উদ্যমী, অনুসন্ধিত্সু মানুষজনের সামনে, বিশেষ করে আগামীপ্রজন্মের সামনে কোনো নির্দেশকময় কাজ না করে যেতে পারলে উত্তরপ্রজন্মের ক্ষমা আর পাওয়া যাবে না এ কথা স্পষ্ট করে আজই বলে দেওয়া যাক.

ধূসর মৃত্যুর ছায়া – লোকনাট্যের সন্ধানে এক পরিক্রমা৫


এই ধরণের জনঅংশগ্রহণ শুধুই যে আলকাপে ঘটে বললে পশ্চিমিধারায় সত্যের অপলাপ হবেতো বটেই, কেননা লেটো, গম্ভীরা, মাছানি, বনবিবির পালারমত নানান অঞ্চলের লোক নাট্যের ক্ষেত্রেও সমানভাবে সত্য লোকনাট্য বললে যেন মনে হয়, শুধুই নাটক এই আঙ্গিকের মূল স্তম্ভ নয়, গান আর নাচের সমবিব্যহারে গড়েওঠে একটি লোকনাটকের আঙ্গিক ভারতীয় সিনেমায় হঠাত হঠাতই গান গেয়ে ওঠে নায়ক বা পার্শ্বচরিত্র, সেটাই আদত লোক নাটকের দান আগেই বলাগিয়েছে, লোকনাট্যের প্রত্যেক কুশীলবই যেন স্বয়ংসম্পূর্ণ শিল্পী নাচ, গান আর অভিনয় – অভিকর শিল্পের এই তিন মূল স্তম্ভে সমাভাবে দক্ষতা অর্জন করেছেন তাই গ্রামীণেরা রাতে শুধু নাটক দেখতে যান না, তারা পালা-গান বা শুধুই গান দেখতে যান, যা শহুরে যাত্রাগানের ক্ষেত্রেও সমান প্রযোজ্য তাই অনায়াসে গান গেয়ে ওঠেন রাজা-রানী – এর জন্য অলাদা পরিমণ্ডল তৈরিরও প্রয়োজন হয়না, হাজার হাজার বছরের রসজ্ঞানী দর্শক হতচকিত না হয়ে, যেন তৈরিই থাকেন এমন এক শৈল্পিক বাঁকের সামনে
বাংলার দক্ষিণ অঞ্চলে লোকনাট্যের অন্যতম প্রদান উপাদান ছোকরারা এঁরা নাচে, গানে, লাস্যে উজ্জ্বল করে রাখেন লোকনাট্যের আসর আর তার প্রধান পৃষ্ঠপোষক দর্শককুলকে এই ছোকরাদের অভিনয় প্রতিভা কোনো প্রতিষ্ঠিত মহিলা শিল্পীর থেকে একচুলও ন্যুন নয় শ্রদ্ধেয় সিরাজমশাইএর জবানিতে শোনা যাক – মোয়েদের হৃদয় ও মুখমন্ডল বিশিষ্ট তরুণ পুরুষের শরীরে কিংবদন্তীর গ্রাম পরীরা কীভাবে অনপ্রবেশ করে দেখেছি আলকাপ দলের নাচিয়ে ছোকরার প্রেমো পড়েছি অচরিতার্থ কামনায় জ্বলে মরেছি ১৯৫০এ তার ছিল চৌদ্দ বছর অপূর্ব মুখশ্রী আর দেহের গড়ন ওকে ছেলে বলে চেনা কঠিন ছিল আমার প্রথম বিভ্রম সে সেই ভালবাসা কেনো মেয়েকে দেওয়া যায়না কারন তার সবটাই ছিল মনের আর শুদ্ধতার তার শারীরিক নটে গাছটি মুড়িয়ে যায় না – দীর্ঘ মিথে বেঁচে থাকে(দেশ সাহিত্য সংখ্যা, ১৩৮৩) এক ছোকরাকে নিয়ে দুই ধনবান পুরুষের লাঠালাঠিতে বেঁচে গেছে কত দল ভেঙেছে কত পরিবারের দাম্পত্য এরকম বহু জনশ্রুতি শোনাযাবে আলকাপের ধাত্রীঅঞ্চল ভাগবানগেলা গ্রামেরমত পশ্চিমবঙ্গের কত কত গ্রামে আজও শুধু আলকাপ নয় নানান লোকনাট্যের দলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কত বুকভাঙা কাহিনীর দীর্ঘশ্বাস লেটোর কৃতি সংদার হর কুমার গুপ্ত আর আলকাপের কে কে(করুণাকান্ত) হাজরা শুনিয়েছিলেন এরকম নানান কাহিনী আজ থেকে অন্ততঃ বিশ বছর পূর্বে
যাঁরা কোনো লোক নাট্য দলের মহড়া দেখেছেন তাঁরাই সাক্ষ্যদেবেন যে, এঁরা কেউ শহুরে বিশেষজ্ঞদের বর্ণনায় স্বভাব শিল্পী নন সকলেই সমান পরিশ্রমে সমান শৈল্পিক প্রচেষ্টায় নিজেকে তিন তিন করে গড়ে তোলেন নিজেদের গ্রামে হ্যাজাকের আলোর সামনে বছরের পর বছর হাজার হাজার কালো মাথা আর খাটিয়ে হৃদয় ভেদ করে এক একজন প্রশিক্ষিত শিল্পীই তার সম্মোহনকারী স্বরক্ষেপ, অভিনয়, বাজনা দর্শকদের অন্তঃস্থলে প্রবেশ করতে পারেন, শুধু স্বভাবে একদিন বা দুদিনই ঘটতে পারে, কিন্তু দীর্ঘকালের কঠোর অনুশীলনই পারে একদল শিল্পী বা দলকে কিংবদন্তীর পর্যায়ে তুলে নিয়ে যেতে
ছোকরারা ভূমি মঞ্চে প্রবেশ করেন আসর বন্দনায় বন্দনার বিযয় নানান ধরনের হতে পারে মঞ্চ থেকে গুরু, পিতা-মাতা থেকে পরিবেশ, গ্রাম থেকে উপস্থিত দর্শক, দেবদেবী (যে কোনো ধর্মের) থেকে চতুর্দিক সব কিছুই চলে আসে বন্দনাংশে বন্দনাশিল্পীদের আশা, প্রণাম চাওয়া সকলের আশীর্বাদ যেন দলের মাথায় আশিসস্বরূপ ঝরে পড়ে আর তাদের দলের গান দর্শকদের গ্রহনীয় হয় বোলানের একটি ছোট বন্দনা, প্রণমি গণরায় আমারে দেহ অভয়, তোমারি করুণায় বেদনা দূরে যায়, দয়াময়ী দীন তারিনী সেজো না আর পাষাণী, ভবানী ভৈরবী তুমি পাষাণের নন্দিনী লেটোর বন্দনা বাহিরের পুজা বাহিরে মা গো-, বাহিরের পুজা বাহিরে নাও, অন্তরের পুজা অন্তরে নাও মা আমার, আরতি ধর মা আমার এবার আলকাপ জগজ্জননী মাগো তারা, জগতকে তরালি, আমারে কাঁদালি, আমি কী মাতোর চরণ ছাড়া, জগজ্জননী মাগে তারা গানের শেষ পদটি ধুয়ো বা ধ্রুবপদ বাজনদারদের সঙ্গে বসে দোহারেরী শেষ পদটি নিয়ে ধুয়া ধরত ছোকরাদের গানসহ নাচের শেষে

ধূসর মৃত্যুর ছায়া – লোকনাট্যের সন্ধানে এক পরিক্রমা৪


বাংলার ধারের শিল্প, প্রসেনিয়াম থিয়েটারের যখন পিঠ দেওয়ালে ঠেকেছে, তখনই শুরু হয়েছে, সেই বদ্ধজলা থেকে বেরোনোর বিকল্প রাস্তার, আঙ্গিকের খোঁজ সেই আঙ্গিকের খোঁজে শহুরে ধারকরা নাট্য পা বাড়িয়েছে লোকনাট্যের ব্রাত্য আঙিনায় সেই খোঁজ কতটা আন্তরিক আর কতটা দায়ে পড়ে সেই পশ্চিমি বিতর্কে না ঢুকে বলা যায়, শহুরে সমাজ আজ বুঝেছে ধারের সম্পদে ঝুলি ভরলে সেই ধারের ভারে একদিন ন্যুব্জ হতেই হয় তাই ফিরে চলা শেকড়ের পানে একে একে কলকাতার প্রসেনিয়াম থিয়েটার, যারা বিকল্প ভাবনা, আঙ্গিকের কথা বলেন, একে একে আপন করে নিলেন নানান লৌকিক লোক নাটকের আঙ্গিক যে কেনো নাট্য উত্সবে লৌকিক আঙ্গিকের নাটক দেখার জন্য লাইন এখন কিংবদন্তির পর্যায়ে, শম্ভু মিত্রের চাঁদ বণিকের পালা শুধুই পাঠ দেখা, মাধব মালঞ্চি কইন্যা, চাক ভাঙা মধু আথবা গোপীচন্দ্রের পালা ভেঙে দেয় সমস্ত নাট্য প্রযোজনার অতীত গৌরব
আর নতুন করে পশ্চিম থেকে ধার করা থার্ড থিয়েটার, বা থিয়েটার ফর দ্য অপ্রেসড তার প্রেরণা কিন্তু এসেছে লৌকিক নাট্য থেকে বিংশ শতকের মাঝের দিকে যখন পশ্চিমি(যাকে বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রদ্ধাভরে আন্তর্জাতিক ছাপ মেরে দিয়েছে) চিত্রকলা প্রায় গতিহীন হয়ে পড়ে, তখন তাকে পথ দেখাল আফ্রিকার প্রাচীণ মুখোশ, গুহাচিত্র আর অতীতের গুহাচিত্রাবলী আজ বাংলায় যখন প্রবাদপ্রতীম প্রসেনিয়াম থিয়েটার মুখ থুবড়ে পড়ছে, তার সামনে বিশাল একটা প্রশ্ন চিহ্ন ঝুলে রয়েছে, তখন তাকে সসম্মানে পথ দেখাচ্ছে একদা ব্রাত্য, অশ্লীল, বাংলার নানান লৌকিক নাট্য আঙ্গিক
পথ দেখানোর কথাই যখন উঠল, তখন একবার বাংলার লোক নাট্যের আঙ্গিকের অন্দরে ঝাঁকি দর্শণ করে আসা যাক বিশ্বের নানান দেশের লোকনাট্যেরমতই বাংলার লোক নাট্যের অধিকাংশই অভিনীত হয় ভূমি মঞ্চেস প্রসেনিয়ামেরমত অভিনেতা অথবা দর্শকের মধ্যে থাকেনা কোনো আড়াল বা দার্শনিক বিভাজন, লৌকিক জীবনের অংশিদারি দর্শনের অনুসরনে সকলেই যেন একস্তরেই অবস্থান সেখানে না থাকে কেনো উইংসএর চাপানো বাহুল্য, থাকেনা কোনো তৈরি করা সাজঘর লৌকক নাটকে বাজনদারেরা একটা বড় অংশ পালন করেন তাঁরাও যেন একটা বড় অংশিদার আর এই নাট্য আঙ্গিকের প্রত্যেক অংশিদারেরাই যেন পরিপূর্ণ শিল্পীর মর্যাদা পেয়ে আসেন, তাই কখোনো কখোনো বাজনদারেরাই অবলীলায় অভিনয়ও করেন অথবা গানও গেয়ে ওঠেন কোনো আঙ্গিকে বাজনদারেরা বলেন আসরের মাঝে আবার কোনো আঙ্গিকে বলেন আসর ঘিরে, মাঝখানের ছাড়া অংশে অভিনীত হয় আলকাপ পুস্তকে ফণি পালমশাই বলছেন, চণ্ডী মণ্ডপে বা পার্শ্ববর্তী ভাঙা হাটের খোলা ময়দানে বাঁশ পুঁতে সামিয়ানা টাঙিয়েছে অভাবে কোথাও কোথাও আবার চট বা চাটাই টাঙানো আশ্চর্যের নয় মাতব্বর লোকেরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে কিছু চাল ডাল সংগ্রহ করছেন, কিছু টাকাও চাল ডাল সংগ্রহ করে আলকাপ দলের লোকজনদের খাওয়াতে হবে আর টাকাটা বখশিস

ধূসর মৃত্যুর ছায়া – লোকনাট্যের সন্ধানে এক পরিক্রমা৩


কোম্পানি আমলের প্রথম থেকেই গ্রামীণ বাঙালি লুঠেরা কোম্পানি রাজের ওপর খড়্গহস্ত তিতুমীরের আন্দোলন দিয়ে যে বিদ্রোহী গ্রামীণ লৌকিক বাংলার জয় যাত্রা শুরু, সেই জয়যাত্রা শেষ হবে স্বাধীণতা আন্দোলনের পর নতুন করে পশ্চিমিভাবধারায় উদ্বুদ্ধ শাসক মধ্যবিত্তের হাতে পরাধীন হয়ে অথচ শহুরে বাঙালিরা ঠিক ততখানি উদারতার সঙ্গেই সঙ্গ দিচ্ছে কোম্পানির নানান উদ্যমকে তাই শহুরে বাংলা গদ্যের বিকাশে বিদেশিয়দের, অভিযাত্রিকদের, ধর্মপরিবর্তকদের ভূমিকা বেশ বেশি বলেও গ্রামীণ সংস্কৃতির বিকাশে এঁদের ভূমিকা স্বাভাবিকভাবেই খুব বেশি নেই বললেই চলে প্রথম থেকেই গ্রামীণ বাংলাকে বর্জন করেছিল ব্রিটিশ শাসক বাংলায় এক লাক পাঠশালা ভংস করে সর্বশিক্ষার ধারণাটাকেই শহুরে মধ্যবিত্তের সহায়তায় উপড়ে ফেলল ততকালীন রাজশক্তি ধর্মপ্রচার, ধর্মপরিবর্তন এবং এদেশের নানান প্রযুক্তি, শিক্ষা ব্যবস্থা, এবং নানান তথ্য পঞ্জীকরণ করতে গিয়ে(আদতে তা চুরিই) দেখলেন হাজার হাজার বছর ধরে লৌকিক বাঙালিরা এক সমৃদ্ধশালী বাংলা গড়েছে এই সমৃদ্ধ সমাজকে তাঁরা দেগে দিলেন অবোধ, অজ্ঞ আর পিছিয়ে পড়া হিসেবে ফলে মেকলের পদ্ধতিতে শিক্ষিত বাঙালির একটা বড় অংশ দুরছাই করলেন তাঁর নিজের সংস্কৃতির শেকড় থেকে দূরে সরে গিয়ে
তবুও বিদেশিয় শিক্ষাব্যবস্থা বিদেশিয় দর্শেণের বাইরে বেরিয়ে এসে এক ঝাঁক মানুষের প্রণোদনা জাগল শেকড়ে ফিরে যাওয়ার গ্রামীণ মানুষের মুখের কাহিনী, সঙ্গীত, নাটক, শিল্প পুনরুদ্ধারে তাঁদের অনেকেই জাবনপণ করলেন সেই প্রণোদনায় গড়ে উঠল বিদেশিপ্রভাবের বাইরে বেরিয়ে এসে নতুন করে দেশ আর তার মানুষ, তাদের সংস্কৃতিকে জানার আকুলতা অথচ এদের মধ্যেও বিভেদের রূপরেখা দেখা দিল ক্রমশঃ লোক সাহিত্য যখন নতুন করে তার পথ খুঁজে নিচ্ছে নিজস্ব গতিজাড্যে, তখন লৌকিক নাটককে আদৌ সাহিত্য বলা হবে কীনা, তা নিয়ে চুলচেরা বিরোধ দেখা দিচ্ছে দেশজ ভাবধারায় শিক্ষিত আর বিদেশিয় মেকলে পদ্ধতিতে কালো সীহেবদের মধ্যে দেশের মধ্যে নানান সাহিত্যিক কর্মকাণ্ডকে আলাদা করে দেখার দর্শণে উদ্বুদ্ধ শহুরে শিক্ষিতদের মধ্যে থানা গেড়েছে বেশ ভালভাবেই বিদেশিয় ভাবধারা অনুসরনকারীরা লোক সাহিত্যের মধ্যে ভাগ বয়ে নিয়ে এলেন উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে বিদেশিয় শিক্ষা পদ্ধতিতে শিক্ষিতরা সাহিত্য বলতে অনেকদিনই বুঝিয়েছেন, ছড়া, গীতিকা, গান, লোক-কথাকে লোকনাট্যও যে লোক সাহিত্যের এক শক্তিশালী মাধ্যম সেই তথ্যকে উদ্দেশ্যপূর্ণভাবেই উপেক্ষা করা হয়েছে দীর্ঘদিন বিপক্ষদের যুক্তি লোক নাটক অভিকর শিল্প বা পারফর্মিং আর্ট, তাই সে সাহিত্য পদবাচ্য নয় তখন দেশাভিমানিনী বিপক্ষ দল প্রশ্ন তুলল, লোক সঙ্গীত যদি সাহিত্যপদবাচ্য হতে পারে, তাহলে লোক নাটককে সাহিত্য অভিধা দানে কেন ইতস্তত করা! ভারতীয় নাট্য দর্শনে আমরা যে চুলচেরা বিভাগগুলি পাই তাতে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে শিল্পী সঙ্গীত, নৃত্য আর নাট্যে পারদর্শী, তাকেই পরিপূর্ণ শিল্পীর অভিধা দেওয়া হয়েছে এবং লোক নাট্যগুলিতে স্বাভাবিকভাবেই ভারতীয় দর্শণ বর্ণিত পরিপূর্ণ শিল্পীর পরিচয় দেখতে পাই

ধূসর মৃত্যুর ছায়া – লোকনাট্যের সন্ধানে এক পরিক্রমা২


ছোটেলোকেরা যে আমোদ করে তাকেই বলে লেটো ভদ্রলোকের শোণার যোগ্য নয় এই রায় দিয়েছিলেন আমার ন-কাকা – পাঁচুগোপাল রায় হয়ত বিষন্ন কৌতুকে বিখেছিলেন সুকুমার সেনের নট নাট্য নাটক বইতে নিজের শর্টহ্যান্ডে নেওয়া একটি লেটে পালা সংযোজনের মুখবন্ধে লেটোরমতই বাংলার নানান প্রান্তজুড়ে ছড়িয়েথাকা আরও অনেক লোকনাটকে পাতে দেওয়ার যোগ্য বলেই মনে করেনি শহুরে পশ্চিম শিক্ষায় শিক্ষিত উচ্চবর্ণের সংস্কৃতির জ্যাঠাশাই ন-কাকারা বহু শত বছর ধরেই শহরের প্রান্তে নিজেদের এক নিজস্ব সমাজবীক্ষা গড়ে তুলে ছিলেন গ্রামীণ প্রচারবিমুখ অথচ সাংস্কৃতিভাবে ঋদ্ধ, চাহিদা-সংস্কৃতির বিরোধী এক যৌথ সংস্কৃতি গড়ে তুলে চাওয়া শিল্পীরা অথচ সুকুমার সেন মশাই প্রগুক্ত পুস্তকেই বলছেন, খ্রিস্টপূর্ব কাল থেকে আমাদের দেশে যে ধরনের নাট্যকর্ম পন্ডিতদের অগোচরে একটানা চনে আসছে বলাযায়, তার জের এখোনো পশ্চিমবঙ্গে বর্ধমান ও হুগলির দামোদর উপত্যকায় মুসলমান গুণীদের মধ্যেই সেদিন পর্যন্ত চলে এসেছে সুকুমারবাবু নিজে বর্ধমানের মানুষ ছিলেন, কিন্তু বর্ধমানের বাইরেও সারা বাংলা জুড়ে এই নাট্য জড়িয়ে রয়েছে শীতের মমতাময় কাঁথারমত ইংরেজ শাসনের আমল থেকেই শেকড় ছেঁড়া সংস্কৃতিতে উদ্বুদ্ধহয়ে ওঠা ইংরেজি শিক্ষিত উচ্চবর্ণ সমাজ পশ্চিমি শেকড় ছেঁড়া সংস্কৃতিতে দীক্ষিত শহুরে বাবুসমাজ নিজের শেকড় খুঁজতে না গিয়ে ভাঁড় শুঁকে মেতে উঠলেন, প্রসেনিয়াম থিয়েটার, চলচ্চিত্রের মুগ্ধতায় দেশের সংস্কৃতির প্রতি নতুন করে কোনো আগ্রহও গড়ে উঠলনা বুদ্ধিজীবিদের ধারণা ছিল চৈতন্য উত্তর বাংলার সংস্কৃতির ছিল বন্ধ্যা সে সময় কোনো আশার আলো দেখা যায়নি ব্রিটিশ আর ব্রিটিশের ধামাধরা সংস্কৃতির ইতিহাসের প্রবক্তাদের বক্তব্য ছিল, বাংলা সংস্কৃতিতে অন্ধকারের প্রতিচ্ছবি তাই অন্ধকারের তথাকথিত অনির্দেশ্য পথে না ছুটে তারা ছুটে চললেন উজ্জ্বল অথচ ভূমির সঙ্গে সম্পর্ক রহিত এক আলেয়ার পিছনে নিজেদের আপাত দৈন্য ঢাকতে বিভিন্ন তথ্যের মসলা ফোড়ন সহযোগে প্রমাণ করার চেষ্টা চলল চৈতন্য উত্তর বাংলা সংস্কৃতিতে সৃষ্টির দৈন্যের নানান তথ্য এ ধরনের মানুষজনের দাবি, বাংলার প্রণোদিত নবজাগরণের ধারাতেই তাঁরা পুনর্জন্ম প্রদান করলেন বঙ্গসংস্কৃতিকে এই সেদিন পর্যন্ত কয়েকজন সনাতন বাংলার সংস্কৃতিতে প্রণত উত্সাহী, গবেষক, পন্ডিত ছাড়া গ্রামীণ সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় ছিল না শহুরে হাতেগোণা নবজাগরণে অগ্রদূতেদের বঙ্গ গ্রামীণ সংস্কৃতির নামে বাঙালি যা পরিচয় পেয়েছে তা হল, শহুরে অনুসরণ হনুকরণপ্রিয় পিটুলিগোলাসম সংস্কৃতি শুধু চৈতন্যোত্তর সময়েই নয়, হাজার হাজার বছর ধরেই সমগ্র বাংলা নিজস্ব সংস্কৃতির জারন রসে নিজেকে টিকিয়ে, জারিয়ে রেখেছিল এটাই বাস্তব এই তত্বের বিরুদ্ধে একটাই প্রশ্ন তোলা যায় যে তিনশে বছর ধরে কোনো সভ্যতা কী সংস্কৃতি ছাড়া বেঁচে থাকতে পারে এর উত্তর পেতে পথে নামলেন একঝাঁক দেশের মাটির প্রতি দায়বদ্ধ এক ঝাঁক মানুষজন জবাব দিলেন
বাংলার শহুরে বুদ্ধিজীবিরা তখন লজ্জাজনক তুলনায় নিজেদের ব্যস্ত রেখেছিলেন নিজেদের সংস্কৃতির মহীরুহের পশ্চিমের নানান স্রষ্টার সঙ্গে তুলনা করছেন অবহেলে কেউ বাংলার শেলি, কেউবা বাংলার বায়রন আবার কেউবা বাংলার স্কট, আবার কেউ বাংলার গ্যারিক তবুও তাঁরা কেউ বাংলার নিজের সংস্কৃতির দিকে তাকিয়েও দেখার প্রয়োজন করলেন না আরও অভিযোগ উঠল যতটুকু সৃষ্টি হয়েছে এই সময়, তা সবই ধর্মাশ্রয়ী, এমত ইওরোপিয়মত প্রকাশকরেছেন সাহিত্য বিশেষজ্ঞরা সাংস্কৃতিক কর্ণধারেরা সকলেই ইওরোপবাদী ইওরোপের সাহিত্য আন্দোলন যেন তাঁদের নিজস্ব আন্দোলন তাঁরা কেউ বিচার করলেন না লৌকিক ধর্ম আর প্রাতিষ্ঠানিক বা রাজসভার ধর্মের মধ্যে পার্থক্যের কথা ধর্মাশ্রিত হলেও ধর্ম সবসময় মানুষের কথা বলেছে, তার দুঃখ, দুর্দশা আর তার থেকে নিরাময়ের কথা বাখান করেছে বাংলার দীর্ঘ সময় ধরে গ্রামগঞ্জের গীতিকা, মঙ্গল কাব্য অথবা রামায়ণ বা মহাভারতের অনুবাদে বার বার ফুটে উঠেছে সাধারণের জীবন যন্ত্রণা দেবতা রয়েছেন কিন্তু তিনি যেন লৌকিক মানুষ শিবায়ণ কাব্যের শিব আর চ্যংমুড়ি কানি সকলেই যেন লৌকিক মানুষের প্রতিনিধিত্ব করছেন ভক্তি যতটা রয়েছে, ভয় ততটা যেন নেই ষোড়শ শতাব্দের শেষ দিকে বৈষ্ণব ধর্ম যোগী-তান্ত্রিক-সুফিদেরমত অবৈষ্ণব গুহ্য সাধকদের আকর্ষণ করতে শুরু করে, যেখান থেকেই আউল, বাউল, সহজিয়া, সাঁই কর্তাভজা প্রভৃতি সম্প্রদায়ের উদ্ভব বহু ভিন্নস্বরের সমারোহে বৈদিকযুগের বহু আগে থেকেই বিংশ শতকের শেষার্ধ পর্যন্ত জীবনের জয়গানে বাংলার গ্রামীণেরা মুখর হয়ে উঠেছেন এবং অন্তরের ক্ষুতপিপাসা মিটিয়েছেন

ধূসর মৃত্যুর ছায়া – লোকনাট্যের সন্ধানে এক পরিক্রমা১


এই অত্যাশ্চর্য ধ্রুপদী লোকনাট্যরীতির জনপ্রিয়তা লোকসমাজে শ্রেষ্ঠতম আবার বলছি, শ্রেষ্ঠতম অবশ্য আরও লোক শিল্পেরমতই এর গায়েও মৃত্যুর ধূসর ছায়া পড়েছে – মায়ামৃদঙ্গ, সৈয়দ মুসতাফা সিরাজ
প্রায় তিনদশক আগে লেখা এক পথভাঙা উপন্যাসে সৈয়দ মুজতাফা সিরাজমশাই আলকাপ গান আর তার পরিবেশ পরিজন বর্ণনে পথপ্রদর্শকের ভূমিকা নিয়ে পরম মমতায় তুলে ধরলেন এর আগেও বহু মানুষ বিক্ষিপ্তভাবে আলকাপ নিয়ে ভেবেছেন, লিখেছেন অথবা তাকে নিয়ে শহরের প্রাঙ্গনে উপস্থাপন করেছেন, কিন্তু মায়ামৃদঙ্গ এমন একটি উপন্যাস, যার ব্যপ্তি শুধুই কাগজের পাতা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ে বাস্তবের কঠিন মাটিতে পলিমাটিরমত নরম তুলতুলে কলমেরঘাতে নিজের জীবনদিয়েই কিশোরী বেশী আলকাপ বালক আর আন্যান্য কুশিলবের দৈনন্দিন জীবনযন্ত্রণা, বাস্তব জীবন সংগ্রামের রক্তঝরা কাহিনী মরমীয়া কবিরমমতায় সৈয়দমশাই প্রথম তুলে এনেছিলেন শহরের বাবুসমাজের সামনে আজথেকে প্রায় চার আগেই মায়ামৃদঙ্গের রচনার সময়েই তিনি রচনা করেছিলেন, আলকাপের গায়ে ধূসর মৃত্যুর ছোঁয়া মন কেমন করা প্রতিবেদন দশক মুক্তগোলার্ধ রচনার নতুন সহস্রাব্দের প্রথম দশক শেষ, সেই ছায়া আরও দীর্ঘতর, আরও গাঢ়, আরও গভীর হয়ে চেপে বসেছে সিরাজমশাইএর সাধের আলকাপের পরতে পরতে বিশ্বজয়ী বৈদ্যুতিন মাধ্যমের বিকট মুখব্যদনে, কৃষি উত্পাদনের বিধ্বংসী কৌশলী কৃতকৌশলের পরিবর্তমে নিশ্চিহ্ন হতে বসেছে হাজার হজার বছরের মাটির সংস্কৃতি
তবে শুধুই আলকাপেরমত ব্যাপ্ত সংস্কৃতিই শুধু মৃত্যুর মুখেমুখি বললে অপনাপ হবে, লেটো, গম্ভীরা, বোলান, ডোমনি, মেছেনি, খন, দেতরা, বনবিবির পালারমত গ্রামীণ সংস্কৃতির লালনপালন করা শিল্পীদের চোখে বায়না না পাওয়ার নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার বেদনা, অতলান্ত হাহাকার ক্রমাগত বর্ধমান শিল্প-শিল্পী-জীবন যে জীবনযাত্রায় মিনেমিশে একাকার, সেই জীবনে শিল্পকে আলাদা ভাবে চিহ্নিত করার, শিল্পকে পেশ করার যন্ত্রণা প্রতিটি শিল্পীর জাবনে ফুটেউঠছে একদিকে দূরদর্শনে প্রতি সন্ধ্যায় অপরিসীম চাহিদা তৈরির কারখানার বাড়বাড়ন্ত অন্যদিকে শহরের শেকড়ছেঁড়া চাহিদাভিত্তিক সংস্কৃতির চাপে গ্রামীণ সংস্কৃতির নাভিশ্বাস শতাব্দের পর শতাব্দ গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে অন্তর্লীন স্রোতেরমত লৌকিক-গ্রামীণ সংসিকৃতি আজ দিশাহারা আপাত সহজিয়া দর্শনে জারিত কিন্তু বাস্তবে যথেষ্ট জটিল এই গ্রামীণ নাট্যের নানান প্রকাশভঙ্গী চলে যাচ্ছে বিস্মৃতির অন্তরালে কেউবা টিকে থাকার তাগিদে দূরদর্শণ অথবা যাত্রা বা চলচ্চিত্রের জাঁকজমকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মডার্ন পালার খোঁজে ব্যস্ত, কেউবা স্বরচিত শহুরে পল্লিগীতির প্রভাবে শহরতলীতে রেডিও-দূরদর্শণের তাবিজ তকমা ধারণ করে উদ্গ্রীব হয়ে উছেঠেন যেন তেন প্রকারেণ তথাকথিত শহুরে লেকসংস্কৃতির অপটু বিপননের আপাত সুখের টানে ভেসে চলেছেন কোন অজানা আগামীতে কে জানে!

Sunday, March 27, 2011

উত্তরবঙ্গের মুখা বা মুখোশ

সমগ্র বাংলা জুড়ে যতটুকু মুখোশের প্রাচুর্য রয়েছে, তার সন্ধান করা দেশজ সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধ সমাজের মানুষদের একান্ত প্রয়োজন. মালদহ থেকে শুরু করে  দার্জিলিং পর্যন্ত প্রায় প্রত্যেক জেলায় রয়েছে মুখা বা মুখোশের বৈচিত্র্য আর সমারোহ.
মালদহ
মালদহের মুখোশ সাধারণভাবেই মুখা নামে পরিচিত. যদিও গম্ভীরা গান বা পালার সঙ্গে এই মুখোশ একদা দেখা যেত আজ আর এই মুখোশের সচরাচর দেখা মেলে না. স্থানীয় শিল্পীরা বলেন, এবং সরকারি নানান প্রদর্শনী সাক্ষী,  একসময়ে এই মুখোশ তৈরি হত কাঠ দিয়ে, কিন্তু বর্তমানে এই মুখোশ তৈরি হয় মাটি দিয়ে. এদের মধ্যে নরসিংহ, কালি, রাম, কার্তিক, প্রেত, হনুমান, বুড়ো-বুড়ি, শিব, ভুত প্রভৃতি আজও তৈরি হয়.
গম্ভীরা বিষয়ে প্রথম শহরের মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হরিদাস পালিত আদ্যের গম্ভীরা বইতে লিখেছেন, মুখার উর্ধদিকে ও পশ্চাদংশে একটি এবং দুই কর্ণের পশ্চাতে দুইটি ছিদ্র দৃষ্ট হয়. মুখার ঘর্ষণ থেকে মুখ রক্ষার জন্য চাদর বা বস্ত্রখন্ড  দিয়া কর্ণ বেষ্টন করিয়া পাগড়ী বাঁধা হয়. বছরের শেষে গম্ভীরার নাচ আর মুখোশ দেখতে পাওয়া যায়. তবে নানান  কারনে দারুন দেখতে এই মুখোশগুলো সারা বাংলা জুড়ে লৌকিক শিল্পের দোকানে সচরাচর দেখতে পাওয়া যায়না. গম্ভীরা বা গাজনের সময় এগুলি পাওয়া যায়, মেলায় ওঠে, কিন্ত দাম পায় না, কেননা, গম্ভীরা শিল্পীছাড়া কেউই সাধারণতঃ এগুলি কেনেননা.
জলপাইগুড়ি
এই জেলার রাজবংশী সমাজ সমগ্র উত্তরবঙ্গেরমতই মুখোশকে মুখা বলেন. জলপাইগুড়ের মুখা-খেল কিন্তু গম্ভীরারমত শুধুই ধর্মীয় উত্সব নির্ভর নয় বলে, প্রায় সারা বছরই এই নাচ আর মুখোশ দেখা যায়. যদিও রাম-রাবণ, শিব-দুর্গা আর উত্তরবঙ্গের জাতীয়দেবী মনসার মুখা পাওয়া যায়. পৌরানিক বা ধর্মীয় ভাবনার পাশাপাশি সাধারণ জীবনের নানান ভাবনাও উঠে আসে এই মুখা খেলার মধ্যে.  এগুলি কাঠ, লাউ, পোড়ামাটি, পুরু কাগজ অথবা পাতলা শেলা দিয়ে তৈরি. কাঠের বা লাউএর খোলের ওপর কাদা দিয়ে ন্যকড়া এঁটে তার ওপর চিত্রকর এঁকে দেন. একমাত্র সূত্রধর সমাজেরই কোনো বিশেষ ব্যক্তি এই কাজটি করতে পারেন.
দিনাজপুর
দিনাজপুরে রাজবংশীদের পলিয়া আর দেশি সমাজে গমীরা খেলায় মুখা ব্যবহার হয়. এ অঞ্চলে মোখা নামে এটি পরিচিত. এগুলি একমাত্র ছৈতন বা ছাতিম গাছ দিয়ে তৈরি. গম্ভীরারমত মাটির মুখার প্রচলন নেই. তবে এই গমীরা-খেলার সঙ্গে গম্ভীরার কোনো ভাবগত সাজুজ্য নেই.  বুড়াবুড়ি, চামাড় কালি, উড়ান কালীর(শিকনি ঢাল)মত নানান বার্তাই এই নাচে দেওয়া হয়. রাম বনবাস পালায় অশোক বনের চেড়ি, হনুমান, পাতালের দানব, বাঘ, গন্ডার, ভালুক প্রভৃতি মুখোশ ব্যবহার হয়. হনুমানের মোখা শ্রদ্ধাসহকারে রাখা হয়.

দার্জিলিংএর মুখোশ নিয়ে আগেই আলোচনা হয়েছে.
একটা স্পষ্ট কথা বলা প্রয়োজন, এই অঞ্চলের মুখো নিয়ে ভারতীয় জাদুঘরের সবিতা রঞ্জন সরকার একবার কাজ করেছেন. সেই সংস্থা দ্বারা প্রকাশিত মাস্ক অব বেঙ্গল বইটি প্রথম এই মুখোশ নিয়ে ছবি প্রকাশ করে.

উত্তরবঙ্গের চৈতা গান

তার নাম চৈতা. সীমান্তবর্তী দিনাজপুরের লোক সংগীত. মকলা বাঁশে ঘেরা বাঁশবাড়ি গ্রামের পাশ দিয়ে বয়েছে মহানন্দা. একটু দূরেই জাতীয় সড়ক. রেলস্টশন আলুয়াবাড়ি. এই চৈত্র সন্ধ্যায় গ্রাম একত্রে মেয়ে পুরুষ এক সঙ্গে যে গান গেয়ে ওঠেন, তার নামই চৈতা. ক্রমশঃ এই গান ছড়িয়ে পড়ে নানান গ্রামে মহানন্দার পাড় ধরে. দার্জিলং জেলার তুরিয়াখালি আর চিতলঘাটা গ্রামে.
শুরু পয়লা চৈত্রের সন্ধ্যায়. মেয়েরা বাড়ি বসে খালিগলায় গান তোলে আর বাড়ি থেকে বারে বেরোনো পুরুষদের গানের সঙ্গের সঙ্গী খোল, মঞ্জিরা আর উত্তরবঙ্গের গানের সঙ্গে প্রায় সম নাম হয়ে ওঠা  দোতরা. অনেকটা সওয়াল জবাবের ঢংএ গান এগিয়ে চলে.
পড়িগেল চৈতকে ধুপ / আরে নেহারোয়া কৈসে যাই বারে...(চৈত্রের প্রখর রোদে কীভাবে বাড়ির বাইরে তাকাই), এরপর এক চৈতা গায়ক প্রশ্ন তোলেন, কোনা মাসে আমআরে / মঞ্জরী গেলহে রামা কোনা মাসে ধরলে টিকব? কোনমাসে আমের মুকুল আর কোন মাসে গুটি, এই প্রশ্নের উত্তরদেন আর এক চৈতা গায়ক, মাঘমাসে আমআরে মঞ্জরী গিল /চৈতা মাসে ধরালে টিকব অর্থাত মাঘ মাসে আমের মঞ্জরী আর চৈত্রতে তার গুটি.
গানের ভাষা কিন্তু ব্রজবুলির. যদিও এ গ্রামগুলোর বাসিন্দারা নিজেদের  বাঙালি আর মাহিষ্য বলে পরিচয়দেন, কিন্তু এই গানের কথা স্পষ্টই মৈথিলি ব্রজবুলি.
চৈত্রের চড়া রোদে ঘাটো ব্রত, গমীরা আর সিরুয়া পরব. সিরুয়ায় একে অপরের গায়ে ছুঁড়ে দেবে ধুলো, মাটি আর কাদা. ঘরের দেওয়ালে পড়বে রঙএর ছোপ, আঁকা হবে নানান ফুল, পাখি আর লতা.
মনেরাখতে হবে ঠিক এই সময়েই সারা ভোজপুরি এলাকা জুড়ে নরনারী সমবেতস্বরে গেয়ে ওঠে চৈতা গান.

Saturday, March 26, 2011

সেরপাই

বীরভূমের সিউড়ির কাছের এক গ্রাম, লোকপুর খ্যাত সেরপাই-এর জন্য. এই গ্রামেরই ভোলানাথ কর্মকার শুধু বাংলাই নয়, ভারতের নানান স্থানে বেশ নাম কুড়িয়েছেন সেরপাই তৈরির জন্য. ভোলানাথ এই শিল্পটি শিখেছেন তাঁর শ্বশুর মশাই কার্তিক কর্মকারের কাছ থেকে. আর যেহেতু লৌকিক শিল্পীদের পরিবারও সাধারণভাবে তাঁদের নানান কাজে হাত লাগান, সেরপাই তৈরিতে ভোলানাথের স্ত্রী রুমা আর কন্যা পুতুলও যথেষ্ট দক্ষ, কিন্তু তাঁরা ভোলানাথের সহকর্মীরূপেই বেশি কাজ করতে উতসাহী.

আগে আমকাঠ দিয়ে তৈরি হত সেরপাই, এখন হয় সেনাঝুরি দিয়ে. নির্দিষ্ট মাপ অনুযায়ী কেটে যে পাত্র বা খোনাটি তৈরি হয়, তার নাম ডোল. একে ঘসে মসৃণ করা হয়. ভুষো কালি, শিরিষ আঠা আর রজন দিয়ে কালো রং করা হয়. এর পর নকশা তৈরির পালা.
এর পর বাইরে তৈরি হয় পিতলের কারুকাজ, পিতলের পাত কেটে. পিতলের পাতের নকশার জন্য রয়েছে পুরোনো দিনের ফর্মা. নতুন সময়ে নতুন নতুন নকশারও প্রচলন হচ্ছে. তবে পুরোনোগুলো দেখতে কিন্তু বেশ সুন্দর. ফর্মা থেকে নকশা তুলে পাত কেটো ভ্রমর আর ফাইল দিয়ে সেই নকশা ফুটিয়ে তারপর এটি লাগানো হয় ডোল জুড়ে. এর পর পালিশ. তৈরি হল সেরপাই.

Friday, February 4, 2011

সাম্রাজ্যের বন্ধুরাঃ উচ্চ-মধ্যবিত্তের ঔপনিবেশিক চক্রান্তের মুখোশ১০


১৯২৯এর ১৫ ডিসেম্বরএ টাউন হলে নীলচাষের পক্ষে আয়োজিত এক সভায় রামমোহন বলেন তিনি বাংলা আর বিহার ঘুরে দেখেছেন নীল চাষী রায়তেরা বেশ সুখে স্বচ্ছন্দে দিনযাপন করছে, ভাল জামাকাপড় পরছে সেই সভাতেই দ্বারকানাথ বলেন তাঁর বাংলার নানান এলাকায় জমিদারি রয়েছে, আর নীলচাষে রায়ত আর নীলকর উভয়েই লাভবান হয়েছে এরপর রামমোহন আর দ্বারকানাথের সই করা একটি প্রস্তাবনা লর্ড বেন্টিঙ্কের চরমতম সুপারিশ নিয়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পাঠানো হয় নীলকরেরা কিন্তু ১৮৩০এর বেন্টিঙ্কের পঞ্চম আইনেও খুশি ছিল না এই আইনে বলা ছিল, দাদন নেওয়ার পর যদি কেনও রায়ত নীল চাষ না করে, তাহলে তাকে ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে সোপার্দ করা যাবে
নীলকরদের আরও বেশি অত্যাচারকে আইনি বৈধতা দেওয়ার ব্রিটিশ-শহুরে ভারতীয়দের আন্দোলন পার্লামেন্টেও পৌঁছয় ১৯৩১এ ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সিলেক্ট কমিটি রামমোহনকে সনদসহ নানান বিষয়ে ৫৪টি মূল আর ১৩টি অতিরিক্ত প্রশ্ন করে একটি প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ভারতে ইওরোপিয়দের জমি কেনার ফলে শিক্ষাবিস্তার, শিল্পায়ণ, কৃষিতে বিনিয়োগএরমত নয়টি সুফল ভোগকরতে পারে ভারত এই ভাষাতেই আজকের বিদেশি বিনিয়োগের প্রবক্তারা ওকালতি করেন বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের যদিও তিনি কয়েকটি নগন্য কুফলের কথাও বলেন রামমোহনের বক্তব্য পার্লামেন্ট রিপোর্টে গুরুত্বসহকারে প্রকাশিত হলে, এর বিরুদ্ধে বাংলার জমিদারেরা ব্রিটিশ পার্লামেন্টে প্রতিবাদপত্র পাঠান এমনকী লর্ড মেকলেও রায়তদেরপ্রতি নীলকরদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে কলম ধরেন ১৮৩৩এর সনদের ৮১ থেকে ৮৬ ধারা ভারতে ব্রিটিশ নাগরিকের যথেচ্ছ জমি কেনার আর বসবাসের সুযোগ এনে দেয় ১৮৩৩এর সনদের প্রভাব ভারতীয় সমাজ অর্থনীতিতে সূদূর প্রসারী হবে এই কজে, রামমোহন-দ্বারকানাথ জুটিটি সাম্রাজ্যের যে দায় নিজেদের বৃষসমস্কন্ধে তুনে নেবেন, তা আগামী দিনে ভারতে ঔপনিবেশিক দর্শনের ভিত গড়তে যোজনপ্রমাণ সাহায্য করবে
১৮০০ শতক পর্যন্ত ভারতের বাজারে ব্রিটিশ দ্রব্যের চাহিদা ছিলই না প্রায় তাই ভারতে প্রবাদ প্রতীম ম্যানচেস্টারের মিলগুলি প্রায় ধুঁকছিল ১৭০০, ১৭২০তে দুবার ব্রিটিশ সরকার ভারতীয় বস্ত্রের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয় ১৭৫৭ পর্যন্ত ব্যবসাটা প্রায় একতরফা ছিল নানান দ্রব্যের বিনিময়ে ভারত বিদেশ থেকে সোনা আনত ৫৭রপর ভারতই ব্রিটেনে একমাত্র উপনিবেশ যাকে চালানোর সাম্রাজ্যকে অর্থ ব্যয় করতে হত না, বরং ভারত থেকে উদ্বৃত্ত অর্থ নিয়ে ব্রিটেনের অর্থনীতির চাকাতো চলত বটেই, এমনকী অন্যান্য উপনিবেশের অর্থনীতিও গড়গড়িয়ে চলত ১৮৩৩এর সনদ (আর এর সঙ্গে রামমোহন-দ্বারকানাথের সরাসরি ওকালতি) গৃহীত হওয়ার পরেই ভারত থেকে ব্রিটেনে কাঁচামালের রপ্তানির বহর বেড়ে যায় বহুগুণ ভারত থেকে ব্রিটেনে ১৮১৩তে ৯ মিলিয়ন পাউণ্ডের সুতো রপ্তানি হত ১৮৩৩এ তার পরিমান বেড়ে দাঁড়ায় ৩২ মিলিয়ন আর ১৮৪৪ সালে সেই রপ্তানির পরিমান দাঁড়ায় ৮৮ মিলিয়ন পাউণ্ড সনাতন ভারতের কারখানাগুলোর শ্মশান যাত্রা শুরু হয়, গ্রামীণ বাজার ধংস হয় ভারতের বাজার ব্রিটিশ উত্পাদনে ছেয়ে যায় ব্রিটিশ সভ্যতার অসীম অত্যাচার সয়েও ভারতীয় শিল্প যতটুকু উত্পাদন করছিল তার অধিকাংশ বন্ধ হয়ে যেতে থাকে গ্রামে গ্রামে সমাজে সমাজে এই সময় থেকেই ব্রিটেনের জিডিপি দুই অংকের ওপরে উঠতে শুরু করে(এ প্রসঙ্গে ১৯১৩কে ভিত্তিবর্ষ ধরে ব্রিটেনের ঐ সময়ের জিডিপির ইতিবৃত্ত ১৭২০-২১ ২.১, ১৭৬০-৬১ ২.৬, ১৭৭০-৭১ ৩.৩,, ১৭৮০-৮১ ৩.৫, ১৭৯০-৯১ ৪.৬, ১৮০০-০১ ৫.৭, ১৮১০-১১ ৭.১, ১৮২০-২১ ৯.৭, ১৮৩০-৩১ ১৮.৩, ১৮৪০-৪১ ১৯.৬ লক্ষ্য করুন ১৮০০র পর থেকে জিডিপি ৫এর উর্ধমুখী আর ৩০এর পর লাফিয়ে দুই অংক ছাড়িয়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে কুড়ির ঘরে প্রবেশ করেছে) শিল্পবিপ্লবের বেশকিছু হাতিয়ার যেমন স্পিনিংজেনি - স্বচলমাকু, ৭০ বছর আগে আবিষ্কার হলেও, পড়েছিল ঠাণ্ডাঘরে তাকে চালানোর জন্য ভর্তুকির অর্থনীতির বাজারের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল একটু একটু করে- সাম্রাজ্যের পাখির চোখ ছিল ভারতীয় বাজারেই দিকেই ১৮৩৩ থেকে সেই ভারতীয় বাজারে লুঠপ্রতীমব্যবসা আর চিনকে ঘাড় ধরে আফিমে বুঁদ রাখার ব্রিটিশ ব্যবসারঘোমটারআড়ালে লড়াই(যদিও দুবার আফিম যুদ্ধও হয়েগেছে) - যার অন্যতম বাঙালি অংশিদার দ্বারকানাথ-রামমোহনসহ বেশকিছু ব্রিটিশ রেনেসাঁর উপজাত শহুরে জনগোষ্ঠী আর পারসি সমাজের অংশিদার, কামা, জেজে, টাটারা (ব্যবসায়ী পারসিদের আফিম ব্যবসার অর্থে গড়ে উঠেছে আজকের মুম্বই) - খুলেদিল শিল্পবিপ্লবের হাঁ মুখ ব্রিটিশ লুণ্ঠনে ৭০ সাল ধরে একাদিক্রমে ভারতীয় শিল্পধংসকরণ প্রক্রিয়ায় ভেঙেপড়া ভারতীয় শিল্প সমাজের জ্বলন্ত চিতায় শেষ কাঠ ১৮৩৩এর সনদ আর সাম্রাজ্যের আফিম আর নীলকরদের ভারতীয় বন্ধুদের উপনিবেশ গড়ার আন্দেলনের চক্রান্ত ভেঙেদেবে সনাতন ভারতীয় সমাজের শেষতম শিক্ষাব্যবস্থা আর শিল্প কাঠামোটিও এর পরই ত্রিশের দশকের শেষ থেকে ম্যানচেষ্টারের মিলগুলোতে স্বচলমাকু ঘুরতে থাকবে দুর্দম গতিতে, প্রায় বিনাব্যয়ে ব্রিটেনে পাঠানো ভারতীয় কাঁচামালের ওপর ভিত্তিকরে
রামমোহন আর দ্বারকানাথ, ভারত সমাজ ধংসে তাদের ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেও আধুনিক ভারতের প্রথম আধুনিক কারিগর-বুদ্ধিজীবি হয়ে উঠতে পারেন, আর যে সব নীলচাষী তাদেরমত আধুনিক মানুষের অত্যাচার সয়ে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন তারা থেকে যান নীরবে নীল বা আফিম বিদ্রোহের কেনো স্মরণ তিথিও পালিত হয়না কার্ল মার্কসএর ভাবশিষ্য সুশোভন সরকারও রামমোহন-দ্বারকানাথপ্রমুখদের এই বিদ্রোহ বিরোধী, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদপন্থী আন্দোলনের পথ সরাসরি সমর্থন করতে বাধ্যহন কেননা তাঁদের গুরুঠাকুর কর্ল মার্কস নিজেই ভারতকে পশ্চাদপদী দেশ হিসেবে অভিহিত করে গিয়েছেন, তাই তাকে চোখের মাথা খেয়ে অস্বস্তিকরভাবে সাম্রাজ্যবাদী বন্ধুদের সমর্থন করতে হয় এ পাপ তোমার এ পাপ আমার!
মনেরাখতেহবে, গ্রামীণ সমাজ লুঠেরা ব্রিটিশকে এক দিনও সুখে থাকতে দেয়নি বছরের পর বছর ধরে তারা হাতে অস্ত্র তুলেছে, ব্যতিব্যস্ত করে রেখেছে সরকারকে কোটি কোটি গ্রামীণ বিদ্রেহী বাঙালির সঙ্গে যুদ্ধে রক্ত হোলি খেলেছে ব্রিটিশ, মন্বন্তরের পর মন্বন্তরে নির্বিকারে কোটি কোটি বাঙালি আর ভারতীয় মেরেও সে সভ্য জাতি জগত্সভার হর্তাকর্তাবিধাতা সে সমাজের জাগতিক সম্পদ লুঠ, সমাজের জ্ঞাণ-প্রযুক্তি চুরি আর সমাজের হাজার হাজার বছর ধরে যে শিল্প পরিকাঠামো গড়ে উঠেছিল, তাকে ধংস করার প্রতিক্রিয়ায় সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, ঘড়ুই বিদ্রোহ, খয়রা মাঝি বিদ্রোহ, চাকমা বিদ্রোহ, নীল ও আফিম চাষী বিদ্রোহ, মালঙ্গী বিদ্রোহ, পাহাড়িয়া বিদ্রোহ, সুবান্দিয়া বিদ্রাহ, নায়েক বিদ্রাহ, গারো বিদ্রাহ, ওয়াহবী বিদ্রাহ, ফরাজী বিদ্রোহ, সাঁওতাল-মুণ্ডা বিদ্রাহ, সিপাহি বিদ্রোহের পর বিদ্রোহের আগুনে যখন ফেটে পড়ছ ভারতীয় সনাতন সমাজ, তখন কলকাতায় বসে রামমোহন আর দ্বারকানাথের সুযোগ্য নেতৃত্বে বাঙালি বুদ্ধিজীবিরা প্রাণপনে চেষ্টা করে চলেছেন কীভাবে ব্রিটিশ সরকারের আরও ভালভাবে সেবা করা যায়, ব্রিটিশ চক্রান্তে সমাজেরকে টুকরো টুকরো করে ফেলার সরকারি কোম্পানির পরিকল্পনায় যথাসাধ্য বুদ্ধি নিয়োগ করে রাজাবাহাদুর, রাযবাহাদুর, রাজা উপাধি অর্জন করা যায়, সরকারের সঙ্গে মিলে মানুষ লুঠের ব্যবসায় আরও ধনী হওয়া যায়
রামমোহন বা দ্বারকানাথ শুধু নয়, সে সময় অধিকাংশ শহুরে মধ্যবিত্তই ব্রিটিশদের প্রশ্রয়ে সনাতন ভারতের বিদ্রোহের বিরুদ্ধে প্রাণপাত করে উপনিবেশের পক্ষে সবলভাবে দাঁড়িয়েছেন কেউ জানেন না নীল বিদ্রোহের সাহিত্যিক রূপকার দীনবন্ধু মিত্র শেষ বয়সে লুসাই যুদ্ধে ব্রিটিশ সরকারের প্রতি আনুগত্যের পুরস্কার হিসেবে রায়বাহাদুর উপাধি অর্জন করেন দুর্জনদের বক্তব্য দীনবন্ধু কুকি বিদ্রোহের সময় আসমের ডাক প্রধান ছিলেন তিনি কুকি বিদ্রোহীদের চলাচলের সংবাদ ব্রিটিশ সরকারের কাছে বিক্রয় করে বিদ্রোহ ধংসের অন্যতম কারবারি হয়ে ওঠেন শেষ বয়সে কোম্পানি সরকার নীল দর্পণের লেখককে তার বিদ্রোহ দমনের কাজে সন্তুষ্ট হয়ে সরকারি রায়বাহাদুর উপাধি দান করেন আর ভারতের গ্রামীণ সমাজের প্রতিনিধি, তিতুমীর নীল চাষীদের পক্ষে দাঁড়িয়ে ১৮৩১ খৃষ্টাব্দে নারিকেলবাড়িয়ায় কর্নেল স্টুয়াটের নেতৃত্বাধীন ইংরেজ বাহিনীর মোকাবিলা করেনবীর তীতুমীর যুদ্ধ শহীদ হনতার প্রধান অনুচর ও সহকারী গোলাম মাসুম ৩৫০ জন বিদ্রোহীসহ বন্দী হলেনগোলাম মাসুমকে প্রাণদন্ডে দন্ডিত করা হয় শহুরে ব্রিটিশ বন্ধুদের মুখোশ না খুলতে পারার লজ্জা তার সঙ্গে বিদ্রাহীদের স্মরণ না করার লজ্জা, এই দুই লজ্জা আজও অধিকাংশ শহরবাসীকে কুরে কুরে খায় না চক্রান্ত কী আজও চলছে না!
শিক্ষত পূর্বজদের সমস্ত দায় মাথায় নিয়ে, নতমস্তকে আর বিনীতভাবে বলা যাক, এই সামান্য লেখায়, ক্ষুদ্র সামর্থে বাংলার যেসব স্বাধীনতাপ্রিয় সমাজ, পলাশি চক্রান্তের পর থেকে কোম্পনির শাসনের বিরুদ্ধে জান-প্রাণের পরোয়া না করে বিদ্রোহের ধ্বজা উড়িয়েছে, নতুন সময়ে বসে নতুন করে স্মরণ করতে চেষ্টা করি, শ্রদ্ধা জানাই সেইসব আপাতশান্ত অথচ স্বভাববিদ্রাহী সমাজের কাণ্ডারীদের, যারা তিল তিল করে পূর্বজদের বহু পরিশ্রমে গড়ে তোলা বাংলার সমাজের একটির পর একটি গ্রন্থি ভাঙতে দেখে হাতে অস্ত্র তুলে নিতে বাধ্য হয়ে ছিলেন উপনিবেশের গ্রাস থেকে তাঁরা বাংলার সমাজ বাঁচাতে হয়ত সফল হননি, কিন্তু ব্রিটিশতামুকখাওয়া শহুরে ভারতের তৈরি সর্বগ্রাসী উপনিবেশিকতাবাদী দর্শনের বিরুদ্ধে প্রায় দেড়শ বছর ধরে বিদ্রোহী সমাজগুলির মাথারা উপনিবেশিক সরকারের তৈরি রূদ্ধপথভাঙার পথ তৈরি করে গিয়েছিলেন, তৈরি করে দিয়ে গিয়েছিলেন বাংলাকে ভালবাসার শপথ গ্রহণের স্বোচ্চার বাণী বিপ্লবী আন্দোলনের বিপরীতে শহুরে সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তে সরাসরি জড়িয়ে পড়ার কর্মকাণ্ডও বিচার করার চেষ্টা করাযাক বিপ্লবের আয়নায়
সেই প্রতিবাদী অথচ ভালবাসার পথ, মাঝখানের বছরগুলোতে একটু একটু করে ইওরোপিয় সাম্যবাদের প্রচণ্ডতায়, ধর্মীয় সংখ্যাগুরু আর সংখ্যালঘু মৌলবাদের হুঙ্কারে সাময়িকভাবে হারিয়ে যেতে যেতে কিন্তু আবার নতুন করে জীবন ফিরে পাচ্ছে ঔপনিবেশিক শাসন পাকা করতে কোম্পানির অর্থ-দাক্ষিণ্যেপুষ্ট মহাপণ্ডিত হয়েওঠা জোনস বা ভারতভাঙার কারিগর ম্যাক্সমুলারের নানান ভাষা বা দার্শনিক তত্ত্বের তথাকথিত গবেষণামূলক আবিষ্কারে আজও ব্রিটিশ অনুগামী বাঙালি বুদ্ধজীবি মহল চমত্কৃত বিশ্বে অন্যপথের দিশারী ঋষি কার্ল মার্কস পর্যন্ত ভারতের সনাতন সমাজ ভাঙার কাজে সরাসরি ব্রিটিশ সরকারের মদত দিয়েছেন, বলেছেন অপচয়ের এই বুর্জোয়া সমাজ উন্নততর সমাজ ব্যবস্থা সেই সব ভাবনারমূলে বাঙলায় খুব একটা কুঠারাঘাত না হলেও বাঙলার বাইরের নানান কাজে সনাতন ভারত আবিষ্কারের পথ নতুন করে খুলছে সাম্রাজ্যের বন্ধুদের নতুন করে চেনার কাজ শুরু হচ্ছে, নতুন করে দাবি উঠছে কৃতকর্মের জন্য সাম্রাজ্যের আজকের প্রতিনিধিদের ক্ষমা ভিক্ষার আজ ঔপনিবেশিকতাবাদের বাইরে বেরিয়ে সনাতন বাংলার নিজস্ব জ্ঞান, প্রযুক্তি, শিল্প চর্চার নথিকরণের কাজ হচ্ছে তবে সেই কাজ আরো ভালভাবে সুসম্পন্ন হতেপারে যদি বিদ্রোহী বাংলার উত্তরসূরীরা ঔপনিবেশিক বাংলার কুজ্ঝ্বটিকা সরিয়ে বিদ্রোহের ইতিহাস রচনা আর বিদ্রোহীদের চরিতবাখানে কম্বুকণ্ঠ হন আর তথাকথিত আধুনিকতার ধ্বজাধারী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বন্ধুদের চক্রান্তের মুখোশ খুলে দিতে পারেন

সাম্রাজ্যের বন্ধুরাঃ উচ্চ-মধ্যবিত্তের ঔপনিবেশিক চক্রান্তের মুখোশ৯


এই লেখাটির মূল উদ্দেশ্য দুশো বছরের ব্রিটিশ সরকার, ব্রিটিশ বুদ্ধিজীবি আর তার ভারতীয় অনুগামীরা বাংলা তথা ভারতের সমাজের দর্শণ, প্রযুক্তির ন্যুনতা অন্বেষণে, সনাতন সমাজ ভাঙার প্রচেষ্টায় যে নিরবিছিন্ন প্রচার চালিয়েছেন তার ভিত্তিমূলকেই প্রশ্ন তোলা ব্রিটিশ আর পশ্চিমি সভ্যতার নির্দেশিত পথে ইওরোপিয়ভাবনায় শহুরে ভারত গড়ার কারিগরেরা এতদিন প্রণম্য ছিলেন, তাঁদের অবদানের কথা বহু আলোচনা হয়েছে, কিন্তু ঔপনিবেশিক শাসন গড়ে তুলতে, বিদ্রোহী ভারতের বিরুদ্ধে পরেক্ষে যুদ্ধ ঘোষণা করতে তাঁদের অবদান কী তা না জানলে বিদ্রোহী বাংলার প্রতি যে সুবিচার অপেক্ষা করে রয়েছে তাকে সম্মান জানানো যাবে না
বিদ্রোহী বাংলা অথবা বাংলার প্রযুক্তি-দর্শণ নিয়ে অসত্য তথ্যের পাহাড় সরানোর কাজে আজ ব্রতী হওয়া দরকার সর্বাগ্রে আদিবাসী সমাজকে বাগে না আনতে পেরে, বেশকিছু আদিবাসী সমাজকে জন্ম অপরাধীর ছাপ মেরে দেওয়ারমত ব্রিটিশ সরকারি কাজের চক্রান্তমূলক সমর্থন এসেছে বর্ণ বাঙালিদের সমাজ থেকেই বাংলার লৌকিক আদিবাসী গ্রামীণ সমাজের বিদ্রোহ দমন করতে ব্রিটিশ সভ্যতা যে হোলি খেলেছে, তার প্রচারও খুব একটা হয়নি, যে রক্তের ছিটের দাগ আজও লেগে রয়েছে ইংরেজি জানা বর্ণহিন্দুর গায়ে, সে দাগ সহজে ভারতীয় সভ্যতা মুছতে দেবেনা এই কলমচির গায়েও সেই দাগ লেগে রয়েছে যে গনগনির মাঠে হাজার হাজার বিদ্রাহীকে ফাঁসি দেওয়া হয়, সেই গনগনিরমাঠ আজ অবহেলায় পড়ে রয়েছে বিদ্রোহীদের রক্তচিহ্নবুকে ধরে সারা বিশ্বে তার কৃতকর্মের জন্য অতীতের নানান সম্রাজ্য বিভিন্ন সমাজের কাছে ক্ষমা চাইলেও, বাংলার একের পর এক মন্বন্তর ঘটিয়েও, সামাজিক ভারতের গ্রামীণের অর্বুদ-পদ্ম পরিমাণ অর্থ লুঠ করে, জ্ঞান চুরি করে, সমাজকে ছিন্নভিন্ন করে, ব্রিটিশ হৃদয় নিষ্কলঙ্ক থাকে, শহুরে, দেশ ছাড়া বুদ্ধিবিভাষাময় বাঙালিরাও ব্রিটিশ অর্থে চিনির পলেস্তেরা ফেলা গবেষণা কর্ম করে নোবেল পান ভারতে বা বাংলায় তাদের কৃতকর্মের জন্য রাণীকে ক্ষমা চাইতে বলার সাহস এ কজন আন্তর্জাতিক নোবেলীয় ব্যক্তিত্বের হয় না
বাংলার বৌদ্ধিক জগতে একটি নির্জলা মিথ্যে প্রচারিত রয়েছে যে, বাংলা তথা ভারত নিরুপদ্রবে ব্রিটিশ শাসন মেনে নিয়েছিল লৌকিক ভারত নয়, এই শাসন মেনে নিয়েছিল প্রথমে শহুরে বাংলা, পরে শহুরে ভারত বাংলার রেনেসাঁর নাম করে গত দেড়শ বছর যে বৌদ্ধিক পিটুলি গোলা বিশ্ব তথা বাংলাকে মানতে বাধ্য করেছে ব্রিটিশ অনুগামী বুদ্ধিবিভাষা, যে প্রচারে সমগ্র বাংলা আজও বুঁদ, সেই অতিকথার হাওয়া-বেলুন চুপসে দেওয়ার কাজ করা আজ সর্বস্তরের ভারতসমাজপ্রেমী মানুষের অবশ্য কর্তব্য যখন হাজার হাজার সরল লৌকিক বা আদিবাসী সমাজ ঔপনিবেশিক ব্রটিশদের প্রতি ঘৃণায় হাতে অস্ত্রের তুলে নিযেছে, অবলীলায় প্রাণ দিচ্ছেন হাজার হাজার গ্রামীণ নর-নারী, তখন শহুরে ভারতীয় বুদ্ধিবিভাষার প্রধাণ পুরুষ রামমোহন আর তার অনুগামী দ্বারকানাথ আর তাঁদের শিষ্যগোষ্ঠী শিল্পবিপ্লবীয় দর্শনের পথে অতুলনীয় ধণে ধনী হতে গিয়ে প্রথমে লুঠেরা ব্রিটিশদের বেনিয়ানি করে, চাকরি করে, পর্বত প্রমাণ অর্থ অর্জন করেন
পরে সেই উত্পাতের অর্থে জমিদারি কিনে ভারতীয় রায়তদের শুধুই জোর করে আফিম বা নীল চাষ করতে বাধ্য করেন নি, আফিম আর নীল বিদ্রাহীদের সরাসরি বিরোধিতা করেছেন, বিদ্রোহীদের পরোক্ষে ঠেলে দিয়েছেন বাংলা জুড়ে তাণ্ডবলীলা চালানো ব্রিটিশ সেনার সামনে, লবন বিদ্রোহীদের বিরোধিতা করে, সরকারের লবন নীতির সমর্থন করে বুক ফুলিয়ে লবন ব্যবসা করেছেন, ভারতে ব্রিটিশদের জমি কেনার জন্য, দিল্লিশ্বরের জন্য কোম্পানির বরাদ্দ অর্থ বাড়াতে মহারাণীর কাছে লণ্ডনে দালালি করেছেন, চিনের সঙ্গে অনৈতিক আফিম ব্যবসায়ে সরাসরি জড়িত থেকেছেন, ভাইবেরাদারদের নিয়ে ব্যাঙ্ক খুলে আর কার টেগোর নামক কোম্পানি তৈরি করে নীল আর আফিম ব্যবসায় টাকা নিয়োগ করছেন, নীল চাষীদের রক্তে বোনা নীল রংএর ব্রিটিশ বণিক সাম্রাজ্যের সঙ্গে ব্যবসায়ে বাংলায় বড়তম অংশিদার ছিলেন, মহামান্য কেম্পানি বাহাদুরের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সরাসরি ভারতীয় সভ্যতার নামে ঘৃণা ছড়িয়ে অজস্র আস্থা অর্জন করেছেন, গ্রামীণ বাংলার সমাজিক বনিয়াদ ধ্বংস করে তার চরিত্র পাল্টে দেওয়ার কাজে সরাসরি যুদ্ধ করা ব্রিটিশ সেনারা যখন বিদ্রাহীদের রক্তে হোলি খেলছে, মেকলে, ট্রভলিয়নেরমত জাতিবিদ্বেষী ব্রিটিশ সরকারি আমলারা যখন কলকাতায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হাজার হাজার বছরের ভারতীয় সভ্যতার মুখে কালি ছেটাচ্ছেন, তখন ইংরেজি শিক্ষিত ভারতসমাজবিদ্বেষী বর্ণকুলীন নবজাগরণের বাঙালি কর্ণধার আর অগ্রদূতেরা রামমোহনের সাক্ষাত শিষ্য দ্বারকানাথ বেলগাছিয়ার বাগানবাড়িতে অশ্লীল নাচের আসর বসিয়ে মেকলেকে অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন মদের ফোয়ারা ছুটিয়ে, অজস্র অর্থ ব্যয় আর নষ্ট করেছেন অপচয়ের চরমে উঠে এ দেশে দ্বারকানাথ আর তার অস্বস্তির অপৌত্তলিকগুরু রামমোহনের যত জীবনী প্রকাশ হয়েছে, তাতে প্রায় প্রত্যেক লেখক উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে তাঁর বেনিয়ানি করে ঘুষ গ্রহণ, নুন আর আফিম বোর্ডে দেওয়ানি করে বামহস্তক্রিয়ায় বাস্তবে পাওয়া মাইনে থেকে অত্যন্ত বেশি আয় করা, ভারতে অত্যাচারী ব্রিটিশ নীলকরদের পক্ষ নেওয়া, নুন ব্যবসায় তার বিরুদ্ধে মালঙ্গীদের আন্দোলন নিয়ে সাধারণেই নীরব থেকেছেন
কুড়ির দশকেই নীলকরদের অত্যাচারে বাংলার চাষীরা হাতে অস্ত্র তুলে নেয় মনেরাখতে হবে বাংলার চাষীর একটা বড় অংশ ইসলামধর্মী তিতুমীর ছিলেন তাঁদের অন্যতম নেতা ততকালীন ভারতে নীলকরেরা কোম্পানি সরকারের কাছ থেকে কোনো আইনি রক্ষাকবচ পেত না ব্রিটিশ নাগরিকেরা ভারতভূমিতে জমিও কিনতে পারত না নীলকরেরা আইনি সুরক্ষা দাবি করলেন এটি উপনিবেশ গড়ার(কলোনাইজেশন) আন্দোলন নামে পরিচিত এই তত্বে রামমোহন দিয়েছেন সামাজিক-রাজনৈতিক ভিত্তিভূমি আর দ্বারকানাথ দিয়েছেন অর্থনৈতিক বনিয়াদ দ্বারকানাথের লেখায় বারবার উল্লিখিত হয়েছে নীল চাষে তিনি আর তার আত্মীয়দের অর্থনৈতিক উন্নতির সুগভীর বর্ণনা ১৮৩৩ সালের ভারতে ব্রিটিশ ইন্ডিয়া কোম্পানির একচেটিয়া ব্যবসার সনদ নতুনভাবে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে গৃহীত হওয়ার আগে থেকেই ভারতে জমি কেনার অধিকার পাওয়ার জন্য ব্রিটিশ নীলকর আর আফিম চাষীরা কোম্পানিকে যথাসম্ভব চাপ দিচ্ছিল রামমোহন আর দ্বারকানাথ সেই গোষ্ঠীরই পক্ষেই আন্দোলন করছিলেন তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ ব্রিটিশ আফিম আর নীল চাষীদের সঙ্গে জড়িত শিয়ালদায় সব থেকে বড় নীলের গুদাম ছিল দ্বারকানাথের ১৯২৩এর বড়লাট আমহার্ষ্ট-এর ষষ্ঠ আইনে বলা হল, সুদ-আসল তুলতে নীলকরেরা মামলা করতে পারবে ১৮২৮এ সংবাদ কৌমুদি ভারতে নীলকরেরা জোর করে ধানের জমি দখল করে নীল চাষ করানোর সংবাদ প্রকাশ করে ঐ বছরেই ২৬ ফেব্রুয়ারি দ্বারকানাথ ঠাকুর পত্রিকাটিতে একটি চিঠি প্রকাশ করে সংবাদের বিরুদ্ধমত প্রকাশকরে ভারতে ব্রিটিশ প্রজাদের, আদতে আফিম চাষী আর নীলকরদের জমি কেনার সপক্ষে সওয়াল করেন দ্বারকানাথের দাবি, এতে নীলকর জমিদারদের যেমন উপকার হবে তেমন গরীব চাষীদেরও একটু বেশি রোজগার হবে।। Rammohun believed that, the presence of British settlers would force the government to broaden political participation & to introduce British political institution in India, creating in the process a true British-Indian Empire… Rammohun suggested that immigration to be limited to Europeans of the high & better educated class -  খোলাখুলি বলছেন elite-পন্থী দ্বারকানাথের ব্রিটিশ জীবনীকার ব্লেয়ার বি ক্লিং তার Partner in Empire: Dwarakanath Tagore & the age of enterprise in Eastern India বইতে ব্লেয়ার যত সহজে রামমোহন বা দ্বারকানাথের পক্ষনিয়ে পরোক্ষে ব্রিটিশ সভ্যতার জয়গান আর ভারত ধংসের বীনা বাজাতে পারেন পারেন, শহুরে ভারতীয়রা পরবর্তীকালে ঠিক তত সহজ দক্ষতা নিয়েই ব্লেয়ারদের সুরে সুর মিলিয়ে সেই ধংসতত্ব সমর্থন করবেন! দ্বারকানাথের এই দাবির প্রতিধ্বনি তার দেড়শ বছর পর কন্ট্রাক্ট ফার্মিংএর প্রবক্তারা নতুন করে তুলবেন

সাম্রাজ্যের বন্ধুরাঃ উচ্চ-মধ্যবিত্তের ঔপনিবেশিক চক্রান্তের মুখোশ৮


তখনও ভারতীয় সমাজ, লেখাপড়ার সঙ্গে গাড়ি চড়ার অস্বস্তিকর সম্পর্ক গড়ার থেকে, বিদ্যা আর্জণ করে বিনয়ী হতে বেশি অভ্যস্ত কিন্তু শহুরে ভারতীয়দের নিদান হল, হাজার হাজার বছরের জ্ঞাণ চর্চার পদ্ধতি ছেড়ে নিতে হবে সাগর পারের ভুঁইফোঁড় বিদ্যাচর্চা পদ্ধতি জোর যার মুলুক তার ব্রিটিশ শিক্ষা পদ্ধতি বিনীত হতে শেখায় না, অধিকার করতে শেখায়, বিনা প্রতিবাদে অনুগামী হতে বাধ্য করে মানি আর না মানি, বিগত প্রায় দুশো বছর ধরে শহুরে ভারত ইওরোপিয় জ্ঞাণ চর্চার ধারাকে বহন করে চলে ভারত রাষ্ট্র ক্রমশঃই পিছিয়ে পড়ছে প্রযুক্তির বিকাশে সে আজকের বিশ্ব-প্রযুক্তিতে ইওরোপ থেকে কম করে চল্লিশ বছর পেছনে পড়ে ৪০ বছর আগে ইওরোপ চাঁদে মানুষ পাঠিয়েছিল, আজ ভারত শুধু চাঁদে মানুষহীন রকেট পাঠিয়েই খুশি
আজ বাংলার হাতে গোণা মানুষ ডোকরা শিল্প দিয়ে বাড়ি সাজালেও, জানেই না বাংলায় ডোকরা কামারেরা জং ছাড়াই লোহার সামগ্রী তৈরি করতে আজও সক্ষম, সেই প্রযুক্তি এখনও বাংলার শিল্পীর দখলে রয়েছে আজও বাংলার বহুপ্রান্তে দলমাদল বা বাচ্চাওয়ালিরমত বহু কামান ছড়িয়ে ছিটিয়ে খোলা আকাশের নিচে অবহেলায় পড়ে রয়েছে, অথচ এক ফোঁটাও জং পড়েনি ইওরোপে যখন টিকা দেওয়ার প্রচলন হয় নি তখন বাংলার ব্রাহ্মণেরা সফলভাবেই টিকা দিতে জানতেন খুব কম ক্ষেত্রে বিফল হত তাঁদের টিকাদান বাংলার নবদ্বীপ, ভাটপাড়া, হাতিবাগান, বর্ধমান, বাঁকুড়ার বিস্তির্ণ অঞ্চলে ছিল বিশ্ববিদ্যালয়প্রতীম শিক্ষাদান কেন্দ্র শহরের মানুষের অবহেলায় সেগুলি কোথাও আজ জীর্ণ - অধিকাংশ স্থানে মুছে গিয়েছে ভারতীয় বিদ্যামানচিত্র থেকে বাংলার মসলিন, বালুচরী প্রবাদ প্রতীম, কিন্তু বাংলার পটুয়া(মষ্করী) আর ভাষ্করদের হাতে অজন্তা-ইলোরা বা অঙ্কেরভাটেরমত নানান স্থাপত্য রূপ পেয়েছে, দীনেশ সেনমশাই সে তথ্য বলে গেলেও আজও তা খুব একটা সর্বজনবিদিত কী? বিশ্বের বাজারে বাংলার গৌড়ি মদের, চিনির, নুনের, সুপুরির, হাতির, ধাতুর, শিল্পকলার একদা যে সমাদর ছিল তাও কেউ জানি কীনা জানিনা পাশ্চাত্য মার্কসীয় সাম্যবাদী দর্শনের আদ্যপান্ত অন্ধ অনুগামী অথচ লৌকিক বাংলার বিনম্র পুজারী বিনয় ঘোষ দেখেছেন পাঁচ রংএর সিল্কএর বর্ণনাবিশিষ্ট পুঁথি, রাণীগঞ্জে বাংলার পোড়ামাটির স্থাপত্যের প্রযুক্তি নিয়ে মুকুল দে মশাইএর কাজ কয়েকজন বিদগ্ধজনের বাইরে ঠাঁই হয়নি দিল্লির লৌহস্তম্ভ বাঁকুড়ার পেখন্না গ্রামের কর্মীদের তৈরি, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী আর রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবিষ্কার করা এ তথ্য কোনো এক অজানা কারণে বাংলাতেও খুব একটা প্রচার পায়নি বাংলার সুপ্রাচীণ লাঙল যে প্রযুক্তি বিদ্যার এক চরমতম নিদর্শণ কজন জানি সেচের কাজে আসা ব্রিটিশ প্রযুক্তি ভোলকার সরকারকে জানিয়েছিলেন বাংলার সেচ ব্যবস্থা ভারতীয় প্রযুক্তিরবিদ্যার চরমতম নিদর্শণ
বাংলার বাইরে বিশেষ করে এক হাতে ধরমপালজী আর তার সঙ্গীসাথীরা অথবা আলমোড়ার লোক বিজ্ঞান কেন্দ্র বা দক্ষিণ ভারতের নানান শিকড়ে যাওয়ার আন্দোলনে ভারতের সনাতন সমাজ, দর্শণ, ঐতিহ্য, প্রযুক্তির নথিকরণ করেছেন দায়বদ্ধভাবে এই বাংলার অন্তরকে জানাতে চেয়ে যে কাজের সূত্রপাত ঘটিয়েছিলেন রাজেন্দ্রলাল মিত্র, অক্ষয় কুমার দত্ত, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, দীনেশচন্দ্র সেন অথবা নির্মল চন্দ্র বসুরমত মানুষ, সেই কাজের এক অংশের দায়ভাগ আজকের প্রজন্ম তুলে নিলেও, বাংলার ন্যুনতা নিয়ে ব্রিটিশ মিথ-মিথ্যাকে খণ্ডন করার কাজ খুব একটা আগ্রসর হয়নি শহুরে বাংলার শিক্ষায়, জ্ঞানে, বুদ্ধির রণ্ধ্রে রণ্ধ্রে যে উপনিবেশবাদ ঢুকে রয়েছে, তাকে বিনাশ আর খণ্ডন করা অত্যন্ত জরুরিকর্ম ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে ঔপনিবেশিকতাবাদের নগ্নতম রূপ দেখে, সারা জীবন ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে কাজ করা মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদেরমত মানুষ শেষ বয়সে এই দর্শনের খণ্ডনকার্যটি হাতে নিতে চাইছিলেন(১৯১০ সালের কাছাকাছি এসে তিনি জানান ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সুফল না বলতে দিয়ে, যদি কেউ তাকে কুফল বলাতে চান, তাহলে তিনি স্বস্তিবোধ করবেন) চাইলেও তিনি পারেন নি পারেননি তাঁ অনুগামীরাও এটাই চরমতম ঐতিহাসিক সত্য এই খণ্ডনকর্ম করতে গেলে আজ প্রয়োজন ইওরেপিয় জ্ঞান আর ইতিহাস চর্চার মিথ-মিথ্যাগরীমাকে প্রশ্ন করা, যা আম বাঙালি বুদ্ধিজীবিদের স্বপ্নেরও অগম্য
বিগত দুশো বছরের ইওরোপিয় জ্ঞাণ-বিজ্ঞাণ-প্রযুক্তির আধিপত্যবাদ নিয়ে জ্ঞাণচর্চার ইতিহাস যে নির্জলা অসত্য প্রচার করেছে, সেই প্রচার ভারতীয় ইংরেজি শিক্ষিত বর্ণকুলীন বিনা প্রতিবাদে মেনে নিয়েছে, আজও নিচ্ছে কেরল অঙ্কবিদ্যার যে ভিত্তিভূমি আজ বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তাতে প্রমাণিত যে, কলন বিদ্যার সূত্র ধরেই তৈরি হয়েছে পশ্চিমি গণিতের অন্যতম ভিত নিউটন বা লিবনিত্জকে কলণবিদ্যার জনক বলার কোনো হেতু নেই কেরলিয় গণিতই ইওরোপে নিউটনিয় অংক নামে পরিচিত আজ ভারতীয় কলণ বিদ্যাকে ইওরোপ-পূর্ব কলন বিদ্যার ছাপ মেরে দেওয়া হচ্ছে, কেননা ভারত কখোনোই ইওরোপেরমত লিমিটের ধারণা প্রয়োগকরে কলন বিদ্যার চর্চা করে নি তার আলাদা প্রকার কলন চর্চার ইতিহাস রয়েছে যে ইতিহাস আজ এক কলণবিদ্যার ছাত্রেক কাছে অজানা আজ যে কোনো ভারতীয় বিদ্যালয়ের পাঠ্য অঙ্ক পুস্তকে বলা হয় ত্রিকোণোমিতির উদ্গাতা গ্রীক সভ্যতাশ্রিত মিশরের আলেজান্দ্রিয়া পাঠ্যবইতে তাঁদের যে ছবি ছাপা হয় সবই ককেসাসিয়ান চেহারার অথচ আলেকজান্দ্রিয়ায় যে মানুষেরা অঙ্কবিদ্যা চর্চা করছেন তাঁরা সকলেই আদত আফ্রিকার অধিবাসী, তাঁদের চেহারায় আফ্রিকার ছাপ থাকার কথা কিন্তু ব্রিটিশ তথা পশ্চিমি প্রচারে তাঁরা সকলেই ইওরোপিয় চেহারার অধিকারী, ব্রিটিশদের সেই প্রচার শহুরে শিক্ষিত আমরা নির্বিবাদে গ্রহণ করেছি এক সাধারণ যাজক কোপার্নিকাস ইওরোপিয়দের প্রচারে হয়ে উঠেছেন প্রখ্যাত বিজ্ঞানী তিনি শুধুমাত্র ল্যাটিনে অনুবাদ করেছেন ইবন শাতির আর নাসিরুদ্দিন তুসির রচনার গ্রীক সংস্করণ আর ইওরোপিয়দের প্রচারে প্রভাবিত হয়ে অধিকাংশ বাঙালি বুদ্ধিজীবি আজও তথাকথিত কোপার্নিকাসীয় বিপ্লবের ধারণায় বুঁদ হয়ে থাকেন আর ভাবেন ইওরোপিয় ইতিহাসের ভুল ধরারমত ভুল আর বিশ্বে কিছুই নেই সকলেরই ধারনা ইওরোপীয় সব বচনই সত্য আর সব মিথ্যা সবই ব্যাদে আছে - অসামাজিক ব্যাঙ্গটিতে নিজের সনাতনী সমাজের প্রতি যে দুর্দমনীয় অশ্রদ্ধা প্রকাশ ঘটেছে তা আদতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সভ্যতার দান আজ ভারতের অধিকাংশ অংকবিদ জানলেও বলেন না ইওরোপিয় পদ্ধতিতে অংক কষার বাইরেও একটা অংক চর্চার অ-ইওরোপিয় ইতিহাস রয়েছে